সৌভিক চক্রবর্তী

ভূমিকা
সেটা ছিল বড়োদিনের আগের সন্ধ্যা। আমি এভাবেই শুরু করছি, কারণ কোনো গল্প শুরু করার এটাই সঠিক, সনাতন এবং সম্মানজনক পন্থা, এবং যেহেতু আমি বড়ো হয়েছি সঠিক, সনাতন এবং সম্মানজনক পন্থায়, সুতরাং ছোটোবেলা থেকে আমি শিখেছি, যাই করা হোক না কেন, তা করতে হয় সঠিক, সনাতন এবং সম্মানজনক পন্থায়, ফলে সেই অভ্যেসটা আমার রয়েই গেছে।
অবশ্য এক্ষেত্রে তারিখটা উল্লেখ করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার বলার আগেই অভিজ্ঞ পাঠকেরা বুঝে নিয়েছেন যে এটা বড়োদিনের আগের সন্ধ্যা। সবসময়েই এটা বড়োদিনের আগের সন্ধ্যা, যে-কোনো ভূতের গল্পে।
বড়োদিনের আগের সন্ধ্যাটা হল ভূতেদের মোচ্ছবের রাত। এই রাতটায় তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠান হয়। বড়োদিনের আগের রাত্তিরে প্রেতলোকের (বা পেত্নিলোকের) সমস্ত বাসিন্দা – তারা কেউকেটা কিংবা যে বান্দাই হোক না কেন – বেরিয়ে পড়ে প্রমোদভ্রমণে – নিজেদের দেখাতে এবং অন্যদের দেখতে যে শেষযাত্রার সময় তাদের শবদেহ কীরকম চমৎকার কাপড়ে মোড়া ছিল এবং অন্যদের কাপড়গুলো তাদের তুলনায় কতটা বিশ্রী, তাদের স্টাইলের তুলনায় অন্যেরা কতটা পিছিয়ে পড়া, এবং শেষ পর্যন্ত নাসিকায় তোলে একটা অবজ্ঞাসূচক ঘুৎকারধ্বনি।
এই রাতে যে ‘কুচকাওয়াজ’ হয়, যাকে ‘ক্যাসল প্যারেড’-ও বলা যায়, তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে প্রেতলোকের সমস্ত বাসিন্দা, আর এতে যোগদান করে বুক ফুলিয়ে চলে যত খুন হওয়া ব্যারনের দল, অপরাধের রক্তরঞ্জিত যত কাউন্ট আর সেই সব আর্ল-এর দল, যারা কোনো রাজা আর তাঁর সমস্ত দারা-পুত্র-পরিবারকে হত্যা করে গদিতে বসে শেষ অবধি পাগল হয়ে মরেছে।
এর জন্য বেশ ধৈর্য ধরে অভ্যেস করতে হয় গোঙানির আওয়াজ আর দানবীয় হাসি। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে শোনা যায় রক্ত-জল করা চিৎকার। অভ্যেস করা হয় হাড়হিম করা সব অঙ্গভঙ্গি। কুলুঙ্গি থেকে বের করে আনা হয় জং-ধরা যত চেন আর শুকনো রক্তমাখা ছোরা, সেগুলো সাফসুতরো করা হয় উৎসবের রাতের জন্য। গতবার যে সব মড়ার চাদর – থুড়ি – শবাচ্ছাদন বস্ত্রগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলোর ধুলো ঝেড়ে-টেড়ে, ছেঁড়াফাটা মেরামত করে রোদে দেওয়া হয়।
সত্যি, কনকনে ডিসেম্বরের চব্বিশ তারিখটা প্রেতলোকের সবচেয়ে গা-গরম করা রাত বটে! তোমরা নিশ্চয়ই খেয়াল করে থাকবে যে ভূতেরা কক্ষনো বড়োদিনের রাতে দেখা দেয় না। এর কারণ, আমার মনে হয়, আগের রাত্তিরের ধকলটাই তাদের পক্ষে অনেক বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। সেই রাত্তিরের হুল্লোড়ের সপ্তাহখানেক পর ভদ্র ভূতেরা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা যথেষ্ট বড়ো হয়েছে, পরিণত হয়েছে, অতএব এই শেষ, সামনের বার থেকে আর কোনো হইহুল্লোড় নয়, এবং তখনই মহিলা ভূতেরা, কোনো কারণ ছাড়াই নাকিসুরে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এর কোনো নড়চড় হয় না, বছরের পর বছর ধরে এটাই চলে।
তবে, সাধারণ ভূতেরা – যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর – তারা নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম মেনে চলার পক্ষপাতী নয়। তাদের মাঝেমধ্যে কিছু কিছু অতিপ্রাকৃত ক্রিয়াকলাপ করে দেখাতেই হয়, আর যে-সব রাত্তিরে মানুষের কাজকর্ম থাকে না, সেই সব রাত্তিরেই তারা তাদের অতিপ্রাকৃত কার্যকলাপ দেখিয়ে থাকে। আমার যা ধারণা – মিডসামার-এ, বা ‘অল হ্যালোস ইভ’-এ, অথবা তেমন কিছু জবরদস্ত পরব না পেলে, হাতের কাছে যা পাওয়া যায়, সেই সব রাত্তিরে – যেমন কেউ যদি কোনোদিন ফাঁসিতে ঝুলে মরে, সেই দিনটাতে, অথবা যে সব দিনগুলোর অশুভ বলে বদনাম আছে, সেই সব দিনগুলোতেই তারা তাদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
গড়পড়তা ব্রিটিশ-ভূতেরা অবশ্য ভয় দেখাতে খুবই ভালবাসে। আর কাউকে অভাগা বানাতে বললে তো তার আর ফুর্তির সীমা থাকে না। একবার হুকুম করলেই হল, যে অমুকের বাড়িটা খুব শান্তিপূর্ণ, সেখানে গিয়ে একটু হাঙ্গামা করে এসো, বা তমুককে একেবারে দেউলিয়া করে দাও, বা ভয়ঙ্কর ধরনের সব দুর্যোগ তৈরি কর, যেগুলো সাধারণ লোক চিন্তাও করতে পারবে না, ব্যস, দেখবে সে কী খুশি হয়েই না সেগুলো করতে চলে গেল। অবশ্য এর ফলে যদি তার নিজের পরিবারের কোনো লোক বিপদে পড়ে, তাতে সে খুবই দুঃখিত হয়, কারণ ঠিক সেই সময়ে সে নিজেই হয়ত অন্য কারোর বাড়ির উঠোনে সস্তা অতিপ্রাকৃত খেলা দেখাচ্ছিল, বা কারো খাটের পাশে দাঁড়িয়ে ভয় দেখিয়ে তার দাঁতকপাটি লাগিয়ে দিচ্ছিল। b
কিছু তরুণ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভূত আবার কোনো নির্দিষ্ট দিন-টিনের ধার ধারে না। তারা যে কী ভাবে, কী আছে তাদের মনে, তারাই জানে, তারা সারাবছর ধরে এক মনে ভয় দেখিয়ে যায়। আর আছে কিছু পাতি-ভূত, যারা মরেছিল কোনো ডাস্টবিন অথবা গ্রামের কোনো ডোবার মধ্যে, এরা তো কোনো রাত্তিরেই কাউকে তিষ্ঠোতে দেয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ বেশ খরচাপাতি করে তার একটা জমকালো শেষকৃত্য সম্পন্ন না করে।
তবে এগুলো সবই ব্যতিক্রম। গোঁড়া, সনাতনপন্থী ভূতেরা বছরে ওই একবারই হৈ চৈ করে, আর সেটা হল বড়োদিনের আগের রাত।
আর কেন যে সেটা ঠিক বড়োদিনের আগের রাত্তিরেই হয়, সেটা আমার ঠিক বোধগম্য নয়। ওই সময়ের ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া তো মোটেই সুবিধের থাকে না। তাছাড়া, বড়োদিনের সময়ে প্রত্যেকটা লোকের বাড়িই তো তাদের আত্মীয়স্বজনে বোঝাই থাকে, সেই সময়টায় ভূতপ্রেতরা এসে বাড়িতে হল্লা করুক, এটা নিশ্চয়ই কেউ চায় না। তাহলে?
আমার মনে হয়, ওই সময়ের আবহাওয়াতেই এমন একটা কিছু থাকে, যেটা ভূতেদের নিজস্ব বাসস্থান থেকে টেনে আনে, ঠিক যেমন গ্রীষ্মকালে একপশলা বৃষ্টির পরে ঠান্ডা হাওয়া আর সোঁদা সোঁদা গন্ধের গর্ত থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসে শামুক আর ব্যাঙেরা।
আরেকটা জিনিসও দেখার আছে। বড়োদিনের আগের রাত্রে যে শুধুমাত্র ভূতেরাই হাওয়া খেতে বেরোয়, তা নয়, জীবিত মানুষরাও ওই একই রাত্রে ভূতেদের নিয়ে গল্প করতেই ভালবাসে। যদি পাঁচ-ছ’জন ইংরেজ কোনো ড্রয়িংরুমের ফায়ারপ্লেসের পাশে জমিয়ে বসতে পারে, ব্যস, আর দেখতে হবে না, ভূতের গল্প হবেই হবে। আসন্ন বড়োদিনের উৎসব তাদের আর ততটা খুশি করে না, যতটা খুশি করে ভাল ভাল ভূতের গল্প, কারণ বড়োদিনের মতো একটা উৎসবের মরসুমে আমরা গোরস্থান, শবদেহ, খুনখারাপি আর রক্তপাত নিয়ে আলোচনা করতেই বেশি ভালবাসি।
এই যে আমরা অতিপ্রাকৃত সব অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করি, এগুলোর মধ্যে একটা মিল আছে, তবে সেটা আমাদের দোষ নয়, ভূতেদেরই দোষ। এদের মধ্যে কোনো নতুন কিছু করার চিন্তাও নেই, ভাবনাও নেই, আর চেষ্টাও নেই, সেই কবে থেকে তারা একইরকম বস্তাপচা ব্যাপার-স্যাপার করে আসছে। ফলে ব্যাপারটা হয় কী, যখনই তুমি কোনো বড়োদিনের আগের সন্ধ্যার পার্টিতে যোগ দেবে, এবং যথারীতি ভূতের গল্প শুরু হবে, তুমি শুনবে সবাই সেই এক চেনা গল্পই করে যাচ্ছে। প্রতি তিন বা চার নম্বর গল্পটাই সেই আগের গল্পের পুনরাবৃত্তি। একই হাস্যকর কমেডি দু’বার দেখার মতই তখন তোমার আর কোনো গল্পই শুনতে ইচ্ছে করবে না, অবধারিত খুন চাপবে মাথায়, মনে হবে গল্প-বলিয়ের নাকে একটা ঘুষি মেরে তার নাকটা ফাটিয়ে দেওয়ার।
এসব গল্পে প্রায়শই দেখা যায় কোনো যুবক সে-বারের বড়োদিনের ছুটিটা দেশের বাড়িতে কাটাবে ঠিক করে, এবং বড়োদিনের আগের রাত্তিরেই বাড়ির লোকেরা তাকে বাড়ির পশ্চিমের ঘরটায় শুতে পাঠায়। তারপর ঠিক মাঝরাতে ঘরের দরজা আস্তে করে খুলে যায় এবং কোনো একজন, সাধারণত কোনো মহিলা, রাতের পোশাকে ধীর পায়ে হেঁটে এসে খাটের পাশে বসে। যুবকটি ভাবে বোধহয় এ-বাড়িতে তার মতই কেউ বেড়াতে এসেছে, অথবা এদের কোনো আত্মীয়স্বজনই হবে হয়ত, যার সঙ্গে তার আগে আলাপ হয়নি, রাত্রে ঘুম আসছে না দেখে তার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছে। যেহেতু তার কোনো কুসংস্কার নেই, সে বুঝতেই পারে না যে সেটা একটা ভূত। এসব ভেবে-টেবে সে যখন আবার মুখ তুলে তাকায়, দেখে মহিলা উধাও হয়ে গেছে।
যুবকটি পরদিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে সবাইকে মহিলাটির কথা বলে জিজ্ঞেস করে বাড়িতে কেউ এসেছে কি না। বাড়ির সবাই তাকে আশ্বস্ত করে যে কেউই বেড়াতে আসেনি। কর্তাটি তাকে অনুরোধ করে যেন সে ওই মহিলার কথা কাউকে না বলে। অনুরোধটা এতই অদ্ভুত যে যুবকটি হতভম্ব হয়ে যায়।
ব্রেকফাস্টের পর বাড়ির কর্তা যুবকটিকে বাড়ির এককোণে ডেকে নিয়ে যায় এবং বলে যে গতরাত্রে সে যে-মহিলাকে দেখেছে, সে আসলে ভূত এবং সে ওই ঘরের ওই খাটেই একদা খুন হয়েছিল, অথবা কাউকে খুন করেছিল। সেটা অবশ্য খুব বড়ো ব্যাপার নয়, তুমি কাউকে খুন করেও ভূত হতে পার, অথবা খুন হয়েও ভূত হতে পার, যেটা তোমার ভাল লাগে। খুন হওয়া ভূত অবশ্যই বেশি জনপ্রিয়, আর অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলে খুন হলেই তোমার লাভ বেশি, কারণ সেক্ষেত্রে খুন হওয়ার সময় গায়ে যে সব ক্ষতস্থান তৈরি হয়েছিল, সেগুলো দেখিয়ে আর মৃত্যুযন্ত্রণার চিৎকার শুনিয়ে লোকজনকে ভয় দেখাতে সুবিধে হয়।
এরপর আছে সেই নাস্তিক লোকের গল্প, যে ভূত-জাতীয় কোনো কিছুতেই বিশ্বাস করে না। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত এরা কোনো বাড়ির অতিথিই হয়ে থাকে। ভূতেরা কক্ষনো তার নিজের বাড়ির লোকেদের নিয়ে মাথা ঘামায় না, তারা সবসময় অতিথিকেই বেছে নেয় ভয় দেখানোর জন্য। সেই অতিথি, অবশ্যই বড়োদিনের আগের রাত্রে বাড়ির কর্তার কাছে সেই বাড়ির ভূতুড়ে কুঠুরি আর ভূতের গল্পের কথা শুনে একটা অবিশ্বাসের হাসি হাসে আর বলে যে সে এসব গল্পে বিশ্বাস করে না। এবং তারপর সেই রাত্রেই সে বাড়ির সেই বিশেষ ঘরটায় শুতে যায়, অবশ্য যদি বাড়ির লোকেরা তাকে যেতে দেয়, তবেই।
বাড়ির লোকেরা যদিও প্রত্যেকেই তাকে মাথার দিব্যি দেয় এতটা বেপরোয়া না হওয়ার জন্য, কিন্তু সে অবিচল। হালকা চালে শিস দিতে দিতে একটা মোমবাতি হাতে নিয়ে সে হাঁটা দেয় সেই হলদে রঙা (অথবা লাল অথবা নীল – তা সে যেই রঙাই হোক না কেন) ঘরের দিকে। সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে সে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়।
পরদিন সকালে দেখা যায় তার মাথার চুল সব সাদা হয়ে গেছে। কী যে সে ওই ঘরে দেখেছে, সেটা সে কাউকে বলে না, সেটা দেখতে ভাল দেখায় না।
এ-ছাড়াও আছে সেই অধ্যবসায়ী অতিথি, যে ভূত দেখে এবং বুঝতে পারে সেটা ভূত, কিন্তু কিছু বলে না, কিচ্ছুটি করে না, শুধু চুপ করে দেখে যে ভূতটা ঘরে এল, আবার চলেও গেল (অবশ্যই দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে), তারপর অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর সে যখন দেখে যে সেই ভূতটা আর ফিরে আসছে না, তখন সে আর জেগে লাভ নেই ভেবে ঘুমিয়ে পড়ে।
সে পরদিন অবশ্য কাউকে ভূত দেখার ব্যাপারে কিছুই বলে না – কারণ সেটা শুনে অনেকে ভয় পেয়ে যেতে পারে (আর কিছু কিছু লোক ভূতে এমন ভয় পায় যে বলার নয়) – শুধু চুপচাপ অপেক্ষা করে পরের রাত্রের জন্য, যদি সেই ভূতটা আবার দেখা দেয়।
যথারীতি পরের রাত্রে ভূতটা আবার দেখা দেয়, এবং সেই সময় সেই অধ্যবসায়ী অতিথিটি আর দেরি করে না। জামাকাপড় পরে, চুলটুল আঁচড়ে, ভূতটার পিছু নিয়ে আবিষ্কার করে একটা বহু পুরোন আমলের চোরাপথ, যেটা শোয়ার ঘর থেকে সোজা মদের কুঠুরিতে চলে গেছে এবং সেই পথটা বেশি ব্যবহার হয়নি।
তারপর আছে সেই যুবকের গল্প, যে হঠাৎ মাঝরাতে একটা অস্বস্তি নিয়ে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে দেখে তার বড়োলোক এবং অবিবাহিত কাকা তার খাটের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, মুখে একটা মুচকি হাসি, তারপর হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। যুবকটি ধড়মড় করে উঠে ঘড়ি দেখে। সেটা সাড়ে চারটে বেজে বন্ধ হয়ে গেছে, চাবি দেওয়া হয়নি।
পরদিন যুবকটি খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে এবং জানতে পারে, খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, তার সেই বড়োলোক অবিবাহিত কাকা, সে যার একমাত্র ভাইপো, সেই কাকা কিনা, দু’দিন আগে ঠিক পোনে বারোটার সময় এগারোটি ছেলেমেয়ে সমেত এক বিধবাকে বিয়ে করেছে।
এই ঘটনার যে কী মানে, যুবকটি তার মাথামুন্ডু খুঁজে পায় না, খালি একে-তাকে ধরে তার দুর্ভাগ্যের কথা শোনায়।
আবার বেশ কিছু ঘটনায় দেখা যায় সেই ভদ্রলোককে, যে কিনা গ্রামেরই কোনো বন্ধুর বাড়ি থেকে ডিনার সেরে একটু বেশি রাতে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ দেখতে পায় রাস্তার পাশের একটা বহু পুরোনো ভাঙাচোরা গির্জার বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে আলো ভেসে আসছে। সে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে চাবির ফুটো দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখতে পায় এক বয়স্ক মহিলাকে এক বাদামি পোশাক পরা সন্ন্যাসী চুমু খাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে সে এতই ধাক্কা খায় যে ভয়ে তার দাঁতকপাটি লাগে এবং সে সটান অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। পরের দিন সকালে লোকজন তাকে আবিষ্কার করে সেই গির্জার দরজার সামনে, মুখে কোনো কথা নেই এবং হাতে, অদ্ভুত ব্যাপার, শক্ত করে ধরা একটা চাবি – কীসের, কে জানে!
এসব ঘটনাই বড়োদিনের আগের রাত্রে ঘটে থাকে এবং বড়োদিনের আগের রাত্রেই বলা হয়ে থাকে। ইংরেজ সমাজে চব্বিশে ডিসেম্বরের রাতের বলা ভূতের গল্প আর অন্য যে-কোনো রাতের বলা ভূতের গল্পে অনেক তফাৎ। এবং এটা বহুদিনের প্রাচীন প্রথা। সেই কারণেই, আমি এখন যে নিতান্তই দুঃখের, অথচ নিখাদ খাঁটি ভূতের গল্পটা বলতে চলেছি, তার তারিখ আর সময় বলাটাও নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি কারণ এটাও হচ্ছে সেই সনাতন বড়োদিনের আগের রাত। কারণ প্রথা ভাঙাটা ঠিক নয়।
হানাবাড়ির গল্প
এবার শুরু করা যাক। তোমরা তো সবাই আমার ভায়রাভাই মি. পারকিন্সকে চেনো (মুখ থেকে লম্বা ক্লে-পাইপটা নামিয়ে কানে গুঁজে শুরু করলেন মি. কুম্বস; আমরা গল্প-শুনিয়েরা স্রেফ সময় বাঁচানোর জন্য এ-কথায় একবাক্যে ঘাড় নাড়লাম, যদিও আমরা তাঁর ভায়রাভাইকে মোটেও চিনি না), এবং এটাও নিশ্চয়ই জানো যে সে একবার সারে-তে একটা উইন্ডমিল ভাড়া নিয়েছিল সেখানে থাকবে বলে।
এখন, বুঝলে, বহু বছর আগে এই উইন্ডমিলটার মালিক ছিল এক বদমাশ কিপটে বুড়ো। ব্যাটা মরেছিল ওই বাড়িতেই, আর এ-রকম জনশ্রুতি ছিল যে সে তার সব টাকাপয়সা ওই মিলেরই কোনো একটা গোপন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিল। ফলে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যে ওই গুপ্তধনের লোভে বহু লোকই আগে উইন্ডমিলটা ভাড়া নিয়েছিল। কিন্তু কেউই কিছু খুঁজে পায়নি। স্থানীয় জ্ঞানবৃদ্ধরা বলত যে ওই টাকা কেউই খুঁজে পাবে না, যদি ওই কিপটে বুড়োর ভূত তার কোনো ভাড়াটিয়াকে নিজে এসে জায়গাটা বলে না দেয়।
আমার ভায়রাভাই অবশ্য এসব গালগল্পে বিশেষ পাত্তা দেয়নি, আর আগের সব ভাড়াটেদের মতো লুকোন সোনা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাও করেনি।
“আমি জানি না আগে কী ছিল, তবে এখন ব্যাবসা-বাণিজ্যের যা হাল, তাতে এই মিল চালিয়ে কেউ কত টাকা বাঁচাতে পারত, আমার সন্দেহ আছে, সে যতই কিপটে হোক না কেন, কাজেই শুধু শুধু ফালতু ঝামেলা নিয়ে লাভ নেই,” এই ছিল আমার ভায়রাভাইয়ের মত। যদিও মাথা থেকে সে গুপ্তধনের চিন্তাটা একেবারে উড়িয়ে দেয়নি।
একদিন সে রাতে ঘুমোতে গেল। এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। লোকজন সাধারণত রাতেই ঘুমোতে যায় এবং আমার ভায়রাভাইও সাধারণত রাতেই ঘুমোতে যেত। যেটা ঘটনা, তা হল, সেদিন রাতে গাঁয়ের গির্জার ঘড়িতে যেই ঠিক বারোটা বাজার শেষ ঘন্টাটি বাজল, আমার ভায়রাভাই চমকে জেগে উঠল এবং বুঝতে পারল যে তার পক্ষে আবার এক্ষুনি ঘুমোতে যাওয়া আর সম্ভব হবে না।
জো (আমার ভায়রাভাইয়ের নাম) সটান বিছানায় উঠে বসে ইতিউতি চারিদিকে তাকিয়ে দেখল, খাটের ঠিক সামনে ধোঁয়াধোঁয়া চেহারার কে-যেন-একটা একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খানিকক্ষণ বাদে সেটা নড়ে উঠল। খোলা জানলা দিয়ে চাঁদের আলো আসছিল। জো দেখল সেটা একটা রোগাভোগা শুকনো চেহারার ছোট্টখাট্টো লোক, চোগা-চোপকান পরা, মাথার চুলে আবার বিনুনি করা। জো-র তক্ষুনি মনে পড়ে গেল সেই গুপ্তধন আর কিপটে বুড়োর কথা।“ও নিজেই আমাকে লুকোন জায়গাটা দেখিয়ে দিতে এসেছে, তাহলে শেষপর্যন্ত আমিই গুপ্তধনটা পাচ্ছি,” মনে মনে ভাবল সে এবং সেই সঙ্গে এটাও ভেবে ফেলল যে পুরো টাকাটাই সে খরচা করবে না, খানিকটা কোনো ভাল কাজের জন্যও রেখে দেবে।
ভূতটা দরজার দিকে এগোল। আমার ভায়রাভাই চটপট জামাপ্যান্ট পরে নিয়েই তার পিছু নিল। ভূতটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে সোজা রান্নাঘরে গিয়ে হাওয়ায় ভেসে উনুনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল এবং উধাও হয়ে গেল।
পরদিন সকালে জো কয়েকজন রাজমিস্ত্রি নিয়ে এসে রান্নাঘরটা ভাঙচুরের কাজে লেগে গেল, মিস্তিরিরা উনুনটাকে তুলে ফেলল, চিমনিটাকে টেনে নামাল আর জো সোনাদানা ভরবে বলে একটা আলুর বস্তা নিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।
মিস্তিরিরা রান্নাঘরের দেওয়ালের অর্ধেক ধ্বসিয়ে ফেলল, কিন্তু চারআনার খোঁজও পাওয়া গেল না। আমার ভায়রা মাথা চুলকোতে লাগল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
পরেরদিন রাতেও ভূতটা এল এবং জো-কে যথারীতি রান্নাঘরে নিয়ে গেল, এবার কিন্তু সে ফায়ারপ্লেসের দিকে যাওয়ার বদলে ঘরের ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং উধাও হয়ে গেল।
“ওহ, এবার বুঝেছি,” আমার ভায়রা বিড়বিড় করল, “গুপ্তধনটা মাটির নীচে আছে। বুড়ো গাধাটা তাহলে গতরাতে আমাকে কেন উনুনের দিকে নিয়ে গিয়ে বলল যে ওটা চিমনির মধ্যে আছে?”
পরের দিন সকালে আবার তারা কাজে লেগে গেল। কিন্তু গোটা রান্নাঘরের মেঝে খুঁড়ে তারা যা পেল, তা হল একটা তিন দাঁড়াওয়ালা কাঁটাচামচ, যার হাতলটা আবার ভাঙা।
তৃতীয় রাতে ভূতটা এল, একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে দাঁড়িয়ে থেকে এবারেও রান্নাঘরে গেল এবং ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে উধাও হয়ে গেল।
“হুঃ! বুদ্ধি তো নেই-ই, কোনো কান্ডজ্ঞানও নেই! ওটা যে সিলিং-এ লুকোন রয়েছে, সেটা আগে দেখালেই হত!” জো নিজের মনেই গজরগজর করতে করতে ঘরে ফিরে শুয়ে পড়ল।
সুতরাং পরের দিন ব্রেকফাস্ট করেই তারা কাজে লেগে গেল। ঘরের সমস্ত সিলিং নামিয়ে যেটা পাওয়া গেল, তা হল একটা খালি বোতল।
চতুর্থ দিন রাতে যখন ভুতটা এল, যেমন আসে, আমার ভায়রাভাই এমন ক্ষেপে গেল যে তার বুটটা ছুঁড়ে মারল। বুটটা ভূতের শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে জানলার কাচে লেগে কাচটা ফাটিয়ে দিল।
পঞ্চম রাতে, জো যখন জাগল (তখন তার ঘুম বারোটাতেই ভাঙছিল), দেখল ভূতটা তার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুঃখী দুঃখী চেহারা নিয়ে। তার দু’চোখে এমন করুণ দৃষ্টি যে ভায়রাভাইয়ের মন গলে গেল।
“মনে হচ্ছে বোকাটা ভুলে গেছে যে কোথায় টাকাকড়িগুলো রেখেছে,” সে ভাবল, “অনেকদিনের ব্যাপার তো! যাই হোক, ও যখন চেষ্টা করছে, তখন ওকে আরেকটা সুযোগ দেওয়া উচিত।”
ভূতটাকে বেশ উৎফুল্ল দেখাল, যখন দেখল জো ওর পেছন পেছন আসছে। এবার সে সোজা জো-কে চিলেকোঠায় নিয়ে গেল এবং সিলিং-এর দিকে দেখিয়ে উধাও হয়ে গেল।
“অবশেষে! এবারে নিশ্চয়ই ওর ভুল হয়নি,” আমার ভায়রা বলল এবং পরদিন সকালে তারা চিলেকোঠার ছাদ খোলার কাজে লেগে গেল।
তাদের পুরো ছাদটা খুলে ফেলতে তিনটে গোটা দিন লেগে গেল এবং শেষ পর্যন্ত যা পেল, তা হল একটা পাখির বাসা। তাদের আবার সারা ছাদটা ত্রিপল দিয়ে ঢেকে ফেলতে হল বাড়িটা শুকনো রাখার জন্য।
তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ যে এইবার নির্ঘাত তার গুপ্তধন খোঁজার বাতিক সেরে গেল। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়।
সে বলত যে মিলের কোথাও না কোথাও গুপ্তধন নিশ্চয়ই আছে, না হলে ভূতটা বার বার আসত না, অতএব যে-কোনো মূল্যেই হোক না কেন, সে এই রহস্যের শেষ দেখে ছাড়বে।
রাতের পর রাত সে বিছানা থেকে উঠে সেই ভন্ড, দু’নম্বরি ভূতটার পেছন পেছন যেত এবং ভূতটা যেখানে যেখানে দেখাত, পরের দিন আমার ভায়রাভাই সেই সব জায়গাগুলো ভাঙত আর গুপ্তধনের খোঁজ করত। তিন সপ্তাহ বাদে দেখা গেল, মিলের একটা ঘরও আর বাস করার অবস্থায় নেই। প্রত্যেকটা দেওয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে, সমস্ত ঘরের মেঝে খোঁড়া, প্রতিটা সিলিং-এ এইসা বড়ো বড়ো গর্ত। এইভাবেই যখন চলছিল, তখন হঠাৎ একরাতে দেখা গেল ভূতটা আর এল না। এল না তো এলই না। তারপর আর কোনোদিনও না, আর আমার ভায়রাভাই ওই মিল আবার সারিয়ে বাস করার মায়া ত্যাগ করে ওখান থেকে চম্পট দিল।
এমন একজন ছাপোষা গেরস্থের সঙ্গে ভুতটা এরকম দু’নম্বরি করল কেন? না, সেটা আমি বলতে পারব না।
তবে কিছু লোকের মতে, বেঁচে থাকতে লোকটা ছিল মহা বদমাশ আর বদবুদ্ধির হাঁড়ি, সে-কারণেই মরার পর ও যখন ভূত হল এবং দেখল আমার ভায়রাভাই, ওই বাড়িতে যে ও ভূত হয়ে আছে, সেই কথাটা প্রথমে বিশ্বাস করেনি, তখন তাকে এভাবেই শিক্ষা দিল। আবার কিছু লোকের মতে ভূতটা বোধহয় ওখানকার স্থানীয় কোনো কলের মিস্তিরি বা রাজমিস্ত্রির ভূত, স্বাভাবিকভাবেই বাড়িঘর ভেঙেচুরে গেলেই তাদের মহা ফুর্তি হয়। তবে নির্দিষ্টভাবে কেউই কিছু বলতে পারেনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন