শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
নয়নপুরের জল খুব বিখ্যাত, সেখানকার জল একবার পেটে গেলে কী মার-মার খিদে, অনিদ্রা উধাও, গায়ে বেশ জোরবল চলে আসে আর মেজাজটাও তিরিক্ষি থাকে না। সেই জলের লোভেই নয়নপুরে অনেকে এসে হাজির হয়।
জল ভালো ঠিকই, তা বলে নয়নপুর যে খুব ভালো জায়গা তা কিন্তু নয়, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই ছাড়াও অন্য কিছু ব্যাপার আছে, তা লোকে প্রকাশ্যে বলতে চায় না; কিন্তু আছে। আর সেটা কানুবাবু বেশ টের পেলেন।
কানুবাবু মানে হলেন গে কানাই সূত্রধর। পেটরোগা মানুষ, বেজায় অম্বলের ধাত। বারোমাস পেঁপে-কাঁচতলা-কাঁচামুগের ডাল তাঁর পথ্যি। ভালোমন্দ খেতে বড় ভালোবাসতেন, কিন্তু এখন আর সেইসব শুরুপাক জিনিস তাঁর খাওয়াও বারণ। তাঁর জীবন থেকে পোলাও, কালিয়া, পায়েস, পিঠে, মুর্গমুসল্লম, বিরিয়ানি, চপ-কাটলেট, আম-কাঁঠাল সব বিদায় নিয়েছে। কানুবাবুর মনে বড় দুঃখ। তাই তাঁর শালা ফটিক যখন নয়নপুরের স্কুলে মাস্টারির চাকরি পেয়ে সেখানে গিয়ে কয়েকদিন পরেই চিঠি লিখে জানাল যে নয়নপুরে এলেই পেটের সব রোগ সারে তখনই কানুবাবু নয়নপুরে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছিলেন, কিন্তু ক-দিন পরেই ফটিক চিঠি লিখল, এখন আসার দরকার নেই, এখানে অনেক বিপদ-আপদ আছে।
কানুবাবুর গিন্নি বেঁকে বসলেন, ও বাবা! বিপদ-আপদের কথা যখন লিখেছে তখন আর ওখানে গিয়ে কাজ নেই।
কানুবাবু কিন্তু দমবার পাত্র নন। তিনি বললেন, আহা, বিপদ-আপদ আর কীসের? ফটিক তো ওখানেই আছে। সে যখন আছে তখন আমরাও ক-দিন থাকতে পারব।
গিন্নি প্রস্তাব নস্যাৎ করে দিয়ে বললেন, কিছুতেই নয়। পেট সারাতে গিয়ে প্রাণ হারাতে পারব না বাপু।
কানুবাবু বড্ড হতাশ হয়ে পড়লেন, প্রাণ গেলে যেত, তবু তো জন্মের শোধ দু-চার পদ ভালোমন্দ খেয়ে মরতেন। এখন এরকমটাই কি বেঁচে থাকা হচ্ছে?

তবে সুযোগও এসে গেল। গিন্নি কয়েকদিনের জন্য তাঁর বাপের বাড়িতে গেলেন। কানুবাবুও দেরি না করে পরদিন সকালেই নয়নপুরের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন।
নয়নপুর একেবারে হাতের কাছে নয়, বরং বেশ দূরেই। তার ওপর সোজা রাস্তার ওপর পুরোনো পোল ভেঙে যাওয়ায় অনেকটা ঘুরপথ দিয়ে যেতে হল। বাছুরডোবায় এসে বাকিটা হাঁটাপথ। হাটের লোকেরা বলল, খাল পেরিয়ে মাইল তিনেক গেলেই নয়নপুর।
পেটে অনেকক্ষণ দানাপানি নেই। হাটে মুড়ি-মুড়কি কিনে গোগ্রাসে গিলে টিপকলের জল খেয়ে খানিক শান্তি হল। তারপর বেরিয়ে পড়লেন।
হাটের লোক বলে দিয়েছিল, খাল পেরিয়ে কিছুদূর এগোলে তেমাথা পাওয়া যাবে। বাঁ দিকে নয়নপুরের রাস্তা। তেমাথায় এসে কানুবাবু একজন লম্বাপানা লোককে দেখতে পেলেন। গোরু নিয়ে বাড়ি ফিরছে বলে মনে হল। চাষিবাসি লোক।
ও মশাই, এটাই কি নয়নপুরের রাস্তা?
কাল অবধি ওটাই ছিল, আজ বলতে পারি না। গিয়ে দেখুন।
কানুবাবু ফাঁপরে পড়ে গেলেন, এ আবার কোন দিশি জবাব।
ও মশাই, রাস্তা কি রাতারাতি বদলে যায় নাকি?
লোকটা গোমড়া মুখে বলে, তা কত কিছু হয়।
কানুবাবু একটু ভয়ে ভয়েই বাঁ দিকের রাস্তাটাই ধরলেন। মাইলটাক যাওয়ার পর অবাক হয়ে দেখলেন, সেই লোকটাই ফের গোরু নিয়ে উলটো দিক থেকে আসছে।
এরকম হওয়ার কথা নয়। কানুবাবু স্পষ্ট দেখেছেন, লোকটা গোরু নিয়ে ডানহাতি রাস্তায় উলটো দিকে যাচ্ছিল। এতটা উজিয়ে এল কীভাবে?
ও মশাই, এটা কী হচ্ছে বলুন তো? আপনাকে তো আমি অনেক পিছনে ফেলে এসেছি। তা হলে মুখোমুখি দেখা হচ্ছে কীভাবে?
লোকটা তেমনি রসকষহীন মুখে বলে, রাস্তা তো আর আমি তৈরি করিনি, এখানে রাস্তা নিজেই তৈরি হয়ে যায়।
এটা কি তবে নয়নপুরের রাস্তা নয়?
নয়নপুর না হোক, কোথাও না কোথাও তো গেছে!
লোকটা তাঁকে মুখোমুখি পেরিয়ে উলটোদিকে চলে গেল।
আরও মাইলখানেক হাঁটলেন কানুবাবু। কোনো লোকালয় চোখে পড়ল না। কিন্তু একটা তেমাথা পেলেন। অবিকল আগেকার তেমাথার মতোই। এমনকী একটা জোড়া খেজুর গাছ দেখেছিলেন, সেটাও রয়েছে। আর কী আশ্চর্য! সেই লোকটাই তার গোরুটাই গলার দড়ি ধরে উলটোদিক থেকে আসছে।
ও মশাই, এটা হচ্ছেটা কী?
লোকটা বিন্দুমাত্র বিস্ময় প্রকাশ না করে নির্বিকার মুখে বলে, রাস্তা উলটে গেলে কী করা যাবে বলুন!
আমি যে নয়নপুরে যাব! সন্ধে নেমে এল যে!
নয়নপুরে যেতে তো কেউ আপনাকে নিষেধ করেনি, আর সময় হলে সন্ধে নামবেই। তাতে তো কারও হাত নেই।
আপনি আসলে কে মশাই?
আমি একজন লোক। বলে লোকটা ফের উলটো দিকে চলে গেল।
কানুবাবু ভারী হতোদ্যম হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বুঝতে পারলেন, কোথাও একটা ভারী ধাঁধা কাজ করছে। আস্তে আস্তে যখন অন্ধকার নেমে এল তখন তিনি হাল ছেড়ে দিয়ে গুটিগুটি ফিরে এলেন। বাছুরডোবার হাটে এসে ফের জনে জনে জিজ্ঞেস করে জানলেন, খাল পেরিয়ে তেমাথার মোড় থেকে বাঁ হাতি পথটাই নয়নপুরের। কোনো ভুল নেই।
তা হলে ভুলটা যে কোথায় তা ভাবতে ভাবতে তিনি রাতেই বাড়ি ফেরার গাড়ি ধরলেন।
কিশোর ভারতী, জানুয়ারি ২০১৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন