নতুন করে

অমল চট্টোপাধ্যায়

আকাশের গায়ে গায়ে হালকা প্রলেপ দেওয়া সাদা কালো মেঘ। যেন ফিনফিনে কিছু দিয়ে ঢাকা আকাশটা।

তারই ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসা আলো মনে হয় কোনো রূপসীর অঙ্গ হতে শাড়ি ভেদ করে বেরিয়ে আসে রূপের ছটা ছড়িয়ে যায় এ ধার থেকে ওই শেষ প্রান্ত পর্যন্ত।

রাস্তার দুধারে ছাড়া ছাড়া বড় বড় গাছ। হাওয়ায় তাদের পাতা ও কচি ডালগুলো পর্যন্ত দুলছে। রাস্তায় তখনো লোকজন, গাড়ির এদিক—ওদিক ছুটছে। দোকান পাটও খোলা। খদ্দেরের ভীড়। কম—বেশি হলেও রোজকারের মতোই চলছে শহর।

হঠাৎ কিছু বোঝার আগে যেটুকু আলো সেই আলোও এলো নিভে। প্রথমে একটা থমথমে ভাব, তারপরই এলো টিপ টিপ করে নয় ঝম, ঝম, করে বৃষ্টি। অনেকেই হতভম্ভ হয়ে আকাশ দেখা বৃথা চেষ্টা করে মারে ছুট। একটু আগে যারা কিছু বয়স্ক লোকের হাতে ছাতা দেখে মেঘের ফাঁক দিয়ে আলো দেখে তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে রোজ যেমন হাঁটেন তেমনি তাদের রীতি অনুযায়ী হাঁটছিলেন তার মধ্যে আমি একজন। এখন এই বৃষ্টির সাথে পাঞ্জা না কষে হনহন করে ছুটলাম। সাথে অনেকে। বিশেষ করে যাদের হাতে ছাতা নেই। কোথায় দাঁড়ালে বৃষ্টির হাত হতে রেহাই পাওয়া যায়। ছুটছি আর ভাবছি অতঃপর কোনো এক বাড়ির ওপর সেড দেওয়া খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। ভিজে গিয়েছিলাম। পকেট থেকে রুমাল বার করে কোনোরকম হাত মুখ গলা মুছে নিই। তারপর ভিজে রুমালই পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে সেই খোলা বারন্দায় আরো জনা কয়েক জনকে দেখি। আমার মতন তাদের এক অবস্থা। সেখানে আরো একজন ছিলো। এক পাখিওলা। সামনে দুটো বড় খাঁচায় বেশি নয় পাঁচ—ছটি পাখি। আর কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে যাবার জন্য লাঠি। পাখিওলা তার লুঙ্গি পরা অবস্থাতেই বারান্দার মেঝেতেই গ্যাট হয়ে বসে আপন খেয়ালে গুনগুন স্বরে ওর ভাষায় গাইছিলো, জোরে নয়। তাই রক্ষে, ওমন বেসুরে গান সে যে ভাষা হোক। এমন সুর কানে ভীষণ বাজে। এছাড়া কাজেও তাড়া বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত অগত্যা পাখিওলার কিঞ্চিত অত্যাচার না মেনে উপাইয়ের আর কোনো পথ খুঁজে পাইনি। সুতরাং তখনকার মতো মানতেই হলো।

এই বারান্দায় লাগোয়া ঘর। ঘরে মাঝারি এক জানলা। জানলার ভেতর এক বাচ্চা শিশু জানলার শিক দুহাতে দুটো শিক ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো। বয়স মাত্র পাঁচ কিংবা ছয়। ফুটফুটে দেখতে, বড় বড় চোখ, এতো মানুষ থাকতে ওর নজর কিন্তু খাঁচার ভেতর পাখিগুলোর দিকে। বাচ্চাটির হাবভাব পাখি দেখা সব মিলিয়ে একটা স্নেহের আবেশে সময়টা তখনকার মতো ভালোই কেটে যাচ্ছিল। শিশুটি একই ভাবে বড় বড় চোখ দিয়ে পাখিগুলো দেখছিলো। ভাবলাম শিশু মনে কতই না আবেগ তাদের কল্পনা।

হয়তো মন চলে যায় হতেম যদি পাখি, কিংবা হঠাৎ শিশুটি চিৎকার করে বলে, পাখিদের কি দুঃখ কষ্ট কিছু নেই। আমিও তোমাদের খাঁচায় বন্দি করে রাখবো। আমি শিশুটির কথা শুনে হাঁ, এ কার গলার আওয়াজ, পাঁচ ছ—বছর যার বয়স? না ব্রিটিশের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো স্বদেশী। শিশুটির চিৎকারে বারান্দায দাঁড়িয়ে থাকা সবাই শিশুটির দিকে তাকান। পাখিওয়ালা যে তাঁর ভাষায় গাইছিলো সেও। পাখিওয়ালা হয়তো শিশুটির কথা বুঝেছে যে পাখি নিয়ে শিশুটি কিছু বলছে। তাই ওই শিশুটির কথা শুনে গান থামিয়ে বললে খোকাবাবু তুমি আমায় কিছু বলছো?

শিশুটি তেমনি চিৎকার করে বললে তোমাদের সব্বাইকে। আমার বাবা বলে বন্দি সুখ নয় কষ্ট। বলে, আমি যদি শুধু ঘরেই থাকি তাহলে বাইরে ঘোরা যে আলাদা সুখ, তা বুঝবো কি করে। বাবা বলে তাহলে আমি যদি সব সময় ঘরে থাকি তাহলে আমিও বন্দি। তাই আমি মনের আনন্দে ঘুরি। তাই বলছি পাখিগুলো ছেড়ে দাও। ওরা উড়ে যাবে, সুখ পাবে।

এবার পাখিওয়ালা বলে, ওরা বন্দি কেনো, যে কিনবে তার কাছে ওরা থাকবে।

শিশুটি তাঁর ছোট ছোট আঙ্গুল দিয়ে জানলার শিকগুলোকে থাপড় মারতে মারতে বলে, তুমি দুষ্টু। ওই পাখিগুলো আমার মতো ঘুরবে না খেলবে না। ওরা ডানা মেলবে না। যেখানে যাবে সেখানেও পাবে দুঃখ। তাহলে ওদের সুখ? পাখিওয়ালা বাঙালি না হলেও বাংলা ভালোই বলে। সে বলে খোকাবাবু, তুমি পাখি নেবে।

শিশুটি বলে হ্যাঁ নেবো। তোমার সব পাখি, তুমি পাখিওয়ালা?

পাখিওয়ালা হাসতে হাসতে বলে হ্যাঁ, তারপর একটু মজা করে বলে, পাখি দেবো। কিন্তু খোকাবাবু তোমার খাঁচা আছে তো?

শিশুটি চোখ বড় বড় করে বলে, খাঁচা কেন?

পাখিওয়ালা তেমনি হাসতে হাসতে বলে, এ কেমন কথা খোকাবাবু। খাঁচা না থাকলে থাকবে কোথায়!

শিশুটি জোরে জানালার বাইরে ওর ডানহাত বাড়িয়ে প্রায় প্রতিবাদ করে বলে ওঠে—না, না তোমার কথা মানছি না। তুমি যেমন ঘুরে সুখ পাও। পাখিরাও তো চায় সুখ। ওদের গাছ, ওদের আকাশ, আকাশে পাখনা মেলে ওড়া, এই সুখই হলো ওদের ভাবনা ওদের স্বাধীনতা। জানো আমার বাগানে কতো পাখি, ওরা খেলা করে। আমি তালি দিয়ে ওদের সাথে কথা বললে ওরা শিষ দেয়। আমার কি মজা হয়। বাবাকে বললে বাবা বলে, ওরা স্বাধীন। তাই তো ওদের মনে এতো আনন্দ। এতো সুখ, কারো সুখ, কম থাক বেশি থাক, কেড়ে নেওয়া অন্যায়। আমার বাবার কাছে এসব কথা শুনে বাবাকে ভালোবাসি মা তাঁর ইচ্ছাতে পাখিকে খাবার দেয়, তাই মাকেও ভালোবাসি। পাখিওয়ালা তুমি আমায় পাখিগুলো দাও, আমি ওদের সুখ দেবো।

পাখিওয়ালার দিকে আমার দৃষ্টি ও শিশুটির এক নাগাড়ে বলে যাওয়া কথাগুলো মনে হলো বেশ মনোযোগ দিয়ে পাখিওয়ালা শুনছে। আমারও মনে একই জিজ্ঞাসা এই ছোট্ট শিশুটি তাঁর সহজ সরল মন আর সাদা চোখ দিয়ে যা দেখেছে যা যা বললো, তা কত সত্য বিশ্লেষণ দিয়ে যদি বোঝা যায় তাহলে নিজেরাই বুঝে নিতে পারি এখনো অনেকেই অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে আসতে পারেনি। একটু আলো পাবে বলে, তার সন্ধানে এখনো আশা নিয়ে থাকে।

শিশুটির সহজ ভাবে বলার মধ্যে আসল সত্য কথাটিই প্রকাশ পায়। বর্তমান সভ্যসমাজে থেকেও মানুষ এখনো কান্নায় ভেঙে পড়ে। বলে পেলাম না। সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়ে বন্দি হয়ে আছি মানুষেরই বন্ধ ঘরে। শিশুটির সহজ সারাল্য মন ভালো এটাই বলতে চায়, একজনের গলার স্বরে তাকাতেই ষাট—এর ঊর্ধ্বে একজন বয়স্ক লোক দেখি আমাকেই বলছে, বললাম, আমায় কিছু বলছেন?

বয়স্ক লোকটি গলা খাটো করে বললেন, কেমন জেদ শিশুটির তাই না। এই বয়সেই এতো বড় বড় কথা। আমার ঠাকুরদা নেতাজীকে সামনে থেকে দেখেছিলেন বাঘা যতীনকেও, তিনি নেতাজীর দৃঢ় গলায় যেমন মাথা উঁচু করে ব্রিটিশদের সামনে বলতেন, ঠাকুর্দার কাছেই জেনেছি। এই শিশুটির গলার স্বরে শুনছি যেন সেই বজ্রকণ্ঠ, এখুনি বুঝে ফেলেছে সুখ আর বন্দি তার অর্থ। সত্যি বলতে কি, আমি আপনার পাশে এখানে, কিন্তু এখনো বন্দি, আলো আর কৈ দেখছি ভেবেই যাচ্ছি। পঁয়ষট্টিতে পা দিয়েছি। দেখি আর কতদিন অপেক্ষায় থাকবো। পাখিওয়ালার অমন তাকানো দেখে শিশুটি কান্না মেশানো গলায় পাখিওয়ালাকে বলে, তুমিও তো এখানকার। তুমিই দাও না খাঁচার দরজা খুলে। দেখবে পাখিগুলো উড়তে উড়তে তোমায় থ্যাঙ্কু বলবে। আমি তোমায় আমাদের বাগান দেখাবো। বাগানে কতো পাখি, আসে যায় ডালে বসে আনন্দে শিষ দেয়। আমরা বাবা মা সবাই আনন্দ পাই। কি হলো তুমি খাঁচার দরজা খুলবে না ওই দরজা আমি ভেঙে দেবো।

পাখিওয়ালা কি বুঝলো কে জানে নিজেই উঠে দাঁড়ায়। তারপর প্রায় জানালার কাছে এসে শিশুটিকে বলে তুমি মস্ত পালোয়ান। আমায় তো হার মানতেই হবে খোকাবাবু।

শিশুটি এবার হেসে ফেলে। আমি অবাক হয়ে দেখি। হয়তো ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই ওই বীর শিশুটির নির্মল হাসিটি দেখলো। আমার মনে হলো এই হাসির মধ্যেই আছে ওর জয় সুনিশ্চিত।

পাখিওয়ালা অতি বিনয়ী হয়ে বলে, খোকাবাবু তুমি বুঝবে না। তবু বলি পাপ—পুণ্যের বিচার করতে গিয়ে আজ আমার মনে এক ক্ষত দাগ যেনো দেখতে পাচ্ছি। তাইতো আমার পরিবারের অভাবটাকে একটু ভালো রাখতে গিয়ে এখন তোমার হৃদয়ের ব্যথা সে ব্যথা আমাকে আরো বেশি কষ্ট দিচ্ছে, তাই মনে হচ্ছে একটু হলেও স্বাধীনতা জোর ভাবে কেড়ে নেওয়া শত অপরাধ। খোকাবাবু আমি পাপী।

শিশুটি হাত নেড়ে বললে, না তুমি পাপী নও। আমার বাবা কি বলে জানো। যে বুঝতে শেখে সে ঈশ্বরের দেখা পায়। তুমি ভালো, পাখিওয়ালা যেন ভয় পেয়েছে এমন একটা ভাব করে বলে খোকাবাবু পাখিগুলো আমি ছেড়ে দেবো ঠিক। কিন্তু আজ নয় একদিন জানবে আমাদের চারপাশটাই নোংরা অবর্জনায় ভরা। আছে সব কিন্তু সরায় কে? পাপীরাই তো বেশি। তাই বলছি, আমার ছেড়ে দেওয়া পাখিগুলো স্বাধীনভাবে আকাশে উড়তে পারবে তো? শয়তান যে ওত পেতে আছে।

শিশুটি হাত নেড়ে চেঁচিয়ে বলে, তুমি ভয় পেও না। পুলিশ আছে, ওদের ধরবে, আমার বাবা পুলিশ।

পাখিওয়ালা এগিয়ে যায় খাঁচার সামনে। আমরা অর্থাৎ ওখানে যারা ছিলাম সবাই মনে মনে ভাবছিলাম পাখিওয়ালা যে কাজ করতে যাচ্ছে সে কাজ কি নিছক ছলনা শুধু দেখানো, কাজে মোটেই নয়। মিথ্যে আশ্বাস দেওয়া।

পাখিওয়ালা খাঁচার সামনে গিয়ে বসে। এবার অন্য ভাবটাই মনে আসে পাখিগুলো তাহলে ছাড়া পাচ্ছে। শিশুটির তাহলে জয় অবধারিত। ভাবছি পাপিষ্ঠ ও যদি সত্যের সন্ধান পায় সত্যকে অনুকরণ করে তাহলে কি দেশ সুন্দরে ভরে উঠতে পারে না? অবশ্য বেশি ভাগটাই তো লোভ আর লালসায় ভরা দেশ। সত্যকে গ্রাস করতে কতক্ষণ। যদি দলগতভাবে সত্য রুখে দাঁড়ায়? জানি না কবে আসবে সেদিন।

পাখিগুলো পাখিওয়ালার স্বরূপ চেহারা তার মুখের আকৃতি আগে ভাগেই ভালো করে হয়তো বুঝতো। তাই ওরা পাখিওয়ালকে দেখে বন্ধ খাঁচার ভেতর যেটুকু অংশ পায় সেটুকুর মধ্যেই পিছু হটতে থাকে। হয়তো বৃথা বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা। কয়েকটি পাখি আবার ডানা ঝাপটিয়ে উড়বার কতই না চেষ্টা। মৃত্যুর কাছে মুখোমুখি হয়ে যেমন হয় অভুক্ত মানুষের লড়াই। ঠিক তেমনি।

পাখিওয়ালা খাঁচার দ্বার খুলে তার লোমশ মোটা হাত ভেতরে ঢোকাতেই সব পাখিগুলো আতঙ্কে ছটপট করতে থাকে, আমিও কেন জানি না ভয়ে শিউরে উঠি। চোখে ভাসে নারীপাচার নারীদের প্রতি অসৎ আচরণ। নারী ধর্ষণ। ধর্মের নামাবলি গায়ে দিয়ে অসহায় মানুষের ভিটে কেড়ে নেওয়া, কারো বলার নেই। প্রতিবাদ নেই। শুধু কাগজের পাতায় কিছু লেখা। পরিবারের দুঃখ, মেয়েহারা মায়েদের কান্না। তারপর চেষ্টা চলছে, কদিন বাদে সব যায় চাপা পড়ে। গরীবের কান্না শেষ পর্যন্ত স্থান পায় তারই অন্তঃস্থলে। শহর চলে আবার সেই গতিতে।

একটু বাদে নিজেকে সামলে দেখি পাখিওয়ালা এক এক করে যেন দেখি ভিন্ন তার রূপ। ভয়ংকর চোখে ভাসে ভালোবাসা আর বেদনার ছাপ। সেই পাখিওয়ালা পাখিগুলোকে মুক্তি দিয়ে চলেছে।

শেষ পাখিটি হাতে নিয়ে জানলার সামনে শিশুটির কাছে এসে বিনীত ভাবে বলে শিশুটিকে, খোকাবাবু আমি মূর্খ, লেখাপড়া জানা নেই। ভালো মন্দ বুঝিনি। তাই আমি পাপী। আমিও তো চাই ভালোর ছোঁয়া পেতে। আজ বৃষ্টি এসে সব পাপ আমার সাফ করে দিলো তোমাকে দিয়ে, তুমি আমার খোকা বাবা। আমি ভালো হবো। তুমি আসল বীর।

শেষ পাখিটিকেও পাখিওয়ালা উড়িয়ে দিয়ে জানি না কেনই বা পাখিওয়ালা ওই শিশুটিকে সেলাম জানিয়ে শূন্য খাঁচা নিয়ে নামে রাস্তার বুকে। হয়তো শিশুর অন্তরই ওকে জাগিয়ে তোলে আগাম সূচনা!

আমি প্রকৃত মানুষ হয়ে মানুষের পাশে থাকতে চাই।

নির্মল না হলেও আকাশ নীলেই ভরা। ছন্নছাড়া শুধু টুকরো টুকরো কিছু সাদা মেঘ এগিয়ে যায়। জানা নেই কোন স্থানে। সবাই যারা বৃষ্টির জন্যে খোলা বারান্দায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এখন রাস্তায় নাবার জন্যে সবাই ব্যস্ত।

সেই বয়স্ক লোকটি যার সাথে সামান্য কথোপকথন হয়েছিলো তিনি বারান্দা সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়েও না নেমে আমার কাছে এলেন। চোখে মুখে হাসি হাসি ভাব। মনে হলো হঠাৎ করেই শুকনো ডালে আবার এলো বসন্ত। বয়স্ক লোকটি বললেন বয়স হলো। কিন্তু এতো বছরের স্বাধীনতার প্রকৃত রূপটাই চোখে পড়েনি আজ অজান্তে অনুভব করলাম। শিশুটির জেদ আর পাখিওয়ালার আত্মত্যাগ। আর আমি পেলাম কিছুটা শান্তি। কিছু সময় আগে যখন বৃষ্টি পড়ছিলো সেই সময় ফোন এলো এ্যাডভোকেট সুজন ব্যানার্জীর কাছ থেকে। আমার একটিই মেয়ে রীনা। ব্যাঙ্কে চাকরি করে। শুনেছি ব্যাঙ্কেরই এক কর্মীর সাথে আলাপ কথাবার্তা এবং ভালোবাসা। তবে যেটুকু কানে আসা ছেলেটি সৎ এবং সচ্ছল পরিবার। মেয়ের মা অবশ্য সবই জানে। বাবাকে বলতে দ্বিধা তাই বলেনি।

একদিন অফিস ফেরত ঠিক সন্ধের সময় পথচারিত লোকের মাঝেই মদ্যপ দুজন দুষ্কৃতির হাতে আক্রান্ত হয়। সেই ঘটনাচক্রে ঈশ্বরের অসীম কৃপায় এক মুটিয়া হয়তো ঈশ্বরের দূত হয়ে সেই পথ ধরে যেতে এক নারীর আর্তনাদ শুনে অন্য সবার মতো নীরব মানুষদের মতো চুপ হয়ে থাকতে পারেনি। মুহূর্তে রুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের ওপর লক্ষ্য মেয়েটিকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করা। এবং পেরেছে ওই নিম্নশ্রেণির মানুষটি। ভেবেও দেখেনি ওর এতে বিপদ আছে বা আসতে পারে।

আমি আজীবন ওই মুটিয়া যাকে আমাদের সমাজ থেকে তাদের অনেক দূরে রাখি এখন মনে হচ্ছে ও আমার ভীষণ কাছের মানুষ। ওর কাছে যে আমি চির ঋণী। হ্যাঁ, ওই দুষ্কৃতি দুজন পুলিশের সহায়তায় ধরা পড়ে। অনেক লম্বা লম্বা হাতের থেকে ছিনিয়ে অবশেষে এবার সমাপ্তির পথে। এ্যাডেভোকেট ব্যানার্জী কিছুক্ষণ আগে ফোনে জানালেন ওই দুজনের সম্ভবত পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত জেল হবে। বেশিও হতে পারে। পরশু রায় বেরোবে। পুরো ঘটনাটি পেপারেও বেরিয়েছিলো।

আর পুরস্কার হিসেবে মুটিয়া পাচ্ছে সাহসিকতার জন্য সম্মানপত্র। ওর ঋণ শোধ না করতে পারলেও ওর জন্যে একটা কিছু করতে পেরে আমি সুখী। আমি ওর যোগ্যতায় ওর জন্যে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছি। ওরাও যে আমাদের মতো আমাদের সাথে মিশতে চায়। ওদের মধ্যেও যে মায়া মমতা স্নেহ ভালোবাসা আছে। কিন্তু আমরা এতোই দম্ভে থাকি যে ওদের কথা ভাবলে বুঝি সময়টা বৃথাই নষ্ট হলো। এখন ভাবলে কাঁদায়, নিজেকে দোষারোপ করি। ভাবি হে ঈশ্বর এ কেমন তোমার লীলা বন ফুলও তোমার চরণে চমক জাগায়? যা গন্ধ ফুলেও কখনো হয় না। আপনাকে বিরক্ত করছি আর একটি ফোন আসে। আমার স্ত্রী করেছিলো। আজ সন্ধ্যে সাতটার সময় ছেলের বাড়ি থেকে ছেলের বাবা মা আসছেন। আমার মেয়েকে দেখতে এবং তাঁরা দিনটাও পাকা করে নিতে চান।

বললাম, আনন্দ সংবাদ। আমি ভীষণ খুশি।

বয়স্ক লোকটি পুনরায় বললেন ভেবেছিলাম মেরুদণ্ড আর আমার কোনোদিনই সোজা হবে না। এখন বুঝি বয়সের সাথে সাথে মেরুদণ্ড বেঁকে গেলেও মন আমার আরো সোজা হয়ে দাঁড়াবে। অশুভ আসতে ভয় পাবে। আজ আর এক স্বচক্ষে দেখলাম শিশু হলেও ওর বজ্র কণ্ঠ, প্রতিবাদ। আর পাখিওয়ালা, সুযোগ্য মানুষ পেলে যার কঠিন হৃদয়ও গলতে বাধ্য। যাবার সময় আপনার ফোন নম্বরটি চাইছি। বলতে পারেন ভালো লাগার আবদার।

আমার মেয়ের বিয়ের দিন আপনার উপস্থিত চাই। আপনার আশীর্বাদ নিশ্চয়ই ওরা মাথা পেতে নেবে।

কাজ সেরে বাড়ি ফিরছি। ভাবছি স্বাধীনতা কি আমার মধ্যেও এলো? হয়তো কিছুটা। হয়তো আরো পাব।

যদি শুনি শিশুটির মতো কোনো তেজবান মানুষের কণ্ঠস্বর। তাই যারা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলেছিলো এ আমাদের দেশ। চাই স্বাধীনতা। তারপর হারিয়ে গেলো সেই স্বপ্ন। স্বাধীনতা পেয়েও মুষ্টিমেয় ছাড়া সবাই চেয়ে থাকে উত্তোলন ভারত পতাকার দিকে। কোথায় পেলো স্বাধীনতা? তবে আসবে। ভদ্র মুখোশপরা মানুষ নয়। হাজার হাজার মুটিয়ার মতো শ্রমিক যারা নিঃস্বার্থে এগিয়ে আসে মানুষের পাশে। তারাই একদিন ভালোবেসে প্রত্যেকের অন্তরে জাগিয়ে তুলবে প্রকৃত স্বাধীনতা। আর চায় সাধারণ মানুষ সেই অপেক্ষায় রইলাম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%