বাদশা

অমল চট্টোপাধ্যায়

কোলকাতার রাত ফিকে হয়ে এলো। ভোরের আলো এলো বলে। প্রকৃতি নতুন রূপে নতুন সাজে। শরৎ মাখানো গায়ে মিষ্টি হাওয়া বয়। আকাশের বুকে সাদা টুকরো টুকরো মেঘ যায় ভেসে। যায় আপন খেয়ালে। জানা নেই কোন স্থানে?

কোনো এক আভিজাত্য পাড়া তার এক প্রান্তে সবুজ ঘাসে ভরা মাঠ। মাঠের চারধার ধরে সারি সারি বিভিন্ন ধরনের গাছ। তার চারপাশে পাথুরে রাস্তা এককথায় বলা যায় সাজানো—গোছানো সুন্দর ছোট্ট এক উদ্দান। এরই নাম কোলকাতা।

সেই মাঠেই এক গাছের তলায় বসে ধুকছিলো অতি বিশ্রীকায় এক শীর্ণ মানুষ। গর্তে ঢুকে যাওয়া চোখ। চোখ দুটিতে পিচুটীতে ভরা। হাড় পাঁজরা যেন দেহ হতে বেরিয়ে আসতে চায়। এমন চেহারা খালি গায়ে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গায়ে চামড়া ছাড়া দেহের মাংসের সামান্যটুকুই নেই বলা যায়। কোমরে জড়ানো ময়লা এক টুকরো ছেঁড়া কাপড়। সেটাও গন্ধ মাখা নোংরা। এই মানুষটিকে প্রথমে দেখে মানুষ না ভাবাটাই স্বাভাবিক। কারণ এমন চেহারা অদ্ভুত এই মানুষটিকে দেখে কেউও প্রথমে চমকাবে না এমন নয়। আস্তে আস্তে জানার পরও ভাববে ঠিক যেন কঙ্কাল। অথচ মানুষ, যে একদিন এক গর্ভ হতে জন্ম নিয়েছিলো এই বসুন্ধরায়। যে আজও চেয়ে আছে পৃথিবীর পানে। শুধু আশা নিয়ে। মাঠের আর এক ধারে আর এক এমনই মানুষ রয়েছে। এক তাজা গাছের তলায়। তবে সে মৃত। মৃত মানুষটি চিৎ হয়ে ভগবানের দিকে শুয়ে। চোখ দুটো বোজা। মুখ ওর সামান্য হাঁ করা। কি জানি কি উদ্দেশ্যে ওর হাঁ করে থাকাটা, গঙ্গা জলতো দেবার মতো কেউ ছিলো না। আর থাকবেই বা কেন? কোন স্বার্থে? কি জানি ভগবান জানেন কিনা। এই ধন—দৌলত সম্পদ সবই ওনার কৃপায় পাওয়া। সুতরাং সমাজকে বাদ দিয়ে ওনার ওপরেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। শুধু শুধু তর্ক—বিতর্ক কেন। তবু জিজ্ঞাসা থেকে যায়, নিশ্চয়ই ও মৃত্যুর আগে কিছু বলতে চেয়েছিলো। পৃথিবীর শেষ আলো হতে বিদায় নেবার আগে হয়তো এই অভাগা শেষ ইচ্ছেটুকু ভিক্ষে চেয়েছিলো। তা কি? কারো জানা নেই। কেউ জানতেও পারেনি। কারণ ওর মনসকামনা পূর্ণ করার সময় কে বা পাশে বসে ওর ইচ্ছেটুকু পূরণ করবার জন্য ব্যস্ত থাকবে। আছে কে? এক ঈশ্বরই জানেন। হয়তো ওর শেষ ইচ্ছেটুকু ঈশ্বরই সমাধান করে দেন। মৃত্যুই ছিলো ওর শেষ ইচ্ছা। এছাড়া আর কিবা দেবেন, আছে সব, দেবেন কে? ঈশ্বর না রাজা? যার দেবার সে তো ঈশ্বরের কৃপায় সেবায় মন না দিয়ে বিলাসিতায় মগ্ন।

যাইহোক মৃতটার মুখ সামান্য হাঁ করা, মুখের চারপাশে লালা। কয়েকটি মাছি লালার ওপর বসে। কয়েকটি চারপাশ ঘিরে উড়ছে। ওরাও চায় ক্ষুধা মেটাতে।

শরৎ মাখানো ভোর। পূর্ব আকাশ রাঙা তবে অবছা। ঝিরঝিরে মিষ্টি হাওয়া বইছে। গাছের ডালে ডালে পাখির সারা আকাশেও তাই। স্বাধীনতা বইছে ওদের ডানায় ডানায়, উদ্যানেও মানুষের ভীড়। বেশিরভাগ মর্নিংওয়াক করতেই এসেছেন। মন আর শরীর চাঙ্গা রাখার জন্যে এসেছেন। কেউ তার শিশুকে নিয়ে, কেউ এমনি অভ্যেসে এসেছেন মিষ্টি হাওয়া উপভোগ করতে।

হঠাৎ অনেকেই চমকে ওঠেন, দেখেন এক কঙ্কাল সার দেহ গাছের তলায় চিৎ হয়ে শুয়ে। কয়েকজন এগিয়ে যান, কাছে গিয়ে বোঝেন বেঁচে নেই। একটা বেদনাসূচক শব্দ করে বলে ওঠেন আ—হা বেচারি বেঁচে নেই। কয়েকজন অভিমান করে বললেন এতো জায়গা থাকতে এখানে কেন? পথই এদের ঠিক স্থান। আর এক জন বয়স্ক তিনি আক্ষেপ করে বললেন, না—না একথা বলা উচিত নয়। যার যেখানে সেই স্থানটাই পরম প্রিয়। হয়তো ওর সাধ ছিলো এখানে মরার। যেখানে ও মরেছে অর্থাৎ গাছ তলায় সেই গাছের ওপরে ভালো করে সাদা একটা পোস্টার তাতে লেখা, একটি গাছ একটি প্রাণ।

কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে মনের আনন্দে খেলছিলো। হঠাৎ ভীড়ভাট্টা দেখে সেই দিকে ছুটে যায় হৈ হৈ করতে করতে। গিয়ে দাঁড়ায় মৃতটার প্রায় কাছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন দু হাঁটুর ওপর হাত দুটো রেখে মৃতটার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। মুখে এবং মুখের চারপাশে মাছিগুলো তখনো ছিলো, বাচ্চাগুলোর সেদিকেই দৃষ্টি। একজন বাচ্চা তার বন্ধুদের বললে নিশ্চিত না খেয়েই লোকটি মরেছে। আর একজন বললে আমিও আমাদের স্কুলের রাস্তায় ডাস্টবিনের সামনে ঠিক এমনি দেখতে একজন মরে আছে দেখেছি। আমার সেদিন ভীষণ কষ্ট হয়েছিলো। মৃতটা যেহেতু মানুষ সুতরাং মানুষের এমন দৃশ্য মানুষ কি স্থির থাকতে পারে? তাই দুঃখের শেষ নেই। উঃ আঃ শব্দটি তাই আপনা হতেই বেরিয়ে আসে সবার মধ্যে।

একজন সুন্দরী মহিলা তিনিও মর্নিংওয়াক করতে এসেছিলেন। সাথে ছয়—সাত বছরের ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে। তিনিও ভীড় দেখে এগিয়ে যান। তারপর অস্তিচর্ম সার মৃত মানুষটিকে দেখেন। দুঃখ প্রকাশও করেন। হঠাৎ উনি ওনার ব্যাগ থেকে দশ টাকার একটি কয়েন তার বাচ্চার হাতে দিয়ে কয়েনটি ছুঁড়ে দেওয়ালেন মৃতদেহটার কাছে। কপালে হাত দিয়ে প্রথা অনুযায়ী সেই কাজটিও সারতে ভুললেন না মহিলাটি।

এর কারণ বাচ্চাটি জিজ্ঞেস করলে মহিলা বললেন, ওর আত্মা যাতে শান্তি পায়। ঈশ্বরের কাছে তারই জন্যে প্রার্থনা। মহিলার এমন সুন্দর কথা, এক ভিখিরি তার প্রতি এতো দরদ। এত মায়া, সত্যি ভাবা যায় না। সুতরাং মহিলাকে সাধুবাদ দিতে কেউ ভুললেন না। হয়তো হাততালিও পড়তো। কিন্তু এই এখানে তা হবার নয়। তাই তালি দেওয়া বন্ধ রইলো।

মহিলাকে ভুরি ভুরি প্রশংসা করার পর অনেকেই এখন তার পথ ধরে এগিয়ে যেতে চান তাই তারাও এক সাথ এক মন হয়ে যে যা পারে টাকা পয়সা মৃত ভিখিরির দিকে ছুঁড়ে দেন, কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কারও করলেন অনেকে। তার সাথে সাথে বলেও ফেললেন কয়েকজন, একেই বলে কপালের জোর, দুঃখের পরে সুখ। মন্দ কি? সুখ তো পেলো।

কেউ বলেন ভগবান যাকে দেন দুহাত ভরে দেন। মরেছে ঠিকই। কিন্তু ওর কপালে লিখন কে খণ্ডাবে? তাই ওর শেষ ইচ্ছেটুকু পূর্ণ হলো।

একজন মোটাসোটা ভদ্রলোক তাঁর মানিব্যাগ থেকে একটি পঞ্চাশ টাকার নোট নিয়ে টাকাটা গোল্লার মতো করে জোরে ছুড়ে দেন। টাকাটা মৃত মানুষটির হাঁ করা মুখে গিয়ে পড়ে।তিনি সামান্য হেসে বললেন, শেষ সুখটি এবার ও পুরোটাই পেলো।

মাঠের আর এক প্রান্তে গাছের তলায় যে মানুষটি বসে ধুকছিলো। ওর ক্ষীণ দৃষ্টি কখনো আকাশে কখনো ওখানে, যেখানে মৃত মানুষটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। পিঁচুটি ভরা চোখ, দৃষ্টি ক্ষীণ, চোখের কোল বেয়ে নামা অশ্রুবিন্দু। চেহারা শীর্ণ বিশ্রী, সেই মানুষটি এখনও আশা নিয়ে পৃথিবীর দিকে চেয়ে থাকে। হয়তো ক্ষীণ দৃষ্টির মধ্য দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করে কত বড়ই না পৃথিবী। তা থেকে কিছুই কি তার নেই? তাই শূন্য তার পাত্র শূন্যই থাকে।

সত্যি কে একজন তাও ভিখিরি মরেছে। তার জন্য এতো ভাবনা—চিন্তা কেন? কিন্তু মৃত মানুষটাকে নিয়েই হয়ে যায় বিরাট কিছু।

মাঠের ওপারে রাস্তার পাশেই আছে স্বাধীনতা সংগ্রামী একজন মহান নেতার নামে ক্লাব। এখানে ভালো—মন্দ মিশিয়ে ক্লাব সদস্য কম নয়। এই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট এবং ক্ষমতাশীল ব্যক্তি বিলাস দে। গোলগাট্টা চেহারা। গলায় ঝোলে কয়েক ভরির সোনার চেন। নিজস্ব গাড়ি দুটি, অনেক উঁচু দরের মানুষ তাঁর বাড়ির বৈঠকখানায় বসে জমিয়ে আড্ডা মারেন। চেলা চামুন্ডার সংখ্যাও কম নয়।

ক্লাবের প্রায় কাছে ওনার দ্বিতল সাজানো গোছানো বাড়ি। প্রিয়জনদের আবদারে ভোটে দাঁড়াবার টিকিটটাও পেতে বেগ পেতে হয়নি তাঁর। ভোট আসন্ন, তিনিও চিন্তিত, কোন ভেল্কীতে চেয়ারখানায় বসতে পারেন। হঠাৎ এর মধ্যে সমাধান করা পেয়েও যান, তা হল এক ভিখিরীর মৃত্যু। মানুষের জটলা। তাদের দুঃখ প্রকাশ যন্ত্রণা। এসবের মধ্যেই পেয়ে গেলেন তাঁর ভোট পাবার সফলতা। খবরটি কানে যেতেই তৎক্ষণাৎ ঘরোয়া মিটিং ডেকে সমস্ত সভ্য ও চেলা চামুণ্ডদের একপ্রকার হুকুম এবং সাথে একটু মধুও মিশিয়ে বললেন—মৃতের সৎকার ক্লাবের সভ্যগণই করবে। আমি আছি। স্বামী বিবেকানন্দের মতে কে উঁচু কে নীচু? আমরা এক। সবাই আমরা ভাই। সুতরাং আর দেরি নয় এগিয়ে চলো, সদস্যদের তৎপরতায় চাঁদা দ্বিগুণের চেয়ে বেশি উঠলো। এতে বিলাসবাবু বেশি উৎফুল্ল। কারণ তিনি মনে মনে হিসেব করে নেন। নিশ্চিত এমন সাড়া তার মধ্যেও আসবে। এর জন্যে না হয় আরো কিছু সময় এদের মাঝে তিনিও না হয় সাধারণ এক মানুষ হয়ে থাকেন। তাহলে পাকা চেয়ারটি থাকবে তারই দখলে।

চাঁদা ভালোই ওঠে। মৃতটার কাছেও কম টাকা পয়সা পড়েনি। বেচারা মৃত। ও যদি এসব টাকা বেঁচে থাকার সময় পেতো, তাহলে যম নিজেই হয়তো ওর কাছ হতে পিছন ঘুরে দাঁড়াতেন। কারণ তিনি বুঝতেন এর কাছে এই টাকা অনেক।

সূর্য মাঝ আকাশে। ঝাঁজালো রোদ। যে মানুষটি গাছের তলায় বসে ধুকছিলো তার আবছা দৃষ্টি মাঠের ও প্রান্তে। যেখানে মৃত মানুষটিকে নিয়ে জটলা।

ক্লাবের সদস্যরা উপস্থিত। বিরাট একটা মহৎ কাজের জন্য অনেকের কাছে তারা মহান। হয়তো এমন সেবামূলক কাজ আগে কোনোদিন হয়নি। যদিও বিলাসবাবুর এই নিঃস্বার্থ কাজে ওনার ভূমিকা অতুলনীয়।

তিনি সবার মাঝে কিছু বলতে গিয়ে স্বামীজির বাণীটাই কাজে লাগালেন। দরিদ্র, মেথর, মুচি সবাই আমার ভাই। হাততালি স্বভাবতই পড়বে, পরেও ছিলো কিন্তু এই হাততালি তিনি মেনে নেননি। শেষে তাঁর নির্দেশে এক মিনিটের জন্যে শোক দিবস পালন করা হয়।

এক উঁচুদরের মৃত ব্যক্তির জন্যে যা যা করা হয়। এখানে অর্থাৎ মৃত ভিখিরিকেও সেই মর্যাদা দেওয়া হলো। দামি খাট। দামি বিছানা, তার ওপর শোয়ানো মৃত মানুষটি। যার মৃত্যু না খেয়ে, মৃতের গলায় মোটা রজনীগন্ধার মালা। বিলাসবাবু এবং আরো কয়েকজনের তরফ থেকে ওরকম আরো কিছু মালা মৃত ভিখিরির প্রায় সর্ব শরীর ঢাকা পড়ে যায়। মৃত ভিখিরি ওর মৃত্যুর পরেও কপাল জোরে ওর কপালে রয়েছে চন্দনের ফোঁটা, গোলাপ ফুলও রয়েছে বুকে। এরকম এক দৃশ্য আশ্চর্যজনক। এপাড়া ও—পাড়া দূরে আরো দূরে ছড়াতে বেশি সময় নেয় না। সুগন্ধ ধূপ। আর আতরের গন্ধে সারা মাঠই গন্ধে ভরপুর। মৃতটি যদিও ক্ষুধার জ্বালায় মরেছে। কঙ্কালের মতোই চেহারা। তবু সবার এখন একই সমালোচনা মৃত মানুটিকে নিয়ে, তার মধ্যে বলেই ফেললেন কে, চলেন সেজে বাদশা। সমাজ ব্যবস্থার এতো গাফিলতি থেকেও আজকের এই মেকি দৃশ্যে ভুলে যায় সত্যি কি তাই? এটাই আমাদের নিঃস্বার্থ কাজ। তাই প্রশংসার শেষ নেই। তালি থামে না। ঘোর অন্ধকারে ভাবি এই বুঝি পাব আলো। আবার ভাবি সবই যায় বুঝি তলিয়ে। সমাজ চলে দ্রুতগতিতে দেখবার সময় কই!

মৃতটির সম্মান যায় আরো বেড়ে বিশিষ্ট সব মাননীয়দের জন্যে। বিলাসবাবু তার আসনটি আরো পাকাপাকি পাবার আসায় মৃত ভিখিরির সৎকারের ব্যবস্থায় নিজেই এলেন এগিয়ে। সঙ্গে ক্লাবের সদস্যগণ এবং সমাজ বিশিষ্ট মাননীয়রা।

মাঠে এক প্রান্তে যে জীবিত অবস্থায় থেকে তখনো বাঁচার আশায় চেয়ে ছিলো মানুষের ভীড়ে, তাকে আগে ভাগেই কয়েকজনের সহায়তায় মাঠের বাইরে বার করে দেওয়া হয়। কারণ মাঠের সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্যই এই ব্যবস্থা। যদিও অনেকের তীব্র সমালোচনা আগেই এই কঠোর ব্যবস্থা করা থাকলে মাঠের সুন্দর পরিবেশ নষ্ট হতো না।

কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে। সুতরাং এই আলোচনা থামতে বেশি সময় নেয়নি। কারণ আছেন সব দরদি মানুষ। আছেন মাননীয় সম্মানীয় গুণীজন সব বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। যারা কথা বলে মানুষ কেনেন।

মাঠের বাইরে ফুটপাথের এক ধারে ধুকছিল যে মানুষটি অর্থাৎ ভিখিরিটি, সে এখন ওর ক্ষীণ দৃষ্টি দিয়ে দেখে পাড়া জাগিয়ে বিকট জোরে হরিবোল বলতে বলতে ক্লাবের সদস্য এবং বিশিষ্ট মাননীয় সম্মানীয় ব্যক্তিরা একজন না খেয়ে মরে যাওয়া মানুষকে সমাদরে বাদশার মর্যাদা দিয়ে ঘটা করে নিয়ে চললেন মহাশ্মশানের দিকে। ক্ষীণ দৃষ্টি দিয়ে সবই আবছাভাবে দেখে তখনো বেঁচে থাকা সেই মানুষটি যার ভিক্ষের পাত্র ছিল তখনো শূন্য।

বিকেল শেষ হব হব। এখনো হয়নি। সূর্য পশ্চিম আকাশে। মাঠের পরিবেশ এখন মিষ্টি মেশানো বিকেলের শেষ বেলা। শিশুরা হুটপাটি নিয়ে মেতে। বড়রা সাথে সাথ দিয়ে মেতে রয়েছেন শিশুদের সাথে। কেউ কেউ হেঁটে শরীরকে ঠিক রাখায় ব্যস্ত। মাঠের চারপাশে ল্যাম্প পোস্টের বাতি সব জ্বলে ওঠে তাতে মাঠের রঙটাই গেছে পাল্টিয়ে। এইখানেই সকালের যে ঘটনা চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এখন আর মনেই হয় না একজন এই স্থানে না খেতে পেয়ে মরে সবার কাছে বাদশা হয়েছিলো। হয়তো বিলাসবাবুর প্রচারে না খেতে পাওয়া ভিখিরিটি আবার বাদশা হয়ে উঠবে কিছুদিন। অন্তত ভোটের দিন পর্যন্ত।

সূর্য ডোবে। মাঠের বাইরে ফুটপাথে কোনো এক স্থানে বসে যে ক্ষুধার যন্ত্রণায় ধুকছিলো। যাকে একপ্রকার জোর করেই মাঠের বাইরে বার করে দেওয়া হয়। সেই মানুষটি তার ঘোলাটে দৃষ্টি দিয়ে দেখে নেয় তার ভিক্ষে পাওয়া পাত্রটি। হঠাৎ শূন্য পাত্রটি হাতে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে রাস্তায়। তোবড়ানো পাত্র গাড়ির চাকায় আরো চেপ্টে যায়। তারপর অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ায় না খেতে পাওয়া মানুষটি ওর কঙ্কাল সার হাত দুটো ওপরে তুলে একবার বিড় বিড় করে কি যেন বলতে থাকে, তারপর আবার কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ে।—

ওর উঠে দাঁড়াবার উদ্দেশ্য কি ছিলো? কিছু কি বলতে চেয়েছিলো? হয়তো চেয়েছিলো। ওর সঙ্গীর মতো আশা নিয়ে কিছু কথা।

আমিও চাই বাদশা হতে ''আমাকে বাদশা করে দাও।''

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%