পঞ্চম অধ্যায়

প্রলয় কুমার নাথ

সাল - ২০২১ (বর্তমান সময়)

স্থান - মন্তেশ্বর গ্রাম

গ্রামের হারান গোঁসাই বেশ অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। ওই এক জমিদার বাড়িটা বাদ দিলে, এই গ্রামে পাকা বাড়ির সংখ্যা হাতে গোনা। তার মধ্যে অন্যতম হল হারানের বাড়ি। চাল, গম এবং নানাবিধ শষ্যের ব্যবসা করে তার আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে। স্ত্রী প্রতিমা আর দুই মেয়েকে নিয়ে সুখে সংসার করে সে তার একতলা পাকা বাড়িটাতে। তবে একটা দুঃখ যেন সব সময় কুড়ে কুড়ে খায় হারানকে। সেটা হল এখনো অবধি কোন পুত্র সন্তান জন্ম না দিতে পারার শোক। বড় মেয়ে পুঁটির বয়স প্রায় দশ বছর হল, আর ছোট মেয়ে টেপির পাঁচ। মেয়েরা তো বাপের বাড়ির কয়েক দিনের অতিথি মাত্র, বিয়ে হয়ে গেলে তো আর তারা এখানে থাকবে না। এত পরিশ্রম করে ব্যবসাটাকে যে দাঁড় করালো হারান, তার অবর্তমানে তাহলে সেটা কে দেখবে? জামাইরা তো এক গাদা টাকা পয়সা বিয়ের সময়ই নেবে, তাই তাদের মধ্যেই নিজের অবর্তমানে নিজের ব্যবসা এবং বিষয় সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা করতে প্রাণ সায় দেয়না হারানের। এই সব সমস্যার সমাধান হয় যদি তাদের একটা ছেলে হয়। আকারে ইঙ্গিতে এই কথা অনেকবার সে বোঝাতে চেষ্টা করেছে প্রতিমাকে। তাই এইবার গ্রামের এক ওঝার সান্নিধ্যে এসে নানা প্রকারের তুক তাক, ঝাড়ফুঁক ইত্যাদির বশবর্তী হয়েছে প্রতিমা। সহবাসের আগে হারানকে দুধের সাথে সেই ওঝার দেওয়া কি যেন একটা গাছের শেকড় বেটে খাওয়ানো বা সেই ওঝারই দেওয়া ওই অদ্ভুত গন্ধযুক্ত তেলটা দিয়ে স্বামীর পুরুষাঙ্গ মালিশ করে দেওয়া এবং সহবাসের সময় ওই ওঝারই শেখানো একটা মন্ত্র আওরে যাওয়া…এই সব নানাবিধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দিবারাত্রি ঈশ্বরের কাছ থেকে একটা পুত্র সন্তান কামনা করে চলেছিল প্রতিমা। মাদুলি, তাবিজ, কবজেরও কমতি নেই তার এবং তার স্বামীর শরীরে। তবুও পুত্রসন্তান হওয়া দূরের কথা, আপাততঃ সন্তানসম্ভবনার কোন ছাপই নেই তার দেহে।

সেদিন সকালে হারান দোকানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল, টেপির হাত ধরে পুঁটিও মাকে টাটা করে বেরিয়ে গেল পাঠশালার উদ্দেশ্যে। গোয়াল ঘর থেকে সোনা গাইটা সকাল থেকেই বড্ড ডাক পারছিল। তাই প্রতিমা গরুটিকে দেখতে ঢুকলো গোয়াল ঘরে। সোনার সামনে রাখা খাবারের পাত্রটা প্রায় খালি হয়ে পড়ে আছে। প্রতিমা তখনই সেটার ভেতর কাটা খড় আর ভাতের ফ্যান ঢেলে দুই হাত দিয়ে সেগুলো মাখতে লাগল। এমন সময় অদ্ভুত ভাবে গোলায়ের তাপমাত্রা যেন নীচে নেমে গেল। প্রতিমার কানে ভেসে এলো এক মিহি জান্তব ডাক:

—"ম্যাওওও…ম্যাওওও…ম্যাওওও"

উবু হয়ে বসা অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন পানে তাকিয়ে চমকে উঠল প্রতিমা। একটা বিচ্ছিরি দেখতে বুড়ি এসে দাঁড়িয়েছে গোয়ালের মাঝে। ময়লা লালপেড়ে শাড়ি গাছ কোমর করে পরা, কালো তোবড়ানো মুখের চামড়ায় সহস্র বলিরেখা ভর্তি, তার অপরিস্কার জটা ধরা সাদা চুলগুলো যেন শনের নুড়ির মত উড়ছে। আর এই বুড়িটার কোলেই রয়েছে একটি ভূতের মত দেখতে কালো বেড়াল, কিছুক্ষন আগে যার ডাক শুনতে পেয়েছে প্রতিমা।

—"খিদে…বড্ড খিদে পেয়েছে রে আমার!…কত্ত দিন কিছু খাইনি আমি…আমায় কিছু খেতে দিবি রে বউ!", ঠান্ডা কণ্ঠে হিসহিসিয়ে বলে উঠল বুড়িটা।

বুড়িটার পায়ে কালো ধুলো ময়লা ভর্তি, আর সেই পা দিয়েই হাঁটার সময় সদ্য নিকানো উঠোনটার একেবারে দফা রফা করে দিয়েছে সে। মাথায় আগুন জ্বলে উঠল প্রতিমার।

—"আরে এই হাঘরের বেটি!…কোথা থেকে এসেছিস রে তুই?…যা, বেরো বলছি, যাআআআ…", ভাতের ফ্যান মাখা হাতেই বুড়িটার কাছে মারমূখী হয়ে ছুটে গেল প্রতিমা।

—"ও বউ, কিছু খেতে দে না রে আমারে…বড্ড খিদে পেয়েছে রে আমার…আমার পুষিটাও কত দিন কিছু খায়নি!", আকুল কণ্ঠে আবার বলে উঠল বুড়িটি।

—"মরণ দশা! নিজের খাওয়ার জোগাড় নেই, আবার ওই হতভাগা বেড়ালটাকে পুষতে গেছে!…এই, তোমার কথা কানে যাচ্ছে না, যাও বেরোও আমার বাড়ি থেকে, নাহলে এখনই পাড়ার লোক ডাকছি আমি…", ঝগড়ার সুরে বলে উঠল প্রতিমা।

—"হি হি হি হি", এবার তাকে অবাক করে খিলখিল করে হেসে উঠল বুড়িটি। আরেকবার একটি শীতল দমকা হাওয়ার ঝাপটা এলো প্রমিমার গায়ে…আর চক্ষের নিমেষে যেন কর্পূরের মত উবে গেল বুড়ি এবং তার পোষ্যটি! এমনকি উঠোনে তার পায়ের ছাপগুলো অবধি যেন কোন মন্ত্রবলে অদৃশ্য হয়ে গেল। সাথে সাথে মাথা ঘুরে অচৈতন্য হয়ে গোয়াল ঘরের মেঝেতে ঢলে পড়ল প্রতিমা।

এর কয়েকদিন পরেই প্রতিমা বুঝেছিল যে সে অন্তঃসত্ত্বা। হয়তো ওঝার দেওয়া টোটকা কাজে লেগেছে, এবার হয়তো ঈশ্বর মুখ তুলে চাইবেন তার দিকে…হয়তো ছেলেই হবে তার! এই সব ভেবে আনন্দে গদগদ হয়ে রইল প্রতিমা আর হারান। তখন প্রায় নয় মাসের মাথায় হবে, একদিন রাতে গর্ভবতী প্রতিমার কঁকিয়ে ওঠার আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেল হারানের। সে উঠে দেখল তার পাশে শোয়া প্রতিমার শাড়ি এবং তার নিচের বিছানার অংশটা কেমন যেন ভেজা ভেজা। তার মানে জল ভেঙেছে প্রতিমার! ভয়ে বুক কেঁপে উঠল হারানের। এত রাতে কি করবে সে! কিভাবে ওকে গাঁয়ের হাসপাতালে নিয়ে যাবে? সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ল ওদের বাড়ি থেকে কয়েক ঘর পরেই মৃদুলা বলে একটি বিধবা মহিলা থাকে। সে আগে ধাইএর কাজ করত, এখন অবশ্য আর ধাইয়ের ওপর তেমন বিশ্বাস করে না কেউ, তাই সবাই চেষ্টা করে তাদের বাড়ির অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। কিন্তু এত রাতে হারানের ক্ষেত্রে মৃদুলা ছাড়া আর কোন গতি নেই! ঝটপট পুঁটিকে ঘুম থেকে তুলে যেভাবেই হোক মৃদুলাকে ডাকতে পাঠালো হারান। কিছুক্ষনের মধ্যেই পুঁটি মৃদুলাকে নিয়ে এই বাড়িতে এলো।

হারান সহ বেশ কিছু পুরুষ মানুষেরা ঘরের বাইরে অস্থির চিত্তে পায়চারি করছিল। তারা বুঝেছিল যে আর দেরি নেই, সেদিনই ভূমিষ্ঠ হতে চলেছে প্রতিমার সন্তান। তাই মনে মনে তারা পুত্র সন্তানের জন্য হন্যে হয়ে প্রার্থনা করছিল ভগবানের কাছ। ঘরের মধ্যে ছিল শুধুমাত্র মৃদুলা আর প্রতিমা। অত্যাধিক প্রসব বেদনায় ছটফট করছিল প্রতিমা।

—"কিছু হবে না…কিছু হবে না…একটুখানি সবুর কর মা…দেখ, সব মেয়েদেরই এটা সহ্য করতে হয় রে…", প্রতিমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল মৃদুলা।

এমন সময় একটা তীব্র আর্তচিৎকার করে আর যন্ত্রণার ছোটে জ্ঞান হারাল প্রতিমা। মৃদুলা বুঝতে পারল মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। সে বাচ্চার নাড়ি কাটার সব সরঞ্জাম তৈরি করতে লাগল, এমন সময়…

যে হারান এবং অন্যান্য পুরুষেরা সদ্যজাত শিশুর ক্রন্দন ধ্বনি শোনার জন্য মুখিয়ে উঠেছিল, তারা বেশ কিছুক্ষনের পরে ঘরের ভেতর থেকে একটা নারী কণ্ঠের তীব্র চিৎকার শুনে হকচকিয়ে উঠল। এই চিৎকার আর কারোর নয়, মৃদুলার। সকলে দল বেঁধে ছুটে গেল ঘরের বন্ধ দরজার দিকে, ক্রমাগত কড়াঘাত করে চলল মৃদুলার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে। কিন্তু দরজা খুলল না মৃদুলা। অগত্যা বাধ্য হয়েই কিছু বলশালী পুরুষ গায়ের জোরে ছিটকিনি ভেঙে খুলে ফেলল সেই বন্ধ ঘরের দরজা। কিন্তু ভেতরে ঢুকে সেখানকার দৃশ্য দেখে বিস্মিত পুরুষের দল যেন কিছুক্ষন স্থানুর মত অচল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কিছুক্ষন পর হারান মাটিতে বসে পড়ে মেঝেতে মাথা কুটে হাহাকার ভরা স্বরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। এর কারণ, ওদের সামনেই মেঝের ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে মৃদুলা, তার মাথায় চোট লেগে মৃদু রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আর ওদের সামনেই বিছানার ওপর পড়ে আছে প্রতিমার লাশ…তার অনাবৃত নিম্নাঙ্গ রক্তে ভেসে যাচ্ছে…কেউ যেন প্রবল আক্রোশে ফালা ফালা করে ছিঁড়ে দিয়েছে তার যোনিপথ! আর তার পেটের বাচ্চাটি!…তার কোন হদিস নেই।

কিছুক্ষন পর জ্ঞান ফিরেছিল মৃদুলার। সেই রাত্রে কি হয়েছিল ওই ঘরে, এই কথা জিগাসা করলে সে আতঙ্ক মেশানো কাঁপা কাঁপা গলায় সবাইকে জানিয়েছিল একটি অদ্ভুত অবিশ্বাস্য কথা! মৃদুলা যখন তৈরি হয়ে নিচ্ছিল বাচ্চাটিকে বার করে নাড়ি কাটার জন্য, ঠিক তখনই কেমন যেন একটা ঝড় ওঠে ঘরের ভেতর। সেই হাওয়ার দাপটে ঘরের কুপির আলো নিভে যায়। মৃদুলার মনে হয় কেউ যেন তাকে জোরে ধাক্কা মারে। সে আছড়ে পড়ে দেওয়ালের গায়ে। তার মাথায় আঘাত লেগে রক্ত ক্ষরণ হতে শুরু হয়। ঠিক তখনই মৃদুলার যেন মনে হয় ঘরের খোলা জনলাটা দিয়ে একটা সাপের মত কোন জন্তু ঢুকছে ঘরের ভেতরে। তার চলাফেরার সাথে একটা খসখস শব্দ হচ্ছে। ধীরে ধীরে সেই জন্তুটা এগিয়ে আসে প্রতিমার দিকে। তারপর তার শরীরের সামনের অংশটা যেন একটি নারী শরীরের রূপ ধারণ করে। সবুজ গাত্রবর্ণ বিশিষ্ট ভয়ানক দেখতে সেই পিশাচিনীর মূর্তি…তার আগুনের গলার মত জ্বলন্ত দুটি চোখ, ঠোঁটের দুইপাশে তীক্ষ্ণ দুটি শ্বদন্ত, সাপের মত চেরা লম্বা জিভ, মাথার চুলগুলো যেন এক গুচ্ছ সর্প শাবকের মত কিলবিল করে বেড়াচ্ছে তার মুখ আর কাঁধ জুড়ে! তীক্ষ্ণ নখ বিশিষ্ট আঙ্গুল দিয়ে সে প্রতিমার যোনি ফাঁক করে চিরে, গর্ভের সন্তানটিকে টেনে হিঁচড়ে বার করে। তারপর সদ্যজাতটির টুঁটি কামড়ে ধরে একবার তাকায় আতঙ্কে আরষ্ঠ মৃদুলার দিকে। এতটা দেখেই জ্ঞান হারায় মৃদুলা…তবে তার আগে সেই পিশাচিনীর ফিসফিস করে বলা কয়েকটা কথা আসে মৃদুলার কানে!

—"কি বলছিল সে?", সকল গ্রামবাসী একত্রে চিৎকার করে জানতে চায় মৃদুলার কাছ থেকে।

—"কেমন যেন একটা অন্য রকম ভাষা…আমার যে ঠিক মুখে আসচে না গো!", ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে মৃদুলা, তবুও মস্তিষ্কে চাপ দিয়ে একটু ভেবে সে বলে ওঠে,

—"হ্যাঁ এইবার মনে পড়েছে…সে যেন বলচিল:

ব..ব..বানা চ..চ…চচুগুনু ভ..ভ…ভ্যের!"

***********

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%