আর্কুলারিস

সৌভিক চক্রবর্তী

আর্কুলারিস হাসপাতালের জানলা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ আগে একপশলা বৃষ্টি হয়ে আবার রোদ বেরিয়েছে। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ দেখতে দেখতে আর্কুলারিস টের পেল শীত শীত লাগছে। লাগারই কথা; এই জুনেও একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে একটানা।

রাস্তার ও-পাশটায় গাছ-গাছালি থেকে জল ঝরে পড়ছে। আর এ-পাশে একটা ফাঁকা জায়গায় একদল লোক বেহালা বাঁশি গিটার নিয়ে দিব্যি সুর তুলেছে জমিয়ে।

ওফ! বিরক্ত হল আর্কুলারিস। এরা কি জগতে আর সুর খুঁজে পায় না! সেই ক্যাভেলিয়ারা রাস্টিকানা! শুনতে ভাল লাগে না এই বিরহের সুর। বাঁশিতে ওই বুড়ো লোকটা চোখ পিটপিটিয়ে যেন একটানা কেঁদেই চলেছে।

আর্কুলারিস জানলায় ঝুঁকে দেহের সমস্ত ভারটাই যেন ছেড়ে দিল। আসলে তার নিজেকেই বড়ো দুর্বল লাগছে, ওই হতচ্ছাড়া অপারেশনটার পর থেকে।

আর এইখানেই আর্কুলারিসের আপত্তি। সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও সে নিজেকে এত দুর্বল ভাবছে কেন? কেনই বা মনের মধ্যে এত টালমাটাল? একটা বাচ্চা ছেলের মতো কান্না পাচ্ছে?

অথচ তার অনিবার্য মৃত্যু নিয়ে ডাক্তারদের, এমনকী তার নিজেরও ভবিষ্যতবাণী তো ব্যর্থই বলা যায়; নাহলে সে এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছে কী করে!

সে তো এখন একশোভাগই ফিট, ওই বেহালাটার টান টান তারগুলোর মতই।

বেহালা! আবার হাসি পেল আর্কুলারিসের। বেহালাই বটে! শুধু সুর নেই কোথাও, তালও নেই। আর এই নিয়েই তাকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হবে। আবার একটা কান্নার ঢেউ তোলপাড় করতে লাগল আর্কুলারিসের ভেতরে।

এই কান্না কান্না ভাবটা কেন যে আসছে!

অথচ হাসপাতালের ডাক্তার জাহাজে করে তাকে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এর চেয়ে ভাল তো আর কিছু হয় না। একটা নতুন জীবন শুরু হবে। সেখানে কীসের একটা পাষাণভার বুকের মধ্যে যেন চেপে চেপে বসছে। আর্কুলারিস নিজের মনটাকে ঘোরাতে চাইল।

আর একটু পরেই গাড়ি নিয়ে হ্যারি এসে হাজির হবে তাকে জাহাজঘাটায় নিয়ে যেতে। তার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সমুদ্রের কিনারাহীন বিস্তারে ভেসে পড়বে জাহাজ। তার পরেই সূর্য ডুববে গোলাপি আভা ছড়িয়ে। আস্তে আস্তে পেছনে পড়ে থাকা বস্টন শহর ঢেকে যাবে রাতের আঁধারে।

পিছনে যতই আঁধার হোক, সামনে তখন নতুন জীবন।

কত বছর! কে জানে কত বছর দেশের বাইরে সে! মোলায়েম উষ্ণতায় ভরা জুন মাস তাকে ডাকছে এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধে। ক’দিনেই সে ইউরোপে ফিরবে। সামনে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স... রাইন নদীর কুলুকুলু ধ্বনি এখনই যেন সমুদ্রের সমস্ত উত্তাল ঢেউ ছাপিয়ে শুনতে পাচ্ছে সে! বুকের কোটরে আবার মুচড়ে উঠল কান্না। একেই বোধহয় মন-কেমন-করা বলে। ফেলে যাওয়া সব কিছুর জন্য মন-কেমন!

তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। আর মৃদু টোকা দিয়ে দরজা ঠেলে যে ঢুকল সে হ্যারি ছাড়া কেউ নয়।

হ্যারির আসাটা প্রত্যাশিতই, তবু আর্কুলারিস শশব্যস্ত হতে গিয়ে যেন একটু টলে গেল।

রে রে করে উঠল হ্যারি,“আরে দাঁড়ান দাঁড়ান, একদম তাড়াহুড়ো করবেন না। আমি তো এসেই গেলাম। সব কিছু ঠিক করে দেব।”

এগিয়ে এসে হাত ধরল হ্যারি। বলল, “আহা রে! একেবারে আশি বছরের বুড়োর মতো লাগছে গো! ”

মৃদু হাসল আর্কুলারিস। এই যে হ্যারি তাকে ভালোবেসে একটা নতুন জীবনের খোঁজ দিতে নিয়ে যাচ্ছে, সেই কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল বুক।

করিডোর পেরিয়ে কয়েক ধাপ নামলেই নীচে বড়ো হলঘর। ধীরে ধীরে আর্কুলারিস নেমে এল সেখানে।

ওখানে তখন কে নেই! তাকে বিদায় জানাতে দাঁড়িয়ে আছে নার্স হয়েল, ওয়ার্ডের রাশভারী মেট্রন আর সেই মিষ্টি দেখতে মেয়েটা। ছোট্ট একটা তিল আছে ওর চিবুকের একধারে। হাসলে যেন সোনা ঝরে। আর্কুলারিস গ্যারান্টি দিতে পারে, যে কেউ স্বচ্ছন্দে ওর প্রেমে ডগমগ হবে। মেয়েটা যে অপারেশন টেবিলে ওঠার আগে তাকে সাফসুতরো করে তকতকে একটা পোশাক পরিয়ে দিয়েছিল, ভাবতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল আর্কুলারিসের মুখ।

মিস হয়েল হাত নাড়ল, “গুড বাই মিস্টার আর্কুলারিস। শুভ যাত্রা।”

“হ্যাঁ, গুড বাই, মিস হয়েল। আমার জন্য যা করেছেন ভোলার নয়। আমি তো শুধু জ্বালিয়েই গেলাম!”

শুধু চিবুকের তিলের জন্যেই যে মেয়েটিকে আলাদা করে মনে রাখা যায়, এগিয়ে এসে হাত ধরল আর্কুলারিসের, হেসে বলল, “ভাল থাকবেন অবশ্যই।”

আর্কুলারিসের মনে একটা রোমাঞ্চ জাগল। মেয়েটিকে যতবারই দেখে কার যেন কথা মনে পড়ে যায়। অদ্ভূত মিল আছে কোথাও। ‘দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।’ কিন্তু কে সে? ভেবে ভেবে খেই হারিয়ে ফেলে আর্কুলারিস। কোন রকমে বলে, “গুড বাই।” তারপরে মেট্রনের দিকে তাকায়।

মেট্রনের মুখে রহস্যময় হাসি। বললেন, “মিস্টার আর্কুলারিস যে দেখছি এইসব নব্য যুবতীদেরই সবকিছু দিয়ে যাচ্ছেন...”

এ-কথায় তার প্রতি মনযোগের ছোঁয়া স্পষ্ট। মুগ্ধ আর্কুলারিস এবার বিহ্বল

হয়ে পড়ল। সত্যিই তো, তার মতো এক অক্ষম মাঝবয়সীর জন্য এদের এত মায়া!

সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য একটু রসিকতা করতেও ছাড়ল না। বলল, “কোথায় যে আর সব কিছু দিলাম! সে হবে জাহাজে, ভেসে যাওয়া জাহাজে – আমার সব কিছু!”

মিস হয়েল বললেন, “আমার কিন্তু মনে হয় আর একটা অপারেশনের পর আপনি পুরোদস্তুর ঠিক হয়ে যাবেন...”

কয়েক পা সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটু এগোলেই সামনে পথ। আর্কুলারিস নামতে নামতে সিঁড়ির দু’পাশে তাকাল। সেখানে টবের মধ্যে ছোটো ছোটো পাম গাছ। কতদিনের চেনা! তারাও যেন উচ্ছ্বসিত হয়ে হাত নাড়াচ্ছে...গুড বাই!

রাস্তায় নামতেই এক দমক ঠান্ডা হাওয়া এসে কাঁপিয়ে দিল আর্কুলারিসকে!

ওহ্! জুন মাসে যেখানে আরামদায়ক গরম থাকার কথা, সেখানে এমন হাড়কাঁপানো ঠান্ডা! ভাগ্যিস ওভারকোটটা চড়িয়ে নিয়েছিল গায়ে! তবু কাঁপুনি তার সর্বাঙ্গে চেপে বসল।

আর্কুলারিস যেন নিজের দাঁতের খটখটানি শুনতে পাচ্ছিল। বলল, “ওহ্ বড্ডো ঠান্ডা!”

হ্যারি একটা মোটাসোটা কম্বল গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল, “পুবদিক থেকে হাওয়া চলছে যে। আসলে মুশকিলটা হল, আমার গাড়িটা চারদিক খোলা। হাওয়া আসবেই...”

“হ্যাঁ, একটা ঢাকা গাড়ি হলে ভাল হত।”

“তা হয়ত হত, কিন্তু আমার ভরসা ওই খোলা হাওয়ায়। লম্বা লম্বা শ্বাস নিন, দেখবেন কেমন চনমনে হয়ে উঠছেন।”

আর্কুলারিসের মুখ দেখে মনে হল খুব একটা ভরসা পায়নি। তাই দেখে হ্যারি বলল, “চিন্তা নেই, হাতে অনেক সময় আছে। আমি ধীরেসুস্থে গাড়ি চালাব না হয়।”

সামনে দীর্ঘ ঢালু পাহাড়ি পথ বেকন স্ট্রিটের দিকে চলে গেছে। ঢালু পথে গাড়ি চালাতে হ্যারির তেমন কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না। বরং সে যথাসম্ভব আস্তেই চালাচ্ছিল। কিন্তু পাহাড়ি পথ যেমন হয়, বড্ডো এবড়ো খেবড়ো। থেকে থেকেই ঝাঁকুনি টের পাচ্ছিল আর্কুলারিস। আর তখনই, হয়ত সেই ঝাঁকুনি থেকেই, এতক্ষণ টের না পাওয়া যন্ত্রণা বুকের কাছ বরাবর চাগিয়ে উঠল। আর্কুলারিস একটু নড়েচড়ে ডানদিকের হাতলের উপর ঝুঁকে পড়তে মনে হল যেন কিঞ্চিৎ উপশম হল যন্ত্রণার।

পপলার বনের মধ্য দিয়ে পথ। এপাশে-ওপাশে এলোমেলোভাবে ছড়ানো পাথর। রাস্তায় বিশেষ একটা জনপ্রাণী নেই। শুধু গাড়ির চাকার বিরামহীন আওয়াজ। মেঘ সরে গিয়ে ঝলমল করছে সুনীল আকাশ।

ওহ! কতদিন বাদে মুক্তি! পৃথিবীকে শেষ কবে যে এত সুন্দর লেগেছে! চারদিকে বৃষ্টিভেজা

গাছ থেকে টুপটাপ জল ঝরছে। একপশলা বৃষ্টিতেই সবুজের সমারোহ যেন হেসে হেসে উঠছে। গাছগাছালির ফাঁক থেকে একটা দেখতে-না-পাওয়া পাখি একটানা ডেকে ডেকে সুরমূর্চ্ছনা ভাসিয়ে দিচ্ছে হাওয়ায়।

ভিজে রাস্তার সোঁদা গন্ধ বুক ভরে নেওয়ার জন্য লম্বা শ্বাস নিল আর্কুলারিস। দৈবাৎ পাশ কাটিয়ে যাওয়া এক আধটা গাড়ি এত চকচকে, যেন সবে পথে নেমেছে। সব যেন সেই শিশু বয়সের চোখ দিয়ে দেখা। যখন তার জীবনের একমাত্র সাধ ছিল বড়ো হয়ে ওইসব গাড়ির ড্রাইভার হবে।

একসময় আর্কুলারিস খেয়াল করল যে সে আপন মনে হেসে চলেছে। কারা এভাবে হাসে? বোকারা? আর হাসিটাও যেন তার স্বভাবসিদ্ধ নয়; বোকা বোকা দুধেল হাসি।

তখনই আর্কুলারিসের মনে হল, তার ভীষণ কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু মাথার মধ্যে, মনের মধ্যে অজস্র কথার কণাগুলো চলতে চলতে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ভয়ানকভাবে মুখে এসে বের হচ্ছে না। অথচ এই ভালোলাগার বোধটা কত সুন্দরভাবে বলা যায় হ্যারিকে। সেখানে বলতে গেলেই বোবা হয়ে যাবে আর্কুলারিস। অবরুদ্ধ ভাষা তখন চোখের জল হয়ে ঝরে পড়বে অঝোরে।

“নাহ্!” আপনমনেই ঘাড় নাড়ল সে।

অবশেষে কয়েকখানা কথা বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে, “সব কিছু কেমন অসাধারণ, না!”

হ্যারি হাসল, “তা সুন্দর লাগছে বৈকি।”

“কথা হারিয়ে যাচ্ছে আমার!”

“একটু ধৈর্য ধরুন। আমি বাজি রাখতে পারি, সমুদ্রে আপনার জন্যে একটা চমৎকার সময় অপেক্ষা করছে।”

“চমৎকার! কে জানে! আমার তো মনে হয় না! আমার কী মনে হয় জানো? একটা শান্ত, নিস্তরঙ্গ সময়, ওখানে বোঝার মতো আমার উপর চেপে বসবে।”

হ্যারি কথাটা শুনল কিনা বলা যায় না, সে তখন গাড়ি চালাতে চালাতে আপন মনে শিস দিচ্ছে।

দেখতে দেখতে হার্ভার্ড ক্লাব এসে গেল। ঘাড় ঘোরাতে কষ্ট হচ্ছে, তবু আর্কুলারিস কষ্ট উপেক্ষা করে যেন চোখ দিয়ে চেটেপুটে নিতে লাগল ওই হর্ম্যটাকে। হয়ত এটাই শেষ, আর কখনো দেখা হবে না।

আর্কুলারিস বুঝতে পারছে না, হঠাৎ সে কেন এত আবেগপ্রবণ হয়ে উঠছে, একটা শিশুর মতো। সামনেই হার্ভার্ডের পতাকা, হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে। পতাকার মাঝখানে সেই পরিচিত গোল সিল; মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে পতাকার ভাঁজে, ঠিক আগে যেমন হতো। ওপাশে ওই তো লাইব্রেরির রিডিংরুমের জানলা। ওই জানলার লাগোয়া টেবিলেই বসত আর্কুলারিস! বসে বসে প্লেটো, কিপলিং তো বটেই, আরো কতকিছু যে পড়তো ঈশ্বরই জানেন!

আর পাশের ওই ব্যালকনিটার তো তুলনা নেই, যার নীচে বহুদূর ছুটে আসা ম্যারাথনের শক্ত-পোক্ত অ্যাথলিটরা রেস শেষ করে শরবত খেত। এখনও সে-সব চোখের সামনে ভাসে।

আর তাদের অতিপ্রিয় সেই যে বুড়ো মানুষটা, ট্যালবট না কী নাম, রোজ একখানা মোটা বই কোলে নিয়ে চেয়ারে বসে ঢুলত। মাথাটা একদিকে হেলে গেলে হাত থেকে খসে পড়ত বই। কেউ জ্বালাতন করতো না তাকে। ভদ্রলোকের অবশ্য ধারণা ছিল যে সে ওইখানে বসে আছে যার যা সমস্যা সবকিছু সমাধান করার জন্য। ছবিটা মনে পড়তেই হাসি পেল আর্কুলারিসের।

ঘাড়ে ব্যথা করছে। এবারে মাথাটা সোজা করা দরকার।

গুড বাই, পুরোনো বন্ধু, চললাম । হার্ভার্ড ক্লাবের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল আর্কুলারিস।

“ওরা কিন্তু আপনাকে খুব মিস করবে।” হ্যারির কথায় সহানুভূতি, না বিদ্রুপ? আবার বলল, “সত্যিই খুব মিস করবে আপনাকে।”

হঠাৎ আর্কুলারিস নীচু গলায় আবৃত্তি করল, “মোর লাগি কেহ যেন নাহি করে শোক...” তারপর বলল, “কোথাকার লাইন জানো এটা? অডিসি!”

হালকা কাঁপুনি সত্ত্বেও ঠান্ডা হাওয়া মুখে লাগায় বেশ একটা আরাম বোধ হল আর্কুলারিসের। এই শীতল হাওয়া তার মধ্যে জমে থাকা ঘোর অনিশ্চয়তার ক্লান্তিকে যেন ধুয়ে মুছে দিচ্ছে।

কিন্তু সেই ভালোলাগাটা বেশিক্ষণ রইল না। হঠাৎ সব কিছু আচমকা যেন ঘুরপাক খেতে খেতে বিলীন হয়ে গেল। চোখের সামনের বাড়িগুলো যেন দুলছে, আর দুলতে দুলতে এ ওর সঙ্গে মাথা ঠোকাঠুকি করছে। এর পরে আর কী হতে পারে ভেবে দু’চোখ খোলা রাখতে সাহস হল না আর্কুলারিসের। কিন্তু চোখ বন্ধ করেও যে রেহাই নেই। মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল, যেন একটা অদ্ভূত আর একটানা গুনগুনানি ক্রমশ বাড়তে বাড়তে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ভেতরের জ্বর জ্বর ভাবটা হয়ত এখনো যায়নি। জাহাজে উঠে একগ্লাস হুইস্কি পেলে বেশ হয়। এইসব ভাবতে ভাবতে আর্কুলারিসের মনে হল সে জাহাজেই আছে আর জাহাজ ধীরে ধীরে ইস্ট বস্টন পার হয়ে যাচ্ছে। কে বলতে পারে মাথার মধ্যে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকা আওয়াজটা হয়ত জাহাজের ইঞ্জিনের। পরের মুহূর্তেই যেন কোনো ঘুম থেকে জেগে উঠল সে আর বুঝতে পারল জায়গাটা জাহাজঘাটা। এদিকে হ্যারির গাড়িটাও একেবারে নিস্পন্দ। চারপাশ শুনশান। একদিকে পাহাড়ের মতো প্যাকিং বাক্সের স্তূপ।

হ্যারি গুনগুন করে প্রচলিত একটা গানের সুর ভাঁজছিল –

“আমরা এখানে, আমরা এখানে, কারণ আমরা এখানে।”

আর্কুলারিসের মনে হল গানটার ছত্রে ছত্রে ঘোর এক অনিবার্যতা লুকিয়ে আছে। সেও বিড়বিড় করল, “কারণ আমরা এখানে!”

গাড়ির মধ্যেই হালকা ঢুলুনি এসেছিল আর্কুলারিসের। ইতিমধ্যে হ্যারি গিয়ে তার জাহাজের টিকিট, পাসপোর্ট, মালপত্তর আর জনাকয়েক কুলিকে নিয়ে ফিরে এল। হ্যাঁ, হ্যারির মতো লোক আর হয় না। তার সব খুঁটিনাটির দিকে তীক্ষ্ণ নজর।

সাবধানে আর্কুলারিসকে গাড়ি থেকে নামিয়ে কাঠের লম্বা পাটাতন বেয়ে হ্যারি তাকে জাহাজে ওঠাল অবশেষে। আর গোলকধাঁধাঁর মতো আঁকাবাঁকা সরু সরু গলি পেরিয়ে একটা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।

ঘরটা অদ্ভূত, কোন জানলা নেই। থাকার মধ্যে আছে শুধু একটা ঘুলঘুলি। তাও কী অসম্ভব ঠান্ডা! আর্কুলারিসের মনে হল, শীতের হাওয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ঘরের মধ্যে।

হ্যারি চারপাশে সব ঠিকঠাক আছে দেখে নিয়ে আর্কুলারিসের দিকে তাকাল, “চলি তাহলে? জাহাজ ছাড়ার ভোঁ বাজল শুনলেন তো?”

“কই না তো! বাজল বুঝি?”

হ্যারি হাসল, “শুনবেন কী করে? আপনি তো সেই থেকে ঢুলেই যাচ্ছেন! যাই হোক, চলি এবার; নিজের দিকে খেয়াল রাখবেন – আর শেষ গন্তব্যে যাবার পর আমাকে একটা ছবির পোস্টকার্ড পাঠাতে ভুলবেন না কিন্তু।”

“একটা, না অসংখ্য! কটা চাই?”

“অসংখ্য হলে তো ভালই, তবে তাতে আপনার সই থাকতে হবে। যাই হোক অনেক ধকল গেল, এখন টুক করে হালকা একটা ঘুম লাগিয়ে দিন। ওই আপনার বাঙ্ক। গুড বাই...”

হ্যারির চলে যাওয়ার মুহূর্তে ওর হাতদুটো জড়িয়ে ধরল আর্কুলারিস। তাতেই বুকের মধ্যে মোচড় দিল কোথাও। কী হচ্ছে এসব! সে কি এখন কাঁদতে বসবে নাকি? মনে হল সে আবার একটা শিশুর মতো হয়ে যাচ্ছে! কোনরকমে ধরা গলায় বলল, “গুড বাই!”

ঘরে ঢুকে আর্কুলারিস সামনে রাখা একটা কাঠের চেয়ারে বসে চোখ বুঁজল। ঘুলঘুলিতে শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে হাওয়ার। বাইরে থেকে একনাগাড়ে লোকজনের চলাফেরার আওয়াজ আসছে। সবাই যেন ভয়ানক ব্যস্ত আর ছটছে।

চেয়ারটা যদিও আরামদায়ক, কিন্তু অস্বস্তি বাড়াতে লাগল ব্যথাটা, সেই পুরোনো ব্যথা আবার জেগে উঠেছে।

এর পর আর্কুলারিসের পক্ষে আর বসে থাকা সম্ভব হল না। ধীরে সুস্থে শুয়ে পড়ল অপ্রশস্ত বাঙ্কে। শুতে শুতেই তলিয়ে গেল ঘুমে। ওভারকোটটা গায়েই রইল।

কখন যে ঘুম ভাঙল! টের পেল ঘরের মধ্যে প্রচন্ড ঠান্ডা। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঘুলঘুলির ঢাকনাটাও হাট করে খোলা ।

কোনরকমে হাতড়ে হাতড়ে আলো জ্বালল আর্কুলারিস। তারপর বেল টিপে জাহাজের স্টুয়ার্ডকে ডাকল যদি ঘুলঘুলিটা বন্ধ করানো যায়।

ডিনার টেবিলে অবশ্য অন্য ছবি। চারদিক আলোয় আলো।

একটা মেয়ে বসেছে টেবিলের উল্টোদিকে। চোখ আটকে যাওয়ার মতো চেহারা। একঝলক দেখেই আর্কুলারিসের মধ্যে একটা উসখুসানি শুরু হল। বড্ডো চেনা কারো সঙ্গে মিল পাচ্ছে এর। কার সঙ্গে! হ্যাঁ, হতে পারে হাসপাতালের সেই মেয়েটা, যার চিবুকে একটা তিল ছিল।

মেয়েটির না-লাল, না-সোনালি দীর্ঘ চুলের রাশি অত্যন্ত সাধারণভাবে বাঁধা। যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো দেবদূতি। মেলজো দ্য ফরলির আঁকা একটা ছবির কথা মনে এল তার।

আশ্চর্য! এরও চিবুকে তিল, আর তেমনই ভেজা ভেজা ঠোঁট।

মনে হয় মেয়েটি একাই বেরিয়েছে।

স্টুয়ার্ড এলে আর্কুলারিস টেবিলে রাখা মেনুকার্ড দেখে কেবল একবাটি স্যুপের অর্ডার দিল। স্টুয়ার্ড চোখ কপালে তুলল। বলল, “শুধু স্যুপ! আমাদের বিখ্যাত মুরগির ডানার তৈরি অর্ডেভ চেখে চেখে দেখবেন না একটুও?”

আর্কুলারিস হাসল, “পাগল! ওটা খেলে আমার পরলোক গমন নিশ্চিত!”

যেন খুব একটা মজার কথা শুনল, হেসে এমন ভাব দেখিয়ে মেনুকার্ডটা টেবিলে রেখে চলে গেল স্টুয়ার্ড। স্টুয়ার্ড চলে যেতেই মেয়েটা হাসল, “বেচারাকে খুব ভ্যাবাচাকা খাওয়ালেন যা হোক।”

“মনে হয় না অবশ্য এতটা হয়েছে, কারণ সেটা হতে গেলে যে হৃদয়ের প্রয়োজন, তা যদি থাকত তবে এই স্টুয়ার্ডের চাকরিতে ওরা টিকতেই পারত না। আমার ধারণা, এরা সব মরা মানুষ।”

একটু থেমে আর্কুলারিস আবার বলল, “অবশ্য কী আর বলব, এদের বিকারটাই তো ওইরকম, যেন কার পরে কী ঘটবে সব আগেভাগেই জেনে বসে আছে – তাই ওদের অবাক করা বা ভ্যাবাচাকা খাওয়ানো কঠিন।”

মেয়েটির মুখ ম্লান হল, “ওদের জীবনটা তাহলে ভয়ানক একঘেয়ে বলুন?”

“না, সেই বোধটাও ওদের নেই। কারণ ওরা মরে গিয়েছে। মৃতের সব চিহ্ন ওদের চোখে মুখে দেখতে পাই।”

“আপনি সত্যিই এটা মনে করেন?”

মেয়েটির প্রশ্নে আর্কুলারিস হঠাৎই যেন সিরিয়াস হয়ে পড়ল। বলল, “হ্যাঁ, মনে করি। কেন জান? আসলে আমি মৃত্যুর দাগগুলোকে খুব ভাল করে চিনি। নিজের জীবনেই খুব নিবিড় করে দেখেছি এদের – মৃত্যুর পাশে দাঁড়িয়ে।”

ভ্রূ কোঁচকাল মেয়েটি, বলল, “ওই মৃত্যুর পাশে দাঁড়িয়ে...কথাটা ঠিক বুঝলাম না।”

“না না, এর মধ্যে রহস্যের গন্ধ খুঁজো না। হাসপাতালে একটা অপারেশনের পর ডাক্তাররা তো ধরেই নিয়েছিল আমি শেষ। এমনকী প্রায় টানা ছ’মাস ধরে আমিও বিশ্বাস করতাম আমি মৃত।” দম নেওয়ার জন্য একটু থামল আর্কুলারিস। তারপর বলল, “যদি কখনো কঠিন অসুখে পড়ে মৃত্যুকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখ প্রতি মুহূর্তে, তখন তোমার মধ্যে জীবনের অতীত এক বোধ তৈরি হবে। দেখবে, জগতে ভাল কোন কিছুরই ওপর আর তোমার ভরসা থাকছে না – মনে হবে তুমি তো সব জান, সব বোঝ, তোমার অজ্ঞেয় কী আছে – কিচ্ছু না!”

মেয়েটি চুপ করে শুনছিল আর্কুলারিসের কথা। বলল, “আপনার কথাগুলো এখন একটু একটু বুঝতে পারছি মনে হয়। তবে আমি কখনো অসুস্থ হইনি।”

“কী বলছ! কখনো হওনি!”

“না...”

“ঈশ্বরের দয়া বৈকি!”

সহসা চুপ করে গেল আর্কুলারিস। অন্তরের অব্যক্ত কত গোপন কথা, কত না-বলা-বাণী বুকের মাঝে ঘুলিয়ে ঘুলিয়ে উঠছে। মেয়েটিকে তো বলতেই পারত সেসব। কিন্তু ঠোঁট দুটোতে যেন পাষাণের ভার। আর্কুলারিস মেয়েটির মুখের দিকে চেয়েই রইল। আবার সেই পুরোনো ভাবনাটা ঘুরে ফিরে এল মনের মধ্যে। কেন একে এত কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে! কার কথা বার বার মনে পড়াচ্ছে এই মেয়ে?

আর্কুলারিস বুঝি একটু বেশিক্ষণই তাকিয়েছিল, খেয়াল করতে অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে বলল, “ম্যাডাম, আমার মতো এক আধবুড়ো, অক্ষমের এলোমেলো কথায় এত মনোযোগ দেওয়া ঠিক নয়। শেষে দেখবে হাসপাতাল পর্যন্ত ছুটতে হবে।”

মেয়েটি হাসিমুখে ঘাড় কাত করে মেপে যাচ্ছিল আর্কুলারিসকে, বলল, “বলছেন বটে। তবে আপনাকে দেখে কে বলবে অক্ষম?”

কথাটায় কী যে ছিল, দুলে উঠল আর্কুলারিসের বুক। মেয়েটি সত্যিই তুলনাহীনা।

আর্কুলারিসের ব্যথাটা যেন কমে গেল এক লহমায়। মাথার মধ্যে শুরুর সেই একটানা গুঞ্জনও অদৃশ্য হল মুহূর্তে। শব্দ একটা হচ্ছে বটে, আর সেটা নিছকই জাহাজের ইঞ্জিনের কম্পন! আর্কুলারিস নিশ্চি ত হল তার সমুদ্রযাত্রাটা অবশেষে আনন্দদায়ক হতে চলেছে।

টেবিলের একধারে একজন যাজক বসে ছিল, নুনের পাত্রটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “মশাই আপনার ওই স্যুপে মনে হচ্ছে এর প্রয়োজন পড়বে।”

আর্কুলারিস হাসল, বলল, “ধন্যবাদ, আপনারটাতেও লাগল বুঝি?”

পাশের টেবিলে খাবার পরিবেশন করতে করতে স্টুয়ার্ড ঠিক শুনতে পেয়েছে কথাটা। সঙ্গে সঙ্গে একেবারে বিনয়ের অবতার হয়ে বলল, “আজ তো যাত্রার প্রথম দিন কিনা, তাই সবকিছু একটু এলোমেলো হয়ে আছে।”

মেয়েটি সে-কথায় কান না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “স্টুয়ার্ডমশাই, আমাদের সমুদ্রযাত্রাটা বেশ জম্পেশ হতে চলেছে তো?”

স্টুয়ার্ড তখন যাজকের স্যুপের বাটি উঠিয়ে নিয়ে তাকে খাবার পরিবেশন করছে। একটু থমকে গিয়ে বলল, “আমি যদিও জেরোমিয়া নই, তবুও...”

ঝাঁপিয়ে পড়ে তার কথাটা কেড়ে নিল যাজক। বলল, “জেরোমিয়া মানে ওই হিব্রু ভবিষ্যতদ্রষ্টা? ছাড়ুন মশাই, আমাদের এখানে কোন জেরোমিয়ার দরকার নেই।”

মেয়েটি এবার যাজককে থামিয়ে স্টুয়ার্ডের দিকে তাকাল, “কী যেন বলতে চাইছিলেন আপনি?”

স্টুয়ার্ড বলার জন্যই বুঝি উশখুশ করছিল। চাপা গলায় বলল, “এসব কথা সবাইকে বলার নয়, কিন্তু ব্যাপারটা বেশ গুরুতর, বুঝলেন! আসলে এই জাহাজের খোলে একটা মৃতদেহও যাচ্ছে আয়ার্ল্যান্ডে। আর ঘাড়ের ওপর একটা মরা মানুষ নিয়ে কোনো সমুদ্রযাত্রা কখনোই মনোরম হতে দেখিনি।”

যাজক চেঁচিয়ে উঠল, “আপনি থামুন তো! রাজ্যের কুসংস্কারের ডিপো সব।”

আর্কুলারিস এতক্ষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে গরমাগরম স্যুপ খাচ্ছিল, বলল, “হুঁ, প্রাচীন সংস্কার এটা। আমি বহুবার শুনেছি। হয়ত আপনিই ঠিক মিস্টার স্টুয়ার্ড। আমাদের জাহাজের জন্য সত্যিই কোন ঘোর বিপদ হয়ত অপেক্ষা করে আছে।”

“তাহলে ধ্বংসই হওয়া যাক বরং।” যাজক ঠান্ডা গলায় বলল।

আর্কুলারিস কিন্তু ততক্ষণে কাঁপতে শুরু করেছে। স্টুয়ার্ডের কথাটা তার মাথা থেকে সরছে না কিছুতেই যে এই জাহাজের অন্দরে কোথাও একটা মৃতদেহ আছে। মৃতদেহ... মানে একটা কফিন! একটা আস্ত কফিন!

কোন দুর্ঘটনা ঘটবেই নিশ্চিত। হয়ত বা গাঢ় কুয়াশায় হারিয়ে যাবে জাহাজ, হয়ত বা কোন হিমশৈলর সঙ্গে লাগবে ধাক্কা! হে ভগবান!

আর্কুলারিসের চোখে একে একে সমস্ত জাহাজ দুর্ঘটনার ছবি ভেসে উঠতে লাগল। টাইটানিক! ইঁদুরের মতো মরেছিল সব। সে-সময় হার্ভার্ড ক্লাবের রিডিংরুমে বসে খবরের কাগজে কত কিছু পড়েছিল। সব যেন ভয়ংকর সত্যি হয়ে চোখের সামনে নাচানাচি করছে। কাগজেই পড়েছিল, জাহাজ ডোবার সময়েও নাকি ব্যান্ডের গায়কেরা ডেকের উপর গাইছিল, “তবু আমরা ঈশ্বরের কত কাছে।”

আর্কুলারিসের মনে এই ছবিটা একপশলা অন্ধকারের মতই গাঢ় হয়ে আছে। আর ওই যে জাহাজ, “আয়ার্ল্যান্ডের রানি!” যার সেই হতভাগ্য যাত্রীরা, যারা ধূমপানের ঘরে আটকা পড়েছিল! পাগলের মতো ছুটোছুটি করতে করতে দেখছিল তাদের জীবন আর মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র দরজাটা তখন বন্ধ। ভুল করে ডেকের স্টুয়ার্ড রাতের মতো চাবি লাগিয়ে কোথায় চলে গেছে।

আর্কুলারিসের শরীরে কাঁটা দিল, আচমকা যাজকের দিকে ঘুরে গিয়ে প্রশ্ন করল, “এইসব আজেবাজে পাগলাটে ভাবনা কী করে তৈরি হয় বলুন তো?”

যাজক তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টিতে আর্কুলারিসকে মাপছে যেন। এই দৃষ্টির অস্বস্তি এড়াতে আর্কুলারিস হঠাৎই তার টাইটাকে ঠিকঠাক করতে লেগে গেল।

যাজকের গম্ভীর গলা শোনা গেল, “কী করে তৈরি হয়? নিছক ভয় থেকে, পৃথিবীর আর কোনো কিছু নয়, শুধুই ভয় থেকে।”

“আশ্চর্যই বটে!” এতক্ষণ চুপ করে থেকে মেয়েটি বলল।

এ-কথায় আবার আর্কুলারিস মেয়েটার দিকে আকৃষ্ট হল। মেয়েটা মুখ নামিয়ে কিছু ভাবছে। পুরোনো কাঁটাটা খচখচ করতে লাগল আর্কুলারিসের মনে। আবার ভাবতে বসল, মেয়েটা কার কথা মনে পড়াচ্ছে বার বার? এ কি সেই হাসপাতালের মেয়েটা? নাহ্! ওরা দুজনেই অন্য কারো ছবি টেনে আনছে সামনে। তার জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েছিল এমন একজন। এ-রকমই সুন্দরী আর স্নেহময়ী। এতদূর ভেবেই চিন্তার জটে আটকে গেল আর্কুলারিস।

রাতের খাওয়া শেষ হলে, উঠে পড়ল সবাই। জাহাজের অর্কেস্ট্রার একটা ঢেউ খেলানো সুর আর্কুলারিসকে আবার কেমন যেন একা করে দিল। একটু মদ্যপান করলে হয় ভেবে টলমল পায়ে সে এগিয়ে গেল জাহাজের বারের দিকে।

বারটা বড়ো ঘিঞ্জি। ঢুকতেই একটা গুমোট ভাব চেপে বসল আর্কুলারিসের শরীরে। এখানে জাহাজের ইঞ্জিনের গোঁ গোঁ শব্দ বেশ তীব্র। সেই শব্দের প্রতিটা অভিঘাত আর্কুলারিসের ব্যথার কম্পাঙ্কের সঙ্গে অনুনাদ হয়ে আছড়ে পড়ছে যেন। এখানে আর থাকা চলবে না।

কোন রকমে টালমাটাল পায়ে আবার তার ছোট্ট সাদা ঘরটায় এসে হাজির হল আর্কুলারিস। প্রথমেই চাইল ঘুলঘুলিটার দিকে। নিশ্চিন্ত হল সেটার ঢাকনাটা বন্ধই আছে। তা সত্বেও কী ভীষণ ঠান্ডা এখানে।

ঘুলঘুলিটাই দেখছিল আর্কুলারিস। নীল আর সাদা রঙের দুটো রিবন সেখান থেকে দুলছে। নীল আর সাদা রঙের রিবন! কী যেন একটা মানে আছে ওগুলোর। আর্কুলারিস হাতড়াতে থাকে।

সমুদ্র এখন একদম শান্ত। জাহাজের মৃদু দুলুনির সঙ্গে তাল রেখে কাচের গ্লাস আর বোতল থেকে টুংটাং শব্দ উঠছে। এই সবকিছু বড়ো বিরামহীন! যেন চলেই আসছে। আর্কুলারিসের মনে হল এই শব্দ বড়ো পরিচিত, যেমন বড়ো পরিচিত নীল সাদা রিবনের এই দোল খাওয়া। যেন আগে... অনেক আগে সে এদের কোথাও এইভাবেই দুলতে দেখেছে। কিন্তু কোথায়? সেদিনও কি পাশে কেউ ছিল না?

গলার টাই আলগা করতে করতে আয়নায় নিজের মুখখানা একবার দেখল আর্কুলারিস। ব্যথাটা আবার জ্বালানো শুরু করেছে। থেকে থেকেই পাঁজরের পাশে খিমচে ধরছিল আর্কুলারিস। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে একটাই অস্বস্তি কুরে কুরে খাচ্ছিল। কোথায় সে দেখল এত জীবন্ত ছবি? নাহ্, যদিও পোর্টসমাউথে তার ছেলেবেলা কেটেছে, সেখানে নয়, সালেমে তো নয়ই; এমনকী ইসির বাড়ির কোলঘেঁষে যে বিস্তীর্ণ গোলাপের বাগান... সেখানেও নয়! তবে... তবে কি কেম্ব্রিজের স্কুলের ঘরে? ধুস্...।

সে একেবারে অন্যরকম। যেমন অদ্ভুত, তেমনি প্রিয়জনের মতো মহামূল্যবান। সেই চাইনিস চেকার খেলা; লাল,নীল, হলুদ, সবুজ – কত ঘুঁটি টপকে টপকে যাওয়া। রবিবারে ছুটির দিনে ছবির মতো অরণ্যে ভ্রমণ। কে যেন থাকত সঙ্গে, আর তার ভালমন্দের খবর রাখতো! কত মজার মজার ছবির কার্ড যে জমিয়েছিল! সেই ভালো লাগার বোধ কোন সুদূর অতীত থেকে এসে তাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায়, কোথায়, কোথায়...

ভাবতে ভাবতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল আর্কুলারিস।

সমুদ্রের একটা মজা আছে। সময়ের ধারণা একেবারে যেন গুলিয়ে যায়। প্রতিটি সময়ের কোন আলাদা অস্তিত্ব থাকে না। চারপাশে ধু ধু সমুদ্রও যেন একই রকম। সকালে আর বিকেলে কোন পার্থক্য নেই। কে জানে আজ মঙ্গল না বুধবার? একেকসময় জাহাজকেও মনে হয় অনন্ত সমুদ্রের মাঝে স্থির দাঁড়িয়ে। কোনো রেফারেন্স ফ্রেম নেই কোথাও।

ডেকের ওপাশে সিগারেট খাওয়ার ঘরের একটা বিশেষ কোনা আর্কুলারিসের বড়ো পছন্দের; সেখানে বসেই দেখতে পেল যাজকমশাই মন দিয়ে সেই মেয়েটা অর্থাৎ মিস ডিনকে দাবাখেলা শেখাচ্ছেন। যাত্রীরা ডেকের উপরে পায়চারি করতে করতে হাওয়া লাগাচ্ছে গায়ে। বিশ্রামেও এক অদ্ভুত শৃঙ্খলা। লাল জামা গেল তো তার পেছন পেছন কালো টুপি সাদা জ্যাকেট, তারপরে বেগুনি মাফলার আর হন্তদন্ত হয়ে মনোকল পরা কালো দাড়ি। খানিক বাদেই আবার লাল জামা, আবার কালো টুপি, যেন চেনের মতো আসা বেগুনি মাফলার, এবং কালো দাড়ি-মনোকল। আবার... আবার...

এদের এই চলাচল এতই সুনির্দিষ্ট যে একবার চোখ বুঁজে একশ গুনেই বলে দেওয়া যায় যে এরপরে কে আসবে।

গ্রহ-তারার যেমন কক্ষপথ নির্দিষ্ট, তেমনি এই লোকগুলোরও। একচুলও এদিক ওদিক হচ্ছে না। ব্যাপারটা বড়ো বেয়ারা মনে হয় আর্কুলারিসের। কিভাবে মেনে নেবে যে দুনিয়ার সমস্ত চলমানতাই পর্যাবৃত্ত। আর সেটাই নাকি ঈশ্বরের অভিপ্রায়।

তাই যদি হয়, এটা তো ঈশ্বরের গুন্ডামিই বলা যায়। না না, এই বার বার একইভাবে চক্কর খাওয়াটা কারোর পক্ষে সুখকর হতে পারে না।

লাল টুপি, কালো দাড়িরা ততক্ষণে তাদের চল্লিশ নম্বর পাক মারতে চলেছে। বোগাস! আর্কুলারিস চোখ বন্ধ করল। ওদিকে সেই যাজক প্রাণপনে ঘোড়ার চাল রপ্ত করাচ্ছে মিস ডিনকে – এক-দুই-আড়াই। সোজা দু-ঘর গিয়ে পাশে একঘর ।

এক-দুই-আড়াই। মেয়েটিও বার বার ঘোড়ার কান ধরে দাবার বোর্ডের উপর দিয়ে চালিয়ে আবৃত্তি করছে এক-দুই-আড়াই। এখানেও ছিটেফোঁটা অন্যদিকে নড়ার উপায় নেই। সেই বাঁধা গৎ, বাঁধা ছক! অসীমও এখানে এসে বাঁধা পড়েছে একতারে। যুক্তির সমস্ত ডালপালা যেন ধেয়ে এসে থমকে যাচ্ছে এক অন্তিম পথ-নির্দেশক স্তম্ভে, যাকে পার হলে আর কিছুই নেই, শুধু বাকি থাকবে এক উজ্জ্বল নীল আলোর ঝলক... মৃত্যু...

কক্ষপথ মানে তো সেই পথ, দূরান্তের গ্রহ-নক্ষত্র যে পথ ধরে নিরন্তর পাক খাচ্ছে অনন্তকাল থেকে। কিন্তু জীবন? জীবনও যে সেই কঠিন কক্ষপথের বাইরে নয়। যত ভাবছে আর্কুলারিস ততই সবকিছু আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। কে জানে? সমুদ্রে ঘুরলে বোধহয় এমনটিই হয়!

নাহ্, এইসব আজগুবি ধারণা থেকে বাঁচতে হবে। উঠে পড়ল আর্কুলারিস, হাঁটতে হাঁটতে এসে গেল রাইটিং রুমে। সেখানে একজায়গায় ডাঁই করে রাখা ছিল কিছু পুরোনো ম্যাগাজিন। তার একটা পাতা উল্টোতেই পরপর রঙিন ছবি – রঙিন আর সহজ। গাছপালায় ভরা সুন্দর সবুজ দ্বীপ, অথবা বাদামি রঙের উঁচু উঁচু পাহাড়। ওই তো সাম্পানে চড়ে কারা যেন পাড়ি দিচ্ছে সুনীল সাগর। কোনোটাই যেন বাস্তব নয়, অন্যরকম, ঠিক যেন স্বপ্নের মতো। হাতের নাগালে নেই, অথচ ভাল লাগছে। ধরো, তুমি স্বপ্নের মধ্য দিয়ে হাঁটছ, যেখানে তোমার চিরচেনা বাড়ির চেহারাটাই অন্যরকম। অথচ তুমি স্থির জানো, ও বাড়ি তোমারই।

ম্যাগাজিন পড়তে পড়তে আর্কুলারিস টের পেল কোথা থেকে প্রচুর ক্লান্তি এসে তার মনঃসংযোগে চিড় ধরাচ্ছে। কে জানে হয়ত এ-ও স্বপ্ন – নাকি সেই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এদিক ওদিক বিচরণ করছে।

আর্কুলারিস ভেবেই রেখেছিল মিস ডিনকে এসব কথা বলবে। কাউকে বলতেই হবে তার অনুভূতিটা কেমন। সন্ধেবেলায় জাহাজের ডেকে বসে মিস ডিনকে তাই বলছিল। অন্ধকারে দিগন্ত দেখা যায় না। নিকষকালো সমুদ্রের বুক চিরে আসা সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপুনি ধরছিল তার।

মিস ডিন মন দিয়ে শুনছিল আর্কুলারিসের কথা। আর্কুলারিস তাকে যত দেখছিল তত অবাক হচ্ছিল। মেয়েটির বিস্ময়মাখা চাহনি যেন আর্কুলারিসকে

প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দিচ্ছিল সেই দৃষ্টিতে কতটা স্নেহ, কতটা মমতা রয়েছে।

দুজনেই নির্বাক বসেছিল দীর্ঘ সময়। কথা নেই, কিন্তু আর্কুলারিস টের পেল অনেক কথাই বলা হয়ে যাচ্ছে নিশ্চুপে। অনেক অব্যক্ত গোপন কথা শুধু চোখে চোখে বিনিময় হয়ে চলেছে। কে জানে হয়ত ঘন্টা দু-তিন কেটে গেছে এভাবে।

সত্যিই কি কথা বলা জরুরি?

মিস ডিন হাসল।

“মজার ব্যাপারটা হল, গত রাতের আগে আমি খুব একটা স্বপ্ন দেখিনি। কিন্তু স্বপ্নে আমি ভয় পেলাম!”

“কী স্বপ্ন দেখলেন?”

আর্কুলারিস মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে বলল, “আমি যেন হাঁটছিলাম... একদম একা। চারিদিকে ফাঁকা মাঠ বরফে ঢেকে গেছে। তখনি যেন ঝাঁপিয়ে নামল অন্ধকার। প্রচন্ড ঠান্ডায় আমার হাত-পা জমে যাচ্ছিল। বুঝতে পারলাম পথ হারিয়েছি। এই যখন অবস্থা ঠিক তখনি সামনে একটা ফলক দেখতে পেলাম। রাস্তা চেনানোর সেই ফলক দেখে মনে হল বরফ ছাড়া আর কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু চারপাশ একেবারে কালো হওয়ার আগের মুহূর্তে দেখতে পেলাম একটা শব্দ ফুটে উঠেছে – পোলারিস।”

“হ্যাঁ, ধ্রুবতারা।”

“হ্যাঁ, ধ্রুবতারা! ধ্রুবতারা আমাকে পথ দেখাবে? আজ সকালের আগে আমিও তো তা... আগেও কি কখনো... কে জানে? কিন্তু আমার নামের সঙ্গে পোলারিস ছন্দে মেলে বল!”

মিস ডিন ঘাড় হেলাল, “তা মেলে।”

“যাই হোক, স্বপ্নে একটা বিশ্রী হতাশা যখন আমায় চেপে ধরেছে, ঠিক তখনই ছবিটা পাল্টে গেল। আমি আর একটা স্বপ্নে ঢুকে গেলাম।”

মিস ডিন একদৃষ্টে চেয়েছিল আর্কুলারিসের মুখের দিকে। আর্কুলারিস খেয়াল করল না। সে যেন মোহাবিষ্ট। বলে চলল, “সে সময় আমি জাহাজে আমার ঘরের বন্ধ দরজার সামনের অন্ধকার সরু করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। করিডোরটা যেন এক কানা গলি। কোথাও যাওয়ার পথ নেই। আমি পাগলের মতো ঘরে ঢোকার জন্যে দরজার হাতলটা খুঁজছিলাম। তখনই আবার টের পেলাম আমার শরীরটা একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে। তুমি ভাবতে পারবে না কত ঠান্ডা। আমার পরনে নিছক একটা পাজামা। ঠান্ডা যেন আমায় গিলে নিচ্ছে! ঠিক

এইসময়ে ঘুমটা ভেঙে গেল।”

“আশ্চর্য! আবার ঠান্ডা!”

“হ্যাঁ, কিন্তু আসলে আমি কোথায় ছিলাম বলতো? এতো ঠান্ডা কোথায় হতে পারে? আমি কিন্তু সেখানে গিয়েছিলাম। আমি নিশ্চিত, ঠান্ডার ওই তীব্র অনুভূতি আমি আগেও কোথাও পেয়েছি। এত স্পষ্ট, এত চেনা, যেন আমি দেখেছি খুব নিবিড়ভাবে! কিন্তু আমি জানি, বাস্তব মনে হলেও আমি ও-রকম জায়গায় কস্মিনকালেও যাইনি।”

আর্কুলারিস এবার আর সহজভাবে হাসতে পারল না, “আমরা তো এতকিছু

শিখেছি, কিন্তু আমাদের মন, আমাদের আত্মা সম্পর্কে আমরা এত কম জানি যে...”

“আসলে এক বিন্দুও জানি না।” আস্তে আস্তে বলল মিস ডিন।

এরপর অনেকক্ষণ আর কোনো কথা নেই। সেই পুনরাবৃত্তি, পরস্পরের দিকে চেয়ে নিরন্তর, গোপন কোন না-বলা-বাণীর বিনিময়।

কত সময় যে এভাবে কাটল! নাকি স্থির হয়ে গেছে সময় এখানে? সেই কক্ষপথের ধারণাটা এবারে আর্কুলারিসের মনে আরো উজ্জ্বল, আরো খাঁটি এবং আরো অবশ্যম্ভাবী মনে হল। কিন্তু কার সঙ্গে এই ভাব বিনিময়? কে এই মিস ডিন? কার সঙ্গে এর অদ্ভূত মিল যার কথা আর্কুলারিস কিছুতেই মনে করতে পারছে না। কোনো সুদূর অতীতের সঙ্গে একসূত্রে বাঁধা পড়ে গেছে মেয়েটি। ঠিক যেমনটা মনে হয়েছিল ছবির সেই বাদামি পাহাড়, দ্বীপ, হাসপাতালের সেই মেয়েটা অথবা অমোঘ নির্দেশকারক – সব যেন এইমাত্র ছিল! কিন্তু কী সেই অজানা গ্রন্থি যেখানে সব কিছু বার বার সমান হয়ে মিলে যাচ্ছে।

লাউঞ্জের একধারের ব্যালকনিতে তখন জাহাজের অর্কেস্ট্রার দল একনাগাড়ে ক্যাভেলিয়ারা রাস্টিকানার অন্তিম সুর বাজিয়ে চলেছে।

লাউঞ্জে এসে আর্কুলারিস দিশেহারা হয়ে পড়ল।

“হে ভগবান! যেখানেই যাই, এই কাঁদুনে সুরটা কি আমার পিছন ছাড়বে না!”

“কেন এটা আপনার ভাল লাগে না?”

“লাগে না, এটা আমাকে ভুল রাস্তায় ঠেলে পাঠিয়ে দেয় মাঝে মাঝে।”

“মানে?”

“মানে আর কী! হাসপাতালে প্রথম শুনেছিলাম গানটা... তবে কখন সেটা মনে নেই। এটুকু বলতে পারি, শুনলেই মনে হয় গানটা কাঁদছে, নাকি আমিই কাঁদছি? আসলে আর পাঁচজনের মতই আমি আমার অনুভূতিগুলোকে সমঝে চলি।”

“কেন সেগুলো বিপজ্জনক বুঝি?”

“এই যে মেয়ে, তুমি আমাকে বেশ বেকায়দায় ফেলতে চাইছ দেখছি।”

ইতিমধ্যে স্টুয়ার্ড এসে বিছিয়ে দিয়ে গেছে কার্পেট। জাহাজের বাকি যাত্রীরা নাচের জন্য তৈরি হল। জাহাজের একজন তরুণ অফিসার ক্ল্যারিসকে ডাকল ওর সঙ্গে নাচবে বলে।

ক্ল্যারিস নাচছে। ঘুরে ঘুরে, অফিসারের কাঁধে হাত রেখে।

আর্কুলারিস-এর সহ্য হচ্ছিল না একদম।

ফালতু! একেবারে ফালতু! আবেগে ভেসে ক্ল্যারিসকে ওই শেষ কথাগুলো না বললেও চলত।

কী আশ্চর্য! সে কি মেয়েটার প্রেমে পড়ল নাকি? তাও আবার একটা হাঁটুর বয়সী মেয়ের প্রেমে!

খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে ধ্রুবতারা দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে মনটা একটু শান্ত হল আর্কুলারিসের। হ্যাঁ, ওই তো আমার পুরোনো বন্ধু! আমার চিরকালের পথ প্রদর্শক। ওই পোলারিস, কালের বৃত্তে ঘুরতে ঘুরতে কখন যেন তার কাছাকাছি হাজির হয়েছিল সে।

আস্তে আস্তে নিঃশব্দে উঠে পড়ল আর্কুলারিস। শোয়া দরকার এবার। শুতেই জাহাজের ইঞ্জিনের তীব্র শব্দে তার মাথা ঝনঝন করে উঠল। ওহ্ এই এক যন্ত্রণা, একটু শান্তি কোথাও নেই। শব্দটা, যেন একটা ধুলোর ঝড়ের মতো ক্রমশ উত্তাল হতে হতে এক ধাক্কায় আর্কুলারিসকে নিয়ে ফেলল মহাশূন্যে। তাহলেও শব্দটার হাত থেকে রেহাই নেই। শব্দটা যেন তাকে চেনে। আর গন্ধ শুঁকে শুঁকে তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছে স্বর্গের কুকুরের মতো। বাইবেলের এমন একটা ছবি সহসা ভেসে উঠল আর্কুলারিসের চোখের সামনে। সামনে সেই অনন্ত অজানা, সেইখানে ঈশ্বর বোধহয় তার কাজের হিসাব নেবেন! দুরন্ত বেগে আর্কুলারিস আকাশগঙ্গা পেরিয়ে গেল। কত দূরে কালপুরুষ দাঁড়িয়ে আছে তার ধনুক হাতে। তার ডানকাঁধের তারাটাকে ছুঁয়েই আর্কুলারিস এখনি ফিরবে তার নিজের বাড়িতে।

নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রান্তরে যেতে যেতে আর্কুলারিস টের পেল তার সমস্ত শরীরটা বরফ হয়ে গেছে। তার হাত, পা, আঙুল থেকে বরফের লাঠি ঝুলছে...কঠিন বরফ... কতদিনের পুরোনো কে জানে! টুংটাং শব্দ উঠছে সেই ঝোলা বরফ থেকে।

আচমকা আর্কুলারিস দেখল সে এক অজানা, অদেখা সীমাহীন অন্ধকারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার সমস্ত জ্ঞানের অগম্য, চেনাপরিচিত সব কিছুর বাইরে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই অদেখা আঁধার।

তাহলেও সেই আঁধারের দূরতম প্রান্তে ওই যে ঝলমল করছে ওটা কী! আর্কুলারিস বুঝতে পারল, ওইখানেই তাকে যেতে হবে তার আপন ঘরে, অন্তিম আশ্রয়ে।

এদিকে ঠান্ডা ক্রমে অসহ্য হয়ে উঠছে। সে যে খালি-পা। বরফের কুচি তার গায়ে ঠিকরে পড়ে ছিটকে যাচ্ছে দূরে।

এখনও কিন্তু চলা শেষ হয়নি আর্কুলারিসের। আরো দূরে তাকে যেতে হবে... ওই চির অচেনা

অন্ধকারের পথে। ভয় পাচ্ছ আর্কুলারিস, ভয় পাচ্ছ তুমি? তুমি না একজন সাহসী অভিযাত্রী! তুমি না সেই প্রবীন অধ্যাপক! এক হাতে বই আরেক হাতে ছাতা দেখেই যাকে চেনা যায়! দৃঢ় মুষ্টিতে চেপে ধর তোমার ছাতা। বল, এবারে ঝাঁপ দিতে সাহস পাচ্ছ না?

আর্কুলারিসের মনে হল আরো একটু সময় চাই, তাহলেই বৃত্ত সম্পূর্ণ হবে। বিরামহীন আওয়াজটা যদি না থাকত শুধু! এটা যে তাকে পাক খাওয়াতে খাওয়াতে কোন দুর্বিপাকের কেন্দ্রে নিয়ে যাবে কে জানে!

তখনই মনে হল সে হারিয়ে গেল আবার। পাগলের মতো অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে একটা ঠান্ডা, পেছল কাঠের দেওয়ালের স্পর্শ পেল আর্কুলারিস। মনে হয়, এটা তার ট্রানজিট, এবারে স্যুইচবোর্ড খুঁজে আলো জ্বালতে হবে।

কম্পন আর আওয়াজ যেন এখন পায়ের তলায়। মনে হয় উৎসটা জাহাজের ইঞ্জিন।

একটু হতাশ লাগছিল, সে তো প্রায় নিজের বাড়িতেই এসে যাচ্ছিল। শুধু আরেকটা পাক বাকি, আরেকটা দরজা খোলা বাকি। তারপর আশ্রয়, নিরাপদ আশ্রয় – পিতার ভবনে।

ঠিক তখনই ঘুম ভাঙল আর্কুলারিসের। দেখল ডাইনিং সেলুন থেকে তার ছোট্ট ঘরের দরজা পর্যন্ত আসা নাতিদীর্ঘ আধো অন্ধকার সুঁড়িপথটায় সে একলা দাঁড়িয়ে আছে। এখন রাত। একটা জনপ্রাণী নেই কোথাও। ভাগ্যিস নেই। নাহলে তাকে এই পাজামা পরা রিক্ত অবস্থায় কেউ না কেউ দেখেই ফেলত।

ঘরের দরজা এখান থেকে পঞ্চাশ পা হবে। সে ডাইনিং সেলুনের দিকে এ অবস্থায় কী করছিল তাহলে?

এইবার তার সত্যিই ভয় লাগছে। গায়ে কাঁটা দিল। দম আটকে এল এমনভাবে যেন হৃৎপিন্ডের লাব-ডুব বন্ধ হয়ে যাবে। সে ঘরের দিকে মুখ ফেরাল। ডাইনিং সেলুনের দিকে পিছন ঘুরল আর্কুলারিস, তাকে কেউ দেখলে ভাববে এই মাত্র সে সেখান থেকে এল। কাঁপতে কাঁপতে টলমল পায়ে পাশের বরফ শীতল পিচ্ছিল রেলিং ধরে ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল সে।

হঠাৎ ভীষণ দুর্বল বোধ করল আর্কুলারিস। অসীম ক্লান্তি যেন তার চোখের উপর জুড়ে বসেছে। আবার এলোমেলো হয়ে গেল সমম্ত ভাবনা চিন্তা। কী যেন ভাবছিল সে! একবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠল হাসপাতালের সেই তিল-নন্দিত সুন্দরী। তারপর মিস ডিন অথবা ক্ল্যারিস। যেন এরা আলাদা কোন সত্ত্বা নয়, এক এবং অদ্বিতীয়া। কিন্তু সেই মেয়েটা এল কোথা থেকে, সে তো আর হাসপাতালে নেই! সে নিশ্চয়ই জাহাজে। এই তো এখনো সে জাহাজের করিডোরেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কী করে সে একইভাবে পূর্ব নির্দিষ্ট কক্ষে পাক খাচ্ছে? কারা যেন গুনগুন করছে, ওঠো অধ্যাপক, আর একটা পাক ঘুরে নাও, ছাতাটা শক্ত করে ধরো!

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই, ঘেমে উঠল শরীর... ঘাম এত ঠান্ডা হয়! কোনোরকমে কাঁপতে কাঁপতে বাঙ্কে শুতে যেতেই, বাইরে রাতের পাহারাদারের আওয়াজ শুনতে পেল।

আবার স্বপ্নটা তার কাছে বিকারের মতো ফিরে এল। চোখ খুলতেও ভয় হচ্ছে। সত্যিই তো, এতক্ষণ তাহলে সে ছিল কোথায়! কষ্টের অনুভূতিটা এখনও পুরোনো ক্ষতের মতো টনটন করছে। কোথায় ছিল সে?

তাহলে কি এটাই শেষের পথ?

তারপরেই মনে হল এটা নেহাতই স্বপ্ন, এত চিন্তার কিছু নেই।

“সত্যিই এত চিন্তার কিছু নেই,” দিনের বেলায় জাহাজের ডাক্তার আর্কুলারিসের অসুস্থতা নিয়ে এতটাই নিশ্চিন্ত, সে বলল, “নাহ, চিন্তার কোন কারণ দেখছি না।

আর্কুলারিস ম্লান হাসল, “ডাক্তারবাবু, সেটা আপনার ধারণা হতে পারে, কিন্তু একই জিনিস আমি বার বার দেখছি –”

“দেখুন, ভয় থেকে এমনটা হতেই পারে। কিন্তু ভয়টা কিসের, কিসের এত অনিশ্চয়তা? আমাকে বলুন, প্লিজ...”

ভয়! আর্কুলারিস কপাল কোঁচকাল, সবই যখন শেষ হয়ে গেল, তখন আর ভয়! মুখে বলল, “না না, ডাক্তার, তেমন কিছুই বলার নেই।”

ডাক্তার হাঁ করে আর্কুলারিসকে খানিকক্ষণ দেখল, তারপর মুখে একটা চুকচুক শব্দ তুলে বলল, “আশ্চর্য!”

আর্কুলারিস হাসল, “আশ্চর্য তো আমারই হওয়ার কথা ডাক্তার। বেড়াতে এলাম সমুদ্রে, বুক ভরে শ্বাস নিতে। সেখানে পদে পদে দুঃস্বপ্ন। ডাক্তারবাবু, আমাকে একটু ঘুমের ওষুধ দিতে পারেন?”

ঘরে এসে ঘুমের ওষুধ খেল আর্কুলারিস। ঘুলঘুলি দিয়ে সূর্য দেখা যাচ্ছে। সূর্যের এখন উত্তরায়ণ। কিন্তু কেমন যেন ঘোলাটে। তবুও প্রতিমুহূর্তে অবস্থান বদলাচ্ছে, একমুহূর্ত বাদেই সরে যাবে ঘুলঘুলির দৃশ্যমানতার বাইরে। তবু এটাই যেন একমাত্র স্বাভাবিক, এই সূর্য – এই সবকিছুর মধ্যে ।

ডাক্তারের কথা মনে হল আর্কুলারিসের। মনে মনে হাসল। হিসেবমতো সব ডাক্তারই সমান। যেমন ছিল তার ডাক্তার-বাবা, কিম্বা হাসপাতালের ওই ডাক্তার – স্মিথ না কী যেন নাম ছিল যেন? সে আবার কবিতাও লিখত রাতের পর রাত জেগে। তার ব্যাপারে হতাশ হয়েছিল বেচারা।

পরে অবশ্য যাজককেও বলেছিল বিষয়টাতে দুশ্চিন্তার কোনো স্থানই নেই।

যাজক সহমত হলে আর্কুলারিস বলল, “তবু আমি ভয় পাচ্ছি।” যাজক মৃদু হাসল, বলল, “মিস্টার আর্কুলারিস, এটা এতটাই অনিবার্য যে ভয় পাওয়াটাই হাস্যকর।”

অনিবার্য! যাজকের কথায় শিহরণ বয়ে গেল আর্কুলারিসের শরীরে। এই হিমশীতল শিহরণ তো আগে কখনো হয়নি, নাকি হয়েছে? কে জানে!

মনে হচ্ছে, হিমাঙ্কের অনেক নীচে থাকা একটা হিমশৈল যেন কাছাকাছি এসে পড়েছে। কিম্বা দিক ভুল হওয়ার মতো ঘন ঠান্ডা কুয়াশা। এইবার থেকে থেকেই জাহাজে মৃত্যুঘন্টা বাজবে, আর্কুলারিস যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। যাজক অবশ্য তার নিজের পথেই হাঁটল। বলল, এমনটা হতে পারে কোনো একটা অপরাধের বোধ থেকে, এমন অপরাধ, যা কোনোদিন প্রকাশ করেননি। আমি অবশ্য আপনাকে সে-সব খোলসা করে বলতে চাপ দিচ্ছি না। তবু যদি বলেন...।

সূর্য ডুবছে। আকাশ জোড়া ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের গায়ে গোলাপি রঙ। আর্কুলারিস আর মিস ডিন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেই রঙের খেলা দেখছিল।

চারপাশ এত সুন্দর, এত মোহময়। এর মধ্যে এমন কী আছে, যাকে ভয় পাওয়া চলে? স্মিত হাসল মিস ডিন। ওকে এখন অতি রমণীয় মনে হচ্ছে।

“মনে হচ্ছে কিছুই নেই।” উদাস স্বরে বলল আর্কুলারিস।

“তাহলে আর ভয় পেও না। আমরা কেউ এখন আর ছোটো ছেলেমেয়ে নই যে কথায় কথায় ভয় পাবো।

“আমরা! তুমি বলছ!”

মিস ডিন এ-কথার কোন জবাব না দিয়ে ডেকের রেলিঙে একটু ঝুঁকে পড়ল। এদিকে জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়া সাদা সাদা ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ দেখতে লাগল। এই সমুদ্রই দিগন্তে কেমন শান্ত আর লাল হয়ে উঠছে ক্রমশ। আর্কুলারিসের চোখ অন্যমনস্কভাবে দিগন্তে হিমশৈলের সন্ধান করছিল।

এর পরে অনেকক্ষণ দুজনে চুপচাপ।

নীরবতা ভেঙে আর্কুলারিস বলল, “ঘুরে ফিরে আমার মনে এক শীতলতার অনুভূতি আসছে কেন জানি না...”

মিস ডিন বিস্মিত হয়ে তাকালে আবার বলল, “হ্যাঁ, ভীষণ ঠান্ডা, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না সে কেমন!”

“কিন্তু তোমার চেহারায় তো তার তেমন ছাপ পড়েনি?”

“ছাপ পড়েনি বলছ? তাহলে আমার হাতদুটো ছুঁয়ে দেখ।”

মিস ডিন চমকে উঠল, “আশ্চর্য! এ যে প্রায় বরফ! এত ঠান্ডা হল কী করে?”

আর্কুলারিস হাসল, “আশ্চর্যের কিছু নেই বন্ধু। আমি যে এইমাত্র ওই পোলারিসের পাশ দিয়ে

ঘুরে এলাম! অমন হিমশীতল পথ, ঠান্ডা তো হবেই!”

মিস ডিনকে দেখে মনে হল অবিশ্বাস তো করেইনি বরং কথাটা তাকে ভাবাচ্ছে।

আর্কুলারিস আচমকা ওর দিকে নিজের হাতদুটো বাড়িয়ে ক্লান্ত গলায় বলল, “উত্তাপ দাও আমায়...”

মিস ডিনের বুঝি একটু আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিল, বলল, “আমি! আমি পারব?”

“নিশ্চয়ই পারবে।”

মিস ডিন তখন নিজের দুই তালুর মধ্যে আর্কুলারিসের শীতল হাত প্রাণপনে ঘষতে শুরু করল।

ডেক শুনশান। যাত্রীরা রাতের খাওয়ার প্রস্তুতি নিতে গেছে। একটা দুটো তারা ফুটে উঠছে আকাশে। সন্ধ্যার লালাভ ভাব সরে গিয়ে ধীরে ধীরে নিকষ কালো হয়ে উঠছে সমুদ্রের জল। ঠান্ডা হাওয়া বইছে মৃদু গতিতে।

আর্কুলারিসের স্বর গাঢ় হয়ে উঠল, বলল, “আমার মনে হয়, এবারে আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি।”

“তাই? চিনতে যখন পেরেছ, তুমি কে তাহলে বল?”

“আমি তো আমার আমি।“

“তাহলে আমি নিশ্চয়ই তুমি।” স্মিত হাসল মিস ডিন।

নৈশভোজের বিউগল বেজে উঠতেই, দুজনে একান্ত নিভৃতে প্রায়ান্ধকার ধরে ডাইনিং সেলুনের দিকে হাঁটতে লাগল।

কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই কান ফেটে গেল ইঞ্জিনের গর্জনে। সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে বাড়তে লাগল ব্যথাটা। হাত দিয়ে চাপ দিয়ে কিছুটা আরাম পেতে চাইল আর্কুলারিস। শীতল স্রোত ঝাঁপিয়ে পড়ছে শরীর জুড়ে। হে ভগবান! রোজই মনে হয়, কাল এর শেষ হবে। কিন্তু কাল, কাল আর কাল। কতদিন যে এমন চলবে কে জানে?

আর্কুলারিস আবার নিজের থেকে ছিটকে গেল। জাহাজটা যেন এক কুয়াশার সমুদ্রে আটকা পড়েছে। দম আটকানোর মতো ঘন কুয়াশা প্রতিনিয়ত ঘিরে রাখছে জাহাজটাকে। হারিয়ে গেছে সূর্য। কখন যে দিন থেকে রাত – আর রাত কেটে ভোর – বোঝা যায় না।

জাহাজের চারপাশে লুকিয়ে থাকা বরফের প্রচীর। আর্কুলারিসের ভয়ানক শীত করছিল। জাহাজের নাবিকগুলোও তেমনি, মাসটা জুন – অর্থাৎ নামেই গ্রীষ্মের মাস বলে হাওয়া গরম করবার যন্ত্রগুলোকেও শিকেয় তুলেছে এরা। যে কারণে দিনের বেলাতেও আর্কুলারিস শরীরে মোটা মোটা দুটো কোট চড়িয়েও স্মোকিং রুমের এককোণায় বসে কাঁপতে থাকে। দাঁতের খটখটানি শুনতে পায় সে, হাতদুটো প্রবল শীতে রক্তশূন্য যেন। আর রাতের বেলা তো ভয়ঙ্কর। রাজ্যের কম্বল বিছানায় এসে ওঠে তখন। ঘুলঘুলি বন্ধ করে চারপাশে হলুদ রঙের পর্দা টেনে পড়ে থাকে। নিস্তার নেই তাতেও। ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে সন্তর্পণে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে আসে কুয়াশা। তার বরফের আঙুল দিয়ে টিপে ধরে আর্কুলারিসের গলা।

মরা মানুষ স্টুয়ার্ড বলল, “মনে হয় আশেপাশে হিমশৈল আছে।”

আরে গাধা, সে তো একটা বাচ্চাও বলতে পারবে। কিন্তু কতদিন এই প্রাণঘাতী ঠান্ডার যন্ত্রণাটা চলবে সেটা বল দেখি! মনে হচ্ছে, ইংল্যান্ড যেতে এরা গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ডও ঘুরে নিচ্ছে।

তবে মিস ডিন উর্ফ ক্ল্যারিস ওর প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল। বলল, “দেখুন, একটা বড়োসড়ো অপারেশন হয়েছে আপনার। একটা সুস্থ লোক যতটা ধকল নিতে পারে আপনার পক্ষে ততটা না পারাটাই তো স্বাভাবিক।” তারপর একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করল, “আপনার ওই অপারেশনটা ঠিক কতদিন আগে হয়েছিল বলুন তো?”

আর্কুলারিস একটু থমকে গেল, “অপারেশন? না, ঠিক কবে যে হয়েছিল মনে পড়ছে না কিছুতেই! হয়ত হাজার বছর আগে, যখন আমি জলের বুকে এক অসহায় ব্যাঙাচি আর তুমি বিশাল মাছ! অথবা তারও আগে টিটোবার্গ জঙ্গলে যুদ্ধের সময়! হয়ত সেই আদিম নিয়েনডারথ্যালদের সময়! কে জানে –”

“ভেবে দেখুন দেখি, তার চেয়েও আগে হয়ত!”

ক্ল্যারিসের কথাটা ঠিক বোধগম্য হলনা আর্কুলারিসের। বলল, “আরো আগে কী করে হবে? এই জাহাজেই তো কবে থেকে ভেসে চলেছি আমরা। হয়ত বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, কিম্বা আরো কত অগণিত সংখ্যাতীত সময়!”

“মনে কর, কতবার এই জাহাজ থেকেই আমার নৈশ অভিযান সেরে ফেলেছি তারার জগতে, তারপর ফিরেও এসেছি। আমাকে কিন্তু আরো দূরে যেতে হবে। আরো অনেক দূরে, সপ্তর্ষিমন্ডলের সীমানা ছাড়িয়ে আরো দূরে, যেখানে একটা সুন্দর ছোট্ট তারা জ্বলজ্বল করে, আমি জানি আমাদের বাঁধাধরা জীবনের শেষ সীমা ওটাই। এবারে আমি প্রমাণ হিসেবে তোমার জন্য একটা তুষারের পালক এনে দেব।

“কিন্তু এখানে আসতে আসতে তো সেটা গলে যাবে!”

“গলে যাবে, এখানে, এই জাহাজে?”

ক্ল্যারিস হাসল, বলল, “ইস্, যদি আমিও তোমার সঙ্গে যেতে পারতাম!”

“সত্যিই তুমি যেতে! সত্যি?”

আর্কুলারিস ক্ল্যারিসকে যত দেখে তত মুগ্ধ হয়। হয়ত এই ক্ল্যারিসের চেয়ে সুন্দর কাউকে

জীবনে সে কোনদিন কাছে পায়নি। এতো অনুভবী, এতো স্নেহশীলা কাউকে। এ যেন পবিত্র, নিছক বাহুবন্ধনে বেঁধে চুমু খাওয়া এর জন্য নয়। তেমন ভাবলে নিজের প্রতি ঘৃণা হয়।

তার বদলে সে অনন্তকাল ওই চোখের দিকে চেয়ে বসে থাকতে পারে। এ সেই দূরের চোখ, যারা তাকে চেনে, বোঝে – চিরকাল। মেয়েটা যেন তার আত্মারই অংশ, আলাদা কেউ নয়।

আর্কুলারিস তাকিয়েই ছিল সেই চোখের দিকে, হঠাৎ খেয়াল করল, ক্ল্যারিসের মুখে একটা অন্যরকম অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। জিজ্ঞেস করল, “কী হল তোমার?”

ক্ল্যারিস ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, “জানি না!”

“আমাকে বলো প্লিজ। বলো –”

“তেমন কিছু নয়! আসলে তোমাকে দেখতে দেখতে কেমন মনে হল, তুমি ভাল নেই। তাই...”

আর্কুলারিস এ-কথায় চমকে উঠে টান টান হল। বলল, “কী বলছ যা তা! হ্যাঁ অবশ্যই আমার ব্যথাটা আমায় থেকে থেকেই ভোগাচ্ছে, দুর্বলও লাগছে। কিন্তু...”

“সে সব নয়, আমি যেন তার চেয়েও বেশি কিছু দেখতে পেলাম! এমন কিছু, যা তোমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।” তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “কীসের এত ভয় তোমার আর্কুলারিস? আমাকে বল! সব কিছু বল।”

ক্ল্যারিস তার দুর্বল জায়গাতেই ঘা দিয়েছে। আর্কুলারিস লম্বা শ্বাস নিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। তার মধ্যে যেন আর বাধা দেওয়ার শক্তি নেই। আর্কুলারিস বুঝল, একেই বলতে হবে সবকিছু! যেন আগে থেকেই বলার কথা ছিল!

আর্কুলারিসের চোখের কোনা ভরে গেল জলে, বলল, “জানো ক্ল্যারিস, সত্যিই আমায় প্রতি মুহূর্তে খুন করছে – সে যে কী ভয়ানক – তুমি জান না।”

“আমি জানি, সব কিছু জানি, তবু নিজের মুখে...” ক্ল্যারিসের গলায় ভরসার সুর।

আর্কুলারিস গলা খাঁকারি দিল। বলল, “শোন তাহলে, এরকম অন্তত দু’বার হয়েছে। যখন আমি স্বপ্নে নিজেকে একটা তারার চারদিকে পাক মারতে দেখলাম। কত দূরে সে জানি না। কিন্তু বীভৎস ঠান্ডা সেখানে। তুমি ভাবতেও পারবে না! আর দু’বারেই এই ভয়ংকর ঠান্ডার অনুভূতি। একই রকম ঠান্ডা! তার পরেই স্বপ্নটা ভেঙে গেল।”

“তো জাগলে যখন, কোথায় ছিলে দেখলে?” ক্ল্যারিসের চোখেমুখে ঔৎসুক্য, আর্কুলারিসের মুখ ভয়ার্ত, বলল “প্রথমবারে দাঁড়িয়েছিলাম ডাইনিং সেলুনের ওধারের সেই দরজাটার হাতল ধরে, যেখান দিয়ে নেমে গেলেই রান্নাঘরে আসা যায়, একদম একা দাঁড়িয়ে ছিলাম।

“আর পরেরবার?”

ক্ল্যারিসের চোখেও জিজ্ঞাসু আশঙ্কা, “পরেরবার কোথায় ছিলে?”

দ্বিতীয়বারের কথা ভেবেই বুক কেঁপে উঠল আর্কুলারিসের। মনে হল, এইবারে সে পাগল হযে যাবে। কথা বলতে বলতে ঠোঁট কাঁপছে, তবু চোখ না খুলেই, ফিসফিস করে বলল, “নীচে, অনেক নীচে রান্নাঘর থেকে যে সিঁড়িটা রেফ্রিজারেটিং রুমের পাশ দিয়ে অনেক নীচে জাহাজের খোলের মধ্যে গুদামঘরের দিকে গেছে, সেইখানে, আমি দেখলাম আমি হামাগুড়ি দিয়ে চলেছি – ঘোর অন্ধকার চারদিকে –”

শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল ক্ল্যারিসের। তার কাছে সব এখন স্পষ্ট, দিনের মতো পরিষ্কার। প্রথম রাতে ডাইনিং থেকে প্যান্ট্রি, পরের রাতে প্যান্ট্রি থেকে গুদাম। টের পেল পাশে দাঁড়ানো আর্কুলারিস ঠকঠক করে কাঁপছে। আর্কুলারিসের কম্পিত শীতল হাতদুটো নিজের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল ক্ল্যারিস।

চোখে চোখ রেখে চেয়ে থাকতে থাকতেই, ক্ল্যারিস চাপা গলায় বলল, “কি মনে হয়, তুমি জানতে পেরেছ এর পরে কী!”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর্কুলারিস, “আমি তো জানিই, আর তুমিও জানো নিশ্চিত। দু’বারে অনেকটা এগিয়ে গেছি। তৃতীয়বারে আমি নিশ্চয়ই...সেই একটা খালি...”

আর বলতে পারল না ...। ক্ল্যারিস আর্কুলারিসের মুখে হাত রেখে জড়িয়ে ধরল, জড়িয়ে ধরে বসেই রইল। নিঃশব্দ সহমর্মিতায় ওরা বসে রইল সেই মহাবিলয়ের দোরগোড়ায়। যার পরে আর কিছুই নেই। বুকের ভেতরটা উদ্বেল হয়ে উঠল। ক্ল্যারিস আর্কুলারিসের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল, তার যাবতীয় উত্তাপ সে দিয়ে যাবে আর্কুলারিসকে, এমনকী নিজের জীবনও।

তারপরেই আচমকা যেন জেগে উঠল ক্ল্যারিস। আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, দুহাতে আর্কুলারিসের কান্নাভেজা মুখ সবেগে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, “ভুল মিস্টার, একদম ভুল, এটা কিছুতেই হতে পারে না, কিছুতেই না...”

আর্কুলারিস হাসল, বড়ো বিষণ্ণ সে হাসি, বলল, “এটা নির্ভেজাল সত্যি। কোনো ভুল নেই।“

“কিন্তু তুমি এত নিশ্চিত হলে কী করে? কী করে জানলে যে কোথাও একটা খালি...”

“তুমি কফিনের কথা বলতে চাইছ তো?”

“হ্যাঁ, কিন্তু সেটা কোথায়, জানলে কী করে?”

“আমার কি জানার আর কিছু বাকি আছে, আমি তো প্রায় সেখানেই এসে গেছি! আর একটা ট্রিপ...”

রাতের মতো যে যার নিজের ঘরে চলে যাওয়ার আগে দুজনেই বেশ খানিকটা হুইস্কি খেল।

আর্কুলারিস বলল, “এটা নিয়ে বেশি ভাবার দরকার নেই, শেষে হয়ত দেখা যাবে আমরা দুঃস্বপ্ন দেখছি। আর যদি ওটা সত্যি হয়, যে গতিতে আমি তারায় তারায় ঘুরছি, আর খান দুয়েক রাত্রি আমার চাই। সেই ছোট্ট তারা – অনেকটা দূর যেতে হবে এখনো...”

“চলো!” ওরা নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই, যাজক বলল, “এত তাড়াতাড়ি শুতে চলে যাচ্ছেন, মিস ডিন? থাকলে একটু দাবা খেলতাম...”

মিস ডিন হাসল, “হ্যাঁ, আমরা দুজনেই যাচ্ছি...”

“ঠিক আছে। গুড নাইট। কাল না হয় এক দান খেলা যাবে।”

“হ্যাঁ, গুডনাইট।”

ডেকের উপর একটু পায়চারি করতে করতে মাঝে মাঝে রেলিং-এ ঝুঁকে ওরা সমুদ্রের দিকে তাকাল। সেখানে তখন হুম হুম করছে ঘন সাদা কুয়াশা। ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। ইঞ্জিনের আওয়াজ এখানে বড়ো ম্লান, কেঁপে কেঁপে যেন সুদূর থেকে গোঙানির মতো ভেসে আসছে। হয়ত জাহাজ চলছেই না। সমুদ্রও শান্ত। ছোটো ছোটো ঢেউগুলো জাহাজের খোলের গায়ে আছড়ে পড়ে ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ তুলছে। অন্যসময় সে আওয়াজ টের পাওয়া যায় না। কিন্তু এখন সব অন্যরকম। এখন যেন সব কিছুই চিরস্থির। বাইরে আর কোন শব্দ নেই কোথাও।

গভীর সুরে আর্কুলারিস আবৃত্তি করল, “পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা! নিশীথবেলা...”

আর্কুলারিসের কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে গলা মেলাল ক্ল্যারিস।

ওদের মিলিত আবৃত্তি কেউ শুনতে পেল না, অর্থহীন গুঞ্জনের মতো সে-সব স্থির হয়ে ভেসে রইল আকাশে।

সময়ও যেন এখানে স্থির। এই জীবনে অন্তত একটা মুহূর্তের জন্যও সুখী হল ওরা।

এর পরে যে যার মতো চলে যাবে। এখন তারা একে অন্যকে হৃদয় দিয়ে জানে। প্রতিটা বিন্দু দিয়ে জানে। ক্ল্যারিস তার জীবনের সবকটা মুহূর্তের সাক্ষী। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন রূপে।

সে বলল, “একদম লক্ষ্মী হয়ে থাকবে সোনা, আর ওষুধটা খেতে যেন ভুলো না।”

একথায় আর্কুলারিস অবাক হল না। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ মা, মাগো, ঠিকসময়ে ওষুধ খাবো, দেখো... ঠিক সময়ে...”

ঘরে ঢুকে যতটা ঘুমের ওষুধ ছিল, সবটা একসঙ্গে খেয়ে নিল আর্কুলারিস। তারপর শুয়ে পড়ল বিছানায়। মুহূর্তে শান্তির ঘুম নেমে এল দুচোখে। আহ! এত ক্লান্তি, এত শ্রান্তি তার জীবনে কখনো আসেনি, কী মনোরম!

তারপরেই সেই উন্মত্ত ঝাঁপ, এক লহমায় আর্কুলারিস পেরিয়ে গেল চাঁদ; এতই অস্বাভাবিক দুরন্ত তার গতি যে ধ্রুবতারাকে মনে হল যেন নিশ্চল। এক অসম্ভব ঝাঁপে পাক মেরে নিল কৃত্তিকা নক্ষত্রকে। সত্ত্বা এখন তার পুরোপুরি শিলীভূত। চলতে চলতেই বহু চেনা সপ্তর্ষিমন্ডলকে তার হিমায়িত হাত নেড়ে অভিবাদন জানাল আর্কুলারিস। এরপর আর সময় বেশি নেই। সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে নীল রঙের এক অজানা ছোট্ট তারা। সেখানে হাজির হলেই এ জগৎ শেষ।

তারপরে সেই মহা অজানার সমুদ্র! বুকে বল আনো আর্কুলারিস। পোশাক তোমার ঠিকঠাক আছে তো? পায়ের মোজা, মাথার টুপি আর তোমার সবসময়ের ছাতা? শক্ত করে ধরো ওকে। তোমার সামনে সেই সমুদ্র। আঘাতে কখনো তোলপাড় হয়নি যে! সাহস আনো আর্কুলারিস। এরপরেই তোমাকে ফিরতে হবে। ক্ল্যারিসকে বলেছিলে না, তাকে বরফের পালক এনে দেবে! চরম মুহূর্তে বাতিল হওয়া জীবনের বরফ! শুধু যদি আমরা ঘুম থেকে না জাগি, জাগতে না চাই দেশ ও কালের সীমানায় বা অন্য কোথাও!

অন্ধকারে ঠান্ডায় জমতে জমতে আর্কুলারিস যেন পামগাছের মধ্যে চলা হাওয়ার কান্নায় ক্যাভেলেরিয়া রাস্তিকানার অন্তিম সুরটা শুনতে পেল।

কেউ একটা বাক্স বয়ে আনছে, সাদা আর মসৃণ! হে ভগবান! আলো দাও, আলো, তোমার পবিত্র আলো। তারপরে আসুক অন্তিম শীতলতা।

এই তো সে আসছে... আসছে... আসছে...

***

ঠিক সেই মুহূর্তে হাসপাতালে আর্কুলারিসের জীবন বাঁচানোর জন্য ডাক্তারদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হল। হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে সার্জেন বলল, “সব শেষ! জানতাম এমনটাই হবে। মিস হয়েল বেসিনে ভর দিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে, ডাক্তার বোধহয় তার চোখের ভাষা বুঝতে পারল। দুজনেই নিশ্চুপ রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপরে হাসপাতালের সাময়িক থমকে থাকা জীবন আবার চলতে শুরু করল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%