অষ্টাঙ্গপুরের বৃত্তান্ত

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বউয়ের ওপর রাগ করে জয়রাম ঠিক দুপুরবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। বলতে নেই, রাগ করাটা অন্যায্যও নয়। তার বউ বিলাসী বড়ই মুখরা। জয়রামের অবস্থাগতিক ভালো নয়। ভাগের চাষ করে ছয় মাসের খোরাক জোগাড় হয় তার। বাকি ছয় মাস নানারকম উঞ্ছবৃত্তি করে কাটে। কখনো ঘরামির কাজ করে, কখনো হাটে গিয়ে সবজি বেচতে বসে, কখনো বড় গাঙে মাছ ধরতে যায়। বিলাসীর শখ-শৌখিনতা মেটানোর সাধ্য তার নেই। ওসব তো দূরের কথা, দু-বেলা পেটপুরে ভাতই জোটে না তাদের। বিলাসী তাই মাঝে মাঝে বড্ড মুখ করে। জয়রামের মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছে হয় একদিন টাকা রোজগার করে বিলাসীকে তাক লাগিয়ে দেয়। তা তার ইচ্ছে হলেই তো হবে না, কপাল বলেও তো একটা জিনিস আছে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে হারা-উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল জয়রাম। ইচ্ছে ছিল চেনা রাস্তায় যাবে না। কোনো অচেনা, অদেখা জায়গায় চলে যাবে, হারিয়েই যাবে সে। একদম নিরুদ্দেশ। কিন্তু আশপাশের সবটাই তার বেজায় চেনা জায়গা। অচিন জায়গায় যেতে হলে গাঁ ছেড়ে অনেকটা যেতে হবে। এক পেট খিদে নিয়ে আর কতটাই বা হাঁটা যায়। তার গাঁ কালীতলা ছেড়ে সে বড় একটা দূরে কখনো যায়নি।

জোর কদমে হেঁটে সে পাশের গাঁ হরিশ্চন্দ্রপুর ছাড়িয়ে বাগদা পৌঁছে গেল। বাগদা পর্যন্ত তার চেনা। এরপর আর সে চেনে না। তবে তাতেই বা কী? আজ সে যে হারিয়ে যাবে বলেই বেরিয়েছে। তাই বাগদার বটতলার টিপকলে অনেকটা জল খেয়ে সে আবার হাঁটা ধরল। রাস্তা অফুরন্ত। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ আর কোনো গাঁ গঞ্জের দেখা মিলল না। ভারী ক্লান্ত বোধ করায় সে একটা অশ্বত্থগাছের ছায়ায় বসে খানিক জিরোল। একটু তন্দ্রার মতোও এসে গেল তার। চটকা ভাঙতেই দেখল, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি উঠে আবার হাঁটা ধরল সে। রাতের আগেই একটা লোকালয়ে পৌঁছতে পারলে ভালো। ট্যাঁকে পয়সা নেই। তাই রাতটা উপোসই কাটবে। তা হোক। খানিকটা জল খেয়ে নিয়ে কারও দাওয়ায় বা চণ্ডীমণ্ডপে কিংবা হাটখোলায় চালার তলায় শুয়ে রাত কাটিয়ে দেবে।

অন্ধকার হয়ে আসার মুখে সে একটা লোকালয় দেখতে পেল বটে। তেমন জমাট জায়গা নয়। একটা ছোট গাঁ বলেই মনে হল। দু-একটা দোকান আছে, কিছু বাড়িঘর।

একটা মুদির দোকানে হাজির হয়ে দেখল, মাঝবয়সি রোগা চেহারার একটা লোক দোকানে বসে দুজন খদ্দেরকে কী যেন মেপে দিচ্ছে দাঁড়িপাল্লায়। সে গিয়ে বলল, মশাই, এটা কোনো গাঁ বলতে পারেন?

এ হল অষ্টাঙ্গপুর। কাকে খুঁজছ বাপু? কার বাড়ি যাবে?

জয়রাম কুণ্ঠিত হয়ে বলে, না, বিশেষ কারও বাড়ি নয়। কোথায় এসে পড়লুম তার ঠাহর পাচ্ছিলুম না কিনা।

যে লোকটির সঙ্গে কথা হচ্ছিল সে বেশ বয়স্ক মানুষ। তার চেহারাটা দশাসই, মস্ত গোঁফ, মুখখানা দিব্যি হাসিখুশি। বলল, যে জায়গায় এসে পড়েছ তা বিশেষ সুবিধের জায়গা নয় বাপু। অষ্টাঙ্গপুরের খুব বদনাম। আর দু-ক্রোশ গেলে মাধবগঞ্জ বেশ ভালো জায়গা।

জয়রাম খিদে আর তেষ্টায় কাতর। এই অবস্থায় আরও দূই ক্রোশ হেঁটে যাওয়ার প্রস্তাবে তার মুখ শুকিয়ে গেল। বলল, কেন মশাই, এই গাঁয়ের বদনাম কেন?

ও বাবা! সে আমি তোমাকে ভেঙে বলতে পারব না। তবে এই আমরা যারা সাতপুরুষের ভিটে আঁকড়ে পড়ে আছি, তারা ছাড়া আর কেউ এখানে তিষ্টোতে পারে না কিনা। প্রত্যয় না হয় জনে যাচাই করে দেখতে পারো।

জয়রাম একটু দমে গেল। লোকটা সওদা নিয়ে চলে যাওয়ার পর জয়রাম দ্বিতীয় লোকটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, মশাই, এ গাঁয়ে কি রাতে একটু মাথা গোঁজার জায়গা পাওয়া যাবে?

এ লোকটা বেঁটে মতো। বয়স বেশি নয়। গোলগাল চেহারা। একটু যেন চমকে উঠে বলল, এখানে থাকতে চাও? বাপু, এ গাঁয়ে কোনো মধু আছে বলো তো। একটু পা চালিয়ে গেলে ক্রোশ দুই দূরে বড় গঞ্জ পাবে। এখানে তেমন সুবিধে হবে না তোমার।

জয়রাম বড্ড দমে গেল। কিন্তু খিদেয় তার নাড়ি পাক দিচ্ছে। আকণ্ঠ তেষ্টা। খদ্দের চলে যাওয়ায় সে দোকানির কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, মণ্ডলমশাই, একটু খাওয়ার জল পাওয়া যাবে?

দোকানি মণ্ডলমশাই ডাক শুনে তেরছা চোখে তাকে একটু মেপে নিয়ে বলল, এখন হিসেব মেলাচ্ছি বাপু। ওই কোণে মেটে কলসি আছে, পাশে ঘটি। নিজেই গড়িয়ে খাও।

ঠান্ডা জলটা পেটে গিয়ে শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেল। ভারী মিঠে জল তো! এত স্বাদের জল সে আগে খায়নি।

আপনাদের গাঁয়ের জল বুঝি খুব ভালো?

দোকানি ফৎ করে একটা শ্বাস ফেলে বলে, অষ্টাঙ্গপুরের সবই তো ভালো ছিল বাপু, কিন্তু ভালো আর থাকছে কই?

কেন মশাই, এ গাঁয়ের খারাপটা কী?

সে-কথা আর শুনতে চেয়ো না হে।

পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে জয়রাম বলল, দুটো বাতাসা দেবেন? একটু পিত্তদমন করে নিই। দুপুর থেকে টানা হেঁটে আসছি। পেটে কিছু না দিলেই নয়।

দোকানদার ফের তেরছা চোখে তাকে দেখে নিয়ে বলল, পকেট যে গড়ের মাঠ তা তোমাকে দেখেই বুঝেছি। পয়সা দিতে হবে না। ওই টুলটার ওপর বোসো।

জয়রাম ভারী কৃতার্থ গ্যালগ্যালে হেসে বলল, আজ্ঞে, আপনি বড় ভালো লোক।

বড় ঠোঙাটা শেষ করতে জয়রামের বিশেষ সময় লাগল না। হালুম হুলুম করে খেয়ে ফের এক ঘটি জল খেয়ে মস্ত ঢেকুর তুলল সে। গায়ে বেশ জোর পাচ্ছে এখন।

দোকানিকে এ গাঁয়ে থাকার জায়গা আছে কি না জিজ্ঞেস করায় দোকানিও আঁতকে উঠে বলল, এখানে থাকবে? এখানে থাকবে কেন? না বাপু, এখানে তোমার সুবিধে হবে না। কেটে পড়ো।

জয়রাম বুঝতে পারল, আরও দুই ক্রোশ ঠ্যাঙানোই তার কপালে আছে। কিন্তু এই জায়গার নামখানা সুন্দর, জল এত ভালো আর মানুষজনও তেমন খারাপ নয়। তা হলে অষ্টাঙ্গপুরের খারাপটা যে কী, তা সে বুঝে উঠতে পারল না।

দোকানি দোকানের ঝাঁপ ফেলার তোড়জোড় করছে দেখে সে উঠে পড়ল। তারপর রাস্তায় নেমে চারদিকে নজর রাখতে রাখতে হাঁটা দিল। গাঁয়ে বাড়ি-ঘরদোর খুব বেশি নেই। কেমন একটু ছাড়া ছাড়া ভাব। অধিকাংশ বাড়িতেই আলোটালো নেই। মনে হয় সন্ধেরাতেই সব ঘুমিয়ে পড়েছে।

সামনে কোথা থেকে যেন একটা কেওনের শব্দ আসছিল। খুব ক্ষীণ কণ্ঠ আর বড্ড বেসুরো। জয়রামের আর তেমন কোনো গুণ নেই বটে, তবে সে খুব ভালো কেত্তন গাইতে পারে। গলার জোর আছে, গলায় সুরও আছে। খোল-কত্তাল বাজানোর হাতও বড় ভালো।

আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে সে দেখতে গেল, রাস্তার বাঁ ধারে গাছপালার আড়ালে একটা চালাঘর। চালাঘরের চাতালে একখানা টেমি জ্বলছে আর চারজন লোক খোল আর কত্তাল বাজিয়ে কেত্তন গাইছে। তারকব্রহ্ম নাম, হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে, হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। কিন্তু তাদের গলায় নামমাত্র সুর নেই। গলায় তেমন জোরও নেই। যেন ভারী ভয়ে ভয়ে কোনোরকমে দায়সারা গোছের গাইছে।

এরকম নিস্তেজ কীর্তন জীবনে শোনেনি জয়রাম। তার ভারী মায়া হল। বিপদ-আপদের কথা বিস্মরণ হয়ে সে রাস্তা ছেড়ে নেমে সোজা চালাঘরটায় হাজির হয়ে মাদুরের এক কোণে বসে পড়ল। তারপর যে লোকটা বেতালে খোল বাজচ্ছিল, ফস করে তার হাত থেকে খোলটা টেনে নিয়ে তার জোরালো আর সুরেলা গলায় গাইতে লাগল।

লোকগুলো এত অবাক হল যে গান থামিয়ে চোখ চেয়ে হাঁ করে তার দিকে খানিক চেয়ে থেকেই হঠাৎ লাফিয়ে উঠে পড়ি কী মরি করে দুড়দাড় পালিয়ে কোথায় হাওয়া হল কে জানে। টেমি আর মাদুর, এমনকী খোলটাও নিয়ে গেল না। জয়রাম আর কী করে! খানিকক্ষণ একা একাই খোল বাজিয়ে খুব প্রাণ খুলে কীর্তন গাইল সে। তারপর গান থামিয়ে ভাবল, দু-ক্রোশ হাঁটার আগে বরং একটু ফিরিয়ে নেওয়া যাক। রাত বেশি হয়নি। বড়োজোর সাতটা বাজে।

জিরিয়ে নিতে মাদুরে একটু গা এলিয়ে দিল সে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের আঠায় দু-চোখ এমন জুড়ে গেল যে তার আর বাহ্যচৈতন্য রইল না। চাষার ঘুম যাকে বলে।

কিন্তু হঠাৎ বিপত্তি ঘটল মাঝরাতে। হঠাৎ হিমশীতল স্পর্শে জয়রাম শিহরিত হয়ে চোখ চাইল। বাপরে! কী শীত। অথচ এখন মোটে ভাদ্র মাসের শেষ। এ সময়ে গাঁ-গঞ্জে শীতভাব হয় ঠিকই, কিন্তু এরকম সাংঘাতিক শীত পড়বার তো কথা নয়। আর এমনই জমাট শীত যে হাত-পা কুঁকড়ে যাচ্ছে। মাদুরটাকে মনে হচ্ছে বরফের চাঙড়। চারদিক ঘুটঘুটি অন্ধকার। টেমিটা বোধহয় তেলের অভাবেই নিভে গেছে। হতভম্ব জয়রাম কোনোক্রমে গামছাটা দিয়ে কান-মাথা ঢাকা দিল।

জীবনে এমন অন্ধকারও কখনো দেখেনি জয়রাম। তার ভয় হল, হঠাৎ তার চোখদুটো অন্ধ হয়ে যায়নি তো!

হঠাৎ সামনে থেকে একটা ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলা ফিসফিস করে বলল, তুই কীর্তন গাইতে পারিস?

কে জিজ্ঞেস করল তা কে জানে। মনের ভুলও হতে পারে। কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না সে। খুব ভয়ে ভয়ে বলল, একটু একটু পারি।

গা।

গাইব?

হ্যাঁ।

হাতড়াতেই খোলটা নাগালে পেল জয়রাম। সেটা কোলের ওপর টেনে নিয়ে গাইতে লাগল। ঝড়াক করে যেন শীতটাও কেটে গেল।

গান শেষ হতেই গলাটা বলল, আয়।

কোথায় যাব?

আয়! আয়!

জয়রাম উঠে পড়ল। কিন্তু কোথায় যাবে, কোন দিকে তা বুঝতে পারল না। এত অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হচ্ছে না।

কিছু দেখতে পাচ্ছি না যে।

আয়। পথ আছে। আয়।

অবাক কাণ্ড হল, জয়রাম হাঁটতে লাগল এবং কোথাও হোঁচট খেল না। পায়ে কাঁটা ফুটল না। খানাখন্দে পা পড়ল না। কিন্তু ঝোপঝাড় ভেদ করেই যেতে হচ্ছে।

হঠাৎ মনে হল সামনে যেন একটা পুকুর। তা সে সেই পুকুরের ওপর দিয়েই যেন দিব্যি। হেঁটে পার হয়ে গেল। পুকুর পেরিয়েই একটা ডাঙা জমি, তারপরেই একটা বাড়ির দাওয়া। খোলা দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকেও পড়ল সে।

কাঁপা গলায় বলল, এটা কার বাড়ি?

সেই গলাটা বলল, আমার।

আপনি কে?

আমি এখন নেই। এ বাড়িতে তুই থাকবি।

আমি থাকব? কিন্তু আমার বাড়ি তো সেই কালীতলা।

না। এখন থেকে এটাই তোর বাড়ি। আমার কুড়ি বিঘে জমি আছে। চাষ করবি। ঠাকুরঘরে সিংহাসনের তলায় চৌকো পাথরটা সরালে নীচে একটা কাঠের বাক্স পাবি। তাতে টাকা আর সোনা আছে।

অ্যাঁ।

রোজ সন্ধ্যেবেলা ওই চালাঘরে বসে কীর্তন গাইবি।

যে আজ্ঞে। কিন্তু শুনতে পাই অষ্টাঙ্গপুর খুব খারাপ জায়গা।

ব্যাটারা কীর্তন গাইতে পারে না বলেই যত অশান্তি। প্রেতাত্মারা খেপে গিয়ে সব লন্ডভন্ড করে দেয়। কীর্তন ঠিকমতো গাইলে সব ঠান্ডা থাকবে। হঠাৎ একটা ছায়া যেন সরে গেল। আবছা আবছা চারদিকটা দেখতে পেল জয়রাম। দিব্যি পাকা বাড়ি। ঘরে বেশ খাট আলমারি বিছানা রয়েছে। বাড়িখানা বেশ মাঝারি মাপের বড় বলেই মনে হচ্ছিল। সে কি ভূতের পাল্লায় পড়ল নাকি রে বাবা! কে জানে কী! ক্লান্ত শরীরে সে সামনের চৌকিতে গড়িয়ে ভোর পর্যন্ত টানা ঘুমোল।

সকালে উঠে বাড়িঘর দেখে সে চমৎকৃত। তার তুলনায় এ যেন রাজপ্রসাদ। পাকা মেঝে, ইটের দেওয়াল, মাথায় টিনের চাল। বেশ তিন-চারখানা ঘর, সামনে-পিছনে দাওয়া, মস্ত উঠোন, কুয়োতলা। আর চাই কী!

একটু বেলা হতে না হতেই গাঁয়ের মোড়ল মাতব্বররা আর পঞ্চায়েতের পাণ্ডা এসে হাজির।

একজন তেরিয়া গোছের লোক চোখ পাকিয়ে বলল, আমি হলুম পরিতোষ সরকার। গাঁয়ের পঞ্চায়েত। তা তুমি কোন আক্কেল এ বাড়িতে ঢুকে দিব্যি গ্যাঁট হয়ে বসে আছ। মামাবাড়ির আবদার নাকি? ঢুকে পড়লেই হল?

জয়রাম হাতজোড় করে বলে, অপরাধ নেবেন না। ইচ্ছে করে পরের বাড়িতে ঢুকব আমি তেমন লোক নই।

তা হলে ঢুকলে যে। তালা দেওয়া ঘরে ঢুকলেই বা কী করে?

জয়রাম তখন সব ইতিবৃত্তান্ত খুলে নিবেদন করে ভেঙে বলল, আপনারা হুকুম করলে এক্ষুনি চলে যাচ্ছি। কালীতলায় আমার মাথা গোঁজার মতো একটু আশ্রয় এখনও আছে।

পরিতোষ চিন্তিত মুখে বললেন, রোসো বাপু। তোমার মুখ দেখে তেমন খারাপ লোক মনে হচ্ছে না। সত্যি কথা বলতে কী, অষ্টাঙ্গপুরে আমরা ভূতের উপদ্রবে জেরবার হয়ে যাচ্ছি। আর সে কী অত্যাচার! নিতাই দাসকে সন্ধের মুখে রথতলার কাছে হঠাৎ উড়িয়ে নিয়ে একটা মস্ত গাছের মগডালে চড়িয়ে দিল। সে আর নামতে পারে না। বাঁশঝাড়ের বাঁশ নুয়ে রাস্তার ওপর শুয়ে থাকে। যেই কোনো ভালোমানুষের ছেলে ডিঙোতে যায় অমনি বাঁশ ছিটকে উঠে তাকে দশ হাত দূরে ফেলে হাড়গোড় দ করে দেয়। পণ্ডিতমশাই এই সেদিন পাঠশালা থেকে ফিরছিলেন। হঠাৎ একটা গোরু এসে তাকে অকারণে গুঁতিয়ে পুকুরে ফেলে দিল। তারপর রোজ প্রত্যেকের বাড়িতে ইয়া বড় বড় ঢেলা মারা হয়। রান্নায় কে যেন খাবলা খাবলা নুন মিশিয়ে দিয়ে চলে যায়। আর হা হা হি হি হু হু করে হাসি আর রক্ত জল করা নানারকম শব্দ আর বিটকেল সব চেহারার আবির্ভাব তো আছেই। ভূতের অত্যাচারে অনেকে গাঁ ছেড়ে চলে গেছে। এটা হল প্রীতম ঘোষের বাড়ি। যিনি বছর দশেক গত হয়েছেন। তাঁর তিনকুলে কেউ নেই। কিন্তু এই বাড়ি আমরা যখনই দখল নিতে আসি, অমনি কোথা থেকে লিকলিক করে গোখরো আর কেউটে সাপ বেরিয়ে আসে। তা ছাড়াও নানা উৎপাত। তা প্রীতম ঘোষ যখন তোমাকে এই গাড়িতে বহাল করেছেন, তখন আমাদের বলার কিছু নেই। কীর্তন শুনলে ভূতেরা ঠান্ডা হয়, একথা জানলে তো আমরা একদল কীর্তনীয়া এনে গাঁয়ে বসত করাতে পারতাম। তা তোমাকেই যখন ভূতেরা পছন্দ করেছে, তখন আর আমাদের বলার কীই-বা থাকতে পারে।

যে আজ্ঞে।

জয়রাম সেদিনই গিয়ে কালীতলা থেকে তার বউ বিলাসী আর হাঁড়িকুড়ি বিছানাপত্র নিয়ে চলে এল। ঘরদোর দেখে বিলাসী তো হাঁ। মুখে আর হাসি ধরে না।

কথাটা হল, জয়রাম এখন মহা সুখে আছে। চালাঘরের অষ্টাঙ্গ কীর্তনসভায় সন্ধেবেলা সে দলবল নিয়ে কীর্তন গায়। চাষবাস করে। অভাবের চিহ্নমাত্র নেই তার সংসারে।

তার অষ্টাঙ্গপুরেও এখন আর কোনো অশান্তি নেই।

কিশোর ভারতী, শারদীয়া ২০১৪

সকল অধ্যায়
১.
গন্ধটা খুব সন্দেহজনক
২.
লালটেম
৩.
ইঁদারায় গণ্ডগোল
৪.
ঢেঁকুর
৫.
কোগ্রামের মধু পণ্ডিত
৬.
কৌটোর ভূত
৭.
কালীচরণের ভিটে
৮.
নয়নচাঁদ
৯.
দুই পালোয়ান
১০.
কৃপণ
১১.
টেলিফোনে
১২.
কালাচাঁদের দোকান
১৩.
মাঝি
১৪.
হর বনাম কালী
১৫.
শিবেনবাবু ভালো আছেন তো!
১৬.
পায়রাডাঙায় রাতে
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
জকপুরের হাটে
১৯.
নিশি কবরেজ
২০.
বাজিকর
২১.
দুই সেরি বাবা
২২.
দুই ভূত
২৩.
ধুলোটে কাগজ
২৪.
আগন্তুক
২৫.
আয়নার মানুষ
২৬.
একান্ন টাকা
২৭.
নিশি চৌকিদার
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
চকদিহির তেনারা
৩০.
ছায়ার লড়াই
৩১.
শ্যামলাল ভাবছে
৩২.
পটলা
৩৩.
অষ্টাঙ্গপুরের বৃত্তান্ত
৩৪.
নয়নপুরের রাস্তা
৩৫.
দুখীরাম
৩৬.
খেলা
৩৭.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৮.
পুতুলওয়ালা
৩৯.
হারু
৪০.
তেঁতুলতলায়
৪১.
পুরোনো জিনিস
৪২.
শিবেনবাবুর ইস্কুল
৪৩.
পুনার সেই হোটেল
৪৪.
নির্জন স্টেশনে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%