সৌভিক চক্রবর্তী

পাঁচ শতাব্দি আগে যখন স্প্যানিশ দেশত্যাগীরা তাদের ক্লান্ত ঘোড়া আর ক্রান্তীয় সূর্যের তাপে গরম হয়ে ওঠা বর্মচর্ম পরে কুইনানোরার উপকূলে এসে হাজির হয়, সেখানে তখন স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের বসবাসের কয়েক হাজার বছর পেরিয়েছে। কনকুইস্তাদররা নতুন ‘আবিষ্কৃত’ দেশে তাদের রাজার পতাকা ওড়াল, তার মাটিতে ক্রুশ পুঁতল আর জায়গাটার নাম রাখল সান জেরেনিমো।
এলাকার মূল বাসিন্দাদের জিভে অবশ্য সে নাম উচ্চারণ করা দুষ্কর ছিল। তারা অবাক হয়ে দাড়িওয়ালা বিজাতীয় লোকগুলোকে দেখত। সারা দুনিয়ায় এরা লোহা আর বারুদের বজ্র হাতে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ তাদের রুখতে পারে না।
এখানকার ইন্ডিয়ানরা অতি প্রাচীন। সৃষ্টির শুরু থেকেই তারা এইখানে থেকে এসেছে। তারা বড়ো গরিব। যুদ্ধটুদ্ধও জানে না একেবারে। অতএব শিগগিরই তাদের দুঃখের দিন শুরু হল। কয়েক বছরের মধ্যেই, নতুন দেবতার ভিত পোক্ত করবার জন্যে নিত্যনতুন অত্যাচার আর অজানা সব রোগভোগে যখন তাদের গ্রামগুলো উজাড় হয়ে যেতে বসল, তখন বাকিরা পালিয়ে গেল গভীর জঙ্গলে। আর এইভাবেই, হারিয়ে গেল মানুষগুলো। তাদের নামটাও হারিয়ে গেল চিরতরে।
কিন্তু তার পরেও তারা শতাব্দির পর শতাব্দি বেঁচে রইল ঘন জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে, ফিসফিসিয়ে কথা বলে আর রাতের অন্ধকারের আড়ালে জীবনধারণ করে। লুকোবার ব্যাপারে তাদের দক্ষতা এমন পর্যায়ে উঠেছিল যে এমনকী ইতিহাসও তাদের ভুলে গেল। আজও, তারা যে বেঁচে ছিল তার কোন প্রমাণ নেই পণ্ডিতদের হাতে।
ইতিহাসের বইতে তাদের নাম নেই বটে, কিন্তু বনের ধারে যেসব চাষাভুষো মানুষের বাস, তারা কিন্তু তাদের কথা জানে। কোনো কুমারী মেয়ে যখন গর্ভবতী হয়ে পড়ে কিন্তু প্রেমিকটিকে খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন তারা বলে এ কোনো কামুক ইন্ডিয়ানের আত্মার কাজ। এই মানুষদের শিরায় ইংরেজ জলদস্যু, স্প্যানিশ সৈনিক, আফ্রিকান দাস, এল ডোরাডোর খোঁজে আসা অভিযাত্রী –সেই সবার রক্তই বইছে। তার সঙ্গে এমনভাবে অরণ্যের সেই অদৃশ্য উপদেবতাদের রক্তের দু-এক ফোঁটা মিশলে তাকে তারা গর্বের বলেই মনে করে।
তারপর তো অনেক বছর কেটে গেল। আমাদের দেশ যত কফি, কোকো, কলা উৎপাদন করে তার সব খেল ইউরোপ, কিন্তু আমাদের মানুষগুলো যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে গেল। তারপর হঠাৎ একদিন বদল এল। একজন কালো মানুষ জমি খুঁড়তে গিয়ে একটু বেশি গর্ত করতেই মাটির ভেতর থেকে তার চোখেমুখে ছিটকে এল খনিজ তেলের ধারা। গ্রেট ওয়ারের শেষাশেষি দেখা গেল লোকজন বলছে আমরা বেশ বড়োলোকের দেশ। তবে দেশের বেশির ভাগ লোকেরই তখনো নুন আনতে পান্তা ফুরোয় দশা। তেলবেচা সম্পত্তি গিয়ে ঢোকে আমাদের ‘আজীবন প্রেসিডেন্ট’ আর তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের ঘরে। কবে তার থেকে দু’ফোঁটা উপচে পড়বে তাদের হাতে সেই আশায় লোকজন বসে থাকে। আমাদের আজীবন প্রেসিডেন্ট কডিলো নামের মানুষটি ভারী কড়া। তাঁর গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের নিয়মকানুন তাঁর হৃদয়ের মতই কঠিন। বিদ্রোহ-টিদ্রোহের হাওয়া উঠলে দেশের মঙ্গলের জন্যই তিনি তা বেজায় কড়া হাতে দমন করে থাকেন।
তবে হ্যাঁ, রাজধানীতে উন্নতির শেষ নেই। মোটরগাড়ি, সিনেমাহল, আইসক্রিমের দোকান, থিয়েটারে নিউ ইয়র্ক আর প্যারিসের নাটক, কিছুরই অভাব নেই। প্রতিদিন বন্দরে এক ডজন করে জাহাজ আসে যায়, নানান খাসা জিনিসপত্র উগড়ে দেয় আর পেট ভর্তি তেল নিয়ে ফিরে যায় যার যার দুনিয়ায়। বাকি দেশটা ঘুমিয়েই থাকে। সে থাক।
একদিন সান জেরেনিমোর লোকজনের দুপুরের ঘুম ভেঙে গেল ভয়ানক শোরগোলের শব্দে। রেলের লাইন পাতা হচ্ছে সেখানে। কেন? কারণ প্রেসিডেন্ট এইখানে ইউরোপের রাজারাজরাদের মতন একটা সামার প্যালেস বানাবেন কিনা, তাই রাজধানী থেকে এই অবধি একখানা রেললাইন পাতা দরকার। অবশ্য এদেশে সারাবছর ধরেই যা গরম, তাতে গ্রীষ্মকাল আর শীতকালে তফাতটা কোথায় তা কেউ জানে না, কিন্তু তাতে কী? বেলজিয়ামের এক প্রকৃতিবিদ সান জেরেনিমো দেখে গিয়ে যে বইটা লিখেছেন তাতে বলা আছে, এ হল দুনিয়ার সেরা জায়গা, পৃথিবীর বুকে স্বর্গ। আর তারপরেই এক ইটালিয়ান স্থপতি এখানে গড়বার জন্য একখানা ভিলার নকশা বানিয়ে নিয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে হাজির হয়েছেন। সে ভিলায় থাকবে অগণিত পিলার, লম্বা লম্বা প্যাসেজ, আঁকাবাঁকা সিঁড়ি, আর্চ, ডোম, সালঁ, রান্নাঘর, তিরিশটা সোনারুপোর কলওয়ালা বাথটাব আরো অনেককিছু। তা সেসব মালপত্তর আর ইটালির মিস্তিরিদের আনতে রেলগাড়ি তো লাগবেই!
বছরচারেক লাগল সে বাড়ি তৈরি শেষ হতে। দেশের সবকটা যুদ্ধজাহাজের একত্র দামকেও ছাড়িয়ে গেল তার খরচ। তার দাম মেটানো হল মাটি খুঁড়ে তোলা তেল দিয়ে। শেষে একদিন, আজীবন প্রেসিডেন্টের সিংহাসনে বসবার এক পূণ্য বর্ষপূর্তির দিনে সামার প্যালেসের ফিতে কাটা হল। রেলগাড়ির মাল বইবার বগিগুলো ফেলে দিয়ে সেদিন লাগানো হল ইংলিশ গদি আঁটা বিলাসবহুল সব সেলুনকার। সুন্দর জামাটামা পরে দেশের নামীদামি লোকজন নেমন্তন্নে এলেন সেই রেলগাড়ি চেপে। সবাই যে সরকারের গদি দখল করা আন্দিজের ঠান্ডা রক্তের বুড়োটাকে পছন্দ করতেন তা নয়, কিন্তু তাঁর নেমন্তন্ন পায়ে ঠেলে এমন সাধ্য কার?
প্রেসিডেন্ট সাহেব লোকটা খুব একটা ভদ্রজনোচিত নন। ঠান্ডা জলে স্নান করেন, পায়ে জুতো পরে হাতে পিস্তল নিয়ে মাদুরে শুয়ে ঘুমোন, ভুট্টা আর মাংসের রোস্ট ছাড়া কিছু খান না, জল ছাড়া কিছু পান করেন না। একমাত্র কালো সিগার ছাড়া আর যেকোনো বিলাসব্যসনই তাঁর কাছে সমকামীদের মতই পরিত্যাজ্য। তবে হ্যাঁ, সময়ের সঙ্গেসঙ্গে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু ভদ্রলোকি আচরণ তাঁকে রপ্ত করতেই হয়েছিল, যাতে দেশবিদেশের লোকজন তাঁকে বর্বর বলে না ধরে নেয়।
আসলে তাঁকে সংশোধন করবার জন্য ঘরে কোন স্ত্রী ছিলেন না। তার কারণ, নিজের মা বাদে পৃথিবীর আর সব স্ত্রীলোকই তাঁর মতে সুবিধের লোক নন, তাঁদের থেকে দূরে থাকাটাই সুস্থভাবে বাঁচবার একমাত্র উপায় বলে স্থির করেছিলেন তিনি। তাঁর মতে, মহিলার সঙ্গে বিছানায় শোয়া পুরুষ একটা শিশুর চেয়েও অসহায়। অতএব নিজের ঘরে সে আপদ না ঢোকাবার পাশাপাশি তাঁর সেনাপতিদেরও তিনি ব্যারাকেই রাখতেন। মাঝেমাঝে স্ত্রী-সন্তান-পরিবারের কাছে গিয়ে উঁকি মেরে দেখে আসবার অনুমতি ছিল শুধু তাদের। প্রেসিডেন্টের বিছানায় শুয়েছে এ দাবি করবে এমন কোন স্ত্রীলোক তাই দেশে ছিল না।
সামার প্যালেসের উদ্বোধন অনুষ্ঠান হল চোখ ধাঁধানো। দু’দিন দু’রাত ধরে বাজনাবাদ্য চলল, অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ করে তৈরি গাউন পরা ক্যারিবিয়ানের দুই মুলাটো মহিলা সারাক্ষণ নেচে গেলেন, জীবনে একটাও যুদ্ধে না যাওয়া সেনাপতিরা মেডেল মোড়া উর্দি পরে তাদের সঙ্গে পা মেলালেন, হাভানা থেকে গাইয়েরা এল, ফ্ল্যামেঙ্কো নাচ হল, জাগলার আর ট্রাপিজওয়ালারা খেলা দেখাল, তাসপাশা খেলা হল, এমনকী খরগোশ শিকারও বাদ যায়নি। খাঁচাভর্তি খরগোশ নিয়ে মাঠে ছেড়ে দিল চাকরবাকররা আর অতিথিরা গ্রে-হাউন্ড কুকুর নিয়ে তাদের পেছন-পেছন ছুটলেন। এক অতিথি আবার প্রাসাদের ঝিলের বুকে চরতে থাকা বিদেশি রাজহাঁসগুলোকে মেরে শেষ করল। অনেকে মদের ঘোরে চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়ল, কেউ কেউ জামাকাপড় পরেই ঝিলে ঝাঁপ দিল, আর বাকিরা জোড়ায় জোড়ায় প্রাসাদের বেডরুমগুলোর মধ্যে উধাও হল।
তবে অতসব খুঁটিনাটিতে আমাদের প্রেসিডেন্টসাহেবের কোন আগ্রহ ছিল না। অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়ে, বেশ নামকরা এক মহিলার হাত ধরে নিয়মমাফিক একপাক নেচে তিনি কাউকে কিছু না বলেই রাজধানীতে ফিরে গিয়েছিলেন।
দু’দিন দু’রাত কাটবার পর ট্রেনটা অতিথিদের নিয়ে ফের রাজধানীতে ফিরে গেল। সামার প্যালেসের দশা তখন করুণ। বাথটাবগুলো চূড়ান্ত নোংরা, পর্দাগুলোয় পেচ্ছাপ চোঁয়াচ্ছে, আসবাবপত্তর ভেঙেচুরে একশা, বিদেশি গাছের বাগানে গাছেরা ধুঁকছে। গোটা একটা সপ্তাহ লাগল চাকরবাকরদের জায়গাটাকে ধুয়েমুছে সাফ করতে।
প্রাসাদে এরপর আর কখনো এমন ধুমধাম হয়নি। প্রেসিডেন্ট মাঝেমধ্যে সেখানে আসতেন, তবে রাজধানীতে ষড়যন্ত্রের বেজায় ভয়, অতএব তিন-চারদিনের বেশি তাঁর সেখানে থাকা হত না। দেখভাল করবার গুটিকয় মানুষ ছাড়া প্রাসাদটা ফাঁকাই পড়ে থাকত।
আস্তে আস্তে প্রাসাদ ফের নিঝুম হয়ে এল। বুনো অর্কিডেরা আবার ফুল ফোটাল, পাখিরা ফের তাদের বাসা বানাল, সান জেরেনিমো ফের ফিরে গেল তার আগের দিনগুলোতে। সামার প্যালেসটাকে তারাও প্রায় ভুলেই গেল একসময়। আর, এই সময়েই সেই অদৃশ্য ইন্ডিয়ানরা সেই প্রাসাদটায় ফিরে এসেছিল নিজেদের এলাকার দখল নিতে।
ব্যাপারটা এত নিঃশব্দে ঘটেছিল যে প্রথম প্রথম কেউ তা টেরই পয়নি। একটু পায়ের আওয়াজ, একটু ফিসফাস, পিলারের ফাঁকে সরে যাওয়া একটা ছায়া, কখনো বা টেবিলের ওপরে একটা হাতের ছাপ এর বেশি কিছু দেখা যেত না। তারপর আস্তে আস্তে রান্নাঘর থেকে খাবার, সেলার থেকে ওয়াইনের বোতল চুরি যাওয়া শুরু হল। পুরো বাড়িটার একসঙ্গে নজরদারি করা পাহারাদারদের সাধ্য ছিল না। সকালবেলা দেখা যেত কোনো কোনো ঘরের বিছানায় চাদর এলোমেলো। কেউ যেন সেখানে রাত কাটিয়ে গেছে। চাকরবাকররা সে-নিয়ে একে অন্যকে গাল পাড়ত বটে তবে গলাটা নীচুই রাখত। কারণ পাহারাদারদের অফিসারের কানে কথাটা উঠলে বিপদ তাদের সবারই হবে।
উপদ্রব ক্রমেই বাড়তে লাগল। এ-ঘরে থাকলে পাশের ঘরে কেউ যেন শ্বাস ফেলল। সে-ঘর খুললে দেখা গেল জানালার পর্দাটা নড়ছে, যেন কেউ এইমাত্র সেখান দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আস্তে আস্তে গুজব ছড়িয়ে গেল সামার প্যালেসে ভূত আছে। পাহারাদার সৈন্যরা ভয়ে বাড়ির ভেতর রাতের পায়চারি বন্ধ করে দিল। দরজার কাছেই অস্ত্রশস্ত্র ধরে দাঁড়িয়ে থাকত তারা। চাকরবাকররা রাতে সেলারে নামত না। বেশির ভাগ ঘরেই তালা ঝুলিয়ে রাখত। নিজেদের থাকবার জায়গাটুকু বাদে প্রাসাদের আর কোথাও যাবার উৎসাহও চলে গিয়েছিল তাদের।
বাকি সবটা প্রাসাদেই অতএব আর কোন পাহারা রইল না। অদৃশ্য ইন্ডিয়ানরা তখন গোটা প্রাসাদটা নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নিল। এতদিন তারা উদ্বাস্তু হয়ে ঘুরে বেরিয়েছে, যখন যেমন দরকার নিজেদের বদলেছে, আর দরকার হলে নিজেদের নিজস্ব কোনো মাত্রায় গিয়ে লুকিয়েছে। প্রাসাদের ঘরগুলোয় অবশেষে তারা নিজেদের বাস্তুজমি ফের খুঁজে পেল। সেখানে তারা নিঃশব্দে রমণ করত, বিনা উৎসবে সন্তানের জন্ম দিত, চোখের জল না ফেলে মারাও যেত। এত ভালোভাবে তারা সেই মার্বেলের গোলকধাঁধার গলিঘুঁজিগুলোকে চিনে নিয়েছিল যে একই জায়গায় পাহারাদারার চাকরবাকরদের সঙ্গে থেকেও কখনো তাদের মুখোমুখি হত না, যেন অন্য কোন সময়ধারার বাসিন্দা তারা।
***
একদিন রাষ্ট্রদূত লিবেরম্যান রাজধানীর বন্দরে এসে নামলেন। সঙ্গে সুন্দরী স্ত্রী, আসবাবপত্রের পাহাড়, পোষা কুকুরের দল, অপেরা রেকর্ডিঙের স্তূপ, আর রাজ্যের খেলাধুলোর জিনিস। ভিয়েনায় ভাইস কনসাল ছিলেন। প্রমোশন পেয়ে রাষ্ট্রদূত হয়ে বদলি হয়েছেন। অর্ডার বেরবার সঙ্গেসঙ্গেই গন্তব্য দেশটাকে তাঁর অসহ্য লাগতে শুরু করেছিল। তবে কিনা, রাষ্ট্রদূতের পদটার জন্য দক্ষিণ আমেরিকার এই নরকেও আসা যায়।
তাঁর স্ত্রী মার্সিয়ার অবশ্য প্রতিক্রিয়াটা হয়েছিল একেবারে উলটো। স্বামীর সঙ্গে চিরটাকালই ঘুরে বেরিয়েছেন। কিছুকাল ধরে স্বামীর থেকে তাঁর মনের দূরত্ব ক্রমশই বেড়ে চলেছে বটে, কিন্তু তবু তাঁর সঙ্গ তিনি ছাড়েননি কারণ, লিবেরম্যানের সামাজিক জীবনে সুন্দরী সঙ্গিনী হওয়া, তাঁর পারিবারিক কাজকর্ম সামলানো – এহেন স্ত্রীসুলভ গুটিকয় কর্তব্য ছাড়া জীবনে তাঁর অঢেল স্বাধীনতা। লিবেরম্যান নিজের পেশা আর খেলাধুলো নিয়ে প্রবল ব্যস্ত থাকেন, স্ত্রীকে বশম্বদ সঙ্গী ভাবেন; তার বাইরে স্ত্রীর মনটন নিয়ে তত মাথা ঘামাবার সময় নেই তাঁর।
বদলির খবর পেতেই মার্সিয়া মানচিত্র, এনসাইক্লোপিডিয়া এইসব জোগাড় করে নতুন জায়গার খবর নিতে বসলেন। স্প্যানিশও শেখা শুরু করে দিলেন। চার সপ্তাহ ধরে আটলান্টিক পেরোবার সময়টা কাজে লাগালেন দেশটার ওপর লেখা বেলজিয়ান প্রকৃতিবিদের সেই বইটা পড়ে।
জাহাজ দক্ষিণ আমেরিকা ছোঁবার আগেই সূর্যধোয়া দেশটার প্রেমে পড়ে গেলেন তিনি। এমনিতেই তিনি একটু একা থাকতে ভালোবাসেন। স্বামীর সঙ্গে নানান অনুষ্ঠানে যাবার চাইতে বাগানে সময় কাটাতে ভালোবাসেন বেশি। পড়াশোনা করে তাঁর ধারণা হল এখানে তাঁর ওসব সামাজিক দায় বিশেষ থাকবে না। বই পড়ে, ছবি এঁকে, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন বেশি।
নতুন জায়গায় বাড়ি পাবার পর লিবেরম্যান প্রথমেই তো সবকটা ঘরে পাখা লাগালেন। তারপর সরকারী কর্তাদের কাছে গিয়ে নিজের কাগজপত্র দাখিল করলেন। কয়েকদিন বাদে আমাদের ‘আজীবন প্রেসিডেন্ট’ কডিলো যখন নিজের দফতরে তাঁকে ডেকে পাঠালেন, ততদিনে লিবেরম্যানের স্ত্রীর রূপের খ্যাতি তাঁর কানেও গেছে। রাষ্ট্রদূত লোকটার নাক উঁচু হাবভাব আর বকবকানি অসহ্য লাগলেও প্রথামাফিক তাঁকে নিজের বাড়িতে ডিনারে নেমন্তন্নও করলেন প্রেসিডেন্ট।
ডিনারের রাতে স্বামীর হাত ধরে যে মুহূর্তে মার্সিয়া লিবেরম্যান হাজির হলেন, আশি বছরের জীবনে এই প্রথমবার কোন মহিলার সামনে খাবি খাবার দশা হল প্রেসিডেন্টের। এর চেয়ে চোখা চেহারা, আরো সুন্দর মুখ তিনি কম দেখেননি, কিন্তু তাদের কারো মধ্যে এমন চুঁইয়ে পড়া আভিজাত্য ছিল না। প্রথম জীবনের সেইসব যুদ্ধজয়ের স্মৃতি জাগিয়ে তুলছিলেন মার্সিয়া তাঁর মনে, বহুবছর ধরে ভুলে থাকা রক্তের উষ্ণতাও ফের যেন টের পাচ্ছিলেন তিনি শিরায় শিরায়।
সে-সন্ধেটা মার্সিয়ার থেকে দূরেদূরেই কাটালেন তিনি। চোরা চোখের চাহনিতে বারবার লেহন করে নিলেন তাঁর গলার খাঁজ, তাঁর চোখের ছায়া, হাতের মুদ্রা, রূপের গাম্ভীর্যকে। সম্ভবত এই কথাও তাঁর মনে উদয় হয়েছিল যে তাঁদের বয়সে চল্লিশ বছরেরও বেশি তফাৎ আর এঁকে নিয়ে কোন স্ক্যান্ডাল হলে তার ফল বহুদূর গড়াবে। কিন্তু তাতে বিপদের আশংকায় পিছিয়ে যাবার বদলে তাঁর সদ্য জেগে ওঠা কামনা আরও তেজিই হয়ে উঠল।
মার্সিয়া লিবেরম্যান টের পাচ্ছিলেন, লোকটার চোখ একটা অশোভন আদরের মতো তাঁর সারা
শরীরে ঘুরছে। ব্যাপারটা বিপজ্জনক, কিন্তু তবু তার থেকে পালাবার মতো মনের জোর পাচ্ছিলেন না তিনি। একবার মনে হল স্বামীকে বলেন বাড়ি ফিরতে, কিন্তু তারপর তা না করে তিনি চুপচাপ বসেই রইলেন। একটা বিচিত্র আশা হচ্ছিল মনে, এইবার বোধ হয় মানুষটি তাঁর কাছে এগিয়ে আসবেন। ওদিকে তেমনটা হলে একছুটে পালিয়ে যাবার জন্যও তিনি তখন তৈরি। শরীরটা কেন যে তাঁর কাঁপছিল তা তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন না। লোকটা বুড়ো সেটা তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন। কোঁচকানো ছোপ ছোপ চামড়া, শুকনো শরীর, আলুথালু হাঁটা – সবই বার্ধক্যের চিহ্ন। কল্পনায় লোকটার পচাটে নিঃশ্বাসের গন্ধও পাচ্ছিলেন যেন তিনি। কিন্তু তবু, লোকটার বার্ধক্যে ঘোলাটে হয়ে আসা চোখে তখনো শক্তির একটা ঝিকিমিকি ছিল, আর সেটাই মার্সিয়াকে বন্দি করে রেখেছিল নিজের চেয়ারে।
প্রেম করবার কায়দাকানুন কডিলোর একেবারেই জানা ছিল না। দরকারও ছিল না কোনো... সেই মুহূর্তটার আগে। সেইটাই তাঁর সুবিধে করে দিয়েছিল। কারণ যদি বীরত্ব দেখিয়ে তিনি মহিলাকে উত্যক্ত করতেন তাহলে মার্সিয়ার ঘেন্না হত, আর, তাকে কীভাবে উপেক্ষা করতে হয় তা আর দশটা সুন্দরী মহিলার মতই তাঁরও ভালোভাবেই জানা ছিল।
কিন্তু, লোকটাকে উপেক্ষা করবার বদলে, এর ক’দিন পরে যখন কডিলো সাধারণ নাগরিকের পোশাকে কোন দেহরক্ষী ছাড়া তাঁর বাড়িতে এসে বললেন, জীবনে তিনি কোন মেয়েকে স্পর্শ করেননি, এবং এখন তিনি সে লোভের উর্ধ্বে উঠে গেছেন, তিনি শুধু চান সে-বিকেলটা কোনো নির্জন জায়গায় গিয়ে মার্সিয়ার কোলে মাথা রেখে শুয়ে তাঁকে নিজের প্রথম জীবনের দিনগুলোর গল্প শোনাতে, তখন মার্সিয়া শুধু প্রশ্ন করেছিল, “আমার স্বামী?”
“তোমার স্বামীর কোন অস্তিত্বই নেই হে খুকি। এখন দুনিয়ায় আছি শুধু তুমি আর আমি,” প্রেসিডেন্ট জবাব দিলেন।
মার্সিয়া আর বাড়িতে ফিরলেন না। মাসখানেক যেতে তাঁর স্বামীও দেশে ফিরে গেলেন। স্ত্রীকে খুঁজে বের করবার জন্য চেষ্টার কোন ত্রুটি করেননি তিনি। দেশশুদ্ধ লোক জানে আসল ব্যাপারটা কী, শুধু তিনি তা প্রথমে কিছুতেই বিশ্বাস করেননি। কিন্তু শেষমেষ যখন প্রমাণগুলো আর অস্বীকার করবার জো রইল না তখন তিনি সরাসরি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করে নিজের স্ত্রীকে ফেরৎ চাইলেন।
দোভাষী তাঁর কথাগুলোকে একটু নরম করে অনুবাদ করবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রেসিডেন্ট তাতে মোটেই ভুললেন না। বেজায় রেগে উঠে বললেন, রাষ্ট্রদূত এহেন উদ্ভট অভিযোগ করে দেশের অসম্মান করেছেন। তবে লিবেরম্যানের দেশের সঙ্গে এই কারণে সম্পর্ক খারাপ করতে তিনি চান না। তাই তিনি তাঁকে তিনদিনের মধ্যে আত্মসম্মান বজায় রেখে দেশ ছাড়বার অনুমতি দিচ্ছেন। তবে লিবেরম্যানের দুঃখটা তিনি বোঝেন। যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন তিনি তাঁর স্ত্রীকে উদ্ধার করে দেবার জন্য। তারপর দেশের পুলিশপ্রধানকে ডেকে আদেশও দিলেন অপহৃত মহিলাকে যেভাবে হোক খুঁজে বের করবার জন্য।
স্ত্রীকে না নিয়ে দেশ না ছাড়বার ইচ্ছেটা লিবেরম্যানের মনে যদি একমুহূর্তের জন্য উদয়ও হয়ে থাকত, তবু, তেমন কিছু করলে যে তাঁর মাথার জন্য একটা বুলেট অপেক্ষা করছে সেটুকু কাণ্ডজ্ঞান তাঁর ছিল। অতএব তিনি তিনদিনের একদিন বাকি থাকতেই দেশ ছেড়ে রওনা হয়ে গেলেন স্বদেশের দিকে।
মার্সিয়ার রূপ বুড়ো বয়সের প্রেসিডেন্টের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল বটে কিন্তু তাতে তিনি বুদ্ধি হারাননি। কেন যে মার্সিয়া সেদিন বিকেলে তাঁর সঙ্গে যেতে রাজি হয়েছিল তা তিনি বুঝতে পারেননি। তবে যুক্তি বলছিল সেটা প্রেমঘটিত কারণ নয়। আর, মেয়েদের ব্যাপারে কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় সাধারণ যুক্তি দিয়ে তিনি অনুমান করে নিয়েছিলেন, কারণটা সম্ভবত ক্ষমতার লোভ বা অ্যাডভেঞ্চারের মোহ। মার্সিয়াকে যখন তিনি জড়িয়ে ধরতেন তখন নিজেকে বড়ো অক্ষম ঠেকত তাঁর। আগের মতো কোন সাড়া দিত না শরীর। মার্সিয়ার বড়ো দয়া হত। একবার অনেক চেষ্টায় তাঁর শরীর থেকে সাড়া আদায় করলেন তিনি। কয়েকবারের চেষ্টায় বৃদ্ধ মাত্রই কয়েকটা মুহূর্তের জন্য মার্সিয়ার শরীরে ঢুকতে পেরেছিলেন, কিন্তু সেই উষ্ণ বাগানে তাঁর বেশিক্ষণ ঠাঁই হয়নি। বুক ধড়ফড়িয়ে খানিক বাদেই বিছানায় লুটিয়ে পড়েছিলেন তিনি।
“আমায় ছেড়ে যেও না।” একটু বাদে খানিক সুস্থ হয়ে মিনতি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট। মার্সিয়া থেকে গিয়েছিলেন। স্বামীর কাছে ফিরে যাবার চেয়ে এ-লোকটার আশি বছরের পুরোনো প্রতিরোধের দুর্গকে ভাঙতেই বেশি মজা পাচ্ছিলেন তিনি।
মার্সিয়াকে কডিলো তাঁর একটা বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিলেন। বাইরের দুনিয়ার সামনে তাকে হাজির করলে তার আন্তর্জাতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবেই। অতএব সেটা করা অসম্ভব। একটা বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে মেয়েটার আটকে থাকবার ক্ষতিপূরণ করবার চেষ্টায় অবশ্য কোন খামতি ছিল না তাঁর। রোজ মার্সিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন তিনি। একটু আদর, একটু কথাবার্তা এই করে সময় কাটাতেন একসঙ্গে। ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশে মার্সিয়া তাঁকে নতুন পড়া বই কিংবা ঘুরে আসা নানান দেশের গল্প শোনাতেন। তার বিশেষ কিছুই কানে যেত না তাঁর। মার্সিয়ার গলার শব্দটুকুই উপভোগ করতে বেশি ব্যস্ত থাকতেন কডিলো। কখনো কখনো নিজেও বলতেন তাঁর প্রথম জীবনের গল্প, নানান যুদ্ধজয়ের ইতিহাস। কিন্তু মার্সিয়া কোনো প্রশ্ন করলেই তিনি একেবারে পাথরের মতন চুপ। আস্তে আস্তে মার্সিয়া বুঝতে পারছিলেন, ভালোবাসা পাবার লোভের চেয়েও দীর্ঘদিন ধরে সবাইকে অবিশ্বাস করবার অভ্যাসটাই বেশি শক্তিশালী কডিলোর মধ্যে।
ভালোবাসার ঘায়ে লোকটার সব প্রতিরোধ ভাঙবার যাবতীয় চেষ্টা যখন ব্যর্থ হল তখন মার্সিয়াও
আস্তে আস্তে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলেন। চারপাশের দেয়ালগুলো এইবার ফের তাঁর দম বন্ধ করে দিতে শুরু করল। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। স্বামী ইউরোপে ফিরে গেছেন, সর্বশক্তিমান কডিলোর তাঁকে দরকার অবসরের সঙ্গী হিসেবে, আর এই দেশে তাঁর আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। মার্সিয়া বুঝলেন পরিস্থিতির ফাঁদে তিনি বন্দি। তীব্র হতাশায় কডিলোর ওপরেও বিরূপ হয়ে উঠলেন মার্সিয়া। বাস্তবের থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন তিনি। নিজের তৈরি একটা বিচিত্র কল্পনার জগতে ঢুকে চলেছিলেন ধীরে ধীরে। কডিলোকে তিনি তখন আর শরীর ছুঁতে দেন না। তাঁদের সন্ধেগুলো তখন কাটে একসঙ্গে হট চকোলেট আর কুকি খেয়ে।
মার্সিয়াকে খুশি করবার জন্য একদিন কডিলো একটা নতুন রাস্তা ভাবলেন। সেদিন সন্ধেবেলা তাঁকে বললেন, “চলো আমার সামার প্যালেসে ঘুরে আসি গিয়ে। সেই বেলজিয়ান প্রকৃতিবিদের লেখা পৃথিবীর বুকে স্বর্গের কথা যে পড়েছ এটা সেই জায়গা।”
রেলগাড়িটা তখন বছরদশেক হল ব্যবহার হয়নি। সেটাকে হাজার চেষ্টা করেও চালানো গেল না আর। তার বদলে মোটরগাড়ি করে রওনা হলেন তাঁরা। বাড়িটাকে সারিয়েসুরিয়ে রাখবার জন্য চাকরবাকরের একটা দল এক সপ্তাহ আগে রওনা হয়ে গেছে। বেশ কটা এসকর্ট গাড়ি সঙ্গে নিয়ে প্রেসিডেন্টের গাড়ি রওনা হল সান জেরেনিমোর উদ্দেশ্যে।
রাস্তার অবস্থাও বিশেষ ভালো ছিল না। একটা পায়ে চলা পথ দু’পাশে লোহার শেকল দিয়ে বুনো গাছপালা আটকাবার চেষ্টা হয়েছে বটে তবে তা সত্ত্বেও মাঝেমাঝেই গাড়ি থেকে নেমে পথের জঙ্গল সাফ করে এগোতে হচ্ছিল। কখনো থকথকে কাদার মধ্যে গরু দিয়ে টানিয়ে গাড়ি তুলতে হচ্ছিল তঁদের। কিন্তু মার্সিয়ার উৎসাহের কিছুতেই কমবার লক্ষণ নেই তখন। বিস্তীর্ণ সেই প্রকৃতি তখন তাঁকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। তীব্র গরম বা মশার ঝাঁক, কোনো কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ ছিল না তাঁর। এ জায়গার প্রকৃতি যেন দু’হাতে কোলে টেনে নিচ্ছিল তাঁকে। বারবার শুধু মনে হচ্ছিল এই ভূমিতে তিনি আগেও এসেছেন। হয়ত স্বপ্নে, হয়ত অন্য কোনো জীবনে তিনি এই ভূমিরই বাসিন্দা ছিলেন। এইখানে পা দেবার আগে পর্যন্ত তিনি যেন প্রবাসেই ছিলেন চিরটাকাল। তাঁর সেই মগ্নস্মৃতিই যেন তাঁর প্রত্যেকটা পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণ করে আজ এইখানে এনে হাজির করে দিয়েছে তাঁকে। স্বামীর সঙ্গে এদেশে আসা, স্বামীকে ত্যাগ করে একজন বৃদ্ধের সঙ্গে চলে আসা, এই সবকিছুরই যেন বা মূল উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে এই ভূমিতে ফিরিয়ে দেয়া।
সামার প্যালেসটা চোখে দেখবার আগেই তিনি যেন বুঝতে পারছিলেন এই তাঁর শেষ বাসস্থান হবে। গোটা পথটা তাই সেখানে যাবার জন্য ছটফটানির শেষ ছিল না তাঁর। অবশেষে গাছপালার ফাঁক দিয়ে প্রাসাদটা যখন প্রথম নজরে পড়ল, একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বের হয়ে এল মার্সিয়ার বুক থেকে। যেন কোনো জাহাজডুবি হওয়া নাবিক অবশেষে তার স্বদেশের বন্দরে পা দিয়েছে।
চাকরবাকরদের শতচেষ্টাতেও প্যালেসের অবস্থার বিশেষ উন্নতি ঘটেনি। দেখতে সেটাকে ভূতুড়েই লাগছিল। রোমান গড়নের প্রাসাদটাকে ক্ষুধার্ত জঙ্গলের ভেতরে ডুবে রয়েছে। হিংস্র আবহাওয়া তার উজ্জ্বল রঙকে জ্বালিয়ে দিয়েছে একেবারে। সুইমিং পুল বা বাগানের কোনো চিহ্ন নেই। পোষা গ্রে-হাউন্ডগুলো একেবারে বুনো হয়ে দড়ি ছিঁড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে। তাদের ডাকে কান পাতা দায়। পিলারগুলোর মাথায় মাথায় পাখির বাসা। গোটা সামার প্যালেসটা যেন তাকে ঘিরে ফেলা সবুজ আক্রমণের শিকার একটা অতিকায়, অসহায় পশু।
গাড়ি থেকে এক লাফে নেমে মার্সিয়া সটান সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন। একে একে প্রাসাদের সবকটা ঘর ঘুরে দেখলেন তিনি। ধুলোয় ঢাকা ড্রয়িং রুমগুলোর মধ্যে দামি স্ফটিকে সাজানো বাতিদানগুলো মেঘে ঢাকা তারাদের মতো ঝিকমিক করে ওঠে আলো পড়লে। ফরাসি আসবাবপত্রের ভাঁজে গিরগিটিদের সংসার। শোবার ঘরগুলোর পর্দা, চাদরের রং রোদে ঝলসে গেছে। বাথটবগুলোর মার্বেলের ফাঁকে ফাঁকে শ্যাওলার আস্তর।
মার্সিয়ার মুখে কিন্তু হাসিটুকু লেগেই আছে তখন। তাঁকে দেখলে মনে হয় এ-সম্পত্তির প্রকৃত মালিক বুঝি তিনি। বহু অপেক্ষার পর আজ তাঁর অধিকার ফিরে পেয়েছেন নতুন করে।
মার্সিয়ার আনন্দ দেখে প্রেসিডেন্টের বুকে বল ফিরে এল। ফের একবার তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। মার্সিয়া অন্যমনস্ক ছিলেন। বাধা দিলেন না।
বিদ্রোহ দমনের কাজ ছাড়া কতকাল যে রাজধানী ছেড়ে বাইরে বের হননি তিনি! এক সপ্তাহ থাকবার কথা ছিল তাঁদের সেখানে। সেটা যে কখন তিন সপ্তাহে গড়িয়ে গেল তা প্রেসিডেন্ট কডিলো টেরই পেলেন না। রাজধানীর কাজে ডুবে থাকবার ক্লান্তি উধাও হল তাঁর শরীর ছেড়ে। মার্সিয়াকে নিয়ে বাগানে ঘুরে বেড়ান তিনি। চিনিয়ে দেন গাছের গা বেয়ে ওঠা নানা অর্কিডের জাত, দেখিয়ে দেন মাটি থেকে বাতাসে উড়ান দেয়া সফেদ প্রজাপতির ঝাঁক, পরিচয় করিয়ে দেন গাছের ডালে বসে সুর তোলা চোখ ঝলসানো রঙের পালকে সাজা নানা পাখিদের সঙ্গে। কখনো নিজে হাতে ছাড়িয়ে তাঁকে খাইয়ে দেন বুনো আম, কখনো বা তাঁর জানালার তলায় দাঁড়িয়ে প্রেমের গান শুনিয়ে তাঁকে আনন্দ দেন। ফের যেন এক তরুণ প্রেমিকে বদলে গেছেন তিনি। মার্সিয়ার দিকে তাকিয়ে তাঁর একেকবার মনে হতে লাগল, সে পাশে থাকলে তিনি অনন্তকাল ধরে রাজত্ব করতে পারবেন তাঁর দেশে।
তারপর একদিন হঠাৎ একদিন তিনি আবিষ্কার করলেন, তিনি মার্সিয়ার কোলে, তার বিছানাতেই ঘুমিয়েছিলেন সারারাত। তাঁর সারাজীবনের প্রতিজ্ঞা ভেঙে গেছে নিজের অজান্তে। মেয়েদের সঙ্গে এক বিছানায় রাত কাটিয়েছেন তিনি! নিজের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন! বিছানা ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠলেন কডিলো। সেখানে মার্সিয়া তখনো গভীর ঘুমে। তাঁর শ্বেতপাথরের মতো শরীরকে ঘিরে সাপিনীর মতো উদ্যত রয়েছে তাম্রবর্ণের কেশরাজি। সেদিকে তাকিয়ে ভয় লাগছিল কডিলোর। তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে রাজধানীতে ফিরে যাবার প্রস্তুতি নেবার আদেশ দিলেন প্রেসিডেন্ট।
মার্সিয়া যখন তাঁর সঙ্গে ফিরে যাবার কোন আগ্রহই দেখাল না তখন প্রেসিডেন্টের বিশেষ হেলদোল হল না তাতে। তাঁর হৃদয়ের বোধ হয় তাতে সায়ই ছিল। মনে মনে তিনি বুঝছিলেন, মার্সিয়া তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দুর্বলতা। কাছে থাকলে একদিন তাঁর সব ক্ষমতার স্মৃতি মুছে দিতে পারে সে।
মার্সিয়াকে ছাড়াই রাজধানীতে ফিরে এলেন কডিলো। গুটি-ছয় সৈনিক পাহারাদার আর কয়েকজন চাকরকে রেখে এলেন শুধু মার্সিয়া আর প্রাসাদের দেখভালের জন্য। বলে এলেন, কোন অভাব থাকবে না মার্সিয়ার। রাস্তাটাকে তিনি সারিয়ে দেবেন যাতে মার্সিয়ার জন্য খাবারদাবার, সাজবার জিনিসপত্র, তার বইপত্রের সরবরাহের কোনো ত্রুটি না হয়। আর তিনি নিজেও মাঝেমাঝেই সুযোগ পেলে এসে থেকে যাবেন তাঁর কাছে। কিন্তু তবু যখন তাঁরা একে অন্যকে বিদায় জানাচ্ছিলেন, তাঁরা দুজনেই জানতেন এই শেষ দেখা।
প্রেসিডেন্টের গাড়ির বাহিনী চোখের আড়াল হতে এক আশ্চর্য নৈঃশব্দ নেমে এল গোটা বাড়ি জুড়ে। জীবনে এই প্রথম নিজেকে সত্যিকারে স্বাধীন ঠেকল মার্সিয়ার। খোঁপার পিনগুলো খুলে দিলেন তিনি। একরাশ চুলের ঢল নেমে এল গা বেয়ে। পাহারাদাররা তাদের উর্দি সরিয়ে সাধারণ পোশাক পরে নিল। ফেলে দিল হাতের অস্ত্রশস্ত্র। চাকরবাকররা চলে গেল গাছের ছায়ায় নিজেদের শোবার হ্যামকগুলো টাঙিয়ে ফেলতে।
তিন সপ্তাহ ধরে প্রাসাদে লুকিয়ে থাকা ইন্ডিয়ানরা আড়াল থেকে সমস্তকিছু দেখেছে। মার্সিয়া লিবেরম্যানের সাদা চামড়া আর কোঁচকানো চুল তাদের বোকা বানাতে পারেনি। তারা ঠিকই চিনেছিল তিনি তাদের জাতেরই একজন। তবু, দীর্ঘকাল সবার নজরের আড়ালে থাকবার অভ্যাসের জন্যই হঠাৎ করে তাঁর সামনে এসে হাজির হতে পারেনি তারা। বুড়ো লোকটা তার দলবল নিয়ে চলে যাবার পর তারা ফের তাদের চিরকালের জমির দখল নিয়ে নিল। মার্সিয়া নিজের অবচেতনে টের পেতেন তিনি একলা নন। যেখানেই তিনি যান হাজারজোড়া চোখ তাঁকে অনুসরণ করে। চারপাশে অবিরত মৃদু ফিসফাসের শব্দ শোনেন তিনি, টের পান কাদের উষ্ণ নিঃশ্বাস, হৃৎপিণ্ডের ছন্দোবদ্ধ ধ্বনি।
কিন্তু তাঁর ভয় লাগত না একেবারে। বরং ভরসা পেতেন। যেন বড়ো পরিচিত বন্ধুদের আশ্রয়ের নিরাপত্তায় রয়েছেন তিনি। ছোটোখাটো উৎপাতেও ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলেন। একটা পোশাক হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে গেল। দিনতিনেক পর দেখা গেল বিছানার পায়ের কাছে একটা ঝুড়িতে করে সেটা রাখা। একদিন খাবার ঘরে যাবার আগেই কে যেন তাঁর রাতের খাবারটা চেটেপুটে খেয়ে গেল। কখনো তাঁর রঙের বাক্স, কখনো দু-একটা বই চুরি যেত। ওদিকে আবার কখনো টেবিলের ওপর পড়ে থাকত সদ্য কেটে আনা অর্কিড, কখনো সন্ধের স্নানের জলে ভাসত মিন্টের ঠান্ডা, সুগন্ধী পাতা। খালি ড্রয়িংরুমগুলো থেকে কখনো ভেসে আসত পিয়ানোর টুংটাং, কখনো বা কোন ঘরের থেকে চাপা গলার শিৎকারের শব্দ বের হয়ে আসত তাঁর বন্ধ দরজা পেরিয়ে। চিলেকোঠার ঘরে মাঝেমাঝেই ছোটো শিশুদের খেলবার আওয়াজ উঠত।
বেশ ক’বার জিজ্ঞাসা করেও চাকরবাকরদের কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে একসময় মার্সিয়া প্রশ্ন করাই বন্ধ করে দিলেন। তবে ঔৎসুক্যটা থেকেই গেল তাঁর। একদিন রাতে একটা টর্চ হাতে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে বসলেন তিনি ব্যাপারটা কী ঘটে তাই দেখবার জন্য। তারপর যেই মার্বেলের মেঝের বুকে একটা পায়ের শব্দ উঠল, অমনি টর্চের আলো জ্বেলে দেখেন কয়েকটা নগ্ন ছায়ামূর্তি যেন... তাঁর দিকে এক লহমার জন্য তাকিয়ে দেখেই অদৃশ্য হয়ে গেল তারা। মার্সিয়া স্প্যানিশ ভাষায় ডাক দিলেন, কিন্তু কেউ সাড়া দিল না।
এইবার তিনি বুঝলেন, এত সহজে হবে না। অনেক ধৈর্য ধরতে হবে তাঁকে এ রহস্যের সমাধান করতে। সময়ের অভাব অবশ্য তাঁর নেই। সারাটা জীবনই পড়ে আছে সামনে।
এর কয়েক বছর বাদে গোটা দেশকে চমকে দিয়ে প্রেসিডেন্ট মারা গেলেন। মানুষ জানত তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন, বেশ কিছুকাল ধরেই হাড়-চামড়া-সর্বস্ব প্রেতের মতন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তবু, তিনি যে কখনো মরতে পারেন এটা কারো মাথাতেই আসেনি গোটা দেশে। মানুষ তাঁকে সে দেশের জলবায়ুর মতই
এক অনিবার্য কিন্তু চিরস্থায়ী উৎপাত বলেই ধরে নিয়েছিল।
ততদিনে পাহারাদার আর চাকরবাকররা সামার প্যালেস ছেড়ে চলে গিয়েছে। মৃত্যুর খবরটা মার্সিনা যখন শুনলেন, তাঁর মনে কোনো প্রতিক্রিয়া হল না। সত্যি বলতে কি নিজের অতীতকে মনে করতে তাঁকে বেশ কসরতই করতে হয় তখন। তাঁকে ঘিরে থাকা এই অরণ্যের বাইরে আর কী কী ঘটেছিল তাঁর জীবনে, অথবা তীক্ষ্ণ চোখের কোনো এক বৃদ্ধ যে তাঁর ভবিতব্যকে বদলে দিয়েছিলেন একদিন সেসব কথা ততদিনে আর তাঁর মনে পড়ে না। খানিক বাদে খবরটার অর্থ বোধগম্য হতে তিনি বুঝলেন, মানুষটার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এখানে লুকিয়ে থাকবার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সভ্য জগতে ফিরে যেতে আর কোন বাধা নেই। তাঁর অপহরণের খবর নিয়ে সেখানে এতদিনে আর কারো কোন উত্তেজনা অবশিষ্ট নেই।
চিন্তাটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলেন মার্সিয়া। বেশ আছে তো জীবন কাটছে এই অরণ্যভূমিকে নিয়ে। এর বাইরের আর কোনকিছুতেই তাঁর কোন আগ্রহ অবশিষ্ট নেই আর।
***
সেই ইণ্ডিয়ানদের সঙ্গে বাকি জীবনটা তাঁর বড়ো শান্তিতে কেটে গেল এরপর। সেই সবুজের সমুদ্রে তিনি একদিন নিঃশব্দে মিশে গিয়েছিলেন। পরনে একটা টিউনিক, মাথার চুল ছোটো করে ছাঁটা, সারা শরীরে পালক আর উলকির সজ্জা। এত সুখ মার্সিয়া জীবনে আগে কখনো পাননি।
***
এর কয়েক প্রজন্ম পরের কথা। দেশে তখন নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের রাজত্ব। একনায়কদের দীর্ঘ ইতিহাস মানুষের স্মৃতি ছেড়ে পণ্ডিতদের খাতায় আশ্রয় নিয়েছে। তখন একদিন হঠাৎ নতুন সরকারের একজন সরকারী নথিপত্রে সেই শ্বেতপাথরের সামার প্যালেসের কথা খুঁজে পেল। ঠিক হল সেখানে একটা শিল্প স্কুল বসানো হবে। সরকারের থেকে একদল প্রতিনিধিকে পাঠানো হল প্রাসাদটাকে সরেজমিনে দেখে আসতে।
মোটরগাড়ির লম্বা, ক্লান্তিকর সফর সেরে তারা সান জেরেনিমোয় গিয়ে হাজির হল বটে কিন্তু সেখানে কোন মানুষ তাদের সেই প্রাসাদের হদিশ দিতে পারল না। প্রাসাদের দিকে একটা রেললাইন পাতা হয়েছে বলে পড়েছিল তারা। কিন্তু সে রেললাইন বহুকাল আগে কেউ উপড়ে নিয়ে গেছে। অরণ্য তার সব চিহ্ন মুছে দিয়ে গেছে তারপর।
সরকার এবার অভিযাত্রীদল আর সেনা ইঞ্জিনিয়ারদের পাঠালো হেলিকপ্টারে করে জায়গাটা খুঁজে দেখবার জন্য। কিন্তু পায়ের তলার জঙ্গল এত ঘন যে আকাশ থেকেও কিছুই চোখে পড়ল না অভিযাত্রীদের।
তারপর ধীরে ধীরে প্রাসাদের কাগজপত্র হারিয়ে গেল সরকারী মহাফেজখানা থেকে। দেশের মানুষের স্মৃতি থেকেও মুছে গেল তার কথা। শুধু গ্রামের বৃদ্ধাদের মুখের গল্প হয়ে বেঁচে রইল সেই সামার প্যালেসের স্মৃতি। দেশের মানুষের সামনে তখন অনেক দরকারী কাজ। পুরোনো, হারিয়ে যাওয়া প্রাসাদের কথা কে আর মনে রাখবে।
***
আজকাল সান জেরেনিমো অবধি যাবার জন্য একটা ভালো হাইওয়ে হয়েছে। সেই রাস্তার যাত্রীরা বলেন, মাঝেমধ্যে ঝড়বৃষ্টির পর, যখন বাতাস ভিজে থাকে, তখন একটা শ্বেতপাথরের প্রাসাদ নাকি পথের ধারে হঠাৎ মাথা তুলে দাঁড়ায়, কয়েক মুহূর্ত বাতাসে ভেসে থাকে, আর তারপর নিঃশব্দে, একটা মরীচিকার মতই মিলিয়ে যায় আকাশে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন