সৌভিক চক্রবর্তী

শরৎ, ১৮২৭। সে-সময় আমি ভার্জিনিয়ার শার্লোটেসভিল অঞ্চলে বাস করতাম। ওই অঞ্চলে থাকাকালীন মিস্টার অগস্টাস বেদলোর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ছোকরা সব ব্যাপারেই যাকে বলে একেবারে ধারালো ছিল। আমার কাজকর্মের খুঁটিনাটি আগ্রহভরে দেখত। মানতে হবে ছোকরার এলেম ছিল।
কিন্তু ওর পরিবার সম্পর্কে কিছু জানতে পারিনি। এমনকী সে যে আসলে কোথাকার লোক, তাও আভাস দেয়নি। ওর বয়স নিয়েও আমি ধন্দে ছিলাম। কেন জানি না, কখনো-কখনো মনে হত ওর বয়স একশ বছরের বেশি।
ছোকরার শারীরিক গঠন মোটেই আহামরি ছিল না। রোগা লম্বা গড়ন। প্রশস্ত কপাল। ওর হাতের লম্বা আঙুলগুলো দেখলে মনে হত যেন রক্তাল্পতায় ভুগছে। নমনীয় মুখটি শরীরের তুলনায় বেশ বড়ো। ছোকরার দাঁতের মতো অসমান দাঁত আমার আগে নজরে আসেনি। গোলগোল বড়ো চোখগুলোকে দেখলেই বেড়ালের চোখের কথা মনে পড়ত। কোন কারণে ও উত্তেজিত হয়ে পড়লে ওর চোখের মণিদুটো এমন জ্বলজ্বলিয়ে উঠত যে, মনে হত, এই বুঝি ওর চোখ থেকে আলোর রশ্মি বেরিয়ে আসবে। একটা অন্তর্নিহিত দীপ্তি ছিল ওর চোখে। কিন্তু অধিকাংশ সময় সেই চোখে কোন ভাবান্তর দেখতাম না। ভাবলেশহীন সে-চোখ যেন এক মৃতের চোখ। ওদিকে মুখের হাসিটি ছিল অমলিন। কিন্তু সেই হাসি দেখে ওর মনের হদিশ পাওয়া মুশকিল হত। s
এই শারীরিক অস্বাভাবিকতার জন্য ওকে কেউ খুব একটা পছন্দ করত না। উল্টোপাল্টা অজুহাতে সবাই ওকে এড়িয়েই যেত। ব্যাপারটা জানার পর আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আমি ধীরে ধীরে যুবকটির সঙ্গ মানিয়ে নিলাম। জানতে পারলাম ওর অদ্ভুত শারীরিক দর্শনের জন্য দায়ী স্নায়ু-রোগ।
ওর নাম বেদলো। সারাতোগা নামে এক অঞ্চলে বেদলোর সঙ্গে পরিচয় হয় টেম্পলটন নামের এক বৃদ্ধ ডাক্তারের। অনেক বছর ধরে টেম্পলটন ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা করিয়ে খানিক ফল পেয়েছিল বেদলো। তাই ডাক্তারের সঙ্গে বাৎসরিক একটা টাকার চুক্তি সে করে নিয়েছিল তার মতো স্নায়ুরোগে আক্রান্ত লোকেদের চিকিৎসা করাবার জন্য। বেদলোর অর্থের অভাব ছিল না। সে বেজায় ধনী ছিল।
অল্প বয়সে ডক্টর টেম্পলটন একজন পর্যটক ছিলেন। প্যারিসে এসে তিনি মেসমারের অনুগামী হয়ে গেলেন। মেসমার শুধুমাত্র একজন চিকিৎসকই ছিলেন না, দিনের পর দিন একদল শিষ্য নিয়ে অনেক অসুস্থ শরীরের ওপর চুম্বকীয় শক্তি ব্যবহারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে শরীরের তীব্র যন্ত্রণাকে খানিক বশে আনার উপায় বের করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রবর্তিত পদ্ধতি পরবর্তীতে তাঁর নামের মতবাদে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু সে-সময় আমেরিকাতে এই চিকিৎসা পদ্ধতি প্রায় অপরিচিত ছিল।
ডক্টর টেম্পলটন, মেসমারের চুম্বকীয় চিকিৎসা পদ্ধতি বেদলোর ওপর দিনের পর দিন প্রয়োগ করেন। প্রথমে এই পদ্ধতি কোন কাজ করেনি। কিন্তু হাল না ছেড়ে ডাক্তার ও রুগী দু’পক্ষই এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকলেন।
কিছুদিন চিকিৎসার পর আংশিক ফল মিলল। রুগী, ডাক্তারের চুম্বকীয় শক্তির প্রভাবে বশে আসতে শুরু করল। ডাক্তার টেম্পলটনের ইচ্ছামতো নির্দেশে বেদলোর ঘুম আসতে শুরু করল। গভীর ঘুমে ঢলে পড়লে বেদলো ভুলে যেত তার যন্ত্রণা।
১৮৪৫ সালের পর থেকে এই প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হতে শুরু করল। সে-সময় আমি এই ঘটনাগুলো যতটা সম্ভব নথিভুক্ত করতে শুরু করে রাখছিলাম।
বেদলোর মনের জোর ছিল প্রশংসার যোগ্য। সে যেরকম সংবেদনশীল ছিল তেমনি উৎসাহে ভরপুর। এর পেছনে সম্ভবত প্রতিদিন মরফিন নেবার খানিকটা ভূমিকা ছিল। রোজ সকালে প্রাতরাশের পর একতাল মরফিন খেত সে। কখনো কখনো ঘুম থেকে উঠে এককাপ কড়া কফি খেয়েই মরফিন খেয়ে নিত। শরীরের ব্যথা ভুলে থাকতে সে এক অব্যর্থ দাওয়াই ছিল।
মধ্যাহ্নভোজ বলে তার কিছু ছিল না। সারাদিন তার কাটত শার্লোটেসভিল-এর বিস্তৃত বন্য-প্রকৃতি আর পাহাড়ের মাঝে। কখনো কখনো একটা পোষা কুকুর তার সঙ্গী হত।
নভেম্বরের শেষ। কুয়াশাছন্ন অথচ উষ্ণ এক দিন। ঠিক যেন আমেরিকায় ভারতীয় গ্রীষ্মের সূচনাকাল। সেদিন, বেদলো প্রতিদিনের মতো পাহাড়ে হাঁটতে গিয়ে সময়মতো ঘরে ফিরল না।
দিন গড়িয়ে গেল; একটু রাতে ব্যাপারটা জানাজানি হলে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। বেদলো তো এরকম করে না? কোনো বিপদ হল না তো?
শেষমেষ আটটা বাজতে আর চুপচাপ বসে থাকা গেল না। আমরা ঠিক করলাম ওকে খুঁজতে এবার পাহাড়ে যাওয়া উচিত।
আর ঠিক তখনই ও ফিরে এল। এবং সুস্থ শরীরে। আমাদের উৎকন্ঠিত দেখে সে উত্তেজিত হয়ে বলতে শুরু করল তার সেদিনকার পাহাড় অভিযানের অদ্ভুত কাহিনি।
***
“প্রতিদিনের মতো আজকেও আমি সকাল ন’টার সময় শার্লোটসভিল ছেড়েছিলাম,” বেদলো বলে উঠল, “সকাল দশটা নাগাদ পাহাড়ের এমন এক গিরিসঙ্কটে পা রাখলাম যেখানে আগে যাইনি। পাহাড়ের একদিকের বাঁক ধরে চলতে থাকলাম।
“দু’পাশের দৃশ্য এত সুন্দর যে বলে বোঝাতে পারব না। তেমনি ভয়ানক নির্জনতা। আমি নিশ্চিত এইখানে আগে কেউ আসেনি। ধূসর পাথরের ওপরকার সবুজ ঘাসপাতা আমার আগে কোন মানুষের ছোঁয়া পায়নি। সম্পূর্ণ নিজের অজান্তেই আমি পাহাড়ের এই অজানা অংশে চলে এসেছি। যেন এক একাকী অভিযাত্রী। কপালগুণে পেয়ে গেছি অনাবিষ্কৃত জগতের খোঁজ।”
“চতুর্দিক ধোঁয়া ধোঁয়া। কুয়াশা প্রতিটি বস্তুর ওপর জমাট হয়ে বসে তার আসল চেহারা বদলে দিয়েছে। সে-কুয়াশা আবার এত ঘন যে আমার কয়েক গজ দূরে কী আছে বুঝতে পারছিলাম না।
“অথচ জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর। শুধু বাদ সেধেছে সূর্যের আলোর অভাব। আমি কোন দিকে যে যাচ্ছি সেটাই ঠাউরে উঠতে পারছি না। এদিকে মরফিনের প্রভাব তখন আমার ওপর চেপে বসেছে। আমার চেতনা অনেকটাই জাগতিক বিষয়গুলো থেকে সরে যাচ্ছিল। পাতার কিনারায় ঝুলে থাকা শিশির-বিন্দু, বাতাসের শব্দ, জঙ্গলের সুবাস, সবকিছু মিলে যেন আমাকে এক অপার্থিব জগতে নিয়ে চলেছে তখন।
“তা সত্ত্বেও আমি চলা বন্ধ করিনি। ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটছি। কুয়াশা আরও ঘন হয়ে চেপে বসছে। হঠাৎ, একটা অস্বস্তি আমার ওপর ভর করল। আমি যেন কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম।
“মনে হচ্ছিল শব্দটা নীচের দিক থেকে আসছে। ভয় লাগতে লাগল আমার। মনে পড়ে গেল এই ভূতুড়ে পাহাড় সম্পর্কে শোনা অদ্ভুত সব কাহিনি। এই জঙ্গলে নাকি হিংস্র মানুষের বাস। আর তারা থাকে এই জঙ্গল-পাহাড়ের গহীন কন্দরে।
“এইভাবে, গুচ্ছের বাজে চিন্তা ক্রমেই আমার মন ভার করতে লাগল। ঠিক তখনই কানে এল একটা ঢাকের আওয়াজ।
“চমকে গেলাম। ট্রাম্পেটের সুর শুনলে এতটা অবাক হতাম না। কিন্তু এখানে ঢাকের আওয়াজ আসবে কী করে? ঢাক এই অঞ্চলে অপরিচিত।
“ঢাকের বাদ্যির পাশাপাশি আরও একটা বাজনাও কানে এল। ওর সঙ্গে সঙ্গে কেউ ধাতব কিছু বাজাচ্ছে। ঠিক যেন অনেকগুলো চাবি তালেতালে টুংটাং শব্দ তুলছে।
“এরপর হঠাৎ, ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার পাশ দিয়ে একটি অর্ধ উলঙ্গ লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে গেল। সে আমার এত কাছ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল যে তার নিঃশ্বাসের ছোঁয়া আমার মুখে লাগল। ভীত লোকটি তার হাতে ধরা গোল ধাতব চাকতিতে ঝোলানো বাজনাটা উন্মাদের মতো ঝাঁকাতে ঝাঁকতে ছুটছিল।
“লোকটা কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতে না যেতেই মুহূর্তের মধ্যে ধেয়ে এল
এক রাশ দাঁত বের করা এক জন্তু। উত্তেজনায় রাক্ষসটার চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল যেন। নাঃ, আমার চিনতে ভুল হয়নি! পশুটা একটা হায়না।
“জন্তুটাকে দেখে আমি এত ভয় পেয়ে গেলাম যে বলার নয়। প্রথমে তো নিজেকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি। হাতে পায়ে চিমটি কাটলাম। চোখদুটো কচলালাম। চিৎকার করে উঠলাম। কিন্তু তাতে দৃশ্যটা না বদলাতে শেষে টলমল করে খানিক এগিয়ে একটা ঝর্নার দেখা পেলাম। বয়ে চলা জলস্রোতে হাত দুটো ভাল করে ধুয়ে, ঘাড়ে মাথায় খানিক জল দিলাম।
“ঠান্ডা জলের ছোঁয়ায় সম্বিৎ ফিরে পেলাম আমি। দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে।
“হাঁটতে হাঁটতেই ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়ে আসছিলাম আমি। অপূর্ব সুন্দর প্রকৃতির সান্নিধ্যে আমার মনের জড়তা কেটে যাচ্ছিল তখন।
“খানিক বাদে একটা গাছের তলায় বসলাম। সূর্যের আলোয় কুয়াশা খানিক ফিকে হয়েছে। একটু পরে এক ঝলক হালকা রোদ্দুর দেখা দিল। গাছের ছায়া ঘাসের ওপর এলোমেলো ছবি আঁকছে।
“আমি তাকিয়ে থাকলাম ছায়ার নড়াচড়ার দিকে। ছায়াছবির আশ্চর্য নাচন আমাকে মাতিয়ে রাখছিল। এ কোন গাছ? আমি ওপরের দিকে তাকালাম। দেখি একটা পাম।
“দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে আমি দ্রুত বাস্তবে ফিরে আসছিলাম। বেশ অনুভব করতে পারছিলাম যে আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলো যথাযথ কাজ করছে। রোদ চড়ছিল। গরমটা রীতিমতো অসহনীয় হয়ে উঠছে। বাতাসে ভেসে আসছে একটা গন্ধ। কানে আসছে নদীর প্রবহমান ক্ষীণ স্রোতধ্বনি। নদীর শব্দকে ছাপিয়ে মাঝেমাঝেই ভেসে আসছিল বহু মানুষের কণ্ঠস্বর।
“হঠাৎ এভাবে এতগুলো মানুষের গলার শব্দ পেয়ে বেশ অবাক হয়ে গেলাম। আর তারপর, আচমকা বাতাসের এক ঝাপটায় সরে গেল কুয়াশার আবরণ। কোনো জাদুকর যেন এক তুড়িতে সরিয়ে দিলেন রঙ্গমঞ্চের পর্দা।
“দেখলাম একটা খাড়াই পাহাড়ের তলদেশে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে ছড়ানো সমতলভুমি। তার মাঝ দিয়ে কলকলিয়ে বয়ে চলেছে একটা নদী। নদীর ধারে, ঠিক যেন আরব্যরজনীর গল্প থেকে উঠে আসা রঙিন একটা শহর।
“খানিক ওপরে থাকায় শহরের প্রতিটি কোনা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আমি। ঠিক যেন একটা মানচিত্র। শহরের মাঝে অসংখ্য রাস্তা একে অপরের সঙ্গে জোড়া। গলি থেকে চওড়া রাজপথের সংখ্যাই যেন বেশি। রাস্তাগুলোয় থিকথিক করছে মানুষের ভিড়। বাড়িগুলো সব ছবির মতো সাজানো। কল্কা করা মিনার-শোভিত প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে বারান্দা। দোকানগুলোতে সিল্ক, মসলিনের কাপড়, রকমারি চকচকে বাসন আর দামি দামি গহনা উপচে পড়ছে।
“রাস্তার দু’পাশে পতাকার সার। রংচঙে পালকির সার দুলকি চালে চলছে তারই মাঝ দিয়ে। ঘোমটার আড়াল দেওয়া মহিলাকে কাঁধে নিয়ে যাচ্ছে ডুলি। চকমকে সাজে হাতি। সার দিয়ে রাখা মূর্তি, ঢাক, কাঁসর-ঘণ্টা, বল্লম, রুপো বাঁধানো লাঠি...
“কালো ও হলুদ চামড়ার মানুষজন হুড়োহুড়ি করছিল সেই সব ঘিরে। পাগড়ি আর আঁটসাঁট পোশাক পরা সেপাই, লম্বা দাড়িওয়ালা পুরুষদের মাঝ দিয়ে চলে বেড়াচ্ছে ষাঁড়। হনুমানের দল মসজিদের মিনারের ওপর হুটোপুটি করে চলেছে।
“রাস্তা থেকে চওড়া সিঁড়ি নেমে এসেছে নদীর কিনারায় স্নানের ঘাটে। নদীতে বড়ো বড়ো বজরা-টজরা নোঙর করা। তার মধ্যে এগোনোর পথ খুঁজে চলেছে কোনো জাহাজ।
“শহরের সীমা ছাড়িয়ে সুপুরি ও নারকেল গাছের সার। তারপর গভীর জঙ্গল। তারই মাঝে ধানের খেত। চাষিদের খড়ের-বাড়ি, পুকুর, নিঃসঙ্গ-মন্দির, ভবঘুরেদের ছাউনি। তারই মাঝ দিয়ে মেঠো পথ বেয়ে এক রমণী মাথায় কলসি নিয়ে চলেছে নদীর দিকে।
“আপনারা ভাবছেন আমি স্বপ্ন দেখছিলাম? মোটেই না। আমি যা বলছি, তা আমি দেখেছি। আমি শুনেছি। আমি অনুভব করেছি। সব অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম যে আমি স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু পরে বুঝেছি যে ওগুলো স্বপ্ন নয়। কেউ যখন স্বপ্ন দেখে আর ভাবে স্বপ্ন দেখছে, সে পরে কখনই তা বলতে পারে না। ঘুম ভাঙলেই সঙ্গে সঙ্গে অবচেতন মন থেকে তা উড়ে যায়। আমি বিশ্বাস করি ঘটনাগুলো আমার সামনে ঘটেছিল। আর যদি বলেন এরা স্বপ্নই, তাহলেও বলব, আমার মনে হয় এগুলো ঘটেছিল। নাকি... দৃষ্টিবিভ্রম হয়েছিল আমার? আপনারা কী বলেন!”
“আমিও নিশ্চিত নই যে তুমি স্বপ্নই দেখেছিলে,” বললেন ডক্টর টেম্পলটন, “তুমি বলো তারপর কী ঘটেছিল। তুমি উঠে দাঁড়ালে আর শহরের দিকে এগিয়ে চললে, তাই তো?”
“ঠিক বলেছেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম,” বেদলো একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে চলল, “তারপর পাহাড় ছেড়ে এগিয়ে চললাম শহরের দিকে। শহরের প্রতিটি রাস্তা জনাকীর্ণ। আমি ভিড়ের স্রোতে মিশে এগোতে লাগলাম। সক্কলে এগিয়ে চলেছে যেন বিশেষ একটা দিকে। সবাই উত্তেজিত।
“হঠাৎ জনস্রোতের তীব্র ধাক্কায় এক জায়গায় হাজির হলাম আমি। যদিও প্রথমে টের পাইনি কী ঘটতে চলেছে। খানিক পরে আমার আশপাশের ঝগড়ায় মত্ত জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম কোনো বিদ্রোহ দানা বাঁধছে এখানে!
“তাড়াতাড়ি জনতার ভিড় ঠেলে আঁকাবাঁকা গলিপথ দিয়ে এলাম শহরের মূল অংশে। সেখানে তখন দাঙ্গা বাধার অবস্থা। সৈনিকের উর্দি পরা একদল ভারতীয় ও একদল ইউরোপীয় এক ব্রিটিশ উর্দি পরা অফিসারের নেতৃত্বে উচ্ছৃঙ্খল জনতার সঙ্গে যুদ্ধে মেতেছে। কিন্তু সংখ্যায় কম হওয়ায় ক্রমশই পিছিয়ে আসতে হচ্ছিল সেই উর্দিধারীদের।
“নিজের অজান্তে সেই ঘটনা-পরম্পরার শরিক হয়ে গেলাম আমি। বিহ্বল হয়ে, মাটিতে পড়ে থাকা এক অফিসারের অস্ত্র তুলে নিয়ে সৈন্যদের দলে যোগ দিলাম।
“উত্তেজনায় আমার মন থেকে ভয় চলে গিয়েছিল। এরপর দ্রুত আমাদের দল ভারী হতে লাগল। আমরা এগিয়ে চললাম কাছের সেনা-ছাউনির দিকে। সেইটার দখল নিয়ে নিরাপত্তার খাতিরে তার সামনে একটা ব্যারিকেড গড়ে তুললাম আমরা।
আমাদের দিকে ধেয়ে আসা উত্তেজিত দেশীয় মানুষগুলোকে কোনোক্রমে ঠেকিয়ে রাখা গেল তাতে।
“তখন হঠাৎ ছাউনির একপ্রান্তের ফুটো দিয়ে নজরে এল, একদল উত্তেজিত মানুষ নদীর ধারের একটা সুসজ্জিত প্রাসাদ ভাঙচুর শুরু করেছে। একজন দুর্বল চেহারার লোক প্রাসাদের ওপরতলার জানালা গলে একটা কাপড় ধরে ঝুলতে ঝুলতে নেমে, নদীতে নোঙর করে রাখা একটি বোটে চেপে পালিয়ে গেল নদীর অন্যপাড়ে।
“আমার ওপর যেন কিছু ভর করেছিল। আমি সঙ্গীদের উদ্দেশে তেজোদৃপ্ত এক বক্তব্য রাখলাম। ওতে কাজ দিল বেশ। কয়েকজন লাফ দিয়ে ছুট লাগাল সামনের দিকে। আমাদের ঘিরে রাখা জনতার ব্যূহ হটিয়ে আমরা ছুটলাম।
“উত্তেজিত জনতাও আমাদের পেছন পেছন তাড়া করে এল। কয়েকজন আমাদের আগে আগেও ছুটছিল। তাদের কেউ কেউ আবার কেবল নিজেদের মধ্যে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ছিল। তারপর আবার ছুটছিল।
“ছাউনি থেকে টানা ছুটে আমরা এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে গেলাম সেই শহরের গলির রাজ্যে। রাস্তার ওপর ঝুঁকে থাকা বড়ো বড়ো প্রাসাদগুলোর ফাঁকে অসংখ্য গলি আমাদের ঠাঁই দিল। সূর্যের আলো পড়ে না সেইসব গলির ভেতরে।
“কিন্তু তাতেও শত্রুদের হাত থেকে নিস্তার মিলছিল না। বারংবার ওদের বর্শার খোঁচা আমাদের শরীরে বিঁধে যাচ্ছিল। ঝাঁকে ঝাঁকে তির উড়ে আসছিল আমাদের দিকে। লম্বা, কালচে সাপের শরীরের মতো হুবহু তৈরি করা হিলহিলে তিরগুলোর ফলা ছিল বিষ মাখানো।
“ছুটতে ছুটতেই হঠাৎ একটা বিষাক্ত তির এসে ঘা দিল আমার মাথার ডান দিকে। আমি ঘুরে পড়ে গেলাম। শরীরে ছড়িয়ে গেল তীব্র যন্ত্রণার অনুভূতি। শুরু হল প্রবল রক্তক্ষরণ...
“ধীরে ধীরে রক্তশূন্য হয়ে আসছিলাম আমি। তারপর একসময় আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। আ...আমি মারা গেলাম।”
এ-পর্যন্ত শুনে আমি মৃদু হেসে বললাম “বেশ খাসা কল্পনা হে! এত ভালো, যে গল্পটাকে স্রেফ অলীক বলতে দ্বিধা লাগছে। কিন্তু নিজেকে মৃত একজন মানুষ হিসেবে দেখা...?”
কথাটা বলার পর আমি বেদলোর কাছ থেকে খানিক হাসির প্রতিক্রিয়া আসা করেছিলাম, কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সে থরথর করে কাঁপতে লাগল, ভয়ে বিবর্ণ হয়ে নীরব রইল।
আমি খানিক অবাক হয়েই ডক্টর টেম্পলটনের দিকে ঘুরে তাকালাম। তাতেও বিস্ময় বাড়ল বই কমল না আমার। দেখি তিনি চেয়ারে পাথরের মতো স্থির হয়ে রয়েছেন। তাঁর দাঁতে দাঁত লেগে মৃদু শব্দ উঠছিল। চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল যেন। খানিক বাদে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ফ্যাসফেসে গলায় তিনি বেদলোকে বললেন, “বলে যাও।”
“বেশ কিছু সময়,” বেদলো বলে চলল, “আমার সমস্ত আবেগ, অনুভূতি সম্পূর্ণ হারিয়ে গিয়েছিল। আমার আত্মা তার অস্তিত্ব হারিয়েছিল। অথচ কেমন করে জানি না সেটা আমি উপলব্ধিও করতে পেরেছিলাম একই সঙ্গে।
“খানিক পর আমি উঠে দাঁড়ালাম। কোনো মানুষজন, শব্দ বা কিছুই নেই। সব যেন উধাও হয়ে গেছে। কোথায় দাঙ্গা? কোথায় কী? একটা নিঝুম শহরের মাঝে আমি দাঁড়িয়ে আছি। মাথায় তিরবিদ্ধ আমার মৃতদেহ মাটিতে পড়ে আছে।
“অথচ মনে হয় না এরকম কিছু আমি চোখ দিয়ে দেখেছি। পুরোটাই ঘটেছিল আমার অনুভূতিতে। আমার অবচেতন মনে। কোনো কিছুতেই আমার আগ্রহ ছিল না। এমনকী আমার মৃতদেহ নিয়েও আমার কোন মাথাব্যথা ছিল না।
“খানিক বাদে আমি চলতে শুরু করলাম। নিঃশব্দে শহর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। যে পথ দিয়ে এসেছিলাম, সেই পথ খুঁজে উল্টোমুখী চলতে থাকলাম ফের। তারপর, অনুভূতিহীন একটা মূর্তির মতই হাঁটতে হাঁটতে শেষে যেখানে আমি হায়নাটার মুখোমুখি হয়েছিলাম সেইখানটায় এসে গেলাম।
“জায়গাটায় এসেই আমার শরীরে যেন বিদ্যুতের একটা স্রোত বয়ে গেল। ক্লান্তি এসে ভিড় করল আমার শরীরে। আমার নিজস্ব ইচ্ছে ফিরে এল। আমি যেন নিজেকে ফিরে পেলাম! তারপর দ্রুত পা চালালাম বাড়ির দিকে।
“কিন্তু এখনও আমি মন থেকে দৃশ্যগুলো মুছে ফেলতে পারছি না। ... আমি কী ধরে নেব, যা দেখেছি তা নিছক স্বপ্ন?”
“ব্যাপারটা অত সহজ নয়,” গম্ভীর হয়ে বললেন টেম্পলটন, “ঘটনাটাকে কী বলে যে আখ্যা দেব তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ধরে নেওয়া যাক, কোনো একটা অতিপ্রাকৃত প্রভাব তোমার ওপর পড়েছিল। যাই হোক, এই জলরঙে আঁকা ছবিটা দেখ। অনেক আগেই এটা তোমাকে দেখানো উচিত ছিল আমার। এতে এমন এক অদ্ভুত বিষয় আছে ... কিন্তু একটা মানসিক বাধা আমায় ছবিটা তোমাকে দেখাতে বারংবার বাধা দিয়েছে।”
আমরা ছবিটা দেখলাম। এমন কোনো বিশেষত্ব খুঁজে পেলাম না তাতে।
একটা মানুষের প্রতিকৃতি। তার অভিব্যক্তি ছবিটিতে নিখুঁতভাবে ফুটেছে। অন্তত আমার বিবেচনা তাই বলে। শুধু ছবিটার সঙ্গে বেদলোর অদ্ভুত মিল।
কিন্তু ছবিটার অভিঘাত বেদলোর ওপর মারাত্মকভাবে পড়ল। সেটার দিকে তাকিয়ে সে প্রায় মূর্চ্ছা যাচ্ছিল।
“কিছু বুঝতে পারছ?” টেম্পলটন বললেন, “ছবিটার কোনায় লেখা তারিখটা দেখ। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ১৭৮০। ছবিটা আমার এক মৃত বন্ধুর। নাম মিস্টার ওলডেব। ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসনকালে কলকাতায় থাকার সময় আমার সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব হয়েছিল। সে-সময় আমার বয়স ছিল মাত্র কুড়ি। সারাতোগাতে তোমাকে দেখে আমি চমকে গিয়েছিলাম মিস্টার বেদলো। আমার মৃত বন্ধুর ছবির সঙ্গে তোমার এত মিল দেখে আমিই তোমার সঙ্গে যেচে আলাপ করি, তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাই ও ধীরে ধীরে তোমার নিত্য সাহচর্য পাওয়ার ব্যবস্থা করি। বন্ধুর কথা মনে পড়ায় আগ্রহবশত তোমার প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম।”
“তুমি এতক্ষণ ধরে তোমার পাহাড়ের অভিজ্ঞতা যা বর্ণনা করলে তা একবিন্দু মিথ্যে নয়। ঠিক এই একই ঘটনা ঘটেছিল পুণ্যতোয়া গঙ্গানদীর তীরের শহর বেনারসে। সেই যুদ্ধ, সেই দাঙ্গা, সেই হত্যাকাণ্ড সব সত্যি। এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন চৈত সিং। ঘটনাটা ঘটেছিল ১৭৮০ সালে। যে লোকটি দড়ি বেয়ে পালাচ্ছিল, সে ছিল চৈত সিং স্বয়ং। ছাউনির নীচে যে দলবল দেখেছিলে তারা ছিল সিপাহী ও ব্রিটিশ অফিসার। ওয়ারেন হেস্টিংস স্বয়ং সেদিন তাঁর সৈন্যদলকে পরিচালনা করছিলেন। আমিও ওই দলে ছিলাম। ওই দাঙ্গায় আহত অফিসারদের চিকিৎসা করছিলাম আমি। ওই বিষ মাখানো তিরগুলো ছুঁড়ছিল একদল বাঙালি। ওই তিরবিদ্ধ লোকটি ছিল আমার প্রিয় বন্ধু ওলডেব। এই কাগজগুলো পড়লেই সব বুঝতে পারবে।”
এই বলে টেম্পলটন একটি ডায়েরি নামিয়ে রাখলেন টেবিলের ওপর। ডায়েরির পাতার পর পাতা লেখায় ভর্তি। দেখে মনে হচ্ছিল যেন সদ্য লেখা।
“তুমি যখন পাহাড়ের কন্দরে বসে ওইসব ঘটনা দেখছিলে তখন বাড়িতে বসে আমি ওই একই ঘটনা লিখে যাচ্ছিলাম ডায়েরির পাতায়। কি অদ্ভুত সমাপতন।”
***
এর ঠিক সপ্তাহখানেক পরে শার্লোটসভিলের এক কাগজে এই খবরটা প্রকাশিত হয়:
মৃত্যু-সংবাদ
“অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমরা মিস্টার অগস্টাস বেদলোর মৃত্যু-সংবাদ ঘোষণা করছি। তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত ভদ্রলোক। তাঁর দয়ালু মনোভাব ও অনান্য অনেক গুণের জন্য শার্লোটসভিলের নাগরিকরা তাঁকে মনে রাখবে। মিস্টার বেদলো বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে স্নায়ুরোগে আক্রান্ত ছিলেন। প্রায়শই এই রোগ তাকে মারাত্মকভাবে বেদনা দিত। এই রোগের চরিত্রই এই। কিছুদিন আগে পাহাড়ে একাকী বেড়াতে গিয়ে তিনি জ্বর ও ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলেন। সঙ্গে আঘাত পেয়ে মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধে। ডক্টর টেম্পলটন জমাট রক্ত বের করে দিতে জোঁক চিকিৎসা শুরু করেন। মস্তিষ্কের জমাট-রক্ত-বাঁধা অংশে কয়েকটি জোঁক ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু খানিক সময় পরে রক্তশূন্য হয়ে রোগীর মৃত্যু হয়। আশঙ্কা, চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত জোঁকের সঙ্গে কোনোভাবে মারাত্মক বিষাক্ত জোঁক মিশে গিয়েছিল। এই বিষাক্ত জোঁকগুলো স্থানীয় পুকুরেও পাওয়া যায়। এই জোঁক মস্তিষ্কের ধমনী থেকে দ্রুত রক্ত চুষে রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়। বিষয়টি যখন নজরে আসে তখন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।”
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ
শার্লোটসভিলের বিষাক্ত জোঁক খুব সহজেই শনাক্ত করা যায়। এগুলো চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত জোঁকের থেকে বেশি কালো রঙের হয়। এগুলোর কুন্ডলি পাকিয়ে থাকার ধরণ অনেকটা সাপের মতো।”
খবরটায় বেদলো-র নামের বানান ভুল ছিল। লিখেছিল বি-ই-ডি-এল-ও। বলা বাহুল্য সেটা ভুল বানান।
এর কিছুদিন পর, আমি ওই কাগজের সম্পাদকের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে এই দুর্ঘটনার বিষয়ে বিশদ জানতে চেয়েছিলাম। বলেছিলাম, “বেদলো তার নামের বানানটা ও-রকম করেই লিখত নাকি? এমনিতে ওর শেষে একটা ‘ই’ হয় বলেই তো জানি! বি-ই-ডি-এল-ও-ই।”
“আরে হ্যাঁ হ্যাঁ। ওইটেই ঠিক বানান,” সম্পাদকমশাই মাথা নাড়লেন, “টাইপ সেটিং করতে গিয়ে ওই শেষের ই-টা আর পড়েনি। সারা বিশ্বে বেদলো নামের বানান শেষে ‘ই’ দিয়েই হয়। ওর বাইরে বেদলো নামের বানান আর কিছু হয় বলে শুনিনি। এ-সবই ছাপাখানার ভূতের খেলা হে!”
“তাই হবে,” আমি উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলাম। জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা সাহিত্যকেও হার মানায়। বেদলোর শেষের ‘ই’টা বাদ দিয়ে ওই অক্ষর ক’টা ঘুরিয়ে একটা নাম তৈরি হয় – ওলডেব। ওএলডিইবি?
ছাপাখানার ভূত? নাকি...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন