অভিশাপ

সৌভিক চক্রবর্তী

“তোমার দেবতারা অথবা আমার দেবতারা – তুমি বা আমি কি জানি কারা বেশি ক্ষমতাবান?”

ভারতীয় প্রবাদ

অনেকেরই ধারণা, সুয়েজ খালের পূর্বদিকে খ্রিষ্টান ধর্মের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়; মানুষ গিয়ে পড়ে এশিয়ার দেবতা এবং অপদেবতাদের হাতে। ইংল্যান্ডের ‘চার্চ অফ প্রভিডেন্স’-এর তখন নিছক পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া আর কোনো গতি থাকে না। ভারতবর্ষে থাকাকালীন সম্মুখীন হওয়া অধিকাংশ ভয়ঙ্কর ঘটনাকেই এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। আমার গল্পটাও তার ব্যতিক্রম নয়।

আমার বন্ধু, ভারতীয় নেটিভদের হাতের তালুর মতো চেনা পুলিশ কর্মচারী স্ট্রিকল্যান্ড এই ঘটনার সাক্ষী। ডা. ডুময়ও নিজের চোখে সবকিছু দেখেছিলেন, যদিও ঘটনা সম্বন্ধে ওঁর ব্যাখ্যা একেবারেই ভুল ছিল। ডুময় আর আমাদের মধ্যে নেই, কয়েক বছর আগে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছিল ওঁর। সেই গল্প অন্য কোনো সময়ের জন্য তোলা রইল।

ফ্লিট যখন ভারতে আসে তখন ও অনেক টাকার মালিক, হিমালয়ের পাদদেশে ধর্মশালা বলে একটা জায়গায় কিছু জমিও কিনেছে। ওর কাকা মারা যাওয়ার আগে ওর জন্য ধনসম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন। লম্বা চওড়া চেহারার মৃদুভাষী ফ্লিট লোক হিসেবে ভালো হলেও ভারতের নেটিভদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে তেমন ধারণা ওর ছিল না। এমনকী স্থানীয় ভাষা বুঝতে ওর অসুবিধে হয় এরকম অভিযোগও প্রায়ই করত ও।

সুদূর পাহাড় থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে আমাদের স্টেশনে এসেছিল ফ্লিট, নতুন বছর উদযাপন করতে। স্ট্রিকল্যান্ডের বাড়িতে অতিথি হয়ে উঠেছিল ও। প্রত্যেকবার বছর শেষের রাতে আমাদের ক্লাবে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন হত, সেখানে ফোয়ারার মতো মদ বইত। এ-যেন ইংরেজ সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত কোণে পড়ে থাকা মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের একদিনের হইহুল্লোড় করার সাধ। সেবারের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতদের মধ্যে কয়েকজন এসেছিল সীমান্ত থেকে। বছরের পর বছর সাদা চামড়ার মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা, রাতে খাইবারি শত্রুর বুলেটের শিকার হতে হতে বেঁচে ফেরা ইংরেজ রেজিমেন্টের সৈন্য। বাগানের একপাশে একটা গুটিয়ে থাকা সজারু খুঁজে পেয়ে ওরা ওটা নিয়ে পোলো খেলার চেষ্টা করছিল। দক্ষিণ ভারত থেকে আসা জনা ছয়েক ব্যবসায়ী সমানে গুলতাপ্পি মারছিল, যেন এশিয়ার সবচেয়ে বড়ো গুলবাজ কে সেই নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। যুদ্ধে আহত এবং নিহত সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন থেকে শুরু করে মদ খেয়ে মাতলামি করা, সবই চলছিল। আমরা কখনো বেহেড মাতাল হয়ে পোলো চ্যাম্পিয়নশিপ কাপ হাতে পুরোনো দিনের গান গাইছিলাম, কখনো আবার তারাভরা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আজীবন বন্ধুত্ব অটুট রাখার অঙ্গীকার করছিলাম।

শেরির বোতল দিয়ে সন্ধে শুরু করেছিল ফ্লিট। ডিনারের আগে এল শ্যাম্পেন, তারপর কেপ্রি, জল না মিশিয়েই। কফি খাওয়ার সময় বেনেডিকটিন, তারপর পাঁচ গ্লাস হুইস্কি, সোডা দিয়ে। রাত আড়াইটের সময় বিয়ার আর ব্র্যান্ডি। ফলে রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ যখন বাইরের চোদ্দ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঠান্ডায় বেরিয়ে এল ফ্লিট, ওর মাথা কাজ করছিল না। ঘোড়ায় চড়ার আগে বারকয়েক ওটাকে কষে ধমক দিল ও, তারপর এক লাফে পিঠে উঠতে গেল। ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠল ঘোড়াটা, এক ছুটে ফিরে গেল আস্তাবলে। অগত্যা আমি আর স্ট্রিকল্যান্ড মিলে “গার্ড অফ অনার” দেওয়ার মতো করে ওকে দু’দিক থেকে ধরে হাঁটিয়ে বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগলাম।

আমরা যে রাস্তা ধরে এগোচ্ছিলাম সেটা বাজারের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। কাছেই ছিল একটা হনুমান মন্দির, স্থানীয় মানুষদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার জায়গা।

সব দেবতারই কিছু-না-কিছু ভালো গুণ থাকে, যেমন থাকে পুরোহিতদেরও। ব্যক্তিগতভাবে আমি হনুমান দেবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতাম। গুরুত্ব দিতাম পার্বত্য জঙ্গলে বসবাসকারী তাঁর ধূসর চামড়ার বানর ভক্তদেরও। কে জানে কখন কোন বন্ধুর প্রয়োজন পড়ে।

মন্দিরে আলো জ্বলছিল। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের কানে এল মন্ত্রের ধ্বনি, পুরোহিতরা রাত জেগে দেবতার উপাসনা করছে।

হঠাৎই ঘটে গেল অঘটন। আমরা বাধা দেওয়ার আগেই মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে ওপরে উঠে গেল ফ্লিট, দরজায় দাঁড়ানো দুজন পুরোহিতকে ধাক্কা মেরে ঢুকে পড়ল ভেতরে। তারপর লাল পাথরে গড়া হনুমান মূর্তির কপালে ছাইসমেত জ্বলন্ত সিগারেটটা ডলতে শুরু করল। স্ট্রিকল্যান্ড চেষ্টা করল ওকে টেনে সরিয়ে আনার, কিন্তু ও ওখানেই বসে পড়ে গম্ভীর গলায় বলল, “ওই দেখো! ওর কপালে পশুর চিহ্ন এঁকে দিয়েছি আমি!”

মুহূর্তের মধ্যে যেন জেগে উঠল গোটা মন্দির। ভারতীয় দেবতাকে অসম্মান করার পরিণতি কী হতে পারে, স্ট্রিকল্যান্ড ভালো করেই জানত। সেই ভয়ানক সম্ভাবনাগুলোই হয়ত নিজের মনে মনে আওড়াচ্ছিল ও। স্ট্রিকল্যান্ডের খারাপ লাগার আরো কারণ ছিল। ওর সরকারি পদ এবং দীর্ঘদিন এদেশে বসবাসের ফলে এখানকার পুরোহিতদের সঙ্গে ওর আলাপ পরিচয় বেশ ঘনিষ্ঠ। অন্যদিকে ফ্লিট আয়েস করে মাটিতেই বসে রইল, একচুলও নড়ল না। বরং জানাল, হনুমানের মূর্তিটা হেলান দেওয়ার জন্য বেশ নরম, অনেকটা বালিশের মতো। t

এমনসময়, কোনোরকম ইঙ্গিত ছাড়াই, মূর্তির পেছনে থেকে বেরিয়ে এল একজন সাদা মানুষ। ওই প্রচণ্ড শীতেও সম্পূর্ণ নগ্ন ছিল লোকটা, সারা শরীর রূপোর মতো ধবধবে সাদা। অনেকদিন কুষ্ঠ রোগে ভোগার ফলে লোকটার নাক চোখ মুখ বলে কিছু ছিল না। বাইবেলে বোধহয় এরকম মানুষ সম্পর্কেই বলা হয়েছে, “তুষারধবল কুষ্ঠরোগী।”

মন্দিরে প্রতি মুহূর্তে লোক বাড়ছিল, যেন মাটি ভেদ করে উঠে আসছিল সবাই। আমরা দুজন মিলে ফ্লিটকে তুলে দাঁড় করাচ্ছি, এমন সময় ছুটে এল সাদা মানুষটা।

আমাদের হাতের তলা দিয়ে গলে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্লিটের ওপর, বিড়ালের মতো কুঁইকুঁই আওয়াজ করতে করতে ওর বুকের ওপর নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে দিল। আমরা টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে দেওয়ার পরেও একটু দূরে বসে মুখ দিয়ে ওইরকম অদ্ভুত আওয়াজ করে যেতে লাগল।

মন্দিরের দরজার সামনে ভিড় জমে গিয়েছিল, পুরোহিতরা ক্ষেপে উঠেছিল। কিন্তু সাদা মানুষটার অদ্ভুত আচরণ যেন এক লহমায় শান্ত করে তুলল ওদের। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতার পর পুরোহিতদের মধ্যে থেকে একজন এগিয়ে এল স্ট্রিকল্যান্ডের দিকে, নিখুঁত ইংরেজিতে বলল, “নিয়ে যান আপনাদের বন্ধুকে। হনুমানের সঙ্গে যা করার ও করেছে, এবার হনুমান তাঁর কাজ করবেন।”

ভিড় সরে গিয়ে আমাদের যাওয়ার জায়গা করে দিল। ফ্লিটকে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম আমরা।

স্ট্রিকল্যান্ড প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল। চেঁচিয়ে বলল, “আমাদের ওরা ছুরি মারতে পারত! ভাগ্য ভালো অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসতে পেরেছি।” ফ্লিট অবশ্য এসবকে পাত্তা দিল না, শুধু বলল ওর ঘুম পেয়েছে। মদের নেশায় চুর ছিল ও।

আমরা বাড়ির পথে এগোতে লাগলাম। স্ট্রিকল্যান্ডের রাগ তখনও কমেনি, গুম হয়েই ছিল। হঠাৎ লক্ষ করলাম, কাঁপুনি শুরু হয়েছে ফ্লিটের শরীরে, সঙ্গে প্রচুর ঘাম। বাজারের গন্ধ নাকি ওর সহ্য হচ্ছিল না। আমাদের বাড়ির এত কাছে কসাইখানা কেন, সেই নিয়েও বলতে লাগল বারবার। জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কেউ রক্তের গন্ধ পাচ্ছ না?”

রাত শেষ হয়ে সবে ভোর হচ্ছে তখন। ফ্লিটকে বিছানায় শুইয়ে স্ট্রিকল্যান্ড আর আমি হুইস্কি নিয়ে বসলাম। মদ খেতে খেতে মন্দিরের ঘটনাটা আলোচনা করলাম আমরা। স্ট্রিকল্যান্ড স্বীকার করল, ও অবাক হয়েছে। নেটিভদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ওর একেবারেই পছন্দ নয়, বরং আইন কানুনের হাতিয়ার দিয়ে ওদের ঘায়েল করাটাই ওর কাজ। তাতে পুরোপুরি সফল না হলেও গত পনেরো বছরে ছোটোখাটো কিছু সাফল্য অবশ্যই পেয়েছিল ও।

“ওরা আমাদের পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারত। তার বদলে স্রেফ কুঁইকুঁই আওয়াজ করে ছেড়ে দিল। আমি এর মানে বুঝতে পারছি না। ব্যাপারটা একটুও ভালো ঠেকছে না।”

“হয়ত ওদের ধর্মের অবমাননা করার জন্য মন্দিরের পক্ষ থেকে আমাদের বিরুদ্ধে ফউজদারী মামলা হবে,” বললাম আমি। ভারতীয় দণ্ডবিধির একটা ধারায় এই ধরনের অপরাধের উল্লেখ আছে। স্ট্রিকল্যান্ড বলল সেটা হলেই ও খুশি হবে। বাড়ির পথ ধরার আগে ফ্লিটের ঘরে একবার উঁকি দিতে গেলাম। দেখলাম ও পাশ ফিরে শুয়ে বুকের বাঁদিক চুলকাচ্ছে। ঠান্ডাজনিত ক্লান্তি আর মনে একরাশ চিন্তা নিয়ে যখন বাড়ির বিছানায় শুলাম আমি, তখন সকাল সাতটা।

দুপুর একটা নাগাদ আমি ফ্লিটের খোঁজ নিতে স্ট্রিকল্যান্ডের ওখানে গেলাম। ভেবেছিলাম, রাতে অত মদ খাওয়ার পর দিনেরবেলা ওর মাথায় যন্ত্রণা থাকবে হয়ত। গিয়ে অবশ্য দেখলাম টেবিলে বসে দিব্যি জলখাবার খাচ্ছে ফ্লিট। তবে ওর মেজাজ খুবই গরম, মাংসের টুকরোগুলো কেন আধকাঁচা রাখা হয়নি সেই নিয়ে বাবুর্চিকে ধমকাচ্ছে। রাতে মদ খেয়ে পরেরদিন কেউ কাঁচা মাংস খেতে পারে এমনটা আমার ধারণাতেও ছিল না। ফ্লিটকে সে কথা বলাতে ও খুব হাসল।

“তোমাদের এখানে আজব ধরনের মশা জন্মায়। সারারাত আমাকে ছিঁড়ে খেয়েছে, তাও আবার একটাই জায়গায়।”

“দেখি কী হয়েছে,”বলল স্ট্রিকল্যান্ড, “এতক্ষণে দাগ মিলিয়েও যেতে পারে।”

ফ্লিট জামা খুলে দেখাল ওর বুকের বাঁদিকে চাকা চাকা দাগ, ঠিক যেমন চিতাবাঘের গায়ে থাকে। অনেকগুলো কালো বুটি একসঙ্গে গোল হয়ে, বৃত্তের মতো।

“সকালেই তো লালচে ছিল, এখন দেখছি কালো হয়ে গেছে,” মন্তব্য করল স্ট্রিকল্যান্ড।

একছুটে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ফ্লিট।

“হে ভগবান! এই বিশ্রী দাগগুলো কীসের?”

আমরা কেউ ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। এরই মধ্যে মাংস এসে গিয়েছিল। চোখের নিমেষে তিনটে বড়ো বড়ো টুকরো খেয়ে নিল ফ্লিট, সেও জন্তুর মতো, দাঁত দিয়ে কামড়ে কাঁধের ঝটকায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে। খাওয়া শেষ হলে ও বোধহয় বুঝতে পারল যে ওর আচরণ আমাদের কাছে অদ্ভুত ঠেকছে, তাই ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “জীবনে কোনোদিন আমার এত খিদে পায়নি। যা পেয়েছি, গপাগপ গিলে নিয়েছি।”

প্রাতরাশ শেষ হলে স্ট্রিকল্যান্ড আমাকে বলল, “আজ আর বাড়ি যেতে হবে না। রাতটা এখানেই থেকে যাও।”

ওর বাড়ি থেকে আমার বাড়ি মাত্র তিন কিলোমিটার, তাই এমন অনুরোধের কোনো মানে ছিল না। তবু স্ট্রিকল্যান্ড জোরাজুরি করতে লাগল। ও আরো কিছু বলতে যাবে, সেই মুহূর্তে ফ্লিট ঘোষণা করল ওর আবার খিদে পেয়ে গেছে।

স্ট্রিকল্যান্ড একজন কাজের লোককে আমার বাড়ি থেকে আমার বিছানাপত্র আর একটা ঘোড়া নিয়ে আসতে পাঠাল। সে ফিরে এলে তবেই বেরোতে পারব আমরা, তাই সময় কাটানোর জন্য তিনজন মিলে স্ট্রিকল্যান্ডের আস্তাবল দেখতে গেলাম। যারা ঘোড়া ভালোবাসে তাদের জন্য এতগুলো ঘোড়াকে কাছ থেকে দেখা, ওদের আচরণ খুঁটিয়ে লক্ষ করা, ওদের বিভিন্নরকম বৈশিষ্ট্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করাটা নিঃসন্দেহে এক সুবর্ণ সুযোগ।

স্ট্রিকল্যান্ডের আস্তাবলে আমরা পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে যে আজব পরিস্থিতির সৃষ্টি হল তা জীবনে ভোলার নয়। মোট পাঁচটা ঘোড়া ছিল ওখানে, সবকটা উন্মাদের মতো একসঙ্গে আর্তনাদ করে উঠল। এমনভাবে ছটফট করতে লাগল যেন দড়িই ছিঁড়ে ফেলবে। তাড়াতাড়ি আস্তাবল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। স্ট্রিকল্যান্ডের ঘোড়াগুলো যথেষ্ট পুরোনো, মালিককে ভালোভাবে চেনে। ওদের এরকম আচরণের কোনো অর্থ খুঁজে পেলাম না। কিছুক্ষণ পরে স্ট্রিকল্যান্ড আবার ওখানে গেল, সঙ্গে আমাকেও ডেকে নিল। ঘোড়াগুলো তখনও বেশ উত্তেজিত ছিল, আমরা গায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়াতে একটু একটু করে শান্ত হল।

“ঘোড়াগুলো যে আমাদের দুজনকে ভয় পাচ্ছে না সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে।” বলল স্ট্রিকল্যান্ড, “ওরা যদি একবার কথা বলতে পারত...”

কিন্তু ঘোড়ারা অবলা জীব, কথা বলতে পারে না। ওরা শুধু জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছিল, আর আদর খেতে আমাদের কাছে ঘেঁষে আসছিল। এরই মধ্যে ফ্লিট ওখানে উপস্থিত হল। ওকে দেখামাত্রই আবার ক্ষেপে উঠল ঘোড়াগুলো। ওদের লাথি খাওয়া থেকে কোনোরকমে পালিয়ে বাঁচলাম আমরা। বাইরে এসে স্ট্রিকল্যান্ড বলল, “ওরা তোমাকে একদমই পছন্দ করছে না, ফ্লিট।”

“কীসব যা তা বলছ! আমার ঘোড়া আমাকে আমার কুকুরের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, সর্বদা সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে,” এই বলে আস্তাবলের পাশে বানানো ছোটো কুঠুরিটার দিকে চলে গেল ফ্লিট, যেখানে ওর ঘোড়া রাখা ছিল। হুড়কো খোলার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে বেরিয়ে এল ঘোড়াটা, তারপর এক ধাক্কায় ফ্লিটকে ফেলে বাগানের দিকে ছুট লাগাল। পুরো ব্যাপারটা দেখে আমি হাসি চাপতে পারলাম না। স্ট্রিকল্যান্ড কিন্তু হাসল না।

ঘোড়ার পেছনে ধাওয়া করার বদলে আড়মোড়া ভেঙে ফ্লিট বলল ওর খুব ঘুম পেয়েছে, ও ঘরে শুতে যাচ্ছে। নতুন বছরের প্রথম দিন কেউ ঘুমিয়ে কাটায় বলে আমি এর আগে শুনিনি।

“ফ্লিটের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ করেছ?” আস্তাবলে বসেই আমাকে প্রশ্ন করল স্ট্রিকল্যান্ড।

“সেরকম কিছু না, ওই গোগ্রাসে খাওয়ার ব্যাপারটা ছাড়া। অনেকদিন লোকালয় থেকে দূরে আছে, একা একা থাকে, হতেই পারে খাওয়া-দাওয়ার আদবকায়দা ভুলে গেছে,” উত্তর দিলাম আমি।

কিন্তু আমার ব্যাখ্যা ওর পছন্দ হয়েছে বলে মনে হল না। এরপর ও আমাকে ফ্লিটের বুকের দাগগুলো নিয়ে জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম ওগুলো কোনো পোকামাকড়ের কামড় থেকে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, অথবা হতে পারে ওগুলো জন্মদাগ, আগে কারও চোখে পড়েনি। তবে দাগগুলো যে বিশ্রী সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমার কথা শুনে স্ট্রিকল্যান্ড এমনভাবে তাকাল যেন খুব অবাক হয়েছে।

“আমার কী মনে হচ্ছে সেটা এখনই বলব না। বললে তুমি আমাকে পাগল ভাববে। কিন্তু তোমাকে ক’টা দিন আমার সঙ্গে থাকতে হবে। আমি চাই তুমি ফ্লিটের ওপর নজর রাখো, যতক্ষণ না ওর এই অবস্থা নিয়ে কিছু একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারছি।”

“কিন্তু আমি তো ভাবছিলাম আজ রাতের খাবারটা বাইরে খাব,” বললাম আমি।

“আমিও তাই করব,” বলল স্ট্রিকল্যান্ড, “আর ফ্লিটকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। অবশ্য যদি ওর আপত্তি না থাকে।”

বাগানে কিছুক্ষণ হাঁটলাম আমরা, তারপর ফ্লিটকে ঘুম থেকে তুলতে ওর ঘরে গেলাম। গিয়ে দেখলাম ফ্লিট জেগেই আছে, অস্থিরভাবে ঘরময় পায়চারি করছে।

“আমার আরও মাংস খেতে ইচ্ছে করছে।”

ওর কথা শুনে হেসে উঠলাম আমরা। “যাও শিগগির তৈরি হয়ে নাও। ঘোড়া নিয়ে বেরোব এখন।”

“আগে আমি খাব, তারপর। মাংসগুলো কাঁচা কাঁচা থাকলেই ভালো।”

তখন সবে বিকেল চারটে, একটা নাগাদ জলখাবার খেয়েছে ও। ফ্লিটের আবদার শুনে হতবাক হয়ে গেলাম আমি। আরও বেশ কয়েকবার খাইখাই করল ও, তারপর পোশাক বদলে উঠোনে গেল। কিন্তু ওর জন্য স্ট্রিকল্যান্ডের আস্তাবল থেকে আনা ঘোড়াটাও – আগেরটাকে তো ধরাই যায়নি – ওর কাছে আসতে চাইল না। দেখতে দেখতে তিনটে ঘোড়াই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। কিছুতেই ওদের শান্ত করা যাচ্ছিল না। এ-সব দেখে ফ্লিট বলল ও বাড়িতেই থাকবে। অগত্যা স্ট্রিকল্যান্ড আর আমি বেরোলাম।

হনুমান মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আরেকবার দেখতে পেলাম ওই সাদা মানুষটাকে। আমাদের দেখে বেরিয়ে এসেছিল লোকটা, মুখে সেই অদ্ভুত কান্নার আওয়াজ।

“লোকটা স্থানীয় পুরোহিতদের কেউ নয়,” বলল স্ট্রিকল্যান্ড। “একবার যদি

ওকে হাতের নাগালে পেতাম...”

রেসকোর্সে বেশিক্ষণ থাকার উৎসাহ পেলাম না আমরা। ঘোড়াগুলোও কেমন নেতিয়ে গিয়েছিল, যেন অনেকটা রাস্তা ছুটে ক্লান্ত। প্রায় সারাটা সময় চুপ করেই রইল স্ট্রিকল্যান্ড, আপনমনে এক-দু’বার বিড়বিড় করলেও খুলে কিছু বলল না।

আমরা যখন ফিরলাম তখন সন্ধে নেমে গেছে। চারদিক অন্ধকার, কিন্তু বাংলোয় একটা আলোও জ্বলছিল না।

“আমার চাকরগুলো সব অপদার্থ!” ঝাঁঝিয়ে উঠল স্ট্রিকল্যান্ড।

হঠাৎ আমার ঘোড়াটা সামনের দু’ পা শূন্যে তুলে লাফিয়ে উঠল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নীচ থেকে উঠে দাঁড়াল ফ্লিট, ঠিক আমার সামনেটায়।

“তুমি এখানে কী করছ?” স্ট্রিকল্যান্ড জিজ্ঞেস করল। ততক্ষণে দুটো ঘোড়াই লাফাতে শুরু করেছে, আমাদের পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয় আর কি। কোনোরকমে ওদের আস্তাবলে ঢুকিয়ে আমরা ফ্লিটের কাছে ফিরে এলাম। কমলালেবু ঝোপের কাছে হামাগুড়ি দিচ্ছিল ও।

“কী হয়েছেটা কী তোমার?”

“কিচ্ছু না, কিচ্ছু না,” জড়ানো গলায় জবাব দিল ফ্লিট। “তোমার বাগানটা আমার খুব ভালো লাগছে। মাটির গন্ধটা কী সুন্দর! ইচ্ছে করছে এখানেই থেকে যাই... সারা রাত।”

আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল কোথাও বড়ো রকমের কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে। স্ট্রিকল্যান্ডকে তাই বলে দিলাম রাতে আর আমি বাইরে খেতে যাচ্ছি না।

“সেই ভালো!” বলল স্ট্রিকল্যান্ড, “এই যে ফ্লিট, ওঠো, এখানে বেশিক্ষণ থাকলে জ্বর বাধিয়ে বসবে। খাওয়ার ঘরে চলো। আলোগুলো জ্বালাই, তারপর সবাই একসঙ্গে খেতে বসব।”

অনিচ্ছা সহকারে উঠে দাঁড়াল ফ্লিট। “নাহ। আলো জ্বালাতে হবে না। আর আমার এখানেই ভালো লাগছে। চলো সবাই মিলে বরং বাইরেই খাই আজকে। মাংস আনতে বল, কাঁচা কাঁচা, রক্ত মাখা মাংসের টুকরো।”

ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় উত্তর-ভারতে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা পড়ে। বদ্ধ উন্মাদের মতো কথা বলছিল ফ্লিট।

“ভেতরে চলো,” এবার কড়া গলায় ধমক দিল স্ট্রিকল্যান্ড, “এখুনি।”

ফ্লিট এল আমাদের সঙ্গে। চাকররা বাতি জ্বালিয়ে আনার পর দেখলাম, ওর পা থেকে মাথা অবধি কাদামাটি লেগে। নিশ্চয়ই এতক্ষণ ধরে বাগানের মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল। আলো দেখামাত্র সিঁটিয়ে গেল ও, তারপর একছুটে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। তাকানো যাচ্ছিল না ওর দিকে। চোখের মণির পেছনে সবুজের আভাস, ধিকিধিকি জ্বলছে। নীচের ঠোঁট ঝুলে পড়ে মাড়ি বেরিয়ে এসেছে।

“আজ রাতে বড়ো কিছু একটা বিপদ হতে চলেছে। তুমি পোশাক বদলিও না, যখন তখন বেরোতে হতে পারে,” বলল স্ট্রিকল্যান্ড।

চাকরদের খাবার দিতে বলে ফ্লিটের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম আমরা। ওর নড়াচড়ার শব্দ আমাদের কানে আসছিল, কিন্তু আলো না থাকায় কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ একসময় ওর ঘর থেকে গর্জনের আওয়াজ শুনলাম, যেন নেকড়ে ডাকছে।

‘গায়ের রক্ত জমে যাওয়া’, ‘লোম খাড়া হয়ে যাওয়া’ এ-সব কথা কত সহজেই বলে বা লিখে ফেলে মানুষ! কিন্তু অনুভূতিগুলো আদপে কতটা বীভৎস তা আমরা সেই মুহূর্তে টের পাচ্ছিলাম। আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল, যেন কেউ বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। স্ট্রিকল্যান্ডের মুখটা ওর ডাইনিং টেবিলে পাতা চাদরটার মতই সাদা হয়ে গেল।

আবার ভেসে এল গর্জন, এবং প্রত্যুত্তরে বাইরে কোথাও থেকেও পালটা শোনা গেল নেকড়ের ডাক।

ভয়ের বাঁধ ভাঙল যেন। ফ্লিটের ঘরের দিকে ছুটল স্ট্রিকল্যান্ড, পেছন পেছন আমিও। গিয়ে দেখলাম জানলা গলে পালানোর চেষ্টা করছে ফ্লিট। ওর গলা দিয়ে জন্তুর মতো আওয়াজ বেরোচ্ছে।

তারপর কী হল আমার ঠিক মনে নেই। বোধহয় স্ট্রিকল্যান্ড লোহার ডাণ্ডা দিয়ে ঘা মেরে অবশ করে দিয়েছিল ওকে। সম্বিৎ ফিরতে দেখলাম, মেঝেতে চিৎপাত হয়ে আছে ফ্লিট, আর ওর বুকের ওপর বসে আছি আমি। ও কোনো কথা বলতে পারছিল না, শুধু গর্জন করছিল। সেই গর্জন মানুষের নয়, নেকড়ের। সকাল থেকে ক্ষইতে থাকা ওর মানুষী চেতনা যেন রাতের অন্ধকারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। আমরা যার সঙ্গে যুঝছিলাম সে ফ্লিট নয়, স্রেফ একটা জন্তু।

গোটা ব্যাপারটা আমাদের যুক্তি বুদ্ধির সীমানা অতিক্রম করে গিয়েছিল। একবার ‘জলাতঙ্ক’ বলতে গিয়েও থেমে গেলাম আমি, কথাটা আমার নিজের কানেই মিথ্যে শোনাল।

ফ্লিটরূপী পশুটাকে পাঙ্খা টানার দড়ি দিয়ে আপাদমস্তক বেঁধে ফেললাম আমরা। তারপর ঘোড়ার নাল দিয়ে মুখ বন্ধ করে ওকে চ্যাংদোলা করে বসার ঘরে নিয়ে এলাম। একজন চাকরকে দিয়ে সবে ডা. ডুময়কে খবর দিতে পাঠিয়েছি, স্ট্রিকল্যান্ড বলল, “কোনো লাভ হবে না। ওকে ঠিক করা কোনো ডাক্তারের কাজ নয়।”

মেঝেতে শুয়ে এদিক-ওদিক মাথা ঝাঁকাচ্ছিল ফ্লিট। এই সময় কেউ ঘরে এসে ঢুকলে নির্ঘাত ভাবত আমরা ছাল ছাড়ানোর জন্য একটা জংলি নেকড়ে ধরে এনেছি। দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে ছিল স্ট্রিকল্যান্ড, মাটিতে পড়ে থাকা জন্তুটার ছটফটানি দেখছিল। ধস্তাধস্তিতে ছিঁড়ে যাওয়া জামার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল ফ্লিটের বুকের দাগগুলো, যেন অনেকগুলো কালো ফোস্কা।

ওই নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ বাইরে থেকে শুনতে পেলাম কান্নার আওয়াজ। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালাম আমরা। ভয়ে আমার গা গুলোচ্ছিল, তবু নিজেকে এবং স্ট্রিকল্যান্ডকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আওয়াজটাকে বিড়ালের ডাক বলে উড়িয়ে দিলাম।

এরই মধ্যে ডা. ডুময় এলেন, এবং ফ্লিটকে দেখে রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলেন। ফ্লিটের অসুখটা যে জলাতঙ্ক সেই নিয়ে তাঁর মনে কোনোরকম সন্দেহ ছিল না। চিকিৎসা করে কোনো লাভ হবে না, বরং রোগীর যন্ত্রণাই বাড়বে, এমনটাই অভিমত দিলেন তিনি।

ফ্লিট আধ ডজন টেরিয়ার পুষত, এক আধবার কুকুরের কামড় খাওয়া ওর পক্ষে মোটেই অস্বাভাবিক ছিল না। আর সত্যিই এক্ষেত্রে একজন ডাক্তারের কিছু করারও ছিল না, কেউ জলাতঙ্ক রোগে মারা গেলে ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দেওয়া ছাড়া।

ফ্লিট ততক্ষণে মুখ থেকে ঘোড়ার নাল ফেলে দিয়ে আবার নেকড়ের ডাক ডাকতে শুরু করেছিল। সেটা দেখে ডুময় জানালেন ওর আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, যে-কোনো সময় মারা যেতে পারে। ফ্লিটের অন্তিম মুহূর্তে আমাদের সঙ্গেই থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন তিনি, কিন্তু স্ট্রিকল্যান্ড ওঁকে বারণ করল। ডাক্তারবাবুর নতুন বছর উদযাপন নষ্ট হোক এটা আমরা কেউই চাইছিলাম না। শুধু ওঁকে অনুরোধ করলাম ফ্লিটের অসুখের ব্যাপারটা আপাতত সবার থেকে গোপন রাখতে।

ডুময়ের ঘোড়ার গাড়ির চাকার শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পরপরই আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল স্ট্রিকল্যান্ড, ফিসফিস করে ওর সন্দেহ আমাকে বলল। কথাগুলো এতটাই অবিশ্বাস্য ছিল যে জোরে উচ্চারণ করতেও ওর অস্বস্তি হচ্ছিল। সাধারণত স্ট্রিকল্যান্ড যা বলত সবই মেনে নিতাম আমি, কিন্তু ওর এই কথাগুলো মানতে আমার লজ্জা হচ্ছিল। তাই বাধ্য হয়ে অবিশ্বাসের ভান করলাম।

“ওই সাদা লোকটা যদি হনুমান মূর্তির অসম্মানের বদলা নিতে ফ্লিটের ওপর তুকতাক করেও থাকে, তবু এত তাড়াতাড়ি তো ফল হওয়ার কথা নয়!”

আমার বলা শেষ হওয়ার আগেই বাইরে আবার ওই কুঁইকুঁই শব্দ আরম্ভ হল, আর সঙ্গে সঙ্গে মেঝেতে শোয়া জন্তুর শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে লাগল। এক মুহূর্তের জন্য ভয় পেয়ে গেলাম আমরা, ফ্লিট ওর বাঁধন ছিঁড়ে উঠে না আসে।

“দেখো, দেখো!” চেঁচিয়ে উঠল স্ট্রিকল্যান্ড, “এ-রকমটা যদি আবার হয়, আমি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হব। তোমাকেও আমাকে সাহায্য করতে হবে।”

কয়েক মিনিটের জন্য নিজের ঘরে গেল ও, পুরোনো একটা বন্দুকের নল, মাছ ধরার ছিপ, মোটা দড়ি, আর খাটের লম্বা, ভারী একটা পায়া হাতে নিয়ে ফিরে এল। ততক্ষণে আমি যা দেখার দেখে নিয়েছি। বাইরে আওয়াজ হওয়ার দু’সেকেন্ডের মধ্যেই ফ্লিটের খিঁচুনি শুরু হচ্ছিল, আর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল ও।

“এভাবে একটা প্রাণ কেড়ে নিতে পারে না ও,” আপনমনে বলে উঠল স্ট্রিকল্যান্ড। আমার তখন নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছে, খাপছাড়াভাবে বলে চললাম, “ওটা নিশ্চয়ই কোনো বিড়ালের ডাক। মানে, বিড়াল ছাড়া আর কী বা হতে পারে? ওই কুষ্ঠ রোগীটার এখানে আসার সাহস হবে নাকি?”

ফায়ারপ্লেসে কাঠ ফেলে আগুন জ্বালাল স্ট্রিকল্যান্ড, বন্দুকের নলটা ঢুকিয়ে দিল আগুনের মধ্যে। বেড়াতে যাওয়ার একটা ছড়ি ভেঙে দু’টুকরো করল, তারপর এক গজ ছিপের সুতোর দুটো প্রান্ত একসঙ্গে বেঁধে মেছুড়েদের মতো করে একটা ফাঁস বানাল।

“আমাদের ওকে জ্যান্ত ধরতে হবে। বেশি আঘাত করাও চলবে না।”

স্ট্রিকল্যান্ডকে ঈশ্বরে ভরসা রাখতে বললাম আমি, আর একটা বুদ্ধি দিলাম। পোলো খেলার লাঠি হাতে নিয়ে বাইরে বেরোব আমরা, ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকব। মুখ দিয়ে আওয়াজ বের করা মানুষ অথবা জন্তুটা বারবার বাড়ির চারপাশে চক্কর কাটছে, যেই আমাদের সামনে আসবে ওকে ধরে ফেলব।

আমার পরামর্শ স্ট্রিকল্যান্ডের মনে ধরল। বাথরুমের জানলা দিয়ে বাড়ির বাইরে এলাম আমরা, তারপর উঠোন পেরিয়ে ঝোপের পেছনে গিয়ে বসলাম।

একটু পরেই চাঁদের আলোয় দেখলাম, বাড়ির পেছন থেকে বেরিয়ে আসছে কুষ্ঠ রোগীটা। আগের মতই পুরো উলঙ্গ। থেকে থেকে মুখ দিয়ে আওয়াজ করছে আর নাচের ভঙ্গিতে শরীর দোলাচ্ছে। মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে গেল আমার। এই জঘন্য প্রাণীটাই ফ্লিটের ওই শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী! প্রতিজ্ঞা করলাম, স্ট্রিকল্যান্ড যাই করুক না কেন, যে-কোনো অত্যাচারই করুক না কেন, ওকে সবরকম সাহায্য করব আমি।

বাড়ির সদর দরজার কাছে এসে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল সাদা মানুষটা। সেই সুযোগে লাঠি হাতে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা। খেয়াল রাখতে হচ্ছিল যাতে ও পালিয়ে না যায়, আবার বেকায়দায় বড়ো কোনো ধরনের চোটও না পায়। এতদিন আমাদের ধারণা ছিল কুষ্ঠরোগীরা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়। লোকটার সাংঘাতিক গায়ের জোর ওই ধারণাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছিল। শেষমেশ স্ট্রিকল্যান্ড কোনোরকমে ওর পা দুটো জাপটে ধরে ওকে মাটিতে ফেলে দিল, আর আমি ঘাড়ে পা দিয়ে চেপে ওকে শুইয়ে রাখলাম। তারস্বরে আওয়াজ করছিল লোকটা, আর জুতো পরে থাকা সত্ত্বেও আমার গা শিরশির করছিল, যেন নোংরা, অপবিত্র কিছুর সংস্পর্শে এসেছি।

ক্রমাগত আঙুল খসে যাওয়া হাত আর পা ছুঁড়ে আমাদের সরানোর চেষ্টা করছিল লোকটা। ঘর থেকে একটা চাবুক এনে ওর বগলের তলা দিয়ে গলিয়ে দিলাম আমরা, তারপর টানতে টানতে ওকে বসার ঘরে নিয়ে এলাম। আর পালানোর চেষ্টা করল না ও, শুধু মুখ দিয়ে “কুঁইকুঁই” আওয়াজ চালিয়ে গেল।

ওর সঙ্গে মেঝেতে শোয়া ফ্লিটরূপী জন্তুটার চোখাচোখি হওয়া মাত্র ঘরের মধ্যে যেটা ঘটল, এক কথায় অবর্ণনীয়। যন্ত্রণায় ধনুকের মতো পেছনদিকে বেঁকে গেল ফ্লিটের শরীরটা, যেন ওর শিরা উপশিরায় স্ট্রিকনিন জাতীয় বিষ ঢেলে দিয়েছে কেউ। বীভৎস আর্তচিৎকার বেরিয়ে এল ওর গলা চিরে। আরও অনেকগুলো ঘটনা ঘটল যা এখানে লেখা যাবে না।

“আমি ঠিকই সন্দেহ করেছিলাম,” বলল স্ট্রিকল্যান্ড, “এবার ওকে দিয়েই ফ্লিটকে সুস্থ করাতে হবে।”

ডানহাতে টাওয়েল জড়িয়ে নিয়ে আগুনের ভেতর থেকে গনগনে বন্দুকের নলটা বের করে আনল ও। ভাঙা ছড়ির একটা খণ্ড সুতোর ফাঁসের ভেতর দিয়ে গলিয়ে মজবুত বাঁধন বানালাম আমি, কুষ্ঠরোগীটাকে খাটের পায়ার সঙ্গে শক্ত করে বাঁধলাম। আমি অল্প অল্প বুঝতে পারছিলাম কীভাবে প্রাচীন সময়ে ঘরের মহিলারা, এমনকী শিশুরাও ডাইনি পুড়িয়ে মারার মতো বীভৎস দৃশ্য সহ্য করে নিতে পারত। মেঝেতে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল ফ্লিট, আর সাদা মানুষটার মসৃণ মাংসপিণ্ডের মতো মুখেও নানান অনুভূতি খেলা করছিল, ঠিক যেমনভাবে স্ট্রিকল্যান্ডের হাতে ধরা আগুন-লাল নলের চারপাশে খেলে বেড়াচ্ছিল তাপপ্রবাহ।

একহাতে তাপ থেকে চোখ আড়াল করে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল স্ট্রিকল্যান্ড, তারপর কাজ শুরু করল। এই অংশটাও ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করা যাবে না।

প্রথম যখন কথা বলল কুষ্ঠরোগীটা, চারদিকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। তার আগে পর্যন্ত কান্নার আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই বেরোয়নি ওর মুখ দিয়ে। নিঃসাড়ে পড়ে ছিল ফ্লিটরূপী পশুর অবসন্ন দেহ, গোটা বাড়ি জুড়ে বিরাজ করছিল নিস্তব্ধতা। আমরা সাদা মানুষটার বাঁধন খুলে দিয়ে ফ্লিটের ওপর থেকে অভিশাপ তুলে নিতে বললাম ওকে। বুকে ভর দিয়ে ফ্লিটের নিথর শরীরটার কাছে গেল ও, খোলা বুকে হাত রাখল। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তারপরই একপাশ ফিরে জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগল লোকটা।

ফ্লিটের শরীরে আত্মা ফিরে এল যেন। ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমতে লাগল ওর কপালে; চোখদুটো, পশুর নয়, মানুষের, ঘুমে বন্ধ হয়ে এল। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করলাম আমরা, তাও ফ্লিটের ঘুম ভাঙল না। তখন ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলাম ওকে, তারপর ফিরে এসে কুষ্ঠরোগীটাকে চলে যেতে বললাম। যাওয়ার আগে যা যা কিছু দিয়ে ওকে ছুঁয়েছিলাম – খাটের পায়া, তোয়ালে, দড়ি, চাবুক – সব ওকে দিয়ে দিলাম আমরা, সঙ্গে দিলাম একটা বিছানার চাদর, নগ্নতা ঢাকার জন্য। মুখ দিয়ে টুঁ শব্দ করল না সাদা লোকটা, চাদর গায়ে জড়িয়ে ভোরের আবছা আলোয় মিশে গেল যেন।

জামার হাতা দিয়ে মুখ মুছে ধপ করে বসে পড়ল স্ট্রিকল্যান্ড। দূরে কোথাও থেকে পরপর সাতবার ঘণ্টাধ্বনি ভেসে এল।

“পাক্কা চব্বিশ ঘণ্টা! গত একদিনে যা কিছু করেছি তা আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার জন্য তো বটেই, পাগলা গারদে পাঠানোর জন্যও যথেষ্ট। আচ্ছা আমরা কি সত্যিসত্যিই জেগে আছি না স্বপ্ন দেখছি?”

ওর পায়ের কাছেই পড়ে ছিল গনগনে বন্দুকের নলটা। বসার ঘরের কার্পেটটা কালো হয়ে পুড়ে গন্ধ বেরোচ্ছিল। স্বপ্নে কেউ পোড়া গন্ধ পায় না।

সকাল এগারোটা নাগাদ আমরা দুজন গিয়ে ফ্লিটকে ঘুম থেকে ওঠালাম। চোখ খোলার পরেও বেশ কিছুক্ষণ আচ্ছন্ন হয়ে রইল ও, তারপর আমাদের দেখে বলল, “হ্যাপি নিউ ইয়ার! আমায় দেখে শিক্ষা নিতে পারো, বেশি মদ খেলে কী অনর্থ হয়! আমার তো মনে হচ্ছে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছি।”

“শুভেচ্ছার জন্য ধন্যবাদ, ফ্লিট, কিন্তু তুমি একটু দেরি করে ফেলেছ। আজ পয়লা নয়, দোসরা জানুয়ারি। টানা একটা দিন ঘুমিয়ে কাটিয়েছ তুমি।”

ঠিক সেইসময় দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন ডা. ডুময়। তাড়াহুড়োয় পায়ে হেঁটেই এসেছিলেন ভদ্রলোক, হয়ত ভেবেছিলেন ফ্লিটের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমাদের সাহায্য প্রয়োজন হবে।

“আমি একজন নার্সকে সঙ্গে এনেছি,” বললেন ডাক্তারবাবু। “যা কিছু দরকার তাতে সাহায্য করতে পারবে।”

“নার্স? কোথায় নার্স?” উৎফুল্ল স্বরে বলে উঠল ফ্লিট, “ওকে ভেতর ডাকুন।”

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ডুময়। ওঁকে ডেকে একপাশে নিয়ে গেল স্ট্রিকল্যান্ড, বোঝানোর চেষ্টা করল যে হয়ত ফ্লিটের রোগ নির্ধারণে ওঁর কিছু একটা ভুল হয়েছিল। বেশিক্ষণ থাকলেন না ডুময়, এমন আকস্মিকভাবে রোগীর সেরে ওঠাটা ডাক্তার হিসেবে ওঁর পেশাদারিত্বে আঘাত করেছিল। উনি চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণের জন্য স্ট্রিকল্যান্ডও বেরোল। ফিরে এসে বলল, ও হনুমান মন্দিরে গিয়েছিল সেদিনের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতে। কিন্তু মন্দিরের পুরোহিতরা নাকি ওকে আশ্বস্ত করে বলেছ যে ওর নিশ্চয়ই কোথাও বোঝার ভুল হয়েছে, কারণ ও’রকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি, কোনো সাদা চামড়ার মানুষের হাতে হনুমান দেবতার মূর্তি অপবিত্র হয়নি।

“তোমার কী মনে হচ্ছে?” জিজ্ঞেস করল স্ট্রিকল্যান্ড।

“স্বর্গ এবং মর্ত্যে এমন অনেক কিছুই আছে...” শেক্সপিয়ার আওড়াতে শুরু

করেও চুপ করে গেলাম আমি, কারণ স্ট্রিকল্যান্ডের এই উদ্ধৃতিটা মোটেই পছন্দ ছিল না। ওর মতে এটা নাকি বহু ব্যবহারে জীর্ণ।

বিকেলবেলা স্নান সেরে জামাকাপড় বদলে নীচে এল ফ্লিট। বসার ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নাক কুঁচকাল ও, যেন বিকট কোনো গন্ধ শুঁকে ফেলেছে। “কী জঘন্য গন্ধ, মনে হচ্ছে কুকুরের গা থেকে বেরোচ্ছে! স্ট্রিকল্যান্ড, তোমার পোষা টেরিয়ারগুলোর আরও যত্ন নেওয়া উচিৎ। ওদের লোম ভালো রাখার জন্য সালফার ব্যবহার করতে পার।”

ফ্লিটের কথার কোনো উত্তর দিল না স্ট্রিকল্যান্ড। চেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে ওর তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর প্রবল অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সভ্য মানুষের মৃগীরোগীর মতো হাসতে থাকা মোটেই স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। ওকে থামাতে যাব, তখনই খেয়াল হল আগের রাতে এই ঘরে বসেই ফ্লিটের আত্মাকে অভিশাপমুক্ত করতে কী লড়াইটাই না করেছি আমরা! মনে-পড়া-মাত্র বেদম হাসি পেল আমারও, বিষম খেতে খেতে যোগ দিলাম স্ট্রিকল্যান্ডের সঙ্গে। এসব দেখে ফ্লিটের নিশ্চয়ই মনে হয়েছিল আমরা উন্মাদ হয়ে গেছি, কারণ গত কয়েকদিনে যা যা ঘটেছিল সে বিষয়ে কোনো কিছুই ওকে জানাইনি আমরা।

বছর কয়েক পর বিয়ে করল স্ট্রিকল্যান্ড, ধর্মপ্রাণ বউকে সঙ্গ দিতে নিয়মিত চার্চে যাওয়াও শুরু করল। এই ঘটনাটা নিয়ে তখন আরেকবার নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণে বসলাম আমরা। স্ট্রিকল্যান্ডই আমাকে পরামর্শ দিল গোটা ব্যাপারটা জনসমক্ষে নিয়ে আসার।

কিন্তু এতে রহস্য সমাধানের ক্ষেত্রে কোনো লাভ হবে বলে আমার অন্তত মনে হয় না। প্রথমত এমন অপ্রীতিকর গল্প কেউ সহজে বিশ্বাস করবে না, এবং দ্বিতীয়ত, যেমনটা প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষই জানেন, ম্লেচ্ছদের দেবতারা নিছকই পাথর এবং পিতল, আর তাই তাদের ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা অর্থহীন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%