শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
লোহাগড়ে এবারে যা শীত পড়েছে তা আর কহতর্ব্য নয়। এমন শীত গত পঞ্চাশ বছর পড়েছে বলে কারও মনে পড়ছে না। সন্ধের পর যেন লোহাগড় একেবারে জবুথবু হয়ে যায়। জম্পেশ এক ভূতুড়ে কুয়াশায় বেমালুম গায়েব হয়ে যায় গোটা গঞ্জটাই। দোকানপাট বন্ধ। রাস্তায় কুকুর-বিড়াল অবধি হাঁটে না। দেহাতি বস্তিতে শুধু খড়কুটো জ্বেলে কয়েকজন আগুন পোহায় আর গা গরম করার জন্য ঢোল বাজিয়ে বেসুরো 'রামা হো' গান গায়। উত্তুরে বাতাসটায় যেন ছোরার ধার। গায়ে লাগলে মনে হবে গায়ের চামড়া কেটে বেরিয়ে গেল।
রাত দশটা নাগাদ শ্যামলাল পথে নামল। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা দেখতে গেলে তার চলে না। রাতবিরেতেই তার কাজ। বাবা, ঠাকুরদারও এই কাজই ছিল। তবে ছেলেবেলা থেকে বাপ-দাদার কাছে শিখে এসেছে, 'পেটের তাগিদে চুরি করো ঠিক আছে। কিন্তু খবরদার, জোচ্চুরি যেন করতে যেও না।' তা শ্যামলাল কথাটা খুব খেয়াল রাখে। চুরি ছাড়া তার কোনো দ্বিতীয় দুষ্কর্ম নেই। কাউকে ঠকায় না, জাল-জালিয়াতি করে না, মিছে কথা কয় না, কারও ওপর হামলা করে কেড়েকুড়ে নেয় না। ছিনতাই করে না। মারদাঙ্গার মধ্যেও সে নেই। তবে তার সংসারটা বেশ বড়। মোট বাইশজন অপোগগুকে পুষতে হয় তার। এরা কেউ তার আত্মীয় নয়। এই গঞ্জ আর তার আশপাশ থেকে কানা-খোঁড়া, অথর্ব, বুড়ো-বুড়ি, খ্যাপাটে লোক এসে জুটেছে।
শ্যামলালের চার পুরুষের বাস গঞ্জের দক্ষিণপাড়ায়। কালী মন্দিরের পিছনে। দালানকোঠা নয়, নিতান্তই চালাঘর। তা সেই বাড়িতেই গাদাগাদি করে তার পুষ্যিরা থাকে। শ্যামলাল আগলে না রাখলে এতদিনে এরা ফৌত হয়ে যেত। এই যে চুরি করে এনে শ্যামলাল এত লোকের অন্ন-বস্ত্র জোগাচ্ছে, এতে তার পুণ্যি হয় কি না কে জানে, তবে সে বেশ ঝামেলাতেই থাকে। অপোগগুরা লোক সুবিধের নয়, এর-ওর ট্যাঁক থেকে চুরি করছে, এর-ওর নামে চুকলি করছে, নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটিও লেগেই আছে। কেউ কাজকর্ম করতে চায় না। তার ওপর নানা বায়নাক্কা। কেউ এসে ধরে, 'ও শ্যামলাল, বলি ফুলকপি আর কড়াইশুঁটি দিয়ে একদিন মুগডালের খিচুড়ি করলে হয় না?' কেউ হয়তো নালিশ করে, 'ওহে, বাপু শ্যামলাল, তেল না মাখলে যে বড্ড খড়ি উঠছে গায়ে!' কেউ নলেনগুড়ের পায়েসের জন্য ঘ্যানঘ্যান করে। কেউ বলে, 'এই তুষের মধ্যে সেঁধিয়ে ঘুমের সুখ নেই হে শ্যামলাল। একটা ভালো কম্বলের ব্যবস্থা হয় না?'

শ্যামলাল জানে, লোকে বসতে পেলেই শুতে চায়। কাজেই বিশেষ আমল দেয় না। কিন্তু মুশকিল হল, শ্যামলাল বড্ড হিমশিম খাচ্ছে। চুরি করেও তেমন পোষাচ্ছে না। লোহাগড়ও কিছু বড়লোকের জায়গা নয়। অধিকাংশই ছাপোষা গরিব মানুষ। তাদের ঘরে হানা দিয়ে সোনাদানা আজকাল মেলেই না। যা মেলে তা নগেন মহাজনের দোকানে বেচে সামান্যই টাকাপয়সা আসে। বাইশটা লোকের অনন্ত খিদে মেটানো তাতে সম্ভব নয়। তার পুষ্যিরা রীতিমতো রাগারাগিই করছে আজকাল।
শ্যামলালের মনে হচ্ছিল আজ রাতে লোহাগড় যেন আর চেনা লোহাগড় নেই। এমন জমাট কুয়াশা আর সঙ্গে এমন পাথুরে ঠান্ডা যে, হাড়ের জোড়গুলো পর্যন্ত জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে যাচ্ছে। শীতল বাতাসে চোখে জল জমে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে নজর। আজ কাজকর্মের বারোটা বাজল। এমন রাতে কাজ-কারবার চালানোই মুশকিল।
রাস্তাঘাটগুলোর হদিশই পাচ্ছে না সে। লোহাগড়ের ভূগোল তার মুখস্থ। অন্ধকারেও দিব্যি গটমট করে চলাফেরা করতে পারে। কিন্তু আজ রাতে যে সবই গুবলেট হয়ে যাচ্ছে। ডান-বাঁ, উত্তর-দক্ষিণ কিছুই আন্দাজ করতে পারছে না। শুধু কি তাই, বার দুই খন্দে পা পড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ার জো হল তার। একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কাও লাগল জোর।
শ্যামলাল একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, এখন উপায় কী করা যায়? ছোট যন্ত্রপাতি ভরা ব্যাগটায় একটা ছোটো টর্চবাতি আছে বটে। কিন্তু এই জমাট কুয়াশা ভেদ করার সাধ্যি টর্চবাতির নেই। তবু টর্চটা বের করে জ্বালতে গিয়ে দেখল, ব্যাটারির জোর কমে যাওয়ায় টর্চবাতির আলো টিমটিম করছে।
ঠিক এই সময়ে কাছেপিঠে কোথাও একটা কাশির শব্দ শোনা গেল। বুড়ো মানুষের কাশি। শব্দ যেন ডান দিক থেকে আসছে। কপাল ঠুকে ডান দিকেই সন্তর্পণে এগোল শ্যামলাল। কাশির শব্দ মানেই মানুষ আর মানুষ মানেই বাড়িঘর।
কয়েক কদম এগোনোর পর ফের কাশির শব্দ শুনতে পেল সে। এবার বড্ড কাছেপিঠে। খুব সতর্ক হয়ে আরও কয়েক কদম এগিয়ে সে ঠাহর পেল। সামনেই একটা বারান্দা বা রকের মতো কিছু রয়েছে। আর সেখানে একটা লোক মুড়িসুড়ি দিয়ে বসা। মনে হলূ, জেগেই আছে যেন।
চুরি করতে বেরিয়ে সাড়াশব্দ করতে নেই। ফস করে দেখাও দিতে নেই। তাই শ্যামলাল দু-পা পিছিয়ে একটু আড়াল হওয়ার চেষ্টা করল।
কেশো লোকটা হঠাৎ বেশ মোলায়েম গলাতেই বলে উঠল, 'শ্যামলাল নাকি হে?'
শ্যামলাল গঞ্জের সবাইকেই চেনে। কিন্তু গলা শুনে এই মানুষটাকে তার চেনা ঠেকল না। তবে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, 'আজ্ঞে, আমিই বটে!'
'তা বাপু, অত দূরে দাঁড়িয়ে কেন? কাছে এসো, দুটো কথা কই।'
শ্যামলাল মাথা চুলকে বলল, 'আজ্ঞে, কথা কইবার কি ফুরসত আছে কর্তা? আমাদের খেটে খেতে হয়।'
'বাপ রে, বড় কাজের লোক দেখছি!'
শ্যামলাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'আজ্ঞে, কাজের লোক আর হতে পারলুম কই। তবে টিকে থাকার চেষ্টা তো করতেই হয়। ডোবার আগে লোকে তো হাত-পা ছোড়ে। ঠিক কি না বলুন।'
'অতি ঠিক কথা। তবে কিনা ঠিকমতো হাত-পা ছুড়তে জানলে ডুবে মরার ভয় থাকে না। আনাড়ির মতো হাত-পা ছোড়াটা কাজের নয় হে।'
'সে কথা সত্যি। তবে কিনা আমাদের তেমন শিক্ষাদীক্ষা নেই কিনা। লেখাপড়া জানা নেই। হাতের কাজ শেখা হয়নি। চাষবাস হল না। করি কী বলুন।'
'কেন, তুমি তো বাপু বংশের বিদ্যে দিব্যি শিখেছ।'
'বড় লজ্জায় ফেললেন কর্তা। বাপপিতেমো যা শিখিয়ে গিয়েছেন সেটি ভাঙিয়েই খাচ্ছি। চুরি করা মহাপাপ, তাও জানি। কিন্তু গরিবের কি আর পাপপুণ্যি বলে কিছু আছে?'
'ও বাবা, জ্ঞানের নাড়ি যে দিব্যি টনটনে! তা বাপু, গরিবের কী কী থাকতে নেই তার একটি লিস্টি করে আমাকে দিয়ো তো!'
'কিছু ভুল বললাম নাকি কর্তা? তা মুখ্যুসুখ্য মানুষ। ভুল হতেই পারে।'
'মুখ্যু তো ভালো কথা হে। কিন্তু আহাম্মক কি ভালো?'
'একটু ভেঙে বললে সুবিধে হয়। আপনি তালেবর লোক বলেই মনে হচ্ছে। আমি বোকাসোকা মানুষ, সাঁটের কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।'
'সাঁটের কথা কইছি নাকি? সোজাসুজি তো বললুম যে, তুমি একটা আহাম্মক। যে অপোগগুলোকে পুষতে তোমার কালঘাম ছুটে যাচ্ছে তাদের একটু নেড়ে-ঘেঁটে দেখেছ কি বাপু? তোমার ঘাড়ে বসে খাচ্ছে। কিন্তু কার কী মতলব তা জানো?'
'আজ্ঞে, না কর্তা। দুঃখী কাঙাল সব মানুষ। সারাদিন খাই-খাই ছাড়া তাদের কোনো কাজ নেই।'
'ওইটেই তো তোমার দোষ। ওই যে অনাথ দাস, আধপাগল সেজে তোমার ঘাড়ে চেপেছে, ওটি আসলে কে জানো? মগরাহাটের ভুবন দাসের সেজো ছেলে। দু-দুটো খুনের মামলা ঝুলছে অনাথের নামে। পুলিশ এসে অনাথকে যদি ধরে তা হলে তুমিই কি রেহাই পাবে বাপু? তারপর ওই সুখেন সরখেলের কথাই ধরো। সুখেন সোজা লোক নয়। জাল-জোচ্চুরিতে পাকা হত। নবীন চৌধুরীর আড়কাঠি হিসেবে নানা কন্দিফিকির এঁটে বেড়ায়। তোমার বসতবাড়িটা গাপ করার জন্য দলিলের কাগজপত্র হাতানোর মতলবে এসে জুটেছে। খোঁড়া বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলে তোমার সবই যাবে। ভবেন মণ্ডল চোখে দেখতে পায় না বলে তোমার ভারী মায়া। তাই না? চোখের ডাক্তারের কাছে গিয়ে হাজির করলেই বুঝবে যে, ওসব স্রেফ ভড়ং। ভবেনের চোখ সর্বদা চারদিকে নজর রাখছে। সাতটা ডাকাতির আসামি। দোগাছির ভাঙা শিবমন্দিরের মেঝেতে ওর দশ লাখ টাকা পিতলের কলসিতে লুকোনো আছে। গঙ্গা বিশ্বাস সাতচুড়োর এক বুড়ো সেজে থাকে। ভুলেও তাকে বুড়ো ভাবতে যেয়ো না। সে হল পুলিশের চর। তোমার ওপর নজর রাখতে মোতায়েন রয়েছে।'
শ্যামলাল ভারী অবাক হয়ে গেল, 'কিন্তু কর্তা, আপনি এত জানলেন কী করে? আপনাকে ঠিক ঠাহর করতে পারছি বটে। কিন্তু আপনাকে তো লোহাগড়ের লোক বলে মনে হচ্ছে না! এত সব খবর তবে কে আপনাকে দিল?'
লোকটা খিঁচিয়ে উঠে বলে, 'খবর রাখতে হলে লোহাগড়ের বাসিন্দা হতে হবে নাকি? এই যে তুমি লোহাগড়ের বাসিন্দা। এসব খবর কি তোমারই জানা ছিল?'
'আজ্ঞে, তা অবিশ্যি ঠিক।'
'ঠিক ছাড়া বেঠিক কিছু বলার অভ্যাস নেই আমার।'
'তা তো বুঝলুম কর্তা, কিন্তু সব শুনে যে আমি ভারী মুশকিলে পড়ে গেলুম।'
'তা পড়লে বটে। তবে কিনা তোমাকে আমি তেমন অপছন্দ করে উঠতে পারছি না। বুদ্ধির দোষ থাকলেও তুমি মানুষটা ভালো। আর সেই জন্যই মাঝরাতে থানা গেড়ে বসে আছি ভাঙা কেল্লার ফটকের পৈঠায়।'
'এই পাথুরে ঠান্ডায় মাঝরাতে জেগে আপনি আমার জন্যই বসে আছেন কর্তা? এই তুচ্ছ শ্যামলালের জন্য? এ যে পেতায় হতে চায় না কর্তা!'
'তা অবশ্যি ঠিক। তবে কিনা গুরুতর একটা কারণও আছে।'
'কী কারণ কর্তা? ভয়ে যে আমার বুকে হাতুড়ির ঘা পড়ছে।'
'উতলা হোয়ো না। এই গাঁয়ে না হোক দেড়শো বছর ধরে খুঁটি গেড়ে আছি। পুরোনো মানুষদের জিজ্ঞেস করলে অনেকেই ষষ্ঠীপদ মালোর নাম শুনেছে বলে মনে করতে পারবে।'
শ্যামলাল হাঁ হয়ে গেল। অতি কষ্টে হাঁ বন্ধ করে বলল, 'ষষ্ঠীপদ মালো? তিনি তো বহুকাল আগেই গত হয়েছেন। মস্ত মানুষ ছিলেন। রাজা সাত্যকীচরণের ভাণ্ডারী ছিলেন। খুব দাপুটে মানুষ।'
'আমিই ষষ্ঠীপদ।'
'তা হলে যে আমি মূর্ছা যাব।'
'কেন হে বাপু, তোমার কি বেজায় ভূতের ভয়?'
'তা সেই ভয় কার নেই বলুন।'
'ধ্যাষ্টামি কোরো না। চোর-ছ্যাঁচড়াদের ভূতের ভয় থাকলে কি পেট চালাতে পারত? আর একটা কথা হল, দেখা না-পাওয়া পর্যন্তই ভয়টা থাকে। দেখা পেয়ে গেলে আর ভয়টা কীসের? ঠিক কি না বলো।'
'আজ্ঞে সেও ঠিক কথা। এই এখন আর তেমন মূর্ছাটা আসছে না।'
'কাজের সময় মূর্ছা যাওয়াটা মোটেই কাজের কথা নয়।'
'যে আজ্ঞে।'
'যা বলছিলাম। আমি ষষ্ঠী মালো, রাজা সাত্যকীচরণের ভান্ডারি এবং হবিবপুরের জমিদারও বটে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, মেলা কঠিন পরীক্ষা পার হয়ে, অনেক কষ্টে অর্থ সঞ্চয় করে বিরাট ধনী হলাম বটে। হাতে ক্ষমতা এল। কিন্তু বাপু হে, বড়লোক হওয়ার হ্যাপাও আছে। অতিরিক্ত আদরে আর প্রশ্রয়ে মানুষ হয়ে আমার চার-চারটে ছেলেই বখে গেল। নেশাভাঙ করে, নানা অত্যাচার করে রোগেভোগে চারটেই অকালে চলে গেল। আমার বংশধারাটাই রইল না। আমি মরার পর বাড়িঘর বিষয়সম্পত্তি সবই উড়েপুড়ে লুটমার হয়ে গেল। তা গিয়েছে যাক। কিন্তু দেড়শো বছর ধরে বসে বসে আমি শুধু ভাবছি, বেঁচে থাকতে তো ভালো কাজ কিছু করিনি। শুধু প্রজা ঠেঙিয়েছি, রাজকোষ থেকে সোনাদানা হাতিয়েছি। যত পারি লাভ-লোকসানের হিসেব করেছি। এখন ভাবি, কী করলে একটু ভালো কাজ করা হয়।'
শ্যামলাল উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তা ভেবে কিছু পেলেন কর্তা?'
ষষ্ঠীপদ সখেদে বললেন, 'না হে বাপু, দেড়শো বছর দিনরাত ভেবেও কিছু কুলকিনারা করা গেল না। কখনো ভাবি, সব গরিবকে বড়লোক করে দিলে হয়, কখনো ভাবি বড়লোক গরিব করে দেওয়া দরকার। কখনো মনে হয়, দুনিয়া থেকে সব পাপীতাপীদের লোপাট করে দেওয়া দরকার। আমার সন্দেহ হয় ভগবান যে পাপীতাপী সৃষ্টি করেছেন তারও তো একটা প্রয়োজন থাকতে পারে। নাকি? এই দোটানায় আর মনস্থির করা হয়ে উঠল না।'
'আমার মনের কথাটিই কইলেন কর্তা। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ এ আমার বড্ড গুলিয়ে যায়।'
'বাপু শ্যামলাল, এই বাঘা শীতে মধ্যরাতে তোমার জন্য খাপ পেতে বসে আছি কেন জানো?'
'আজ্ঞে, কেন?'
'এই যে কেল্লার ফটকের বাইরে পৈঠায় বসে আছি, এই পৈঠার নীচে সাত মন সোনা পোঁতা রয়েছে। সাতটা সোনার কলসিতে। পৈঠা ভেঙে ফেলে তলায় দু-ফুট গভীর গর্ত করলেই হবে।'
'উরিব্বাস। বলেন কী?'
'ভেবে দেখলাম, শ্যামলাল লোকটা যখন ভালো, তখন এই সোনাদানা দিয়ে সে-ই ভালো কাজ করতে পারবে। কী বলো, পারবে না?'
শ্যামলালের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তাড়াতাড়ি দু-হাতে মাথা চেপে ধরে বলল, 'দিলেন তো কর্তা মাথাটা ফের গুলিয়ে। এখন আমি কী করি! ভালোমন্দ তো ফের গোলে হরিবোল হয়ে গেল।'
'আহা, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। বসে বসে ভাবো। ভাবতে থাকো, ভাবতে ভাবতে ঠিক একদিন ভালো আর মন্দের একটা আন্দাজ মাথায় এসে পড়বে। আমি শুধু জানি, সোনাদানা দিয়ে ভালো কাজ করা খুব কঠিন।'
কঠিন বলে কঠিন। শ্যামলাল সেই থেকে ছ-মাস ধরে ভাবছে। ভেবে ভেবে এখনও কোনো ফয়সলায় পৌঁছতে পারেনি। তবে সে ভুলক্রমেও ওই গড়ের ফটকের পৈঠার কাছে যায় না। সাত মন সোনা বড়ো সব্বোনেশে জিনিস। ভালো মন্দের হেস্তনেস্ত না হলে ওই সোনায় হাত দিয়ে মরবে নাকি?
তবে হ্যাঁ, শ্যামলাল ভাবছে।
আনন্দমেলা ৫ জানুয়ারি ২০১২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন