মৃত্যুধারা

সৌভিক চক্রবর্তী

"This striding place is called the “Strid,”

A name which it took of yore;

A thousand years hath it borne the name

And it shall a thousand more."

-W. Wordsworth

ইউরোপীয় কেতায় অভ্যস্ত বলেই, আর কিছুটা গা আলগা দেওয়ার ফলেও, ওয়াইগাল মেঠো হাঁস-মুরগি শিকারে অল্পেতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।

ক্লান্ত হবে না কেন? ঠায় একটা আলের মতো জমির বেড়ার ওপরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, গৃহস্বামীর লোক যতক্ষণ না পাখিগুলোকে লম্বা কঞ্চির ডগা দিয়ে খুঁচিয়ে তোলে আর অপেক্ষমান বন্দুকের সামনে এনে হাজির করে। ওয়াইগালের নিজেকে সেসব পূর্বপুরুষদের প্যারডির মতো লাগছিল, যাঁরা ইয়র্কশায়ারের ওয়েস্ট রাইডিং এর পতিত জমির তেপান্তরে আর জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে সত্যিকারের শিকারের মতো শিকার করতেন। তবে আগস্টে ইংলন্ড এসেছে বলে, সে-মরশুমে যা পাওয়া যায় তাতেই সে খুশি থাকতে চেয়েছে। উলটে সে গৃহস্বামীকে পালটা আমন্ত্রণ জানিয়েছে, দক্ষিণে গিয়ে ফেজেন্ট শিকার করার জন্য। তার যুক্তি ছিল, জীবনের খুশি-মজাকেও সেই একই দার্শনিকতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত যেভাবে সে অসুবিধাগুলোকে করে থাকে।

আজ দিনটা একেবারেই সুবিধের হয়নি। ভারী একটা বৃষ্টির পরে গোটা বিস্তীর্ণ পতিত জমিটা এমনই স্পঞ্জের মতো হয়ে উঠেছে, যে পায়ের তলার মাটিটা যেন রবার। বনমোরগদের নিজেদের গোপন আস্তানা থাকার কারণেই হোক, বা ওদের বাতের ব্যামো নেই বলেই হোক, শিকার জমেনি, মরা পাখির থলি হালকা রয়ে গেছে। এখানে মহিলারাও খুব একঘেয়ে ধরনের, এক-আধখানা ব্যতিক্রম বাদ দিলে। যেমন এক মেয়ে আগের সন্ধ্যায় সারাক্ষণ তাকে ওপরের গোলাকৃতি ছাতে আঁকা একটি ঝাপসা তৈলচিত্র কী বিষয়ে আঁকা, তা ভাষায় প্রকাশ করার জন্য আবদার করে গেল।

ওয়াইগাল-এর মনে এসব কিছুই তেমন দাগ কাটেনি। তবে সবাই শুতে চলে যাবার পর সে নিজে নিজে দুর্গ থেকে বেরিয়ে পড়েছিল, এবং এলোমেলো হেঁটে নদীর ধারটিতে এসে হাজির হয়েছিল। আসলে দু’দিন আগেই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল তার বহুদিনের বন্ধু, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ছেলেবেলার সাথী, কলেজ জীবনের দোস্ত, বহু দেশে একসংগে ঘোরার সঙ্গীটি। যে কিনা দুনিয়ার একমাত্র লোক, যার জন্য তার মনে তীব্র ভালবাসা ছিল। আন্দাজ হচ্ছিল সে বুঝি পাড়ি দিয়েছে কোনো অনন্তলোকে, অন্তত পেছনে যা চিহ্ন রেখে গিয়েছে তাতে এমনই মনে হয়েছিল।

বিগত সপ্তাহে এই বন্ধুটি ছিল পাশের এস্টেটের অতিথি, সত্যিকারের শিকারীর মতো যথাযথ

আগ্রহ নিয়ে বন্দুকবাজি করছিল, মাঝে মাঝে আদেলিন কাভান নামের নারীটির সঙ্গে প্রেমও করছিল, স্পষ্টতই খুব খোশমেজাজেই ছিল।

যতদূর জানা যায় তার মনের পারদ নামিয়ে দেবার মতো কিছুই ঘটেনি, কেন না পকেটে ছিল বিপুল রেস্ত, আর মিস কাভান তার দিকে তাকালেই কর্ণমূল অব্দি রাঙা হয়ে উঠছিলেন, এবং, ইংলন্ডের সবচেয়ে ধুরন্ধর বন্দুকবাজ হিসেবে, আগস্ট মাসের চাইতে প্রিয় মাস তার কিচ্ছুটি নেই।

কাজেই আত্মহত্যার থিওরিটা একেবারেই উদ্ভট, সবাই মেনে নিয়েছিল তা, আর তাকে খুনই বা কে করবে, কেনই বা।

তথাপি, মার্চ অ্যাবি থেকে দু রাত্তির আগে সে হেঁটে বেরিয়ে গিয়েছে কোথাও, টুপি আর ওভারকোট ছাড়াই, আর কেউ তাকে দেখেওনি তারপর থেকে।

গ্রামগঞ্জের দিকে রাতে দিনে পাহারাদার ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একশ জন বনরক্ষক আর শ্রমিক জঙ্গল ঠেঙিয়ে ফিরছিল, প্রান্তরের মধ্যে জলাজমিগুলো খুঁচিয়ে দেখছিল, কিন্তু এখনো একটা রুমাল পর্যন্তও পাওয়া যায়নি।

ওয়াইগাল এক মুহূর্তের জন্যও ভাবেনি যে উইয়াট গিফোর্ড মৃত। সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি, যদিও অনস্বীকার্য, তবু তার যত না ভয় করছিল তার চেয়ে বেশি রাগ হচ্ছিল।

ক্যামব্রিজে থাকতে গিফোর্ড ছিল সংশোধনের অতীত এক রগুড়ে লোক, প্র্যাকটিকাল জোকের অভ্যেস যে তার চলে গেছে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাও বলা যায় না। এটা তার পক্ষে খুবই সম্ভব যে সান্ধ্য-পোশাকেই সে গাঁ পেরিয়ে গিয়ে একটা গরু চালানের ট্রেনে উঠে পড়েছে। আর ওয়েস্ট রাইডিং-এ তাকে নিয়ে যা হৈ চৈ হচ্ছে সে আমোদটা একা একাই খুব একচোট উপভোগ করে নিচ্ছে।

তথাপি, ওয়াইগালের মনে তার বন্ধুর জন্য ভালবাসাটা এতটাই গভীর ছিল, যে অধুনা যে সন্দেহ ও দুশ্চিন্তার বাতাবরণ চলছে তাতে একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। তাই, অন্য পুরুষদের মতো তাড়াতাড়ি শুতে না গিয়ে, সে ভাবল একটু হেঁটে আসা যাক, যতক্ষণ না ঘুম পেয়ে যায়।

হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ে গেল সে, জঙ্গলের মধ্যের সুঁড়িপথটা ধরে ধরে চলতে লাগল। চাঁদ ছিল না আকাশে, কিন্তু তারাদের শীতল আলোখানি জলের ওপর ঝিকমিক করছিল। জঙ্গল আর ভাঙাচোরা বাড়িঘরদোরের পাশ দিয়ে, মাথার ওপর ঝুলন্ত পাথরের সবুজ বিশালতার মধ্যে দিয়ে বা গাছ গাছালিতে জড়িয়ে-মড়িয়ে থাকা ঢালু পাড়ের পাশ দিয়ে শান্তভাবে বয়ে যাওয়া এক ফালি কোমরবন্ধের মতো জলটুকু। নদীর জলটা যেন মাঝে মাঝে পাথরে ধাক্কা খেয়ে রাগি গলায় গর্জন করে উঠছিল, আবার গতিপথ ফাঁকা পেতেই শান্ত হয়ে যাচ্ছিল।

যে গভীর জঙ্গলে হাঁটছিল ওয়াইগাল, তা খুব অন্ধকার। আপনমনেই সে হেসে ফেলল, গিফোর্ডের

একটা কথা মনে করে: ‘ইংলন্ডের যে-কোনো জঙ্গল কিন্তু ঠিক জীবনের অন্য অনেক জিনিসের মতই, দূর থেকে বেশ আকর্ষণ করে, আর ভেতরে গেলে ফাঁকা ঠাট্টার মতো মনে হয়। যতক্ষণ দু-পাশে তুমি দিনের আলো দেখতে পাও, সূর্যের আলোয় সবকিছু সামান্য মনে হয়। নিজেদের প্রকৃত রূপটা খোলতাই করে তুলতে আমাদের জঙ্গলগুলোর আসলে রাত্তির দরকার হয়, স্বরূপে তারা যা ছিল, আগে, যদ্দিন না আমাদের পূর্বপুরুষদের নাতিপুতিরা এসে খালি টাকা টাকা করে সব মাটি করলে।”

ওয়াইগাল ধূমপান করতে করতে হাঁটতে লাগল, বন্ধুর কথা ভাবতে ভাবতে, তার নানা দুষ্টুমির কথা ভাবতে ভাবতে, যার মধ্যে অনেকগুলোতেই আবার তার নিজেরও অবদান ছিল, যতটা না বন্ধুর। একেক রাত্রে গোটা রাত ধরেই তাদের নানা কথোপকথন চলত, সে স্মৃতিতেও সে চুর হয়ে ছিল।

লন্ডনের মরশুম শেষ হবার ঠিক আগে, এক উষ্ণ রাত্রে কোনো এক পার্টির পর তারা দুজনে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আত্মার অস্তিত্ব ও গন্তব্যের নানা তত্ত্ব নিয়ে কথা বলেছিল। সেইদিন সন্ধেতে তারা এক কলেজের সহপাঠীর কফিনের সামনে মিলিত হয়েছিল, গত তিন বছর বন্ধুটির মগজটা শূন্য হয়ে গিয়েছিল। কয়েক মাস আগেই সে-বন্ধুকে দেখতেই, ওরা পাগলাগারদেও গিয়েছিল। তখন তার মুখের ভাবটি ছিল কোনো বৃদ্ধের মতো। সারা মুখে ছিল অতিরিক্ত ভোগের চিহ্ন। মৃত্যুতে কিন্ত সেই মুখই শান্ত, বুদ্ধিদীপ্ত, যেন অনাচারের দাগ-ছোপ সব উধাও। আবার কলেজের চেনা সেই মানুষটির মুখ ফিরে এসেছে।

তখন সেখানে দাঁড়িয়ে ওয়াইগাল বা গিফোর্ড কোনো মন্তব্য করার সময় পায়নি এটা নিয়ে, তারপর বিকেল ও সন্ধে ছিল পরিপূর্ণ, কিন্তু, উৎসব বাড়ি থেকে বেরিয়ে, নির্জনতা খুঁজে পেতেই, দুজনে যেন একই সংগে বিষয়টায় ফিরে গিয়েছিল।

গিফোর্ড বলেছিল, আমার এই তত্ত্বে বিশ্বাস যে আত্মা মৃত্যুর পরও কিছুক্ষণ দেহে অবস্থান করতে থাকে। উন্মাদ দশায় সে এক অক্ষম বন্দীর মতো থাকে, যদিও সচেতন বন্দী। ভাবো, কী ভয়ানক দুর্দশা তখন তার, কী বীভৎস অবস্থা। কিন্তু এর চেয়ে স্বাভাবিক আর কীই বা আছে বল, যখন জীবনের আগুন নির্বাপিত হয়, সেই অত্যাচারিত আত্মাটি ফাঁকা খুলিটাকে অধিগ্রহণ করবে এবং জয়ী হবে অন্তত কয়েক ঘন্টার জন্য, পুরোনো বন্ধুরা যখন তাকে শেষ দেখা দেখতে আসবে? ততদিনে তো সে নিজের কুকর্মের ফল ভোগ করে আত্ম-অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছে, নিজের আত্মশুদ্ধিও করেছে।       আমাকে যদি স্বাধীনতা দাও, আমি আমার কফিনটা মাটির তলার খুপরিতে গিয়ে ঢোকা পর্যন্ত নিজের কঙ্কালের ভেতরেই থাকব। যাতে আমি আমার পুরোনো বেচারি বন্ধুকে মৃত্যুর বিষাদময় নৈর্ব্যক্তিকতার হাত থেকে অব্যাহতি দিতে পারি। আমার এও ইচ্ছে, আমার দেহটির প্রতি সুবিচার হোক, পূর্বপুরুষদের পাশে, সঠিক অনুষ্ঠান পালন করে, যথোপযুক্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে তাকে শায়িত করা হোক। আমার আবার এত ঔৎসুক্য এই বিষয়ে, যে ভয় হয় তড়িঘড়ি মরেই না যাই, ঊর্ধ্বজগতের রহস্য উদ্‌ঘাটনের তাড়ায়।

তুমি তাহলে বিশ্বাস কর, আত্মা একটি আলাদা অস্তিত্ব, এটা কেবল জৈব তাড়নার আর এক নাম নয়?

নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি। শরীর আর আত্মা দুই যমজ, জীবনের সহযোদ্ধা – কখনো বন্ধু, কখনোবা শত্রু, কিন্তু শেষ দিনে পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ। কোনো একদিন, আমি যখন বস্তুজীবনে ক্লান্ত হয়ে পড়ব, একবার যাবই ভারতে। ‘মহাত্মা’ হয়ে দেখব, শুধু এই স্বয়ম্ভুব আত্মার সঙ্গে শরীরের সম্পর্কটার প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।

আচ্ছা ধরো, তোমার শরীরটাকে যদি ঠিকঠাক ভাবে সংরক্ষণ করা না হয়, আর নিরালম্ব বায়ুভূক হয়ে এক বছর বেরিয়ে ফিরে এসে তুমি দেখ, যে তোমার পার্থিব দেহটা আর বসবাসের উপযুক্ত নেই? আমি বাপু এরকম কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে নেই। আত্মা আর শরীরের মধ্যে লোফালুফি করতে গিয়ে যদি গোলমাল হয়ে যায়?

সেটাও খুব একটা মন্দ হবে না, একঘেয়ে ব্যাপার তো নয়ই। আমি বরং ভাঙা খোল-নলচে, যন্ত্রপাতি নিয়ে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষাটা করতে মজাই পাব।

জলের উঁচুপর্দার বুনো এক হুংকার হঠাৎ আছড়ে পড়ল ওয়াইগালের কানের ওপরে। তার স্মৃতিচারণে ছেদ পড়ল চকিতে। জঙ্গল ছেড়ে সে ওয়ার্ফ নদীকে প্রায় রুদ্ধ করে দেওয়া পিছল বিশাল বিশাল পাথরগুলোর ওপর বেরিয়ে এল। দেখল এখানটায় জল যেন ফুঁসতে ফুঁসতে নেমে গেছে সরু একটা ফাঁক বেয়ে, দুরন্ত ক্রুদ্ধ শক্তিতে। দু’পাড়ের জঙ্গলের কালো নীরবতা উঁচু হয়ে উঠে গেছে। তারাগুলো ঠিক ওপরেই যেন আরো ঠান্ডা, আরো সাদা।

যেদিকেই দেখ,নদীটা যেন একটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার গুহার মধ্যে হঠাৎ প্রবেশ করেছে। এর চেয়ে নিঃসঙ্গ আর কোনো জায়গা নেই বোধ হয় ইংলন্ডে, এর চেয়ে বেশি ভূতুড়ে তো নয়ই। কেউ সে দাবি করতে পারবে না। যদি অবশ্য ভূতেরা সত্যিসত্যিই থেকে থাকে। ওয়াইগাল ভিতু নয়, কিন্তু স্ট্রিড নামের এই জায়গাটাতেই ঘটে যাওয়া কতগুলো যে মৃত্যুর গল্প তার জানা, সব তার মনে পড়তে লাগল আর অস্বস্তি হতে লাগল। ওয়র্ডসওয়ার্থের ‘বয় অফ এগ্রেমন্ড’ কে বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন উইটেকার নস্যাৎ করলেও, অসংখ্য অন্য মানুষ, যাদের বোধবুদ্ধির চেয়ে অজানার প্রতি টান বেশি, এই সরু, ফুটন্ত জলের পথে নীচে চলে গেছে, কোনোদিন যাদের কয়েক গজ দূরের ওই স্তব্ধ জলাশয়ে আর ভেসে উঠতে দেখা যায়নি। জলের নীচে, স্ট্রিডের চারপাশের দেওয়াল গড়ে উঠেছে কয়েকটা বিশাল প্রস্তরখন্ড দিয়ে, তারো নীচে আছে স্ট্রিডের গোপন গুহা, যারা মরেছে তারা ঐ তাকের মতো খোপটায় গিয়ে আটকে গিয়েছে। জায়গাটার একটা কুৎসিত আকর্ষণ আছে। ওয়াইগাল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মনশ্চক্ষে কঙ্কালগুলোকে দেখতে পেল, কফিনছাড়া,সবজেটে,মানুষের মরণশীলতার চিহ্নবহন করা, নড়বড়ে চক্ষুহীন জিনিসগুলো। কঙ্কালের ওপরের আচ্ছাদনটুকুকে খেয়ে শেষ করেছে মৃত্যু। ওই যে তাদের ঘর। ওয়াইগাল কল্পনা করতে চেষ্টা করল, এর মধ্যে কেউ স্ট্রিডের ওপর দিয়ে লাফিয়ে পার হতে চেষ্টা করেছে কিনা। গোটা পাথরটা শ্যাওলায় ঢাকা,এত বেশি ভয়ংকর সন্দেহজনক আগে কখনো এ-জায়গাটাকে দেখায়নি।

শিউরে উঠে সে পেছন ফিরল। যেন এক তাড়না এল তার এ-জায়গা ছেড়ে পালাবার,যদিও সে পুরুষমানুষ। যেমনি পেছনে ফেরা,পাথর থেকে জল যেখানে নীচে নেমে গেছে সেখানে ফেনার মধ্যে কী যেন একটা নড়তে-চড়তে দেখল যেন। জলের ফেনার মতই সাদা,কিন্তু জল নয়,এমনকিছু,তার চোখে পড়ে গেল,আর তৎক্ষণাৎ গতিরুদ্ধ হল তার। তারপর সে লক্ষ করল,জল যেদিকে ধেয়ে যাচ্ছে, তার ঠিক উলটোদিকে এই জিনিসটার গতি। যেন সপাটে উঠে যেতে চাইছে ওপর দিকে,পেছন দিকে। ওয়াইগাল দাঁড়িয়ে পড়ল শক্ত হয়ে,তার শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এল,মনে হল নিজের মাথার চুলগুলো সব সটান দাঁড়িয়ে যাবার আওয়াজও সে পেল।

ওটা কি একটা হাত? ফুটন্ত ফেনার আরো ওপরে জিনিসটা উঠে আসতে চাইছে যেন,পাশে ফেরানো,আর চারটে আকুল আঙুল স্পষ্ট দেখা গেল কালো পাথরটার প্রেক্ষাপটে।

ওয়াইগালের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মহাভীতি এক লহমায় দূর হয়ে গেল। একটা মানুষ ওখানে আটকে গেছে, নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইছে স্ট্রিডের তলার ঘূর্ণির টান থেকে, নিশ্চিতভাবে জলে তলিয়ে যেতে যেতে। একটু আগেই,তার আসার এক মুহূর্ত আগেই হয়ত, যখন সে ঘূর্ণিটার উলটোদিকে ফিরে দাঁড়িয়েছিল, তখনই পড়েছে লোকটা।

কিনারার যতটা কাছে যেতে তার সাহসে কুলোল, যথাসম্ভব কাছে সে গেল। ওই হাতটা মুড়ে গেল, যেন তাকে ডাকছে, পৃথিবীর প্রাণীদের অপরিবর্তনীয় নিয়তির দিকে টেনে নেওয়া ওই বেগের বিরুদ্ধে উন্মাদের মতো ঝাঁকুনি দিয়ে দিয়ে। তারপর আবার হাতটা ছড়িয়ে ফাঁক হল, আবার মুঠো পাকাল, আবার ছড়াল,যেন সাহায্যের জন্য চিৎকার করা এক মানুষের কন্ঠের চেয়েও বেশি জোরে ধ্বনিত হল তার আর্তি।

ওয়াইগাল সবচেয়ে কাছের গাছটার দিকে ছুটে গেল, বলিষ্ঠ বাহুতে একটা ডাল টেনে ছিঁড়ে আনল বেঁকিয়ে চুরিয়ে, এবং ততোধিক দ্রুততায় স্ট্রিডের কাছে ফিরে এল। হাতটা তখনো একই জায়গায়, এবং একইরকম ঝোড়ো ইঙ্গিতে ঝাঁকিয়ে উঠছে। শরীরটা তো বোঝাই যাচ্ছে নীচের পাথরগুলোর ফাঁকে আটকে গিয়েছে,হয়ত জল তার অর্ধেকটা টেনেই নিয়ে গিয়েছে ওই ভয়ংকর পাথুরে তাকগুলোর ভেতরে। ওয়াইগাল একটা নীচু পাথরের উপরে শুয়ে পড়ল প্রায়,নিজের কাঁধদুটোকে পেছনের পাথরের সঙ্গে সাঁটিয়ে ভর রাখল, তারপর জলের ওপর ঈষৎ ঝুঁকে, গাছের ডালটাকে হাতটার মধ্যে গুঁজে দিল।

যেন রোগতাড়িতের মতো আঙুলগুলো জড়িয়ে ধরল ডালটাকে। ওয়াইগাল সজোরে টান দিল, তার নিজের পা-দুটো বিপজ্জনকভাবে একেবারে কিনারার কাছে চলে এসেছে তখন। প্রথমে চোখে কিছুই পড়ল না। তারপর একটা গোটা বাহু জলের ওপরে এক ঝটকায় উঠে এল। ওয়াইগালের মাথা অব্দি যেন রক্ত ছলকে উঠল, প্রায় দমবন্ধ হয়ে এল ভাবতে,যে স্ট্রিড বুঝি তাকেও নিজের গর্জনরত আলিঙ্গনে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিচ্ছে,কিন্তু সে কিছুই দেখতে পেল না। তারপর কুয়াশা কেটে গেল। হাত ও বাহু অব্দি তার বেশ কাছে এসে গিয়েছে কিন্তু শরীর তখনো ফেনার নীচে ঢাকা। ওয়াইগাল চোখ সরু করে দেখার চেষ্টা করল। অল্প আলোয় একটা অদ্ভুত নকশা করা কাফলিংক নজরে এল, ডাল আঁকড়ে ধরা আঙুলগুলোও খুব চেনা।

ওয়াইগাল পিছল পাথরের কথা ভুলে গেল,একটু বেশি দূরে পা ফেললে তার কী নিদারুণ মৃত্যু হতে পারে তাও আর মনে রইল না। প্রচন্ড আবেগতাড়িত হয়ে সে ইচ্ছাশক্তি আর পেশীশক্তি দুইই খাটিয়ে টান দিল। তার মগজের উষ্ণ আলোর ভেতরে কত যে স্মৃতি ঝাঁপ খেয়ে পড়ছে তখন,ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে হুমড়ি খেয়ে,যেমন ডুবে যাবার সময়ে মানুষের মনে আসে। তার জীবনের বেশির ভাগ সুখের কথা, ভাল মন্দের কথা সবই তার বন্ধুর সঙ্গে কোনো-না-কোনোভাবে জড়িত। কলেজের দিনগুলোর দৃশ্য, ভ্রমণের দৃশ্য, ইচ্ছে করে করা বেপরোয়া কান্ড, মৃত্যুর খুব কাছে এসে গিয়েছিল যখন তারা একাধিক ঘটনায়, ক্যালাইডোস্কোপের বদলে বদলে যাওয়া ছবির মতন সব ঝলকে উঠতে লাগল তার মাথায়।

ওয়াইগালের একাধিক মেয়ের সঙ্গে ভালবাসা হয়েছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে সেসব প্রেমকে সে ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে পারে উইয়াট গিফোর্ডকে সে যতটা ভালবেসেছে তার পাশে। গোটা পৃথিবীতে কত সুন্দরী মহিলা আছে, কিন্তু তার জীবনের বত্রিশ বছরে সে আর একটি পুরুষকেও দেখেনি যাকে গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্কে এভাবে বাঁধা যায়।

সামনে দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে। তার কব্জিটা যেন মড়মড় করে উঠল,হাতের ছাল ছিঁড়ে গেল। তবু ওই আঙুলগুলো এখনো ডালটাকে আঁকড়ে ধরে আছে,তার মানে তার ভেতরে প্রাণ আছে।

হঠাৎ কী যেন একটা আলগা হয়ে গেল। হাতটা প্যাঁচ খেয়ে ঘুরে গেল, ওয়াইগালের মুঠি থেকে গাছের ডালটাকে ছিঁড়ে নিয়ে যেন। শরীরটা আটকে নেই আর, ছিটকে বাইরে চলে এসেছে, যদিও ফেনা আর বুদবুদের তলায় এখনো ডুবে আছে।

ওয়াইগাল নিজের পায়ে কোনমতে খাড়া হয়ে ছুটে গেল পাথরের ধার বরাবর,বুঝল গিফোর্ডের শরীরটাকে আর নীচের ঘূর্ণির টেনে নেবার বিপদ নেই, শান্ত ওই জলাশয়ের দিকে শরীরটা এবার ভেসে যাবে সিধে। গিফোর্ড তো সাঁতারে মাছেদের মতই দক্ষ,এমনকী,জলের তলাতেও ও অন্য অনেক পুরুষের চেয়ে বেশিক্ষণ থাকতে পারে। এই ঝঞ্ঝাটটুকু যদি ও কাটিয়ে উঠে থাকে, তাহলে ওর সাহস আর কুশলতা ওকে আরো একবার ডুবে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেবেই।

ওয়াইগাল জলাশয়ে এসে উপস্থিত হল। সান্ধ্য পোশাকে একটি লোক ভেসে রয়েছে, তার মুখ ঘোরানো, জল থেকে উঁচু একটা খাড়া পাথরের ওপর তার বাহুটি পড়ে আছে,পাথরটা শরীরটাকে তুলে ধরেছে যেন ওপর দিকে। যে-হাতটা ডালটাকে আঁকড়েছিল সেটা পাথরটার ওপরে নেতিয়ে পড়ে আছে, কালো জলে সাদা ছায়া পড়েছে হাতের।

ওয়াইগাল অগভীর জলাশয়ে ঝাঁপ দিল, গিফোর্ডকে তুলে নিল পাঁজাকোলা করে, ফিরে এল তীরে। শরীরটাকে নীচে নামিয়ে রাখল,নিজের কোট খুলে ফেলল, যাতে প্রশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য কসরৎ করার সময়ে নিজের হাতদুটো মুক্ত পাওয়া যায়। এক মুহূর্তের জন্য আনন্দে তার মন ভরে গেল। শেষ ওই সংগ্রামটুকুতে এই সাহসী মানুষটির জীবন চলেও তো যেতে পারত। ওর মুখের দিকে তাকাতেও ভয় পাচ্ছিল, বুকে কান রেখে শ্বাসের শব্দ শুনতেও। তবু এক মুহূর্তের কুন্ঠা সরে গেল,নাহ,আর একটুও কালক্ষেপ করা যাবে না।

স্থির হয়ে থাকা বন্ধুর দিকে সে ফিরল। হঠাৎ তার ইন্দ্রিয়গুলোকে যেন একটা অদ্ভুত আর অপ্রীতিকর কোনোকিছু ভয়ানক একটা ধাক্কা দিল। অর্ধমুহূর্তের জন্য সে তার স্বরূপ বুঝতে পারল না। তারপর তার দাঁতে দাঁত লেগে গেল খটখট করে, তার পা আর দুটো ছড়ানো হাত জঙ্গলের দিকে উঠে গেল, কিন্তু নিজেকে সামলে, সে লাফিয়ে উঠে ব্যক্তিটির পাশে এসে নীচু হয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। সেখানে মুখ ছিল না কোন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%