শেষ পর্যন্ত

অমল চট্টোপাধ্যায়

তখন বিকেল, বিকেল অর্থাৎ পড়ন্ত বিকেল। পশ্চিম আকাশে লাল আভা। সূর্য ডুবু ডুবু। এক চিলতে মেঘ তারই পাশে। দূরে আরো কিছু টুকরো মেঘ ছন্ন ছাড়ার মতো ছড়িয়ে। কুড়ি—বাইশ বছরের জিনস প্যান্ট আর টি শার্ট পরা মেয়েটি সারা শরীরে লাবণ্যে ভরা, দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার এক পাশে।

গোল্ডেন চশমা পরা মিষ্টি চেহারা সুন্দরী মেয়েটিকে কেমন যেন আনচান লাগছে। ওর ভাবে ভঙ্গিতে তাই মনে হয়। কারণ মেয়েটি স্থির হয়ে নেই। একবার সামনে এগিয়ে যায়। আবার পিছন ফিরে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ায়। বারে বারে ডান হাতের কব্জিতে বাঁধা ঘড়ি দেখে। সুন্দর ভ্রূ জোড়া কুঁচকে কি যেন দেখার চেষ্টা করে দূরে কোথাও। আবার মোবাইলেও কাকে কি যেন বলছে।

আমি খুব কাছে না হলেও প্রায় কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিলাম। জানি না কেন, বাসস্ট্যান্ড এখানে নয়। তবু কেন দাঁড়িয়ে আছি তখনকার মতো অন্তত আমি জানি না। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে না থেকে কেন এখানে? চুম্বক রহস্য? তাও জানি না। তবে শুধু শুধু সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থহীন। তবু কেন সে দাঁড়িয়ে। যদিও এর একটা কারণ থাকবে। যুক্তি ফলিয়েও আসল যুক্তিকে ফেলে দেওয়া যায় না। তবু কেন আমি দাঁড়িয়ে।

আবার মেয়েটির প্রায় কাছে। উদ্দেশ্য কিছু না থাকলেও তবু মেয়েটিকে নিয়ে ভাবছি। আরো ভাবায় কাকে উদ্দেশ্য করে মোবাইলে এতো সব বলছে? সব কথা কানে না গেলেও কিছু কথা শোনা যায়। যেমন এক্ষুণি এসো। এতো লেট সহ্য হয়। কি এমন রাজকার্য দেরি করে আসতে হবে। ধৈর্যের সীমা পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি বাড়ি চলে যাব। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এর অর্থ একটাই। প্রেম ভালোবাসায় ভাসিয়ে যাবার আগের মুহূর্ত। রাগ অভিমান। কিছু দর্শনীয় কথা। আর কতক্ষণ, এবার এসো তুমি আমায় উদ্ধার করো।

আমি দাঁড়িয়ে এসব দেখছি। আমার এসব দেখার মধ্যে নিজের কিছু উপকারে আসবে তাও নয়। ইচ্ছে থাকলেও কাজে খাটবে না। তবু মোবাইল আমার কানে ধরে রেখেছি তার একটাই কারণ মেয়েটির কাছে সন্দেহের তালিকায় যাতে না থাকি।

তবে মেয়েটি আমাকে দেখছে কিনা বুঝতে পারিনি। যদিও আমিও সুপুরুষ।

রাস্তার সামনেই ছোট্ট এক চিলড্রেন পার্ক। মেয়েটি পার্কের সামনের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি অদূরে দাঁড়িয়ে, তখনো অযথা কানে ধরা মোবাইল।

সুন্দর সাজানো পার্ক, চারপাশে রেলিং দেওয়া। মাঠের ধারে ধারে সারি সারি গাছ। কয়েক ফুট ছাড়া ছাড়া সিমেন্টটে তৈরি বেঞ্চ পাতা। আবাল বৃদ্ধ বনিতা অনেকেই সেখানে বসে। কেউ আকাশে রাঙা রঙ দেখে আনন্দ পাচ্ছেন। কেউ হয়তো মাঠের রূপ বর্ণনায় নিজেকেই আনন্দ দিয়ে যাচ্ছেন। আমার অন্তত তখনকার মতো তাই ধারণা হয়।

কোনো কোনো মহিলারা আবার তাঁদের বাচ্চাদের সাথে দৌড়ঝাঁপ খেলা নিয়ে মগ্ন।

তবু যেন মনে হলো এতো কিছু দেখার মাঝে মেয়েটিই সেরা। ওর অস্থিরতা, লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে আবার পিছিয়ে আসা, ওর মোবাইলে অভিমানে কখনো মৃদু ভর্ৎসনা স্বরে কাকে উদ্দেশ্য করে বলা, সবই এক রোমান্টিক ছবির নায়িকার মতোই আমার চোখে ভাসছে।

আমার মনে হলো এতো কিছু দেখার পরও মেয়েটিকেই সবাই দেখছে। আর দেখবেই না কেন। এ যেনো হঠাৎ বসন্ত এলো ফিরে।

যদিও এখন টুপি পরার সময় নয় তবু একজন টুপিপরা বৃদ্ধ পার্কে আপন মনেই বুক টান করার ব্যর্থতায় একটু ঝুঁকে হাঁটছিলেন। এক পাক যেতে না যেতেই পার্কের বেঞ্চে বসতে গিয়েও মাঠের রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে কি যেন দেখে আর না বসে ধীরে ধীরে মাঠ থেকে বেরিয়ে একেবারে মেয়েটির পাশে এসে দাঁড়ালেন। মেয়েটির ওরকম হাঁটা চলা কথা বলা, রাগ অভিমান এসব দেখলেন, একবার ওনার চশমাটি কপালে তুলে চোখ কচলাতে গিয়ে চশমাটি নাকের ডগায় এনে মেয়েটিকে কি নেশায় কি মনে করে কেমন করে যেন দেখলেন। বোঝা দায়, তারপর পুনরায় চশমাটি যথা স্থানে বসিয়ে অভিভাবকের মতো হয়ে গদগদ গলায় মেয়েটির প্রায় কাছে গিয়ে বললেন, মা জননী, তুমি কি বাসের অপেক্ষায় আছো এটা তো বাস থামার জায়গা নয়।

মেয়েটি তার ফোনে জোরে জোরে বলছিলো, এখনো লেট।

বৃদ্ধটি একটু ঝুঁকে মেয়েটিকে একই ভাবে সেই কথা বললেন, তবে গদগদ হয়ে নয়, একটু জোরে।

মেয়েটি এবার কান থেকে ফোনটি নামিয়ে বললে, জানি, এটা বাসস্ট্যান্ড নয়, তারপরই ফোন কানে দিয়ে হতাশার স্বরে বললে আমি তাহলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাবো! তার পরেই রাগত স্বরে বললে কি মনে করো। আমার সময়ের দাম নেই।

বৃদ্ধটি চমকে চশমাটি ওনার ঠিক জায়গায় আছে কিনা দেখে নেন। তারপর নিজে নিজেই বলতে থাকেন, সত্যিই তো সময়ের দাম নেই? আজকালকার ছেলে ছোকরাদের বিশ্বাস করাটাই মুশকিল। মা জননী তুমিই বা কম কিসে।

মেয়েটি বৃদ্ধটিকে ভালো করে দেখে নিয়ে জোর গলায় বলে ওঠে রাবিশ।

বৃদ্ধটি থতমতো খেয়ে বললেন, কিছু বলছো?

মেয়েটি একটু চেঁচিয়ে বললে, দাদু, যান, দিদিমা অপেক্ষায় আছেন।

বৃদ্ধটি আর কথা না বলে নিজেই বকতে বকতে একেবারে আমার কাছে এসে পড়েন। আমি তাকাতে প্রায় রেগেমেগেই বৃদ্ধটি বললেন, দেখলে তো বাবাজি, ভালো কথা বলতে গিয়ে বিছের কামড়। কি সর্বনাশী মেয়েরে বাবা। ভালো লেগেছিলো বলেই না, কে ওর আপন তাই আসছে না।

ওর দুঃখ দেখে বলতে গিয়ে উল্টে শুনিয়ে দিলে কত কথা। যত সব বৃদ্ধটি হাঁটতে হাঁটতে একবার পেছন ঘুরে তাকান। এবং দেখেন মেয়েটি ধমকে বলছে আমার সময়ের কি দাম নেই। কি করছিলি উত্তর দে?

যাকে মেয়েটি বলছে সে বারো—তেরো বছরের মেয়ে, চেহারা মোটামুটি, খারাপ নয়, ফ্রক পরা, পায়ে চটি, আর দুহাতে জড়িয়ে বুকের কাছে রাখা একটি বাচ্চা কুকুর। সম্ভবত Spaniel, বারো—তেরো বছরের মেয়েটি বললে, আমি কি করবো দিদি। তোমার টমি আমার কথা শোনে। ধরতে গেলে ছুট মারে। কি দুরন্ত। তারপর ছাদে বেশি সময় নিয়ে নেয়। আমায় দোষ দিও না। টমিরই যতো লেট।

মেয়েটি টমিকে জাপটে ধরে আস্তে আস্তে থাপ্পড় মেরে বলতে থাকে তুমি আজকাল নটী হয়ে গেছো। সকালে না পটি করেছ। আবার কেন অসভ্যতা। তারপর টমি অর্থাৎ বাচ্চা কুকুরটিকে নিয়ে মাঠের গেটের সামনে যেতে যেতে বলে আই লাভ ইউ টমি। আমার সোনাটা। একটা চুমুও দিলো মেয়েটি ওর টমিকে।

মেয়েটির পেছন পেছন হাঁটতে থাকে বারো—তেরো বছরের মেয়েটি। সেও বলতে বলতে যায়। আই লাভ ইউ টমি। আই লাভ—

বৃদ্ধটি আবার আমার কাছে এগিয়ে বললেন প্রায় তাচ্ছিল্য ভাবে বাবাজি এটা কোন ধরনের প্রেম? তারপর নিজেই বললেন রাবিশ। কুকুরের সাথে—

আমি কিছু বলতেই আমাকে থামিয়ে বললেন, বয়েই গেছে।

ওর সাথে কথা বলতে। ওর ছটপটানি দেখে ভাবলাম হতাশায় ভুগছে। তাই একটু সান্ত্বনা। উল্টে আমাকে বলে কিনা যান, দিদিমা অপেক্ষা করছে। বুঝলে, এসব মেয়ে হলো সাংঘাতিক। ওপরে হালকা ভেতরে জ্বলছে। দোর ভেঙে অপর দোরে ছোটে।

আমি বললাম, মনের ইচ্ছাকে যে যেমন ভাবে নেয়। হয়তো কুকুর ওর খেলার সাথি। প্রয়োজনে সময় কাটানো।

বৃদ্ধ দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বললেন, বুঝলে আমারও তোমার মতো বয়স ছিলো। চেহারা দেখলেই এমন অনেক সুন্দরীরাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকতো। বুঝলে এখনো কম যাই না। পার্কে দশবার পাক দিই।

আমি হেসে বললাম, মেয়েটি সত্যি অবুঝ। আপনাকে আর একটু ভালো ভাবে যাচাই করলে বুঝতো।

বৃদ্ধটি এক গাল হেসে বললেন বলছ চলি বাবাজি। তোমার কথাগুলো মনে ধরার মতো। মেয়েটির মধ্যেও চেয়েছিলাম, তোমার মতো।

বৃদ্ধটি চলে যেতে আমার মনে হলো বাসস্ট্যান্ডে আর যাবার দরকার নেই। মাঠে যাওয়াটাই এখন সুখদায়ক।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%