হাত

সৌভিক চক্রবর্তী

“আপনি কি আজ রাতে এসে থাকতে পারবেন? পরামর্শ চাই। জরুরি। ট্র্যাভার্স। ব্র্যান্ডন সেন্ট গাইলস ভিকারেজ।”

টেলিগ্রামটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিত। কিছুটা ব্যাখ্যাতীতও বটে। একে তো আমি পরামর্শ দেওয়ার মতো লোক নই। তার ওপর ট্র্যাভার্সের তেমন কিছুর দরকারই হয় না। তবু, ব্যাপারটার মধ্যে এমন একটা বিপদের সুর ছিল যেটা উপেক্ষা করতে পারলাম না। জবাব পাঠিয়ে বললাম, সেদিন সন্ধের আগেই আমি ওর কাছে হাজির হয়ে যাব।

নিজের চেয়ারে বসে টাইমস্‌-এ মনোনিবেশ করলাম। কিন্তু মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছিল। টেলিগ্রামটা...

ট্র্যাভার্সকে আমি অনেকদিন হল চিনি। ওর বাবা কেম্ব্রিজে আমার সমসাময়িক ছিলেন। পড়াশোনায় ও যতটা খারাপ ছিল, রাগবিতে ছিল ততটাই দড়। ধর্মকর্মে মতি থাকায় ট্র্যাভার্স শেষ অবধি চার্চে যোগ দেয়। যুদ্ধের পর দেশে ফিরে ও ব্রিস্টলের একটা প্রত্যন্ত প্যারিশের দায়িত্ব নিয়ে অনেকদিন কাটিয়েছিল। মাঝে একবার ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। হাসিমুখেই ছোকরা বলেছিল, লোকে ওর ভাষণ বা উপদেশ শুনতে না এলেও মাঠে ওর খেলা দেখতে ভিড় জমায়। মাসকয়েক আগে ও সেখান থেকে ব্র্যান্ডন সেন্ট গাইলস্‌-এ ভিকার হয়ে যোগ দিয়েছে, এই খবর পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার কাছে ও কী পরামর্শ চাইতে পারে?

সেদিন বিকেলেই আমি ভিকারেজ-এর দরজায় কড়া নাড়লাম। গাড়ি চেপে ব্র্যান্ডন সেন্ট গাইলস্‌ যেতে আমার বেশিক্ষণ লাগেনি। তবে ইস্ট অ্যাংলিয়ার ওই বিরক্তিকর ন্যাড়া পরিবেশ, জনহীন আদিগন্ত মাঠ আর জলাজমির ওপর নেমে আসা নভেম্বরের কুয়াশা, আর মাঝেমধ্যে ছাড়া-ছাড়া এক-আধটা বাড়ি – এ-সব দেখে আমার মেজাজটা কিঞ্চিৎ বিগড়ে গিয়েছিল। বহুবছর আগে উলের ব্যবসা করে এখানকার কিছু লোক বেশ পয়সাকড়ি করেছিল। তাদেরই বদান্যতায় সেই যুগে তৈরি হয়েছিল বিশাল চার্চটা। কিন্তু এখন জায়গাটা এতই গরিব আর নির্জন যে সেটা বেখাপ্পা লাগে।

একটি কাজের মেয়ে দরজা খুলে আমাকে বসার ঘরে নিয়ে গেল। বাইরের ওই নির্জন কুয়াশাঘেরা পরিবেশ থেকে ঘরে ঢুকে প্রথমেই ফায়ারপ্লেসের কাছে গদিয়ান হলাম।

“ভিকার সবে উঠেছেন স্যার।” মেয়েটি বিনীতভাবে বলল, “উনি একটু পরেই আসছেন।”

ট্র্যাভার্স অসুস্থ, এটা আমি জানতাম না। জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, ওঁর ঠিক কী হয়েছে?”

“উনি কাল রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আর...” মেয়েটা তড়বড়িয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তখনই ট্র্যাভার্স ঘরে ঢোকায় কথাটা থেমে গেল। হাতের ইশারায় ওকে চলে যেতে বলে ট্র্যাভার্স আমার কাছে এগিয়ে এল।

“আপনি যে এত তাড়াতাড়ি চলে আসতে পেরেছেন, এটা আমার কাছে একটা বিরাট ব্যাপার।”

ওর গলা শুনে বুঝলাম, কথাগুলো ও বানিয়ে-বানিয়ে বলছে না, “আপনাকেই ডাকলাম, কারণ...”

“কারণ?” ট্র্যাভার্সের অস্বস্তিটা আমার চোখে ধরা পড়ল।

“আপনি অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে বেশ আগ্রহী ছিলেন, তাই না?” ও থেমে-থেমে বলল, “কাল রাতে আমার এমন একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে, যার আর কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে বলে মনে হয়নি। তাই আপনাকে এতদূর টেনে আনা!”

ট্র্যাভার্সের ফ্যাকাশে মুখ দেখে বুঝলাম, যে-কোনো কারণেই হোক না কেন, এই বছর ত্রিশেকের ফিট অ্যান্ড ফাইন ছোকরা ভয় পেয়েছে। ওকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বললাম, “তুমি নির্দ্বিধায় পুরো ঘটনাটা আমাকে শোনাও। যদি আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয়, অবশ্যই করব।”

“তাহলে...” ঘড়ি দেখল ট্র্যাভার্স, “আগে আপনাকে একবার চার্চটা দেখাই। অন্ধকার হওয়ার আগে জায়গাটা আপনার দেখা দরকার। চা-টা নাহয় তারপর সারা যাবে।”

বাগান পেরিয়ে আমরা চার্চে ঢুকলাম। উত্তরের দেওয়ালটা সময়ের ছোবলে জায়গায়-জায়গায় ভেঙে পড়েছিল একসময়। সেগুলো পরে মেরামত করা হয়েছে। তার গা ঘেঁষে কবরের সারি। সেগুলোর মধ্য দিয়ে একটা সরু পায়ে-চলা পথ ধরে এগোল ট্র্যাভার্স। শেষে পুবদিকের একটা দরজা দিয়ে আমরা মূল বাড়িটায় ঢুকলাম। একপাশে চমৎকার নকশা-কাটা জায়গাগুলো দেখে বুঝলাম, কয়্যারের গায়করা ওখানে দাঁড়ায়। ওগুলো চলে গেছে একেবারে বেদী অবধি। বেদীর কাছে এসে ট্র্যাভার্স ঈষৎ অস্বস্তিভরে ডানদিকে আঙুল তুলল। সেটা অনুসরণ করে আমি দেওয়ালের খাঁজের মধ্যে ঢোকানো একটা সমাধি দেখতে পেলাম।

“ওটা দেখে একটু বলুন তো, আপনার কী মনে হয়।”

আমি সমাধিটা খুঁটিয়ে দেখলাম। কবরের ওপর একটা মসৃণ বেদী। সেখানে অ্যালাবাস্টার, মানে অনেকটা তেলতেলে অফ-হোয়াইট রঙের স্ফটিকের বানানো একটা মূর্তি আছে। চমৎকার হাতের কাজ, সেটা এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়। মূর্তির পোশাক, হাতের ব্যান্ড ইত্যাদি বুঝিয়ে দেয়, এটা চার্চের কোনো পুরোহিতের। তবে উল্লেখযোগ্য হল মূর্তির হাতের অবস্থান।

সচরাচর এই ধরনের মূর্তিগুলোতে হাতজোড়া বুকের ওপর এক্স হরফের মতো করে রাখা থাকে, মানে প্রার্থনা করার সময় লোকের হাত যেভাবে থাকে আর কি। এখানে কিন্তু তা হয়নি। একটা হাত পরনের আলখাল্লার ভেতরে ঢোকানো আছে। অন্যটা বেদী থেকে সামান্য বাইরে বেরিয়ে এসেছে, এবং মূল বেদীটার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করছে। চার্চের স্থাপত্য নিয়ে অল্পবিস্তর জ্ঞান আছে আমার। সেটা কাজে লাগাতেই স্পষ্ট হল, কয়্যারের স্টলগুলো পরে বানানো হয়েছিল। হয়ত জায়গার টানাটানির ফলেই এই মূর্তি, আর তার উঠে থাকা আঙুল একটা অন্ধকার, নজর-চলে-না এমন জায়গায় রয়ে গেছে।

“দারুণ কাজ!” আমি প্রশংসা করলাম, “এমন একটা একটেরে জায়গায় রয়েছে বলেই বোধহয় মূর্তিটা এতদিন পরেও এত ভালো অবস্থায় আছে।”

“লেখাটা পড়লেন?” ট্র্যাভার্স সমাধির এক ধারে গভীরভাবে খোদাই করা ল্যাটিন লেখাগুলোর দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। কম আলোতেও আমি পড়তে পারলাম। সরল অনুবাদে লেখাটার অর্থ ছিল-

“এখানে শায়িত আছেন ওয়াল্টার হিংকম্যান। জন্ম ১৪৭০ খ্রিস্টাব্দ, মৃত্যু ২৭শে এপ্রিল ১৫৩৬। ত্রিশ বছর ধরে ব্র্যান্ডন সেন্ট গাইলস্‌-এর প্যারিশের ভিকার ছিলেন তিনি। সবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র এই মানুষটির স্মৃতির উদ্দেশে এই স্মারকটি তৈরি করান তাঁর উত্তরাধিকারী তথা চার্টারহাউস থেকে আসা জন মেলকম্ব।”

তার ঠিক নীচেই ছিল কয়েকটা লাইন। ষড়মাত্রিক ছন্দে তাতে লেখা ছিল:

EN! MANUS AETERNOS VENERANDA EST

SANCTA PER ANNOS.

আমার মতে সেটার সরলার্থ ছিল, “দেখো! সাধুসঙ্গলাভের ফল চিরন্তন হয়।”

“SANCTA MANUS-এটার আপনি কী মানে করলেন?” জানতে চাইল ট্র্যাভার্স।

“সেক্রেড ব্যান্ড।” আমি বললাম, “বোঝাই যাচ্ছে, পুরোহিত বা অন্যান্য ধর্মযাজকদের গোষ্ঠীকে বোঝানো হচ্ছে।”

“MANUS মানে হাত, এটাই কি বোঝানো হচ্ছে না?” ট্র্যাভার্সের মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম, আমার করা অর্থটা ওর মনঃপূত হচ্ছে না।

“হতে পারে। পবিত্র বা পূত হাত, এমনটা বোঝাতেই পারে।” আমি মেনে নিলাম, “কিন্তু এখানে সেটার কী অর্থ?”

“না, মানে, মূর্তির হাতটাই আগে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাই না?” আমতা-আমতা করে বলল ট্র্যাভার্স, “এমনিতে মূর্তিটার সম্বন্ধে আপনার কী মত?”

“রিফর্মেশনের পর এই ধরনের বেশ কিছু মূর্তি বানানো হয়েছিল অ্যালাবাস্টার দিয়েই।” আমি বললাম, “চমৎকার কাজ। তুমি চিশেস্টারের বিশপ শেরবার্নের মূর্তিটা দেখেছ? এরকমই, তবে ওটাতে সূক্ষ্ম কাজ আরও বেশি।”

“আমার এ-সবে কোনোকালেই খুব একটা আগ্রহ ছিল না।” মাথা ঝাঁকিয়ে বলল ট্র্যাভার্স, “তাহলে মূর্তিটার মধ্যে আর তেমন কিছুই নেই বলছেন?”

“হাতের অবস্থানটা অন্যরকম।” আমি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, “প্যারিশের দায়িত্বে থাকা কারও জন্য এরকম দামি মূর্তি সচরাচর দেখা যায় না। তবে চেশায়ারে উইমস্লো-তেও একটা মূর্তি দেখেছি, আরও ভালো।”

আমি ব্যাপারটা নিয়ে আগ্রহ হারাচ্ছিলাম। তবু ট্র্যাভার্সকে বললাম, “তোমার চার্চটা একটু ঘুরিয়ে দেখাবে না? স্টেইনড গ্লাসের সংগ্রহের জন্য এই চার্চের খ্যাতি আছে বলেই শুনেছি।”

“কাল সকালে।” ট্র্যাভার্সের উশখুশুনিটা ক্রমেই বাড়ছিল, এবার দেখলাম সেটা ও আর সামলাতে পারছে না, “আপাতত এখান থেকে বেরোতে হবে।”

“আমি জানি আপনার কাছে কথাটা হাস্যকর শোনাবে।” বেরোনোর পর গেটে তালা দিতে-দিতে ট্র্যাভার্স আমাকে বলল, “কিন্তু অন্ধকার হয়ে গেলে আমি আর চার্চের ভেতরে থাকতে পারব না। সব বলছি আপনাকে, তবে এখানে আর না!”

ভিকারেজের ভেতর, ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে চা ও টা সহযোগে আমাকে যথাযথ আপ্যায়ন করল ট্র্যাভার্স। তারপর ও বলতে শুরু করল, প্রথমে থেমে-থেমে, তারপর হুড়মুড়িয়ে।

“আপনি তো জানেন, আমি গত ফেব্রুয়ারিতে এখানে দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আমার আগেরজন প্রায় চল্লিশ বছর এখানে ভিকার ছিলেন। সজ্জন মানুষ। দায়-দায়িত্ব ছাড়ার আগে এক সপ্তাহ আমি ওঁর সঙ্গেই কাটিয়েছিলাম। সেই সময়ে উনি আমাকে অনেক কিছু বুঝিয়েছিলেন। তাতে আমার সুবিধেই হয়েছে তারপর। সেই সময় উনি আমাকে ভিকারের স্টল নিয়ে কয়েকটা অদ্ভুত কথা বলেছিলেন।

স্টলের অবস্থানটা আপনি লক্ষ করেছেন নিশ্চয়। বেদীর নীচে ডানদিকের দরজা-বরাবর রয়েছে ওই স্টলটা। ওর ঠিক উলটোদিকে, ওই... যে সমাধিটা আপনাকে দেখালাম তার গা ঘেঁসে আরেকটা স্টল আছে। আমার পূর্বসূরী বারবার করে বলেছিলেন, ওই স্টলটা যেন কক্ষনো ব্যবহার না করি। কেন? কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ভদ্রলোক বলেছিলেন, তিনি নাকি তাঁর আগের ভিকারের কাছ থেকে এমনটাই শুনেছিলেন। যেহেতু এলাকায় এমন কিছু প্রথা চালু থাকলে সেগুলো যথাসাধ্য মেনে চলাই নিরাপদ, তাই তিনি চল্লিশ বছরের মধ্যে ওই স্টলে দাঁড়াননি। তার আগেও বোধহয় এমনটাই হয়েছে বেশ কয়েকশো বছর ধরে। আমিও ব্যাপারটা বুঝে, এই ন”মাস ধরে ওই স্টলটা ব্যবহার করিনি।

মুশকিল হল, শীত পড়ার পরেই পুবদিকের ওই খোলা মাঠ আর জলার দিক থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ঢোকা শুরু হয়েছিল। পরশুদিন ওই পাশের দরজা, মানে যেটা দিয়ে আমরা ঢুকলাম, তার নীচ দিয়ে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় আমি বিলক্ষণ কষ্ট পেয়েছি। কাল সন্ধেবেলা চার্চে ঢুকে দেখি এবার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। মানে ওই হাওয়া খেয়ে স্টলে দাঁড়িয়ে ঘণ্টা তিনেকের একখানা সেশন নিলে নিউমোনিয়া অবধারিত। তখনই ঠিক করলাম, একটা পুরোনো সংস্কার বা ভাবনাকে অকারণে এত তোল্লাই দেওয়ার কোনো মানেই হয় না। আমি গটগট করে হেঁটে উলটোদিকের স্টলটায় বসলাম।

পুরো কয়্যার গান থামিয়ে, একেবারে হাঁ করে আমার দিকে তাকাল, যেন এমন পাগলামো তারা জীবনে দেখেনি। ম্যাসন, মানে এখানকার পুরোনো ভার্গার এমনভাবে মাথা নাড়তে লাগল যে আমার ভয় হল, বুড়োর মুন্ডুটাই না খুলে যায়। আমি উঠে দাঁড়িয়ে আমার ভাষণ শুরু করলাম। আসলে মনে হচ্ছিল, আমি স্বাভাবিক না থাকলে এই ব্যাপারটা আরও জট পাকাবে। ঠিক তাই হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকল। আমার ভাষণ, তারপর কর্নেল হার্টওয়েলের নির্দেশ অনুযায়ী কয়্যারের গান, সবই ঠিকঠাক হচ্ছিল। কিন্তু...

আপনি দেখেছেন নিশ্চয়, চার্চের ভেতরে আমরা এখনও ইলেকট্রিক লাইট লাগাতে পারিনি। তেলের বাতিগুলো একেবারে টিমটিম করে। সব মিলিয়ে তখন চার্চের ভেতরটা বেশ অন্ধকারই ছিল। আমার তখন খুব ঘুমঘুম পাচ্ছিল। হঠাৎ আমার জোব্বার একধার ধরে টান পড়ল। আর তখনই কিছু একটা আমার হাঁটুটাকে একেবারে শক্ত করে চেপে ধরল!

আমি এতটাই চমকে গিয়েছিলাম যে আর কিছু ভাবিনি, সোজা একটা ঝটকা মেরে জিনিসটাকে সরাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার হাত যাতে ঠেকল সেটা... সেটা ছিল ওই অ্যালাবাস্টারের মূর্তির হাত! ওটা নিজের জায়গা থেকে সরে এসে আমার হাঁটুটা চেপে ধরেছিল।

তারপর ঠিক কী হয়েছিল, আমি বলতে পারব না। একটা চিৎকার করে আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম নাকি। চার্চে থাকা লোকজন আমাকে ঝটপট নিজের ঘরে শোয়ায়, ডাক্তার ডাকে। ডাক্তার এসে আমাকে ঘুমের ওষুধ দেন। তার ফলেই আজ অনেকক্ষণ অবধি... তবে সকালে একবার ঘুম ভাঙামাত্র আমি ম্যাসনকে ডেকে পাঠিয়ে ওকে একটু খোঁজখবর নিতে বলি। ওর বক্তব্য, মূর্তি আর তার হাত যেখানে থাকার সেখানেই আছে। বরং আমিই স্বপ্ন দেখেছি নাকি!

আমি জানি, আমি স্বপ্ন দেখিনি। কিন্তু ম্যাসনকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেও ওই স্টল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কারণটা জানতে পারিনি। ফলে একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না পেলে আমার পক্ষে ওই চার্চে অন্ধকারের পর থাকা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। এবার আপনি যদি...”

“আমি একটাই পরামর্শ দিতে পারি।” বললাম আমি, “ওই সমাধিটা আমাদের খুলে দেখতে হবে।”

“জানতাম আপনি এটাই বললাম।” একটা বড়ো শ্বাস ফেলে বলল ট্র্যাভার্স, “কিন্তু ওটা করতে গেলে কী হবে ভাবতে পারছেন? আমাকে বিশপ আর হোম অফিস, দু’জায়গা থেকেই অনুমতি নিতে হবে। এমনিতেই কাল রাতের ঘটনায় আমি স্থানীয় লোকেদের গুজগুজ-ফুসফুসের কারণ হয়ে গেছি। এইসব করতে গেলে তো আর দেখতে হবে না! আপনি আর কিছু করতে পারবেন না?”

“তাহলে তুমি আপাতত নিজের স্টল থেকেই কাজকর্ম চালাও, সে যতই ঠান্ডা লাগুক না কেন।” আমিও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “ক’দিন আমি এখানে থেকে ওই সমাধির গায়ের লেখা, আর মূর্তিটা দেখি-বুঝি। মূর্তির ছবিটা লোকজনকে দেখাই, যদি তারা কিছু বলতে পারে। এর বেশি কিছু তো করা যাচ্ছে না তাহলে।”

সেযাত্রা আর উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। আমি পরদিন শহরে ফিরি। সেই মুহূর্তে নিজের কাজের চাপ ছিল প্রচুর। তবে আমি এও জানতাম যে ট্র্যাভার্সের ‘হাত’ থেকে এত সহজে রেহাই পাওয়া যাবে না। নিজের নোটসগুলো আমি ফাদার অ্যান্ড্রুজ-কে পাঠিয়ে দিই। কার্থুসিয়ান অর্ডার নিয়ে ভদ্রলোকের প্রচুর পড়াশোনা আছে, তিনি নিজেও একজন কার্থুসিয়ান। ওই সমাধিটা যিনি বানিয়েছিলেন সেই জন মেলকম্বে চার্টারহাউস, মানে কার্থুসিয়ান অর্ডারের সদস্য ছিলেন। তাই আমার মনে হয়েছিল, উনি এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারবেন। তিনদিন পর আমার কাছে অ্যান্ড্রুজের ফোন এল। ভদ্রলোক সোজা কাজের কথায় এলেন।

“আমাকে কাল একবার ব্র্যান্ডন সেন্ট গাইলস্‌ নিয়ে যেতে পারবেন? মনে হচ্ছে, আপনার দেওয়া ধাঁধার একটা সমাধান পাওয়া গেছে। তবে এখন এই নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না, প্লিজ।”

কথামতো পরদিন বেলা দশটায় লিভারপুল স্ট্রিটে আমি ফাদার অ্যান্ড্রুজের সঙ্গে দেখা করলাম। ওঁর সঙ্গে একজন খেটে-খাওয়া মানুষ ছিলেন। অ্যান্ড্রুজ ভদ্রলোককে “মিস্টার সিমসন” বলে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সিমসন কী করেন সেই নিয়ে অ্যান্ড্রুজ, বা সিমসন কিচ্ছু বললেন না। তবে সিমসনের সঙ্গে যে একটা টুল-ব্যাগ আছে, এটা আমার নজর এড়াল না। ওঁদের সঙ্গে কথা বলে ট্র্যাভার্সকে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে জানালাম, আমরা আসছি।

নরউইচে ট্র্যাভার্স সোৎসাহে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। ওর আনা গাড়িতেই আমরা সবাই ভিকারেজে এলাম। লাঞ্চ সারা হল। পুরো সময়টা অ্যান্ড্রুজ নানা হাবিজাবি বকে কাটালেন। সিমসন ভিকারেজের পরিবেশে যে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করছেন, এটা বুঝতেই পারছিলাম। তিনিও চুপ করেই ছিলেন। ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছিল, অ্যান্ড্রুজ কী ‘সমাধান’ পেয়েছেন। তবে গল্প-উপন্যাসের গোয়েন্দাদের মতো এই ভদ্রলোকেরও শেষ মুহূর্ত অবধি সবকিছু চেপে রাখার অত্যন্ত খারাপ স্বভাব আছে। আমি নিজেকে মোটামুটি সামলে রাখলেও ট্র্যাভার্স একেবারে ফুটছিল আগ্রহে।

লাঞ্চের পর আমরা সবাই মিলে ওই সমাধিটা, বিশেষ করে মূর্তির চারপাশে জমায়েত হলাম। অ্যান্ড্রুজ ফিসফিসিয়ে সিমসনকে কিছু নির্দেশ দিলেন। সিমসন নিজের ব্যাগ থেকে একটা ইলেকট্রিক লাইট বের করলেন। তারপর গর্তের মতো ঢুকে যাওয়া অন্ধকার খাঁজের মধ্যে সেটাকে এমনভাবে রাখা হল যাতে অ্যালাবাস্টারের হাতটার ঠিক পেছনে সেটা থাকে। অ্যান্ড্রুজ বোঝালেন, লাইটটা ঠিকঠাক রাখা হয়েছে। তাঁর ইশারায় লাইটটা জ্বালালেন সিমসন।

ট্র্যাভার্স তো বটেই, আমিও স্তম্ভিত হয়ে বুঝলাম, মূর্তির হাতটা নিরেট অ্যালাবাস্টার দিয়ে বানানো নয়। তার মধ্যে কিছু একটা আছে।

কবজি বরাবর কাটা, একটা শীর্ণকায়, কিন্তু সত্যিকারের হাত!

“কবজির কাছে একটা সূক্ষ্ম জোড় আছে।” আমরা এতই মন দিয়ে হাতটা দেখছিলাম যে অ্যান্ড্রুজের গলা শুনে চমকে উঠলাম। অ্যান্ড্রুজ বললেন, “মিস্টার সিমসন একজন দক্ষ স্টোন-ম্যাসন। উনি মূর্তির বিন্দুমাত্র ক্ষতি না করে, এবং সমাধিটা না ছুঁয়ে হাতটাকে আলাদা করে নিতে পারবেন, যদি আপনি অনুমতি দেন।”

সিমসন নাক আর গলা মিশিয়ে একটা আওয়াজ করে বোঝালেন, কাজটা ওঁর কাছে কঠিন হবে না।

“তাহলে...?”

ট্র্যাভার্সের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া অ্যান্ড্রুজের প্রশ্নটা চার্চের মধ্যে কিছুক্ষণ ঝুলে রইল। তারপর ট্র্যাভার্স, নিজের সঙ্গে স্পষ্টতই যুদ্ধ করতে-করতে, দ্রুত মাথা ঝাঁকিয়ে “হ্যাঁ” বোঝাল।

টুল-ব্যাগ থেকে সিমসন একটা পাথর কাটার করাত বের করলেন। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে, একেবারে মসৃণভাবে হাতটাকে মূর্তি থেকে আলাদা করে নিলেন সিমসন। হাতটা ফাঁপা ছিল। তার মধ্যে রাখা, প্রায় মমি হয়ে যাওয়া হাতটাকে অতি সাবধানে বের করে আনলেন ফাদার অ্যান্ড্রুজ। সেটাকে একটা নরম কাপড়ে সযত্নে মুড়ে নিজের অ্যাটাচিতে চালান করলেন তিনি।

ট্র্যাভার্সের মুখে বিদ্রোহ এতটাই স্পষ্ট হয়েছিল যে এবার অ্যান্ড্রুজ কিছুটা ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হলেন।

“এই হাতটা শুধু আমার অর্ডারের কাছেই মূল্যবান ভিকার। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, এই মূর্তির নীচে কবরে শায়িত এখানকার প্রাক্তন ভিকারের সঙ্গে এই হাতের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই হাতটা আমি সরিয়ে নেওয়ায় কবর, বা সমাধির বিন্দুমাত্র সম্মানহানি হচ্ছে না। বাকিটা আমি আপনাদের বলছি, তবে এখানে নয়। ভিকারেজে চলুন। ইতিমধ্যে মিস্টার সিমসন ফাঁপা হাতটাকে আবার মূর্তির সঙ্গে জুড়ে দিন, যাতে কেউ কিছু বুঝতে না পারে।”

সিমসন নিজের কাজে ব্যস্ত হলেন। আমরা ভিকারেজে ফিরলাম। ফায়ার প্লেসের পাশে, চায়ের কাপ হাতে বেশ গুছিয়ে বসলাম। ফাদার অ্যান্ড্রুজকে দেখে মনে হচ্ছিল, সদ্য-সদ্য একটা ভালো ম্যাজিক দেখিয়ে মঞ্চ থেকে নেমেছেন ভদ্রলোক। আমরা নিজেদের বেশ কষ্ট করেই চুপচাপ রেখেছিলাম। সস্নেহ হাসি দিয়ে সেটার স্বীকৃতি দিলেন অ্যান্ড্রুজ। তারপর কথা শুরু করলেন।

“১৫৩৫ সালে অষ্টম হেনরির আদেশে চার্টারহাউস বন্ধ করে দেওয়া হয়, এটা আপনারা হয়ত জানবেন। তবে কাজটা খুব সহজ ছিল না। বহু কার্থুসিয়ান যাজক রাজাকে চার্চের মাথা বানানোর চেষ্টা, এবং তার অঙ্গ হিসেবে দেওয়া এই আদেশ মানতে রাজি ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে অনেককেই শহিদ হতে হয়। জন ফক্স, আর এই চার্চের ভিকার জন মেলকম্বে চার্টারহাউস ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে ফাঁসিকাঠে চড়েননি, বা জেলে যাননি। বরং অ্যাংলিকান চার্চেই তাঁদের সম্মানের সঙ্গে জায়গা দেওয়া হয়। কুইনহিথ-এর সেন্ট মেরি ম্যাগডালেন চার্চের দায়িত্ব পান ফক্স। আর এই প্যারিশের দায়িত্ব নেন মেলকম্বে।

তবে বাইরে-বাইরে অ্যাংলিকান হলেও ফক্স যে আদতে কার্থুসিয়ানই থেকে গেছেন, এই খবর রাজার কমিশনারদের কাছে যায়। চার্টারহাউসের প্রধান হিসেবে শহিদ হয়েছিলেন প্রায়র হটন। তাঁর বাঁ হাতটা, কঠোরভাবে নিষিদ্ধ জেনেও, নিজের উপাসনার বেদীতে লুকিয়ে রেখেছিলেন ফক্স। খবর পেয়ে ফক্স দেশ ছেড়ে পালাতে সক্ষম হন। তবে তাঁর বন্ধুরা ধরা পড়েন। তাঁদের কারও ফাঁসি, কারও জেল, এই-সব সাজা হয়।

মেলকম্বে যখন হিংকম্যানের মৃত্যুর পর এই প্যারিশের ভিকার হন, তখন তাঁর কাছেও এমন একটা নিষিদ্ধ জিনিস ছিল। শহিদ হওয়া এক কার্থুসিয়ানের হাত। ফক্সের ভুলটা মেলকম্বে করেননি। লুকোনোর জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা যে চোখের সামনেটাই, এটা ভদ্রলোক জানতেন। তাই তিনি অ্যালাবাস্টার দিয়ে নিজের পূর্বসূরীর একটা মূর্তি তৈরি করান, তারপর তার মধ্যেই হাতটা লুকিয়ে রাখেন।

মূর্তিটা বানানোও হয়েছিল কেমন জায়গায়, সেটা ভাবুন। যখন গোটা চার্চ মূল বেদীর দিকে মাথা ঝোঁকাবে, তখন তাঁদের সামনে থাকবে ওই হাতটাই! ওইজন্য তিনি SANCTA MANUS কথাটা ওভাবে খোদাই করান। যাদের বোঝার তারা ঠিকই বুঝত, এই কবর তথা মূর্তির উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে “পবিত্র হাত”-কেই সম্মান জানানো হচ্ছে।

ভদ্রলোকের যে রসবোধ ছিল, এটা বোঝাই যাচ্ছে, তবে...”

কিছুটা সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে ট্র্যাভার্সের কাঁধ চাপড়ে দিলেন অ্যান্ড্রুজ। তারপর বললেন, “কিন্তু ঘটনার শ’চারেক বছর পরে এক অ্যাংলিকান যাজকের সঙ্গে এইরকম বদ রসিকতা, সে যেই করুক না কেন, মোটেই সমর্থন করা যায় না।”

ভদ্রলোকের গলাটা গম্ভীর ছিল বটে। কিন্তু তাঁর চোখগুলো যে দুষ্টুমিতে ঝকমক করছে, সেটা আমি অন্তত দেখতে পেয়েছিলাম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%