খেলা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বুক চিতিয়ে, লাঠি বাগিয়ে দৃপ্ত পায়ে তিনি কুমোরপাড়া পেরোলেন, অতি দ্রুত ডিঙিয়ে গেলেন ন্যাড়ার মোড়, তারপর রথতলা পেছনে ফেলে ডানদিকে মোড় নিয়ে হাটখোলা ছাড়িয়ে গেলেন এক লহমায়। কাঁসাই দিঘির পুবধারের রাস্তা ধরে নির্ভীক পায়ে গটমট করে করে গিয়ে তিনি দুর্গাবাড়ি ছাড়িয়ে ঘোষপাড়ায় ঢুকে পড়লেন। উপেনবাবুর বুকে এখন দামামা বাজছে। একটু বাদেই তিনি অকম্পিত হৃদয়ে তাঁর দুর্মর প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হবেন। আজ একটা মরণ-বাঁচন লড়াই। এ লড়াই জিততে হবে।

একটা লালরঙা তিনতলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এবার একটা রণহুংকার ছাড়লেন, বাবলু!

দোতলার বারান্দা থেকে একটা ফরসা রোগাপাতলা বাচ্চা ছেলে হাসি মুখখানা বাড়িয়ে বলল, ওঃ, কাকু এসে গেছেন। দাঁড়ান, আসছি।

একতলার বারান্দায় টেবিল পাতা, দু-ধারে চেয়ার। একটা চেয়ারে বসে উপেনবাবু রুমালে ঘেমো মুখটা মুছে নিলেন। তারপর ভিতরকার উত্তেজনা প্রশমনের জন্য টেবিলে আঙুল দিয়ে একটা তবলার বোল তুলবার চেষ্টা করলেন। কাজের লোক এসে চা-বিস্কুট দিয়ে গেল। গাম্ভীর্য বজায় রেখে উনি তা খেয়েও ফেললেন, রোজ যেমন খান। তারপর অশান্ত মনকে শান্ত করার জন্য গুনগুন করে একটা শ্যামাসংগীত ভাঁজতে লাগলেন।

এমন সময়ে বগলে স্লেট আর হাতে পেনসিল নিয়ে বাবলু ওপর থেকে নেমে এল। বলল, তা হলে হয়ে যাক, কাকু।

উপেনবাবুও হাঁক দিয়ে বললেন, হয়ে যাক।

বাবলু চটপট স্লেটের ওপর একটা কাটাকুটি খেলার ছক এঁকে ফেলল আর বাঁ কোণে একটা ক্রস বসিয়ে দিল। স্ট্র্যাটেজি আজ ঠিক করেই এসেছেন উপেনবাবু। তিনি বাবলুর বিপরীত কোণে গোল্লা বসিয়ে দিয়ে আপনমনে বলে উঠলেন, হুঁ হুঁ বাবা! বাবলু ফস করে আর একটা কোণে ক্রস বসিয়ে দিল। আরে একটা মোক্ষম কোণে গোল্লা বসানোর পরই হাত কামড়াতে ইচ্ছে করল উপেনবাবুর। ইস! মস্ত ভুল হয়ে গেছে। বাবলু ফস করে ধারের ঘরে মাঝখানে ক্রস বসিয়েই লাইন টেনে দিল।

দপ করে খানিকটা নিবে গেলেন উপেনবাবু। নাঃ। আরও একটু কনসেন্ট্রেট করতে হবে। চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। রিফ্লেকস ধারালো করে তুলতে হবে।

এবার তিনি ক্রস মারলেন, বাবলু গোল্লা। তিনি ক্রস। বাবলু গোল্লা। তিনি ক্রস। বাবলু গোল্লা। কিন্তু কী আশ্চর্য, কোন আশ্চর্য জাদুবলে তিনটে গোল্লা সরল রেখায় বসে তাঁকে মুখ ভ্যাঙাতে লাগল।

কাকু, আবার হয়ে যাক।

হয়ে যাক!

কিন্তু হতে হতেও হল না। বাবলুর তিনটে ক্রস তাঁকে বক দেখাতে লাগল।

আবার হয়ে যাক কাকু!

হয়ে যাক!

পর পর পাঁচ দাম হেরে বজ্রাহতের মতো বসে রইলেন উপেনবাবু।

আমার স্কুলের সময় হয়ে এসেছে কাকু, তা হলে আমি এবার যাই?

গম্ভীর গলায় পরাজিত উপেনবাবু বললেন, এসো গিয়ে।

উপেনবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়েন। নাঃ আজও হল না। হেস্তনেস্ত হল না, এসপার-ওসপার হল না। ভিতরে এতক্ষণ যে টগবগানিটা ছিল তা উধাও। হাতে-পায়ে সেই জোরটাও আর নেই।

বটতলার পাশ দিয়ে আনমনা হয়ে যখন হেঁটে যাচ্ছেন তখন উলোকুলো জোব্বাপরা ফকির গোছের লোকটা আজও হাঁক মারল, কী হল? আজও পারলে না তো!

ফকিরের পাশে বসে থাকা কেলে দিশি কুকুরটা অবধি ঘুম-চোখে তাকিয়ে বলল, ভাগ। ভাগ!

উদ্দীপনাহীন উপেনবাবু এখন যেভাবে হাঁটছেন তাকে বলে বলে ল্যাং ল্যাং করে হাঁটা। এই হাঁটার মধ্যে কোনো ইচ্ছাশক্তি থাকে না, কোনো লক্ষ্যে পৌঁছনোর থাকে না, কোনো উদ্দেশ্যও থাকে না। এমনকী কেন হাঁটছি তাও বুঝতে পারা যায় না।

হাঁটতে হাঁটতে উপেনবাবু ময়নার মাঠ অবধি চলে এলেন। বেশ জায়গা। উদোম, মস্ত মাঠের দু-ধারে দুটো গোলপোস্ট, চারধারে মেলা গাছগাছালি। দু-চারটে খোঁটায় বাঁধা গোরু চরছে। লোকজন নেই। আম ঘাছটার তলায় ক্লান্ত ও হতাশ উপেনবাবু বসে রইলেন। আজও তিনি পারলেন না। কোনোদিনই কাটাকুটি খেলায় তিনি বাবলুর সঙ্গে পারেননি। নিজের এই নিরঙ্কুশ পরাজয়ের কোনো ব্যাখ্যাই তাঁর কাছে নেই। তিনি একটা ঘাসের ডাঁটি তুলে চিবোতে এই পরাজয়ের গ্লানিকে ভুলতে চেষ্টা করতে লাগলেন। প্রথমেই নিজেকে বললেন, খেলায় হারজিৎ তো আছেই।

সঙ্গে সঙ্গে কাছ থেকেই কে যেন বলে উঠল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, খেলায় হারজিৎ তো আছেই।

উপেনবাবু চমকে উঠে চারদিকে চেয়ে দেখলেন। কেউ কোথাও নেই। তবে কথাটা বলল কে?

ফের উপেনবাবু নিজেকে বোঝালেন, কাটাকুটি আবার একটা খেলা!

সঙ্গে সঙ্গে ফের কেউ বলল, দূর দূর। কাটাকুটি কোনো খেলাই নয়।

এ তো মহা মুশকিল হল। কোনো বেয়াদব ফোড়ন কেটে যাচ্ছে, কিন্তু তাকে দেখা যাচ্ছে না। উপেনবাবু তন্ন তন্ন করে চারদিকটা খুঁজে দেখলেন। কেউ কোথাও নেই। উপেনবাবু ভাবলেন, মনের ভুলই হবে। ফের তিনি ঘাসের ওপর বসে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে নিজেকে বোঝালেন, বুঝেছ উপেন, কাটাকুটি খেলায় হেরে গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না।

সঙ্গে সঙ্গে ফের সেই ফোড়নবাজের গলা, পাগল নাকি। মহাভারত অশুদ্ধ হলেই হল।

উপেনবাবু আর উপেক্ষা করতে পারলেন না ব্যাপারটাকে। বেশ গলা তুলেই বললেন, কে রে? কার এত সাহস?

ঝুপসি গাছটার ডালপালায় একটা শব্দ হল, তারপর ওপর থেকে একজন বেঁটেখাটো রোগা লোক ঝুপ করে নেমে সামনে একগাল হেসে দাঁড়াল, আজ্ঞে আমি হলুমগে নিবারণ তোপদার। কাটাকুটি খেলায় আমি ছিলুম এই গোটা মুর্শিদাবাদ জেলায় চ্যাম্পিয়ন।

বলেন কী মশাই। কাটাকুটি খেলার আবার জেলাওয়ারি কম্পিটিশনও হয় নাকি?

কী রে বলেন উপেনবাবু। কাটাকুটির তো রাজ্য এবং জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপও আছে। আর শেষে হল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ।

বাপরে! এটা তো আমার জানা ছিল না, নিবারণবাবু।

তবে আর বলছি কী? আমি অবশ্য রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠে জান মহম্মদের কাছে হেরে যাই। তারপর আর লজ্জায় লোক সমাজে মুখ দেখাই না। তবে আমার কাছে অনেকে শিখতে আসে। তাদেরই যা একটু শেখাই।

উপেনবাবু সোজা হয়ে বসে বললেন, আমাকে শেখাবেন?

নিবারণ খুব তীক্ষ্ন চোখে উপেনবাবুর গা থেকে মাথা পর্যন্ত জরিপ করে নিয়ে বলে, সবাই শেখাই না। যার ভিতরে প্রতিভা আছে বলে মনে হয় তাকেই শেখাই। মনে হচ্ছে, আপনার হবে।

উপেনবাবু উদ্বেল হয়ে বললেন, হবে। ঠিক বলছেন তো। তা কবে থেকে শুরু করবেন বলুন তো।

লোকটা ডান হাতটা বাড়িয়ে বলল, পাঁচশো এক টাকা নজরানা দিয়ে চলে যান। কাল সকাল দশটায় একটা স্লেট আর পেনসিল নিয়ে চলে আসবেন।

উপেনবাবু গদগদ হয়ে নিবারণের হাতে পাঁচশো এক টাকা দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমি তা হলে কাল থেকেই—

হ্যাঁ, হ্যাঁ, কাল থেকেই। বলে লোকটা ফের গাছে উঠে গেল।

উপেনবাবু খুশি মনে বাড়ি ফিরলেন।

নিবারণ তোপদারের সঙ্গে অবশ্য উপেনবাবুর আর দেখা হয়নি। আর বাবলুর কাছে হারতে হারতে তিনি যেন হয়রান হয়ে যাচ্ছেন।

শুকতারা, শারদীয়া ২০১৭

সকল অধ্যায়
১.
গন্ধটা খুব সন্দেহজনক
২.
লালটেম
৩.
ইঁদারায় গণ্ডগোল
৪.
ঢেঁকুর
৫.
কোগ্রামের মধু পণ্ডিত
৬.
কৌটোর ভূত
৭.
কালীচরণের ভিটে
৮.
নয়নচাঁদ
৯.
দুই পালোয়ান
১০.
কৃপণ
১১.
টেলিফোনে
১২.
কালাচাঁদের দোকান
১৩.
মাঝি
১৪.
হর বনাম কালী
১৫.
শিবেনবাবু ভালো আছেন তো!
১৬.
পায়রাডাঙায় রাতে
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
জকপুরের হাটে
১৯.
নিশি কবরেজ
২০.
বাজিকর
২১.
দুই সেরি বাবা
২২.
দুই ভূত
২৩.
ধুলোটে কাগজ
২৪.
আগন্তুক
২৫.
আয়নার মানুষ
২৬.
একান্ন টাকা
২৭.
নিশি চৌকিদার
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
চকদিহির তেনারা
৩০.
ছায়ার লড়াই
৩১.
শ্যামলাল ভাবছে
৩২.
পটলা
৩৩.
অষ্টাঙ্গপুরের বৃত্তান্ত
৩৪.
নয়নপুরের রাস্তা
৩৫.
দুখীরাম
৩৬.
খেলা
৩৭.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৮.
পুতুলওয়ালা
৩৯.
হারু
৪০.
তেঁতুলতলায়
৪১.
পুরোনো জিনিস
৪২.
শিবেনবাবুর ইস্কুল
৪৩.
পুনার সেই হোটেল
৪৪.
নির্জন স্টেশনে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%