খুলির আর্তনাদ

সৌভিক চক্রবর্তী

মাঝেমধ্যেই বস্তুটাকে আমি চিল্লাতে শুনি। আরে না না, আমি ভিতু নই। কল্পনাশক্তির ছুটও বেশি নয় আমার। সবচেয়ে বড়ো কথা আমি কখনো ভূতে বিশ্বাস-টিশ্বাসও করিনি। অবশ্য এ বস্তুটা ভূত হলে অন্য কথা। তবে জিনিসটা যাই হোক না কেন এটা লিউক প্র্যাটকে যতোটা ঘেন্না করত আমাকেও ততটাই করে। আমায় দেখলেই চ্যাঁচায়।

বুঝলেন, কখনো ডিনার টেবিলে বসে কাউকে কোনো ভয়ানক খুনের কায়দা-টায়দার গল্প শোনাবেন না। কে বলতে পারে আপনার পাশের লোকটা তার বাড়ির লোকজনের ব্যাপারে কী মতলব ভাঁজছে। মিসেস প্র্যাটের মৃত্যুর জন্য যেমন আমি সবসময় নিজেকেই দুষি। আমি তো চাইতাম তিনি বুড়ো বয়েস অবধি সুখেশান্তিতে বেঁচেবর্তে থাকুন,কিন্তু সেদিন ডিনার টেবিলে কেন যে মরতে গল্পটা বলতে গিয়েছিলাম। নইলে হয়ত —

মনে হয় সেইজন্যই বস্তুটা আমায় দেখলেই অমন চিৎকার জোরে। মহিলা বেশ নরমসরম ভালোমানুষগোছের ছিলেন। তবে একবার আমি তাঁকে চিৎকার করতে শুনেছিলাম। ঘরের ভেতর থেকে পিস্তলের ফাঁকা আওয়াজ পেয়ে ভেবেছিলেন বুঝি তাঁর ছোট্ট ছেলেটা গুলি চালিয়ে দিয়েছে। বস্তুটার চিৎকারের শব্দ অবিকল সেইরকম। শেষের দিকে অবিকল একরকম একটা তীক্ষ্ণ কাঁপুনি থাকে। কি বলছি বুঝতে পারছেন তো? এক্কেবারে একরকম।

আসল ব্যাপারটা হচ্ছে,ডাক্তার আর তার স্ত্রীর মধ্যে যে গন্ডগোল একটা চলছে আমি সেটা আগেভাগে একেবারে আঁচ করতে পারিনি। মাঝেমধ্যে একটু আধটু খিটিমিটি লেগে থাকত বটে,তখন মিসেস প্র্যাটের মুখটা লাল হয়ে উঠত আর লিউক বাজে বাজে কথা বলে ফেলত হড়বড় করে। তবে সে-তো তার একেবারে ছোটোবেলার অভ্যেস। আমার জ্ঞাতিভাই। আমি তাকে ভালোই জানি। ইশকুলেও তো সেই একইরকম স্বভাব ছিল ওর। সত্যি বলতে কি সেই আত্মীয়তার সূত্রেই আমার এ-বাড়ির মালিকানা পাওয়া। ওর মৃত্যু আর ওর ছেলে চার্লির দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাণ হারাবার পর বংশে আর কেউ ছিল না তো! সম্পত্তিটা বেশ ভালোই। আমার মতো একজন বুড়ো নাবিকের শেষের দিনগুলো বাগান করে কাটিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট।

লোকে দেখবেন নিজের বুদ্ধির কাজগুলোর থেকে নিজের ভুলভ্রান্তিগুলো বেশি পরিষ্কারভাবে মনে রাখে। আমি ব্যাপারটা প্রায়শই খেয়াল করি। একদিন প্র্যাটদের সঙ্গে রাত্তিরের খাবার খেতেখেতে ওদের সেই গল্পটা বলেছিলাম। সে ছিল নভেম্বরের এক বৃষ্টিভেজা রাত। সমুদ্রটা গোঙাচ্ছিল-

-এই – এই – চুপ – কথা বলবেন না—চুপ করে শুনুন—এক্ষুণি শুনতে পাবেন — জোয়ার আসছে বুঝতে পারছেন তো? কেমন ভার করা শব্দ,তাই না? কেমন একটা—আরে—ওই তো—ওই যে হচ্ছে—ভয় পাবেন না,কোনো ভয় নেই মশায়। আরে এ আপনাকে খেয়ে ফেলবে না—এ তো শুধু একটা চিৎকার—

যাক! আপনি যে চিৎকারটা শুনেছেন তাতেই আমি খুশি। নইলে লোকে ভাবে ও বুঝি বাতাসের আওয়াজ, কিংবা আমার কল্পনা,বা ওইরকম কিছু একটা। না না,আজ রাতে আর হবে না। এক রাতে একবারের বেশি এ কখনো চিল্লায় না।

বাহ বেশ বেশ—আগুনে আরো দু-একটা কাঠ গুঁজে দিন দেখি। আরেকটু পানীয় ঢেলে নিন। ব্লকলট নামের সেই বুড়ো ছুতোরকে মনে আছে আপনার? আরে ওই যে,ক্লন্টার্ফ নামের জাহাজটা ডুববার পর যে জার্মান জাহাজটা আমাদের উদ্ধার করে সেখানে কাজ করত। উপকূল থেকে শ’পাঁচেক মাইল ভেতরে তুফানি দরিয়ার বুক থেকে আমাদের তুলে এনে ব্যাটা কেমন টলমল পায়ে গান ধরেছিল, “আহা দুবলাপাতলা খোকাগুলানকে পাড়ে লও—পাড়ে লও—” আমার মাঝেমধ্যেই এখন লোকটার কথা মনে পড়ে।

তা সে ছিল সেইরকমই একটা ঝড়ের রাত। আমি তখন কিছুদিন হল বাড়িতে আছি। অলিম্পিয়া জাহাজটার প্রথম সমুদ্রযাত্রায় যাবার অপেক্ষায়—এর পরের যাত্রাতেই তো অলিম্পিয়া রেকর্ড ভাঙল—মনে আছে? সেই যে বিরানব্বই-এর—উমম-নভেম্বর মাস,ঠিক ঠিক। মনে পড়েছে।

তা সে-সন্ধেয় আকাশ বেশ মেঘলা ছিল। সঙ্গে একঘেয়ে বৃষ্টি। প্র্যাটের সেদিন মেজাজ গরম। রান্নাবান্না বেশ বাজে হয়েছে। তাতে প্র্যাটের মেজাজ আরো চড়েছে। তার ওপর আবার ঠান্ডাও পড়েছে জমিয়ে। সব মিলিয়ে প্র্যাটের মেজাজখানা সেদিন একেবারে বেজায় চড়া।

বেচারা বউটার অবস্থা তো বুঝতেই পারছেন। সে বসে বসে খালি একটা ওয়েলশ রেয়ারবিট বানিয়ে কাঁচা শালগম আর আধসেদ্ধ মাংসের ত্রুটি ঢাকবার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। প্র্যাটের সেদিন সম্ভবত কোন রোগী মারা গিয়েছে। আবহাওয়া,বাজে খাবার,সারাদিনের খাটুনি সব মিলিয়ে তার মেজাজের থই পাওয়া ভার। বলে, “আমার বউ আমায় কেমন বিষ খাওয়াবার চেষ্টা করছে দেখছিস? কোনোদিন খাইয়েও দেবে হয়ত।”

খেয়াল করলাম কথাটা তার বউয়ের মনে বেজায় লেগেছে। ব্যাপারটাকে হালকা করে দেবার জন্য বললাম, “ধুস। মিসেস প্র্যাট বুদ্ধিমান মানুষ হয়ে অমন বোকার মতন কায়দায় খুন করতে যাবেন কেন?” তারপর আমি জাপানিদের সেই কাচতন্তু আর কুঁচিকুঁচি করা ঘোড়ার লোম দিয়ে বিষ খাওয়াবার সূক্ষ্ম কায়দাটায়দার গল্প শুরু করে দিলাম।

প্র্যাট ডাক্তার। এসব ব্যাপারে ভালোই জ্ঞানগম্যি আছে। কিন্তু আমিও কম যাই নাকি? বলে ফেললাম আয়ারল্যান্ডের সেই মহিলার গল্প। তিন-তিনবার বিধবা হয়েছিলেন। কেউ তাঁকে সন্দেহও করেনি।

গল্পটা শোনেননি নাকি? চার নম্বরের বার তাঁর শিকার জেগে ছিল। সে-ই তাঁকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। মহিলার ফাঁসি হয়েছিল। খুন করবার কায়দাটা দারুণ ছিল মহিলার। শিকার ঘুমোলে সরু একটা ফানেল দিয়ে তিনি তার কানের ভেতর কয়েক ফোঁটা গরম সিসে ঢেলে দিতেন। বাইরে থেকে দেখে কিচ্ছুটি বোঝবার জো নেই—না না –ওটা হাওয়ার শব্দ মশায়। ঝড়টা ফের ঘুরে আসছে কি না! ও আমি শব্দ শুনেই ধরতে পারি। তাছাড়া চিৎকারটা তো বললামই এক সন্ধেয় একবারের বেশি আসে না।

তা সে-ডিনারের কিছুকাল পর মিসেস প্র্যাট ঘুমের মধ্যে হঠাৎ করে মারা গেলেন। অলিম্পিয়ার পর যে স্টিমারটা ছেড়েছিল,তাদের কাছেই আমি নিউ ইয়র্কে বসে খবরটা পাই। সে বছর আপনি তো লিওফ্রিক নামের জাহাজে ছিলেন,তাই না? এই যে—এই পানীয়টা চেখে দেখুন দেখি একটু। একেবারে খাঁটি, পুরোনো হালসক্যাম্প মশাই। এ বাড়িটা যখন আমার হল তখন এর সেলারের মধ্যে বোতলটা খুঁজে পেয়েছিলাম। বোতলটা অবশ্য বছর পঁচিশেক আগে আমিই লিউককে কিনে এনে দিয়েছিলাম আমস্টারডাম থেকে। খুলেও দেখেনি কখনো। বেচারা বোধ হয় তার জন্য এখন ওপারে বসে একটু দুঃখ পায়।

হ্যাঁ,তা কত অবধি বলেছিলাম গল্পটা? মিসেস প্র্যাটের আকস্মিক মৃত্যু—হ্যাঁ। তার পর লিউক বোধহয় এখানে একটু একা হয়ে গিয়েছিল। মাঝেমধ্যে আমি এসে দেখা করে যেতাম। লিউককে বেজায় ক্লান্ত আর চিন্তিত দেখাত। বলত ডাক্তারিটা আর চালাতে পারছে না। তবে কোন অ্যাসিসট্যান্টও সে কিছুতেই রাখতে চায় না।

এইভাবে কয়েকটা বছর কেটে গেল। একদিন লিউকের ছেলেটা দক্ষিণ আফ্রিকায় মারা গেল। এরপর লিউক কেমন অদ্ভুত একটা হয়ে গেল। স্বাভাবিক মানুষের থেকে আলাদা। কিছু একটা যেন ভর করেছিল ওর ওপর। না না,পেশার ক্ষেত্রে কোনো ভুলভ্রান্তি করত না তা ঠিক, কিন্তু ওই কীরকম একট যেন আচরণ—মানে—বুঝতে পারছেন তো?

কমবয়সে লিউকের গায়ের রঙ বেজায় ফর্সা ছিল। মাথার চুল ছিল লাল। ছিপছিপে গড়ণ। মাঝবয়সে এসে সে কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আর ছেলের মৃত্যুর পর বেচারা ক্রমশই রোগা হয়ে যাচ্ছিল। তার দেখে মনে হত একটা চামড়ায় মোড়া খুলি। চোখগুলো কেমন যেন চকচক করত সবসময়। দেখলে বুক কাঁপে।

মিসেস প্র্যাটের বাম্বল নামে পেয়ারের কুকুর ছিল একটা। এখন সেটা প্র্যাটের সঙ্গে সঙ্গে সবজায়গায় ঘুরত। ভারী ভালো স্বভাবের একটা বুলডগ। মাঝেমধ্যে দাঁত খিঁচিয়ে অচেনা লোকজনকে একটু ভয় দেখাত শুধু। কখনো কখনো সন্ধেবেলা প্র্যাট আর বাম্বল একা একা চুপচাপ বসে একে অন্যের মুখের দিকে চেয়ে থাকত। হয়ত বসে বসে পুরোনো দিনের কথা ভাবত। মিসেস প্র্যাট তখন বেঁচে ছিলেন বোধহয়। সেই সময়গুলোর কথা। তখন এইরকম সন্ধেবেলায় তিনি বসে হাঁকতেন ওই যে—ওই যে-চেয়ারটায় আপনি বসে আছেন ওইটাতে। আর এই আমার চেয়ারটায় বসত প্র্যাট।

বসে থাকতে থাকতে বুড়ো মোটাসোটা কুকুরটা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ত। লাফাতে তো পারে না আর,তাই,প্র্যাটের চেয়ারের পায়া বেয়েই ওপরে উঠে পড়বার জন্য সে কী আপ্রাণ চেষ্টা তার। প্র্যাট তখন তার কংকালের মতো মাথার সামনে কয়লার টুকরোর মতো জ্বলন্ত দুটো চোখ নিয়ে কুকুরটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকত। মিনিট-পাঁচেক এইরকম চলবার পর হঠাৎ কুকুরটা থরথর করে কাঁপতে শুরু করত আর সেইসঙ্গে যেন গুলি খেয়েছে এইরকম করুণ আর্তনাদ বেরিয়ে আসত তার গলা থেকে। আর তারপর প্র্যাটের চেয়ার থেকে ছিটকে নেমে পড়ে চেয়ারের তলায় গিয়ে লুকিয়ে কুঁই কুঁই করে ডাকতে থাকত।

আমার কল্পনাশক্তি খুব কম, তবু আমি হলফ করে বলতে পারি সেই শেষের মাসগুলোতে প্র্যাটের মুখখানা দেখলে বহু দুর্বল-হৃদয় মানুষই ভিরমি যেতেন। সেটার দিকে তাকালে একটা চামড়া-ঢাকা খুলি ছাড়া আর কিছু মনে হওয়া সম্ভব ছিল না।

অবশেষে আমি একদিন তার বাড়িতে গেলাম। সেদিনটা ছিল ক্রিসমাসের ঠিক আগে। আমার জাহাজ তখন বন্দরে আর আমার তিন সপ্তাহ ছুটি। বাম্বল আশপাশে ছিল না। আর আমি একটু ঠাট্টা করেই জিজ্ঞেস করলাম কুকুরটা অবশেষে মারাই গেছে বুঝি। “হ্যাঁ।” প্র্যাট উত্তর দিল। অতটুকু বলাতেই তার গলার স্বরটা খুব অদ্ভুত ঠেকল আমার। কয়েক মুহূর্ত পর সে আবার বলল, “ওটাকে মেরেই ফেলেছি। আর সহ্য করতে পারছিলাম না।” আমি তাকে প্রশ্ন করলাম সে ঠিক কোন জিনিসটা আর সহ্য করতে পারছিল না। তবে উত্তরটা আমি জানতাম।

“আরে,কুকুরটার একটা বাজে অভ্যেস হয়েছিল। খালি গিয়ে ওই…মানে তার পুরোন চেয়ারটায় গিয়ে বসত আর আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকত।” এই বলে লিউক যেন একটু কেঁপে উঠল। “কিন্তু বিশ্বাস কর,কষ্ট পেয়ে মরেনি বেচারা বাম্বল,” সে প্রবল গতিতে বলে যেতে লাগল, যেন আমায় বোঝাতে চেয়ে যে সে নিষ্ঠুর নয়,“আমি ওর জলে কিছুটা ডায়োনাইন মিশিয়ে দিয়েছিলাম,তাতে ও নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল আর তারপর আস্তে আস্তে ক্লোরোফর্ম দিয়ে…ও কিন্তু এর কিছুই টের পায়নি, স্বপ্ন দেখতে দেখতেও নয়। এরপর থেকেই সব বেশ চুপচাপ হয়ে গেছে।”

সে যে ঠিক কী বলতে চাইছিল তা আমি বুঝতে পারছিলাম না,কারণ তার মুখের থেকে কথাগুলো যেন জোর করে ঠেলে বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু আজ আমি সব বুঝি। ও বলতে চেয়েছিল যে কুকুরটা যাওয়ার পর থেকে আওয়াজটা আর ও অত ঘনঘন শুনতে পেত না। হয়ত ও ভেবেছিল যে আওয়াজটা আসলে বাম্বলেরই চাঁদ দেখে চিৎকার,যদিও আওয়াজটা সেই ধরনের ছিল না। অবশ্য লিউক সে-কথা না জানলেও এখন তা আমি জানি। তাছাড়া একটা আওয়াজেরই তো ব্যাপার। আওয়াজ তো আর কারুর কোন ক্ষতি করে না। কিন্তু কল্পনাশক্তিটা লিউকের আমার চেয়ে ঢের বেশি ছিল। হ্যাঁ,জায়গাটায় যা ঘটে চলেছিল তা ব্যখ্যার বাইরে। কিন্তু যদি আমার সামনে এরকম কিছু হত তাহলে আমি সেটাকে ভূতের নেত্য বলতাম,কিন্তু কখনোই শুধু শুধু ধরে নিতাম না যে জিনিসটা আমাকে মারতে চাইছে। লিউক সারাদিন খালি তাইই ভাবত। আমি সবকিছুর ব্যখ্যা করতে পারিনা,আপনিও পারেননি। আসলে যে একবার সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছে সে কখনোই হলফ করে বলতে পারবে না যে দুনিয়ায় সব ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারে। আগে আমরা জলোচ্ছাস কেন হয় তার কোন ব্যখ্যা দিতে পারতাম না, মনে আছে? এখন আমরা বলি সমুদ্রের তলায় ভূমিকম্প হলেই নাকি জলোচ্ছাস হয়। আর আরো পাঁচ-গন্ডা থিয়োরি লিখি। তার মধ্যে হয়ত কোনোটাই ভুল নয়। কিন্তু তা তখনই কাজ করবে যখন আমরা সত্যি সত্যি জানতে পারব এই ভূমিকম্পটা আসলে কী। একবার আমাকে এরকম একটা জলোচ্ছাসের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আমি বসেছিলাম, হঠাৎ করেই আমার টেবিলের ওপর থেকে কালির দোয়াতটা সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল আমার কেবিনের ছাতে। ক্যাপ্টেন লেকির সঙ্গেও একই জিনিস ঘটেছিল, আমার মনে হয় আপনি তা পড়েছেন, তার ওই ‘রিঙ্কেলস’-এ। বাহ, ভাল, ভাল। এবার যদি এরকম একটা জিনিস ডাঙায় কোথাও,বা ধরুন এই ঘরটাতেই ঘটত, কোনো ভিতুর ডিম ভূত-প্রেত, ম্যাজিক কী না কী টেনে আনত এর ব্যাখ্যা করতে। কিন্তু যেটা শুধু একটা ‘বিস্ময়কর ঘটনা’ বলেই ছেড়ে দেওয়া যায়, সেটাকে নিয়ে এত গণ্ডগোল কেন? এই আমার মত, মশায়।

তাছাড়া,লিউক যে তার স্ত্রীকে খুন করেছে, তারও তো কোন প্রমান নেই। আপনি বলেই বলছি,অন্য কেউ হলে আমি তো এ-রকম একটা কথা ইঙ্গিতও করতাম না। শুধু এই যে আমার লিউককে ওই খুন করার কায়দাটার কথা বলার কয়েকদিনের মধ্যে বেশ কাকতালীয় ভাবেই মিসেস প্র্যাটকে বিছানায় মৃত পাওয়া যায়। আরে দুনিয়ায় কত মহিলাই তো ওভাবে মারা গেছে,শুধু কি ও একা? পাশের প্যারিশ থেকে লিউক এক ডাক্তারকেও ডেকে এনেছিল,আর সেই ডাক্তার আর সে, দু’জন মিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছিল যে মিসেস প্র্যাট হার্টের কী একটা দোষে মারা গেছেন। এরকম তো হরবখত হয়। অবশ্য কাছেই একটা হাতাও ছিল। আমি কাউকে সে ব্যাপারে কিছু বলিনি। ওদের শোবার ঘরের আলমারিতে হাতাটাকে দেখেই তো আমি ভিরমি খেয়ে গিয়েছিলাম। একেবারে নতুন ছিল জিনিসটা, লোহার ওপর টিনের পাতলা একটা পরত, দু-একবারের বেশি আগুনে দেওয়া হয়নি। একটুখানি গলানো সিসেও পেয়েছিলাম সেটার মধ্যে, নীচে আটকে ছিল। কিন্তু তাতে কিছুই প্রমাণ হয় না। আরে গ্রামের ডাক্তার জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবই নিজের হাতে করে থাকে। তাছাড়া লিউকের সিসে গলানোর আরও তো হাজারখানা কারণ থাকতে পারে। সমুদ্রে মাছ ধরতে ভালবাসতো ও। হয়ত বঁড়শির ওজনের জন্য বা ঘড়ির জন্য ওর দরকার ছিল বস্তুটার। সে যাই হোক, জিনিসটা পেয়ে আমার বড়ো অস্বস্তি হয়েছিল। হাতাটাকে আসলে একদম আমার সেই খুনের গল্পের মেশিনটার মতো দেখতে ছিল। বুঝতেই তো পারছেন তা দেখে আমার মনের অবস্থা কীরকম দাঁড়াল। জিনিসটাকে একেবারে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। এখনও হয়ত আছে কোথাও সেটা,সমুদ্রের তলায়, স্পিট-এর মাইল খানেক দূরে। কখনো ডাঙায় ভেসেও এলে ক্ষতি নেই। ততদিনে সেটা আর চেনার অবস্থায় থাকবে না।

লিউক নিশ্চয়ই ওটাকে গ্রাম থেকেই কয়েক বছর আগে কিনেছিল। গ্রামে একটা লোক এখনও সেইরকম হাতা বেচে। রান্নার কাজে লাগে বোধহয়। সে যা হোক কোনো চালাকচতুর কাজের মেয়ের হাতে যদি সিসে-সুদ্ধ সেটা একবার পড়ে যেত, তাহলে আর দেখতে হত না। সে হয়ত প্লাম্বারের ছেলের বউ সেই অন্য মেয়েটাকে গল্পটা শোনাতো গিয়ে, সে আবার আমায় ডিনারের সময় সে-গল্পটা বলতে শুনেছিল। তার হয়ত মনেও ছিল গোটা ব্যাপারটা।

বুঝতে পারছেন তো গোটা ব্যাপারটা। লিউক প্র্যাট অনেকদিন আগেই ইহলোক ত্যাগ করেছে আর এখন তার সেই বউ-এর পাশের কবরেই রয়েছে সে। কবরের ফলক অনুসারে সে একজন ভাল লোক, কর্তব্যপরায়ণ,সৎ ও খাটিয়ে লোক। আমি আর পুরোনো কথা বলে মৃত মানুষটার স্মৃতিটাকে নোংরা করতে চাই না। স্বামী, স্ত্রী, ছেলে – তিন জনের কেউই আর বেঁচে নেই। আর এমনিতেও লিউকের মৃত্যুর সময় যথেষ্ট ঝামেলা হয়েছিল।

কেমন ঝামেলা? ওর মৃতদেহটাকে সমুদ্রের ধারে পাওয়া গিয়েছিল এক সকালে। আর যথারীতি করোনারকে দিয়ে একটা তদন্ত করানো হয়েছিল গোটা ব্যাপারটাকে নিয়ে। ওর গলার চারধারে অদ্ভুত কয়েকটা দাগ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু জিনিসপত্র কিছু চুরি বা ছিনতাই হয়নি। শেষমেষ আন্দাজ করা হয়েছিল যে ‘রাক্ষুসে কোন মানুষ বা কুকুরের হাতে বা কামড়ে’ মৃত্যু হয় প্র্যাটের। অর্ধেক জুরি ভেবেছিল যে একটা বড়ো কুকুর প্রথমে ওকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে ওর শ্বাসনালী কামড়ে ধরেছিল,কারণ ওর ঘাড় মটকায়নি। ও যে কখন বেরিয়েছিল,কোথায় যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিল তা কেউ জানতো না। সমুদ্রের ধারে দেওয়ালের গায়ে যেখানে জোয়ারের জলের দাগ,ঠিক সেখানে চিৎ হয়ে পড়েছিল। হাতের নীচে ছিল তার স্ত্রী-এর পুরোন একটা টুপির বাক্স,ঢাকনা খোলা। বাক্সটাতে ও একটা খুলি নিয়ে যাচ্ছিল...আরে ডাক্তাররা এসব করে থাকে কখনো-সখনো। খোলা বাক্স থেকে গড়িয়ে গিয়ে খুলিটা ওর মাথার কাছে পড়ে ছিল। আশ্চর্য রকমের সুন্দরও ছিল সেটা। ছোট্ট,চমৎকার আকৃতির ও খুব সাদা,আর তাতে মুক্তোর মতো নিঁখুত দাঁত। দাঁত বলতে খালি ওপরের সারিটার কথাই বলছি। নীচের চোয়ালটার কোন চিহ্ন ছিল না। অন্তত প্রথম যখন দেখি তখন ছিল না।

হ্যাঁ, এখানে এসে জিনিসটা দেখেছিলাম আমি। জিনিসটা না, খুব সাদা আর চকচকে ছিল,যেন পালিশ করা। ওটাকে কাচের শো-কেসে করে সাজিয়ে রাখবার মতো করে রেখে দিয়েছিল কেউ। জিনিসটা কোত্থেকে এসেছিল,বা সেটা নিয়ে কীই বা করা হবে,তা কেউ জানত না। তাই বোধহয় ওরা সেটাকে আবার সেই বাক্সে ভরে রেখে বাড়ির সবচেয়ে ভাল শোবার ঘরের আলমারির একটা তাকে তুলে রেখেছিল বস্তুটাকে। আমি বাড়িতে থাকতে এলে আমাকে ওরা সেটাকে দেখিয়েও দিয়েছিল। খালি একটা জিনিসেরই কেউ কোনো ব্যাখ্যা করতে পারেনি। খুলিটা বালির ঢাল বেয়ে নীচে সমুদ্রের দিকে গড়িয়ে যাওয়ার বদলে লিউকের মাথার কাছে উঠল কী করে? তখন আমার ব্যাপারটা সেরকম অদ্ভুত লাগেনি, মশায়। কিন্তু পরে অনেক ভেবেছি এই নিয়ে। ঢালটা বড়োই খাড়া। কালকে আপনাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে নাহয় দেখিয়ে দেব, যদি আপনি চান। পরে সেখানে পাথর দিয়ে আমি একটা স্তম্ভ মতো বানিয়ে রেখেছি।

ও যখন পড়ে গিয়েছিল, বা ওকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল...সে যাই ঘটে থাক...বাক্সটা বালিতে পড়ল, ঢাকনাটা খুলে এল, আর জিনিসটা বেরিয়ে এল,তারপরে তো তার গড়িয়ে পড়ে যাওয়ার কথা,কিন্তু সে তা যায়নি। সেটা তার মাথার একদম ধারে প্রায় ছুঁয়েই বসে ছিল লক্ষ্মী হয়ে,মুখটা তার দিকেই ঘোরানো ছিল। লোকটার মুখে শুনে ব্যাপারটা আমার বিশেষ অদ্ভুত ঠেকেনি; কিন্তু আমি সেটা নিয়ে চিন্তা না করে আর পারলাম না,বারবার ভাবতে লাগলাম। শেষে চোখ বুজলেই গোটা দৃশ্যটা ভেসে উঠত আমার সামনে। আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম আপদটা নীচের দিকে গড়িয়ে যাওয়ার বদলে উপর দিকে উঠে কেন এসেছিল? আর অন্য কোথাও থামার বদলে ঠিক লিউকের মাথার ধারেই কেন বসেছিল এসে?

আপনি নিশ্চয়ই জানতে চান শেষমেষ এই ব্যাপারে কী উত্তর পেলাম আমি। গড়িয়ে যাওয়াটার কোনই ব্যাখ্যা পাইনি, মশাই।

কিন্তু এই সময় আমার মাথায় আরেকটা চিন্তা বাসা বাঁধল, আর এতে আমার অশ্বস্তি বাড়ল বৈ কমল না।

না, না, অতিপ্রাকৃত কিছু নয়! ভুত থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। যদি থেকে থাকে তাহলে আমি মনে করি না যে সে কোনোভাবেই জ্যান্ত মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে, শুধু একটু-আধটু ভয় দেখানো বাদে। আর আমার ব্যক্তিগত মতামত এই যে সমুদ্রের গভীরে ঘন কুয়াশার বদলে আমি যে-কোনো ধরনের ভূতের সাক্ষাৎ করতে রাজি। না, আমার মনে খচখচানিটা ঘটাচ্ছিল একটা হাস্যকর চিন্তা, আর আমি জানি না সেটা কীভাবে শুরু হয়েছিল, আর কীভাবেই বা নিজের মতো বেড়ে উঠে সেটা একরকম ধ্রুবসত্যে পরিণত হল, তা আমি সত্যিই জানি না।

এক সন্ধ্যেবেলা আমি লিউক ও তার বেচারি বউয়ের কথা ভাবছিলাম পাইপ টানতে টানতে, হাতে একটা একঘেয়ে বইও ছিল। হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা খুলিটা তো লিউকের বউয়েরই হতে পারে, আর তারপর থেকে এই চিন্তাটার হাত থেকে নিস্তার পাইনি আমি। আপনি নিশ্চয়ই বলবেন যে চিন্তাটার মাথামুন্ডু নেই কোন,মিসেস প্র্যাটকে যে-কোনো ক্রিশ্চানের মতই কবরখানায় কবর দেওয়া হয়েছে। আর তার বর কিনা তার মুন্ডুটা শোয়ার ঘরের আলমারিতে একটা বাক্সে ভরে রেখেছে! এই ভাবনাটাই তো ভয়ানক! কিন্তু সে যাই হোক, অনেক ভেবে, যুক্তি, সাধারণ বুদ্ধি ও সম্ভাব্যতার মুখোমুখি হয়ে আমি তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে ঠিক এইটাই করেছিল। অবশ্য ডাক্তাররা তো কতই এ-রকম অদ্ভুতুরে কাজ করে-টরে থাকে,তাতে আমার আপনার মতো মানুষের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়।

তাহলে...বুঝতে পারছেন তো, খুলিটা যদি তার বউয়েরই হয় তাহলে সেটা লিউকের আলমারিতে আসবার একটাই উপায়, লিউক তার বউটাকে খুন করেছিল,ঠিক যেভাবে আমার গল্পের বউটা খুন করেছিল তার স্বামীকে। আর খুনটা করে সে নিশ্চয় ভয় পেয়েছিল যে হয়ত একদিন ব্যাপারটা নিয়ে তদন্ত হবে,আর তাতে তার ধরা পড়বার সম্ভাবনা আছে। তাই মাথাটাকে...

মজা হল, এই কথাটাও আমি লিউককে বলেই এসেছিলাম। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে, সেই মহিলার ঘটনাটা প্রকাশ্যে আসবার পর তার স্বামীদের কবর খুঁড়ে তিনটে করোটিও তুলে আনে পুলিশ। তাদের প্রত্যেকটার ভেতরে একটা করে সিসের ছোট্ট দলা টকাটক শব্দ করছিল। ওইতেই তো মহিলার ফাঁসি হল! কথাটা লিউক মনে রেখেছিল নিশ্চয়। বউয়ের কানে সিসে ঢালবার পর এই কথাটা যখন তার মনে পড়ল তখন সে কী করেছিল?

না মশায়। অত নারকীয় একটা দৃশ্য কল্পনা করতেও আমার রুচিতে বাধবে। আপনারাও নিশ্চয় ওসব দৃশ্যের কথা শোনবার জন্য গল্পটা পড়ছেন না? নাকি...চাইছেন? চাইলে পরে গল্পের এইখানটাতে নিজেই লিখে নিন না, সে দৃশ্যটা ঠিক কেমন ছিল?

নিশ্চয় খুব ভয়ংকর দৃশ্য ভাবছেন, তাই না? ঠিক তাই। কেন যে আমি ছবির মতো সবকিছু দেখতে পাই ব্যাপারটার কে জানে? কাজটা লিউক করেছিল তার বউকে কবর দেবার আগের রাত্তিরে। কফিনের ডালা তখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, বাড়ির কাজের মেয়েটাও ঘুমিয়ে, ঠিক তখন...

আমি বাজি ধরে বলতে পারি, মুণ্ডুটা কেটে নেবার পর তার জায়গায় লিউক একটা কিছু রেখে দিয়েছিল যাতে বোঝা না যায় মুন্ডুটা নেই। কী দিয়ে থাকতে পারে?

আমায় পাগল ভাবছেন? তাতে আপনাদের দোষ নেই। নিজেই প্রথমে বললাম ওসব ভয়ানক দৃশ্য লেখবার রুচি আমার নেই। তারপর এমনভাবে বর্ণনাটা দিয়ে যাচ্ছি যেন সেখানে ঘটনার সময় আমি সশরীরে হাজির ছিলাম। যেমন ধরুন, বউয়ের মাথার জায়গায় লিউক কী দিয়েছিল সেটা আমি বলে দিতে পারি। দিয়েছিল মেয়েটার সেলাইয়ের ব্যাগটা। ব্যাগটা আমার পরিষ্কার মনে আছে, কারণ প্রত্যেকদিন সন্ধেবেলাই ব্যাগটা তার সঙ্গে থাকত। মখমল কাপড়ে তৈরি, ঠেসে জিনিসপত্র ভরলে সেটাকে দেখতে অনেকটা – বুঝতেই পারছেন। ওই যে, আবার ভুরু কোঁচকাচ্ছেন। হাসুন, হাসুন, আপনি তো আর লিউককে গলানো সিসের গল্পটা শোনাননি, আর যে বাড়িটায় কাজটা করা হয়েছিল সেখানে আমার মতো একলা একলা থাকেনও না। আমি নার্ভাস মানুষ নই। তবে মাঝে মাঝে আমি বুঝতে পারি কেন কোনো কোনো মানুষ এত নার্ভাস হয়। একা একা রাতে বসে এই সমস্ত কথা আমি ভাবতে থাকি, স্বপ্নও দেখে ফেলি মাঝেমধ্যে। আর, বস্তুটা যখন চিল্লায়, তখন তো—যাক গে!

কিন্তু আমার তো নার্ভাস হওয়া উচিত নয়। আমি একবার একটা ভূতুড়ে জাহাজে সওয়ারিও করেছি। জাহাজাটার মাস্তুলে একটা মানুষ দেখা দিয়েছিল, আর নাবিকদের বেশির ভাগই তারপর বন্দরে ফেরবার দশদিনের মধ্যেই জ্বর হয়ে মারা পড়ে। কিন্তু আমার কিচ্ছুটি হয়নি সেবারে। আপনাদের মতো আমিও কিছু কিছু ভয়ানক দৃশ্য দেখেছি জীবনে, যেমন সকলেই দেখে। কিন্তু তার কোনোটাই এই খুলিটার মতন আমাকে চমকে দিতে পারেনি। অনেকবার—বুঝলেন, অনেকবার জিনিসটাকে বিদেয় করবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেটা তা মোটেই পছন্দ করে না। যেখানটায় সে আছে সেইখানটাতেই বসে থাকতে চায়। সেরা বেডরুমটাতে কাবার্ডের ভেতর মিসেস প্র্যাটের বাক্সটার মাথায়। অন্য কোথাও গিয়ে তার সুখ নেই। কেমন করে জানলাম? কারণ, আমি সে চেষ্টা করে দেখেছি। ভাবলেন কী করে যে আমি ওটাকে সরাবার চেষ্টা করিনি? ওখানে যদ্দিন ধরে ওটা আছে, মাঝেমাঝেই হঠাৎ হঠাৎ চিল্লিয়ে ওঠে, বিশেষ করে বছরের এই সময়টায়। কিন্তু জায়গা থেকে সরালে সে একটানা চিৎকার করে চলবে। চাকর-বাকর কাজ ছেড়ে পালায় মশায়। একা হাতে ওই চিৎকার সয়ে দশ পনেরোদিন সব সামলাতে হয় তখন আমাকে। গ্রামের একটা লোক ও-বাড়ির ছাদের নীচে এক রাতও কাটাতে চায় না এখন। বিক্রি করা বা ভাড়া দেয়া তো কল্পনারও অতীত। গ্রামের লোকজনের বক্তব্য ওখানে থাকলে আমার পরিণতিও খুব খারাপ হবে একসময়।

আমি অবশ্য তাতে ভয় পাই না। যত্তোসব ননসেন্স। খিল্লি একটা শব্দ। ও নিয়ে অত ভাববার কী আছে? চেয়ারের পাশে ভূত তো এসে দাঁড়াচ্ছে না আর ঘাড় মটকাবার জন্য! তাছাড়া খুলিটার ব্যাপারে আমি যেসব কথা ভাবছি সে-সবই যে একেবারে ঠিক তাই বা কে বলল? মনে হয় ভুলই ভাবি, তাই না? হয়ত লিউক অনেকদিন আগে কোনোখান থেকে একটা সুন্দর নমুনা হিসেবে ওটা জোগাড় করে নিয়ে এসেছিল। আর ওটাকে নাড়ালে ভেতরে যে ঠকঠক করে শব্দ হয় সেটা একটা মাটির ড্যালা—হতেই পারে। অনেকদিন মাটির তলায় থাকা খুলির মধ্যে ওরকম মাটি বা পাথরের নুড়ি তো ঢুকে যায়ই, তাই না? উঁহু। জিনিসটা আমি কখনো বের করে দেখবার চেষ্টা করিনি। কারণ ওটা যে ঠিক কী সেটা আমি জানতে সাহস পাই না। যদি ওটা সিসে হয় তাহলে তো আমিই ওর খুনটা করিয়েছি। তার সঙ্গে নিজে হাতে মারবার আর কী তফাৎ? তাই যতক্ষণ খুলিটার মধ্যে ঠিক কী রয়েছে সেটা না জানছি ততক্ষণ আমি আমার সন্দেহটাকে একটা ফালতু বাতিক বলেই চালিয়ে দিতে পারি নিজের কাছে। ভেবেই নিতে পারি যে মিসেস প্র্যাটের মৃত্যু একেবারেই স্বাভাবিক কোনো কারণে ঘটেছিল আর লিউক যখন লন্ডনে ডাক্তারি পড়ছে তখন থেকেই খুলিটা ওর সঙ্গে ছিল, এইটেও ভেবে নিতে কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু—আমি সে ব্যাপারে খুব একটা নিশ্চিত নই।

সে যাই হোক, সবচেয়ে ভালো বেডরুমটাতে আরাম করে শোবার চেষ্টা আমাকে ছাড়তে হয়েছে। হ্যাঁ। আপনি বলতেই পারেন জ্বালানি-পোড়ানিটাকে একটা পুকুরের জলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেই তো ল্যাঠা চোকে। বলতেই পারেন! বলুন। কিন্তু প্লিজ ওই জ্বালানি-পোড়ানি গালাগালটা দেবেন না। ও গালাগাল একদম সইতে পারে না।

ওই যে ফের শুরু হল। ভগবান! কী বিশ্রি আওয়াজ! বলেছিলাম আপনাকে, গাল দেবেন না! হল তো? নিন, পাইপে তামাক ঠাসুন দেখি ভালো করে! আর চেয়ারটা আগুনের কাছে ঠেলে নিন আরেকটু। কিছু পান করবেন নাকি? বাইরে আজ রাতটা বেজায় ভেজা আর ঠান্ডা তো, তাই বলছিলাম আর কি! বাতাস কেমন গোঁ গোঁ করছে শুনতে পাচ্ছেন?

আপনি যদি ওকথা না বলতেন তাহলে আমরা নিশ্চয়ই ওই চিৎকার শুনতাম না,এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আপনি ব্যাপারটাকে কাকতালীয় বলতেই পারেন,সে আপনার ইচ্ছা। কিন্তু কিছু মনে করবেন না,আমার মনে হয় আপনার আর ওকে গাল দেওয়াটা উচিত হবে না। আহা রে,হয়ত বেচারি বউটা শুনতে পায়,শুনে দুঃখ পায়,বুঝতে পারছেন না আপনি?

ভূত? না,না! যে জিনিসটাকে দিনের বেলা হাতে নিয়ে দেখতে পারি,আর ঝাঁকালে খটখট করে ওঠে সেটাকে তো আর ভূত বলা যায় না ঠিক। কিন্তু জিনিসটা সব শোনে,সব বোঝে,এ-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। এখানে প্রথম থাকতে এসে আমি সেরা শোবার ঘরটাতে ঘাঁটি গাড়বার চেষ্টা করেছিলাম। কারণ গোটা বাড়িতে সবচেয়ে বেশি আরাম ওই ঘরটাতেই। কিন্তু কিছুদিন পরেই সে আশা ছেড়ে দিতে হল আমায়,বুঝলেন মশায়। ওই ঘরেই তো আগে শুতো ওরা। আর ওই খাটেই তো বেচারির মৃত্যু। আর আলমারিটা দেয়ালের গায়ে,খাটের মাথার দিকে। ওখানেই ওটা থাকতে চায়,ওর ওই বাক্সে। আমি এখানে আসার পর সপ্তাহ দু’য়েক ওই ঘরে থাকতে পেরেছিলাম,তারপর বাপ বাপ করে নীচতলায় ছোটো একটা ঘরে চলে গেলাম, লিউকের সার্জারিতে। রাত্তিরে কল আসবার সম্ভাবনা থাকলে লিউক ওখানে শুতো।

ডাঙায় থাকলে আমি চিরকালই মড়ার মতো ঘুমোই। আট ঘন্টা হল আমার রোজকার হিসেব। একা থাকলে এগারোটা থেকে সাতটা। সঙ্গে কেউ থাকলে বারোটা থেকে আটটা। কিন্তু ওই ঘরে ভোর তিনটের পর আর ঘুমোতে পারতাম না। ঠিক সোয়া তিনটেতে শুরু হত, আমি আমার পকেট ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। ঠিক তিনটে বেজে সতেরোতে। হয়ত ওই সময়ই ও খুন হয়েছিল।

আপনি যেটা শুনলেন সেরকম কিছু নয়। ও-রকম হলে আমি দু’রাতের বেশি সহ্য করতে পারতাম না। খালি আলমারি থেকে একটু কেমন আঁতকে ওঠার আওয়াজ, একটু গোঙানি, টেনে টেনে নিশ্বাসের শব্দ, কয়েক মুহূর্ত ধরে। সাধারণত অতটুকু আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙার কথাই নয়। এইদিক থেকে আপনিও বোধ করি আমার মতো,আর আর পাঁচটা নাবিকদের মতই প্রাকৃতিক আওয়াজে আমাদের কিছু আসে যায় না। বেজায় ঝড়ে সমুদ্র উথালপাথাল হলেও নয়।

কিন্তু যদি একটা পেনসিল হঠাৎ ভেসে উঠে কেবিনের টেবিলে ড্রয়ারের মধ্যে খটখট করতে থাকে তাহলে মুহূর্তের মধ্যে আমি উঠে পড়ব। এইরকমই – সবসময় আমি বুঝতে পারি। সে যাই হোক, আলমারির শব্দটা ওর থেকে বেশি কিছুই ছিল না, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল।

আমি আঁৎকে ওঠার আওয়াজ বলেছিলাম। আমি জানি আমি ঠিক কী শুনেছি,কিন্তু অন্য কাউকে সেটা বোঝাতে গেলে পাগলের প্রলাপ মনে হবে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আঁৎকে ওঠার আওয়াজ নেই কোন, দাঁত চিপে রেখে, ঠোঁট দুটো ফাঁক করে খুব জোরে নিশ্বাস টানার আওয়াজ হতে পারে বড়োজোর। আর কাপড় সরে যাওয়ার মৃদু শব্দ। এইরকমই কিছু শুনতে পেয়েছিলাম আমি।

টের পাচ্ছিলাম কাবার্ডের মধ্যে কিছু একটা শুরু হয়েছে। শব্দটা হয়ত কাবার্ডে নয়, আমার মাথার মধ্যেই হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন একটা বাক্সের মধ্যে থেকে চাপাভাবে বেরিয়ে আসছে। শুনে কিন্তু তখন মাথার চুলও খাড়া হয়ে যায়নি, রক্তও ঠান্ডা হয়ে যায়নি। শুধু ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল কাবার্ডের কোনো একটা ফাটল দিয়ে বাইরের বাতাস ঢুকেছে ভেতরে। আলো জ্বালিয়ে ঘড়িতে দেখলাম রাত তিনটে সতেরো।

বাঁ কানটায় কম শুনি। ছোটোবেলায় একবার সমুদ্রে ডাইভ দিতে গিয়ে চোট লেগেছিল। কাজেই এবার কাত হয়ে ডান কানটা বালিশে চেপে ফের চোখ বুঁজলাম। আওয়াজ কিন্তু থামল না। আর তারপর প্রত্যেক রাতে ওই একই সময়ে–

দিনপনেরো এমন চলার পর আর সহ্য হল না। হয়েছিল কী,সেদিনও ভালো কানটাকে বালিশে গুঁজে শুয়েছিলাম। ও অবস্থায় বালিশের পাশে ফগহর্ন বাজলেও আমার কিছু শুনতে পাবার কথা নয়। কিন্তু সেদিন দেখি আমার বাঁ কানেও শব্দটা শুনতে পাচ্ছি। মাথাটা গরম হয়ে গেল আমার। সটান উঠে বসে আলো জ্বালিয়ে কাবার্ড খুলে ফেললাম। তারপর বাক্সটাকে বের করে এনে একটানে জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। আর তারপরেই মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠল আমার। জিনিসটা চিৎকার করে উঠল! বারো ইঞ্চি কামানের গোলার শিসের মতন আওয়াজ করে উড়ে গিয়ে পড়ল রাস্তার একেবারে ওপারে।

সে-রাতে আর ঘুম হবে না বুঝে উঠে পড়লাম আমি। পাইপ জ্বালিয়ে একটা বই টেনে নিয়ে পড়তে বসলাম, কিন্তু তার একটা লাইনও আমার মাথায় ঢুকছিল না। মাথায় না ঢুকবার কারণ ওই চিৎকার। আধঘন্টাটাক বাদেই বাইরে থেকে ফের এই আজকের রাতের মতো চিৎকারের শব্দ ভেসে এল। তারপর খানিক বাদেবাদেই বারবার চিৎকার উঠছিল, আর মনে হচ্ছিল প্রতি বারে সেটা আরো কাছে এগিয়ে আসছে। শেষমেষ আর যখন সহ্য হচ্ছে না তখন নীচে,বাইরের দরজায় কে যেন টোকা দিল। ভাবলাম বাঁচা গেল। একটা মানুষের শব্দ হাজার হোক।

তাড়াতাড়ি নীচে গিয়ে দরজা খুলে দেখি কেউ কোথাও নেই। ঠিক তক্ষুনি মেঝেতে কিছু একটা গড়িয়ে এসে পায়ে ঠোক্কর খেয়ে থেমে গেল। চমকে উঠে দেখি খুলিটা এসে পায়ের কাছে ঠেকেছে।

তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে জিনিসটাকে হাতে তুলে টেবিলের ওপর মোমবাতিটার পাশে বসিয়ে দিলাম। মোমের কাঁপা কাঁপা আলোয় বারবার মনে হচ্ছিল খুলিটার চোখের কোটরগুলো খোলাবন্ধ করছে। আর — তারপর — হঠাৎ করে মোমবাতিটা নিভে গেল। হাওয়াবাতাস কিছু ছিল না অবশ্য। এমনি-এমনিই নিভে গিয়েছিল সেটা। গোটা ছ’য়েক দেশলাইকাঠি নষ্ট হল আমার সেটাকে ফের জ্বালাতে।

হ্যাঁ ভয় পেয়েছিলাম আমি। অস্বীকার করে লাভ নেই। চুপচাপ বসে খুলিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বইছিল আমার। মনে হচ্ছিল,সে ফিরে এসেছে। দোতলায় নিজের জায়গাতে ফিরে যেতে চায়। আস্তে আস্তে উঠে খুলিটাকে নিয়ে ফের তার জায়গায় ফিরিয়ে দিয়ে এলাম। মনে আছে যেতে যেতে সেটার সঙ্গে কথাবার্তাও বলছিলাম আমি। বাকি রাতটা জেগেই কাটিয়ে দিলাম আমি। আলোটা জ্বালিয়েই রেখেছিলাম। রাস্তা পেরিয়ে যে খুলি এসে দরজায় টোকা দিতে পারে তার সঙ্গে এক ঘরে থেকে ঘুম আসা সম্ভব নয়।

সকাল হতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে থেকে খুলির বাক্সটাকে ফেরত এনে কাবার্ডের খুলিটাকে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম। খানিক বাদে কাজের মেয়েটা ফ্যাকাশে মুখে আমার সকালের খাবারটা নিয়ে এসে বলল,মাইনেটাইনেয় কাজ নেই,সে আর এ-বাড়িতে থাকছে না। না বোঝার ভান করে বেশ অবাক অবাক মুখ করে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা কী? সে তাতে পাত্তা না দিয়ে মুখ-ঝামটা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল আমি কি এই ভূতের বাড়িতে এর পরেও থেকে যেতে চাই নাকি। আর থাকলে আমি আর কদিন প্রাণে বাঁচব সে বিষয়ে কিছু ভেবেছি কি না!

কাজের মেয়ে চলে যাবার পর সেদিন আমি সেরা ঘরে ঘুমোবার আশা ত্যাগ করে নীচতলায় নেমে এলাম। ক’দিন বাদে কিছু মাঝবয়েসি কয়েকটা স্কটিশ কাজের লোক জোগাড় করে নিয়ে এলাম বাড়িতে। এরপর বেশ ক’দিন খুব নিশ্চিন্তে কাটনো গেল। দুই নতুন কাজের মহিলা গল্পটল্প শুনে বাঁকা হেসে বললেন,ওসব কর্নিশ ভূতের গল্পে তাঁদের বিশ্বাস নেই। এর আগে নাকি তাঁরা গুটি দুই ভূতের বাড়িতে কাজ করে এসেছন,কিন্তু ভূতের টিকিটিও দেখেননি। তবে সে-বছরের শেষের দিকে তাদের একজন কাজে জবাব দিল আর অন্যজন আমাদের চার্চের পাদ্রি জেমস ট্রেনহ্যামকে বিয়ে করে সংসার পাতল।

অতএব এখন রাতে আমি বাড়িতে একলাই থাকি। দিনের বেলায় মিসেস ট্রেনহ্যাম এসে সব কাজকর্ম সেরে দিয়ে যান। খুলিটাকে দেখবেন ভাবছেন? আমার কোনো আপত্তি নেই মশাই। নিখুঁত খুলি। শুধু নীচের চোয়ালের দুতিনটে দাঁত নেই। বলতে গিয়ে মনে পড়ল, খুলিটার নীচের চোয়ালটা কিন্তু ট্রেনহ্যামই খুঁজে পেয়েছিল। গত বসন্তে অ্যাসপারাগাস রুইবার জন্য বাগানে গর্ত খুঁড়তে গিয়ে সে চোয়ালটা খুঁজে পায়। মাটি খুঁড়তে গিয়ে একদলা পোড়া চুন উঠেছিল। তার মধ্যেই চোয়ালটা আটকে ছিল। ট্রেনহ্যামের এ-ব্যাপারে ভালো অভিজ্ঞতা আছে। বলে এটা কোন কমবয়েসি মেয়ের। মরার সময় দাঁতগুলো তার আস্তই ছিল,তবে মাটি খোঁড়বার সময় কোনভাবে সেগুলো খুলে বেরিয়ে গেছে। জিনিসটা আমার কাছে নিয়ে সে বলে, চাইলে আমি সেটা রেখে দিতে পারি,আর তা না হলে সে চার্চের কোনো কবরে সেটা দিয়ে দেবে। হয়ত কোন সৎ খ্রিষ্টানের হাড়! ঠিকঠাক কবরে যাওয়াই তার উচিত হবে।

তাকে বললাম,ডাক্তাররা অনেকসময় চুনের মধ্যে হাড় রেখে দেয় তাকে ঠিকঠাক পরিষ্কার করবার জন্য। বোধ হয় প্র্যাটও এই উদ্দেশ্যেই এইটেকে চুনের মধ্যে ভরে মাটির তলায় পুঁতে রেখেছিল।

জবাবে ট্রেনহ্যাম শুধু আমার দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে বলে, “আপনার ঘরে রাখা খুলিটার সঙ্গে চোয়ালটা বোধ হয় মানিয়ে যাবে স্যার। ওই খুলিটাকেই বোধ হয় প্র্যাট ডাক্তার চুনের মধ্যে রেখেছিল পরিষ্কার করবার জন্য। তারপর সেটা বের করে নেবার সময় চোয়ালটা সেখানেই থেকে যায়। কী বলেন? চুনের ড্যালাটার মধ্যে মানুষের মাথার দু-এক গাছি চুলও ছিল স্যার।”

ট্রেনহ্যাম বোধ হয় কিছু জানে। ওর চার্চের চ্যাপেলেই তো ওদের কবর দেয়া হয়েছে। মিসেস প্র্যাটকে কবর দেবার সময় কি খেয়াল করেছিল যে ওর মাথাটা নেই? নাকি লিউককে একই জায়গায় গোর দেবার সময়–

ঝড় উঠছে আবার! আওয়াজ পাচ্ছেন? আজকের রাতটা ভালো যাবে না মশাই! কিছুতেই ভালো যাবে না!

“যাকগে সে কথা। গল্পটা বলি। ট্রেনহ্যামের থেকে চোয়ালটা নিয়ে এসে আমি খুলিটার সঙ্গে লাগিয়ে দেখি একেবারে মিলে গেছে। দেখবেন? দেখাব, দেখাব। তবে তাড়া কীসের? সবে তো সাড়ে ন’টা বাজে মশাই। খাওয়া দাওয়া শেষ। একটি পাইপ টেনে নিই প্রথমে।

যা বলছিলাম, খুলিতে চোয়ালটা মাপে মাপে বসাতে গিয়ে হঠাৎ একটা আজব ব্যাপার ঘটল। ওর দাঁতগুলো আমার আঙুলটাকে কামড়ে ধরল যেন। সত্যিকথা বলব মশাই, আচমকা কামড় খেয়ে চমকে একটু লাফ দিয়ে উঠেছিলাম আমি। খেয়াল হয়নি নিজেই চোয়ালটাকে চাপ দিয়ে ধরে আছি। উঁহু। নার্ভাস হইনি। বাইরে তখন ফটফটে দিনের আলো। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো পড়ছিল ঘরে। ভয় পাইনি, তবে লিউকের মৃত্যু নিয়ে করোনারের কথাগুলো হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছিল, ‘মৃত্যুর কারণ, অজানা কোনো জন্তুর হাত বা দাঁত...’

যাকগে, বাক্সটা নিয়ে আসি বরং। আপনাকে খুলিটা দেখাই। দেখুন তো ওর ভেতরে খটখট শব্দ করে যে জিনিসটা সেটা সত্যিই একটা সিসের টুকরো না অন্যকিছু? যদি দেখেন ওটা একদলা শুকনো মাটি, বা একটুকরো পাথর, তাহলে আমার বুকের থেকে একটা ভার সরে যাবে মশাই। ও খুলির কথা তারপর আমি আর জীবনে ভাবব না। কী বললেন? উঁহু, আমি নিজে কখনো জিনিসটা বের করে দেখবার সাহস পাই না। কেমন যেন অস্বস্তি হয়।

দাঁড়ান। আমি গিয়ে নিয়ে আসি। কী বললেন? আপনি আমার সঙ্গে যাবেন? হা হা। ভাবছেন আমি ভয় পাচ্ছি? ধুস!

কী? বলছেন লন্ঠনটা সঙ্গে নিয়ে যেতে? না মশায়। হাত থেকে কখনো জ্বলন্ত লন্ঠন খসে পড়েনি আমার। পড়লে বিপদ হতে পারে, তাও বোঝেন না? আমি বরং মোমবাতি নিয়ে যাই একটা। ওতে ভয় কম।

নাহ, এবারে সত্যিই যাব। নইলে আপনি আবার ভেবে বসবেন যে-কথা বলে বলে আমি ওপরে যাওয়াটা এড়িয়ে যাচ্ছি কেবল। আপনি পানীয়টা শেষ করতে থাকুন, আমি এলাম বলে...

***

এই যে। নিয়ে এসেছি বাক্সটা। খুব সাবধানে ধরে এনেছি। আহা বেচারা! নাড়াচাড়া হলে চোয়ালটা খুলে আসতে পারে তো! তাহলে ও রেগে যাবে, আমি নিশ্চিত। আনতে আনতে মোমবাতিটা নিভে গিয়েছিল। না না কোনো অতিপ্রাকৃত কারণ নেই। হাওয়া – হাওয়া – অন্ধকারের মধ্যে একটা চিৎকার শুনেছিলেন না? আমাকে একটু ফ্যাকাশে লাগছে? ধুর মশাই? তা কেন লাগবে? চিৎকারটা ওই বাক্স থেকে বেরোয়নি। আমি হলফ করে বলতে পারি। বাক্সটা হাতে নিয়ে যখন আসছি তখনই তো চিৎকারটা উঠল। তাহলে সেটা বাক্স থেকে আসবে কী করে, অ্যাঁ? বোধহয় দেয়ালের কোন ফুটো দিয়ে হাওয়া চলবার শব্দ হয়েছে। একদিন ঠিক খুঁজেপেতে এই চিৎকারের মতো শব্দগুলোর কারণটা আমি বের করে নেব দেখবেন। তার মানে, কী বুঝলেন? খুলিটা চিৎকার করে না? তাই তো? প্রমাণ হয়ে গেল? ব্যস।

এবারে বাক্সটা খুলি? আলোর নীচে ধরে জিনিসটাকে দেখি একবার? সত্যি ভাবতে বড়ো কষ্ট হয় বুঝলেন? ঠিক এই আলোটার নীচে, আপনি যে চেয়ারটায় বসে আছেন সেইখানটাতেই দিনের পর দিন বসে থাকতে দেখেছি মেয়েটাকে আমি...আরে আরে, জানালাটা বন্ধ করুন শিগগির...কী সাংঘাতিক হাওয়ার ঝাপটা! গেল গেল যাহ। আলোটা নিভেই গেল। ঠিক আছে। অসুবিধে নেই। ফায়ারপ্লেসের আলোতেই দেখাই আপনাকে। তবে আগে জানালাটা...

ব্যস। আর চিন্তা নেই। জানালাটা ভালো করে এঁটে দিয়েছি। আগেও আঁটাই ছিল। কী করে যে অতবড়ো ছিটকিনিটা খুলে গেল হাওয়ার ধাক্কায়! নিন, আর খুলবে না। একেবারে ভালো করে...এ কী? খুলির বাক্সটা? ওটা কোথায় গেল? হাওয়ার ধাক্কায় পড়ে গেল বুঝি? অন্ধকারে কিছু দেখাও তো যাচ্ছে না ছাই! আ...আপনি বাক্সটা খুঁজুন তো! আমি ততক্ষণে লন্ঠনটা জ্বালাই—

বাক্সটা পেয়েছেন? ঠিক আছে। টেবিলের ওপর রাখুন। জানালাটা আমার দোষেই ওভাবে খুলে গিয়েছিল, বুঝলেন? নিশ্চয় ভালো করে আঁটিনি আগেরবার। হ্যাঁ হ্যাঁ। দড়াম করে খুলে যাবার আগে ওর বাইরে চিৎকারটা আমি শুনেছি। গোটা বাড়ি ঘুরে ঘুরে এসে তারপর জানালার গায়ে আছড়ে পড়ল যেন। তাতে কী প্রমাণ হয় মশাই? হাওয়া! আর কিচ্ছু না। কিচ্ছু না।

বাক্সটা...দাঁড়ান। ঠান্ডা লেগে গেছে। আগে একটু পানীয় নিই, কাহিঙ্ক পাইপ টেনে সুস্থির হই – শেষের চিৎকারটা যে দুজনেই শুনতে পেয়েছি তাতে আমি বড্ডো খুশি হয়েছি মশাই। বড্ডো খুশি-খুলিটা টেবিলের ওপর আর চিৎকারটা বাইরে। তার মানে খুলিটা চিৎকার করেনি! তার মানে ওটা হাওয়ার আওয়াজ!! আহ! প্রমাণটা পেয়ে ভারী স্বস্তি লাগছে। আপনিও সাক্ষী।

দাঁড়ান, বাক্সে-আঁটা দড়ির গিঁটটা খুলি। সিলটা ভাঙি আগে! আজ্ঞে হ্যাঁ। পাছে ট্রেনহ্যাম বা অন্য কেউ জিনিসটায় হাত দেয় সেই ভয়ে বাক্সটা দড়ি বেঁধে সিল করে রাখি আমি। দেখাশোনা হলে ফের খুলিটা ওতে ভরে নতুন করে সিল করে দেব। আসলে ট্রেনহ্যাম, অনেক কিছু জানে তো! মুখে যা বলে তার চেয়ে অনেক বেশি। ও খুলিটা দেখুক আমি চাই না। এই যে... এই যে... দেখুন...

এ কী? ভেতরে খুলিটা নেই তো? কিন্তু আমি তো গত বসন্তে ওটাকে শেষবার বের করবার পর ফের ঢুকিয়ে রেখে নিজে হাতে সিল করেছিলাম বাক্সটা। সিল ঠিকই আছে—এ হতে পারে না। অসম্ভব...

ব্যাপারটা আমার একেবারে ভালো ঠেকছে না মশাই। না না অতিপ্রাকৃতটিক কিছু ভাববেন না। কেউ নিশ্চয় সিলটার ওপর কারিকুরি করে খুলিটা চুরি করেছে। বাগানে কাজ করতে যাই যখন, ট্রেনহ্যাম তখন কখনো হয়ত ফাঁকা ঘরে ঢুকে...

কিন্তু... তা যদি না হয়? না না বলবেন না, বলবেন না। ওটা নিজে নিজে বাক্স থেকে বেরিয়ে...যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে এ বাড়ির কোথাও না কোথাও অন্ধকারে ঘাপটি মেরে রয়েছে ওটা। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে... তারপর কাছে গেলেই অন্ধকারের ভেতর থেকে ওটা চিল্লিয়ে উঠবে-ও আমায় ঘেন্না করে... ঘেন্না করে...

আরে বাক্সটা উলটোতে গিয়ে মেঝের ওপর কিছু একটা পড়ে গেল না? দেখুন তো, আপনার পায়ের কাছেই তো... হ্যাঁ। একটা সিসের টুকরো। শব্দ শুনেই বুঝতে পেরেছিলাম আমি। তার মানে লিউক সত্যিসত্যিই...

মেয়েটাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে... ভেবে দেখুন... ফুটন্ত সিসের একটা ধারা আপনার খুলির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে... ওহ! কী ভীষণ যন্ত্রণা হয়েছে মেয়েটার! চিৎকার করে ওঠবার আগেই বোধ হয় প্রাণটা বেরিয়ে গিয়েছিল ওর... ওই যে,বাইরে ফের চিৎকার করছে ও...ঠিক দরজাটার বাইরে... ওহ...

একী? আপনি যে একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গেছেন মশাই? উঁহু, অমন করলে চলবে না। আজ রাতে যদি একটুও ঘুমোতে হয় তাহলে ওটাকে খুঁজে এনে বাক্সে ঢোকাতে হবে ফের। বুঝতে পারছেন না কেন, ও বাক্সে ফিরে আসতে চাইছে... ও নিজের বাড়িতে ফিরতে চাইছে...তাই আজ এত চিৎকার করছে ওটা...সেই প্রথমবারের পর আর কখনো এত জোরে... প্রথমবার... হ্যাঁ হ্যাঁ, প্রথমবার।

আমি ওটাকে মাটিতে... হ্যাঁ। আজ ফের তাই করব। ওটাকে খুঁজে বের করে ছ’ফুট মাটির নীচে গোর দিয়ে দেব আমরা। সেখানে যতই চিৎকার করুক, আমরা কেউ শুনতে পাব না দেখবেন! লন্ঠনটা নিন দেখি। বেশি দূর যেতে পারেনি বোধ হয়। জানালাটা খুলে ঢুকে আসবার চেষ্টা করেছিল, আমি সেটা বন্ধ করে দিয়েছি তখন।

চলুন, চলুন... লন্ঠনটা হাতে... থামুন। চুপ, চুপ... দরজায় ঠকঠক করছে শুনতে পাচ্ছেন? ও-টোকা আমি চিনি। পরপর তিনবার। একটু থেমে ফের তিনবার - ও দরজার বাইরে এসে গেছে। ঘরে ঢুকতে চাইছে এখন। আর খুঁজতে হবে না। গোর? আরে ধুস। মজা করছিলাম তো। ও গোর দেয়া একদম পছন্দ করে না। একদম না।

আমার সঙ্গে একটু আসবেন? ওটাকে নিয়ে আসি। একলা একলা একটু অস্বস্তি হয় কিনা! আসলে আজ সিসের টুকরোটা দেখে ইস্তক একটু দুর্বল হয়ে পড়েছি।

চুপ চুপ... ওই শুনুন... দরজায় কেমন ঠুকঠুক করছে... জিনিসটা জানে, আমরা আসছি। সাবধানে এগিয়ে আসুন । লন্ঠনটা ধরে থাকবেন ঠিক করে। আমি দু’হাতে ওটাকে... খুলছি কিন্তু দরজাটা... আলোটা নীচু করে ধরুন। না না ওটা নিজে নিজে লাফ দেবে কেন? হাওয়ার ধাক্কায় উড়ে আসবে... আরেঃ... ধরুন, ধরুন ওটাকে... দাঁড়ান আমি দরজাটা বন্ধ করে আসছি। আপনি ততক্ষণে ওটাকে ওর বাক্সে — একী? অত জোরে ছুঁড়ে ফেললেন যে? ও রেগে যায় ও-রকম করলে...কী বললেন, আপনার হাতে দাঁত বসিয়ে দিয়েছে? যত বাজে কথা। রক্ত বের করে দিয়েছে কামড়ে? হতেই পারে না। খুব জোরে চেপে ধরেছিলেন বোধহয়। এ হে হে চামড়াটা ছড়ে গেছে একটুখানি। দাঁড়ান ওষুধ লাগিয়ে দিই। কংকালের দাঁত তো! বিষিয়ে উঠতে পারে।

চলুন, যাওয়া যাক। লন্ঠনটা জ্বলুক। বাক্সটা আমি নিচ্ছি। এ হে খুলিটার মুখে রক্ত লেগে রয়েছে যে! দাঁড়ান, চোয়ালটা টেনে খুলে দাঁতগুলো মুছে দিই একটু। বিচ্ছিরি লাগছে দেখতে। না না সাবধানেই করব। ভয় নেই। আমায় কামড়াতে দেব না। এই যে নিন। হয়ে গেছে। এবারে বাক্সটাকে সিল করে কাবার্ডে ঢুকিয়ে...নিন, শুয়ে পড়ুন। কী আশ্চর্য ব্যাপার বলুন তো? এখনো এ ঘরটার মধ্যে মেয়েদের জামাকাপড়ের হালকা গন্ধ রয়ে গেছে! ঘুমোন আপনি। গুড নাইট। আলোটা নিয়ে যাই, কেমন?

নীচের খবরটা স্থানীয় কাগজে কয়েকদিন বাদে বের হয়েছিল -

অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেনের রহস্যময় মৃত্যু

ক্যাপ্টেন চার্লস ব্র্যাডকের রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে ট্রিডকোম্ব গ্রামে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পঁয়ষট্টি বছরের নীরোগ, সবলদেহ এই বৃদ্ধকে তাঁর বিছানায় গত মঙ্গলবার রাতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কোন রহস্যময় আততায়ী তাঁর গলায় কামড়ে শ্বাসনালীটিকে গুঁড়িয়ে দেয়। করোনার ক্ষত পরীক্ষা করে রায় দিয়েছেন কোন অমিত শক্তিশালী মহিলা, যাঁর নীচের দুপাটি দাঁত নেই, এ কাজটি ঘটিয়েছেন। দাঁতের দাগের আকার থেকেই খুনি যে মহিলা সে সিদ্ধান্ত করা গিয়েছে। ঘরে ধ্বস্তাধ্বস্তির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কেমন করে বন্ধ বাড়িতে খুনি ঢুকল বা সেখান থেকে বের হয়ে গেল তারও কোন হদিশ করা সম্ভব হয়নি এখনো। পুলিশ খুনির সন্ধান করছে-

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%