অমল চট্টোপাধ্যায়
আমি সুমিষ্ট নামের একটা গাছ ছিলাম। জমিদার রামবাবুর বাগানে অনেকটা জায়গা জুড়ে আমার বসতি ছিল। আমার যৌবন যতই পরিস্ফুট হতে থাকে, ততই জমিদারবাবুর যাতায়াত বাড়তে থাকে। বসন্তে মৃদু বাতাসে যখন আমার অবিন্যস্ত চুলগুলো উড়তো, তখন আমার যৌবন তরঙ্গে ভালোবাসার গান গেয়ে উঠতো। অস্ত যাওয়া সূর্য তার রাঙা আলো আমার সারা অঙ্গে যখন ফেলতো ঠিক সেই সময় জমিদারবাবু আসতেন এবং আমার গায়ে ঠেস দিয়ে বসতেন। তখন আমার ভরা যৌবনে বান ডাকতো।
আমি ছিলাম চিরকুমারী, এতে আমার দুঃখ ছিল না। আমার রূপ আমার যৌবন সবাইকে করেছিল মুগ্ধ। সবাই দেখতো আমাকে। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতো। স্বয়ং জমিদারবাবুও এক এক সময় অপলক দৃষ্টিতে আমার যৌবনের অঙ্গগুলো কল্পনার ছাঁচে গড়তেন। আমার গায়ে আলতো করে চুম্বন দিয়ে এঁকে দিতেন। তখন গর্বে আমার বুক ভরে উঠতো। প্রাণের স্পন্দন নেচে উঠতো। মন বলতো আমি সুখী। আমি চির সুখী। কিন্তু জানতাম না আমার ভরা যৌবনটাই আমার সর্বনাশের মূল। আমি সুমিষ্ট নামের একটা গাছ ছিলাম সত্য, কিন্তু ছিল না কোনো স্বাদ। আমি ছিলাম মুখরুচি কুমারী।
একদিন জমিদার নিজে সামনে থেকে তাঁর পারিষদ দ্বারা ক্ষত—বিক্ষত করে দিলেন আমার বিশেষ অঙ্গ তাঁর কল্পনার ছাঁচকে। আমি কাঁদলাম।
এখন আমি একটা পোড়া কাঠ। আধপোড়া অবস্থায় নদীতে আশ্রয় নিয়েছি। ডোমটা বয়ে নিয়ে এখানে ফেলে গেছে। আমার পোড়া পীঠে কাক চিল শকুন বসে মরা ব্যাঙ অথবা নোংরা কিছু খেতে খেতে একটু আরাম করে নেয়। শেষকালে মরা কাঠ নামে পরিচিত হলাম আমি। কাক চিল শকুনগুলো পর্যন্ত আমার পীঠে বসে আস্ফালন করে। এর চেয়ে যদি ছাই হয়ে যেতাম তবে কলঙ্কের বোঝা নিয়ে আর ঘুরতে হতো না। এ আমার অদৃষ্টের ফের। এ আমার ভরা যৌবনের উচিত শিক্ষা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন