হারিয়ে যাওয়া ভূতটা

সৌভিক চক্রবর্তী

মিসেস জন এমারসন জানলার পাশেই ছুঁচসুতো নিয়ে বসেছিলেন; বাইরের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন মিসেস রোডা মিসার্ভ রাস্তা ধরে আসছেন। ওঁর হাঁটার ধরন আর বিড়বিড় করা দেখেই বুঝলেন এ-বাড়ির দিকেই ভদ্রমহিলার লক্ষ্য। হাবভাবেই পরিষ্কার – কাঁধ ঝাঁকিয়ে, গলা উঁচিয়ে আসছেন মানেই গুরুতর কোনো সংবাদ আছে। কোনো খবর বাজারে থাকলেই সেটা রোডা মিসার্ভ জেনে যাবেনই, ওঁর কাছে সবসময়ই এ-রকম খবর থাকে আর সাধারণত মিসেস জন এমারসন-এর কাছেই এসে সেটা প্রথম বলবেন। মিসেস মিসার্ভ, সাইমন মিসার্ভকে বিয়ে করে গ্রামে আসার পর থেকেই ওই দুই মহিলা পরস্পরের খুব বন্ধু।

মিসেস মিসার্ভ বেশ সুন্দরী, আকর্ষণীয় একটা ফ্রিল-দেওয়া-স্কার্ট পরে আসছিলেন, চোখেমুখ স্পষ্টত বেশ বিচলিত আর ওর মুখটা কালো টুপির কানাতের মধ্যে থেকে একটা উজ্জ্বল সাদা ঝিনুকের মতো লাগছিল জানলায় বসা মিসেস এমারসনের।

ওঁকে আসতে দেখে মিসেস এমারসন খুশিই হলেন। উৎসাহের আতিশয্যে তাড়াতাড়ি উঠে বাইরের ঘর থেকে সবচেয়ে ভালো রকিং চেয়ারগুলোর একটা নিয়ে এলেন ওঁকে বসতে দেবার জন্য। উল্টোদিকের জানলার পাশে চেয়ারটা রেখে এসেই বন্ধুকে দরজার সামনে থেকে স্বাগত জানালেন।

“গুড আফটারনুন,” বললেন ভদ্রমহিলা, “আমি তোমায় দেখে সত্যি খুব খুশি হয়েছি। সারাদিন একলাই বসেছিলাম, জন আজ সকালবেলাতেই শহরে গেছে। ভাবছিলাম তোমার বাড়িই যাই, এদিকে সেলাইটা করে উঠতে পারিনি। নতুন কালো স্কার্টটাতে কুঁচি লাগাচ্ছিলাম।

“তাই! আমার আবার হাতে তেমন কাজ কিছু নেই, খালি কুরুশের কাজটা ছাড়া,” মিসেস মিসার্ভ বললেন, “সেজন্য ভাবলাম চট করে তোমার এখানেই একটু ঘুরে যাই।”

“সত্যি খুব খুশি হয়েছি তুমি এলে বলে,” মিসেস এমারসন বললেন, “জিনিসপত্তরগুলো দাও, আমার শোবার ঘরে বিছানার ওপরেই রাখছি ওগুলো। রকিং চেয়ারটাতে বোসো।”

মিসেস মিসার্ভ বসার ঘরের রকিং চেয়ারটাতে গুছিয়ে বসলেন, ইতিমধ্যে মিসেস এমারসন ওর শাল আর টুপিটা শোবার ঘরে রেখে এলেন। ফিরে আসতে আসতে দেখেন মিসেস মিসার্ভ রকিং চেয়ারে

দিব্যি আরামে বসে নীল রঙের উল বোনা শুরু করে দিয়েছেন।

“এটা ভারী সুন্দর,” মিসেস এমারসন বলে উঠলেন।

“হ্যাঁ। আমারও সুন্দর লাগে,” মিসেস মিসার্ভ উত্তর দিলেন।

“চার্চের মেলার জন্য নিশ্চয়?”

“হ্যাঁ। কিন্তু মনে হয় না এটা বেচে ভালো জাতের পশমও কেনা যাবে, কাজের মজুরি তো

ছাড়ো। তবু কিছু না কিছু তো করতে হতই।”

“গতবারের মেলার জন্য যেটা বানিয়েছিলে সেটা বিক্রি করে কত আয় হয়েছিল?”

“পঁচিশ সেন্ট।”

“বড্ডো খারাপ, তাই না?”

“হুঁ। তাই-ই বটে। সারা সপ্তাহে সারাক্ষণ কাজ করে একখানা বানানো। ভাবি, যারা পঁচিশ সেন্ট দিয়ে কিনেছে তারা যদি একটা বানিয়ে দেখত। মনে হয় অন্য গাওনা গাইত তারা। আমার অবশ্য অভিযোগ করা উচিত নয় কারণ সবটাই ঈশ্বরের জন্য। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় তিনিও এর চেয়ে বেশি কিছু পেতেন না।

“যাই হোক, জিনিসটা বেশ সুন্দর,” মিসেস এমারসন উল্টোদিকের জানলায় বসে ওর সেলাইয়ের স্কার্টটা টেনে নিলেন।

“হ্যাঁ, কাজটা বেশ ভালো, আমি কুরুশ বুনতে দারুণ ভালোবাসি।”

দুই মহিলাই চেয়ারে দুলতে দুলতে দু’তিন মিনিট নিঃশব্দে উল বুনে চললেন। দুজনেই অপেক্ষায় ছিলেন। মিসেস মিসার্ভ অপেক্ষায় ছিলেন, কখন অন্যজনের ঔৎসুক্যটা বাড়তে বাড়তে এমন হবে, যেন ওর খবরটা দেবার একটা সঠিক আর মোক্ষম সময় আসে। ওদিকে মিসেস এমারসন এই খবরটার অপেক্ষাতেই ছিলেন। শেষ অবধি আর অপেক্ষা করতে পারলেন না তিনি।

“ইয়ে, খবরটা কী?” বলেই ফেললেন তিনি।

“ঠিক ঠিক জানি না আসলে সত্যিই...” বিষয়টা আড়াল করে একটু সময় নিচ্ছিলেন মহিলাটি।

“হ্যাঁ নিশ্চিত ঘটেছে কিছু, তুমি আমায় ঠকিও না।” মিসেস এমারসন বললেন।

“তুমি কী করে জানলে?”

“তোমার হাবেভাবেই স্পষ্ট।”

মিসেস মিসার্ভ হেসে উঠলেন, প্রকৃতপক্ষে লুকোতে বিফল হয়ে।

“ইয়ে, সাইমনও বলে যে আমার মুখের অভিব্যক্তি এমনই যে আমি পাঁচ মিনিটের বেশি কিছু চেপে থাকতে পারি না, যতই চেষ্টা করি না কেন,” তিনি বলে চললেন, “হ্যাঁ সত্যিই খবর আছে একটা। সাইমন দুপুরে খবরটা নিয়ে এসেছিল। সাউথ ডেটন-এ শুনেছে ও। একটা ব্যাবসার কাজে ও আজ সকালেই গিয়েছিল সেখানে। পুরোনো সার্জেন্টের জায়গাটা ভাড়া দিয়েছে।”

মিসেস এমারসন হাতের সেলাই থামিয়ে তাকিয়ে রইলেন।

“যাহ। বোল না!”

“হ্যাঁ। সত্যিই।”

“কাকে?”

“কেন, ওই যে বস্টনের লোক, যারা গেল বছর সাউথ ডেটনে এল। আগের বাড়িটাতে ওদের ঠিক পোষাচ্ছিল না – যথেষ্ট বড়ো ছিল না বলে। লোকটার অনেক সম্পত্তি, আর খুব ভালোভাবে থাকার সামর্থ্যও আছে। পরিবারে কেবল ওর এক স্ত্রী আর অবিবাহিতা বোন আছে। বোনেরও টাকাপয়সা আছে। লোকটা বস্টনে ব্যাবসা করে। এখান থেকে বস্টন যাওয়াও যা সাউথ ডেটন থেকেও তা। তো ওরা এখানেই আসছে। জানই তো পুরোনো সার্জেন্টের বাড়িটা চমৎকার জায়গা।”

“হ্যাঁ শহরের সবচেয়ে সুদর্শন বাড়ি, কিন্তু ...”

“আরে, সাইমন বলল, ওদের সে-সব বলেছে, লোকটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে ও তো ভয় পায়ই না, ওর বউ বা বোনও পায় না। লোকটা বলেছে যে, সাউথ ডেটনের বাড়িটা যেমন ছিল, তেমন আলো-না-ঢোকা, ঘুপচি ঘরে থাকার চেয়ে ভূতের সঙ্গে থাকার ঝুঁকি ঢের ভালো। আরো বলেছে, ভূত হয়ে যাবার ঝুঁকির থেকে ভূত দেখার ঝুঁকিটা নেয়াই শ্রেয়। সাইমন বলল, লোকটা বেশ মজা করতে পারে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ,” মিসেস এমারসন বলে উঠলেন, “বাড়িটা খুব সুন্দর, হতে পারে গল্পগুলো শুধুশুধুই, কোনো সারবত্তা নেই। আমার কখনোই মনে হয়নি, ইয়ে, ওরা সরাসরি অমনিই চলে আসে। আমি কখনো ও-কথাগুলোয় অত গুরুত্ব দিইনি। আমি কেবল যেটা ভাবছি, যে ভদ্রলোকের স্ত্রী যদি একটু নার্ভাস প্রকৃতির হন!”

“একটা বাড়ির সম্পর্কে ওরকম একখানা কথাও যদি কখনো শুনতাম, পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, আমাকে দিয়ে ওই বাড়িটা ভাড়া নেওয়ায়।” মিসেস মিসার্ভ জোর গলায় ঘোষণা করলেন, “আমাকে উলটে ভাড়ার টাকাটা দিয়ে দিলেও আমি ও-বাড়িতে ঢুকতাম না। অনেক ভূতুড়ে বাড়ি দেখেছি, জীবদ্দশায় আমি আর তাতে ঢুকছি না।”

মিসেস এমারসনের মুখের ভাবটা এবারে শিকারী কুকুরের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

“গেছ নাকি?” নীচু গলায় ফিসফিস করে বললেন তিনি।

“হ্যাঁ গেছি। আর যেতে চাই না।”

“এখানে আসার আগে?”

“হ্যাঁ, বিয়ের আগে – তখন আমি ছোটো।”

কথাটা শুনেই মিসেস এমারসন মনে মনে হিসেব করে নিলেন। মিসেস মিসার্ভের অল্পবয়েসে বিয়ে হয়নি।

“তুমি সত্যিই এরকম একটা বাড়িতে ছিলে, যেখানে...” ভয়ার্ত ফিসফিস স্বরে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

মিসেস মিসার্ভ গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন।

“তুমি কখনো সত্যি সত্যিই – মানে দেখেছ – কিছু...”

মিসেস মিসার্ভ আবার মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন।

“তুমি এমন কিচ্ছু দেখনি যা তোমার কোনো ক্ষতি করেছে?”

“না, এক দিক থেকে বললে, আমি এমন কিচ্ছু দেখিনি যা আমার কোনো ক্ষতি করেছে। কিন্তু এতে এমন কোনো কিছু দেখার বিষয়ই নেই যা এ জগতের কোনো লোকের কোনো উপকারে আসে। তুমি কখনোই এটা বুঝতে পারবে না।”

খানিকক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল। মিসেস এমারসন আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলেন, “বেশ। তোমার সঙ্গে তর্কে যেতে চাই না,” বলে উঠলেন উনি, “তুমি যদি এ বিষয়ে কথা বলতে না চাও; কিন্তু তোমার মনের মধ্যে যে অশান্তি জমে আছে তা বলে ফেললে হয়ত তোমার ভালই হবে।”

মিসেস মিসার্ভ বললেন, “আমি এটা আমার মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাই।”

“বেশ। যা ভালো মনে কর।”

“সাইমন ছাড়া কাউকে বলিনি,” মিসেস মিসার্ভ বললেন, “বলা উচিত হবে বলে ভাবিনি। জানতাম না কে কী ভাববে। অনেকেই বুঝতে না পেরে হয়ত বিশ্বাস করবে না, ভাববে আমারই মানসিক সমস্যা আছে। সাইমনও পরামর্শ দিয়েছিল না বলতে। ও বলেছিল, ‘মনে হয় না এটা কোনো অপ্রাকৃত ঘটনা।’ কিন্তু স্বীকারও করেছে যে ওর নিজের কাছে এ ঘটনার কোনোরকম ব্যাখ্যা নেই। ও বলেছিল, ‘বস্তুত কেউই এটার ব্যাখ্যা দিতে পারবে না।’ আবার এ-ও বলেছে যে বিষয়টা নিয়ে ও আসলে কোনো কথাই বলবে না। বলেছে যে, লোকেরা নিজেরা ব্যাপারটা না বুঝতে পেরে নিজেদের বিব্রতভাব ঢাকতে রটিয়ে বেড়াবে যে আমার মাথাটাই খারাপ।”

“আমি এমন কিছু বলব না, নিশ্চিত,” মিসেস এমারসন কৈফিয়তের ঢঙে বললেন, “আশা করি আমার চেয়েও তুমি সেটা ভালো জানো।”

“হ্যাঁ, জানি,” মিসেস মিসার্ভ বললেন, “আমি জানি তুমি এমন কিছু বলবে না।”

“এবং তুমি বললে আর একটি প্রাণীকেও আমি সেটা বলব না।”

“হ্যাঁ। কাউকেই বোলো না।”

“আরে বাবা, আমি মিস্টার এমারসনকেও বলব না।”

“হ্যাঁ। ওকেও বোলো না।”

“বলব না।”

মিসেস এমারসন স্কার্ট পোশাকটা তুলে নিলেন আবার। মিসেস মিসার্ভ নীলরঙের উলটা একঘর বুনে নিলেন। তারপর শুরু করলেন, “অবশ্যই আমি নিশ্চিতভাবে বলছি না যে আমি ভূতে বিশ্বাস করি কিংবা ভূতে অবিশ্বাস করি। আমি শুধু যা দেখেছি, বলছি। আমি ব্যাখ্যা দিতে পারব না। এমন ভাবও দেখাব না যে পারি, কারণ সত্যি সত্যিই পারব না। তুমি পারলে ভালো; আমি খুশিই হব, কেন না তাতে আমার মানসিক যন্ত্রণা কমবে। এতকাল ধরে এ-ব্যাপারটা আমায় যন্ত্রণা দিয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও এমন যন্ত্রণাই দেবে। ঘটনাটা ঘটার পর একটা দিন বা রাত যায়নি যে-সময় আমি ওটা নিয়ে ভাবিনি, আর যতবারই মনে পড়েছে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেছে।”

“খুবই খারাপ অভিজ্ঞতা।” মিসেস এমারসন বললেন।

“তাই না? যা হোক, এটা ঘটে, আমার বিয়ের আগে, যখন আমি ছোট্ট মেয়ে, ইস্ট উইলমিংটনে থাকি। ওখানকার প্রথম বছরের ঘটনা। তুমি জানো, তোমায় বলেওছি, তার পাঁচ বছর আগেই আমার পরিবারের সবাই মারা গিয়েছিল।”

মিসেস এমারসন মাথা নাড়লেন।

“যাই হোক, ওখানে একটা স্কুলে পড়াতাম; মিসেস অ্যামেলিয়া ডেনিসন বলে এক মহিলা আর তার বোন মিসেস বার্ড-এর সঙ্গে একসঙ্গে থাকতাম। অ্যাবি, বোনের নাম ছিল অ্যাবি। ভদ্রমহিলা বিধবা ছিলেন; ছেলেপুলে হয়নি। সামান্য পয়সাকড়ি ছিল। মিসেস ডেনিসনের তাও ছিল না। ওরা ইস্ট উইলমিংটনে বাড়ি কিনে থাকতে শুরু করেন। খুবই সুন্দর বাড়িটা, যদিও খুব পুরোনো আর জীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। মিসেস বার্ডকে বেশ ভালোরকম খরচা করতে হয়েছিল ওটা মেরামত করে নিতে। মনে হয় সে-কারণেই আমাকে থাকতে দিয়েছিল। ওরা ভেবেছিল খানিকটা সাহায্য হবে। আমার ধারণা আমি যা দিতাম তাই দিয়ে আমাদের খাবার দাবারের ব্যাপারটা মিটে যেত। মিসেস বার্ডের যা ছিল, মিতব্যায়ী হলে, তা দিয়েই আরামসে চলে যেত। কিন্তু পুরোনো বাড়িটা সারাতে এত খরচ করে ফেলেছিলেন যে কিছুদিনের জন্য বেশ অর্থকষ্টেই পড়তে হয় তাঁদের।

“যাই হোক, আমায় তো থাকতে দিল, আর আমিও ভাবলাম আমার ভাগ্য ভাল, ওখানে থাকতে পেয়েছি। আমার একটা চমৎকার ঘর ছিল। বড়োসড়ো, প্রচুর রোদ আসে, সুদৃশ্য আসবাব, নতুন কাগজ আর রঙ লাগানো, সবকিছুই মোমের মতো মসৃণ। মিসেস ডেনিসনের মতো রান্না করতে পারে এমন আমি একজনকেও দেখিনি। আমার ঘরে একটা ছোটো স্টোভ ছিল; স্কুল থেকে ফিরে দেখতাম ফায়ারপ্লেসে সুন্দর করে একটু আগুন জ্বালানো। ওখানে থাকার প্রথম তিন সপ্তাহ অবধি আমার মনে হত নিজের বাড়ি চলে যাবার পর এমন ভালো জায়গায় আমি কখনো থাকিনি।

“তিন সপ্তাহের আগে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি, যদিও আমার ধারণা ব্যাপারটা ওঁরা বাড়িটাতে আসা ইস্তকই শুরু হয়েছিল, মোটামুটি চারমাস মতো। ওঁরাও কিছু বলেননি বিষয়টা নিয়ে, আর আমিও অবাক হইনি কেন না ওঁরা সবে বাড়িটা কিনে একগাদা টাকা খরচ করে সেটা সারিয়েছিলেন।

“তো, আমি সেপ্টেম্বর মাসে গেলাম। আমার স্কুল শুরু হল প্রথম সোমবার থেকে। মনে আছে খুবই ঠান্ডা শরতের সময় ছিল সেটা, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বরফ পড়ল, গায়ে শীতের কোট চাপাতে হল। মনে আছে সে-রাতে আমি যখন বাড়িতে ফিরি (মনে করতে দাও, হুঁ, আমি একটা সোমবার স্কুল শুরু করলাম, আর তার দু’সপ্তাহ পরের বেষ্পতিবার ছিল সেটা), আমি নীচের সিঁড়িতে কোটটা খুলে ঢোকার মুখেই টেবিলের ওপর রাখি। খুব সুন্দর কোট ছিল – ঘন কালো রঙের, ফার দেওয়া। আগের শীতেই নিয়েছিলাম। আমি ওপরতলায় চলে যাবার পরই মিসেস বার্ড আমায় ডেকে বলেছিলেন দরজার পাশে ও-রকমভাবে যেন কোটটা ফেলে না যাই, যে কেউ ঢুকে এসে নিয়ে যেতে পারে। আমি হেসে উঠে ওঁকে বলেছিলাম, ভয় নেই কোনো। আমি সত্যিই কখনো খুব একটা চুরির ভয় করিনি।

“আসলে, যদিও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সবে, রাতটা বেশ ঠান্ডা ছিল। আমার ঘরটা, পশ্চিমমুখী, বেশ মনে করতে পারি, সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, আকাশে হালকা হলদে-বেগুনী রঙ, ঠিক যেমনটা শীতের দিনে বেশি ঠান্ডা পড়লে দেখ, অমনি। মনে হয়, ওই রাতেই প্রথম বরফ পড়ে। মিসেস ডেনিসন সামনের বাগানের কয়েকটা ফুলগাছ ঢাকা দিয়ে রেখেছিলেন যাহোক। মনে পড়ছে ওর একটা সবুজ উলের চাদর ভারবেনা ফুলগাছগুলোর ওপর চাপা দেওয়া ছিল। আমার কাঠের উনুনে আগুন জ্বলছিল। মিসেস বার্ড জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন, আমি জানি। উনি সত্যি মায়ের মতো মহিলা ছিলেন; সবসময় অন্য কারো সুখ স্বাচ্ছন্দ্য করে দিতে পারলেই যেন খুশি হতেন। মিসেস ডেনিসন আমায় বলেছিলেন উনি চিরকালই ওইরকম। বলেছিলেন উনি ওঁর বরকে খুবই যত্নে রাখতেন। ‘অ্যাবির কপাল ভাল ওদের ছেলেপুলে হয়নি, নইলে ও তাদের বিগড়ে দিত।’ মিসেস ডেনিসন বলেছিলেন।

“যাই হোক, সে-রাতে ছোট্ট আগুনটার পাশে বসে আমি একটা আপেল খেয়েছিলাম। আমার টেবিলে একপ্লেট চমৎকার আপেল ছিল। মিসেস বার্ডই রেখে গিয়েছিলেন। আমি বরাবরই আপেল খুব ভালোবাসতাম। তো বসে বসে খুব আরামে একটা আপেল খাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম আমি ভাগ্যবতী যে এমন একটা জায়গায় ভালো লোকেদের সঙ্গে কাটাতে পারছি, এমন সময় দরজায় অদ্ভুত একটা শব্দ শুনলাম। এমন অস্পষ্ট শব্দটা যেন ঠিক টোকা নয়, একটা খসখসে আওয়াজ। যেন ভয়ে ভয়ে কেউ ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে দরজায় হাতড়াচ্ছে, টোকা দিতে সাহস করছে না। এক মিনিটের জন্য ভাবলাম ইঁদুর-টিদুর হবে। একটু অপেক্ষা করতে শব্দটা আবার হল, আর পরিষ্কার বুঝলাম দরজায় খুবই আস্তে, ভয়ে ভয়ে, টোকাই দিল কেউ, তাই বললাম, ‘ভেতরে এসো।’

“অথচ কেউ ঢুকল না, আর আবারও দরজায় টোকা পড়ল। আমি উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম, খুবই অদ্ভুত ব্যাপার, আর কেন জানি না একটু ভয় ভয় করছিল।

“তো দরজাটা খুললাম, আর প্রথমেই যেটা লক্ষ করলাম, একঝলক ঠান্ডা বাতাস, যেন নীচের তলার বাইরের দরজাটা খোলা রয়ে গেছে, কিন্তু ঠান্ডা বাতাসে অদ্ভুত একটা বন্ধ ঘরের গন্ধ। অনেকটা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা আলমারির গন্ধের মতো, ঠিক বাইরের খোলা হাওয়ার কোনো গন্ধ নয়। তারপরেই দেখতে পেলাম আমার কোটটা। যে ওটা ধরে ছিল সে এত ছোটো যে কোটের আড়ালে প্রথম চোটে আর কিছুই দেখতে পাইনি। তারপরেই একটা ছোট্ট ফরসা মুখ দেখলাম, চোখেমুখে ভয় আর দৃষ্টি এত তীব্র যে যে-কারো বুক এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাবে। একটা ভয়ানক ছোট্ট মুখ; এমন কিছু ছিল মুখটায়, অন্য সকলের চেয়ে আলাদা, অথচ এমন করুণ, যে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা ওতেই অনেকটা কেটে গিয়েছিল। ঠান্ডায় নীল হয়ে যাওয়া ছোট্ট দুটো হাতে আমার কোটটা তুলে ধরে, যেন বহুদূর থেকে বলছে, এমন গলায় বলল, ‘আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছি না।’

“‘ভগবানের দোহাই,’ আমি বললাম, ‘তুমি কে?’

“ছোট্টটা আবার বলে উঠল, ‘আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছি না।’

“সারাক্ষণ আমি ঠান্ডা গন্ধটা পাচ্ছিলাম আর দেখলাম সেটা মেয়েটার দিক থেকেই আসছে; ঠান্ডা ভাবটা যেন ওকে ঘিরে আটকে আছে, যেন ও একটা খুব ভয়ানক ঠান্ডা জায়গা থেকে এসেছে। কোটটা নেবার সময় মেয়েটাকে ভালো করে দেখলাম। খুব সাধারণভাবে তৈরি একটা ছোটো সাদা পোশাক পরেছে। একটা নাইটগাউন, একটু বেশিই লম্বা, ওর পা পর্যন্ত ঢেকে গেছে; পাতলা পোশাকের মধ্যে ওর রোগা শরীরটা খেয়াল করলাম, ঠান্ডার নীল ছোপ ছোপ সারা গায়ে। মুখটা অবশ্য অতটা নীল নয়, বরং অনেকটা মোম-সাদা, ফ্যাকাশে। মাথার চুল কালোই, অথচ মনে হয় খুব স্যাঁতসেঁতে বলে কালো দেখাচ্ছে, যেন ভেজাই, হতে পারে চুলটা খানিক পাতলাই। কপালটা গোল মতো আর সাদা, তার ওপর এসে পড়েছে চুলটা। এমন ভয়ানক চেহারা না হলে ওকে বেশ সুন্দরীই লাগত।

“‘তুমি কে?’ জিজ্ঞাসা করলাম ওকে।

“আমার দিকে ভীষণ করুণ চোখে তাকাল মেয়েটা কিন্তু কিছু বলল না।

“‘তুমি কে?’ আমি আবার জিজ্ঞাসা করি। অমনি ও চলে গেল। আর বাচ্চাদের মতো ছুটে বা হেঁটে গেল না। কেমন ভেসে ভেসে চলে গেল, সাদা ছোট্ট, পাতলা প্রজাপতিগুলোর মতো, হালকা, মনেই হয় না সেগুলো আসল, যেন তাদের কোনো ওজন নেই। সিঁড়ির মাথা থেকে ঘুরে তাকাল মেয়েটা, বলল, ‘আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছি না।’ ও-রকম কন্ঠস্বর আমি কখনো শুনিনি।

“‘তোমার মা কে?’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু ততক্ষণে ও নেই।

“তো, একমুহূর্তের জন্য ভাবলাম অজ্ঞান হয়ে যাব। ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেছে আর একটা গান শুনতে পাচ্ছি। কোটটা বিছানাতে ছুঁড়ে ফেললাম। ওটা ধরে থাকাতে হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। আমার ঘরের দরজাতে দাঁড়িয়েই মিসেস বার্ড আর মিসেস ডেনিসনকে গলা তুলে ডাকলাম। ও ওখান দিয়ে যাবার পর, সিঁড়ি দিয়ে যেতে আমার সাহসে কুলোচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল আর পাঁচটা জীবন্ত সাধারণ মানুষের মুখ না দেখতে পেলে আমি পাগল হয়ে যাব। ভাবছিলাম কেউ আর আমার গলা শুনতে পাচ্ছে না, অথচ আমি নীচের তলায় ওদের পায়ের শব্দ পাচ্ছি, রাতের বিস্কিট সেঁকা হচ্ছে, গন্ধ পাচ্ছি। যা করেই হোক ওই একমাত্র অকৃত্রিম গন্ধটা, ওটাই আমাকে সুস্থির রেখেছিল। সিঁড়ি দিয়ে নামবার সাহস হচ্ছিল না। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আবার ডাকলাম আর শেষমেষ দরজা খোলার আওয়াজ হল, মিসেস বার্ড উত্তর দিলেন, ‘কী হয়েছে? মিস আর্মস, আপনি ডাকছিলেন?’

“‘ওপরে আসুন; শিগগীর ওপরে আসুন, দুজনেই,’ আমি চেঁচিয়ে বললাম, ‘তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি!’

“শুনলাম মিসেস বার্ড মিসেস ডেনিসনকে বললেন, ‘চট করে এসো অ্যামেলিয়া, মিস আর্মসের ঘরে কিছু হয়েছে।’ আমার তখনই মিসেস বার্ডের কথার ঢঙে একটু অদ্ভুত লেগেছিল। আর ওঁরা দুজনেই ওপরে উঠে আসার পর দেখলাম ওঁরা জানতেন কী ঘটেছে, অথবা ঘটনাটা ঠিক কেমন ঘটে থাকতে পারে।

“‘কী হয়েছে বাছা!’ মিসেস বার্ড জিজ্ঞেস করলেন। ওঁর সুন্দর কোমল স্বরটা কেমন আড়ষ্ট শোনাল। আমি দেখলাম, উনি মিসেস ডেনিসনের দিকে তাকালেন, আর মিসেস ডেনিসনও; দুজনের চোখাচোখি হল।

“‘ভগবানের দোহাই,’ আমি বলে উঠলাম, আর এভাবে আমি কক্ষনো বলি না, ‘ভগবানের দোহাই, আমার কোটটা কে নিয়ে এল ওপরে?’

“‘কে ওটা? কেমন দেখতে?’ মিসেস ডেনিসন আমতা আমতা করে বললেন, বলতে বলতেই উনি বোনের দিকে তাকালেন আর ওঁর বোনও ওঁর দিকে তাকাল।

“‘একটা বাচ্চা মেয়ে, আগে কখনো দেখিনি এখানে। বাচ্চার মতই দেখতে কিন্তু এত ভয়ানক চেহারার বাচ্চা আমি দেখিনি কখনো। ওর গায়ে একটা নাইটগাউন ছিল আর বলছিল ও ওর মাকে খুঁজে পাচ্ছে না। কে ও? ও কে?’

“একমুহূর্তের জন্যে ভেবেছিলাম মিসেস ডেনিসন অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু মিসেস বার্ড চট করে ওঁকে ধরে ফেলে হাত ঘসে দিতে লাগলেন আর কানে কানে ফিসফিস করে (গলাটা কেমন একটা ভূতুড়ে মতো ছিল) কী বললেন। আমি ছুটে ওঁকে একগ্লাস ঠান্ডা জল এনে দিলাম। তোমায় বলছি, নীচে একা একা যাওয়াটা সে-সময় বেশ সাহসের ব্যাপার ছিল। কিন্তু ওঁরা বাইরের টেবিলের ওপরে একটা বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন যাতে আমি দেখতে পারি। অনেক সাহস সঞ্চয় করে অন্ধকারে নীচে গিয়েছিলাম, প্রতি মুহূর্তে ভেবেছি বাচ্চাটা আমার কাছাকাছিই রয়েছে। আলোর বাতিটা আর বিস্কিটের গন্ধটা আমায় খানিকটা সাহস জুগিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তোমায় বলছি, নীচের তলায় গিয়ে রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস জল আনতে একটুও সময় নষ্ট করিনি। ঊর্ধ্বশ্বাসে গেছি, যেন বাড়িতে আগুন লেগেছে, আর সামনে বালতি মতো যা পেয়েছি সেটাই নিয়েছি। ওটা একটা রঙ করা পাত্র ছিল, মিসেস ডেনিসনের রবিবারের স্কুল থেকে ফুলদানি হিসেবে ওঁকে দিয়েছিল।

“যাই হোক ওটা ভর্তি করে ওপরে ছুটলাম, প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল, আমার পা’টা কেউ ধরল বুঝি। জলটা মিসেস ডেনিসনের মুখের কাছে ধরলাম। মিসেস বার্ড ওঁর মাথাটা উঁচু করে ধরলে, উনি অনেকটা জল ঢকঢক করে খেলেন, তারপর কড়া চোখে পাত্রটা দেখলেন।

“‘হ্যাঁ,’ আমি বললাম, ‘আমি, ইয়ে আমিই ওটা এনেছি, হাতের সামনে ওটাই পেয়েছিলাম কিনা! আর কিছু নষ্ট করিনি।’

“‘রঙ করা ফুলগুলো ভিজিও না,’ মিসেস ডেনিসন খুব ক্ষীণ স্বরে বললেন। ‘ভেজালে ফুলগুলো মুছে যাবে।’

“‘খুব সাবধানে রাখব,’ বললাম আমি, জানতাম যে ওটা ওঁর ঘর সাজানোর জিনিস।

“জল খেয়ে মিসেস ডেনিসন একটু সুস্থ বোধ করলেন, মিসেস বার্ডকে সরিয়ে উঠে বসলেন। উনি আমার বিছানাতেই শুয়েছিলেন।

“‘আমি ঠিক আছি এখন,’ মহিলা বললেন, কিন্তু ভীষণ ফ্যাকাশে লাগছিল ওঁকে, এবং চোখ দেখে মনে হল নির্ঘাৎ বাইরে কিছু দেখেছেন। মিসেস বার্ডের অবস্থাও তেমন ভাল কিছু ছিল না। কিন্তু উনি সবসময়েই এমন শান্ত, স্মিত ও হাসিখুশি যে কোনোকিছুই ওঁর শান্তিভঙ্গ করতে পারত না। আমার তো সাংঘাতিক অবস্থা হয়ে আছে, জানতাম। গ্লাসের জলে নিজেকে একঝলক দেখেও নিয়েছিলাম, নিজেকেই চিনতে পারিনি।

“বিছানা থেকে নেমে মিসেস ডেনিসন টলমল পায়ে চেয়ারের দিকে গেলেন, ‘আমি একটা নির্বোধ, এমন কান্ড ঘটিয়েছি।’

“‘না মোটেই, নির্বোধ নও তুমি দিদি,’ মিসেস বার্ড বললেন্‌ ‘জানি না তোমার থেকে ভালো আর কে জানে এটা, যা-ই হয়ে থাক, তাতে কাউকে নির্বোধ বলা যায় না। বিশেষত যখন এমন একটা ঘটনাকে কাটিয়ে উঠছ, যা অন্যের কাছে সম্পূর্ণ বিজাতীয় হলেও, আমরা তো সারা জীবনই জানি।

“মিসেস ডেনিসন বোনের দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে, তারপর আবার নিজের বোনের দিকে তাকালেন, আর মিসেস বার্ড অমনি মুখ খুললেন যেন ওঁকে কোনো প্রশ্ন করা হয়েছে।

“‘হ্যাঁ,’ বললেন উনি, ‘আমার মনে হয়, মিস আর্মসকে বলা উচিত ছিল – ইয়ে মানে আমরা যা যা জানি তার সবটাই।’

“‘বেশি কিছু নয়,’ মরণকালে যেমন হয়, মিসেস ডেনিসন তেমনি লম্বা শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলেন। ওঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, যে-কোনো সময়ে আবার অজ্ঞান হয়ে যাবেন। ভদ্রমহিলা সত্যিই দুর্বল-গোছের দেখতে ছিলেন। কিন্তু কার্যত দেখা গিয়েছিল বেচারি মিসেস বার্ডের চেয়ে তিনি বেশিই শক্তপোক্ত।

“‘না, বিশেষ কিছুই আমরা জানি না,’ মিসেস বার্ড বললেন, ‘কিন্তু যতটুকুই থাক সেটা এর জানা দরকার। মনে তো হয়, ও এখানে প্রথম আসার সময়েই ওকে জানানো উচিত ছিল!’

“‘হুমম। সেটা উচিত হবে বলে ভাবিনি,’ মিসেস ডেনিসন বললেন, ‘কিন্তু আশা করছিলাম ব্যাপারটা থেমে যাবে, আর ইয়ে, যা হোক, ও ওকে হয়ত সমস্যায় ফেলবে না। এদিকে বাড়িতে এত কিছু করে ফেললে তুমি যে টাকার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, আর জানি না, বললে, ও হয়ত ভয় পেয়ে আসবেই না ভেবেছিলাম, এদিকে আমি আবার পুরুষ ভাড়াটেও রাখতে চাইনি।’

“‘আর টাকাটা বাদ দিলেও, আমরা খুব উৎকন্ঠায় ছিলাম তোমার আসা নিয়ে, বাছা।’ মিসেস বার্ড বললেন।

“‘হুঁ,’ মিসেস ডেনিসন বললেন, ‘আমরা বাড়িতে অল্পবয়েসী কাউকে চাইছিলাম; আমরা একলাই ছিলাম তো, আর যে-মুহূর্তে তোমাকে দেখলাম, আমাদের দু’জনেরই খুব ভালো লেগে গেল।”

“ধরে নেওয়া যায় ওঁরা যা বলছিলেন, ঠিকই বলছিলেন। ওঁরা খুব ভাল মহিলা ছিলেন, ওঁদের থেকে দয়ালু বোধহয় আর কেউই হতে পারত না। আর আমাকে ও-কথা না বলার জন্য আমি কোনোদিনই ওঁদের দোষ দিতে পারব না। আর সত্যিসত্যি ওঁরা যা বললেন — বলার তেমন কিছু ছিলও না।

“বাড়িটা কিনে, থাকতে শুরু করার পরই ওঁরা নানারকম ব্যাপার দেখতে শুনতে শুরু করেন, সেটাও তো বেশিদিন নয়। মিসেস বার্ড বললেন, ওঁরা একদিন সন্ধ্যাবেলা বসবার ঘরে বসে ছিলেন, সেদিনই প্রথম শোনেন। ওঁর দিদি একটা লেস বুনছিলেন (মিসেস ডেনিসন চমৎকার লেস বুনতে পারতেন) আর উনি মিশনারি হেরাল্ড পড়ছিলেন (মিসেস বার্ড মিশনারির কাজকর্মে খুব আগ্রহী ছিলেন), এমন সময় হঠাৎ ওঁরা একটা শব্দ শোনেন। প্রথম উনিই শুনতে পান, মিশনারি হেরাল্ডটা নামিয়ে রেখে কান পেতে শুনতে থাকেন।

“মিসেস ডেনিসন দেখেন উনি কান পেতে শুনছেন। হাতের লেসটা রেখে দিয়ে বললেন, ‘কী শুনছ অ্যাবি?’ তক্ষুনি শব্দটা আবার হল, আর দুজনেই এবার একসঙ্গেই শুনতে পেলেন। শুনেই দুজনের শিঁরদাড়ায় ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। যদিও কেন যে হল কেউই বুঝলেন না। ‘বেড়াল-টেরাল হবে, তাই না?’ মিসেস বার্ড বললেন।

“‘এটা কোনো বেড়াল নয়।’ মিসেস ডেনিসন বললেন।

“‘ওহ, না না বেড়ালই হবে মনে হয়; ইঁদুর ধরেছে হয়ত।’ মিসেস ডেনিসনকে শান্ত করতে হাসিখুশি মিসেস বার্ড বললেন। উনি দেখেছিলেন দিদি প্রচন্ড ভয়ে আধমরা, আর ওঁর যখন-তখন ফিটের ব্যামো আছে। সুতরাং...

“উনি উঠে দরজা খুলে ডাকতে থাকলেন, ‘কিটি, কিটি কিটি!’ ইস্ট উইলমিংটন থেকে আসার সময় একটা ঝুড়িতে করে ওঁরা ওঁদের পোষা বেড়ালটা এ-বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। একটা সুশ্রী, বড়োসড়ো ডোরাকাটা হুলো, আর অনেক কায়দাকানুন জানত সেটা।

“যা হোক, উনি তো কিটি কিটি করে ডাকলেন! আর বেড়ালটা নিশ্চিতভাবে এসে দরজা দিয়ে ঢোকার সময় বড়ো হাঁ করে একটা শব্দ করল, যেটা দু’জনের শোনা একটু আগের শব্দের মতই ছিল।

“‘এই দ্যাখ দিদি, এই যে; বললাম না বিড়াল!’ মিসেস বার্ড বলে উঠলেন, ‘বেচারা কিটি!’ কিন্তু মিসেস ডেনিসন, বেড়ালের দিকে তাকিয়েই, চিল চিৎকার দিয়ে উঠলেন।

“‘কী ওটা? ওটা কী?’ ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন।

“‘কীসের কী?’ মিসেস বার্ড অবাক হয়ে বললেন। বুঝতেই পারলেন না তার দিদি কী বলতে ছাইছেন।

“‘বেড়ালের লেজটা কেউ ধরে ছিল,’ মিসেস ডেনিসন বললেন, ‘কিছু নিশ্চই ধরে ছিল লেজটা। সোজা হয়ে ছিল লেজখানা, আর তাই নড়তে পারছিল না। শুনলে না ডাকটা!”

“‘ওটা কিছু নয়,’ মিসেস বার্ড বললেন বটে কিন্তু বলতে বলতেই দেখতে পেলেন, একটা ছোট্ট হাত বেড়ালের লেজখানা ধরে রয়েছে, আর হাতের পেছনে আধো অন্ধকারে বাচ্চাটা কেমন বাতাসে মিলিয়ে রয়েছে। বাচ্চাটা, যাকে বলে, হাসছিল তখন, দুঃখী দুঃখী মুখ নয়; উনি বললেন সেটা নাকি আরো খারাপ, কারণ অমন ভয়াবহ বিষণ্ণ হাসি উনি কখনো শোনেননি।

“যা হোক এমন ভেবলে গিয়েছিলেন ভদ্রমহিলা, যে কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না, শুরুতে বুঝতেও পারেননি যে এটা একটা অতিপ্রাকৃত ঘটনা। ভেবেছিলেন আশেপাশের পড়শির কোনো বাচ্চা-টাচ্চা হবে, বেড়ালটার সঙ্গে খেলা করছে, আর তাতেই ওরা ভড়কে মতো গেছেন। ফলে খুব কড়া গলায় উনি বললেন, ‘জানো না, বেড়ালের লেজ অমন করে টানতে নেই?’ বললেন, ‘বুঝছ না যে বেড়ালটাকে তুমি ব্যথা দিচ্ছ? আর সাবধান না হলে, ও তোমাকে আঁচড়ে দেবে! বেচারা কিটি, তুমি ওকে একদম যন্ত্রণা দেবে না।’

“উনি বললেন যে একথা বলতেই মেয়েটা থেমে গেল, লেজ টানা বন্ধ করে দিয়ে আস্তে আস্তে চাপড় মেরে আদর করা শুরু করল, আর বেড়ালটাও অমনি পিঠ ফুলিয়ে গরর গরর করতে লাগল যেন খুব পছন্দ হয়েছে। বেড়ালটা একবিন্দুও ভয় পায়নি, সেটা খুব আশ্চর্যের। সবসময়েই শুনেছি যে প্রাণীরাই ভূতে সাংঘাতিক ভয় পায়; যদিও এটা একটা নিরীহ গোছের ছোট্ট ভূত ছিল।

“তো মিসেস বার্ড বললেন যে বাচ্চাটা বেড়ালটাকে আদর করছিল এবং উনি আর মিসেস ডেনিসন দু’জনে দু’জনকে জাপটে ধরে সেটা দেখছিলেন। চেষ্টা তাঁরা করছিলেন ব্যাপারটাকে সহজভাবে নিতে, কিন্তু সেটা তত সহজ ছিল না। শেষমেশ মিসেস ডেনিসন মুখ খুললেন, “‘খুকি, তোমার নাম কী?’

“মেয়েটা তখন বেড়ালটাকে চাপড় মারা বন্ধ করে চোখ তুলে চাইল, বলল, ও ওর মাকে খুঁজে পাচ্ছে না, ঠিক যেমন ও আমাকে কথাটা বলেছিল। মিসেস ডেনিসন তাতে এমন খাবি খেতে শুরু করলেন, যে মিসেস বার্ড ভাবলেন যে উনি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন আবার। কিন্তু তা হল না।

“‘ভালো কথা, তোমার মা কে?’ মিসেস বার্ড বললেন। কিন্তু বাচ্চাটা খালি একই কথা বলে চলল, ‘আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছি না – আমার মাকে আমি খুঁজে পাচ্ছি না।’

“‘কোথায় থাকো তুমি, বাছা?’ মিসেস বার্ড শুধোলেন।

“‘আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছি না।’ বাচ্চাটা বলল।

“তো, এ-রকমই ঘটেছিল ব্যাপারটা। বিশেষ কিছু না। দুই মহিলা পরস্পরকে ধরে দাঁড়িয়েছিলেন, বাচ্চাটা তাঁদের সামনে, আর ওঁরা তাকে প্রশ্ন করে চলেছেন, আর সব প্রশ্নের উত্তরে সে খালি বলে চলেছে, আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

“তখন মিসেস বার্ড বাচ্চাটাকে ধরতে গেলেন, ভাবলেন যা ভাবছেন তা হয়ত নয়, বাচ্চাটা হয়ত সত্যি সত্যিই বাস্তব, একটু মাথার গোলমাল আছে হয়ত, নাইটগাউন পরেই বিছানা ছেড়ে উঠে চলে এসেছে।

“বাচ্চাটাকে উনি ধরতে গেলেন। ভেবেছিলেন একটা শাল জড়িয়ে ওকে নিয়ে যাবেন; ছোট্ট মেয়ে সহজেই কোলে নিয়ে নিতে পারবেন, কোন পড়শির বাচ্চা খুঁজে নেবেন বাইরে গিয়ে। কিন্তু বাচ্চাটার দিকে এক পা এগোতেই দেখেন বাচ্চাটা আর নেই। খালি শূন্য থেকে ওর গলার স্বর ভেসে আসছে, ‘আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছি না।’ আর ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে সেই গলা।

“তো একই ঘটনা ঘটতে থাকল; হুবহু না হলেও একইরকম ঘটনা মোটামুটি। কখনো মিসেস বার্ড হয়ত থালাটালা ধুচ্ছেন, হঠাৎ বাচ্চাটা এসে ওঁর পাশে উদয় হয়ে ডিশ টাওয়েল দিয়ে বাসনগুলো মুছছে। অবশ্যই ব্যাপারটা বেশ ভীতিজনক। মিসেস বার্ডই সাধারণত থালাগুলো ধুতেন। কখনো কখনো উনি মিসেস ডেনিসনকে এসব জানাতেন না, কেননা শুনে উনি খুব নার্ভাস হয়ে পড়তেন। কখনো কেক বানানোর সময় দেখতেন কিসমিসগুলো সব খুঁটে তোলা, কখনো দেখতেন রান্নাঘরের উনুনের পাশে আগুন জ্বালানোর কাঠকুটো জড়ো করে রাখা। কখনোই ওঁরা জানতে পারতেন না কখন বাচ্চাটার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। বাচ্চাটা সারাক্ষণ বলে যেত ওর মাকে ও খুঁজে পাচ্ছে না। পরে ওঁরা বাচ্চাটার সঙ্গে আর কথা বলবার চেষ্টা করতেন না, কেবল এক দু’বার মিসেস বার্ড মরিয়া হয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কিন্তু বাচ্চাটা কখনোই যেন কিছু শুনতে পেত না। কেবল বলে চলত, যে ওর মাকে ও খুঁজে পাচ্ছে না।

“বাচ্চাটার ব্যাপারে যাবতীয় অভিজ্ঞতা আমায় বলার পর ওঁরা আমায় বাড়িটা আর বাড়িটাতে ওঁদের আগে যারা থাকতেন তাঁদের সম্পর্কে বলেছিলেন। মনে হয় সাংঘাতিক কিছু ঘটেছিল বাড়িটাতে। জমির দালাল কখনো কিছু বলেনি সে-সম্পর্কে। বললে, যত কম দামই হোক, কিছুতেই ওঁরা বাড়িটা কিনতেন না, একথা হলফ করে বলা যায়। ওঁরা ভিতু না হলেও নিশ্চই এমন বাড়িতে থাকতে পছন্দ করতেন না যেখানে ভয়ানক কান্ডকারখানা ঘটেছে আর সারাক্ষণ তোমাকে সেটা ভাবিয়ে বেড়াবে। আমি জানি আমায় বলার পর, আমার পক্ষেও, মহিলা দুজনের কথা এতটা না ভাবলে, আর একরাতও সেখানে থাকা উচিত ছিল না, সে যত আরামেই তারা রাখুক না কেন। যদিও নার্ভাস ঠিক হইনি তবু রয়ে গেলাম। অবশ্য এটাও ঠিক, ঘটনাটা আমার ঘরের ভেতর ঘটেনি। তাহলে আমি কিছুতেই থাকতে পারতাম না।

“কী হয়েছিল?” মিসেস এমারসন ভয়ভয় গলায় বললেন।

“একটা সাংঘাতিক ব্যাপার। বাচ্চাটা ওর বাবা মায়ের সঙ্গে বছর দুয়েক আগে থাকত। ওরা, মানে ওর বাবারা, খুব ভালো পরিবারের লোক। বেশ ভালো অবস্থা ছিল ওদের। ভদ্রলোক শহরের নামি চামড়ার কম্পানিতে সেলস রিপ্রেসেন্টেটিভ ছিলেন। খুবই ভালোভাবে প্রাচুর্যের মধ্যেই দিন কাটত। কিন্তু মহিলাটি ছিলেন খুব পাজি। ছবির মতো সুন্দরী, লোকে বলাবলি করত মহিলাটির পরিবার বস্টনের সম্ভ্রান্ত মানুষদের মধ্যে পড়ে অথচ মেয়েটা ছিল আদ্যন্ত খারাপ, যদিও এত সুন্দর কথা বলত যে ওপর ওপর সকলেই পছন্দ করত। সুন্দর সুন্দর সাজগোজ করে লোক দেখিয়ে বেড়াত, বাচ্চাটার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ ছিল না; লোকে বলতে শুরু করেছিল, একেবারেই নাকী যত্ন করে না।

“মহিলাটি কাজের লোক টেকাতে পারতেন না। কোনো না কোনো কারনে কেউই টিকত না। কাজ ছেড়ে দেবার পর কাজের লোকেরা ভদ্রমহিলার সম্পর্কে নানারকম খারাপ খারাপ কথা বলে বেড়াত, যা-নয়-তাই। লোক প্রথম প্রথম বিশ্বাস করত না, কিন্তু আস্তে আস্তে করতে শুরু করল। ওরা বলত ছোট্ট বাচ্চাটা, বছর পাঁচেকের বেশি বয়েস না, বয়েসের তুলনায় যথেষ্ট বাচ্চা আর ছোটোখাটোই, তাকে দিয়েই মহিলা সবরকম কাজ করাতো, যা যা কাজ ছিল। লোকে বলত, কাজের লোক না থাকার সময়, বাড়িটা প্রায় শুয়োরের খোঁয়াড়ের মতো লাগত। এও বলত যে বাচ্চাটা একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থালাবাসন ধুতো। মাঝে মাঝেই ওরা দেখত বাচ্চাটা বড়ো বড়ো কাঠের টুকরো বয়ে বয়ে আনছে আর ওর মা ওকে খুব বকছে। মহিলা গান গাইত ভাল আর যখন বকত গলাটা পেঁচার চেঁচানির মতো শোনাত।

“বাপটা বেশিরভাগ সময়েই বাইরে থাকত, আর যখন এসব ঘটনা ঘটছে ও কয়েক সপ্তাহের জন্য পশ্চিমে ছিল। এদিকে একজন বিবাহিত পুরুষ ওই মহিলার আশপাশে ঘুরঘুর করত, লোকে সে-নিয়েও নানা কথা বলত। কিন্তু কেউই ঠিক নিশ্চিত ছিল না যে সত্যিই কিছু গড়বড় আছে কি না। এই তৃতীয় লোকটা সমাজের অনেক উঁচুতলার আর অঢেল পয়সাকড়িও ছিল, ফলে লোকেরা একটু সমীহই করত, পাছে আবার এসব শুনে লোকটা তাদের ঝামেলায় ফেলে। পাড়াপড়শিরা একটু দ্বিধায় ছিল ব্যাপারটা নিয়ে, তবে পরে সকলের মধ্যেই কথা চালাচালি হচ্ছিল যে বাচ্চাটার বাবাকে বিষয়টা জানানো দরকার।

“বলা সহজ, কিন্তু বাচ্চার বাবাকে বলবে কে সে কথা, কেইই বা রাজি হবে বলতে, যখন বিষয়টা নিয়েই কেউ নিশ্চিত নয়! ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকেই স্বভাবত বেশি বিশ্বাস করবেন। সকলে বলল, ভদ্রলোক শুধু টাকা কামানোতেই ব্যস্ত, আর নানান জিনিস কিনে বউকে দেবে এতেই মগ্ন। বাচ্চাটাকেও অবশ্য যথেষ্ট ভালবাসেন ভদ্রলোক। ওরা বলেছিল, ভদ্রলোক আদতেই খুব ভালো মানুষ। বেশিরভাগ ভালোমানুষদের সঙ্গেই এমনটা হয়। সবসময়েই দেখেছি।

“তো, একদিন সকালে শুনি যে অন্য লোকটা সম্পর্কে এত গুজুর গুজুর চলছিল, সে লোকটা নাকি বেপাত্তা। যদিও কদিন ধরে দেখা যাচ্ছিল না ওকে, পরে জানা গেল সত্যিই লোকটার পাত্তা নেই। কয়েকদিন হল বাইরে গিয়েছিল, বউকে বলে গিয়েছিল নিউ ইয়র্কে ব্যাবসার কাজে যেতে হতে পারে, সপ্তাহখানেকও লাগতে পারে, না ফিরলে যেন চিন্তা না করে। আর চিঠি না লিখলেও যেন চিন্তা না করে কেননা প্রতিদিনই হয়ত ফেরার ট্রেন ধরার পরিকল্পনা থাকতে পারে, ফলে চিঠি লিখে লাভ নেই। বউ অপেক্ষা করে রইল আর ভাবনা-না-করার চেষ্টা করতে থাকল; শেষে সপ্তাহ গড়িয়ে আরো দুটো দিন কাটার পর ওর বউ এক পড়শির বাড়িতে ছুটে গেল। আর সেখানে গিয়ে মেঝের ওপর ঠাস হয়ে পড়ল অজ্ঞান হয়ে। লোকজন জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পেল লোকটা অন্যের বেশ কিছু টাকা নিয়ে ভেগেছে।

“লোকেরা তখন জিজ্ঞাসা করা আরম্ভ করল, এই বাড়ির মহিলাটি কোথায়, এর-ওর সঙ্গে কথাবার্তায় জানা গেল লোকটা বেপাত্তা হবার পর থেকে মহিলাটিকেও কেউ দেখেনি। কেবল তিন-চারটে পাড়ার বউ-ঝি মনে করতে পারল যে মহিলাটি ওদের বলেছিল, বাচ্চাটাকে নিয়ে বস্টন যাবে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে। ফলে ওকে না দেখতে পেয়ে আর বাড়ি বন্ধ দেখে সবাই নিশ্চিত বুঝে নিয়েছিল যে মহিলা কোথায় গেছেন। এই বউ-ঝিরা আশেপাশেই থাকতেন, যদিও মহিলার কাছে খুব একটা যাতায়াত, কথাবার্তা ছিল না। ফলে সে যখন এসে বস্টন যাবার পরিকল্পনাটা বলেছিল ওঁরা খুব একটা উত্তর করেননি সেকথার।

“তো, বাড়িটা বন্ধ হয়ে রইল আর লোকটা এবং তার বউ মেয়ের খবর নেই। তারপর হঠাৎ একদিন ও-বাড়ির সবচেয়ে কাছে থাকা এক মহিলার একটা কথা মনে পড়ল। উনি পরপর তিন রাত্তির কোথাও একটা বাচ্চার কান্না শুনে জেগে উঠেছিলেন। আর উনি ওঁর বরকে ডেকে তোলাতে, সে বলেছিল, ও বিসবিদের বাচ্চা মেয়েটা, উনিও ভেবেছিলেন তাইই হবে। সে বাচ্চাটার শরীর ভালো ছিল না, প্রায়ই কাঁদত। মহিলা বললেন, ঘটনাটা নিয়ে বড়ো একটা মাথা ঘামাননি তিনি কিন্তু এই এখন, এই মুহূর্তে এটা তাকে ভাবাচ্ছে। উনি বললেন, কান্নাটা তিনি নিশ্চিত শুনেছেন। লোকজন অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল যে বাড়ির ভেতর ঢুকেই দেখা যাক কোনো গোলমাল হয়েছে কি না।

“তো সকলে ঢুকল আর দেখল, বাচ্চাটা একটা বন্ধ ঘরে মরে পড়ে আছে। (মিসেস ডেনিসন আর মিসেস বার্ড কখনো ঘরটা ব্যবহার করেননি; ঘরটা দোতলার পেছনের দিকের একটা শোবার ঘর।)

“হ্যাঁ, বেচারা মেয়েটাকে পাওয়া গেল, না-খেয়ে না-খেয়ে ঠান্ডায় মরে কাঠ হয়ে পড়ে আছে। সবাই অবশ্য নিশ্চিত ছিল না যে ঠান্ডাতেই জমে কাঠ হয়েছে কি না, কেননা মেয়েটা পোশাক-টোশাক সহই বিছানাতে ছিল, জীবিত অবস্থায় গরম থাকার জন্য তা যথেষ্ট। কিন্তু মেয়েটা ওখানে প্রায় এক সপ্তাহ বন্ধ ছিল। হাড় আর চামড়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না দেহে। ওর মা চলে যাবার সময় ওকে ওই ঘরে বন্ধ করে চলে গিয়েছিল আর বলে গিয়েছিল টুঁ-শব্দ না করতে। কেননা পড়শিরা শুনতে পেলে ধরে ফেলবে যে মহিলা পালিয়েছে।

“মিসেস ডেনিসন বলেছিলেন, তিনি ভাবতেও পারেন না যে এক মা তার নিজের বাচ্চাকে না খেতে দিয়ে মেরে ফেলবে। সম্ভবত মহিলা ভেবেছিল ও কাউকে ডেকে টেকে নেবে, অথবা পাড়াপড়শিরাই বাড়িতে ঢুকে ওকে খুঁজে পেয়ে যাবে। যা-হোক, যাই ভেবে থাকুক ও, বাচ্চাটা মারা গেল।

“কিন্তু এটাই শেষ নয়। এর মাঝেই বাপ ফিরে এল বাড়িতে। বাচ্চাটাকে সবে কবর দেওয়া হয়েছে তখন, উনি আর নিজের মধ্যে নেই, ভদ্রলোককে মনে হচ্ছিল তাঁরই অন্য এক সত্ত্বা তার পাশে দাঁড়িয়ে। সঙ্গে সঙ্গে বউকে খুঁজতে বেরোলেন তিনি, আর খুঁজে বের করে, গুলি করে মারলেন। খবরের কাগজে সেসময় বেরিয়েছিল ঘটনাটা। তারপর উনিও হারিয়ে গেলেন। ওঁকে আর দেখা যায়নি। মিসেস ডেনিসন বলেছিলেন যে লোকটা হয় আত্মহত্যা করেছে অথবা দেশ ছেড়ে চলে গেছে, কেউ জানে না, কিন্তু ওঁরা জানতেন বাড়িটাতে কিছু গোলমাল ছিল।

“‘আমি দেখতাম, প্রথম যখন এলাম, সবাই অদ্ভুতভাবে জিজ্ঞেস করত, যে কেমন লাগছে,’

মিসেস ডেনিসন বললেন, ‘বুঝতে পারতাম না, সেই রাতে বাচ্চাটাকে দেখার আগে অবধি ভাবতেই পারিনি, কেন।’”

“আমি জীবনে এমন ঘটনা শুনিনি,” বলে, মিসেস এমারসন গোল গোল চোখ করে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“আমি জানতাম তুমি এরকমই বলবে।” মিসেস মিসার্ভ বললেন, “আশ্চর্য হওনি, যখন একটা বাড়ি সম্পর্কে অদ্ভুত কথাবার্তা হত, আমি খুব একটা আগ্রহ দেখাতাম না, বা আলগা কথাবার্তা বলতাম না... হয়েছিলে?”

“না, হইনি। শোনার পরেও।” মিসেস এমারসন বললেন।

“কিন্তু ওটাই সব নয়।” মিসেস মিসার্ভ বললেন।

“আবার দেখেছিলে নাকি?” মিসেস এমারসন জিজ্ঞাসা করলেন।

“শেষবারের আগেও অনেকবার দেখেছি। আমি ভাগ্যবান যে নার্ভাস হইনি, নইলে ওখানে থাকা সম্ভব হত না, জায়গাটা পছন্দের তো ছিলই, ওই মহিলা দুজনের কথাও ভাবতাম। ওঁরা সত্যিই, খুবই ভালো মহিলা ছিলেন, কোনোই ভুল নেই। ওঁদের খুবই ভালবাসতাম। আশাকরি মিসেস ডেনিসন এসে দেখা করবেন কখনো।

“যা-হোক, রয়ে তো গেলাম, কিন্তু জানতাম না ঠিক কখন বাচ্চাটার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। আমার যাবতীয় জিনিসপত্র মনে করে ওপরতলায় এনে রাখতাম, তাতেই অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার ঘরে কোনো কাজ ফেলে রাখতাম না। ভয় লাগত যে মেয়েটা এসে হয়ত কোটটা জায়গা মতো ঝুলিয়ে দিল, বা গ্লাভসটা। দেখব হয়ত কাজটা আগে ভাগেই সারা হয়ে গেছে অথচ ঘরে কেউ নেই কাজটা করে দেবার মতো। তোমাকে বোঝাতে পারব না, মেয়েটার সঙ্গে দেখা হবার আতঙ্কে কেমন ভুগতাম। তার চেয়েও বাজে ব্যাপারটা হল ওর ওই কথাটা শোনা, ‘আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছি না।’ তোমার শরীর ঠান্ডা করে দেবার জন্য ওটাই যথেষ্ট। ওই মৃত বাচ্চাটার মাকে খোঁজার মতো আর্তি আমি কোনো জ্যান্ত বাচ্চার মধ্যেও কখনো দেখিনি। তোমার বুক ভেঙে যাবে, যাবেই।

“ও মাঝে মাঝেই আসত আর বেশিরভাগ সময়ে অন্য কাউকে নয়, মিসেস বার্ডকেই এসে ওটা বলত। আমি একবার মিসেস বার্ডকে বলতে শুনেছিলাম, যে বেচারা মেয়েটা মনে হয় মরনের পারেও মাকে সত্যিই খুঁজে পায়নি, যা ধড়িবাজ মহিলা!

“কিন্তু মিসেস ডেনিসন বলেছিলেন যে তিনি মনে করেন ওর এমনটা বলা উচিত নয়, এমনকী এমন কথা ভাবনাতেও আনা উচিত নয়। মিসেস বার্ড বলেছিলেন, এটা সত্যি হলে মোটেই উনি আশ্চর্য হবেন না। মিসেস বার্ড প্রায়শ খুব সহজেই যে-কোনো দোষের ভাগী হতেন। ভালো মহিলা, আর এমনই ভালো যে সবার জন্য যথেষ্ট করে উঠতে পারতেন না। মনে হত যেন এজন্যই ওঁর বেঁচে থাকা। বেচারি বাচ্চা ভূতটাকে উনি যত না ভয় পেয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি দুঃখে কাতর হয়েছিলেন। ওটার জন্য তাঁর বুকটা ভেঙে যেত কেননা কিছু তো করতে পারতেন না, বেঁচে থাকলে তবু না হয় করা যেত!

“‘মাঝে মাঝে মনে হয়, আমিই মরে যাই আর তারপর মেয়েটার সাদা পোশাকটা খুলিয়ে পোশাক আশাক পরিয়ে, কিছু খাওয়াই, আর ওর মাকে খুঁজে বেড়ানোটা বন্ধ করি,’ এমনটাও বললেন একদিন, শুনলাম, এবং সেটা মন থেকেই বললেন। আর সেটা উনি মারা যাবার খুব বেশিদিন আগে না।

“এবারে তোমায় সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাটার কথা বলছি। মিসেস বার্ড হঠাৎ মারা গেলেন। এক সকালে ... শনিবার ছিল সেটা, ইস্কুল ছিল না ... আমি নীচে গেছি সকালের প্রাতরাশের জন্য। মিসেস বার্ড ছিলেন না, মিসেস ডেনিসন ছাড়া কেউই ছিলেন না। আমি যখন ঢুকলাম উনি কফি ঢালছিলেন।

‘মিসেস বার্ডকে দেখছি না, কোথায়?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

“‘সকালে অ্যাবির শরীরটা ভালো লাগছিল না,’ উনি উত্তর দিলেন, ‘মনে হয়, তেমন কিছু নয়, ঘুম হয়নি ঠিক মতো, মাথা ব্যথা করছিল, ঠান্ডাও লাগছিল, তাই আমি বললাম আরেকটু শুয়ে থাকতে, বাড়িটাতে একটু রোদ আসুক, তারপর উঠুক।’ খুব ঠান্ডা ছিল সকালটা।

“‘মনে হয় ঠান্ডাই লেগেছে।’ আমি বললাম।

“‘হ্যাঁ। আমারও মনে হয় ঠান্ডা লাগিয়েছে,’ মিসেস ডেনিসন বললেন, ‘ওর ঠান্ডাই লেগেছে, নইলে উঠে পড়ত কখন। অ্যাবি বিছানায় এতক্ষণ শুয়ে থাকার মানুষই নয়।’

“তো আমরা খেতে শুরু করলাম আর এর মধ্যেই হঠাৎ দেয়াল থেকে একটা ছায়া সিলিঙের দিকে সরে গেল। জানলার ওপাশে বাইরে দিয়ে কেউ চলে গেলে যেমন হয় অমনি। মিসেস ডেনিসন আর আমি দুজনেই জানালার বাইরে তাকালাম; মিসেস ডেনিসন চেঁচিয়ে উঠলেন,

“‘অ্যাবি কি পাগল হল!’ উনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘সক্কালবেলা, এত ঠান্ডায় বাইরে বেরিয়েছে আর... আর...’ কথা শেষ হল না, কিন্তু উনি বাচ্চাটাকে বোঝাতে চাইছিলেন। দুজনেই জানলার বাইরে তাকিয়েছিলাম আর দুজনেই দেখলাম, যেমনটা আর জীবনে কখনো দেখিনি। মিসেস বার্ড বরফে ঢাকা রাস্তার ওপর দিয়ে বাচ্চাটার হাত শক্ত করে ধরে হেঁটে চলে যাচ্ছেন; বাচ্চাটা ওঁর কোল ঘেঁষে, যেন ও ওর মাকে খুঁজে পেয়েছে।

“‘ও মারা গেছে।’ মিসেস ডেনিসন আমার হাতটা খামচে ধরে বললেন, ‘মারা গেছে, আমার বোনটা মারা গেছে!’

“সত্যিই। আমরা হুড়োহুড়ি করে যত দ্রুত সম্ভব ওপরতলায় গেলাম। নিজের বিছানাতেই মৃত অবস্থায় শুয়ে, মুখে হাসি, যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছেন, একটা হাত বাড়ানো, যেন কেউ ধরে রয়েছে । শেষ অবধি হাতটা সোজা করাই গেল না, কবর দেবার সময় কফিন-বাক্সের বাইরেই রয়ে

গেল।”

“বাচ্চাটাকে আর দেখা গিয়েছিল?” কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন মিসেস এমারসন।

“নাহ,” মিসেস মিসার্ভ বললেন, “উঠোন পেরিয়ে মিসেস বার্ডের সঙ্গে চলে যাবার পর, বাচ্চাটাকে আর কখনো দেখা যায়নি।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%