শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
খাঁদু মল্লিকের কাছে মদন বৈরাগীর একান্ন টাকা ধার ছিল। দেখতে-না-দেখতে ছ-মাস কেটে গেছে। টাকাটা এখনও মদনের জোগাড় হয়নি। খাঁদুর সুদ খুব চড়া। দু-মাস আগে নফরগঞ্জে শুনে এসেছিল, একান্ন টাকা নাকি চার মাসে সুদে-আসলে তিরাশি টাকা পঞ্চাশ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। কত হারে সুদ সেটা মদনের ধারণাও নেই। অঙ্কের নামগন্ধ সে জানে না, সুদকষা দূরে থাক। যাই হোক খাঁদু মল্লিকের টাকাটা কিছুতেই শুধে উঠতে পারছে না সে। দশ টাকা রোজগার হলে ন-টাকা খরচ। একান্ন টাকা দু-মাস আগে তিরাশি টাকা পঞ্চাশ পয়সায় দাঁড়িয়েছিল বটে, কিন্তু গত দু-মাসে খাঁদু তাকে কোথায় ঠেলে তুলেছে কে জানে।
নফরগঞ্জ থেকে পির নসিবপুর মোটে দু-মাইল রাস্তা। মদন নফরগঞ্জে গেলে যেমন খাঁদুর খবর পায়, তেমনি খাঁদুর কাছেও খবর পৌঁছে যায়। মদন ভয়ে আর পির নসিবপুরের রাস্তা মাড়ায় না বটে, কিন্তু সে জানে, গা-ঢাকা দিয়ে বেশিদিন খাঁদুর হাত থেকে বাঁচা যাবে না।
নফরগঞ্জের আটাচাক্কির পিয়ারী নস্কর মদনকে চক্রবৃদ্ধি সুদ জিনিসটা কী তা দুপুরবেলায় বোঝাচ্ছিল। মদন ব্যাপারটা পরিষ্কার বুঝল না বটে, কিন্তু ব্যাপারটা যে ঘোরালো হয়ে উঠছে তার একটা আন্দাজ হল। ধূপ বেচে তার গোটা বিশেক টাকা নিট মুনাফা হয়েছে, কিন্তু পিয়ারী বলল, একটু একটু করে দিয়ে কোনো লাভ নেই। ওতে আরও সুদটা তেড়েফুঁড়ে ওঠে। পারো তো বাপু গোটাটাই একদিন ঝপ করে ফেলে দাও।
মদন ভাবিত হল। কারও কারও কাছে একান্ন টাকা মোটে টাকাই নয় বটে, কিন্তু ধূপ আর ধূপকাঠি বেচে মদনের যা আয় হয় সেই হিসেবে একান্ন টাকা পর্বতের সমান।
অঘোর মান্না মদনের কাছ থেকে পাঁচ প্যাকেট 'চন্দন শলাকা' নিল। অঘোর বেশ লোক, নগদানগদি মিটিয়ে দেয়, ঘোরায় না। বলল, তা তোর সুদে-আসলে শুনলুম একশো ছাড়িয়েছে। পরশু খাঁদু এসেছিল আলকাতরা কিনতে। তখনই কথা হল।
মদনের বয়স এই সাতাশ পুরল। তবু কথাটা শুনে নিজেকে ভারি জবুথবু বুড়ো মানুষ বলে মনে হচ্ছিল তার। একটা দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়ে গেল তার। দুনিয়ার খেল বোঝা দুষ্কর। একান্ন যে কোন মন্তরে একশো ছাড়িয়ে গেল কে জানে।
একান্নটা টাকা যে মানুষের কতবড়ো শত্তুর হতে পারে তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মদন। রাতে খারাপ স্বপ্ন দেখছে, মাঝে মাঝে বুকটা ধকধক করে উঠছে, জিব শুকোচ্ছে।
নফরগঞ্জে আজ হাটবার। গাঁ-গঞ্জ থেকে হাট প্রায় উঠেই যাচ্ছে। ময়রাদিঘির হাট বিখ্যাত ছিল। এখন পাকা বাজার হওয়ার পর থেকে হাট বসছে না। বসবেই বা কোথায়? ফাঁকা মাঠ ভরাট হয়ে বাড়িঘর উঠে পড়ছে। চারদিকেই বেশ উন্নতির লক্ষণ দেখছে মদন, শুধু তারই তেমন কিছু হয়ে উঠছে না। নোনাপুকুর গাঁয়ে তার একখানা পৈতৃক ভদ্রাসন আছে মাত্র। টিনের ঘর দু-খানা, একটা দাওয়া, একচিলতে উঠোন। মা-বাবা পটল তুলেছে কবেই, একাবোকা মদনই ভিটে কামড়ে পড়ে আছে। তিন কুলে আর কারও খবর জানা নেই তার। কেউ তার খবরও কস্মিনকালে নেয় না। লেখাপড়া একটু শিখেছিল, অঙ্কের জন্যই উঁচু ক্লাসে উঠতে পারল না। দু-এক ক্লাস উঁচুতে উঠেই দেখেছে, অঙ্ক যেন বনবেড়াল থেকে হালুম-বাঘা হয়ে উঠছে। লেখাপড়া করতে হলে পিছনে হুড়ো দেওয়ার কাউকে চাই। তা সেরকম কেউ তো ছিল না তার যে, তাড়ন-পীড়ন করে বা বাবা-বাছা বলে পড়তে বসাবে।
হাটে আজ ভিড় মন্দ হয়নি। মেলা ব্যাপারি, মেলা খদ্দের। মদন তার দু-খানা হাতব্যাগে নিয়ে হাটের ধারে বটতলায় বসে গেল। পাশেই সেফটিপিন-চিরুনি-বোতাম- ডটপেনওয়ালা সতু শীট। ওপাশে কুড়ি টাকায় এক সেট ঘড়ি-লাইটার-চিরুনি পেনসিল টর্চওয়ালা পটলডাঙার হরিশ পাল। ওদের তবু খদ্দের আছে। মদন প্লাস্টিকের সবুজ চাদরটা পেতে ধূপকাঠি আর ধূপের প্যাকেট সাজাতে লাগল।
হরিশ বিক্রিবাটার মাঝখানেই বলল, একজন বুড়ো মানুষ তোর খোঁজ করছিল রে মদনা? খিটকেলে বুড়ো।
মদন হাসল। কে খিটকেলে নয় বাবা! দু-টাকা চার টাকায় সস্তা মাল কিনবে, তায় আবার নানা বায়নাক্কা। কিন্তু ব্যবসা করতে গেলে ওসব সয়ে নিতে হয়।

তার চন্দন শলাকা আর রানি ধূপ মন্দ বিকোয় না। চন্দন শলাকাটা সে নিজেই বানায়। বাকিগুলো পাইকারের কাছে কেনে। নোনাপুকুরের ধীরেন গোঁসাইয়ের সুগন্ধি ওয়ার্কস-এর মালও আছে কয়েক রকমের। দোকান খুলতেই আজ চার প্যাকেট মশার ধূপ, পাঁচ প্যাকেট চন্দন শলাকা বিক্রি হয়ে গেল। বউনি খারাপ হয়নি, কিন্তু এই বিক্রিবাটায় পেটটা হয়তো চালিয়ে নেওয়া যায়, খাঁদু মল্লিকের চক্রবৃদ্ধির সুদ মেটানো কী ইহজন্মে সম্ভব?
খিটকেলে বুড়োটা এল। গায়ে গেরুয়া পাঞ্জাবি, হেঁটো ধুতি, পায়ে হাওয়াই।
এই যে বাপু, তুমি বলেছিলে, ধূপ পছন্দ না হলে পয়সা ফেরত।
মদন বলে, সে তো ঠিক কথা।
এই যে রাতের রানি ধূপকাঠি দিয়েছ, পাঁচ টাকায় কেনা, এর গন্ধে বাড়িতে টেঁকা যাচ্ছে না। দুটো কাঠি কিন্তু খরচা হয়েছে।
মদন অম্লান মুখে বলল, তাতে কী? দিন, ফেরত নিচ্ছি।
পুরো পয়সা ফেরত পেয়ে বুড়োটা যেন একটু হতভম্ব হয়ে গেল। পয়সা হাতে নিয়ে হাঁ করে একটু তাকিয়ে রইল মদনের দিকে। তারপর অবাক ভাবটা গিলে একটু দোনোমোনো করে হাটবাগে হাঁটা দিল।
সতু শীট বলল, এরকম পয়সা ফেরত দিস বলে ব্যবসা লাটে উঠছে তোর। পয়সা ফেরত না দিয়ে অন্য কোনো ব্র্যান্ড গছাতে পারিস তো!
আরে না। ওসব করলে লোকে খুশি হয় না।
খুশির যা নমুনা দেখছি!
যে যাই বলুক মদন তার নিয়ম মেনেই চলে। পছন্দ না হলে পয়সা ফেরত কবুল করেও খদ্দেরকে ঘোরানো সে পছন্দ করে না। বলতে নেই, ফেরত-এর কেস তার খুব কমই হয়।
বিষ্ণুপদ মণ্ডল পয়সাওলা লোক। নজরও উঁচু। বটতলার হকারদের কাছ থেকে জিনিস কেনার পাত্রই নয়। আজ কী ভেবে কে জানে, বটতলায় দাঁড়িয়ে গেল। তারপর মদনের কাছেই এগিয়ে এসে বলল, তোমার না চন্দন শলাকা বলে একটা ধূপকাঠি আছে?
মদন সন্ত্রস্ত হয়ে বলল, আজ্ঞে আছে। আমার নিজের তৈরি।
বটে! ভালো ভালো। সেদিন আমার চাকর শশী নিয়ে গিয়েছিল এক প্যাকেট। আমার গিন্নির সেটা খুব পছন্দ হয়েছে। তা কয় প্যাকেট এনেছ?
তা অনেক আছে, বিশ-পঁচিশ প্যাকেট।
দিয়ে দাও।
বিস্মিত মদন বলে, সব ক-টা?
হ্যাঁ। সব ক-টা। কত করে প্যাকেট?
এমনিতে চার টাকা। তবে একসঙ্গে পাঁচ প্যাকেট নিলে সাড়ে তিন টাকা।
কনসেশন লাগবে না। চার টাকা করেই দেব। পরের বার আরও একটু বেশি করে এনো। আমার সুধা স্টোর্সে রাখব'খন। আর একটা কথা বাপু, জিনিসের দাম কম করলেই যে বিক্রি হবে তা কিন্তু নয়। আজকাল লোকের পকেটে পয়সা এসেছে। কম দামের জিনিস লোকে সন্দেহের চোখে দেখে। প্যাকেজিংটা ভালো কোরো, তাহলে লোকে নেড়েচেড়ে দেখবে। দেখতে ম্যাড়ম্যাড়ে হলে লোকে ছুঁতে চায় না।
একসঙ্গে সাতাশ প্যাকেট চন্দন শলাকা বেচে মদন একটু থতমতই খেয়ে গেল। টাকাও হল মন্দ নয়। এই ধূপকাঠিটা সে নিজে হাতে যত্ন করে তৈরি করে। লাভ তাতে বেশিই হয়। প্যাকেটে দু-টাকার মতো। হিসেব করলে শুধু চন্দন শলাকাতেই তার নিট লাভ চুয়ান্ন টাকা।
সতু বলল, হাঁ করে ভাবছিস কী?
ভাবছি, আজ একটু শিঙাড়া-জিলিপি খাব।
সতু হাসল, বড়ো খদ্দের বরাত দিয়ে গেল বুঝি?
বাপ রে! বিষ্ণুপদ মণ্ডল বলে কথা!
দ্যাখ, কতদিন নেয়। তবে তুই তো বোকা। চার টাকায় ছাড়লি। বিষ্ণুপদ কম করেও দশ টাকা প্যাকেট বিক্রি করবে। খোঁজ নিয়ে দেখিস।
তা মদনের আজ জিলিপি-শিঙাড়াও হল। এখন খাঁদু মল্লিকের শোধ হলেই হয়। ওটা গলার কাঁটা হয়ে আছে।
দিনান্তে মোট পঁচাত্তর টাকা নাফা হল মদনের। একটু আশার আলো দেখতে পাচ্ছে সে। বিষ্ণুপদ যদি চন্দন শলাকা নিয়মিত নেয় তাহলে সে মালমশলা কিনে একটু বেশি মাল তৈরি করতে শুরু করবে। খাঁদু মল্লিকের ধারটা শোধ হলেই সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারে। ওই ধারটা তার গলার কাঁটা হয়ে আছে।
জিনিসপত্তর ব্যাগে ভরে প্লাস্টিকের চাদরটা গুটিয়ে উঠতে যাচ্ছে মদন, ঠিক এমন সময় সেই খিটকেলে বুড়োটা এল। মুখে একটু হাসি।
মদন ভদ্রতা করে বলল, কিছু বলবেন?
বুড়ো মানুষটা একটু আমতা আমতা করে বলল, বলছিলাম কী, দোকানদারদের সঙ্গে আমি এই বুড়ো বয়সে আর পেরে উঠি না বাবা। বয়স হয়েছে তো, কেনাকাটা করতে গিয়ে ভুলভ্রান্তি হয়। বাড়িতে ফিরে বকুনি খাই। জিনিস ফেরত দিতে এলে দোকানদাররা বড্ড মুখঝামটা দেয়, দাঁত খিঁচোয়। একমাত্র তুমিই দেখলাম, হাসিমুখে ভাঙা প্যাকেট ফেরত নিয়ে পুরো পয়সা ফেরত দিলে।
ও কিছু নয় মশাই, খদ্দের হল লক্ষ্মী। পারতপক্ষে তাদের চটাতে নেই।
সে আর ক-জন বোঝে বলো! তা তুমি থাকো কোথায় বাপু?
আমার বাড়ি সেই নোনাপুকুর। বাসে গেলে ধোকরহাটিতে নেমে দু-মাইল হাঁটা পথ।
বাড়িতে কে আছে?
আজ্ঞে হাওয়া-বাতাস ছাড়া আর কেউ নেই।
বুড়ো লোকটা গম্ভীর হয়ে বলে, তা হাওয়া-বাতাসই বা খারাপ কী? সেও ফ্যালনা জিনিস নয়। বিনি-মাগনা পাওয়া যায় বলে কদর নেই।
মদন ঘাড় কাত করে বলে, তা বটে।
তা বাপু, আজ লাভটা কীরকম হল?
মদন একগাল হেসে বলে, তা মশাই, মোট পঁচাত্তর টাকা হয়েছে। একদিনে প্রায় সাতদিনের রোজগার। ভাসাভাসি কাণ্ড যাকে বলে।
তুমি লোকটা তো খারাপ নও। লাভ আরও হবে। ধারটাও শোধ হয়ে যাবে।
মদন অবাক হয়ে বলে, ধার! কোন ধারের কথা বলছেন?
লোকটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে, বুড়ো মানুষের কথা ধোরো না বাবা। উলটোপালটা বলে ফেলি। ধারকর্জ নেই তো?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মদন বলে, আছে মশাই, একান্ন টাকা নাকি সুদে-আসলে একশো দাঁড়িয়েছে।
একশো সতেরো টাকা।
অ্যাঁ! আপনি জানলেন কী করে?
আমি! না আমি জানি না কিছু। এইরকমই কী যেন বাতাসে শুনতে পেলাম। মাস গেলে একশো বিয়াল্লিশে দাঁড়াবে।
মদনের একগাল মাছি। বলে কী লোকটা?
লোকটা ভারি আনমনে অন্যদিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল, শোধ হয়ে গেলেও তারপরও অনেক থাকবে। শুধু নিজেকে ভুলে যেয়ো না।
চোখের পলকে লোকটা ভাঙা হাটের ভিড়ের মধ্যে মিশে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল।
মদন ভারি অবাক হয়ে ভাবতে ভাবতে বাস ধরে বাড়ি ফিরল।
কিন্তু তিন মাসের মধ্যে খাঁদু মল্লিকের ধার শোধ হয়ে হাজার পাঁচেক টাকা মূলধন দাঁড়াল মদনের। চন্দন শলাকা ছাড়াও সে কস্তুরী শলাকা, যূথিকা শলাকা, গোলাপ শলাকা, মল্লিকা শলাকা বের করেছে। মাল বাজারে পড়তে পায় না। দেদার বিক্রি। চারজন কর্মচারী রাখতে হল তাকে। ভাসাভাসি কাণ্ডই বটে। ফিরি করতে হয় না, বাড়ি থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে আজকাল।
শুধু মাঝে মাঝে বুড়ো মানুষটার কথা মনে হয় তার। নিজেকে ভুলতে বারণ করেছিল। মদন বিড়বিড় করে বলে, না বাবা, ভুলব না। ভুলব না।
শুকতারা, শারদীয়া ২০০৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন