হোর্লা

সৌভিক চক্রবর্তী

৮ই মে

আজ একটি চমৎকার রোদঝলমলে দিন! সারাটা সকাল ঘরের সামনের বাগানে শুয়ে বসে কাটালাম। বড়ো বড়ো গাছপালার আলোছায়ার লুকোচুরি সেখানে ঘাসে ঘাসে! আসলে, এই নর্ম্যান্ডি অঞ্চলের সঙ্গে আমার এক নাড়ির যোগ রয়েছে, আর তাই এই জায়গা বড়ো প্রিয় আমার। এই মাটিতেই আমার বাপ-পিতেমো হেসে-খেলে জীবন কাটিয়ে গেছেন। তাঁদের জীবনযাপন থেকে হাসিকান্না থেকে কথা বলার ধরন এই সবই মিশে আছে এখানকার মাটির গন্ধে, আকাশে-বাতাসে। প্রাচীন এই পৈতৃক ভদ্রাসনেই আমি বড়ো হয়ে উঠেছি।

আমি! আমি কে? তেমন কেউকেটা তো নই কেউ। এক নও-জওয়ান। এখনও বিয়ে করিনি। চমৎকার আছি বাপের প্রাসাদে। খাই-দাই বগল বাজাই।

বাগানের পাশ দিয়েই প্রিয় সেইন নদী বয়ে চলেছে, আমার ঘরের জানালা দিয়েই দেখা যায়। এই নদীই এখান দিয়ে বয়ে রুয়াঁ ও হাভ্রে অঞ্চলের দিকে চলে গেছে। নদী দিয়ে ছোটোবড়ো জলযান ভেসে ভেসে চলেছে দেখা যায়।

নদীর অববাহিকায় বামদিকে একটু এগিয়েই হল সুপ্রাচীন রুয়াঁ শহর। অনেক দূর থেকেই শহরের উঁচু উঁচু গথিক গম্বুজগুলির মিনার দেখা যায়, শোনা যায় ক্যাথিড্রাল চার্চের গম্ভীর ঘন্টাধ্বনি।

একটু বেলার দিকে দেখি এক স্টিমের টাগবোট দিয়ে লংবো-এর সার টেনে নিয়ে যাচ্ছে নদীপথে, দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এক অতিকায় ফড়িং। হুসহুস করে ঘন কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চলেছে সে, আর মুহূর্তে সেই কালো ধোঁয়া বিলীন হয়ে যাচ্ছে নর্ম্যান্ডির নীলাকাশে। পরপর দুটো পালতোলা ইংলিশ জাহাজ চলে গেল, তারপরেই ধবধবে সাদা এক মস্ত ব্রেজিলীয় তিন-মাস্তুলের জাহাজ। আমি স্যালুট ঠুকে ফেললাম এক। কেন? জানি না। হয়ত চমৎকার ঐ শ্বেতবর্ণের পোত আমার মনে সম্ভ্রমের উদ্রেক করেছিল।

১২ই মে

শরীরটা হঠাৎ বে-জুত হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে জ্বরজ্বর ভাব চলেছে। মনমেজাজও খিঁচড়ে রয়েছে। ভাবি, কোত্থেকে আসে এই মনখারাপের অসুখটা? বেশ চলছে চলছে মনটা এই রোদে উজ্জ্বল দিনে, হঠাৎ কোত্থেকে আর কীসের প্রভাবে আনন্দ উধাও হয়ে ম্যাদা মেরে গেল মনটা, সমস্ত কর্মোদ্যম উধাও হয়ে মিইয়ে গেলাম? কে যেন বলেছিল সে এক ‘হাওয়া’! কোন এক রহস্যময় বদ্‌-হাওয়া, যার অশুভ প্রভাবে নাকি এমনটা হয়।

তার মানে, এই যে এক রোদ-সকালে নদীতীরে পায়চারি করছি মনের আনন্দে, হঠাৎ কোন মন্দ-হাওয়া গায়ে লেগে আমার স্পিরিটটাকে দমিয়ে দিয়ে গেল?

সে হাওয়াটা এল কোথা থেকে? মেঘের গা থেকে না আকাশ থেকে না আমার চারপাশের জিনিসপত্রের মধ্যে থেকে? কে দেবে এ-প্রশ্নের উত্তর?

আচ্ছা, তার মানে কি এই যে অদৃশ্য বস্তুর মধ্যেও আছে এক অপার শক্তি? আমাদের চারপাশের কত-না বস্তুকে তো আমরা দেখেও দেখি না, ছুঁয়েও ছুঁই না! তাদেরও কি তাহলে আমাদের উপর অমোঘ কোনো প্রভাব রয়েছে, রয়ে গেছে, যাকে আমরা কখনই অস্বীকার করতে পারব না?

আসলে, মানুষের অদ্ভুত একটা ‘বোধ’ থাকে। যাকে চোখে দেখা যায় না, পাওয়া যায় না যার ঘ্রাণ, কানে যার শব্দ আসে না কোনো, এমন সত্ত্বার উপস্থিতিও কখনো কখনো অনুভব করতে পারে মানুষ।

সত্যিই, ভাবি তাই, পঞ্চেন্দ্রিয়ের বাইরেও যদি আমাদের আরো একটা-দুটো ইন্দ্রিয় থাকত...যা দিয়ে এই অধরা জিনিসগুলোকে ইচ্ছেমতো ধরা যেত! a

১৬ই মে

নাহ, অলপ্পেয়ে এই জ্বরটা সত্যিই আমায় জ্বালাচ্ছে। সত্যিই অসুস্থ আমি। শুধু শরীর নয়, মনের দিক দিয়েও দুর্বল করে দিয়েছে আমায়। সবসময় যেন মনে হচ্ছে কোনো একটা বিপদ ধেয়ে আসছে, কোনো দুর্ঘটনা বা দুর্ভাগ্য! মৃত্যু!

এটা একটা রোগ, যে রোগের নাম কেউ জানে না, কিন্তু যে রোগ অবধারিতভাবে রক্তে-মাংসে-মজ্জায় ছড়িয়ে পড়ে, জড়িয়ে যায়।

১৮ই মে

দু’রাত্তির ঘুমোইনি। আজ ডাক্তার দেখিয়ে এলাম। জানা গেল আমার পালস হাই, চোখে রাত্রিজাগরণের ক্লান্তি। স্নায়ুও দুর্বল। ভালো করে স্নান করতে বললেন। সেইসঙ্গে কয়েক রকম ওষুধও দিলেন খাবার জন্য।

২৫শে মে

অবস্থার উন্নতি নেই কোনো। দিনের বেলাটায় তবু ঠিক থাকছি। রাত্রি ঘনিয়ে এলেই চারিদিক থেকে যত অশুভ যত অশান্তি এসে ঘিরে ধরে। জলদি নৈশাহার সেরে নিয়ে বই খুলে বসে যাই। কিন্তু পড়ব কী, অক্ষরগুলিই ঝাপসা হয়ে আসে আমার চোখে।

তখন মস্ত ড্রয়িং রুমটায় পায়চারি করতে থাকি। বিছানার কথা ভাবতেই ভয় করে। নিদ্রাহীনতার ভয়! বৈঠকখানার মস্তবড়ো গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটি ঢং ঢং করে রাত দশটা ঘোষণা করতেই ঢুকে পড়ি আমার শয়নকক্ষে। ভিতর থেকে লক করে দিই।

বন্ধ ঘর। কোত্থাও কেউ নেই। তবু যেন আমার কেমন ভয় ভয় করতে থাকে। কীসের ভয়? খাটের তলায় ঝুঁকে দেখে নিই। কেউ নেই। কেউ নেই কাবার্ডের ভিতরেও (পাল্লা টেনে খুলে দেখে নিয়েছি) । কোথাও থেকে কি কোনো সুর ভেসে আসছে? উঁহু।

শুয়ে পড়লাম বিছানায়। অপেক্ষা করতে থাকি নিদ্রাদেবীর আগমনের। যেন এক মৃত্যুদণ্ডের আসামী অপেক্ষা করছে জল্লাদের আসবার? যেন কেউ বদ্ধ জলাশয়ে ডুবে মরবার জন্যে ঝাঁপ দিয়েছে। তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ি।

আজও বোধহয় আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। একটা ঘোর ঘোর ভাব। আর যেন স্বপ্নও দেখলাম। দুঃস্বপ্ন। কেউ যেন ঢুকে পড়েছে আমার এই ঘরটায়। বিছানার উপর ঝুঁকে এসে দেখছে আমায়। এই তো স্পর্শ করল! ঘাড়ের নীচে রাখল তার হাত। এবার চেপে ধরেছে দু’হাত দিয়ে আমার কণ্ঠনালী।

আমি চিৎকার করে উঠতে গেলাম। পারলাম না। সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিতে গেলাম সেই আক্রমণকারীকে। পারলাম না। এমন সময়ে, ঠিক এমনই সময়ে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। দেখি ঘর্মাক্ত কলেবরে একা শুয়ে রয়েছি বিছানায়। ঘরে আর কেউ নেই।

এর পর ভোরের দিকে কখন যেন একটু ঘুমিয়েও পড়েছিলাম।

২রা জুন

আমার অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়ে উঠেছে এই এক সপ্তাহে। হল কী আমার? ঐ ডাক্তারের ওষুধে কিস্যু হল না, না তেড়ে ঠান্ডা জলে স্নান করে কিছু। শরীরের ঘাম ঝরাতে কয়েকদিন কাছাকাছি রউমারের জঙ্গলে লম্বা হন্টন দিয়ে এসেছি। ভেবেছিলাম, জঙ্গলের সবুজ পরিবেশ ও টাটকা বাতাসে শরীরটা সতেজ হয়ে উঠবে। একদিন তো সবুজে ঢাকা বনপথ ধরে পুবের সেই বোও গ্রাম পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম। সে-পথের দুই পাশে অত্যুচ্চ বৃক্ষের সারি, সমস্ত পথটাকে ছাতার মতো ছেয়ে রেখেছে।

কিন্তু সেই চমৎকার পরিবেশেই হঠাৎ আমার সারা শরীর বেয়ে এক কম্পন বয়ে গেল। না, ঠান্ডায় নয়, শরীরজোড়া ব্যথায়! সম্পূর্ণ একলা আমি সেই বনপথে, সত্যি, বড়োই ভীত হয়ে পড়েছিলাম। ভীষণ ভয় করছিল আমার। কেমন যেন মনে হচ্ছিল যে কোনো অদৃশ্য-জন, হয়ত বা অদৃশ্য কোনো শক্তি আমাকে অবিরত অনুসরণ করে চলেছে এই বনপথে। আমার প্রতিটি পদক্ষেপে সে যেন রয়েছে আমার সঙ্গে সঙ্গে। এত কাছে যে সে যেন যে-কোনো মুহূর্তে ছুঁয়ে ফেলবে আমাকে। আমি বারংবার ডাইনে বাঁয়ে আগে পিছে খুঁজতে লাগলাম সেই অদৃশ্য সঙ্গীকে। কিন্তু কোথায় কে? পথের দু’পাশে সারি সারি গাছ ছাড়া আর কিছু নেই। কেউ নেই।

ভয়ে চোখ বুঁজে ফেললাম আমি। কেন? কীসের ভয়? সেটা জানি না আমি। তারপর কী যে কারণে বা কার প্রভাবে জানি না, আমি হঠাৎ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বনবন করে ঘুরতে লাগলাম। লেত্তি-ছাড়া লাটিমের মতো। আমার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের গাছপালা আকাশ সবই তো ঘুরছে, ঘুরছে। বেশ খানিকক্ষণ পরে যেন হাঁফিয়ে গিয়ে থেমে গেলাম। বসে পড়লাম মাটিতে।

তারপর? তারপর আর মনেই পড়ছে না যে কেন ও কীভাবে আমি বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।

৩রা জুন

গত রাতটা ভয়ংকর কেটেছে। নাহ, ঠিক করলাম যে আমি এবার এক লম্বা সফরে বেরিয়ে পড়ব। পথ, কেবল পথই আমায় ঠিক করে দিতে পারে, সারিয়ে দিতে পারে আমার অসুখ।

২রা জুলাই

আজ অনেকদিন পরে এই ডায়েরি লিখতে বসেছি। প্রায় এক মাস পরে। প্রথমেই অতি আনন্দের সঙ্গে জানিয়ে রাখি যে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ বোধ করছি এখন।

আমি এবারের সফরে গিয়েছিলাম সেন্ট-মিচেল দ্বীপে। ইংলিশ চ্যানেলের উপর ছোট্ট সেই দ্বীপে হাজার বছরের এক প্রাচীন দুর্গ রয়েছে। না, আগে আমি কখনো সেখানে যাইনি। অপূর্ব নৈসর্গিক রূপ দ্বীপটির। ছোট্ট শহরটা একটি টিলার উপরে অবস্থিত। তার শেষপ্রান্তে এক চমৎকার উদ্যান। তার সামনেই দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র। এবং পাশেই, বারিধির মধ্য থেকে মাথা তুলে রয়েছে আরেকটি ছোট্ট টিলা, চারিদিক তার ঘেরা সোনালি বালিতে। এ-সব দেখে আনন্দে আমার বলে উঠতে ইচ্ছে করছিল, “ওগো, দ্যাখো তোমরা এসে দেখে যাও এ-কী অপূর্ব সুন্দর জায়গা!”

ওখানে একটি শান্ত-সমাহিত গির্জাও রয়েছে। খুউব ভোরে উঠে দীর্ঘ পথ হেঁটে সেখানে গিয়েছিলাম। সেই টিলার পাদদেশ থেকে বহু সিঁড়ি ভেঙে আশ্রমে উঠেছিলাম। কী অপূর্ব জায়গাটি! এত সুগম্ভীর গথিক স্থাপত্য আমি আগে আর কখনো দেখিনি। বিশাল তার পরিধি, অপূর্ব তার স্থাপত্য। সন্ন্যাসীদের সারি সারি ছোটো ছোটো খুপরি। চার্চ তো নয়, এ-যেন গ্রানাইট পাথরে গড়ে তোলা এক অলঙ্কার, এক আভরণ।

সিঁড়ি চড়তে চড়তে পাহাড়টির টঙে এসে গেছি আমরা, তখন সঙ্গী সন্ন্যাসী-মহারাজকে বললাম, “বাবা, আপনি কতই না সুখে, কী আনন্দে রয়েছেন এখানে, বলুন?”

তিনি কেবল বললেন, “মশাই, এখানে হাওয়া, বড্ডো হাওয়া।”

বলেই চুপ করে গেলেন। তারপর নিজে থেকেই এই চার্চের ও এই অঞ্চলের নানান প্রাচীন গাথা, প্রাচীন কিংবদন্তী শোনাতে লাগলেন আমাকে। তার মধ্যে একটি আমার খুব মনে ধরে গিয়েছিল। সেটি এ-রকম –

এ-অঞ্চলের অধিবাসীরা, বিশেষত মোওনে গোষ্ঠীর লোকেরা, গল্প করে থাকেন যে রাত্রে তাঁরা সমুদ্রের বেলাভূমি থেকে দুই মেষশাবকের কাতর স্বর শুনতে পান। একটা ক্ষীণ, অপরটি তীব্র। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন যে ওটি আসলে কোনো সামুদ্রিক পাখির ডাক, যা কখনো বাচ্চা-ভেড়ার ডাক, বা কখনো মানুষের শিশুর কান্না বলেও মনে হয়। সম্প্রতি অবশ্য কয়েকজন ডিঙির জেলে জানিয়েছেন যে তাঁরা এক বৃদ্ধ মেষপালককেও সেখানে দেখেছেন, যার মাথাটা সবসময় ঘোমটার আড়ালে ঢাকা থাকে বলে মুখটা ভালো করে দেখা যায় না।

আরও যেটা আসল আশ্চর্যের কথা সেটা হল এই যে ওই মেষপালক যে দুটি ভেড়া তাড়িয়ে বেড়ায় তার মাদীটির মাথা মেয়েমানুষের মতো আর মদ্দাটির পুরুষমানুষের মতো!

সে-দুটির সঙ্গে মেষপালকটি অনবরত কোনো ভিনদেশী ভাষায় ঝগড়া করতে করতে চলে, আর হঠাৎ কোন মানুষজন কাছে এসে পড়লে একদম চুপ করে যায়, আর তখনই ভেড়া দুটো ভ্যা ভ্যা করে ডাকতে থাকে।

“আপনি এ-গল্প বিশ্বাস করেন, মহারাজ?” আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “আপনি তো এত বচ্ছর এখানে আছেন, আপনি কখনো দেখেছেন তাদের?”

“সব কিছু কি আর চর্মচক্ষুতে দেখা যায়, বৎস? এই যে বায়ুর সমুদ্রে আমরা বেঁচে আছি, যা আমাদের প্রাণ দিচ্ছে আবার কখনো কূপিত হলে তার প্রবল বেগ দ্বারা ধ্বংসও করে দিচ্ছে সব কিছু, তাকে কি তুমি দেখতে পেয়েছ কখনো? প্রভুর কৃপায় এই বিশ্বচরাচরে যা ঘটে চলেছে তার কোটি ভাগের এক ভাগ হয়ত মনুষ্যচক্ষে ধরা পড়ে।” বললেন তিনি।

আমি আর কী-ই বা বলব? চুপ করে গেলাম। উনি হয়ত মস্ত বড়ো এক সন্ত বা এক দার্শনিক। নাকি এক মূর্খ? আমি জানি না। আমি সত্যিই জানি না। কারণ ওঁর বক্তব্য যে আমার চিন্তাভাবনার সঙ্গেই মিলে যায় অনেকটা!

৩রা জুলাই

সেন্ট মিচেল দ্বীপ থেকে বাড়ি ফিরে এসে কালকের রাত্রের ঘুমটা ফের যথেষ্ট বিঘ্নিত হল আমার। আবার সেই ঘুসঘুসে জ্বর। আমার কোচোয়ানটাকেও এই একই জ্বরে ধরেছে।

“কী হল গো তোমার, জাঁ?” শুধোই।

“আপনি বেড়াতে বেরিয়ে যাবার পর থেকে আমি আর কোনো বিশ্রাম পাচ্ছিলুম না এখানে। আমার রেতের ঘুম চলে গেছে। আমার ওপর দিয়ে একটা যাচ্ছে বটে...তারপর এই ঘুসঘুসে জ্বর, রাত হলেই!”

যদিও বাড়ির অন্য চাকরবাকরদের এই জ্বরে ধরেনি, এ-ই বাঁচোয়া। আমার মেজাজটা কিন্তু খিঁচড়ে রইল বাড়ি ফিরে থেকেই ফের রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়।

৪ঠা জুলাই

খবর ভালো নয়। গতরাতে ফের সেই দুঃস্বপ্ন ফিরে এসেছিল। সে – ই মনে হচ্ছে কেউ যেন ঘুমন্ত আমার মুখের উপর ঝুঁকে এসে আমার ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে প্রাণবায়ুটা চুমুক দিয়ে শুষে নিতে চায়! মনে মনে ঠিক করেছি যে এমন চলতে থাকলে আমি আবার পালাব বাড়ি ছেড়ে।

৫ই জুলাই

একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। ভাবছি, আমার কি বোধবুদ্ধি সব লোপ পেয়ে গেল?

গতরাতে, যেমন রোজ করি, শিগগীর শিগগীর ডিনার সেরে বেডরুমে ঢুকে দরজা দিয়েছি। শোবার আগে আধ-গ্লাস জল খেলাম। তারপর সটান বিছানায় ঢুকে গেছি। আর তখনই সামান্য ঘুমঘোরের মধ্যে শুরু হয়ে গেল দুঃস্বপ্ন দেখা। কে যেন আমার বুকে এক ধারালো ছুরি গুঁজে দিয়েছে, আর রক্তে স্নান করে পড়ে আছি আমি বিছানাতে।

ধড়মড় করে উঠে বসে সেই বোতলটা থেকে জল ঢেলে খেতে গেলাম। ও মা! বোতলটা যে শূন্য, এক্কেবারে শূন্য! সে কী! শোবার আগেও যে বোতলটা জল-ভর্তি ছিল। কেউ কি এর মধ্যে ঘরে ঢুকে বোতলের জল নিঃশেষে পান করে গেল? নাকি আমিই কখনো নিজের অজান্তে পান করে নিয়েছি? তাহলে আমি কি আসলে একজন ‘সমনামবুলিস্ট’, ওই যারা ঘুমের মধ্যে হেঁটে-চলে বেড়ায়? মানে, আমার মধ্যে কি দুইটি সত্ত্বা রয়েছে, একটি জীবন্ত আর একটি ঘুমন্ত? একটিকে আমি চিনি, দ্বিতীয়টিকে না!

ওহ্‌ মা গো! কে আমার যন্ত্রণা বুঝবে? কাকে আমি আমার অন্তরের ব্যথা বুঝিয়ে বলতে পারব?

বাকি রাতটা কাল জেগেই কাটিয়েছি চেয়ারে বসে বসে। বিছানায় যাবার সাহস আর হয়নি, পাছে ফের দুঃস্বপ্ন দেখি।

১০ই জুলাই

নাহ, বুঝলেন, আমি বোধহয় পাগলই হয়ে যাচ্ছি, বা গেছি। ছয় তারিখের রাতে একটা পরীক্ষা করবার জন্যে বিছানার পাশের টেবিলটায় জলের বোতলের পাশাপাশি এক ছোটো বোতলে কিছু দুধ, আরেকটায় কিছু শ্যাম্পেন আর পাশে কয়েকটা স্ট্রবেরি ও পাঁউরুটি রেখে শুয়েছিলাম। ভোরে উঠে দেখি জল নিঃশেষ, দুধ সামান্য কমেছে আর বাকি সব যেমনকার তেমনই রয়ে গেছে।

তার মানে, আমিই ঐ জল পান করে নিয়েছি? মনে পড়ে না তো আমার।

পরের রাত্তিরে একই পরীক্ষা করে একই ফল পেলাম। পরশু রাতে দুধ আর জলটা রাখিনি। বাকি অন্যগুলো ছিল। কিন্তু কিচ্ছু ছোঁয়নি। সব যেমন-কে-তেমনই রয়ে গেছে।

গতরাতেই হল সবচেয়ে আশ্চর্যের ঘটনা! পরীক্ষা করবার জন্য আমি দুধ ও জলের বোতলের মুখ শক্ত করে কাপড়ে মুড়ে শুয়েছিলাম, আর নিজের ঠোঁটে, দাড়িতে লেডপেন্সিলের শিষ দিয়ে ঘষে ঘষে রঙ করেছিলাম, যাতে জল খেলে সেই কাপড়ে রঙ লেগে যায়। এরপর যথারীতি শুতে যাই ও যথারীতি দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠে দেখি দুধ ও জলের বোতল শূন্য, যদিও কাপড়ের সিল অটুট রয়েছে। তাতে লেডপেন্সিলের কোনো দাগ নেই। ভাবো!

নাহ, আর নেওয়া যাচ্ছে না। এবার তো প্যারিসে গিয়ে বড়ো ডাক্তার দেখাতেই হয়।

১২ই জুলাই

পারি নগরীতে এসেছি গতকাল। সারাদিন ধরে ভাবছি, কোন ডাক্তারের কাছে যাব? আমি কি আমার কল্পনার হাতের খেলনা হয়ে পড়লাম, না সত্যিই আমি একজন ‘সমনামবুলিস্ট’, যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাঁটে? নাকি আমি সত্যিই এমন কোনো শক্তি বা প্রভাবের আওতায় এসে পড়েছি যার অস্তিত্ব হয়ত আছে কিন্তু যার ব্যাখ্যা নেই?

পাগল পাগল লাগছিল নিজেকে, যদিও সত্যি বলতে কী পারি নগরীর জাদুপ্রভাবে পরের দিকে মন অনেকটাই থিতু হয়ে এল। সন্ধেবেলায় ‘থিয়েটার ফ্রাঙ্কে’-তে গিয়ে আলেকজান্দার দুমা-র এক চমৎকার নাটক দেখে এলাম। যেমন অসাধারণ অভিনয় তেমনি সামগ্রিক উপস্থাপনা। মনটা একেবারে তরতাজা হয়ে গেল। আসলে, এখন বুঝতে পারছি যে আমার নর্ম্যান্ডির বাড়ির একাকিত্বই হল আমার আসল রোগ। ওখানে একা থেকে থেকেই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম। একা থাকলেই মনের মধ্যে যত বিকট ভাবনা এসে বাসা বাঁধে।

***

প্যারিসের এই হোটেলটি চমৎকার জায়গায়। ঢোকবার পথে সারি সারি গাছের ছায়াঘেরা দীর্ঘ পথ। সেখান দিয়ে ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই আমার বাড়িতে কোনো এক অদৃশ্য-কেউ বাসা বেঁধে রয়েছে, আমার সঙ্গে একই ছাদের তলায়। বেশ! দ্যাখো, মানুষের মনটা দ্যাখো! ‘কোনো কিছুর কারণটা খুঁজে পাচ্ছি না বলেই আমরা সেটাকে বুঝতে পারছি না’ এই সহজ তত্ত্বে না গিয়ে আমরা চট করে বিষয়টাকে রহস্য ও অতিমানবীয় শক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করে ফেলি। ফেলি না?

১৪ই জুলাই

আজ ‘বাস্তিল দিবস’। ফরাসি প্রজাতন্ত্রের জাতীয় দিবস! সারাদিন শহরের হইচই, আলো, আনন্দ আর বাজি-পোড়ানোর মধ্যে কাটালাম, যদিও এই সরকার-নির্ধারিত একটা দিনে জনগণের উৎসবে মেতে ওঠাটা আমার বড়ো বোকা বোকা লাগে। মানুষ কি ভেড়ার পাল নাকি যে এই বেশ ধীরস্থির রয়েছে, এই উৎসব করছে, আবার এই দ্যাখো বিদ্রোহে ফেটে পড়ছে। আসলে, এই দুনিয়ায় ‘নির্দিষ্ট’ বলে কিছু হয় না। আলোকই তো এক মায়া-বিভ্রম! আর শব্দ? সে এক প্রবঞ্চনা!

১৬ই জুলাই

গতকালের একটা ঘটনায় বড্ডো বিচলিত হয়ে পড়লাম। নৈশাহারের নিমন্ত্রণে বোনের বাড়ি গিয়েছিলাম কাল। কর্তাটি তাঁর সাতষট্টিতম শসারের (Chasseurs) এক কর্নেল, আছেন এখন মধ্য-ফ্রান্সের লিমুজিন অঞ্চলে। বোনের আরও দুই বান্ধবী অতিথি ছিল কালকের সেই নৈশপার্টিতে। তাঁদের একজনের পতিদেবতা আবার এক মস্ত নিউরোলজিস্ট, নাম ডা. পেরেন্ট। তিনি হিপনোটিজমেরও এক বিশেষজ্ঞ বলে জানা গেল। তিনি গল্প করছিলেন যে আমাদের গ্র্যান্ড ইস্ট প্রভিন্সের ‘ন্যান্সি মেডিক্যাল স্কুলে’-র ডাক্তারদের একটা দল কিছু অনবদ্য কাজ করেছেন এর উপর।

“...মানুষ যেদিন থেকে লেখার মাধ্যমে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে শিখেছে সেদিন থেকেই তার মনের গহনে এমন কিছু অনুভূতি থেকে গেছে যা কিনা রয়ে গেছে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার ঊর্ধ্বে, যাকে মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে স্পর্শ করতে চেয়েছে, জয় করতে চেয়েছে, কিন্ত লিখে প্রকাশ করতে পারেনি।

“পারেনি কেন? কারণ মানুষের এই প্রচেষ্টাটা রয়ে গেছে প্রাথমিক স্তরেই। আর তাই মানবমনের এই ধোঁয়াশা-ঘেরা অঞ্চলেই জন্ম নিয়েছে ভূত, অশরীরী প্রভৃতি অতীন্দ্রিয় ধ্যানধারনা।

“এমনকী, আমাদের ঈশ্বরীয় ভাবনাও এই পর্যায়েই আসে — সে যে-কোন ধর্মেরই হোক না কেন। তাই না দার্শনিকপ্রবর ভলতেয়ার বলে গেছেন,” ডা. পেরেন্ট বলে যেতে থাকেন, “‘ঈশ্বর যদি মানুষকে সত্যিসত্যিই নিজের আদলে গড়ে থেকে থাকেন তাহকে মানুষও ঠিক সেইভাবেই কিন্তু তাঁকে সেই আদল ফিরিয়ে দিয়েছে।’ ”

“তবে,” ডাক্তারের বক্তৃতা তখনও শেষ হয়নি, “বিগত এক শতাব্দীর মধ্যে এই ধারায় নতুন কিছু চিন্তাভাবনা এসেছে। ড ফ্রানজ মেসমারের মতো কয়েকজন বিজ্ঞানী দিগন্ত-উন্মোচনকারী কিছু কাজ করেছেন এই দিকে।”

আমার ভগিনীটিও কম অবিশ্বাসী নয়। সে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল ডা.

পেরেন্টের কথায়। ওঁর দৃষ্টি এড়ায়নি সেটা। হয়ত ওঁর আত্মসম্মানেও লাগল সেই অবিশ্বাসী হাসি। বললেন ডাক্তার, “বেশ। মাদাম, আপনি কি চান যে আমি আপনাকে এক্ষুনি এর কিছু নমুনা দেখাই? এখনই কি আপনাকে আমি ঘুম পাড়িয়ে দেব, দেখে নেব আপনার মনের মধ্যে ঢুকে?”

“দিন না,” বোনের চটজলদি জবাব। মুখে তার সেই ব্যাঙ্গাত্মক হাসিটিও লেগে আছে।

“বেশ। তবে আপনি এসে এই ইজিচেয়ারটায় এসে বসুন তো! বসুন। রিল্যাক্স। রিল্যাক্স,” ডাঃ পেরেন্ট বললেন।

ডাক্তার এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার ছোটো বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ ধরে। কিন্তু, অদ্ভুত কাণ্ড, সেই ডাক্তারের উপস্থিতিতে আমার হঠাৎ হৃদকম্প শুরু হয়ে গেল, গলার কাছে যেন কিছু দলা পাকিয়ে আটকে আসতে লাগল। আমি লক্ষ করলাম, বোনের চোখ জুড়ে আসছে, নিঃশ্বাস ঘন হয়ে উঠেছে, হাপরের মতো উঠানামা করছে তার বুক। দশ মিনিটের মধ্যে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে!

আমাকে বললেন ডাক্তার, “মসিয়ঁ, আপনি ওঁর পিছনে গিয়ে ঐ চেয়ারটিতে বসুন।”

বসলাম। এবার বোনের হাতে এক ভিজিটিং কার্ড গুঁজে দিয়ে উনি বললেন, “মাদাম সাবলে, এটি একটি আয়না। বলুন তো আপনি এতে কী দেখছেন?”

“আমার ভাইকে দেখছি,” বোন সটান বলে দিল।

“তিনি এখন কী করছেন?”

“বসে বসে গোঁফে তা দিচ্ছেন, আবার কী করবেন?” বোনের স্মার্ট জবাব।

“হুম্‌। আর এখন?”

“পকেট থেকে একটা ফটোগ্রাফ বের করলেন। ওঁর নিজেরই ফটো।”

“ফটোতে মসিয়ঁ-কে দেখাচ্ছে কেমন?”

“কেমন আবার দেখাবে? খাড়া দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে তাঁর হ্যাট-টি নিয়ে।”

লক্ষ্যণীয়, এই ধারাবিবরণী কিন্তু বোনটি দিয়ে যাচ্ছেন সেই সাদা কাগজের ভিজিটিং কার্ডটির দিকে তাকিয়ে, আর আমি ব্যক্তিটি দাঁড়িয়ে আছি তাঁর পিছনে।

সেই নৈশপার্টিতে উপস্থিত অন্যান্য ভদ্রজন এবার হৈ হৈ করে উঠলেন, “ব্যস, ব্যস। অনেক হয়েছে। অনেক হয়েছে। এবার ছেড়ে দিন।”

ডা. পেরেন্ট কিন্তু এবার গম্ভীর গলায় আদেশ দিলেন, “মাদাম সাবলে, আপনি এখন ঘুমিয়ে পড়বেন। উঠবেন কাল সকাল ঠিক আটটায়। তারপর সোজা যাবেন আপনার দাদার হোটেলে আর ওঁর কাছ থেকে পাঁচ হাজার ফ্রাঙ্ক ধার চাইবেন, যেটা আপনার পতিদেবতা চেয়ে পাঠাবেন আপনার কাছ থেকে।”

না, এই এপিসোড আর দীর্ঘায়িত হয়নি, কারণ তখনই ডিনার টেবিলের ডাক এসে পড়ল।

***

হোটেলে ফিরতে ফিরতে আমি এই ঘটনাটা নিয়েই গভীরভাবে ভাবছিলাম। আমার বোনকে তো আমি আজন্ম ঘনিষ্ঠভাবে চিনি। কিন্তু এই ডাক্তারের কান্ডটা কী? সে কি সত্যিই কোনো বিজ্ঞানী, না কি কোথাও ছোট্ট এক আয়না লুকিয়ে রেখে ট্রিক-টা দেখালো আমাদের? পেশাদার লোকজনের কাজকম্ম আমাদের মতো গোলা-লোকের পক্ষে বুঝে ওঠা ভার।

***

হোটেলে এসে রাতে তো ভালোই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কাল। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ রুমবয় এসে জানাল যে এক মাদাম সাবলে এসেছেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে।

চমকে উঠে গাউনটা গায়ে জড়াতে জড়াতে গেলাম ভিজিটার্স রুমে। দেখি বোনটি আমার মাথা নীচু করে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে কাউচে। আমাকে দেখে কোনো ভনিতা ছাড়াই উঠে দাঁড়িয়ে সটান বলে উঠল, “দাদা, তোমার কাছে আজ এক সাহায্য চাইতে এসেছি। আমাকে পাঁচ হাজার ফ্রাঙ্ক ধার দিতে হবে। দেবে? এক্ষুনি দরকার। বড্ডো দরকার।”

“তোর দরকার? পাঁচ হাজার ফ্রাঁ? এক্ষুনি?” অবাক হয়ে শুধোই।

“না, মানে তোমার ভগ্নীপতিরই দরকার। বড্ডো দরকার। তাই আমায় পাঠিয়েছে সে। দেবে, দাদা? দাও না!” অশ্রুসজল কণ্ঠে বলল বোন।

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। আমার গতরাত্রের ঘটনা মনে পড়ে গেল। বড্ডো বিচলিত বোধ করছি। ঠিক যেন বুঝতে পারছি না কী ঘটছে। গতরাতে কি সেই ডা. পেরেন্টের সঙ্গে কোন ষড় করে এই নাটক করছে এরা আমার সঙ্গে? অবশ্য, বোনের প্রায়-ক্রন্দনোদ্যত মুখের দিকে তাকিয়ে আমার সেটাকে নাটক বলে মনে হল না। কিন্তু বোনেদের অবস্থা তো যথেষ্ট ভাল বলেই জানতাম। আশ্চর্য হয়ে শুধোই, “পাঁচ হাজার? মাত্র পাঁচ হাজার ফ্রাঁ ধার নিতে লিমোগের কর্নেল সাহেব তোকে পাঠিয়েছে আমার কাছে এই সাতসকালে?”

“হ্যাঁ,” ধীরে ধীরে ঘাড় নেড়ে বললেন মাদাম সাবলে, আমার ছোটো বোন।

“আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না বোনটি যে তোর কর্তা এই সামান্য অর্থের জন্যে এতো সকালে তোকে আমার কাছে পাঠাবে। সে কি তোকে কোনো চিঠি লিখে পাঠালো? নইলে জানতে পারলি কী করে তুই? সে তো এখন সেই লিমুজিনে আছে, না?”

“হ্যাঁ, দাদা। আজ ভোরেই পেয়েছি ওর চিঠি।” বলল বোন।

“আছে তোর কাছে সেই চিঠি? দেখাতে পারিস আমায়?” শুধোই।

“না দাদা। তাতে আরও অনেক ব্যক্তিগত কথা লেখা ছিল। আমি পড়বার পরেই পুড়িয়ে ফেলেছি সেটা।”

“তার মানে তোর বরের অনেক কর্জ হয়ে গেছে বাজারে, বল?” সোফায় গুছিয়ে বসতে বসতে বললাম। ইচ্ছে করেই বললাম তাকে এই কথাটা আমি। পরীক্ষা করবার জন্যে।

“সেটা...মানে সে খবর, দাদা...আমি ঠিক বলতে পারব না। জানি না, আসলে...’ বোন কাঁচুমাচু হয়ে বলল।

কিন্তু আমি ততক্ষণে মনস্থির করে ফেলেছি। কোনো রাখঢাক না রেখেই সটান বলে দিলাম, “কিন্তু বোনটি, আমার কাছে যে এখন পাঁচ হাজার ফ্রাঁ নেই।”

“সে কী, দাদা! আমি যে বড়ো বিপদে পড়ে বড়ো আশা নিয়ে তোমার কাছে ছুটে এসেছিলাম গো!” প্রায় আর্তনাদ করে উঠল আমার ছোটোবোন, হাতজোড় করে নতজানু হয়ে এলো আমার সামনে। বুঝলাম, বড্ডো কড়া আদেশ রয়েছে তার উপরে, নইলে আত্মগর্বিত অভিজাত বোনটি আমার এমন আচরণ করত না।

মনটা দ্রব হয়ে উঠল। মায়া হল আমার। বললাম, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। দেব। দেব আমি তোমায় পাঁচ হাজার ফ্রাঁ, কিন্তু কাল রাত্রে তোমার বাড়িতে কী ঘটনা ঘটে গিয়েছিল সেটা কি মনে আছে তোমার?”

ঘাড় নাড়ল বোনটি, “হ্যাঁ।”

“...তাহলেই বোঝো, কেন আমি দিতে চাইছিলাম না। আমার মনে হচ্ছে যে সেই ডা. পেরেন্টের আদেশেই তুমি এখন এই অর্থ আমার কাছ থেকে চাইতে এসেছ।”

“কিন্তু দাদা, এ-টাকা তো আমার বর চেয়েছে, চেয়ে পাঠিয়েছে...”

এরপর প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে আমি বোনের পেট থেকে কথা বের করবার চেষ্টা করে চললাম। কিন্তু তার এক কথা, “এই অর্থ আমার বর লিমুজিন থেকে চেয়ে পাঠিয়েছে নিজের জন্যে।”

শেষমেষ হতাশ হয়ে বোনকে বিদায় দিয়ে এবার আমি চললাম কালকের সেই ডা. পেরেন্টের চেম্বারে। তাঁর ভিজিটিং কার্ডটি তখনও রাখা ছিল আমার কাছে।

উনি বেরোচ্ছিলেন হসপিটালের উদ্দেশে। আমাকে আসতে দেখে বসে গেলেন। মনোযোগ দিয়ে শুনলেন আমার সব কথা। তারপর স্মিত হেসে বললেন, “আমার কথাটা এবার আপনার বিশ্বাস হল তো, মসিয়ঁ?”

কী আর বলব? ঘাড় নাড়লাম আমি। উনি বললেন, “চলুন তো, একবার আপনার বোনের ওখানে যাই এখন।”

মাদাম সাবলে দেখি সকালে আমার হোটেল থেকে ফিরে এসে ক্লান্তিতে বিছানা নিয়েছে। ডা. পেরেন্ট গিয়ে তার নাড়ি দেখলেন প্রথমে। তারপর তার চোখের সামনে ওঁর ডান হাতটি আস্তে আস্তে নাড়তে নাড়তে ইঙ্গিতে চোখ বুজে ফেলতে আদেশ দিতে লাগলেন। তাঁর প্রবল ব্যক্তিত্বের সামনে বোনের বোধহয় আর কিছু করবার উপায়ও ছিল না। ধীরে ধীরে চোখ বুজে ফেলে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল সে। এবার ডা. পেরেন্ট মৃদু অথচ দৃঢ়স্বরে বললেন, “মাদাম সাবলে, শুনুন। আপনার স্বামীর আর পাঁচ হাজার ফ্রাঁ-র প্রয়োজন নেই। তাই আপনি ভুলে যান যে দাদার কাছে ওই অর্থ ধার চাইতে গিয়েছিলেন আপনি। এবার, এমনকী, আপনার দাদা আপানাকে সেটা দিতে এলেও আপনি বুঝতেই পারবেন না, কেন, কী বৃত্তান্ত।”

এবার বোনকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলেন ডাক্তারবাবু। আমিও তৈরিই ছিলাম। পাঁচ হাজার ফ্রাঁ-র থলি নিয়ে বোনের হাতে দিতে যেতে সে তো আকাশ থেকে পড়ল! কিছুতেই মানতে চায় না যে সে এটা চাইতেই আজ সাতসকালে আমার হোটেলে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঝগড়াঝাঁটি হবার উপক্রম! যাহোক।

এতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম আমি আজ সকালের এই ঘটনাতে যে হোটেলে ফিরে এসে আর লাঞ্চ-টাঞ্চ কিছু করতেই পারলাম না। সটান বিছানা নিলাম।

৩০ শে জুলাই

আজ বিকেলে আমার নর্ম্যান্ডির প্রাচীন বাড়িতে ফিরে এসেছি। সবই তো ঠিকঠাকই আছে বলে মনে হচ্ছে। সেদিনের সেই ঘটনার পরেও দুই সপ্তাহ ছিলাম প্যারিসে। যাদের যাদের কাছেই আমার বোনের ব্যাপারে ঐ অভিজ্ঞতা শুনিয়েছি, হেসে উড়িয়ে দিয়েছে তারা। ব্যাঙ্গ করেছে। এরপর আমি তো গত দু’সপ্তাহে কতবারই সম্ভ্রান্ত বুজিভাল পাড়ায় ডিনার করতে গিয়েছি, সন্ধ্যায় বলডান্সের আসরেও গেছি। কই, সেই সব জায়গায় তো অতিপ্রাকৃত কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করিনি! আসলে, সবকিছু নির্ভর করে তার পরিবেশের উপর। আপনি যদি গোনুইয়ার বৈভবের মধ্যে বসে থাকেন তো আপনার ওইসব অতিপ্রাকৃত-টাকৃত কিছু মনেই আসবে না; আবার যদি চলে যান সেই মঁ সাঁ মিচেল দ্বীপে বা ধরুন ভারতবর্ষে, ওই অতিপ্রাকৃত ভাবই আপনাকে চেপে ধরবে। এ-রকমটাই হয়ে থাকে, দেখবেন।

৬ই আগস্ট

নতুন এক অভিজ্ঞতা হল আজ। এই অভিজ্ঞতার তুলনা আগে কোনদিন পাইনি! কীভাবে ব্যাখ্যা করব এর?

দুপুরের ঝলমলে রোদ্দুরে আজ আমার গোলাপ বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম আমি। এই ‘জায়ান্ট অফ বেতেই’ গোত্রের সংকর গোলাপ আমার নিজের হাতে করা, বড্ড প্রিয় আমার। এমন একটি অপূর্ব গোলাপের সামনে দাঁড়িয়ে তার সুষমা উপভোগ করছিলাম আমি। হঠাৎ দেখি সেই গোলাপটি ডাল-পাতা সহ নুয়ে পড়ছে! তারপর কোনো অদৃশ্য হাত সেটাকে ডাল থেকে ছিঁড়ে নিল, আর সেটা আমার মুখের থেকে মাত্র তিন হাত দূরে হাওয়ায় আটকে রইল, যেন কোন অদৃশ্য মানব তার আঘ্রাণ নিচ্ছে!

প্রাথমিক স্তম্ভিতভাব কাটিয়ে আমি সে ফুলটাকে ধরতে গেলাম। কিন্তু বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেল তা প্রকাশ্য দিবালোকে, বিকালের খোলা হাওয়ায়!

অবিশ্বাস্য এ-ঘটনা। কাউকে বললে সে বিশ্বাস করবে না, কিন্তু এটা ঘটে গেল আমার চোখের সুমুখেই, সেটাকে অস্বীকার করি কী করে? একেই কি হ্যালুসিনেশন বলে? দৃষ্টিবিভ্রম? ঝুঁকে নীচু হয়ে দেখি মাটিতে ফুলের বোঁটাটি তখনও পড়ে রয়েছে, আর গাছের ডালে তখনও তার দু’পাশের দুই গোলাপ ফুটে রয়েছে জ্বলজ্বল করে। এইবার, বন্ধু, এইবার আমি স্থিরনিশ্চিত হলাম যে আমার সঙ্গে এই বাড়িতেই একই ছাদের নীচে দ্বিতীয় কারোর অস্তিত্ব বিদ্যমান, যে জল ও দুধ খেয়ে বাঁচে, এবং তাকে চোখে দেখা না গেলেও সে বস্তুকে স্পর্শ করতে পারে ও সেটাকে নাড়াতে পারে। এইবার আমার মনে পড়ল যে বাড়ির চাকর-বাকরদের মধ্যে কাবার্ডের কাচের বাসন ভাঙা নিয়ে বেশ একটা বিতণ্ডা চলছিল দু’একদিন ধরে। তার ব্যাখ্যা তাহলে এ-ই।

তাই, আজকের এই গোলাপের-ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পরে আমি নিশ্চয়ই ডায়েরিতে লিখতে পারি যে “আমি তাকে দেখেছি,” অন্তত, দৃশ্যত তার উপস্থিতি অনুভব করেছি প্রকাশ্য দিবালোকে! পারি না?

৭ই আগস্ট

ওই গোলাপের-ঘটনার পরেও গতরাত্রে আমি শান্তিতে ঘুমিয়েছি, মানে সে আমায় বিরক্ত করে ঘুম ভাঙাতে আসেনি, যদিও বোতলের জল নিঃশেষ করে দিয়ে গেছে সে। আমি নিজেকে উন্মাদই ভাবতাম যদি না আমার যুক্তিবোধটা বেঁচে থাকত। সেটা তো রয়েছে ষোল আনা। এমনটা শুনেছি, বা দেখেওছি যে কোনো দুর্ঘটনার ফলে মানুষের স্মৃতিবিভ্রম হয়ে যায়, সে কাউকে চিনতে পারে না আর, বা অতীতের কোন ঘটনা মনেও করতে পারে না।

কিন্তু এখনকার নিউরোসায়েন্সের উন্নতিতে স্মৃতির এমন হারানো পথগুলি পুনরায় খুঁজে পাওয়া নাকি সম্ভব হয়েছে। তাই এতে আর আশ্চর্য কী যে আমার মনের গহনের ঐ প্রহেলিকা বা দৃষ্টিবিভ্রমের দিকগুলিকেও বশে আনা যাবে?

ঝলমলে রোদে উজ্জ্বল দিনটিতে প্রিয় সেইন নদীর তীর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জীবনের প্রতি ভালোবাসা আমি ফের অনুভব করতে লাগলাম। এই যে ছোট্ট সোয়ালোর দীর্ঘ সাবলীল উড়ান বা বনপথের সবুজপত্রের মর্মরধ্বনি – এ-ই তো আমার কানে জীবনের ধ্বনি বয়ে নিয়ে আসে! কিন্তু এরই মধ্যে আমার মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অদ্ভুত বোধ কাজ করতে লাগল যেন ঘরে আমার কোনো অসুস্থ প্রিয়জনকে ফেলে এসেছি, তার অবস্থা সঙ্গীন, আর সে যেন আমাকে ঘরে ফিরে আসতে ডাকছে। নদীতীর থেকে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে এলাম তাই। কোনো কি দুঃসংবাদ আসবে? তেমন কোনো একটা টেলিগ্রাম? আসবে?

১৫ই আগস্ট

গত কয়েকদিন ধরে মনে হচ্ছিল যে কোনো এক অদৃশ্য ‘সে’ যেন আমার উপর অবিরত নজর রেখে চলেছে। আজ সকাল থেকে মনে হচ্ছে যে ‘সে’ যেন পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে আমায়, আমি যেন ‘তার’ কথায়, ‘তার’ ইচ্ছায় ওঠা-বসা চলা-ফেরা করছি। হে ঈশ্বর, আমাকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করো। আমি এবার বুঝতে পারছি, কোনো এক অমোঘ শক্তির অধীন হয়ে আমার বোন যখন গতমাসে আমার কাছে টাকা ধার চাইতে এসেছিল তখন তার কেমন লাগছিল। সে তো নিজের ইচ্ছেয় কিছু করেনি, সে হয়ে পড়েছিল দাস, কোন এক অদৃশ্য কিন্তু অসম্ভব ক্ষমতাধর শক্তির দাস। তার নিজের কোনো স্বাধীনতা ছিল না, যেমন আমার নেই এখন।

১৬ই আগস্ট

পালিয়ে এসেছি। আজ সকালে আমি পালিয়ে এসেছি ‘তার’ কব্জার বাইরে। সকালেই কোচোয়ানকে ঘোড়া জুততে হুকুম দিয়েছিলাম, “রুয়াঁ-তে যাব। চলো।”

আর এখন এই দ্যাখো, এই বিকালে আমি নর্ম্যান্ডির রাজধানীতে বিলাসভ্রমণ করছি, দেখেছ? হ্যাঁ, লাইব্রেরিতেও গিয়েছিলাম বটে দুপুরের দিকে। নিয়ে এসেছি ডা. হার্মান হারস্টসের সেই বিখ্যাত বই, “ট্রিটিজ অন দ্য আননোন ইনহ্যাবিট্যান্টস অফ দ্য এনশেন্ট এন্ড মডার্ন ওয়ার্ল্ড।” দেখি, পড়ে দেখব আমি এ-বই।

কিন্তু পড়ব কী করে সেই বই? আমাকে পড়তে দেবেন ‘তিনি?’ এ-হেন ভাবনার কারণ হল এই যে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আমার কোচে চড়ে মস্ত হেঁকে হুকুম দিলাম আমি কোচোওয়ানকে, “ঘর চলো।” আর দিয়েই ভয়ানক চমকে গেলাম নিজেই! কেন? কারণ এ-হুকুম আমি নিজে দিইনি। আমি তো বলতে চেয়েছিলাম, “স্টেশন চলো।” কিন্তু আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “ঘর চলো।” কে বলল ওই কথা? কে আমাকে দিয়ে বলিয়ে নিল?

বুঝলাম, এই রুয়াঁ শহরে পালিয়ে এসেও ‘তার’ হাত থেকে আমার নিস্তার নেই, ‘সে’ আমাকে দিয়ে বলিয়ে নিল ঘরে ফিরে চলার কথা। ডেকে নিচ্ছে সে আমাকে তার কাছে।

১৭ই আগস্ট

আহা! কী গেল রাতটা! অদ্ভুত! কিন্তু আনন্দেরও! রাত একটা পর্যন্ত জেগে জেগে ডা. হারস্টসের বইখানি পড়েছি। উনি অবশ্যই দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন, কিন্তু ওঁর গভীর অধ্যয়নের বিষয় কী ছিল জানো তো? “থিওগনি,” অর্থাৎ ঈশ্বর-উদ্ভবশাস্ত্র। খৃষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে গ্রিক কবি হেসিওড যে এ-নিয়ে এক গান বেঁধেছিলেন, সেটাই হল এ-শাস্ত্রের আদিসূত্র।

খুব স্বল্পচর্চিত বিদ্যা, এবং জার্মান পণ্ডিত ডা. হার্মান হারস্টস হলেন এর এক বিশেষজ্ঞ। তিনি এমন অনেক অদৃশ্য শক্তির কথা বলেছেন যা মানুষের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় এবং তাকে প্রভাবিত করে। কিন্তু আমি মিলিয়ে মিলিয়ে দেখছিলাম যে তাদের কোনোটাই আমার অভিজ্ঞতাটির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ডা. হারস্টস বলছেন, মানুষ বোধহয় নিজেরই কোন এক অদেখা শক্তিশালী ভবিষ্যতরূপকে ভেবে ভয় পায় ও মনে মনে যত সব অশরীরী ছায়া-ছায়া অবয়বের কথা কল্পনা করে নেয়।

এ-সব পড়তে পড়তে মাথাটা ভোঁতা হয়ে এল। জানালাটা খুলে ধেয়ে আসা নদীর বাতাসে সেটাকে ঠান্ডা করতে বসলাম। আকাশে চাঁদ ছিল না। অন্ধকার আকাশে অসংখ্য তারাদের দেখে ভাবতে লাগলাম, কারা থাকে ওইসব গ্রহ-নক্ষত্রে? সত্যিই কি কেউ থাকে? তারা কি মানুষের চাইতেও বুদ্ধিমান? তারা কি কখনো পৃথিবী আক্রমণ করে দখল করে নিতে পারে, যেমনভাবে প্রাচীন ভাইকিং-রা আসমুদ্র জিতে নিয়েছিল? সত্যি, মানুষের ক্ষমতা কত সীমিত!

ভাবতে ভাবতে ঘুম পেয়ে গেল। জানালা বন্ধ করে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম।

কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কতক্ষণ হবে? ঘন্টা তিন-চার হবে হয়ত। হঠাৎ কী এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ভেঙে গেল ঘুমটা। চোখটা প্রথমেই চলে গেল পায়ের দিকে রাখা টেবিলটায়, যেখানে মৃদু আলোটা জ্বলছে তখন,

আর... আর... সেই মৃদু আলোতেই দেখলাম যে ডা. হারস্টসের বইটার পাতা উলটে যাচ্ছে! মিনিট চারেক পরে ঐ দ্যাখো ফের একটা পৃষ্ঠা উলটে গেল। না, হাওয়ায় বইয়ের পৃষ্ঠা উলটে যাওয়া এ-নয়। ঠিক যেন কোনো মনযোগী পাঠক নিবিষ্ট চিত্তে বসে একটির পর একটি পৃষ্ঠা ওলটাতে ওলটাতে বইটি পড়ে চলেছে! টেবিলের সামনের ওই আর্মচেয়ার কিন্তু শূন্য, অন্তত সেখানে কাউকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আমি খুব ভালো রকমই জানি যে সেখানে এখন বসে আছে ‘সে’।

হঠাৎ কী যেন মনে হল, আমি এক বন্যপ্রাণীকে ফাঁদে জড়িয়ে ফেলার অদম্য উদ্যম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সেই ‘শূন্য’ চেয়ারের উপরে। ধরেই ফেলব আজ আমি তাকে।

কিন্তু বললে বিশ্বাস করবে না, আমি সেই চেয়ারের কাছে যাবার আগেই দুম করে কে যেন কুর্সিটা উলটে দিয়ে চলে গেল। টেবিলটা নড়ে উঠল চেয়ারের ধাক্কায়, বাতিটি পড়ে নিভে গেল, আর ... আর... আমার ঘরের জানালাখানি খুলে ফের বন্ধ হয়ে গেল, যেন কোনো এক চোর আমার চোখে ধুলো দিয়ে কেটে পড়ল জানালা দিয়ে!

এর অর্থ, সে পালিয়ে গেল। তার মানে, সে আমাকে ভয় পেয়েছে!

এ-থেকে আমি এই ভরসাও পেলাম যে একদিন-না-একদিন আমি তাকে ধরতে ঠিকই পারব। আমার বাড়িতে থেকে কতদিন আর সে অধরা থাকতে পারবে আমার কাছে?

১৮ই আগস্ট

আজ সারাদিন ধরে বসে বসে ভেবে ভেবে এক মতলব বের করেছি। ‘সে’ যে বলশালী সেটা তো বুঝতেই পারলাম ঐ চেয়ার উলটে দেবার ঘটনা থেকে। এবারে আমি তার কথা শুনে চলব (অন্তত, তেমন ভান করব), তার সমস্ত ইচ্ছা পূরণ করব। তারপর...

তারপর একদিন তো আমার দিন আসবেই।

১৯শে আগস্ট

‘ল্য মোঁদ’ গ্রুপের ‘সায়েন্টিফিক রিভিউ’ পত্রিকা রাখাই হয় আমাদের বাড়িতে। সেখানেই হঠাৎ এই নিবন্ধটিতে চোখ আটকে গেল:

“ব্রেজিল থেকে এক আশ্চর্য সংবাদ পাওয়া গেছে। সাও পাওলোতে পাগলামি এক মহামারীরূপে দেখা দিয়েছে। মধ্যযুগের ইউরোপে একবার এমন হয়েছিল বলে জানা যায়, কিন্ত এবারের ব্রেজিলের উদাহরণ তাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে।

“দলে দলে লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে, কারণ কোনো এক অদৃশ্য শক্তি যেন মানুষকে গরুভেড়ার মতো চালিয়ে বেড়াচ্ছে। সম্ভবত, ভ্যাম্পায়ারের মতো কোনো প্রাণী ঘুমন্ত মানুষকে আক্রমণ করছে। আশ্চর্য, এই অদৃশ্য প্রাণী কিন্তু সামান্য জল ও দুধ ছাড়া আর কিচ্ছু খায় না, কারণ লোকের বাড়ি থেকে মাত্র এই দুটি বস্তুই উধাও হয়ে যাচ্ছে! উন্মাদরোগের এই মহামারীর উপরে আরও অনুসন্ধান করতে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডন পেড্রো হেনরিক তাঁর ছাত্রদল সঙ্গে নিয়ে ব্রেজিলে গিয়েছেন এখন। তিনি মহামান্য সম্রাটের কাছে তাঁর রিপোর্ট শীঘ্রই জমা দেবেন।”

এবার...এবার আমি বুঝতে পেরেছি। আমার মনে পড়ে গেল, গত আট মে আমি এই পাশের সেন নদী দিয়েই এক ব্রেজিলীয় তিন-মাস্তুলের জাহাজকে চলে যেতে দেখেছিলাম। তাহলে...

...নিশ্চয়ই সেই জাহাজ থেকেই ‘অদৃশ্য শত্রু’টি আমার সুদৃশ্য প্রাসাদ দেখে নেমে এসে আমায় আক্রমণ করেছে! কে সে? এ-ই কি সেই শক্তি, ওঝারা যাকে মন্ত্রের সাহায্যে তাড়াতে চেষ্টা করে আর জাদুকরেরা অমাবস্যার রাতে জাগিয়ে তোলে? একেই কি আত্মা,পরী বা অশরীরী-দৈত্যের মতো ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়? একেই কি তাহলে ডা. ফ্রাঞ্জ মেসমার ঈশ্বরীয় স্তরে উন্নীত করে দিয়ে গিয়েছেন, আর চিকিৎসকরা সম্প্রতি এর শক্তির স্বরূপটা বুঝে নিতে চাইছেন?

এ এক রহস্যময় আকাঙ্ক্ষা যা মানুষের নিজস্ব ইচ্ছাশক্তির উপরে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। কিন্তু মনুষ্যজাতির ওপর তা এক অভিশাপ, এক পীড়া।

নাম তার হোর্লা! হ্যাঁ, হোর্লা তার নাম...ওই...ওই যেন সে ঘোষণা করছে...এসে গেছি, আমি এসে গেছি...আমি হোর্লা, আমি অমোঘ, দুর্বার এক অদম্য শক্তি....আমাকে উপেক্ষা করতে পারবে না আর তোমরা!

যুগে যুগে তো শকুন মেরে এসেছে পায়রাকে, নেকড়ে শিকার করেছে ভেড়া, সিংহ মেরেছে বুনোমহিষ আর মানুষ তার অস্ত্রের সাহায্যে সিংহকে শিকার করে এসেছে। কিন্তু হোর্লা? হোর্লা এসে গেলে সে তো তেমনই করবে যা মানুষ গবাদিপশুকে করে এসেছে, মানে বশ করে ফেলবে। কারণ সে মানুষের ইচ্ছাশক্তিকেই তার দাসে পরিণত করবে।

কিন্তু মনে রেখো, কখনো কখনো পোষা প্রাণীও বিদ্রোহ করে ওঠে। আমিও তেমনই তাকে জানব, চিনব, ‘দেখব’...তারপর...

আচ্ছা, ওই যে লোকে বলে না যে পশুর চোখ ফারাক করতে পারে না! তেমনিই আমার চোখও সেই অদৃশ্য আগন্তুককে চিনতে পারছে না, কিন্তু যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে সে আমায়। কিন্তু কেন? আমাকেই কেন?

হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল সেই মঁ সাঁ মিচেলের সাধুজির কথাটা, “...সব কিছু কী আর আমাদের চর্মচক্ষুতে দেখা যায়, বৎস? এই যে বায়ুর সমুদ্রে আমরা বেঁচে রয়েছি, যা কিনা জীবনের চাবিকাঠি সে-ই আবার কখনো কুপিত হলে তার প্রবল বেগ দ্বারা ধ্বংসও করে দিতে পারে সবকিছু। তাকে কি তুমি চোখে দেখতে পাও? প্রভুর কৃপায় এ-বিশ্বচরাচরে যা ঘটে চলেছে তার কোটি ভাগের এক ভাগ হয়ত মনুষ্যচক্ষে ধরা পড়ে।”

সে কথার সূত্র ধরেই ভাবতে বসলাম, আমার চোখ কতই না দুর্বল...কারো শরীর যদি কাচের মতো স্বচ্ছ হয় তাকে কি আর আমি চোখে দেখতে পাব? আমার অবস্থা হবে কোনো এক ছোট্ট পাখির মতো, যে ভুল করে ঘরে ঢুকে পড়ে বেরনোর জন্যে ছটফট করতে করতে জানলার কাচে বারবার ঠোক্কর খায়। মানুষকে বিভ্রান্ত করবার কম উপকরণ কি মজুত আছে প্রকৃতির ভাণ্ডারে? তাই, আশ্চর্য কী যে এমন যদি কোনো প্রাণীদেহ থেকে থাকে যাকে কিনা আলোক ভেদ করে যেতে পারে সেটাকে সে-ও তো দেখতে পাবে না! বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে, উন্মাদপ্রায় হয়ে পড়বে সে!

আচ্ছা, এ-রকম কোনো প্রাণীদেহ বা মানুষের- শরীর কি থাকা সম্ভব? ভাবি, নয়ই বা কেন? সে শরীর তো অতি সূক্ষ্ম কোনো তন্তু দ্বারা তৈরি হতেই পারে! আমাদের সাধারণ মানুষের শরীর তো হাজারো জটিল উপকরণ দিয়ে তৈরি; আর সেই জটিল শরীর থেকে মহান কোনো ব্যক্তি বা বিরাট কোনো আত্মা বেরোতেও পারে আবার না-ও পারে। আচ্ছা, বিবর্তনের ধারায় সামুদ্রিক ঝিনুক থেকে মানুষ পর্যন্ত ক’টা মোট স্তর আছে? তার পরে কি আর বিবর্তনের ধারা চলতে পারে না? পরবর্তী কোনো ধারায় বা স্তরে অপূর্ব এক ফুলগাছ জন্মাতেই পারে যার একটিমাত্র ফুলের সুগন্ধে সারা বন মেতে উঠবে! আগুন-বাতাস-মাটি-জল ছাড়া আর কোনো প্রাথমিক উপাদানও কি হতে পারে না? কেন পারে না?

বড়ো দরিদ্র আমাদের এই জগৎমাতা! চার হাজার নয়, চারশো নয় মাত্র চারটিই আদি উপাদান তাঁর সম্বল। অথচ তাই দিয়েই জলহস্তী বা উটের মতো মস্ত প্রাণী বানিয়েছেন, আবার প্রজাপতির মতো রঙিন চমৎকার প্রাণীও বানিয়েছেন, যদিও সে ছোট্ট, খুবই ছোট্ট।

কিন্তু আমি এই সব উল্টোপাল্টা ভাবছিই বা কেন? আসলে, এ-সেই হোর্লার কীর্তি! সে-ই আমার উপর দখল নিয়ে এ-সব ভাবাচ্ছে আমাকে। আমি তার সম্পূর্ণ বশে চলে গেছি। জানি না, সে একদিন আমায় বধও করে ফেলবে কি না।

২০শে আগস্ট

গতকাল আমার টেবিলে বসেছিলাম নিবিষ্ট মনে কিছু লিখতে। আসলে লেখা নয়, লেখার ভান করে বসেছিলাম। কারণ আমি জানতাম যে আমাকে এইভাবে বসে থাকতে দেখলেই অলক্ষ্যে ধেয়ে আসবে হোর্লা; গ্রাস করতে চাইবে আমায়। তখন তাকে পেড়ে ফেলব।

দুটো ল্যাম্প আর আটটা মোমবাতি জ্বালিয়ে বসেছিলাম ঘরে। এত আলো কেন? তাকে ‘দেখব’ বলে! হোর্লাকে দেখব বলে? ঘরের দরজাটা খুলে রেখেছিলাম। কেন? আসুক, আসুক না সে (পরে অবশ্য সে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম)। আমার পিছনে মস্ত আয়নাখানা ছিল, যাতে পা-থেকে-মাথা পর্যন্ত আমাকে দেখতে পাওয়া যায়।

কিছুক্ষণ পরেই অনুভব করলাম আমার ঘাড়ের উপর যেন তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ঘন ঘন শব্দ। ঠিক শুনেছি আমি। ভুল হয়নি আমার। তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়েছি আমি। আর আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! সামনের ঐ মস্ত আয়নায় আমার কোনো ছায়া পড়ল না। নিজেকে দেখতে পেলাম না আমি মস্ত সেই আয়নার কাচে। সত্যি, নেই! আমি নেই, যদিও ঘরে এত এত আলোর দীপ্তিতে যেন মধ্যদিনের রোশনাই!

তাহলে? তাহলে কি সে সম্পূর্ণতই গ্রাস করে ফেলেছে আমাকে? অবাক হয়ে, সম্পূর্ণ অবাক দৃষ্টিতে আমি তাকিয়ে রইলাম মস্ত সেই আয়নার দিকে। হাঁ করে তাকিয়ে আছি। ক্রমে ক্রমে দেখি আয়নার মধ্যে এক হালকা জলছবি ভেসে উঠছে। কে গো? সে কি আমি? আমিই? জানি না। এক আবছা মূর্তি ভাসা ভাসা ভেসে উঠছে মস্ত সেই আর্শিতে। এ-ই কি আমি, যাকে প্রতিদিন সকালে উঠে দেখি আয়নাতে? না তো! ও তো অন্য লোক। কে সে? সে কি ও? তবে কি ‘ওকে’ আমি দেখতে পেয়েছি আয়নার প্রতিচ্ছবিতে? হোর্লা? হে ঈশ্বর!

২১শে আগস্ট

আর আমি হোর্লা-র প্রভাব সহ্য করতে পারছি না। ওকে আমি মেরেই ফেলব। হ্যাঁ, একদম খতম। কিন্তু কী করে? বিষ? হুমম...তার না-ছুঁতে-পারা শরীরে কি বিষের প্রভাব পড়বে কোনো? কিন্তু সে যদি দেখে ফেলে আমায় দুধে বিষ মেশাতে?

২২শে আগস্ট

রুয়াঁ শহরে লোক পাঠিয়েছি এক কামারকে আনতে। আমার ঘরের দরজায় একটা লোহার শাটার লাগাব ঐ শয়তান হোর্লাকে আটকাতে! তাতে যদি তোমরা আমায় ভিতু ভাবো তো ভাবো। কিছু যায় আসে না আমার।

১০ই সেপ্টেম্বর

প্রায় তিন সপ্তাহ পরে ডায়েরি লিখতে বসেছি ফের আজ। আমার প্রিয় রুয়াঁ শহরে এসেছি। রুয়াঁ! হোটেল কন্টিনেন্টালে রয়েছি। মনের দিক থেকে একটু বিস্রস্ত হয়ে রয়েছি। যা, বা যা যা দেখেছি এই তিন সপ্তাহে তাতে আমার ভেঙে না পড়াটাই অস্বাভাবিক ছিল।

গুছিয়ে লেখবার চেষ্টা করছি। জানি না পারব কিনা। কারণ আমি জানি না যে হোর্লা আর ‘বেঁচে’ আছে না নেই।

শুরুটা সেই তিন সপ্তাহ আগে, তেইশে আগস্ট-এ।

কামারে এসে লোহার শাটার-গেট লাগিয়ে দিয়ে গেছে। ঠান্ডা যথেষ্টই ছিল তবু আমি কিন্তু মধ্যরাত্রি পর্যন্ত সে গেট খোলাই রেখে দিয়েছিলাম।

মধ্যরাত্রি পেরিয়ে হঠাৎ যেন মনে হল ‘সে’ এসেছে। নিশ্চয়ই এসেছে। আমি তার অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভব করতে পারলাম।

আর সেটা পেরেই আলগোছে বুটজোড়া খুলে রাতের স্লিপার পরে নিলাম। তারপর হালকা চালে গেটের কাছে এসেই চুপচাপ সেই লোহার গেট কষে বন্ধ করে তালা মেরে দিলাম ও চাবিগাছা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম।

দরজা বন্ধ করে দেওয়ামাত্র অনুভব করলাম যে হোর্লা আমার শোবার ঘরের মধ্যেই অস্থিরভাবে হাঁটাচলা করছে, সেটা আমি আমার গায়ের বেশ কাছেই অনুভব করতে পারছি। সে ভয় পেয়ে গেছে আর মনে মনে আমায় আদেশ দিচ্ছে দরজাটা খুলে দিতে।

আমারও মনের মধ্যে যথেষ্ট অস্থিরতা। কিন্তু সেটা জয় করে আমি টুক করে গেটটা সামান্য ফাঁক করলাম সন্তর্পণে চাবি ঘুরিয়ে। এবং টুক করে ঘরের বাইরে এসে ফের কুলুপ মেরে বন্ধ করে দিলাম সেই লোহার দরজা! ব্যস। এবার বন্দী সে আমার বেডরুমে, যাতে লোহার শক্তপোক্ত গেট লাগানো! ছুটে এবার নীচে নেমে গিয়ে উপস্থিত হলাম ড্রয়িংরুমে। ড্রয়িংরুমটা আমার বেডরুমের নীচেই। এবার দুটি ল্যাম্পের সব তেল কার্পেট আর কাঠের ফার্নিচারের উপর ঢেলে দেশলাই মেরে আগুন লাগিয়ে দিলাম তাতে। নীচের বাইরের দরজাতেও ডবল লক মেরে দিলাম। আর ছুটে চলে গেলাম বাগানের ঝোপঝাড়ের মধ্যে। সেখান থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম আমার বাড়িটার দিকে যেখানে হোর্লাকে শয়নকক্ষে বন্ধ করে রেখে এসেছি আমি।

কিন্তু কই, আগুনের লেলিহান শিখা তো দেখা যাচ্ছে না। অধৈর্য হয়ে পড়লাম আমি একটুক্ষণের মধ্যেই।

নাহ, এবার জ্বলে উঠেছে আগুন ওই! দাউ দাউ করে জ্বলছে আমার পৈতৃক প্রাসাদ। সারা পাড়ার কুকুরগুলো জেগে উঠে প্রবল ঘেউ ঘেউ শুরু করে দিয়েছে। গাছের পাখিরাও মাঝরাতে জেগে উঠে খুব কিচির মিচির আরম্ভ করে দিয়েছে।

কিন্তু, উত্তেজনায় বাড়ির চাকর-বাকরদের কথা তো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম! মেয়েলি-গলার কান্না শুনে দেখি জানালা খুলে প্রবল হাত নেড়ে নেড়ে ডাকছে তারা।

কাছের গ্রামের দিকে ছুটলাম আমি, “আগুন! আগুন! আগুন লেগে গেছে! ওগো তোমরা এসো, বাঁচাও...”

অনেক গ্রামবাসী ইতিমধ্যে জলের বালতি-টালতি হাতে ছুটে আসছিল আগুন দেখতে পেয়ে। কিন্তু ততক্ষণে আমার প্রাচীন পৈতৃক কাঠের-প্রাসাদ পুড়ে ছাই, যাতে দগ্ধ হয়ে গেছে ‘সে’! ‘সে’ মানে হোর্লা।

দড়াম করে এবার অট্টালিকার কাঠামোটা ভেঙে পড়ে গেল, আর তার মধ্যে স্পষ্ট দেখা গেল ‘তার’ দগ্ধ শরীরটা।

সে! সে হোর্লা।

কিন্তু আমি ঠিক দেখছি তো? সে কি সত্যিই ‘মারা’ গেছে? তার দেহ তো স্বচ্ছ! সে কি আমাদের এই নশ্বর দেহের মতো আগুনে পুড়ে যায়? পুড়তে পারে? শুধু সময়ই তো পারে হোর্লার মতো কোনো অদৃশ্য শরীরকে জ্বালিয়ে দিতে! এমন অধরা আত্মারও কি পার্থিব শরীর হয়? সেও কি অকালমৃত্যুকে ভয় করে চলে? কী আশ্চর্য! কে দেবে এইসব প্রশ্নের উত্তর?

***

অকালমৃত্যু! সকল জীবই তো অকালমৃত্যুকে ভয় করে চলে। হোর্লারও তাহলে ‘মৃত্যু’ হল? তাহলে কি তার জন্য যে নির্দিষ্ট সময় ধার্য ছিল তা পূর্ণ হয়ে গেছে? তাই কি? তা কি হতে পারে? হোর্লা কি মরতে পারে? পারে কি? না, সে মরেনি। সে মরেনি। তাহলে তো আমাকে নিজেকেই মেরে ফেলতে হয়!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%