চকদিহির তেনারা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

শীতল তপাদার যখন মুগবেড়ের খালের ঘাটপারে পৌঁছল, তখন বেলা প্রায় তিনটে। মাঘ মাসের হাড়-কাঁপানো হাওয়া বইছে। রোদের রং লালচে মেরে গিয়েছে। বেলা আর বেশিক্ষণ নেই। ঘাটে গুটিকয় যাত্রী জড়োসড়ো হয়ে নৌকোর জন্য হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। শীতলকেও দাঁড়াতে হল।

ঝাড়া চল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর হেলেদুলে একখানা নৌকো এসে দয়া করে ভিড়লেন। নৌকোয় ওঠার আগে শীতল জিজ্ঞেস করল, 'মাঝিভাই, এই মাঝিভাই, এই নৌকো চকদিহি খেপ মারবে তো?'

মাঝি বুড়োসুড়ো মানুষ। প্রশ্নটা শুনে বিড়বিড় করে আপনমনে কী একটু বলল। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'চকদিহি যাবেন কেন?'

'সেখানেই যে আমার কাজ।'

'অ', বলে মাঝি একটু যেন ভাবনায় পড়ে গেল। তারপর বলল, 'তা কাজ থাকলে তো যেতেই হবে। উঠে পড়ুন তা হলে।'

পাঁচ-সাতটি জড়োসড়ো যাত্রী নিয়ে বড় নৌকোটা রওনা দিল। বেলা ফুরিয়ে আসছে তাড়াতাড়ি। নতুন জায়গা, অন্ধকার হয়ে গেলে অসুবিধেয় পড়তে হবে ভেবে শীতল তপাদারের একটু উদ্বেগ হচ্ছিল। সঙ্গে একটা বিছানা আর বাক্স। চাকরিতে জয়েন করতে যাচ্ছে। সেখানকার বিলি-বন্দোবস্ত তার জানা নেই।

নৌকোটো খানিকক্ষণ বাদে বাদে এ-ঘাটে ও-ঘাটে ভিড়ছিল। যাত্রীদের সবাই তিন জায়গায় নেমে যাওয়ার পর শীতল একা হল। সে আর বুড়ো মাঝি।

অলস হাতে বইঠা মারতে মারতে মাঝি বলল, 'তা চকদিহিতে কে থাকে আপনার?'

'কেউ না। এই নতুন যাচ্ছি।'

'হুঁ, তা কাজটা কীসের চকদিহিতে?'

'একটা প্রাথমিক স্কুলে পড়ানোর চাকরি।'

'তা ভালো। এই সামনেই চকদিহির ঘাট। উঠে পড়ুন।'

চকদিহির ঘাটে নৌকো ভিড়বার সময় বেশ অন্ধকার ঘনিয়ে উঠেছে। চারদিকে ঝুপসি গাছপালা, লোকজন নেই। কাছেপিঠে বাড়িঘরের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। তাকে নামিয়ে দিয়েই নৌকোখানা চটজলদি সরে পড়েছে। পথের হদিশ জিজ্ঞেস করার মতো কেউ নেই।

নিজের অবস্থাটা অনুমান করে ধাতস্থ হতে শীতলের একটু সময় লাগল। তার বাক্সে একখানা টর্চ আছে, কিন্তু এই অন্ধকারে বাক্স খুলে হাতড়ে হাতড়ে টর্চ বার করা কঠিন। সে খুব ধীরে ঘাট থেকে নাবাল বেয়ে ওপরে উঠল।

সে চার-পাঁচ দিন আগে একখানা পোস্টকার্ডে পৌঁছনোর দিন-তারিখ জানিয়ে দিয়েছিল বটে, কিন্তু চিঠিখানা যে পৌঁছেছে, তারই বা ঠিক কী? ওপরে এসে সে চারদিক চেয়ে দেখে বেশ দমেই গেল। লোকজন নেই। বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে না। কোথাও কোনো আলো চোখে পড়ছে না। সাঁঝবেলাতেই যেন মাঝরাত্তিরের মতো নিঝুম হয়ে গিয়েছে জায়গাটা। তার ওপর প্রচণ্ড শীত। শনশন করে উত্তুরে হাওয়া বইছে এবং ভয়ের কথা, চারদিকে বেশ কুয়াশাও ঘনিয়ে উঠেছে। বাক্স, বিছানা নিয়ে সে হারা-উদ্দেশে কোন দিকে রওনা হবে, সেটাই বুঝতে পারছে না। কাছেপিঠে শুধু ঘন গাছপালা আর চাপ-ধরা অন্ধকার। চকদিহি গাঁয়ের চিহ্নমাত্রও নেই। মাঝি ব্যাটা কোনো আঘাটায় নামিয়ে দিয়ে গেল কি না কে জানে! রেলস্টেশনে যেমন থাকে, ঘাটে তো আর তেমন জায়গার নাম লেখা থাকে না।

ভরসা এই, পাকা ঘাট যখন আছে, তখন কাছেপিঠে লোকবসতিও থাকতেই হবে। দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। কপাল ঠুকে সামনে একটু এগিয়ে দেখা দরকার।

শীতল সাবধানে খুব ধীরে ধীরে বাঁ বগলে বিছানা আর ডান হাতে বাক্স ঝুলিয়ে রওনা দিল। কিন্তু কুয়াশাটাও এই মওকায় এমন ঘন হয়ে এল যে, ঠাহর করে পথঘাটের কোনো হদিশ পাওয়ার উপায় রইল না। সেই রসপুর গঞ্জে একটা হালুইকরের দোকানে দু-খানা শিঙাড়া আর রসগোল্লা খেয়েছিল। সেসব কখন তল হয়ে গিয়েছে। এখন খিদেটাও চাগাড় দিচ্ছে খুব।

সে বিজ্ঞান পড়েছে। এতকাল ঈশ্বর নেই বলেই বিশ্বাস ছিল, কিন্তু বিপাকে পড়ে মনে পড়ল, তার মা খুব মদনমোহনের ভক্ত। সর্বদাই 'বাবা মদনমোহন' নামক একজন দেবতাকে কারণে-অকারণে ডাকাডাকি করে থাকেন। বংশীধারী মদনমোহনের বিভিন্ন পটও তাদের ঠাকুরঘরে রয়েছে। শীতলের মনে হল, একবার মায়ের মদনমোহনকে ডেকে দেখলে হয়। আহা, বিজ্ঞান তো আর সব রহস্যই ভেদ করতে পারেনি। বিজ্ঞানকে ছাড়িয়ে, নাগাল এড়িয়েও তো অনেক কিছু থাকতে পারে!

খুব লজ্জা আর সংকোচের সঙ্গে মদনমোহনকেই হালকা করে একটু ডাকতে চাইছিল শীতল। চারদিকে একটু চোখ বুলিয়ে চোখ বুজে সবে বলেছে, 'ম—।'

ঠিক এই সময় হেঁড়ে গলায় কাছেপিঠেই একটা হাঁক শোনা গেল, 'আহা করেন কী, করেন কী!' বলতে বলতেই দুদ্দাড় করে একটা লোক বাঁ দিক থেকে ধেয়ে এল। এই দুর্দান্ত শীতেও তার গায়ে একটা গেঞ্জি আর নিম্নাঙ্গে মালকোঁচা মারা ধুতি ছাড়া কিছু নেই।

'দিন মশাই, আমার হাতে দিন। ইশকুলের মাস্টারমশাই আপনি, মালপত্র বওয়া কি আপনার সাজে? আমরা আছি কী করতে?'

যাক বাবা, মদনমোহনকে ডাকার আগেই বিপদ উদ্ধার হয়ে গিয়েছিল বলে শীতল নিশ্চিন্দির শ্বাস ফেলে বলল, 'আমাকে নিতে এসেছেন বুঝি?'

লোকটা নির্বিকার গলায় বলে, 'আজ্ঞে না। তবে এই ঘাটের ধারে প্রায়দিনই হাওয়া খেতে আসি তো। আপনাকে দেখে মনে হল বিপদে পড়েছেন, তাই আসা। অধমের নাম নীলমণি খাসনবিশ।'

'আমি হলুম গে শীতল তপাদার, ইশকুলে...!'

'আহা, ওসব আমরা জানি। মদন মালোর নৌকোয় এলেন, সবই স্বচক্ষে দেখা।'

অন্ধকারে এবং ঘন কুয়াশায় লোকটার চেহারা বোঝার উপায় নেই। শুধু আবছা ধুতি আর গেঞ্জিটা বোঝা যাচ্ছে। খুব শক্তপোক্ত লোক সন্দেহ নেই। নইলে এই কালান্তক শীতে এই সামান্য পোশাকে হাওয়া খেতে জলের ধারে আসত না।

গলাখাঁকারি দিয়ে শীতল বলে, 'তা নীলমণিবাবু, চকদিহি জায়গা কেমন?'

'দিব্যি জায়গা মশাই, দিব্যি জায়গা। চাঁদ-সুয্যি ওঠে, গাছপালা আছে, খালধার আছে, বাঁশবন আছে, শ্মশানও আছে, গোরস্থানও আছে। আর চাই কী আপনার?'

জবাব শুনে একটু দমে গিয়ে শীতল বলল, 'তা বটে।'

খানিকক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর শীতল বলল, 'আমার থাকার ব্যবস্থা কোথায় হয়েছে তা কি জানেন?'

লোকটা হঠাৎ যেন চমকে দাঁড়িয়ে বলল, 'তাই তো, এটা তো খেয়াল হয়নি।'

'তা হলে আপনি আমাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন কোথায়?'

লোকটি খুব চিন্তিত হয়ে আমতা আমতা করে বলল, 'তাও বটে! কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছিলাম ঠিক মনে নেই। তা চলুন, বাঁশবনটা পেরিয়ে সাঁকো অবধি তো আগে আপনাকে পৌঁছে দিই। তারপর যা হোক একটা ব্যবস্থা করে নেবেন।'

শীতল ভারী হতাশ হয়ে পড়ল। সাঁকো পেরিয়েই বা সে যাবে কোথায়?

নীলমণি খাসনবিশের মাথায় একটু গন্ডগোল আছে বলেই মনে হচ্ছিল শীতলের। তাই সে আর কথা বাড়াল না। সামনেই বাঁ ধারে বিশাল বাঁশবনের আড়াল পাওয়া যাচ্ছিল। কুয়াশায় ভালো করে বোঝা যাচ্ছিল না।

নীলমণি হঠাৎ থেমে বিছানা আর বাক্স তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, 'আমি চলি আজ্ঞে। আর যাওয়ার উপায় নেই কিনা, মেলা কাজ ফেলে এসেছি।'

'গাঁ-টা কত দূর?'

'বেশি না, বেশি না। সাঁকো পেরোলে পো'টাক পথ হবে। বুক ঠুকে চলে যান।'

অন্ধকারে সাঁকোটা অনুমান করেই পেরোতে হল শীতলকে। তবে উপায়ও তো নেই। কিন্তু সাঁকো পেরিয়েও সেই একই সমস্যা। সামনে অন্ধকার আর কুয়াশা। কোনোদিকে গাঁ, কোথায় আশ্রয় বুঝবার উপায় নেই।

ফের মদনমোহনের কথা মনে এল শীতলের। এবার আর বাবা মদনমোহনকে না ডেকে উপায় নেই। সে চোখ বুজে বংশীধারীর ফোটোয় দেখা মুখ স্মরণ করে সবে বলেছে, 'ম...!'

অমনি দুই হ্যাঁচকায় তার হাত আর বগল থেকে বাক্স আর বিছানাটা কে যেন কেড়ে নিয়ে বলল, 'ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমার সঙ্গে আসুন, এগিয়ে দিচ্ছি।'

'আ...আপনি কে?'

'আমি হলুম গে পঞ্চানন হালুই। এই গাঁয়েই বাস।'

'বাঁচালেন মশাই! আপনি কি জানেন, কোথায় আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে?'

'আমার কি জানার কথা?'

'আমি ভাবছিলাম, হেডস্যার, নিশাপতিবাবুই হয়তো আপনাকে পাঠিয়েছেন আমাকে নিয়ে যেতে।'

'না মশাই, নিশাপতিবাবু আমাকে পাঠাননি। নিজের গরজেই এসে আপনার মাল বইছি।'

অন্ধকারে ঠাহর করে যা বোঝা যাচ্ছে লোকটা বেশ লম্বা আর কেঠো চেহারার। গায়ে গরম জামাও আছে বলে মনে হল।

শীতল কুণ্ঠার সঙ্গে বলল, 'সে কী? আমার মাল বইবার আপনার গরজ কীসের? দিন, ওগুলো আমার হাতেই দিন।'

'ঠিক আছে, খানিকটা এগিয়ে তো দিই।'

'আচ্ছা পঞ্চাননবাবু, এই চকদিহি কেমন গাঁ?'

'অখদ্দে মশাই, অখদ্দে। এসে যখন পড়েছেন হাড়ে হাড়ে টের পাবেন। এখানে বেঁচে সুখ নেই, মরে সুখ নেই। দিনে সুখ নেই। তা এই চকদিহি ছাড়া আর জায়গা পেলেন না?'

শীতল তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতলতর স্রোত নেমে যাচ্ছে টের পেল। গলাটা একটু ঝেড়ে বলল, 'খুব খারাপ জায়গা নাকি?'

'খুব, খুব! তবে হ্যাঁ, বেঁচে থাকার ওপর যদি ঘেন্না এসে গিয়ে থাকে, দুঃখে-কষ্টে হেদিয়ে গিয়ে মরার বাসনা যদি চাগাড় দিয়ে উঠে থাকে, তা হলে সোজা চকদিহি চলে আসুন। এখানে মরার ব্যবস্থা চমৎকার। গাছে গাছে ফাঁস লাগানো দড়ি ঝুলে আছে। গহিন পুকুর আছে, বিষগোটার গাছের জঙ্গল আছে। সাপ পাবেন, বাঘ পাবেন, কুমির পাবেন, আর খুনে গুন্ডাদের তো এটা স্বর্গরাজ্যই বলা যায়।'

শীতল শিউরে উঠে বলে, 'ওরে বাবা, চকদিহি তো সাংঘাতিক জায়গা!'

লোকটা ভারী আহ্লাদের গলায় বলল, 'তবে আর বলছি কী? চকদিহি যখন এসে পড়েছেন তখন একটা এসপার-ওসপার কিছু ঘটবেই।'

'আচ্ছা পঞ্চাননবাবু, আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছেন? এখনও তো ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে না!'

'ঘরবাড়ি! ঘরবাড়ি খুঁজছেন নাকি আপনি?'

'ঘরবাড়ি খুঁজব না তো কী? আমার যে গাঁয়ে পৌঁছনো দরকার, মাথা গুঁজবার একটা জায়গা দরকার। সারারাত হেঁটে মরতে তো আসিনি!'

'এই রে! তা হলেই তো মুশকিলে ফেললেন। আমার আবার অন্য কাজেও যেতে হবে। এই ধরুন আপনার মালপত্র, আর এগিয়ে দেখুন যদি কোনো হিল্লে হয়।'

বলেই লোকটা গায়েব হয়ে গেল। এখানকার লোকগুলোর সকলেরই কি মাথায় ছিট আছে? কী বলে আর কী করে তার কোনো ঠিক নেই। পথের মাঝখানে মালপত্র নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে শীতল ভেবেই পেল না, এবার তার কী করা উচিত?

না, নাস্তিকতা ফেলে ঠাকুর-দেবতাকে না ডাকাডাকি করে আর উপায় নেই। বিপদে-আপদেই তো ঠাকুর-দেবতাকে দরকার, তা ছাড়া আর তাঁদের কী দরকার? চোখ বুজে বাবা মদনমোহনের মূর্তিটা একবার ঝালিয়ে নিয়ে শীতল ফের যেই বলেছে, 'ম...!'

'বেঁধে! বেঁধে! আর এগোবেন না!' বলতে বলতে একটা বেঁটে মতো লোক যেন পাশের গাছ থেকেই ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ল। গদগদ গলায় বলল, 'আহা, এত তাড়াহুড়োর কী আছে? ইশকুলের নতুন মাস্টারমশাই তো আপনি! শীতল তপাদার তো?'

'যে আজ্ঞে।'

'চলুন। এগিয়ে দিচ্ছি।'

শীতল এবার ভারী বিরক্ত হয়ে বলে, 'এগিয়ে দেওয়ার নিকুচি করেছে। এগিয়ে দেবেন মানে? এগিয়ে দিলেই হল? বলি যমের দক্ষিণ দোরেই যে এগিয়ে দেবেন না তা কী করে বুঝব বলুন তো? আর দুজনও তো এগিয়ে দিলেন। কিন্তু কোথায় এগিয়ে দিলেন তাই তো বুঝতে পারলুম না। কিন্তু আপনি কে?'

ভারী মিঠে গলায় লোকটি বলে, 'আজ্ঞে, আমি হলুম গে নরহরি পতিতুগু। এ গাঁয়ে বহুকালের বাস। যা হয়রান হতে হল আপনাকে। তা দিন, মালপত্র বয়ে আমিই নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে।'

শীতল মাথা নেড়ে বলে, 'না মশাই, শুধু নিয়ে গেলেই হবে না। জায়গামতো পৌঁছেও দিতে হবে।'

'আজ্ঞে, সে তো বটেই। তা জায়গামতো আপনি একরকম পৌঁছেই গিয়েছেন বলে ধরে নিতে পারেন। কাছেপিঠেই চকদিহি। শুধু ডাইনির জলাটা পেরোতে পারলেই হল।'

শীতল অবাক হয়ে বলে, 'চকদিহি এখনও পৌঁছইনি। বলেন কী মশাই? এই যে নীলমণি খাসনবিশ আর পঞ্চানন হালুই বলে দুটো লোক বলল, চকদিহি পৌঁছে গিয়েছি।'

'ওদের কথা ধরবেন না। মুখ্যুসুখ্যু চাষাভুষো লোক সব। ওরা চকদিহির ঘাঁতঘোঁত জানবে কী করে?'

'তা চকদিহির ঘাঁতঘোঁতটা কী একটু বুঝিয়ে বলবেন?'

'অহো, ওসব তড়িঘড়ি জানবার দরকারটাই বা কী আপনার? যদি টিকে থাকতে পারেন তা হলে দেখবেন চকদিহি ভারী সরেস জায়গা। মঙ্গলবারের হাটে ভারী সস্তায় ছুরি, ভোজালি, তলোয়ার, চপার কিনতে পারবেন। হারু মুতসুদ্দির কাছে পিস্তল-বন্দুকও পেয়ে যাবেন। সতু কপালির কাছে বোমা-বারুদ সের দরে কেনা যায়।'

শীতল চটে উঠে বলে, 'ওসবে আমার কী দরকার বলুন তো। এ তো ভারী অদ্ভুত জায়গা!'

'তা যা বলেছেন! চকদিহির মঙ্গলাহাটের খুব নাম। জায়গা মন্দ নয়, তবে ওই রোজই দু-চারটে লাশ পড়ে আর কী! ওই সব ছোটখাটো ব্যাপার গেরাহ্যি না করলে চকদিহি ভারী সরেস জায়গা।'

'চকদিহির কথা যতই শুনছি, ততই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে মশাই। কিন্তু এসে যখন পড়েছি তখন নিরুপায়। বলি, এখানে মাথা গোঁজার মতো একটা জায়গা পাওয়া যাবে কি নরহরিবাবু?'

'কী যে বলেন! মাথা গোঁজার জায়গার অভাব কী? চারদিকেই মাথা গোঁজার জায়গা। আমি তো শ্মশানেশ্বরী কালীর থানে হাঁড়িকাঠেও অনেক সময় মাথা গুঁজে পড়ে থাকি!'

'সব্বোনাশ! হাঁড়িকাঠে মাথা দিয়ে শুতে হবে নাকি?'

'আরে না না। আপনার জন্যে বোধ হয় একটু ভালো ব্যবস্থাই আছে।'

'আপনার কথার মাথামুণ্ডু বুঝে ওঠাই মুশকিল দেখছি। তা বলুন মশাই, কোথায় নিয়ে যাবেন। বেঘোরে প্রাণটাই না যায়।'

'আজ্ঞে, প্রাণ খুব মজবুত জিনিস, সহজে যাওয়ার নয়।'

লোকটা বাক্স-বিছানা নিয়ে আগু হল, পিছনে শীতল। চোর, ডাকাত না খুনে তা বুঝতে পারছে না শীতল। কিন্তু আর তো কোনো উপায়ও নেই।

অন্ধকারে কী একটা দেখিয়ে যেন লোকটা বলল, 'এই যে ডান ধারে ডাইনির জলা দেখতে পাচ্ছেন তো?'

'না, অন্ধকারে দেখব কী করে?'

'তা-ও ঘটে। কথাটা খেয়াল ছিল না। এ খুব প্রাণঘাতী জায়গা মশাই। বিস্তর লোক আত্মহত্যা করেছে। বিস্তর লোককে চুবিয়ে মারা হয়েছে। বিস্তর মানুষকে কেটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রায় রোজই এই জলায় বস্তাবন্দি লাশ ভুস করে ভেসে ওঠে।'

'বাপ রে!'

'ভয় পেলেন নাকি? থাকুন ক-দিন চেপে, সব-গা-সওয়া হয়ে যাবে। চকদিহিতে থাকলে খুন-জখম কোনো ব্যাপারই নয়।'

'বুঝেছি, এখানে এসে বড় ভুল করে ফেলেছি মনে হচ্ছে। তা আপনি চললেন কোথায়?'

'সেইটেই তো আমিও বুঝতে পারছি না। ওই যে দেখছেন বটগাছ, ওর পিছনেই চকদিহি। আমি ওই পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছি আপনাকে। তারপর আপনার কপাল।'

'মানে। এই বললেন জায়গামতো পৌঁছে দেবেন।'

'আজ্ঞে, ঠিকই বলেছি। বটতলাই সেই জায়গা, আমার কি বিষয়-কর্ম নেই নাকি মশাই?'

দেখা যাচ্ছে নরহরি পতিতুগুও বিশেষ সুস্থ মগজের মানুষ নয়। বটতলার ঘুপসি অন্ধকারে তার মালপত্র নামিয়ে দিয়ে বিনা সম্ভাষণে হঠাৎ কেটে পড়ল। লোকগুলো কেনই বা বেগার খাটছে আর ঘুরিয়ে মারছে, তা একটুও বুঝতে পারল না শীতল।

নাঃ মদনমোহনকে ডাকাডাকি না করলেই আর নয়। তিন-তিনবার ডাকতে গিয়ে বাধা পড়েছে, কিন্তু এবার সে ডাকবেই। মনস্থির করে শীতল বুক ভরে দম নিয়ে সবে শুরু করতে যাবে, ঠিক এমন সময়, 'আহা দাঁড়ান, আমি এসে গিয়েছি তো!' বলতে বলতে মাঝারি চেহারার একটা লোক এসে শশব্যস্তে তার বাক্স-বিছানা তুলে নিয়ে বলে, 'ইস, খুব হয়রানি হয়েছে তো আপনার!'

শীতল গম্ভীর হয়ে বলে, 'আপনি কে?'

'অধমের নাম পীতাম্বর মিস্ত্রি।'

'শুনুন মশাই, তিন-তিনটে পাগলের পাল্লায় পড়ে আমি তখন থেকে ঘুরে মরছি। আমারও খিদে-তেষ্টা আছে। আমি আর বেঘোরে ঘুরতে পারব না।'

'সে তো বটেই। তবে কিনা চকদিহি গাঁখানাও আপনার দেখা হয়ে গেল, ঠিক কি না বলুন?'

'শুনুন পীতাম্বর, এই শীতে অন্ধকার আর কুয়াশার মধ্যে খিদেতেষ্টা চেপে চকদিহি গাঁ দেখার কোনো শখই আমার নেই। এবার স্পষ্ট করে বলুন তো, আপনার মতলবখানা কী! দয়া করে আমার বাক্স আর বিছানা নামিয়ে রাখুন।'

পীতাম্বর বোধ হয় ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে মাথা চুলকে নিল। তারপর বলল, 'হেঁ হেঁ, মতলব খুব একটা খারাপ ছিল আজ্ঞে। তবে বৃদ্ধির দোষে অনেক সময় ভালো করতে গিয়ে মন্দও হয়ে পড়ে কিনা।'

শীতলের খিদে পেলে মাথা ভালো কাজ করে। বরাবর খিদের মুখে সে শক্ত শক্ত অঙ্ক টক করে কষে ফেলে এসেছে। তাই খিদে চাগাড় দেওয়ায় তার চড়াক করে একটা কথা মনে পড়ে গেল। যতবার সে বাবা মদনমোহনের নাম করতে গিয়েছে, ততবারই হয় নীলমণি খাসনবিশ, নয় পঞ্চানন হালুই, না হয় তো নরহরি পতিতুগু এবং পীতাম্বর মিস্ত্রি এসে বাধা দিয়ে হামলে পড়েছে। সুতরাং এর মধ্যেই একটা প্যাঁচ থাকার সম্ভাবনা। সে গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, 'শুনুন পীতাম্বরবাবু, আপনি বা আপনারা আসলে কে তা আমার জানা নেই। আপনাদের মতলব কী তাও বুঝতে পারছি না। কিন্তু এবার আমি আমার মায়ের ইষ্টদেবতাকে না ডেকে ছাড়ছি না। জয় বাবা ম—।'

পীতাম্বর আঁতকে উঠে বলল, 'বলছি! বলছি! আমাদের মনিষ্যির মধ্যে গণ্য না করলেও চলবে। তবে আমরা তেমন খারাপ চরিত্তির নয় মশাই শীতল তপাদার। ইশকুলে যে পোস্টে আপনি বহাল হলেন, সেই পোস্টেই মৃগেনবাবুর ছেলে গঙ্গাপদর বহাল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চাকরিটা আপনার বরাতে জুটে যাওয়ায় মৃগেনবাবু রেগে টং। তিনি হলেন চকদিহির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। হাতে মাথা কাটেন। অপমানটা তাঁর হজম হয়নি। তাই ঠিক করে রেখেছিলেন, আপনি গাঁয়ে পা রাখলেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবেন। সেই মতলবে পাঁচু আর গদাইকে বটতলায় মজুতও রেখেছিলেন। লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা ছিল।'

'ওরে বাবা! একটা চাকরির জন্যে খুন!'

তবে আর বলছি কী? ঘোরাঘুরিটা সেই জন্য করাতে হল কি না।'

'তো মশই, আপনারা কারা?'

'হেঁ হেঁ, সে আর আপনার শুনে দরকার নেই। ওই যে বিশ কদম দূরে বনবিহারীবাবুর বাড়ি। ওখানেই আপনার বাসা ঠিক হয়েছে। চলুন, গরম জল থেকে গরম ভাত সবই তৈরি আছে। গেলেই হয়।'

খুব চিন্তিতভাবে শীতল বনবিহারীর বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে দাওয়ায় উঠে হঠাৎ বললে, 'আচ্ছা, বাবা মদনমোহনকে আপনাদের এত ভয় কেন বলুন তো?'

বলেই হাঁ হয়ে গেল শীতল। চোখের সামনে থেকে জলজীয়ন্ত লোকটা যেন ফুস করে বাতাসে মিলিয়ে গেল। দাওয়ার ওপর তার বাক্স আর বিছানাটা পড়ে আছে শুধু।

আনন্দমেলা, ২০ মার্চ ২০১১

সকল অধ্যায়
১.
গন্ধটা খুব সন্দেহজনক
২.
লালটেম
৩.
ইঁদারায় গণ্ডগোল
৪.
ঢেঁকুর
৫.
কোগ্রামের মধু পণ্ডিত
৬.
কৌটোর ভূত
৭.
কালীচরণের ভিটে
৮.
নয়নচাঁদ
৯.
দুই পালোয়ান
১০.
কৃপণ
১১.
টেলিফোনে
১২.
কালাচাঁদের দোকান
১৩.
মাঝি
১৪.
হর বনাম কালী
১৫.
শিবেনবাবু ভালো আছেন তো!
১৬.
পায়রাডাঙায় রাতে
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
জকপুরের হাটে
১৯.
নিশি কবরেজ
২০.
বাজিকর
২১.
দুই সেরি বাবা
২২.
দুই ভূত
২৩.
ধুলোটে কাগজ
২৪.
আগন্তুক
২৫.
আয়নার মানুষ
২৬.
একান্ন টাকা
২৭.
নিশি চৌকিদার
২৮.
সেই বুড়ো লোকটা
২৯.
চকদিহির তেনারা
৩০.
ছায়ার লড়াই
৩১.
শ্যামলাল ভাবছে
৩২.
পটলা
৩৩.
অষ্টাঙ্গপুরের বৃত্তান্ত
৩৪.
নয়নপুরের রাস্তা
৩৫.
দুখীরাম
৩৬.
খেলা
৩৭.
ভগবানের সঙ্গে দেখা
৩৮.
পুতুলওয়ালা
৩৯.
হারু
৪০.
তেঁতুলতলায়
৪১.
পুরোনো জিনিস
৪২.
শিবেনবাবুর ইস্কুল
৪৩.
পুনার সেই হোটেল
৪৪.
নির্জন স্টেশনে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%