অমল চট্টোপাধ্যায়
ভীষণ ঠাণ্ডা। উত্তরে হাওয়া বইছে। আগের দিন আবার এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। একেবারে হিম ঠাণ্ডা। আমার ধারণা আজ ঠাণ্ডা আরো বেশি।
আমার বস জীতেন বোসের বাড়ি হতে বেরোতে বেরোতেই রাত নটা প্রায়। রাস্তায় পা দিতেই ঠাণ্ডায় হাত পা আমার সিঁটিয়ে যাবার মতো অবস্থা। যদিও যথেষ্ট গরম পোশাক আমার গায়ে। জীতেন বোসের বাড়িতে সন্ধ্যার আয়োজনটি মন্দ হয়নি। শরীরটিকে গরম রাখার ব্যবস্থাও ছিল ভালোরকম। যদিও সেটি ধাঁচে আমার সয় না। খাবার ব্যবস্থা অতি উত্তম। তা সত্ত্বেও ঠাণ্ডা আরো জেঁকে বসে আমার সর্বাঙ্গে। রাস্তায় লোক অবশ্যই খুব কম। যদিও মেইন রাস্তায় জীতেন বোসের বাড়ি নয়। একটু ভেতরে, বাস না চললেও ট্যাক্সি বা অন্যান্য গাড়ির যাতায়াত আছে। আজ তাও এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি। রাস্তার দুপাশে দোকানগুলো পর্যন্ত বন্ধ। আশ্চর্য হবার মতো নয় কারণ এতো কিছু গরম জামাকাপড় পরা সত্ত্বেও পাহাড়ে ঠান্ডার মতোই আমাকে ক্রমশ কাবু করে ফেলছে।
ফুটপাথ ধরে হাঁটছি। বাস স্টপেজ এখনো এ প্রান্ত থেকে দশ মিনিটের রাস্তা। হলুদ ট্যাক্সিতে দূরের কথা Ola uber—এ No. Calls দেখাচ্ছে। জানি না বাস পাবো কি না। যদিও সময় এখনো চলে যায়নি। তবু তাড়াতাড়ি হাঁটবার চেষ্টা করছি কিন্তু প্রকৃতির এই শক্তির কাছে আমার চলবার ক্ষমতা যেটুকু ছিলো তাও আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যায় প্রায়। কয়েক পা এগোই তো মনে হচ্ছে আমি পিছিয়ে পড়ছি, কারণ এতো ঠাণ্ডায় আমি আর হাঁটতে পারছি না।
মনে মনে ভাবছি না এলেই পারতাম। অজুহাত একটা কিছু বলে দিতাম। বিশেষ করে প্রকৃতির সাথে এইভাবে নিছক বোকামো না করে তার সাথে সন্ধি করে নরম বিছানা আর লেপটি আমার সর্বাঙ্গে দিয়ে রাখতাম তাহলে প্রকৃতির এই বদমেজাজি রূপটাই আমার কাছে পরম সুখদায়ক হয়ে উঠতে পারতো। যদিও এখন এসব ভাবা মানে কপালে আরো দুর্ভোগ ছাড়া আর কি হতে পারে? চেষ্টা করছি পা চালাতে, বিপদে মানুষ সব কিছু ভুলে গিয়ে যেমন একজনকেই স্মরণ করে, আমারও তখন সেই একই অবস্থা।
হঠাৎ একটু এগোতেই দেখি অদূরে কয়েকজনকে আগুন পোহাতে। সেই মুহূর্তে মনে হলো প্রকৃতির এই ভীষণ ঠাণ্ডার থেকে যদি একটু রেহাই পাওয়া যায় তাহলে এখনি আমাকে ওখানে যেতে হয়, এবং শরীরটিকে কিছুক্ষণ গরম করে রাখা উচিত। কিন্তু যাবো কি যাবো না এরকম একটা ভাবনা নিয়ে এক সময় দেখলাম আমি সেদিকেই এগিয়ে গেছি। কিন্তু যখন সামনে গেলাম দেখি কয়েকটি অতি নিম্নশ্রেণির বাচ্চা ছেলে—মেয়ে রাস্তার ফুট পাথে বসে আগুন পোহাচ্ছে। গুটি কয়েক বাচ্চা ছেলে মেয়ের মধ্যে দশ—বারো বছরের একটি মেয়েও ওখানে। ওই মেয়েটিই আগুনকে ধরে রাখার ব্যবস্থা করছে।
আমাকে দেখে প্রথমে ওরা ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায়। আমিও যে একটু ভয় পাইনি তা নয়। উদ্দেশ্য যদি ওরা চিৎকার করে। যদি ওদের চিৎকারে দলবদ্ধ হয়ে আমাকে আক্রমণ করে? এবং বেশিরভাগ ওরা হয় ভয়ঙ্কর। সুতরাং উদ্দেশ্য ওদের ভালো নাও হতে পারে।
কিন্তু কেন জানি না এতো কিছু জানা সত্ত্বেও আমি আগুনের ওই তাপটুকু পাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। স্থির হয়ে প্রথমে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর চোখ ফেরাতে দেখি ওরা জড়সড়ো হয়ে কেমন যেন একটা ভয় ভয় চোখে আমাকে দেখছে। কোনো আওয়াজ নেই। চুপচাপ হয়ে বসে। এবার আমার মনে হল, ওরা আমায় দেখে ভয় পেয়েছে। কিন্তু এতটা ভয় পাওয়ার ওদের কি কারণ থাকতে পারে? যে ধারণাটা আমার ছিলো, এখন মনে হচ্ছে আমার এখানে আসাটাই কি এই বাচ্চাগুলোর ভয়ের কারণ। কিন্ত কেন? আমার পোশাকটাই কি এর মূল কারণ? মাথায় আমার কান অবধি ঢাকা টুপি, পরনে গরম জামা প্যান্ট, ফুলহাতা সোয়েটার এবং পায়ে বুট। ঠান্ডা না ঢোকার কড়া ব্যবস্থায় ছিলো তবু ঠান্ডায় আমায় কাবু করে ফেলেছিলো। তাই এই তাপটুকু পাওয়ার আশায় আমার এখানে আসা। জানি না কেন ওরা আমাকে দেখে এতো ভয় পেলো। ওদের তো ভয় পাওয়ার কথা নয়, বিশেষ করে রাস্তায় যাদের বাস। রাত দিনের তফাত বোঝে না। রাস্তাই এদের সব। তবে কি ওরা আমায় নিয়ে অন্য কিছু ভাবছে। হতে পারে। কারণ ওরা মানুষ হয়েও সভ্য জগৎ থেকে একেবারেই বঞ্চিত। আমার এরকম পোশাক ওদের কাছে তো বেমানান লাগবেই। ওদের পোশাক—পরিচ্ছদ, আচার—ব্যবহার সব মিলিয়ে একেবারেই আলাদা। জানি না আমি মানুষ এ কথাটি ওরা বোঝে কিনা। তবু চোখ আছে ওরা দেখে প্রয়োজনে হাতও পাতে। রাস্তায় নিকৃষ্ট জীবের মতোই বলা যেতে পারে।
যাইহোক ও সব চিন্তা না করে হাতদুটো আগুনের তাপে মেলে ধরি। একটু বাদেই বেশ আরাম বোধ করি। পোশাকগুলো পর্যন্ত রীতিমতো গরম লাগছে। শরীরটাও গরম লাগছে। অনায়াসে এবার ইচ্ছেমতো নড়াচড়া করতে পারি, একবার হাত পা ছুঁড়ে যাবে বলে ক্যারাটে মারার মতন ভঙ্গিও করে ফেলি। যদিও ক্যারাটের কিছুই আমি জানি না। বুঝিও না। তবে বুঝতে পারছি এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু নতুন করে এক সমস্যা হলো যে আমার এই সব ভাবভঙ্গি দেখে ওরা আরো আমার কাছ হতে পিছিয়ে বসে। এতোটাই ওরা পিছিয়ে বসে যে আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি ওরা আর আগুনের তাপ তেমন পাচ্ছে না। তবু আরাম এই ছোট্ট কথাটি এতো ভারি এতো স্বার্থপর যে আমি নিজেই নিজের কথা ভেবে এটাকে আরো বেশি করে পাবার আশায় আরো স্বার্থপর হয়ে ফিরে তাকাই না যারা নিঃসম্বল হয়েও নিস্বার্থ ভাবে আমার একটা বিরাট উপকার করলো। উপকারটুকু সামান্য হলেও এই মুহূর্তে এর মূল্য যদি আমি স্বার্থপর না হতাম তাহলে নিশ্চয়ই এর দাম বুঝতাম। আর এতোটা স্বার্থপর হতাম না। কিন্তু হয়েছি, এবং এটাই স্বাভাবিক। না হলে সমাজের রূপটাই এতোদিনে পাল্টে যেতো। এটাই আমাদের মতো মানুষদের একটা বিরাট চরিত্র। এই চরিত্র নিয়ে মান বাড়ে সত্য, মন ভরে কিনা কোনোদিন বুঝতে দিইনি। এখানেও মানটাকে বড় করে দেখছি। মন সে শুধু চায়।
এবার দাঁড়িয়ে না থেকে শরীরটিকে আরো গরম করার জন্যে এবার উবু হয়ে বসি। এতে আরাম আরো বেশি পাচ্ছি। আরামে চোখদুটো আধবোজা হয়ে আসে। মনেই ছিল না আমাকে ঠিক সময়ের মধ্যে বাস বা ট্যাক্সি যদি পাই ধরতে হবে। হঠাৎ মনে পড়তে উঠেই প্রথমে ঘড়িতে চোখ রাখি, নটা চল্লিশ। সুতরাং আর নয়। একবার শরীরটাকে আড়মোড়া করে নিই। তারপর তাড়াতাড়ি করে হাঁটতে যাই, সবে কয়েক পা এগোই হঠাৎ মেয়েলি গলায় কে মৃদু স্বরে চিৎকার করে ওঠে বাবু—আমি বিরক্ত হয়ে একবার দাঁড়াই, তারপর আবার হাঁটা দিই। কিন্তু মেয়েটির গলা আবার শোনা যায় বাবু, আমি ভীষণ বিরক্ত হয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক এসব কাঙাল শ্রেণির ধর্মটাই এমন, হাত পাতাটাই এদের জন্মগত স্বভাব। এর জন্যে কাউকে শিখিয়ে দিতে হয় না। আমিও বা কেমন শুধু শুধু সময় নষ্ট করে এদের কাঙালপনা কথা শুনতে দাঁড়িয়ে পড়ছি। কি উপকারে আসবে এদের হাত পাতার গল্প শুনতে। এখন শুধু ভাবছি কখন পৌঁছবো আপনজনদের কাছে। এখন হাঁটতে মোটেই কষ্ট হচ্ছে না। আগুনের তাপ এখনো সারা অঙ্গে ছড়িয়ে রয়েছে।
হাঁটার গতিও বেড়েছে। সুতরাং আর দাঁড়ানো নয়। আরো জোরে হাঁটবার চেষ্টা করি। কিন্তু ফের বাবু বলে চিৎকার। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাঁড়াই। এবং পেছন দিকে তাকাতেই দেখি দশ—বারো বছরের সেই মেয়েটি যে আগুনকে ধরে রাখার ব্যবস্থা করছিলো। সেই মেয়েটি আমার দিকে ছুটে আসছে। কারণটা কি বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। তবে মতলব যদি অন্য হয়। ভাবছি না, চলে যাওয়াটাই ভালো আরতো একটু এগোলেই বাসপথ। এসব ভাবতে ভাবতেই মেয়েটি আমার কাছে এসে দাঁড়ায়। আমি ভীষণ বিরক্ত হই। কিছু ভদ্র হয়েও অভদ্র কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে প্রায় আসতে যেতেই মেয়েটি ওর ডান হাতটি ওপরে তুলে ধরে আর আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি ওর হাতের দিকে কারণ আমার মানি ব্যাগটি ওর হাতে ধরাছিল।
সেই মুহূর্তে আমার কি হয়েছিলো জানি না। তবে একটা কথা ভাবতে আমার লজ্জা হয়নি আমি সত্যি মানুষ তো?
মেয়েটি আমার দিকে তাকাতে ভয় পাচ্ছিলো মাথা নীচু করে মানি ব্যাগটি দেখিয়ে আস্তে আস্তে বলে, বাবু এটা তোমার, পড়েছিল। আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না। আমি যখন উবু হয়ে আগুনের ধারে বসেছিলাম হয়তো সেই সময় কোনো—না কোনোভাবে আমার প্যান্টের পকেট থেকে মানি ব্যাগটি পড়ে যায়।
মানি ব্যাগটি হাতে নিয়ে দেখে নিই ঠিক ঠাক আছে। এবার এর জন্য ধন্যবাদ না দিলে স্বভাবতই আমাকে অসভ্য বলা যেতে পারে। তাই গম্ভীর গলায় ধন্যবাদ বলতে গিয়ে আমি আমার সব শিক্ষা এবং আচার—ব্যবহার সবকিছুই কেমন যেন গুলিয়ে ফেলি। আমি একজন শিক্ষিত। মানমর্যাদা নিয়ে চলি। অতিমাত্রায় ভদ্র মানুষটি বিশেষ করে আমার পোশাক—পরিচ্ছদ চালচলন সবই প্রায় সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে তালে তাল রেখে চলে। অথচ সেই সভ্য মানুষটি কেমন নির্লজ্জ হয়ে তাঁর হারিয়ে যাওয়া মানি ব্যাগটি হাতে পাওয়া সত্ত্বেও দেখে নেয় ব্যাগটির ভেতরে সব ঠিক আছে কিনা। হয়তো এখানেই বুঝিয়ে দেয়, দীন দরিদ্রের সেবায় কি উঁচু মানুষের মন ভরে? এদের মান যে বড্ড ওপরে, তলার ছায়া কি চোখে পড়ে?
আমি সত্যি আশ্চর্য হই শীর্ণ চেহারা এই মেয়েটি যে অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে কখনো না খেয়ে থাকে। প্রচন্ড এই ঠান্ডায় রাস্তায় একটু আগুন জ্বেলে পৃথিবীকে আঁকড়ে বাঁচার কতই না লড়াই। হয়তো একদিন পৃথিবীর এক বিন্দু আশীর্বাদ না পেয়ে ও চলে যাবে। এখন মনে হলো ও যা দিলো আমি কি আমার শিক্ষা আমার সব কিছু বিচার করে পেরেছি ওর কাছ থেকে এগিয়ে যেতে?
তাই ভদ্র মানুষটির ধন্যবাদ দেওয়া শোনার পর ওর কি কিছু উপকারে আসবে? না পৃথিবী প্রাণ ভরে হাসবে? তার চেয়ে যদি এই মানি ব্যাগটি ওর কাছে থেকে যেতো তবে সেই হিসেবে মানি ব্যাগটাই হয়তো বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়তো। যে দুঃখকেই এতো কাল বয়ে বেড়ালো, অথচ সুখ যে কি এর অর্থ না বুঝলেও ক্ষিদে মেটানোর হিসেবটা ও নিশ্চয়ই বোঝে। সুতরাং আমার মানিব্যাগটির ভেতরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা যদি ও নিতো নিশ্চয়ই ও বা ওর পরিবারকে কয়েক সপ্তাহ তৃপ্তি দিতে পারতো? আমার ধন্যবাদ দেওয়া থেকেও টাকাটা ওদের কাছে অনেক সুখদায়ক। গালিগালাজ ওদের কি আসে যায়। কেন না ওদের গায়ের চামড়া দুঃখ দিয়ে মোড়া। তাই ভদ্রসমাজে অভদ্র আচরণ ওদের যায় আসে না।
যারা চিরকাল কিছু পেলে না। যারা অনাদরে থেকে থেকে নিজের জীবনকে নিয়ে ভাবে না। তারা সভ্য ভাষা ধন্যবাদ দেওয়া, এর মর্ম কি বুঝবে?
বাচ্চাগুলো আর আগুনের কাছে বসে নেই। ওরাও এগিয়ে আসে তবে আমার কাছে নয়। কিছু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। আগুনের তাপের আলোয় ওদের অসহায় মুখগুলি তখন দেখেও আমি গুরুত্ব দিইনি। কারণ তখন আমার মান ছিলো, মন ছিলো, পবিত্র নয়। কারণ আমার শিক্ষার মানটা ছিলো ওপরে মনটা ছিলো আঁধারে। এখন নিজেকেই কেমন ছোট লাগছে। বস—এর বাড়ির এতো আয়োজন, এতো আনন্দ, এর আসল অর্থ কি? এটাই পরম সুখ? শুধু আমরাই সব ভোগ করবো। আর যারা আশা করে থাকে? এর উত্তর আমিই বা কি করে দেবো। আমি নিজেই যে সেই দলের একজন। বিচারে আমাকেই একজন আসামি বলা যায়।
আমার এই মুহূর্তে কেন জানি না স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত বাণীটি মনে পড়ে যায় ''হে ভারত ভুলিও না, ভুলিও না, দরিদ্র অজ্ঞ মুচি—মেথর সবাই তোমার ভাই...''
আদর্শ এই সত্য বাণীটি আমরা মনে রাখি। আমাদের স্বার্থে ত্যাগে নয়। যদি সত্যি অন্তর থেকে তাঁর বাণীটি গ্রহণ করতাম, তাহলে দেশে আজ এতো বাদ বিচার থাকতো না। মানুষ মানুষকে আপন করে তার ভালোবাসার দীপশিখায় ভরিয়ে রাখতো সারা দেশকে। মানুষ হতো প্রকৃত মানুষ। কিন্তু আমরা এই মহান মনীষীর আদর্শ বাণী মাঠ ময়দান আনাচে—কানাচে সব স্থানেই শোনাই সে আমাদের স্বার্থে, বিচার করতে গেলে আমরা ভীষণ স্বার্থপর লোভী। কারণ প্রকৃত ভালোবাসা কি, সেটাই ভাবি না। আমরা ভালোবাসি শুধু নিজেকে। আর আমার পরিবারকে।
বলতে আমার লজ্জা করছে। এই মহান মনীষীকে আমি অন্তর থেকে গ্রহণ করিনি। অথচ তাঁর ফটো আমার ঘরে তাঁর লেখা বইও রয়েছে আরো পাঁচটা বইয়ের সাথে।
আমি মেয়েটির দিকে তাকাই এগিয়ে যাই আরো কাছে। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে চেয়ে থাকে আমার দিকে। আমি স্নেহের বশে ওর মাথার রুক্ষ চুলে হাত বুলিয়ে বলি, আমাকে ভয় লাগছে।
মেয়েটি মাথা নীচু করে থাকে। আমি আরো একবার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বার করে ওর হাতে দিয়ে বললাম তোর বকশিশ। মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি একটু মিষ্টি হেসে বললাম, চলি। সবাই মিলে আনন্দ করবি। ভালো থাকিস। পরক্ষণে মনে হলো আবেগের বশে এই কথা কটি না বললেই পারতাম। কারণ আমার সামান্য দেওয়া এই কটা টাকা ওরা কদিন আনন্দে কাটাবে?
যে কদিন। তারপর—
হাঁটতে থাকি, হাঁটতে তেমন কষ্ট হচ্ছে না। যদিও ঠান্ডা সেই একই রকম। তবু হচ্ছে না।
একটু জোরে হাঁটতে থাকি। বাস রাস্তায় এসে গেছি। ভাবছি ট্যাক্সি পেলে ভালো হয়। ভাগ্য ক্রমে পেয়েও গেলাম। কিছুক্ষণ বাদে আপজনদের কাছে ফিরে যাব। কিন্তু আমার মন কেন জানি না বারে বারে ওদেরকেই ভাবাচ্ছে। হাড় গিলে চেহারা, শুকনো মুখ, ধুলো ময়লা জামা খালি পা। ছেঁড়া বস্ত্র পরা, সেও ধূলায় মাখা। সেই বাচ্চাগুলো ঠান্ডার হাত থেকে একটু রেহাই পাবার আশায় এখনো খড়কুটো জোগাড় করে আগুন জ্বালিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। কি জানি কতক্ষণ চলবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে এই লড়াই। সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত কি না? আর ভগবান একটা ব্যাপারে সজাগ। জন্মেছ, সুতরাং ক্ষিদে থাকবে। পৃথিবীর সবই তো দিলাম। নাও প্রাণ ভরে। কিন্তু নেবার রাস্তা বন্ধ। নেবে কোন পথে? এর উত্তর কে দেবে? এসব কথা ভাবতে গেলে আমি নিজেই নিজের কাছে দোষী। এতো কিছু দেখার পর অনেকক্ষেত্রে চরিত্র বদলায়। আমার কি বদলাবে?
ওই বাচ্চাগুলোর মতো আমার ছেলের বয়স। নামি কনভেন্ট স্কুলে পড়ে। ছেলে আমার নরম বিছানায় নিশ্চয়ই এখন ওর মায়ের পাশে বসে কিংবা লেপের তলায় অর্ধেক দেহ ঢেকে টিভির পর্দায় মনোযোগ দিয়ে তাঁর মায়ের কোল আঁকড়ে রয়েছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন