বিবেক

অমল চট্টোপাধ্যায়

জ্যেঠু, পাঁচ টাকা দাও।

সবে সদর দরজার বাইরে পা রেখেছেন বিজনবাবু। পেছন ঘুরে তাকান, বলেন কিছু বললি?

ফ্রক পরা মেয়ে নীলা। ছোট ফ্রক, ভীষণ আঁটসাট। গায়ের সাথে সেটে আছে। একটুও ঢিলেঢালা নয়, নীলাকে ওর বয়স অনুপাতে বড়ই লাগে।

বিজনবাবু মৃদু হেসে নীলার চিবুক ধরে আদুরী সুরে বললেন বল কি চাই। কিছু চাইছিস?

নীলা হাঁপাচ্ছিলো, হাওয়ার দোলায় গাছে ধরা ফলেরই মতো ওঠা নামা করছিলো ওর বুক। বিজনবাবুর নজর সে দিকে। একবার নিজের বুকে হাত বুলিয়ে নিলেন বিজনবাবু।

হয়তো নিজের কিছু মনের কথা বলতে গিয়ে নিজেই বুড়ো ভালুক হয়ে গাছে চড়তে চাইলেন, শুধু একটু টাটকা মধুর আশায়। একটু কেশে বিজনবাবু বললেন, এতো হাঁপাচ্ছিস যে, বল কি হয়েছে। নীলা হাঁপাতে হাঁপাতেই বলে, বারে সিঁড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি নামতেই না হাঁপিয়ে গেলাম। দাও পুজোয় দুল কিনবো, দাও না জ্যেঠু।

বিজনবাবু নীলার কাছে আর একটু এগিয়ে এসে হাত বুলিয়ে দেন ওর মাথায় মুখে এমনকি গলার নীচ পর্যন্ত। বললেন খুব দুঃখ হয় রে তোর কষ্ট দেখলে।—হ্যাঁরে তোর জ্যেঠি কোথায়?

নীলা বলে ঠাকুর ঘরে। বিজনবাবু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন বেশ বেশ, তারপর একবার এদিক—ওদিক তাকিয়ে বললেন, আর তোর দিদি মণি?

নীলা হেসে বলে দিদিমণি সবে বাথরুমে গেলো। বেরোতে আধ ঘন্টার বেশি। আমি ডাকবো জ্যেঠু।

বিজনবাবু নীলার গালটি টিপে বললেন, দুর বোকা, তুই আছিস আর চিন্তা কি। তুই আমার ফুলটুসি।

নীলার মধ্যে অস্তিরতা ভাব। বললে জ্যেঠু বললাম না টাকাটা দাও। মা যদি দেখে ফেলে বকবে।

বিজনবাবু বিরক্ত ভাবে বললেন, কেন, বকবে কেন? তোর মা আমায় কি মনে করে? আরে কাছে না এলে কি বোঝা যায় আমি কেমন। মিশতে হয়। যেমন তুই বুঝিস। তবু ভালো শাড়ি পছন্দ করে পুজোয় তোর মাকে শাড়ি আমিই দিই।

নীলা মাথা নাড়ে। বলে আমার মা রান্না করে তাই দাও। আমাকেও দাও। কিন্তু তবু কেন জানি না মা সব সময় তাঁর কাছে থাকতে বলে। কচিং যেতে হয় একা। মায়ের তখন ভীষণ কাজ থাকে। স্কুলে যাবার সময় মা সাথে থাকে। আসি এক সাথে সব বন্ধুরা। মায়ের কাছেই পড়ি। মা বোঝায় খুব ভালো।

বিজনবাবু ব্যঙ্গ হেসে বললেন, তোর মা নবরত্নের এক পণ্ডিত কালিদাসের সমতুল্য। কালিদাস সরস্বতীর বর পেয়েছিল তোর মা ডালে না বসে রাঁধুনি হয়ে খুন্তি নাড়ছে। তাই ভেবেছিলাম আমিই না হয় তোদের দুঃখ—কষ্ট বুঝে তোকে পড়াবো। কিন্তু তোর মায়ের আপত্তি। তোর মা অনেক জানে বোঝে আবার চেনেও।

নীলা বলে, আর দেরি করো না। টাকাটা দাও।

বিজন বাবু গম্ভীর ভাবে বললেন এতো তাড়া যখন এলি কেন? মায়ের কাছে যা, বস গিয়ে, মা তোর কতই না আদর্শ বাণী শোনাবে।

নীলা তাঁর জ্যেঠুর দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে।

বিজনবাবু নীলার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ও চিবুক ধরে মৃদুস্বরে বললেন, রাগ হয়েছে। ঠিক আছে আর বলবো না। ভাব হয়ে গেলো কিন্তু।

নীলা বলে, মাও আমার এমন করে বকে, আবার আদর করে তোমার মতো। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।

বিজনবাবু হাসতে হাসতে বললেন তাই, তারপর নীলার গালটিপে বললেন, পুজো বলে কথা। ফেরার সময় তোর জন্য তোর মনের মতো জিনিস কিনে আনবো। নিবি তো? প্রয়োজনে চাইবি, দেবো।

একটা জামাও দেবো ভাবছি।

নীলা এক গাল হেসে বলে জ্যেঠু দেবে নেবো না।

বিজনবাবু পকেট থেকে টাকা বার করে বললেন, বুঝলি টাকার ওজন খুবই কম। তবে বাড়াবো।

নীলা বললে কি বললে।

বিজনবাবু বললেন, কিছু নয়রে। এমনি বললাম, নে ধর টাকাটা। নীলা হাত বাড়ায়, বিজনবাবু নীলার হাতটি চেপে ধরে মুহূর্তে নীলা কিছু বোঝার আগেই জাপটে ধরেন নীলাকে।

নীলা প্রথমে ভীষণ ভ্যাবাচাকা খায়। তারপর বিজনবাবুর হাত দুটো কোনো রকম ছাড়িয়ে সরে এসে বলে, আমার মা এক এক সময় ঠিক তোমার মতো জড়িয়ে কেঁদে ফেলে। বলে তোর বাবা থাকলে এমনি করেই আদর করে বলতো মা আমার বড় হয়ে গেছিস।

জ্যেঠু তুমি বুঝি তাই? মাকে বলবো জ্যেঠু ভালো।

বিজনবাবু প্রথমে নীলার কথায় বাকরুদ্ধ হয়ে যান। কি উত্তর দেবেন ভাবতেই পারছেন না। পরে কোনো রকম কাঁপা কাঁপা স্বরে বললেন, তুই লক্ষ্মী মেয়ে।

বলিস না মাকে। দুঃখ পাবে। কষ্ট হবে।

নীলা ধীরে ধীরে বলে, বুঝেছি, বাবার কথা ভেবে মা রোজ কাঁদে, আচ্ছা বলবো না।

বিজনবাবু মাথা নেড়ে নীলার হাতে টাকা দিতেই নীলা টাকাটা হাতে নিয়ে হন হন করে এগিয়ে যায় রাস্তার মুখে। যেতে যেতে বলে যায় জ্যেঠু দুল কিনবো। কানে পরবো। দেখবে।

বিজনবাবু চেয়ে থাকেন নীলার চলার পথে। মনের ভেতরটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে, কে যেন বলে মা আমার বড় হয়ে গেছিস। জ্যেঠু তুমিও ভালো।

বিজন বাবু কিছুক্ষণ বোবার মতো হয়ে চুপ থাকেন। তারপর নিজেই অনুতপ্ত হয়ে ভাবেন তাঁর মেয়ের বয়স বাইশ। বাবার স্নেহ ভালোবাসা আদরে আদরে বড় হয়ে ওঠে। কখনো মেয়ে জড়িয়ে বলে আই লাভ ইউ পাপা। বিজন বোস কি তখন তাঁর পিতৃত্ব ভাবটিকে মুছে দিয়ে এক অমানুষ হয়ে উঠতে পেরেছে? তাঁর মেয়ে আর যে অসহায় মেয়েটি তার বাবার শূন্যস্থানটি পূরণ করতে এগিয়ে আসে কাছে—সে বা তারা এই ভাবেই কি শেষ হয়ে যায় তাদের মতো মানুষের কাছে?

নীলা এখনো বোঝে না। শুধু দেখে মায়ের কান্না। আর সব ঝাপসা। বুঝেও বোঝে না। জীবন এখনো কুয়াশায় ঢাকা। খোলা জানালা দিয়ে আলো আসবে কখন কে জানে। নীলা এখনো কি কিছু বোঝে?

বিজনবাবু নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে বলেন ছিঃ, আমি আবার আদর্শবান পিতা? যদি বলি, বিবেক কি মিথ্যের কাছে হার মানবে? একদিন হয়তো প্রতিদিন এই বিবেকই তর্জনী দেখিয়ে বলবে বিজন অন্যায় যে করে সাময়িকভাবে সে সুখ পেলেও মনের দিক হতে সুখী হওয়া যায় না।

বিজনবাবু অস্ফুট গলায় বলতে থাকেন নীলা—মা পারলে তোর এই অধম জ্যেঠুকে ক্ষমা করিস।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%