আগন্তুক

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

নাদুবাবু বেজায় নাকাল হচ্ছেন। মানুষটি ভালো, প্রাণে বেশ দয়ামায়া আছে। কাঙাল ভিখিরি এসে দাঁড়ালে দূর-ছাই করতে পারেন না। মাথাপিছু একটি করে আধুলি বরাদ্দ করে রেখেছিলেন। তা আগে পাঁচ-সাতজন ভিখিরি নানা সময়ে আসত। কিন্তু ইদানীং সংখ্যাটা বেড়েছে। বাড়তে-বাড়তে গতকাল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ত্রিশ জন।

আজ সকালে নিজের ছোটো মনোহারির দোকানটা খুলে ধূপধুনো জ্বেলে গণেশবাবুকে পেন্নাম করে মুখ তুলে দেখেন, ওরে বাবা! দোকানের সামনে অন্তত জনা পঞ্চাশেক ভিখিরির লাইন। এই ফরাসগঞ্জে কোনোকালে এত ভিখিরি ছিল না! এল কোত্থেকে?

নাদুবাবু হাতজোড় করে বললেন, বাবা সকল, মা জননীরা, আজ আর আধুলিতে কুলোতে পারব না। একখানা করে সিকি নিয়ে যাও।

শুনে ভিখিরিরা বেজায় চেঁচামেচি জুড়ে দিল। একজন তো তেড়িয়া হয়ে বলে উঠল, এঃ, সিকি দেখাচ্ছেন? আমরা কী ভিখিরি নাকি?

তা গেল পঁচিশটা টাকা। নাদুবাবুর মুশকিল হল তিনি মোটেই রোখাচোখা মানুষ নন, স্পষ্টবক্তা নন, নিরীহ আর ভীতুও বটেন। ভিখিরিরা বিদেয় হল তো সুধীরবাবু এসে হাজির। রোজই হাজিরা দেন। টুকটাক জিনিস কেনেন। বলেন, খাতায় লিখে রাখো, মাসকাবারে দিয়ে যাব। তা আজ অবধি কত মাস যে কাবার হল তার হিসেব নেই। কিন্তু সুধীরবাবু ধারের একটি পয়সাও শোধ দেননি। টাকা না-দিলেও সুধীরবাবু উপদেশ দিয়ে থাকেন।

আজ বললেন, ওহে নাদু, তোমার ব্যবসার যে উন্নতি হচ্ছে না তার কারণ কী জানো? তোমার স্টকটা মোটেই সুবিধের নয়। ওরে বাপু, এ যুগে ভালো-ভালো জিনিস দিয়ে দোকান না সাজালে কী খদ্দের আসে? ভালো-ভালো ব্র্যান্ডের জিনিস কই তোমার? বিলিতি বিস্কুট, ফরাসি সেন্ট, জার্মান ব্লেড এসব না রাখলে এ দোকানের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

সেটা নাদুবাবুও জানেন। সুধীরবাবুর মতো আরও কয়েকজন খদ্দের আছে তাঁর। লক্ষ্মীরতন রায়, গগন চাটুজ্যে, মাধব কর্মকার। এরা সব মাতব্বর লোক। সুধীরবাবুর তবু একটু বিনয় আছে, এদের তাও নেই। যা খুশি জিনিস তুলে নিয়ে যায়। দাম শোধ দেওয়ার নামও করে না। নাদুবাবু লজ্জার মাথা খেয়ে তাগাদাও দিতে পারেন না কখনো।

তাঁর বউ নবলীলা এমনিতেই খাণ্ডার! তার ওপর নাদুবাবুর এইসব ভালোমানুষি আর আহম্মকি দেখে রোজ উস্তম-ফুস্তম করে দিনরাত বকাঝকা-গালমন্দ করে থাকেন। তা নাদুবাবু সেসবেরও কোনো সদুত্তর খুঁজে পান না।

তবে ফরাসগঞ্জের সব লোকই কিন্তু খারাপ নয়। তারা জানে নাদু সরকার নিরীহ সজ্জন মানুষ। দাম বা ওজনে কখনো ঠকায় না। তাই এই দোকানের কিছু বাঁধা খদ্দের আছে। তাদের ভরসাতেই নাদুবাবুর গ্রাসাচ্ছাদনটা কোনোরকমে চলে যায়।

একটু বেলার দিকে সুধীরবাবু বিদেয় হলেন। নাদুবাবু একা-একা বসে নিজের দুঃখের কথা ভাবতে লাগলেন।

এরপর দুটো-চারটে খদ্দের এল, দু-একজন কুশলপ্রশ্ন করে গেল। রমাকান্ত পুরুত এসে শান্তিজল ছিটিয়ে কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে দুটো টাকা নিয়ে গেল। তারপর খানিকক্ষণ ফাঁকা সময় যাচ্ছিল। তখন দুটো কুকুরের ঝগড়া লাগল রাস্তায়। কিছুক্ষণ ঝগড়াটা দেখল বসে নাদু সরকার। গাঁ দেশে দেখার আছেটাই বা কী!

দুপুরের দিকে যখন নাদুবাবু উঠি-উঠি করছেন, ঠিক সেই সময় একটা হা-ঘরে চেহারার লোক এসে টপ করে উঠে সুধীরবাবুর পরিত্যক্ত টুলটায় বসে পড়ে বলল, বিড়ি আছে হে?

নাদুবাবু বললেন, না। বিড়িটিড়ি আমি রাখি না। ওসব হরির দোকানে পাবেন। বাঁ-হাতে একটু এগিয়ে যান, এই কদমতলার দিকে।

না হে, বিড়ির দরকার নেই। ওসব আমি খাই না।

তবে চাইলেন যে।

চাইনি তো! বললুম, বিড়ি আছে হে! তার মানে তো চাওয়া হয়!

তা বটে, তবে এরকমটাই মানে হয় আর কী!

জানতে চাওয়া আর চাওয়া কী এক হল বাপু?

নাদুবাবু মাথা নেড়ে বললেন, তা অবিশ্যি ঠিক।

লোকটা আধবুড়ো, রোগা। গালে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, দাঁত উঁচু। পরনে ময়লা একটা সাদা পিরান, হেঁটো ধুতি আর পায়ে লালচে রঙের ক্যাম্বিসের জুতো। বেশ আয়েশ করে বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছে।

এদিকে নাদুবাবুর খিদে পেয়েছে। বাড়ি গিয়ে চান করে চাট্টি খাবেন। কিন্তু লোকটাকে তো আর বিদেয় হতে বলা যায় না। তাই নাদুবাবু বারকয়েক ইঙ্গিতপূর্ণ গলাখাঁকারি দিলেন। তাতে কাজ হল না।

নাদুবাবু অগত্যা চুপ করে বসে করুণ চোখে দেখতে লাগলেন। লোকটার ঘুম কখন ভাঙবে তা কে জানে!

হঠাৎ লোকটা গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে বসে বলল, ওহে, তোমার দোকানে পাঁউরুটি পাওয়া যায়?

যায়, তবে ফুরিয়ে গেছে।

আহা, ফুরিয়ে গেলে ক্ষতি কী? বলছিলাম পাওয়া যায় কিনা। আমার দরকার নেই, স্রেফ কৌতূহল।

যে আজ্ঞে।

আচ্ছা, ইসবগুলের ভুসি রাখো না তুমি?

আজ্ঞে না। বাজারের মদনের দোকানে ভুসি পেয়ে যাবেন। যান না, তিন মিনিটের পথ।

আহা, ইসবগুলের ভুসি দিয়ে আমার হবেটা কী? তা তুমি খড়কে রাখো? টুথপিক?

আজ্ঞে না। গাঁ দেশে কাঠির অভাব নেই। কে পয়সা খরচ করে টুথপিক কিনতে যাবে বলুন। তবে আপনার দরকার থাকলে—

আরে না-না। খাবারই জুটছে না তো খড়কে দিয়ে কী হবে?

কথাটা শুনে নাদুবাবুর একটু কষ্ট হল। তাঁর বড়ো দয়ার শরীর। বললেন, খাওয়া হয়নি বুঝি আপনার?

লোকটা মাথা নেড়ে বলে, না হে বাপু। গত দিন দুয়েক খাদ্যবস্তুর সঙ্গে মোটে দেখাসাক্ষাৎই হচ্ছে না।

নাদুবাবু চিন্তায় পড়ে গেলেন। দু-দিনে উপোসী মানুষটাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পেট পুরে খাওয়াতে ভারি ইচ্ছে করছে। কিন্তু তাঁর বউ নবলীলা বড্ড মাথা গরম মানুষ যে! এমনিতেই তিনি নাদুবাবুকে মোটেই ভালো চোখে দেখেন না। অকারণেই ঝেড়ে কাপড় পরান। তার ওপর অসময়ে অতিথি নিয়ে গিয়ে হাজির হলে বারুদে আগুন লাগবে যে!

তাই আমতা-আমতা করে বললেন, তা ইয়ে, বিস্কুট খেয়ে দেখবেন? ভালো বিস্কুট আছে কিন্তু! কয়েকখানা খেয়ে একটু জল খাওয়ার পর খিদে জব্দ হয়ে যাবে।

লোকটা মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে বলল, বিস্কুট! ছো! ও আমি জীবনে খাইনি। বিস্কুট আর কাঠের গুঁড়োয় তফাত কী বলো তো! ওসব ফিনফিনে জিনিস আমি দু-চোখে দেখতে পারি না।

নাদুবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তাহলে আর কী করা, আমার কাছে তো বেশি নেই। এই দশটা টাকা নিয়ে যান। যা হোক কিছু কিনেটিনে খাবেন।

দশ টাকা? বলে লোকটা ভারি অরুচির সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, দশ টাকা আবার টাকা? ও তুমিই রেখে দাও।

অপ্রতিভ নাদুবাবু অগত্যা ড্রয়ার আর পকেট হাতড়ে যা পেলেন তা গুণে নিয়ে লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এই যে, কুড়িটা টাকা নিয়ে যান। আমার কাছে আর নেই কিন্তু।

লোকটা উদাস চোখে রাস্তার দিকে চেয়ে থেকে বলল, কুড়ি টাকায় কী হয় বলো তো এই বাজারে?

কিন্তু আমার আর নেই যে!

লোকটা নাদুবাবুর দিকে একঝলক তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি হেনে বলল, আহা, খুঁজে দেখতে দোষ কী? আরও তিনটে ড্রয়ারের টানা খুলে দেখোই না কিছু বেরোয় কিনা।

ওসব আমার দেখা। তবু যখন বলছেন তখন দেখছি। কিন্তু কিছু নেই, আগেই বলে রাখছি।

নাদুবাবু দ্বিতীয় ড্রয়ারটা খুলে কাগজপত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে হঠাৎ দেখলেন তিনখানা পাঁচশো টাকার নোট এক জায়গায় পড়ে আছে। তাজ্জব হয়ে টাকাটা বের করে চেয়ে রইলেন। বললেন, ও বাবা! এ তো দেখছি দেড় হাজার টাকা? কবে মনের ভুলে রেখেছিলাম কে জানে! তা আপনার কপালেই যখন পেলাম, তখন এ টাকাও আপনি নিয়ে যান।

লোকটা দেড় হাজার শুনেও তেমন উৎসাহ দেখাল না। ঠোঁট উলটে বলল, দেড় হাজার তো ফুঁয়ে উড়ে যায়। ওহে বাপু, আরও তলিয়ে দেখো। ভালো করে খুঁজলেই না তুমি। আরও দুটো ড্রয়ার তো পড়ে রইল। কোনো কাগজের ভাঁজে কী আছে তা কী বলা যায়?

নাদুবাবু তাড়াতাড়ি তৃতীয় ড্রয়ারটাও খুললেন। মেলা কাগজপত্র দিয়ে ঠাসা ড্রয়ারটা। খুঁজতে খুঁজতে পুরোনো ক্যাশমেমোর বইয়ের ফাঁক থেকে আরও হাজার দুই টাকার ন্যাতানো নোট বেরিয়ে পড়ল। নাদুবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, অশৈলী কাণ্ডই বটে! এ যে দু-হাজার টাকা! নাঃ, আপনার কপালটা ভালোই বলতে হবে।

দূর! দূর! ও আর এমনকী? আঁতিপাঁতি করে দেখো হে! দেখার চোখ থাকলে কত কী বেরিয়ে আসে!

তা, বলতে নেই, বেরোলোও। গুনে গেঁথে নাদুবাবু অবাক হয়ে দেখলেন, মোট পাঁচ হাজার। এত টাকা বহুকাল একসঙ্গে দেখেননি তিনি। একটা শ্বাস ফেলে বললেন, না মশাই, এ অবিশ্বাস্য কাণ্ড। তা আপনার কথাতেই যখন পাওয়া হল, তখন এ টাকা আপনাকেই দিচ্ছি। নিন।

লোকটা ভারি বিরাগের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে, টাকাপয়সা দিয়ে আমার হবেটা কী? আমি কি তোমার কাছে চেয়েছি নাকি?

আপনিই তো খুঁজতে বললেন!

লোকটা মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে বিরক্ত গলায় বলে, খুঁজতে বলেছি বলেই কী টাকা নিতে হবে নাকি?

আহা, আপনার খিদে পেয়েছে বলছিলেন যে!

লোকটা খিঁচিয়ে উঠে বলে, তাতে তোমার কী? আমার খিদে নিয়ে তোমায় ভাবতে বলেছে কে? পাঁচ হাজার টাকা পেয়ে খুব গুমোর হয়েছে দেখছি! আমাকে টাকা দেখাচ্ছ।

নাদুবাবু কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, আপনি রাগ করবেন না। আচ্ছা, আপনি কি অন্তর্যামী?

কোন দুঃখে অন্তর্যামী হতে যাব?

আমতা-আমতা করে নাদুবাবু বললেন, না, আপনার যা দূরদৃষ্টি দেখছি তাতে মনে হল আর কী?

লোকটা উঠে পড়ল। বলল, চারদিকে নজর রেখে চলতে হয় বাপু। আর সেই কথাটাই বলার জন্য আসা। আমার কথা হয়ে গেছে, চললুম।

বলে লোকটা দোকান থেকে বেরিয়ে হনহন করে ছুটে চলে গেল।

নাদুবাবুর চোখ গোল, মুখ হাঁ।

কিশোর ভারতী, শারদীয়া ২০০৬

সকল অধ্যায়
১.
গন্ধটা খুব সন্দেহজনক
২.
লালটেম
৩.
ইঁদারায় গণ্ডগোল
৪.
ঢেঁকুর
৫.
কোগ্রামের মধু পণ্ডিত
৬.
কৌটোর ভূত
৭.
কালীচরণের ভিটে
৮.
নয়নচাঁদ
৯.
দুই পালোয়ান
১০.
কৃপণ
১১.
টেলিফোনে
১২.
কালাচাঁদের দোকান
১৩.
মাঝি
১৪.
হর বনাম কালী
১৫.
শিবেনবাবু ভালো আছেন তো!
১৬.
পায়রাডাঙায় রাতে
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
জকপুরের হাটে
১৯.
নিশি কবরেজ
২০.
বাজিকর
২১.
দুই সেরি বাবা
২২.
দুই ভূত
২৩.
ধুলোটে কাগজ
২৪.
আগন্তুক
২৫.
আয়নার মানুষ
২৬.
একান্ন টাকা
২৭.
নিশি চৌকিদার
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
চকদিহির তেনারা
৩০.
ছায়ার লড়াই
৩১.
শ্যামলাল ভাবছে
৩২.
পটলা
৩৩.
অষ্টাঙ্গপুরের বৃত্তান্ত
৩৪.
নয়নপুরের রাস্তা
৩৫.
দুখীরাম
৩৬.
খেলা
৩৭.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৮.
পুতুলওয়ালা
৩৯.
হারু
৪০.
তেঁতুলতলায়
৪১.
পুরোনো জিনিস
৪২.
শিবেনবাবুর ইস্কুল
৪৩.
পুনার সেই হোটেল
৪৪.
নির্জন স্টেশনে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%