অমল চট্টোপাধ্যায়
পাখিটি এ—গাছ ও—গাছ করতে করতে কত গাছেই না বসে। একা একা মনের আনন্দে শিষ দেয় মিষ্টি স্বরে। কখনো দুষ্টুমি করে গাছের পাতায় আড়াল হয়ে চমকে দেয় পথ দিয়ে যাওয়া পথিকদের, বলে আমি টুসি। ভালো থেকো। পথিকদের কেউ বলে ওঠে, আরে—ও এক পাখি, কি সুন্দর আমাদের মতো কথা বলে। যারা সামনে থাকে তারা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে, গাছে না দেখতে পেয়ে আর এক গাছে। না দেখতে পেয়ে বলে দুর এমন হয় নাকি। কথা বলা পাখি দেখা যায়। কিন্তু এমন সুন্দর মানুষের মতন। অবিকল এক বাচ্চা মেয়ের গলা।
আর এক জন বলে, সব হয়। মন আর চেষ্টা থাকলে যে তোমার কাছে কিছু চায় সে তাই শিখবে। তাই পাবে টুসি নামে পাখিটি যে স্থানে ও থাকে সেখানে হরেক রকম গাছ। সরস নীরস সব মিলিয়ে, ফুলের এক সুন্দর বাগান আছে সেখানে। তারই সামনে হলুদ রঙের সুন্দর দেখতে দোতলা বাড়ি। বাড়ির এক তলার বাবান্দায় ঝোলানো লোহার বড় খাঁচা। তবে রঙ করা। খাঁচার দরজা সব সময় থাকে খোলা। ওই খাঁচাই হলো টুসির বাসস্থান। তবে ওই খোলা দরজা দিয়ে টুসি তার ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ায় যেখানে সেখানে। ইচ্ছে হলে ওই বাড়িতেই। খাঁচায় থাকা—খাবার খেতে ইচ্ছে না হলে উড়তে উড়তে চলে যায় তার ভীষণ আপনজনের কাছে। এবং মিষ্টি স্বরে বলে মা ক্ষিদে পেয়েছে। আপনজন কি ওর কথা না শুনে থাকতে পারে তাই তাঁর হাতে থাকা খাবার সেই সব খাবারই তৃপ্তি করে খেয়ে একবার মিষ্টি স্বরে মা বলে ডাক দিয়ে চলে যায় আবার কোনো স্থানে টুসি।
পাখিটির মা বলতে মীনাদেবী পঞ্চাশের কাছে বয়স। উদার সারল্য এই ভদ্র মহিলা। কোনো অভাগী এসে তার দুঃখের কথা শুনিয়ে তাঁর হৃদয়ে কান্নার বোঝা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া আরো সৎকার্যে তিনি নিঃস্বার্থে এগিয়ে এসে দাঁড়ান পাশে। দয়া তাঁর কাছে পবিত্র ছাড়া কিছু নয়। কিছু ভালো কাজে দয়া খাটে না। সম্মানও বাড়ে না। সম্পর্ক আরো ঘোলাটে ছোট করে দেয়।
সবাইকে আপন করে নেয়াটাই ভালোবাসা জন্মায়। মীনাদেবী তাই মনে করে। তাঁর স্বামী হিতেন রায়। মীনাদেবীর এই মহৎ কাজকে আরো সুন্দর করে রাখতে প্রয়োজনে সাথে থাকেন। রাস্তার কুকুরগুলো পর্যন্ত তাঁদের কাছে ভীষণ আপন। এক ছেলে অহন আর মেয়ে অহনা। অহনার বিয়ে দিয়েছে ভালো ঘরে। ছেলে অহন তাঁর বোনের থেকে দুবছরের বড়। থাকে বিদেশে। কয়েক মাস বাদে ফিরবে। ইচ্ছে এখানেই প্র্যাকটিস করবে। ওর বাবা—মায়ের ইচ্ছে ডাক্তার হয়ে শুধু রোজগারের পথটা বেছে নিও না। অসহায় মানুষগুলোর দিকে ধ্যান রেখো।
অহনেরও তাই ইচ্ছা।
মীনাদেবীর সব কাজেই যথাসাধ্য ভাবে হিতেনবাবু সময় দেবার চেষ্টা করেন। ভালো পোস্টে রেলে চাকরি করতেন। অবসর নেওয়ার পর যেখানে থাকতেন সেখানকার পাট চুকিয়ে দক্ষিণ কলকাতায় ওনার বাবার বাস্তুভিটায় এসে ওঠেন। পুরোনো বাড়ি। ঠিকঠাক করে এখন ওনারা বসবাস করেন। আশপাশে মানুষজনদের সাথে মিশে ভালোই আছেন। সৎ কাজে যুক্তি দেন, মেনেও নেন কেউ। সেই হিতেনবাবু একদিন মীনাদেবীর একান্ত ইচ্ছায় প্রথমে অবাক হন। তারপর প্রাণ খোলা হেসে নিয়ে বললেন, এ প্রস্তাব ভালো। কিন্তু বন্দি হয়ে থাকার চেয়ে আকাশটা কি ওর প্রিয় নয়? ওদের প্রকৃত সুখ আকাশ, ডানা মেলে ওড়া। গাছের ডালে ডালে বসে হুটোপাটি করা। আনন্দে শিষ দেওয়া। এসব ছেড়ে ও তোমার কাছে থাকবে বন্দি হয়ে? মীনাদেবীর নাছোড়বান্দায় শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন হিতেনবাবু। এবং কিনে আনলেন এইটুকু এক চন্দনা পাখি, এই সেই পাখি হলো মীনাদবীর টুসি। যে এখন ইচ্ছেমতো মনের আনন্দে মেলে দেয় ওর পাখনা, মুক্ত আকাশে, তাঁর ছেলেমেয়ে ছাড়া মন বলে টুসিরও সে মা। টুসি সারাদিন ইচ্ছে হলে যেখানে সেখানে উড়ে যায় সময়মতো খায়, আবার যায়, তবে সন্ধের আগেই ওর ঘর অর্থাৎ খাঁচার ভেতর যায় ঢুকে। খাঁচার দরজাও সেই সময় বন্ধ করে দেন শ্যামা। শ্যামা হলো কাজের মেয়ে একাজটা ওকেই করতে হয়। এছাড়া বাড়ির কাজ তো আছেই। তবে ও বাড়ির সব কিছু নিয়েও সুখী। আর একদিন সেই মীনাদেবীর ইচ্ছায় হিতেনবাবু তাঁর স্ত্রীর মনোবাসনা পূর্ণ সমর্থন করে মৃদু হেসে বললেন সত্যি তো টুসি অমাদের বড় হয়েছে অথচ এখনো চুপ হয়ে আছি। আজই টুসির পছন্দসই একটি পাখি কিনে আনবেন।
মীনাদেবী কিছুদিন ধরেই ভাবছিলেন টুসি বুঝতে শিখেছে তাই ওর মনে ধরার মতো এক সাথি দরকার। ওদের এই ফাঁকটুকু পূরণ হলেই ওদের যেমন আসবে পূর্ণ স্বাধীনতা, তারও তরঙ্গে এক অপরূপ সুরের বাজনা স্পর্শ করে যাবে সর্বক্ষণ।
একদিন স্বচ্ছ আকাশ, গাছের পাতার গায়ে গায়ে বিকেলের শেষ স্নিগ্ধ আলো। পৃথিবীর চারপাশ ঘিরে সবটায় স্নিগ্ধতায় ভরা, গাছে গাছে পাখির সার। আকাশে নিশ্চিন্তে ডানা মেলে এক নয় দুই নয় অনেকে ওরা উড়ছে। টুসিরও চঞ্চলতা দেখা যায় এ ডাল থেকে আর এক ডালে গিয়ে উড়ে বসা। কখনো আর এক গাছে, কখনো খেয়ালে উড়ে যায় আকাশে। মীনাদেবী তাঁর বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে ফুলের বাগানের পাশে উঠোনটার সামনে এসে দাঁড়াল। তাকান ও গাছ থেকে আর এক গাছে। দেখতে পান তাঁর টুসিকে। টুসি গাছের ডালে বসেছিলো। সম্ভবত মীনাদেবীকে দেখতে পায়। তৎক্ষণাৎ ও শিস দিয়ে ওঠে একবার নয় বহুবার। একবার মা মা বলেও ডাকে। মীনাদেবী আনন্দে শিশুর মতো হয়ে হাত তালি দিতে দিতে টুসিকে বলেন টুসি তুই কি সুখী। মুক্ত আবহাওয়ায় নিশ্চয়ই তুই সুখী। কিন্তু মনের মতো সঙ্গী না পেয়ে এতো কিছু পেয়েও কি সুখ আসবে? এবার আসবে, তুই আমার টুসি মা। আমি আছি না!
টুসি কি জানি মীনাদেবীর কথা বুঝতে পেরেছে কিনা কিন্তু সজোরে ওর ভাষায় সাড়া দিয়ে যায়। তারপর ডালে বসা অবস্থায় একবার দোলও খেয়ে নেয়, ওর পাদুটো গাছের ডালে আটকে। তারপর গাছের পাতার ফাঁকে আড়াল হয়ে যায়।
শেষ বেলা সূর্য ডুবেছে কিছু সময় আগে। সন্ধ্যার সবে আধো ছায়া চারপাশ ঘিরে। গাছের পাতার উজ্জ্বলতাও ফিকে হয়ে আসছে। আকাশে তখনো কিছু পাখি হয়তো যে যার বাসায় ফিরছে। গাছে গাছে পাখিদের কাকলি। কিন্তু তখনো টুসি আসেনি তার ঘরে।
এরই মধ্যে এলেন হিতেনবাবু। হাতে খাঁচা, খাঁচার ভেতর সুন্দর দেখতে তেল ঝরানো চন্দনা পাখি।
মীনাদেবী আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললেন এমন না হলে কি আমার টুসির সাথে মানায়? তা তুমি ঠিক বুঝে এনেছ তো?
হিতেনবাবু হাসতে হাসতে মীনাদেবীর কানের কাছে মুখ নিয়ে মিষ্টি করে বললেন পুরুষ নয় সুপুরুষ।
মীনাদেবী ধ্যেত বলে এদিক—ওদিক তাকাতে তাকাতে উচ্চস্বরে ডাকতে থাকেন টুসি কোথায় তুই, আয় দেখবি তোর মন পাবার মতো তোর এক প্রিয় সঙ্গী এসেছে। কত ডাকলেন মীনাদেবী, তবু টুসির দেখা নেই। অনেকক্ষণ এই ভাবে এক গাছ থেকে আর এক গাছে এরকম দেখতে দেখতে হঠাৎ তারই সামনে একটি সরস গাছের নীচের ডালে মীনাদেবী দেখেন তাঁর টুসিকে, তবে টুসি একা নয়। এক রোমান্টিক সিনের মতো দুজনকে। মীনাদেবী এই দৃশ্য দেখার পরও ডাকতে গিয়ে আর ডাকলেন না। শুধু মুচকি হাসলেন।
হিতেনবাবুও এই দৃশ্য দেখে নিয়ে হতাশ কণ্ঠে বললেন এই পাখিটিকে কি কৈফিয়ত দেবো? রাগ হবে না ওর। কি করি। মীনাদেবী এক ঝলক হেসে বললেন সুস্বাস্থ্য। দেখতে ভালো। অভাব হবে না। ছেড়ে দাও। আমাদের দেখতে হবে না। এখন যুগটাই আলাদা। ও নিজেই খুঁজে নেবে ওর মনেধরা কাউকে। যে এগিয়ে আসবে স্ব—ইচ্ছায়। বাইরে খোলা আকাশ। গাছপালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় আরো সব বাড়ি। বয়সের ডিঙি ওপারের মাঝ দরিয়া ছাড়িয়ে গেলেও এখনো যে তিনি স্রোতে ভাসেন। মনে নেই আছেন কোথায়, তাই হঠাৎই মীনাদেবীকে জড়িয়ে বলেন, হিতেনবাবু তুমি যে আমার চিরদিনের। আই লাভ ইউ।
মীনাদেবী তাঁর মাথায় কাঁচা—পাকা চুলে হাত বুলিয়ে বললেন ধ্যেত। বয়স কি এখন কচিপাতা?
হিতেনবাবু জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বললেন, মনকে জিজ্ঞেস করতে গেলে আমার মনটাই যে আমাকে ধমকে ওঠে। বলে কি জানো— এখনো রয়েছে ফাগুন, শুনি কুহু কুহু মিষ্টি ধ্বনি। আর মীনাদেবী স্বামীর মুখের কাছে তাঁর মুখটি এনে ঘষে দিয়ে স্বলজ্জ হেসে বললেন, অসভ্য।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন