শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পরেশ পাল হিসেবি মানুষ। চারদিকে সবসময়ে তাঁর হিসেবি চোখ ঘুরছে। এক পয়সা বাজে খরচ নেই, বাবুগিরি বা বিলাসিতা নেই, দান-খয়রাতি নেই। কিন্তু মুশকিল হল মেয়ে খেঁদিকে নিয়ে। মোটে পাঁচ বছর বয়স তার। হিসেব নিকেশের ব্যাপারটা বোঝেও না। ভিখিরি এলেই ভিক্ষে দিতে দৌড়োয়। নিজের পুতুল বা কাচের চুড়ি হয়তো কাউকে দিয়েই দিল। রোজ নিজে কম খেয়ে এক মুঠো ভাত ভুলু কুকুরকে খাওয়ায়। এসব মোটেই ভালো ব্যাপার নয় বলে মেয়েকে শাসনও করেন বটে পরেশ, কিন্তু তাতে বিশেষ কাজ হচ্ছে না। ভারী চিন্তা হয় পরেশের। কষ্ট করে চারদিক সামাল দিয়ে তিনি তিল তিল করে যা জমিয়ে তুলেছেন তা মেয়েটার জন্যই না বরবাদ হয়ে যায়।
ছুটির দিন, দুপুরবেলা খেয়ে উঠে তিনি বারান্দায় মোড়া পেতে রোজকার মতোই একটু বসেছেন। মেয়ে খেঁদি বারান্দার এক কোণে বসে আপনমনে খেলছিল। হঠাৎ রাস্তা দিয়ে একটা বাজিকর যাচ্ছে দেখে দৌড়ে গিয়ে ডাকাডাকি করতে লাগল, বাজিকর। ও বাজিকর। আমাকে খেলা দেখাবে না?
উলোঝুলো পোশাক পরা, দাড়ি-গোঁফওয়ালা, ঝোলা-কাঁধে একটা লোক একগাল হেসে ফটকের কাছে এগিয়ে এসে বলল, খেলা দেখবে খুকি?

শুনে পরেশবাবুর মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়। করছে কী মেয়েটা? বাজিকরের খেলা দেখা মানেই তো গুচ্ছের পয়সা নষ্ট; দু-হাতে চার-পাঁচটা বল বা ছোরা নাচানো, কাঠির ডগায় পিরিচ ঘোরানো, আগুন খাওয়া, বাঁশবাজি, দড়ি দাঁড় করিয়ে দেওয়া—যত সব লোক-ঠকানো বুজরুকি। বাজিকরটা কয়েকদিন হল থানা গেড়েছে গঞ্জে, পাড়ায় পাড়ায় খেলা দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। পরেশবাবু মেয়েকে ধমক দিয়ে বললেন, না না, ওসব দেখে কাজ নেই। বুজরুকি দেখে পয়সা নষ্ট।
খেঁদি কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, একটু দেখি না বাবা। কখনো তো দেখিনি।
না না, ওহে বাজিকর, তুমি এখন এসো গিয়ে।
বাজিকর লোকটার চেহারা ভারী রোগা। মুখে ক্লান্তির ছাপ। কপালে ঘাম। একটু যেন দমে গিয়ে বলল, আচ্ছা বাবু, তাই হবে, তা আমি আপনার বাগানে ওই ঝুপসি গাছটার ছায়ায় বসে একটু জিরিয়ে নিতে পারি কি? বড্ড পরিশ্রম গেছে।
পরেশবাবু আঁতকে উঠলেন, মধুগুলগুলি আমের ফলন্ত গাছ। আমগুলোয় সদ্য পেকে ওঠার রং ধরেছে। লোকটার মতলব তো ভালো নয়। গাছের তলায় বসার নাম করে যদি দু-চারটে আম পেড়ে খেয়ে ফেলে?
তিনি গর্জন করে বললেন, না বাপু অচেনা লোককে বিশ্বাস নেই। কোনো অজুহাতে বাড়িতে ঢুকে কোনো জিনিসপত্তর হাতিয়ে নিয়ে যায় তার ঠিক কি? না বাপু, তুমি অন্য জায়গায় গিয়ে জিরোও গে।
লোকটা মলিন মুখে চলে গেল। খেঁদি করুণ মুখে ফিরে ঘরে গিয়ে মন খারাপ করে শুয়ে রইল।
মায়াদয়াটা হল এক ধরনের দুর্বলতা। মানুষের ওই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই ঠগ জোচ্চোরেরা করে কর্মে খাচ্ছে, পরেশবাবুর গৌরব হল, তাঁকে কেউ আজ অবধি বোকা বানাতে পারেনি। তিনি এত হুঁশিয়ার লোক যে তাঁকে ঠকানো অতিশয় কঠিন কাজ। চোর অবধি তাঁর বাড়িতে বিশেষ সুবিধে করতে পারেনি। খুট করে একটু শব্দ হলেই তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তাঁর বাড়িতে কুকুর-বেড়াল অবধি নেই।
বাজিকরটা চলে যাওয়ার পর পরেশবাবু বসে বসে ঢুলতে ঢুলতে নানা কথা ভাবছিলেন।
বাবু।
চমকে চেয়ে পরেশবাবু দেখলেন, বাজিকরটা ফিরে এসেছে।
কী চাই তোমার? অ্যাঁ। বলেছি তো খেলা আমরা দেখব না।
খুকিকে একটু ডেকে দেবেন বাবু?
কেন হে? খুকিকে ডাকব কেন? তুমি যাও, ওসব চালাকি হবে না।
বাবু, পয়সা দিতে হবে না। খুকি খেলা দেখতে চেয়েছিল, তাই দেখাতে এসেছি।
পয়সা লাগবে না!
না।
শেষে আবার খাবার-দাবার চেয়ে বসবে না তো। কিংবা পুরোনো কাপড়চোপড়?
না বাবু, কিছুই চাইব না।
পরেশবাবু খুশি হয়েও হলেন না। এদের নানারকম ফন্দি ফিকির থাকে। পরে কোনো প্যাঁচ কষবে কে জানে।
বললেন, ঠিক তো। পরে আবার ফ্যাঁকড়া তুলবে না কিন্তু।
আজ্ঞে না, খুকিকে একটু ডাকুন।
পরেশবাবু খেঁদিকে ডেকে আনলেন। তার মুখে এক গাল হাসি ফুটল।
বাজিকর ভিতরে ঢুকে তার ঝোলা নামিয়ে যন্ত্রপাতি বের করতে লাগল। বল, ছোরা, আরও সব জিনিস।
পরেশবাবু মন দিয়ে দেখতে লাগলেন, পয়সা না লাগলে বাজি-টাজি দেখতে আপত্তি কী? সময়টাও কাটে ভালো।
লোকটা বেশ ভালোই খেলা দেখায়, ছ-খানা লাল নীল সবুজ সাদা বল নিয়ে দু-হাতে এত সুন্দর লোফালুফি করল যে বলার নয়। ধারালো ঝকঝকে ছোরাগুলো নিয়ে ভারী ভালো লোফালুফি করল। কাঠির ডগায় বনবন করে পিরিচ ঘোরাল—তাও আবার একসঙ্গে চার-পাঁচটা—অবিশ্বাস্য। তারপর কুড়ি থেকে একটা দড়ির গুছি বের করে কী মন্ত্র পড়ল কে জানে, দড়িটা সাপের মতো ফণা তুলল যেন, তারপর সোজা আকাশে উঠে যেতে লাগল। খেঁদি তো আনন্দে আটখানা। বাজিকর সেই দড়িটা বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে গেল। ঘাড় উঁচু করে পরেশবাবু দেখতে লাগলেন, লোকটা নারকেল গাছ ছাড়িয়ে আরও অনেক ওপরে উঠে গেছে, তাজ্জব খেলা।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে লোকটা নেমে এসে খেঁদিয়ে বলল, কী খুশি তো খুকি?
খেঁদি হি হি করে হেসে বলল, তুমি খুব ভালো, না বাজিকর? তুমি আমার একটা পুতুল নেবে?
না খুকি, তোমাদের কাছ থেকে যে কিছু নিতে নেই।
কেন বাজিকর?
তাতে যে আমার পাপ হবে।
তোমার মুখটা তো শুকনো, তোমার কি খিদে পেয়েছে?
বাজিকর করুণ মুখে বলে, আমার তো সবসময়েই খিদে। কিন্তু তোমার বাড়িতে যে আমার কিছু খেতে নেই খুকি, পাপ হবে।
কেন পাপ হবে বাজিকর?
এ বাড়িতে যে কাক কুকুরেও খেতে পায় না, এ বাড়িতে কি খেতে আছে?
এ কথায় পরেশবাবু অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ওহে, ওসব কথা ওর মাথায় ঢোকাচ্ছ কেন? আমি হিসেবি মানুষ। নইলে এতদিনে আমার সব চৌপট হয়ে যেত। বাজে খরচ করার জন্য তো দানসত্র খুলে বসিনি।
যে আজ্ঞে বাবু।
তুমি এখন এসো গিয়ে।
আর খেলা দেখবেন না?
আবার কী খেলা?
আপনার জন্য এই একটা খেলা ছিল, দেখাই?
তা দেখাতে পারো।
বাজিকর একটা জাদুদণ্ডের মতো জিনিস হাতে নিয়ে বলল, এ খেলাটা বাবু, এই আপনাদের মতো মানুষের জন্যই আলাদা করে রেখেছি।
তাই নাকি? তা হলে দেখাও। কিন্তু পয়সা পাবে না, আগেই বলে রাখছি।
না বাবু, এ পয়সার খেলাও নয়।
তা হলে দেখাও।
এই যে বাবু দেখছেন, চারদিকে কেমন দুপুরের রোদ, দেখছেন তো!
তা তো দেখতেই পাচ্ছি।
কত আলো, তাই না?
সে তো বটেই।
এ সব ফক্কিকারি। আসলে দেখুন কেমন অন্ধকার।
বাজিকর কথাটা শেষ করার আগেই পরেশবাবু হাঁ। হঠাৎ রোদের আলো ঝপ করে উধাও হয়ে অমাবস্যার ঘুটঘুটি অন্ধকার নেমে এল চারদিকে।
পরেশবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, এ কী! এ কী!
বাবু কি ভয় পেলেন?
এটা কী হল হে! এত অন্ধকার কেন? আমি অন্ধ হয়ে গেলুম নাকি? কোথাও তো একটুও আলো নেই। অ্যাঁ।
আপনি তো অন্ধই বাবু।
তার মানে?
চারদিকে এত আলো, এত আনন্দ, এত জীবন, কিন্তু তা দেখলেন কই? মনের অন্ধকারে ডুবে আছেন যে!
ওরে বাপ রে! ওহে বাজিকর, শিগগির আলো ফিরিয়ে আনো! শিগগির....
আলো ফিরে এল, কিন্তু বাজিকরের চিহ্নও কোথাও আর দেখা গেল না।
পরেশবাবু স্তম্ভিতের মতো কিছুক্ষণ বসে রইলেন। খেঁদি এসে বাবার হাঁটুতে হাত রেখে বলল, কী হয়েছে বাবা?
পরেশবাবুর দু-চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল।
তোমার কি অসুখ করেছে বাবা?
পরেশবাবু মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, না, মা, বাজিকর আমার অসুখ সারিয়ে দিয়ে গেছে।
হংসধ্বনি, ২০০০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন