সৌভিক চক্রবর্তী

“দু’একটা শেয়াল আর কিছু অনেক দিনের বেজি। এর থেকে হিংস্র আর কোন জানোয়ার নেই,” ভ্যান চিল তার উত্তরে বলল। শিল্পী কোন উত্তর দিল না।
“হিংস্র জানোয়ারের ব্যাপারে কী বলছিলেন?” কিছুক্ষণ পর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ভ্যান চিল কানিংহ্যামকে প্রশ্ন করে।
“কিছু না। আমার কল্পনা। যাক, আমার ট্রেন এসে গেছে।” কানিংহ্যাম এই বলে চলে গেল।
সেই বিকেলে ভ্যান চিল প্রত্যহের মতই তার জঙ্গলে ঢাকা এস্টেটের ভেতরে হাঁটতে বেরোল। ভ্যান চিলের পড়ার ঘরে একটা স্টাফ করা বক ছিল ও সে অনেক ধরণের জংলি ফুলের নাম জানত, অতএব তার পিসিও তাকে এক বিশাল প্রকৃতিবিদ বলতে দ্বিরুক্তি করত না। আর যাই হোক, সে প্রচুর হাঁটতে পারত। প্রায় অভ্যাসবসতই সে হাঁটতে হাঁটতে যা দেখত তা মনে রাখত, বিজ্ঞানের উপকারের জন্য না হলেও পরে গল্প করার সময় কাজে লাগবে বলে। চারিদিকে ব্লু বেল ফোটা শুরু হলে সে সবাইকে বিশেষভাবে তার কথা জানিয়েছিল। অবশ্য সবার সে সম্বন্ধে কিছু ধারণা ছিল, কারণ বাইরের ঋতুটা কী তা সবাই দেখেছে কিন্তু এ বিষয়েও সবাই একমত ছিল যে ভ্যান চিল তার বক্তব্য একেবারে মন থেকে করেছিল। অতএব কেউ তাতে কোন আপত্তি জানায়নি।
কিন্তু এই বিশেষ বিকেলে ভ্যান চিল যা দেখল তা তার রোজকার অভিজ্ঞতার থেকে একেবারেই আলাদা। ওক গাছের একটা ঝাড়ের মধ্যে একটা গভীর জলাশয়, তার ওপর ঝুঁকে থাকা মসৃণ পাথরের গায়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিল ষোল-সতেরো বছর বয়সের একটি ছেলে। বিকেলের জোরালো সূর্যের আলোয় আরাম করে তার তামাটে শরীরটাকে শুকোচ্ছিল সে। মধ্যে থেকে চেরা তার ভেজা চুল মাথায় লেপ্টে ছিল। তার হালকা বাদামি চোখগুলোতে কেমন যেন একটা বাঘসুলভ চমক ছিল। সে ভ্যান চিলের দিকেই অলস অথচ সজাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
এহেন অপ্রত্যাশিত মূর্তিকে সেখানে দেখে ভ্যান চিল নিজের অজান্তেই চিন্তা করতে লাগল। এই জংলি ছেলেটি কোথা থেকে এল এখানে? মাসদুয়েক আগে খুব কাছেই কারখানার এক শ্রমিকের বাড়ি থেকে তার বাচ্চাটি উধাও হয়ে যায়। তখন আন্দাজ করা হয়েছিল যে কারখানার পাশে নালার জলে ভেসে গেছে বাচ্চাটি। কিন্তু সে তো একেবারে সদ্যোজাত বাচ্চা, আর এ তো একটা কিশোর!
“এখানে তুমি কী করছ?” সে ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে চেঁচাল।
“দেখছেন না, গায়ে রোদ লাগাচ্ছি।” ছেলেটি উত্তর দিল।
“তুমি কোথায় থাকো?”
“এখানেই থাকি, এই জঙ্গলের মধ্যে।”
“না, তুমি তো এই জঙ্গলে থাকতে পার না।”
“জঙ্গলটা বেশ ভালই তো।” ছেলেটা বলল, তার গলায় একটা অভিজ্ঞ অভিজ্ঞ ভাব।
“কিন্তু রাত্রে কোথায় শোও তুমি?”
“আমি রাত্রে ঘুমোই না যে! তখনই তো আমার সবচেয়ে বেশি কাজ।”
ভ্যান চিল এবার বিরক্ত হল। ব্যাপারটার মধ্যে রহস্য কিছু একটা আছে। কিন্তু সেটা যে কী তা সে ঠিক ধরতে পারছিল না।
“তুমি কী খাও?” সে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল।
“মাংস।” সে কথাটা কেমন যেন রসিয়ে রসিয়ে বলল, যেন সেই মুহুর্তে মাংসের স্বাদ সে তার জিভে পাচ্ছিল।
“মাংস! কীসের মাংস?”
“আপনার যখন এতই ঔৎসুক্য, তখন শুনুন। খরগোশ, বনমোরগ, এমনি মোরগ, ঠিকঠাক আবহওয়ায় ভেড়া, আর মানুষের বাচ্চা যদি পাই কখনও। যদিও এমনিতে রাত্রে ওদের ঘরের ভেতর আটকে রাখে। আর তখনই আমি শিকার করে থাকি। শেষ মানুষের বাচ্চার মাংস খেয়েছি তারপর মাসদুয়েক তো হয়েই গেছে।”
তার এই বিদ্রুপগোছের মন্তব্যটিকে অগ্রাহ্য করে ভ্যান চিল ছেলেটাকে চোরাশিকারের বিষয়টির দিকে টেনে আনার চেষ্টা করল।
“খরগোশের ব্যাপারটা কিন্তু তুমি বাড়িয়েই বলছ। আমাদের এই পাহাড়ি খরগোশ শুধু হাতে ধরা অত সহজ নয়।”
ছেলেটা এর বেশ একটা রহস্যময় উত্তর দিল, “রাতে তো আমি চার পায়েই শিকার করি।”
“তুমি বোধহয় বলার চেষ্টা করছ যে তুমি কুকুর নিয়ে শিকার কর, তাই না?” ভ্যান চিল বলল।
ছেলেটা এবার নীচুগলায় একটা অদ্ভুত হাসি হেসে গড়িয়ে নিয়ে চিত হয়ে শুলো। হাসিটা চাপা হলেও কিছুটা জান্তব গর্জনের মত শোনাল।
“রাতে কোন কুকুরই আমার সাথে থাকতে বিশেষ ইচ্ছুক হবে বলে মনে হয় না।”
ভ্যান চিলের এবার মনে হতে লাগল যে এই অদ্ভুত চোখ-ওয়ালা, অদ্ভুত কথা বলা ছেলেটির মধ্যে একটা বড়ই অস্বস্তিকর ব্যাপার রয়েছে।
“তোমাকে এই জঙ্গলে তো আমি থাকতে দিতে পারি না।” সে এবার কর্তৃত্ত্বপূর্ণভাবে বলল।
“আমার তো মনে হয় আপনার বাড়িতে আমার থাকার চাইতে এই জঙ্গলে থাকাটাই আপনার পক্ষে বেশি সুখকর হবে।”
সত্যিই, তার সুন্দর, সাজানোগোছানো বাড়িতে এই বন্য কিশোরটির থাকাটা একদমই সুখকর হবে না, ভ্যান চিল ভেবে দেখল।
“কিন্তু তুমি যদি নিজে থেকে এখান থেকে না যাও, তাহলে তোমাকে জোর করে তাড়াতে আমি বাধ্য হব।”
ছেলেটা তড়াক করে ঘুরে, জলাশয়টিতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল, আর পরমুহুর্তেই ভ্যান চিল জলাশয়ের যে ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে তার জলে ভেজা চকচকে শরীরটা নিয়ে বেয়ে উঠে পড়ল প্রায় বিদ্যুতগতিতে। একটা উদবেড়ালের পক্ষে এটা অসাধারণ কিছু নয়, কিন্তু ষোল সতেরো বছরের একটা ছেলেকে এরকম করতে দেখে ভ্যান চিল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। সে নিজের অজান্তেই পিছু হটতে গিয়ে হড়াৎ করে পিছলে পড়ে গেল জলের ধারে ভেজা, আগাছা ঢাকা মাটিতে। আর সেই বাঘের মত, হলুদ চোখদুটো ক্রমশ তার দিকে এগিয়ে আসছিল। প্রায় প্রতিবর্ত ক্রিয়াতেই সে হাত দুটো দিয়ে তার গলাটা ঢাকতে গেল। ছেলেটা আবার হেসে উঠল, এবার সেই হাসিতে হাসির চেয়ে গর্জনের পরিমাণই বেশি। তারপর আবার সেই বিদ্যুতগতিতেই ঝোপের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
“কী অদ্ভুত! বন্য জন্তু একেবারে!” ভ্যান চিল মাটি থেকে উঠতে উঠতে মন্তব্য করল। আর তারপরেই তার কানিংহ্যামের কথা মনে পড়ে গেল, “তোমাদের এই জঙ্গলে কিন্তু একটা হিংস্র জানোয়ার আছে।”
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভ্যান চিল এক এক করে গত কয়েক মাস ধরে এই অদ্ভুত বন্য ছেলেটির সাথে যুক্ত করা যেতে পারে এমন সমস্ত ঘটনার কথা নিজের মনে নাড়াচাড়া করতে লাগল।
ইদানিং এই জঙ্গলে শিকার করার মত পশু কমে গেছে প্রায় হঠাৎ করেই, আশপাশের চাষিবাড়ি থেকে মাঝে মাঝেই মুরগি চুরি যাচ্ছে, খরগোশ তো আর প্রায় দেখাই যায় না, আর ভেড়ার ছানা নাকি পাহাড় থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এমন নালিশও তার কাছে এসেছে। সত্যিই কি ছেলেটা তাহলে কোন চতুর শিকারি কুকুরের সাহায্যে এই এলাকায় শিকার করে বেড়াচ্ছে? সে রাত্রে ‘চার পায়ে’ শিকার করার কথা বলেছে, আবার এও বলেছে, যে রাতের বেলা কোন কুকুর তার কাছে ঘেঁষবার সাহস পাবে না। বড়ই রহস্যময় কান্ডকারখানা।
মাসদুয়েক ধরে চলতে থাকা এইসব লুটপাটের কথা ভাবতে ভাবতে আচমকা সে দাঁড়িয়ে পড়ল। দু মাস আগে কারখানা থেকে বাচ্চাটা চুরি গেছিল- সবাই ভেবেছিল নালার জলে ভেসে গেছে বাচ্চাটা, কিন্তু তার মা হলফ করে বলেছিল যে, ঠিক সেই সময় সে একটা চিৎকারের শব্দ শুনেছিল নালার উল্টো দিকে পাহাড়ের থেকে। ব্যাপারটা একেবারেই অচিন্ত্যনীয়, কিন্তু ছেলেটার দু মাস আগে মানুষের বাচ্চার মাংস খাওয়ার কথাটা ভ্যান চিলের মাথায় ঘুরতে লাগল ক্রমাগত। ছেলেটা এসব না বললেই পারত। এরকম কথা ঠাট্টা করেও বলা উচিৎ নয়।
প্রায় অভ্যাসের বিরুদ্ধেই ভ্যান চিল বাড়িতে জঙ্গলের সেই ছেলেটার কথা কাউকে বলল না। সে যে দু’মাস ধরে তার নিজের এস্টেটেই এরকম ক্ষতিকারক একজনকে আশ্রয় দিচ্ছিল তা এলাকার কাউন্সিলর ও বিচারক হিসেবে তার পদমর্যাদাকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে। তাছাড়া চুরি যাওয়া ভেড়া, মুরগির দামও তো লোকে তার কাছেই চাইতে পারে। অতএব সে রাত্রে তাদের ডিনার অস্বাভাবিকরকম নীরবে সম্পন্ন হল।
“কী রে, কথা বলছিস না কেন?” পিসি তাকে প্রশ্ন করল, “বাঘ দেখেছিস মনে হচ্ছে!”
ভ্যান চিল এই প্রবাদটা আগে কখনও শোনেনি। শুনেও তার খুব বোকাবোকা লাগল, সত্যিই যদি বাঘ দেখে থাকে তাহলে এতক্ষণ এ’রকম চুপ করে থাকার পাত্র সে নয়।
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট খেতে গিয়ে ভ্যান চিল টের পেল যে গত বিকেলের ঘটনা নিয়ে তার অস্বস্তি পুরোপুরি কাটেনি। সে ঠিক করল সে ট্রেনে করে পাশের শহরে যাবে, সেখানে কানিংহ্যামকে খুঁজে বের করবে ও জিজ্ঞেস করবে সেদিন সেই হিংস্র জন্তুর কথা সে কেন জিজ্ঞেস করেছিল। এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে, সে তার আগের হাসিখুশি মেজাজ কিছুটা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হল। গুনগুন করে একটা আনন্দের গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে তার সকালের পাওনা সিগারেটখানা খুঁজতে গেল সে তার বসার ঘরে। ঘরে ঢুকে অবশ্য গানের কলির বদলে গলা থেকে তার ভগবানের নাম বেরিয়ে এল। তার সোফার ওপরে কমনীয়ভাবে গা ছড়িয়ে অতি আরামে শুয়ে রয়েছে গত বিকেলের জঙ্গলের সেই ছেলেটা। আগের চেয়ে তার গা অনেক শুকনো, কিন্তু আর কোন বদল ঘটেনি তার চেহারায়।
“কোন সাহসে তুমি এখানে এসেছ?” ভ্যান চিল রাগে চিৎকার করে উঠল।
“আপনিই তো আমায় জঙ্গলে থাকতে মানা করেছিলেন।” সে ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল।
“কিন্তু এখানে আসতে তো বলিনি! আমার পিসি তোমায় দেখলে-” আর সেই মুহুর্তেই পিসি সেই ঘরে ঢুকে পড়ল।
ভ্যান চিল কোনমতে ব্যাপারটাকে ঢাকতে বলল, “আহা রে, বেচারা ছেলেটা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে-আর স্মৃতিও। ও কে, কোত্থেকে এসেছে মনে করতে পারছে না কিছুতেই।” আর পরমুহুর্তেই ছেলেটার মুখের দিকে একবার দেখে নিল পাছে সে তার বন্য চরিত্রের কোন অপ্রত্যাশিত নমুনা দেখিয়ে দেয় পিসিকে। তা অবশ্য হল না, আর এই অনাথ, পথ হারানো ছেলেটিকে, কোন মিষ্টি বিড়ালছানা বা কুকুরছানার মতই মনের আনন্দে কাছে টেনে নিল পিসি। বলে, “ওর জন্য যতটুকু করতে পারি আমরা, করব।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন লোককে পাশের পাদ্রির বাড়িতে পাঠিয়ে সেখানকার অল্পবয়সি এক
কর্মচারীর বাড়িতে পরার জামাকাপড় নিয়ে আসা হল আর তার সঙ্গে জুতো, কলার, শার্ট – এই সমস্তও। পরিষ্কার ও ভদ্র জামাকাপড় পরিহিত অবস্থায় ছেলেটিকে দেখেও কিন্তু ভ্যান চিলের মনে হল তার ওই অস্বস্তিকারক ব্যাপারটা এক চুলও যায়নি। কিন্তু পিসির তাকে বড়ই মনে ধরল।
“ওর আসল নাম জানা অবধি ওকে একটা সুন্দর নাম দিতে হবে,” পিসি বলল, “গ্যাব্রিয়েল-আর্নেস্ট, হ্যাঁ, তাই ভাল। বেশ ঠিকঠাক, সুন্দর নাম।”
ভ্যান চিল সায় দিল বটে কিন্তু মনে মনে তার অস্বস্তিটা রয়েই গেল। বরঞ্চ আরও বেড়ে গেল যখন জানা গেল যে তাদের বৃদ্ধ, শান্ত স্প্যানিয়েলটা ছেলেটা আসা মাত্রই দরজা দিয়ে সটান ছুট লাগিয়েছিল বাইরের দিকে। সে এখন ঘরে ঢুকতে নারাজ। প্রায় জেদ করেই সে ফলের বাগানের অন্য কোণে বসে কাঁপছে আর কুঁই কুঁই করছে। পোষা ক্যানারি পাখিটা, যে ভ্যান চিলের মতই বাচাল, সেও আজ কয়েকটা ভীত আওয়াজ ছাড়া আর কিছু বলতে পারছে না। তার ফলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কানিংহ্যামের সাথে কথা বলাটা আরও জরুরি বলে মনে করল ভ্যান চিল।
যখন সে স্টেশনের পথে রওনা দিল তখন পিসি সন্ধেবেলায় তার সানডে স্কুলের শিশু সদস্যদের সঙ্গে গ্যাব্রিয়েল আর্নেস্টের আলাপ করার ব্যাবস্থা করছে।
***
কানিংহ্যাম প্রথমে কথা বলতে রাজি হচ্ছিল না। বলে, “আমার মা মাথার গন্ডগোলে মারা গেছিলেন। অতএব তুমি বুঝতে পারছো আমি কোন অবাস্তব, অসম্ভব, আজগুবি জিনিস দেখে থাকলেও তা নিয়ে মাথা ঘামাতে একদমই ইচ্ছুক নই।”
“কিন্তু তুমি দেখেছটা কী?” ভ্যান চিল তার পেছনে লেগে রইল।
“আমার যা দেখেছি তা এমনই অবাস্তব যে কোন সুস্থ মানুষ তা দেখে থাকলেও তা কখনও স্বীকারও করবেন না। তোমাদের ওখানে আমার শেষ সন্ধ্যায় আমি ফলের বাগানের ধারে একটা বেশ ঝাঁকড়া ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়েছিলাম, আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাওয়া সূর্যাস্তের রঙ দেখছিলাম আকাশের গায়ে। হঠাৎ আমি একটা ছেলেকে খেয়াল করলাম। একটি কিশোর। সদ্যই স্নান করে উঠেছিল বোধহয়। পাশেই তো পুকুর। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল সে। তাকে দেখে পুরাণের গল্পের পাতা থেকে উঠে আসা কোন বন্য দেবতার কথা মনে হচ্ছিল আমার। তাই তাকে আমি আমার ছবির মডেল বানাব বলে ঠিক করে ফেললাম। পরমুহূর্তেই হয়তো আমি তাকে ডাকতাম। কিন্তু হঠাৎ করেই সূর্য একেবারে ডুবে গেল, গোলাপি ও কমলার বদলে চারিদিকে তখন সন্ধের কালো ও ছাইরং। আর সেই সঙ্গে আরেকটা আশ্চর্য জিনিস ঘটল। ছেলেটা মিলিয়ে গেল।”
“অ্যাঁ! একেবারে ভ্যানিশ?” ভ্যান চিল উৎসাহিত গলায় জিজ্ঞেস করল।
“না, আর সেটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার।” উত্তর দিল শিল্পী, “পাহাড়ের ওপর যেখানে ছেলেটা
এক মুহূর্ত আগে দাঁড়িয়েছিল সেখানে তার জায়গায় হাজির হল একটা বিশাল বড়ো কালচে রঙের নেকড়ে বাঘ। ঝকঝকে শ্বদন্ত আর নিষ্ঠুর, হলুদ দুটো চোখ। তুমি ভাববে--”
কিন্তু চিন্তা করার জন্য আর থেমে থাকল না ভ্যান চিল। সে তখনই হনহন করে স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগাল। টেলিগ্রাম করার কোন প্রশ্নই নেই।
গ্যাব্রিয়েল-আর্নেস্ট একটা নেকড়েমানব! এমন কথাটা হঠাৎ কেউ শুনলে ব্যাপারটার গুরুত্ব সে তো বুঝবেই না, বরং হাসবে। পিসি শুনলে হয়তো ভেবে বসবে ভ্যান চিল তার সঙ্গে রহস্য করছে। শুধু একটাই আশা ছিল তার, সে সূর্যাস্তের আগে হয়তো বাড়ি ঢুকতে পারবে।
বাড়ির স্টেশনে এসে সে গাড়িতে করে তাড়াহুড়ো করে রওনা দিল। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা যেন শেষই হয় না। বিরক্ত লাগছিল তার। আর সেইসঙ্গে একটা শিরশিরে ভয় কাজ করছিল বুকের ভেতর। গিয়ে উঠতে উঠতে দেখা গেল, সূর্যাস্তের আলোয় চারিদিক রঙিন হয়ে উঠেছে। অবশেষে সন্ধের মুখমুখ যখন সে গিয়ে বাড়ি ঢুকল, পিসি তখন টেবিল থেকে না খাওয়া কেক ও জ্যাম বয়ামে ভরে রাখছিল।
“গ্যাব্রিয়েল আর্নেস্ট কোথায়?” সে একরকম চেঁচিয়ে উঠল।
“ও টুপ’দের ছোটো ছেলেটাকে বাড়ি দিতে গেছে।” পিসি বলল, “এত দেরি হয়ে গেল, ভাবলাম বাচ্চাটাকে একা পাঠানোটা নিরাপদ হবে না। সূর্যাস্তটা কী সুন্দর, না?”
সুর্যাস্তের ব্যাপারে অবিদিত না থাকলেও, ভ্যান চিল আর তার রূপ নিয়ে আলোচনা করতে দাঁড়াল না। যত দ্রুত সম্ভব সে ছুটতে লাগল টুপ’দের বাড়ির দিকে। রাস্তাটার একধারে কারখানার সেই নালা আর অন্যদিকে খাড়া পাহাড়। আকাশে তখনও সূর্যাস্তের লালচে আভার কিছুটা লেগে রয়েছে। এর পরের বাঁকটা নিলেই বাড়িটাকে দেখতে পাওয়া যাবে—
-আর তারপরেই হঠাৎ সমস্ত আলো চলে গিয়ে চারিদিক কালো ও নিষ্প্রাণ হয়ে গেল আর দূর থেকে ভেসে এল ভয়ার্ত এক চিৎকার। ভ্যান চিল ছোটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়ল।
গ্যাব্রিয়েল-আর্নেস্ট আর টুপ’দের সেই বাচ্চাটাকে আর কখনো দেখা যায়নি। কিন্তু গ্যাব্রিয়েল-আর্নেস্টের ফেলে দেওয়া জামাকাপড় রাস্তার ধারে পাওয়া গেছিল। অতএব লোকে ভেবেছিল বাচ্চাটা কোনভাবে জলে পড়ে গেছিল ও গ্যাব্রিয়েল আর্নেস্ট তাই জামাকাপড় খুলে রেখে তাকে বাঁচাতে জলে নেমেছিল, কিন্তু পারে নি।
ভ্যান চিল ও আশপাশে কর্মরত কয়েকজন কর্মচারী পরে বলেছিল যে সন্ধে নামার সময় তারা ওখান থেকে আসা একটা বাচ্চার চিৎকার শুনতে পায়। সম্ভবত চিৎকারটা জামাকাপড় যেখানে পাওয়া গেছে সেখানকার আশপাশ থেকেই করা হয়েছিল। টুপ গিন্নীর আরও এগারোখানি সন্তানাদি ছিল, তাই দুঃখ হলেও তিনি তা খুব বেশি দেখাননি। কিন্তু পিসি মনে মনে তার সেই অনাথ বালকের চলে যাওয়া নিয়ে খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। তাই তাঁর উৎসাহেই এলাকার চার্চে গ্যাব্রিয়েল-আর্নেস্টের নামে একটা পেতলের স্মারক বসানো হয়েছিল। সেটা উৎসর্গ করা হয়েছিল, “গ্যাব্রিয়েল আর্নেস্টকে, এক অজানা কিশোর, যে অন্যকে বাঁচানোর জন্য সাহসের সাথে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিল।”
ভ্যান চিল অন্য সব কিছুতে পিসির কথা মেনে নিত, কিন্তু গ্যাব্রিয়েল-আর্নেস্টের স্মারকের জন্য পয়সা দেওয়ার বেলায় এক কথায় না বলে দিয়েছিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন