শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
নিশুত রাতে গাঁয়ে যে কারা চুপিসারে ঘোরাফেরা করে তা ঠিক ঠাহর পায় না নিশি চৌকিদার, একটু-আধটু চাপা গলার কথাবার্তা যেন শোনা যায়, তবে ঠিক বোঝা যায় না। তবে এই হরিরামপুর গাঁয়ে কি শেষ অবধি চোর-ডাকাতের আগমন হতে লেগেছে? আর তা যদি হয় তা হলে বুঝতে হবে নিশি চৌকিদারের সুনাম আর রইল না।
বলতে কী, গত পঞ্চাশ বছরে এ-গাঁয়ে একটাও চুরি-ডাকাতি হতে পারেনি নিশির জন্যই। নইলে আশপাশে কৃতী চোর বা বাহাদুর ডাকাতের অভাব নেই। আশপাশের পাঁচটা গাঁয়ে তারা কাজ-কারবার চালালেও হরিরামপুরে আজও দাঁত বসাতে পারেনি। বছর চল্লিশেক আগে চিতু চোর বৃন্দাবনবাবুর ঘরে সিঁদ দিয়ে মাল খালাস করে পালাতে যাচ্ছিল, কিন্তু নিশি ঠিক যেন বাতাসে খবর পায়, কুকুরের ডাক লক্ষ্য করে নির্ভুল নিশানায় গিয়ে চিতুকে পেড়ে ফেলেছিল বমাল ধরা পড়ে গাঁয়ের লোকের সামনে নাকে খত দিয়ে মুচলেকায় টিপছাপ দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সেই যে চলে গিয়েছিল আর কখনো আসেনি। কালু ডাকাতের মতো ভয়ংকর লোককেও নিশিই আটকে ছিল রথতলার মোড়ে। সঙ্গে লাঠিসোঁটা নিয়ে গাঁয়ের লোকও মশাল নিয়ে হাজির ছিল। কালু রণে ভঙ্গ দিয়ে পালায়। তল্লাটের সবাই বিশ্বাস করে যতদিন নিশি চৌকিদার আছে ততদিন হরিরামপুর চোর বা ডাকাতের ভয় নেই। গঞ্জের দারোগা-পুলিশও নিশির নামে মাথা নোয়ায়।
তা নিশির একদিন হাতযশ ছিল বটে। যেমন গায়ে-গতরে পালোয়ান তেমনি লাঠি-সড়কিতে হাত, আর তেমনি বুকের পাটা, আর সেই সঙ্গে তেজ। সে হাঁকার মারলে মনে হত বাঘ ডাকছে। ভয় বলে বস্তু ছিল না তার মনে। তখন হরিরামপুরে জমিদার পাঁচকড়ি রায়ের সেরেস্তা থেকে সে বেতন পেত। কুস্তি পড়ত, কসরত করত, রথপায়ে গাঁ টহল দিয়ে বেড়াত, সে একটা দিনই গেছে।
কিন্তু নিশি চৌকিদারের সেই ক্ষমতা আর নেই। বয়স হয়েছে, চোখে ছানি, কানেও কম শোনে, পরিশ্রম করলে বুক ধড়ফড় করে, রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারে না, ঢুলুনি এসে যায়। জমিদারি লাটে ওঠার পর সেরেস্তা থেকে বেতন বন্ধ হয়ে গেছে কবেই, তবে গাঁয়ের লোক করুণাপরবশ হয়ে চাঁদা তুলে মাসে মাসে তাকে দেড়-দুশো টাকা করে দেয়। ক্ষমতা না থাকলেও নিশির নামডাক তো আছে। এখনও নিশি চৌকিদার বেঁচে আছে বলেই গাঁয়ে চোর-ডাকাত আসে না।
কিন্তু মুশকিল হল, গাঁয়ের উঠতি ছোকরারা নিশির ওপর তেমন খুশি নয়, তাদের মত হল, ওসব বুড়ো-হাবড়া দিয়ে গাঁয়ে চৌকিদারির কাজ চলে না, এবার একজন কমবয়সি জোয়ান কাউকে না রাখলেই নয়।
তা সুবিধেমতো একজনকে পাওয়াও গেছে। ধর্মদাস মণ্ডল। তেইশ বছর বয়সি জোয়ান ছেলে। পুজোর পর থেকে সে-ই বহাল হবে। পঞ্চায়েত থেকে বেতনও পাবে। নিশিকে রিটায়ার করিয়ে দেওয়া হবে।
নিশির অবশ্য তিন কুলে কেউ নেই। বিয়ে করেনি বলে সংসারের ঝামেলাও নেই। পৈতৃক পুরোনো মেটে ঘরখানায় একাই থাকে। সামান্য বেতনে কোনোক্রমে চালিয়ে নেয়। এখন বেতনটুকু বন্ধ হলে কী হবে তা সে জানে না। রাত জেগে গাঁ পাহারা দিতে দিতে এইসব কথাই ভাবে সে।
এখন মহাপুজোর আগে শেষ শুক্লপক্ষ চলছে, আজ অষ্টমী, আকাশে বেশ জ্যোৎস্না ফুটেছে। রাতে নাল-পরানো লাঠি ঠুকে ঠুকে আস্তে আস্তে গাঁয়ের নির্জন পথে ঘুরছিল নিশি, কিন্তু বড় অস্বস্তি হচ্ছে তার। কারণ সে আবছাভাবে টের পাচ্ছে, গাঁয়ের ঝোপঝাড়ে বা গাছের আড়াল-আবডালে বা ঘন ছায়ার মধ্যে এদিকে-সেদিকে কারা যেন চুপি চুপি চলাফেরা করছে, মাঝে মাঝে হাঁকার মারছে সে। গলায় সেই বাঘের গর্জন আর নেই। কেমন ফ্যাঁসফ্যাঁসে আওয়াজ বের হয়। এখন এই হাঁকডাকে কাজ হয় না, সে বুড়ো এবং অথর্ব হয়ে পড়েছে বলেই কি গাঁয়ে চোর-ডাকাত ঢুকে পড়তে শুরু করল নাকি? লক্ষণ ভালো বুঝছে না নিশি।
হাঁটু ব্যথা করছে বলে হাঁফ ছাড়তে নির্জন চণ্ডীমণ্ডপে একটু বসে ছিল নিশি, হঠাৎ পাশ থেকে কে যেন মোলায়েম গলায় বলল, 'ও নিশি!'
নিশি চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল, কেউ নেই। বলল, 'কে রে?'
গলাটা ফের বলল, 'আরে আমি রে, আমি। দশরথ পালধি।'
'দশরথদাদা! কিন্তু সে কী করে হয়? আপনি তো দশ-বারো বছর আগেই—'
'তা বটে হে, তবে কিনা গাঁয়ের মায়া আর কাটাতে পারলুম কই?'

নিশির শরীর কণ্টকিত হয়ে উঠল, গত পঞ্চাশ বছর ধরে আজ অবধি তার এরকম অভিজ্ঞতা হয়নি, সে কাঁপা গলায় বলে উঠল, 'রাম, রাম, রাম—'
'ঘাবড়াচ্ছ কেন? আমি কি একা নাকি? নগেন রায়, পতিতপাবন দাস, মহেন্দ্র মিত্তির, গদাধর পতিতুণ্ডি সবাই আছি হে। এতক্ষণ চণ্ডীমণ্ডপে বসে তোমাকে নিয়েই কথা হচ্ছিল।'
নিশি ভয়ে আধমরা হয়ে বলে, 'কী—কী কথা?'
'এই সবাই বলাবলি করছে তোমার মতো বিশ্বাসী আর নিষ্ঠাবান একজন চৌকিদারের প্রতি গাঁয়ের লোকরা অবিচারই করেছে।'
নিশি আমতা আমতা করে বলল, 'তা বটে, কিন্তু কী আর করা বলুন।'
'বাপু হে, তোমার দুঃখের কথা সবাই বুঝতে পারছি। হাতে পয়সা নেই বলে তোমার ভালো করে ভরপেট খাওয়া জোটে না। চোখের ছানি কাটাতে পারছ না, ব্যামো হলে চিকিৎসার পয়সা নেই। অথচ বুক দিয়ে এই গাঁয়ের লোকের ধনসম্পদ রক্ষা করে আসছ। এর তো একটা বিচার করতে হয়।'
নিশি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'আপনারা তো সবাই গত হয়েছে, কী আর করবেন বলুন।'
'তুমি একটা কাজ করো।'
'আজ্ঞে হুকুম করুন।'
'একখানা শাবল জোগাড় করে মহীবাবুর পোড়ো বাড়ির ঠাকুরদালানের ঈশান কোণের মাটিটা একটু খুঁড়ে ফেলো।'
'খুঁড়ব? অধর্ম হবে না তো!'
'না, ওসব আমরা বিচার করে দেখেছি।'
'যে আজ্ঞে।'
'কাজে লেগে যাও, দেরি কোরো না। চণ্ডীমন্দিরের দাওয়ায় একখানা শাবল রাখা আছে, নিয়ে যাও। মাত্র এক হাত খুঁড়লেই হবে।'
'গাঁয়ের কেউ যদি টের পায়?'
'পাবে না, আজ গাঁয়ে আমরা সম্মোহন ছড়িয়ে রেখেছি।'
নিশি উঠল, নির্দিষ্ট জায়গায় শাবলটাও পেয়ে গেল। মহীবাবুদের পোড়ো বাড়ির ঠাকুরদালানের ঈশান কোণ খুঁজে বের করতেও সময় লাগল না তার। মাটি খুঁড়তেই একখান চৌকো মজবুত কাঠের বাক্স বেরিয়ে এল। বাক্সটা বেশি বড় নয় বটে, তবে বেশ ভারী।
পিছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর বলল, 'গর্তটা বুজিয়ে চৌরস করে দাও।'
তাই করল নিশি।
'এবার বাড়ি যাও নিশি। ওই বাক্সে যা আছে তা দিয়ে চিকিৎসা করাও, ভালোমন্দ খাও, শীতের লেপতোষক বানাও আর একটু দান-ধ্যানও কোরো।'
নিশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'কিন্তু গৃহসুখ কি আমার তেমন সইবে? গাঁ-পাহারার কাজটা চলে গেলে যে আমি বেশিদিন বাঁচব না।'
দশরথ পালধি হেঁড়ে গলায় হেসে উঠে বলল, 'চাকরি যাবে মানে? চাকরি গেলেই হল? আমরা আছি কী করতে। ধর্মদাস মণ্ডলকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলে রেখেছি, চৌকিদারির কাজ নিলে তার নির্ঘাত সর্পাঘাতে মৃত্যু, সে তোমার চাকরি ছুঁয়েও দেখবে না।'
'তা হলে কি চাকরিটা আমার থাকবে?'
'খুব থাকবে। তুমি চণ্ডীমণ্ডপে কম্বলমুড়ি দিয়ে তোফা ঘুম লাগাবে আর গাঁ চৌকি দেব আমরা, আমাদের নিদ্রা জাগরণ বলে তো কিছু নেই।'
বাক্সটা বাড়ি নিয়ে এসে সকালে খুলে দেখল নিশি। মোহরে গয়নায় জহরতে বোঝাই। দু-চারটে মোহর ভাঙিয়েই মেলা টাকা এসে গেল হাতে। তা দিয়ে ছানি কাটিয়ে এল নিশি। দু-বেলা পেট ভরে খাওয়া জুটতে লাগল। কানের চিকিৎসা করিয়ে একখানা যন্ত্র বসিয়ে নিল। বলতে নেই মাস দুয়েকের ভিতরেই নিশির যেন যৌবন ফিরে এল। গরিব-দুঃখীদের জন্য নিজের ঘরের লাগোয়া একখানা বড় ঘর তুলে ফেলল। শীতকালে কত কষ্ট হয় বেচারিদের। কম্বল-টম্বলও কিনে দিল সবাইকে, একমুঠো ভাতের বন্দোবস্তও করে দিল। গাঁয়ের লোকের মুখে নিশির প্রশংসা আর ধরে না।
গাঁয়ের ছেলে-ছোকরাদের মুখেও কুলুপ।
তা হরিরামপুর নিশি চৌকিদার পাহারার কাজে এখনও বহাল আছে। এখনও এ-গাঁয়ে চোর-ডাকাতের উপদ্রব নেই। তবে লোকে শুনতে পায়, নিশুতরাতে নিশি চৌকিদার যেন কাদের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা কয়। অনেকে বলে ভীমরতি, অনেকে বলে নিশিকে ভূতে পেয়েছে। অনেকে বলে বুড়ো বয়সে নিশির মাথাটাই গেছে।
যে যাই বলুক, নিশি বড়ো আনন্দে আছে।
চির সবুজ লেখা, শারদীয়া ২০০৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন