সপ্তম অধ্যায়

প্রলয় কুমার নাথ

সাল - ২০১৯

স্থান - কলকাতা

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনের সবুজ গাছপালায় ঘেরা একটি স্থানে নরম ঘাসের গালিচার ওপর বসেছিল তৃণা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার অফ ফাইন আর্টস (পেন্টিং) - এর ছাত্রী সে। এক বছর হল সে এই কোর্সে ভর্তি হয়েছে অঙ্কন শিল্পেই গ্রাজুয়েশন করার পর। এটা তার দ্বিতীয় বছর। ইউনিভার্সিটির এই জায়গাটি ব্যক্তিগত ভাবে তৃণার ভীষণ পছন্দের। এমনিতেই খুব মিশুকে মেয়ে সে, তবুও ক্লাসের ফাঁকে কিছুটা সময় নিজেকে একা দেওয়ার জন্য সে চলে আসে এই স্থানে। মোবাইলে হেডসেট গুঁজে একটি ওয়েব সিরিজের মধ্যে মনোনিবেশ করেছিল সে, ঠিক এমন সময় তার কাছে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো তার বান্ধবী তথা সহপাঠী, শ্রীপর্ণা। এমনি শ্রীপর্ণা মেয়েটি বেশ সহজ সরল, তবে তার দোষের মধ্যে হল, সে অত্যাধিক ন্যাকা এবং কোন কথাই নিজের মনে গোপন রাখতে পারে না সে। শ্রীপর্ণা হঠাৎ তৃণার হাত থেকে তার মোবাইল সেটটি কেড়ে নিয়ে সেটাতে খোলা ওটিটি অ্যাপটি বন্ধ করে হেডসেটটিও সেটা থেকে খুলে সেটা ফেরত দিয়ে দিল তৃণা কে।

—"এটা কি হল?", বিরক্ত হয়ে জানতে চাইল তৃণা।

—"আরে তুই ওই নেটফ্লিক্স দেখা ছাড় তো…আর আমার সাথে আয়, ওয়েব সিরিজের বাইরেও একটা ব্যাপক জিনিস তোকে দেখাচ্ছি, একবার দেখলে যার দিকে তুই সারা জীবন দেখতেই থাকবি!"

এই বলে সে তৃণার সকল বাধা অগ্রাহ্য করে তার কব্জি ধরে তাকে টেনে আনল ইউনিভার্সিটি বিল্ডিং এর আরো কাছে। এই স্থানে বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রীরা আড্ডা দিচ্ছে, কোন কোন ছেলে আশেপাশের ঝোপের আড়ালে তাদের গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ কেউ বা সদ্য শেখা অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে সুখটান দিচ্ছে বিড়ি বা সিগারেটে। কিন্তু এদের সবার থেকে একটু আলাদা স্থানে বসেছিল এক বিদেশী যুবক। তার সামনে খোলা ছিল একটি আঁকার খাতা, যার সাদা পাতার ওপর শুধুমাত্র পেন্সিল ব্যবহার করে কি অসাধারণ দক্ষতায় সে ফুটিয়ে তুলেছে গোটা ইউনিভার্সিটি বিল্ডিংটার প্রতিরূপ। তার থেকে কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে ছিল তৃণা আর শ্রীপর্ণা।

—"ওয়াও!", ছেলেটার আঁকার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল তৃণা।

—"হ্যাঁ রে, সত্যিই ওয়াওও…হি ইস ড্যাম হট, ইয়াআআর!", অত্যাধিক ন্যাকামির ভঙ্গিতে টেনে টেনে বলে উঠল শ্রীপর্ণা। এতক্ষনে ছেলেটার চেহারার দিকে নজর গেল তৃণার। না ভুল কিছু বলেনি শ্রীপর্ণা, বিদেশী ছেলেটি সত্যিই সুদর্শন। যেমন তার তার সুগঠিত সিক্স প্যাক ওয়ালা ফিসিক যা তার টাইট ফিটিং টি-শার্টের ভেতর থেকে ফেটে বেরোচ্ছে, তেমনই তার হাইট এবং দুধে আলতা গায়ের রঙ। খয়েরী রঙের চুল এবং গালে রাখা হালকা হালকা দাড়ি যেন তার সৌষ্ঠব আরো বৃদ্ধি করেছে। নীল রঙের চোখের মণি বিশিষ্ট ছেলেটা যে কোন মেয়ের মনের ভেতর পারি জমাতে পারে চোখের একটি ঝলকেই।

এইবার একটু বিরক্ত বোধ করল তৃণা,

—"তাহলে আমাকে তুই ওর আঁকা নয়, বরং ওকেই দেখাতে নিয়ে এসেছিস এখানে, তাই তো?", ছেলেটির দিকে পেছন ফিরে শ্রীপর্ণার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে উঠল তৃণা।

—"ইয়েএএস ডিয়াআআর!", এখনো ছেলেটিতেই মজে ছিল শ্রীপর্ণা।

—"তুই তো বড্ড ক্যারেক্টারলেস মেয়ে দেখছি", শ্রীপর্ণাকে ঝাঁকিয়ে বলে উঠল তৃণা, "ওদিকে তোর বেচারা বর অফিসের টার্গেট পূরণ করতে করতে কাহিল, আর তুই কিনা এখানে অন্য একটি ছেলের পেছনে ঝাড়ি মারছিস! বাহ, ভেরি গুড!" শ্রীপর্ণা গত বছরই পাড়ার প্রভাতদাকে প্রেম করে বিয়ে করেছে। ওর বিয়ের সময় ওর বর বেকার ছিল, কিন্তু এখন যা হোক করে সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে একটি সেলসের চাকরিতে ঢুকেছে। তবে ওই শুধু একটা ছোট্ট সিঁদুরের রেখা ছাড়া বিবাহিত হওয়ার আর কোন প্রমাণ শ্রীপর্ণার সাজপোশাকের মধ্যে ধরা পড়ে না।

—"আরে ধুর, ওকে আমি একাই ঝাড়ি মারতে চাইলে তোকে ডাকব কেন শুনি! আমি তো ওকে সিলেক্ট করেছি তোমার জন্য সখী!", তৃণার চিবুক স্পর্শ করে মৃদু হেসে ফিসফিসিয়ে গেল শ্রীপর্ণা,

—"শোন ছেলেটা দেখতে ভালো, দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ পয়সা ওয়ালা ঘরের ছেলে, সদ্য ভর্তি হয়েছে ফার্স্ট ইয়ারে। এইবেলা সব কাজ ফেলে ওর পেছনে লেগে থাক, বুঝলি…অন্তত ফ্রিতে বিদেশ ভ্রমণটা তো…"

ওর কথা শেষ না হতেই তৃণা মারমূখী হয়ে বলল,

—"দেখ শ্রী, এইবার কিন্তু মার খাবি। একটা জুনিয়র ছেলে, আর তাকে নিয়ে…ডিসগাস্টিং! আর খুব ভালো করেই জানিস সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে অনিমেষ আমার বয়ফ্রেন্ড! আমার এই রাঙা মুলোকে নয়, বরং ওই টল ডার্ক এন্ড হ্যান্ডসাম অনিমেষকেই পছন্দ!"

—"আরে তুই জানিস না অনিমেষ কত খারাপ হয়ে গিয়েছে…নিত্য দিন বারে গিয়ে ড্রিংক করা, ডান্সারদের পেছনে পয়সা ওড়ানো, ড্রাগের নেশা, এমনকি ওই সব খারাপ মেয়েদের সাথেও ও মেশে রে, আমি শুনেছি ওর বন্ধুদের কাছ থেকে!"

—"চুপ কর তো, আমি এই সব কিছুতেই মানতে পারবো না যে…"

ওদের কথোপকথনের মাঝে কখন যে বিদেশী ছেলেটা আঁকা শেষ করে খাতাটা হাতে নিয়ে ওদের দিকেই এগিয়ে আসল, সেটা ওরা লক্ষ্য করল না।

—"হাই আই অ্যাম বুরাক…আই মিন বুরাক কালেভ!…নাইস তো মিট ইউ গার্লস!", তৃণা আর শ্রীপর্ণাকে অবাক করে হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে তাদের দিকে হাত এগিয়ে বলে উঠল বুরাক নামক বিদেশী ছেলেটা। সেই থেকেই তৃণা আর শ্রীপর্ণার আলাপ শুরু বুরাকের সাথে। তারা জেনেছিল যুবকটি ইউ.এস.এর কোন একটা কলেজ থেকে আঁকায় গ্রাজুয়েশন করেছে, তারপর ভারতে এসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে নিতান্তই ভারতীয় পেন্টিংকে ভালোবেসে। সে ওদের থেকে এক বছরের জুনিয়র হলেও বয়সে তাদের থেকে কয়েক বছরের বড়ই হয়তো হবে, কারণ কিছু ব্যক্তিগত কারণের জন্য শৈশবে কয়েক বছর সে পড়াশোনা করতে পারেনি।

দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশ কিছু মাস। এখন ফেব্রুয়ারি মাস, তাই হালকা হালকা ঠান্ডা আমেজ আছে সকালের কলকাতা জুড়ে। সকাল দশটাতেই আজকে একটা ক্লাস আছে তৃণার। লেডিস হোস্টেল থেকে তৈরি হয়ে বেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যেতে যেতে ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে আঁতকে উঠল তৃণা। আজকে নির্ঘাত লেট করে আসার জন্য লেকচারারের বকা খেতে হবে। বাসে বসে যেতে যেতে সেই কথাই ভাবতে লাগল তৃণা। আজ যেন গোটা ইউনিভার্সিটিতে উৎসব উৎসব মেজাজ। গোটা চত্বর জুড়ে এদিক ওদিক বসে আছে প্রেমিক প্রেমিকার জুটি। তবে সেদিকে পাত্তা না দিয়ে তৃণা এগিয়ে গেল ক্লাসঘরের দিকে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক, সেই দিন স্বয়ং লেকচারারই পাক্কা চল্লিশ মিনিট দেরি করে এলেন। তাই বেঁচে গেল তৃণা। ক্লাস যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন তৃণার ফোনে টুং করে একটা মেসেজ এলো। সেটা লিখেছে বুরাক!!

"Are you in class right now?"

"Yes", প্রত্যুত্তর পাঠালো তৃণা।

"Please stay a while after the class gets over, wanna meet you and tell you something", বুরাকের পরের এই মেসেজটা দেখে অবাক হয়ে গেল তৃণা। কিছুক্ষনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল ক্লাস। আজ অনিমেষের কি হয়েছে কে জানে, আজকের ক্লাস বাংক করেছে সে। ক্লাস শেষ হতে ফাঁকা ঘরে কিছুক্ষন বসেছিল তৃণা। এমন সময় একমুখ হাসি নিয়ে সেখানে প্রবেশ করল বুরাক। তৃণাকে অবাক করে একটা সুদৃশ্য কার্ড আর সাথে একটি গোলাপের কলি তৃণার দিকে এগিয়ে ধরল বুরাক। কার্ডের গায়ের বড় বড় ইংরাজি অক্ষরে লেখা 'হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে"! কার্ড আর ফুলটা প্রায় জোর করেই তৃণার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঈষৎ লাজুক গলায় বলে উঠল বুরাক,

—"অ্যাকচুয়ালি আ…আই ওয়ান্টেড তো সে দ্যাট…দ্যাট…দ্যাট আ…আই অ্যাম ইন লাভ উইথ ইউ!…উইল ইউ বি মাই ভ্যালেন্টাইন?", তৃণার দুই হাত আলতো করে চেপে ধরল বুরাক!

বিস্ময়ে হতবাক তৃণার নজর গেল বুরাকের ঠিক পেছনে। চোখে আগুন নিয়ে তাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে অনিমেষ। নিচে তার পায়ের কাছে পড়ে আছে তৃণার জন্য নিয়ে আসা তার ভ্যালেন্টাইনস ডের কার্ড, ফুল এবং চকোলেট।

—"শালা শুয়োরের বাচ্চা!", অনিমেষ চিৎকার করে ছুটে এলো বুরাকের কাছে, তারপর তার জামার কলার ধরে তারস্বরে বলে উঠল,

—"আজ যেই একটু দেরি হয়ে গেল তৃণার জন্য কার্ড আর গিফ্টগুলো কিনতে, ওমনি তুই চান্স নিবি ভেবেছিস, তাই না?", সশব্দে এক ঘুষি কষালো অনিমেষ বুরাকের নাকের ওপর। নিচে পড়ে গেল বুরাক, তার নাক দিয়ে একটা সরু রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ল।

—"হাউ ডেয়ার ইউ টাচ মাই গার্লফ্রেন্ড!'"

তৃণা ছুটে গেল ওদের দুজনের দিকে। আলাদা করতে চেষ্টা করতে লাগল এই দুই যুবককে।

—"ইটস ওকে অনি…ইটস ফাইন। ও আমার সাথে কোন অসভ্যতামি করেনি রে, শুধু নিজের মনের কথা জানাতে এসেছিল। ও হয়তো জানে না আমার সাথে তোর সম্পর্কের কথা!", রাগে ফুঁসতে থাকা অনিমেষকে শান্ত করতে চেষ্টা করল তৃণা। অনিমেষ খপ করে তৃণার হাত থেকে বুরাকের দেওয়া কার্ড আর ফুলটা নিয়ে নিল…তারপর দুটোকেই কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ছুঁড়ে মারল বুরাকের মুখের ওপর। তারপর এক ঝকটায় তৃণাকে নিজের কাছে টেনে জড়িয়ে ধরল অনিমেষ। তৃণা লক্ষ্য করল হাওয়ায় উড়ন্ত কার্ডের টুকরো এবং গোলাপের পাপড়িগুলোর মধ্যে ছলছল চোখে তাদের কাছ থেকে ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে বুরাক। অনিমেষের বুকে মুখ গোঁজা অবস্থাতেই এই স্বল্প-পরিচিত, সুদর্শন বিদেশী ছেলেটার জন্য অল্প হলেও তৃণার হৃদয় মুষড়ে উঠল কি?

আরও কিছু মাস পরের ঘটনা। এর মধ্যে ইউনিভার্সিটিতে তৃণার সাথে বুরাকের চোখাচোখি হলেও তেমন কথাবার্তা হয়নি ওদের দুজনের মধ্যে। সেদিন ছিল তৃণার জন্মদিন। অনিমেষ তাকে আগেই জানিয়ে রেখেছিল আজকের দিনটা সে তৃণাকে নিয়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার সেলিব্রেট করবে পার্ক স্ট্রিটের একটি দামী রেস্তোরাঁয়। সন্ধে হতেই সেজেগুজে তৈরি হয়ে নিয়েছিল তৃণা। সঠিক সময় তার লেডিস হোস্টেলের সামনে একটি বড় গাড়ি এসে থামল। সেখান থেকে নেমে এলো সুটেড-বুটেড অনিমেষ। তৃণা অবাক হল, অনিমেষ অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলে সেটা ঠিক, কিন্তু এতো বড় গাড়ি তো সে কখনো দেখেনি ওদের বাড়িতে। তবুও সে অনিমেষের কথামত গাড়িতে উঠতে গিয়ে দেখল তার পেছনের সিটে বসে আছে দামী পোশাক ও ঘ্যামা পারফিউমে সুসজ্জিত এক মোটা ফর্সা মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, তার মাথায় একটা মস্ত বড় টাক, আর গুটখায় রাঙানো ঠোঁটের ওপর একটি মোচড়ানো গোঁফ। তার গলায় মোটা সোনার চেন, হাতেও বেশ কয়েকটি দামী আংটি। তৃণাকে তার পাশে বসতে বলল অনিমেষ, নিজে বসল ড্রাইভারের পাশের সিটে। বেশ অবাক হল তৃণা, কিন্তু অনিমেষ তাকে আশ্বস্ত করে জানালো সে ওই ভদ্রলোক তার বাবার বিজনেজ পার্টনার, এটা তারই গাড়ি, তিনি পার্ক স্ট্রিটেই একটি কাজে যাচ্ছেন তাই তাকে অনিমেষ অনুরোধ করে তাদের দুজনকে ওই রেস্তোরাঁয় ড্রপ করে দিতে।

কিন্তু ওই ধনী ভদ্রলোকের অভিসন্ধি যে খুব একটা সাধু নয়, তা কিছুক্ষন পরেই বুঝতে পারলো তৃণা। যখন লোকটা বারবার তৃণাকে হাতে অশ্লীল ভাবে স্পর্শ করতে লাগল, তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে চাইল আর সেটা দেখেও, তৃণার চিৎকার শুনেও যখন অনিমেষ দাঁত বার করে হাসতে লাগল, তখনই তৃণা বুঝলো যে কোন বিশ্বাসঘাতকের পাল্লায় পড়েছে সে! গাড়িটা তখন একটি নির্জন রাস্তা দিয়ে চলেছে, সেটা যে পার্ক স্ট্রিটে যাচ্ছে না সেটা ভালোই বুঝেছে তৃণা। আর সহ্য করতে না পেরে ওই লোকটার গালে সপাটে একটা চড় মারল তৃণা, চেষ্টা করল তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে ফোনটা বার করে ১০০ ডায়াল করতে। কিন্তু বিফল হল তার চেষ্টা, পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে তৃণার ফোনটা এক ঝটকায় কেড়ে নিল অনিমেষ, তারপর ক্রমাগত বাড়ি মেরে মেরে ফোনটার তেরোটা বাজিয়ে সে দাঁত বের হেসে করে বলে উঠল,

—"চিল্লা শালী চিল্লা…এখানে কেউ শুনবে না তোর চিৎকার। তোর পাশে ওই যে সেটজী বসে আছেন…জানিস তোর সাথে একটা রাত কাটানোর জন্য সে আমাকে কত টাকা দেবে?…না থাক, সেটা বলছি না, শুধু শুনে রাখ, যে সেই টাকায় আমার গোটা ছয় মাসের কোকেনের খরচটা উঠে যাবে…আর ফুলশয্যা হয়ে গেলে তোকে সোজা সোনাগাছিতে তুলবেন উনি!"

পকেট থেকে একটা সাদা পাউডার ভরা প্যাকেট বার করে সেটা অল্প ছিঁড়ে পরম তৃপ্তিতে সেটার ঘ্রাণ নিতে নিতে বলল অনিমেষ। স্থানুর মত স্তব্ধ হয়ে গেল তৃণা অনিমেষের এই রূপ দেখে।

—"আরে তোকে বেচবো বলেই এত কাঠ খড় পুড়িয়ে তোর সাথে সম্পর্ক গড়লাম…এমন কি ওই সাদা গরুটার সাথে মারামারি অবধি করলাম…যাতে তুই শালী ওর দিকে খিসকে না যাস…"

ঠিক এমন সময় একটি বাইকের তীব্র আওয়াজ শুনে সামনের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল অনিমেষ। ড্রাইভারও চমকে উঠে আচমকা ব্রেক কষে দাঁড় করিয়ে দিল গাড়িটা। ওরা সবাই অবাক হয়ে দেখল যে ওদের গাড়ির পেছন থেকে আচমকাই এক হেলমেট পড়া বাইক আরোহী ইউ-টার্ন দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে ওদের সামনে। অনিমেষ দুচারটে কাঁচা খিস্তি দিতেই চলেছিল তার উদ্দেশ্যে, এমন সময় বাইক দাঁড় করিয়ে নায়ক সুলভ ভঙ্গীতে মুখ থেকে হেলমেট সরালো সেই বাইক আরোহী।

—"বুরাক!!!…", চিৎকার করে উঠল তৃণা।

গতদিন ইউনিভার্সিটির জেন্টস টয়লেটে যখন বুরাক প্রকৃতির ডাক সমাপন করতে গিয়েছিল, তখন সেখানে তার দিকে পেছন ফিরে আয়নার সামনে ভিজে চুল ঠিক করে ব্যস্ত ছিল অনিমেষ আর তার কিছু ইয়ার দোস্ত। সেদিন হালকা বৃষ্টি পড়ছিল তাই সর্বদেহে রেইনকোটে আবৃত বুরাকের দিকে নজর যায়নি তাদের কারোরই। কিন্তু বুরাক লক্ষ্য করেছিল অনিমেষ বারবার তৃনার নাম নিয়ে তার বন্ধুদের কিছু বলছে আর অশ্লীল ভাবে দাঁত বের করে হাসছে। বাংলা এখনো ভালো করে বোঝেনা বুরাক, তবুও অনিমেষের অকার ইঙ্গিত দেখে সে যে খারাপ কিছু করতে চলেছে সেই ইঙ্গিত পেয়েছিল বুরাক। তাই তো কাল থেকে এখনো অবধি অনিমেষ এবং তৃনার সমগ্র গতিবিধিত ওপর গোপনে নজর রেখে যাচ্ছিল বুরাক। সে যে বাইক নিয়ে তাদের গাড়িটা ফলো করছিল সেটাও বুঝতে পারেনি ওরা কেউ।

বাইক থেকে নেমে ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে এলো বুরাক। এক ঝটকায় অনিমেষের পাশের জানলার ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে সে খুলে ফেলল গাড়ির দরজা। তারপর অনিমেষের গলার টুঁটি চেপে ধরে তাকে গাড়ির ভেতর থেকে বের করে কিছুক্ষন শূন্যে ঝুলিয়ে রাখল তাকে, তারপর টান মেরে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল অনিমেষের বলিষ্ঠ দেহটাকে। কে বলবে এই ছেলেটাই সেদিন অনিমেষের ঘুঁষি খেয়ে চুপচাপ কেটে পড়েছিল! তার গায়ের জোর দেখে থরথর করে কেঁপে উঠল সেই মোটা লোকটা এবং তার গাড়ির ড্রাইভার। চোখের নিমেষে একবার তৃণার কাছে কান মলে ক্ষমা চেয়ে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল লোকটা। তারপর মালিক আর ড্রাইভার সহ গাড়িটা চক্ষের নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল। বুরাক ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দূরে পড়ে থাকা অনিমেষের দিকে, কিন্তু সে কোন মতে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ি কি মরি করে অদূরে বনঝোপের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেল। তৃণা ছুটে এসে বুরাকের জামা খামচে ধরে তার বুকে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তারপর ভাঙা ভাঙা ইংরাজিতে তাকে বলে উঠল,

—"আমি জানিনা অনিমেষের এই অভিসন্ধির কথা কিভাবে তুমি জানলে, কিন্তু যদি জানতেই পেরেছিলে তাহলে আমাকে আগে বললে না কেন?"

—"বললে হয়তো তুমি বিশ্বাস করতে না, তৃণা…তাই তোমাকে দেখাতে চেয়েছিলাম অনিমেষের আসল রূপটাকে, সেই জন্যই একটু রিস্ক নিলাম আর কি…আর দেখাতে চেয়েছিলাম…", ইংরেজিতে উত্তর দিল বুরাক।

—"আর কি দেখাতে চেয়েছিলে বলো?"

—"দেখাতে চেয়েছিলাম যে আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি, তৃণা!"

—"খবরদার, এমন রিস্ক আর তুমি কখনো নেবে না বুরাক…আমার যাই হয়ে যাক না কেন, কিন্তু তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি কি কিভাবে বাঁচতাম বলো!"

নৈশ্য আলো আঁধারে ভরা কোন এক অজানা রাস্তার বাঁকে এই নারী পুরুষের জুটির একে অপরের প্রতি আলিঙ্গন আরো সুদৃঢ় হয়ে উঠল। এই আলিঙ্গন বিশ্বাসের, ভরসার…এই আলিঙ্গন বুক ভরা অটুট ভালোবাসার!

***********

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%