জনমত

অমল চট্টোপাধ্যায়

পাহাড়টি উচ্চতায় বেশি নয়, কিন্তু রূপে চোখ ফেরানো যায় না এমনই সুন্দর চাঁদের আলোয় এই পাহাড়কে লাগে আরো সুন্দর। সোনালি হয়ে ওঠে তখন এই পাহাড়। রুপের ছটায় ঝিকমিক করে এই পাহাড়।

পাহাড়ের পাশে বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে জমি, জমির প্রায় অংশ সবুজ ঘাসে ভরা। তার চারপাশ ঘিরে কতই না গাছ, নানা জাতের গাছ, জাতের শেষ নেই। সেইসব গাছে এক এক সময় এক এক ধরনের ফল। এই সব গাছের ডালে ডালে বসে থাকে কতই না রঙ—বেরঙের পাখি। নানা জাতের পাখি। নানান ভাষায় শুরু হতে থাকে তাদের গল্প। গল্প আর থামে না, অথচ গল্পে কলহ নেই, আছে সুখ শান্তির কথা। তাই তো গাছের পাতায় পাতায় বসন্ত আসার আগেই আসে যেন বসন্ত। প্রকৃতির রূপ হয়ে ওঠে এখানে আরো মনোরম। এই বিস্তীর্ণ এলাকার নানা স্থানে রয়েছে ছোট বড় দিঘি। এক সরু নদীও পাহাড়ে গা ঘেসে চলে গেছে বহুদূর পর্যন্ত, তারপর মিশে গেছে বড় নদীতে। সব মিলিয়ে এই স্থান অতীব সুন্দর।

এই স্থানে যারা বাস করে তারা সবাই পশু, যেমন বাঘ ভালুক শিয়াল উট কুকুর বেড়াল এমনকি ইঁদুর পর্যন্ত। এছাড়া অন্যান্য পুশুরাও। এরা প্রত্যেকেই থাকে একে অপরকে আপন করে। চলে নির্ভয়ে আসলে এরা প্রত্যেকেই ভাবে আমরা প্রত্যেকেই যাই হই না কেন, মনটা আমাদের সবার এক, তাই দ্বন্দ্ব আসবে কি করে। আর দ্বন্দ্ব না হলে শ্রেণি ভাগও আসার কোনো লক্ষণ নেই। এক কথায় শান্তিছায়ায় যেই থাকুক তার অমর্যাদা এখানে হয় না। আসলে শান্তিছায়া হলো সবার প্রাণ। একে অক্ষুণ্ণ রাখা চাই সবার কাছে আগে। সুতরাং লোভ লালসা হিংসা ওদের মনের পাতায় শূন্যই থাকে। তাইতো ওরা সুখী।

পাখিদের ভাষায় এরাও যেন আছে পরম নিশ্চিন্তে, আনন্দে, স্বাধীনভাবে সর্ব সুখ নিয়ে।

একদিন বর্ষ তখন শেষ, সন্ধ্যা আকাশ, নক্ষত্র তাতে ভরা, আকাশে গোল চাঁদ, দিগন্তব্যাপী তার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে প্রকৃতির মাঝে। হাওয়ার দোলায় গাছের পাতা সহ ডালগুলি দুলছে। চাঁদের আলো পাতায় পড়ে পাতাগুলো ঝকমক করে উঠছে। তখন শান্তি ছায়ার রূপের পরিবর্তন হয় আর এর রূপে, যার রূপের শেষ নেই, মনে হয় মঙ্গলময়ী মা ধরা দেন আপনা হতেই। হয়তো বলতে চান আমি সবার। তোমরা সবাই সুখে থাকো।

ঠিক সেই সময় ভীষণ ক্লান্ত আবস্থায় এক বুড়ো কাঠুরিয়া মিস্ত্রী অনেক চেষ্টা করেও পথ খুঁজে না পেয়ে চলে আসে এই শান্তি ছায়ায়।

দূরে পাহাড়ের রং তখন সোনালি। অপূর্ব তার রূপ। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে সোনালি তাতে মিশে পাহাড় সবাইকে যেন আরো আকৃষ্ট করে রেখেছে। পাস দিয়ে সরু নদীর জলও সোনালি মিশে যেন সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে এক অপরূপ মহিমায়। তারই পাশে চারপাশ ঘিরে সারি সারি গাছ। চাঁদের আলোয় গাছের দোলা ডালগুলোর পাতায় চাঁদের আলো পড়ে সবুজ পাতায় সোনালি তাতে মিশে অপরূপ হয়ে উঠেছে।

ক্লান্ত কাঠুরিয়া মিস্ত্রী অবাক হয়ে এই পৃথিবীকে দুচোখ ভরে দেখেও যেন তার সাধ পূরণ হতে চায় না। ভাবে, আরো দেখে জীবনের শেষ পর্যন্ত, মৃত্যুর স্পর্শ না পাওয়া পর্যন্ত। কারণ এমন সুন্দর সন্ধ্যা সে তো কোনোদিন দেখিনি। পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো পেয়েও এমন সুখ পায়নি। এমন চাঁদ দেখেও মুগ্ধ হয়নি। এমন গাছ দেখেও নিঃশ্বাস নেয়নি বাঁচার তাগিদে। এখন এই মুহূর্তে মনে হলো এই সবই তার অন্তরঙ্গ কেউ। যারা তাকে আপন করে নিলে বাধা আসবে না। কারণ, এ জায়গা যেন ভীষণ পবিত্র। হয়তো প্রভাতে এখান থেকেই শুরু হবে নতুন সূর্য দেখার স্বপ্ন।

কাঠুরিয়া তার একাকী জীবনে ভাবলো বহু কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করে এতো বছর তো কাটিয়ে দিলো। এবার না হয় বাকি জীবনটা এখানেই যেভাবে হোক কাটিয়ে দেবে এবং থেকেও গেলো। দিনগুলো বেশ ভালোভাবেই কাটতে লাগলো।

একদিন সন্ধ্যায় এক দিঘির পাড়ে বুড়ো কাঠুরিয়া মিস্ত্রী বসেছিলো। দিঘির চারপাশে কত রকমের গাছ। কত রসালো ফল গাছের ডালে ঝুলছে। এছাড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে নারকেল গাছতো আছেই। তাছাড়া যেখানে সেখানে ফুলের গাছ। আকাশে আধখানা চাঁদ, তার আলো চারপাশ ঘিরে স্থানটিকে আরো সুন্দর করে তুলেছে। চাঁদের আলোয় দিঘির জলে যেন সোনালি মিশে দিঘীর জল আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে এক মনোরম দৃশ্য দেখে চলেছে বুড়ো কাঠুরিয়া মিস্ত্রী।

হঠাৎ বুড়ো কাঠুরিয়া মিস্ত্রী দেখতে পেলো দিঘির অদূরে এক পরমা সুন্দরীকে। রাজকন্যার মতোই তার বেশ, রাজকন্যার ঠোঁটে এক চিলতে সুন্দর হাসি।

কাঠুরিয়া মিস্ত্রী অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে রাজ কন্যার দিকে। এবং মনে হলো রাজকন্যা তার হাসির মধ্য দিয়ে কিছু বোঝাতে চাইলো তাকে। এক সময় সেই সুন্দরী কাঠুরিয়ার চোখে মিলিয়ে গেলো। কাঠুরিয়ার মনে হলো রাজকন্যা মিলিয়ে গেলেও তার একটা মিষ্টি সুবাস সে এখনো পাচ্ছে। সুতরাং সে ধরে নিলো তাঁর দেখা এই রাজকন্যা অদৃশ্য হলেও এই স্থানের আশেপাশেই আছে। ওই রাজকন্যার হাসিতে আরো বুঝলো, সে ভালো আছে এবং নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় থাকতে পারে, এই শান্তি ছায়া সকলের জন্য।

কাঠুরিয়া মিস্ত্রীর ভীষণ ইচ্ছা হলো তাই দিঘির জল স্পর্শ করলো, সেই জল মাথাতেও ছিটিয়ে দিলো। তারপর ফিরে এলো এক রসালো গাছের নীচে। গাছের ডালে ডালে ঝুলছে অজস্র পাকা ফল। একেবারে কাঠুরিয়া মিস্ত্রীর মাথার উপরেই ফলগুলি, সুতরাং কাঠুরিয়ার কোনো অসুবিধাই হলো না ফলগুলি স্পর্শ করতে। মনে মনে ভাবলো এটাই কি তাহলে আসল সুখ?

এই শন্তি ছায়াকে আপন করে বাকি দিনগুলি বুড়ো কাঠুরিয়া মিস্ত্রীর বেশ আনন্দেই কেটে যাচ্ছিলো। মনে মনে আশ্চর্যও হচ্ছিল, এখানকার স্বাধীনতা দেখে। সুখ পাবার আশায় কারো ওপর কেউ নির্ভরশীল হয় না। সুখ এমনিতেই ঝিরঝিরে হাওয়ার মতো বইতে থাকে এখানে সমান তালে।

বুড়ো কাঠুরিয়া আরো বুড়ো হলো। আর পারে না, পৃথিবীব ভার সইতে। যদিও পৃথিবী তার বড়ই আপন। মা বসুন্ধরাও চায় না কাউকে কোলছাড়া করতে। কিন্তু এ তো সত্য, একদিন সব মায়া বন্ধন ছেড়ে চলে যেতে হবে যার নির্দেশে এখানে আসা তারই চরণতলে।

একদিন সূর্যদেব দিনের সব কাজ সেরে ধীরে ধীরে তার যথা স্থানে এগোতে থাকেন, তার দেহ হতে রক্তিম আলো আকাশের চারপাশ ঘিরে এক মনোরম শোভা তখনো বর্ধন করে চলেছে, এমন অদ্ভুত দৃশ্যে বুড়ো কাঠুরিয়া চেয়ে থাকে এক দৃষ্টে। তারপর হাত জোড় করে বললো হে সূর্যদেব! আমার যেটুকু শক্তি দিয়ে এগিয়ে গেছি সবই আপনার কৃপা। আমার শেষ বেলায় আমার শেষ ইচ্ছাকে আর একবার পূরণ করে আমার মনোবাসনা পূর্ণ করুন। আমার একান্ত ইচ্ছা শেষ জীবনে পথ হারিয়ে এখন এসে ফিরে পেয়েছি যে সুখ সে আপনারই লীলা ছাড়া কিছু নয়। সুতরাং পুনরায় একবার শেষ সুযোগ দিন, যেন আমার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারি।

সূর্যদেবকে আর একবার স্মরণ করে কাঠুরিয়া মিস্ত্রী। সূর্যদেব ফিরে যায় তার যথা স্থানে।

আকাশে গোল চাঁদ। তার মিষ্টি আলোয় চারিদিক আঁধার মুক্ত। বুড়ো কাঠুরিয়া তার থলি হতে যন্ত্রপাতি বার করে বনের মধ্যে যে বন একটু ঘন সেই বনের মধ্যে প্রবেশ করলো।

তারপর সেখান থেকে কিছু শুকনো গাছের কাঠ সংগ্রহ করে বন থেকে বেরিয়ে এসে এক খোলা জায়গায় এসে বসলো। যদিও কাঠ বইতে এই বয়সে খুব কষ্ট হচ্ছিল, তবু তার ইচ্ছাকে হার মানাতে চাইছিল না। কারণ শান্তি ছায়ার যে ভালোবাসা পেয়েছে তা মুছে ফেলার মতো নয়।

বুড়ো কাঠুরিয়া সেই কাঠ নিয়ে তার কাজ শুরু করে দিলো। কাজ চললো সারারাত, পরিশ্রম হলো প্রচুর। তবু জিনিসটা না করা পর্যন্ত তার শান্তি নেই। কারণ সে যে ভালোবাসে তার এই শান্তি ছায়াকে।

অবশেষে কাজ শেষ হলো। একটা আরাম তৃপ্তি এলো কাঠুরিয়ার মধ্যে। একবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিল জিনিসটা। তারপর এক গাল হেসে নিজের মনেই বললো আমার সাধ্যমতো যা দিলাম তোমরা গ্রহণ করো। তোমাদের অপার ভালোবাসাই আমার চিরবিদায়ের সুর বাজুক আমার ভাঙা হৃদয়ে। বুড়ো কাঠুরিয়া তৈরি করলো সুন্দর একটি চেয়ার।

পূর্বাকাশে সবে রাঙা আলোর আভাস, পাখিদের স্বরে কাজের তাড়া, তবে সুর বড়ই মিঠে।

পাখিদের ডাকে ঘুম ভেঙে যায় ইঁদুরের, আলমোড়া ভাঙতে ভাঙতেই সূর্যদেবকে দেখে নেয় একবার, মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণামও সেরে নেয়। তারপর হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নজরে পড়ে এক নতুন জিনিস। যা আগে কোনোদিন শান্তিছায়ায় দেখেনি। ইঁদুরটি পিট পিট করে নতুন জিনিসটি দেখতে থাকে একটা কৌতূহল জেগে ওঠে মনের মধ্যে ওটা কাছে দেখার ইচ্ছা আরো পেয়ে বসে, এবং এগিয়েও যায় এই অদ্ভুত জিনিসটি দেখার জন্য। কাছে গিয়ে অবাক হয়ে বলে ওঠে আরে বাবা। একি সুন্দর রে, এত সুন্দর কি কিছু আছে, ইচ্ছে করছে একটু স্পর্শ করতে।

না, থাক দরকার কি, ইঁদুরটি কয়েক পা পিছিয়ে পড়ে। আবার পেছন ঘুরে তাকিয়ে থাকে জিনিসটির ওপর, একবার ভাবলো চলে যাওয়াটাই ঠিক। তারপর মনের মধ্যে কি সব উদ্ভট চিন্তা আসতে থাকে, একসময় মনস্থির করে নেয়, তারপরই গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে জিনিসটির একেবারে কাছে এসে দাঁড়ায়। সামনের পাদুটো তুলে দুপা এক করে কচলিয়েও নেয় কিছুক্ষণ তারপর চোখ বন্ধ করে ছুঁয়েও ফেলে জিনিসটা। মুহূর্তে কেমন যেনো হয়ে যায় ইঁদুরটি। মুখ দিয়ে কেমন সব অদ্ভুত কথা বেরোতে থাকে, আঃ কি সুন্দর! কি অপূর্ব! ইঁদুরটি হাসতে হাসতে বলে ওঠে। এর মধ্যে এতো সুখ আগেতো বুঝিনি। ছুঁতেই যদি এতো সুখ পাওয়া যায় কি জানি বসলে হয়তো সুখ আরো অনেক বেড়ে যাবে। তাহলে বসেই দেখি একবার। ইঁদুরটি একবার এদিক ওদিক চেয়ে নেয়। একবার লাফিয়ে বসতে গিয়েও না বসে ভেবে নেয় কিছু, তারপর জিনিসটির চারপাশে ঘুরে ঘুরে শুঁকে নিয়ে এমন ভাব করলো মনে হলো এবার এর দখলটা এরই হাতে। তাই ইঁদুরটি এক লাফে জিনিসটির ওপর ধপাস করে বসে পড়লো। আর সেই মুহূর্তে নিজেকে কি মনে হতে থাকলো, একবার পেছনের দুপা জিনিসটির ওপর রেখে সামনের দুপা হাতের মতো করে একটি হাত পিঠের পিছনে রেখে একটি হাত ওপরে তুলে কিসব আবলতাবল যা—তা বলতে লাগলো, যার সাথে শান্তিছায়ার কোনো সংস্পর্শ নেই। যেমন প্রথমেই বলে আমাকে এটা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। অবশ্য এটা আমারই প্রাপ্য। আমি আজ খুবই খুশি।

হাওয়াটাতেও তাজা মিঠে গন্ধ পাচ্ছি। আগে যা পাইনি, এখানকার গাছপালা ফল মূল বন সবই যেন আমার কাছে এসে পড়ছে। তাহলে কি এসবই আমার? তাহলে আমি কে? ইঁদুর হোঃ হোঃ করে হাসতে থাকে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে অবাক হয়ে চারপাশ চোখ ঘুরিয়ে নিজেকেও ভালো করে দেখে নেয়। দু—একবার সামনের পা দিয়ে চুলকিয়ে নেয় শরীর। তারপর নিজের মনে বলে আমি ইঁদুরতো? না অন্য কিছু বিরাট কিছু হয়ে গেছি, তবে যদি তাই হই, তবে তাই, বলে জিনিসটির ওপর ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে আধ বোজা অবস্থায় একবার বলে ওঠে কাজ শেষ, যাও আমি নাচবো। ইঁদুরটি ঘুমিয়ে পড়ে।

তার একটু বাদে বেড়াল রাস্তা ধরে হাঁটছিল। সূর্য তখন রাঙা পোশাক ছেড়ে অন্য পোশাকে, গাছের ডালে ডালে জটলা হয়ে পাখিরা বসে কি সব আলোচনা ব্যস্ত। বেড়াল ভাবে ওদের ডাকের মধ্যে কেমন যেন একটা অন্য ভাব। এই আলোচনার মধ্যে সেটাই প্রকাশ পাচ্ছে। ওদের হাব ভাব দেখে আর কথা না বাড়িয়ে নিজের কাজ করে যাওয়াটাই ঠিক এ কথাটি ভেবে একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নজরে পড়লো অভাবনীয় সেই জিনিসটির দিকে, আরো অবাক হলো ওটার ওপর আবার ইঁদুর বসে থাকায়।

বেড়াল আরো দ্রুতবেগে জিনিসটির কাছে এসে দাঁড়ালো। দেখে ইঁদুর দিব্যি নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। বেড়ালটার ভ্রূ দুটো কুঁচকে উঠলো, ভাবলো ব্যাপরটা কেমন গোলমাল লাগছে না? বেড়ালটা জিনিসটার চারদিকে ঘুরে নিলো প্রথমে।

তারপর সামনের পা দুটো তুলে জিনিসটির চারপাশে ঘুরতে থাকে আবার জিনিসটা শুঁকতেও থাকে। তারপর নিজের মনেই বললো এবার বুঝি এতে কত মধু, কত সুখ, ব্যাটা তাহলে এতো আয়াসে ঘুমোয়? দেখাচ্ছি—

বেড়াল আস্তে ইঁদুরকে ঠেলা দিলো। কাজ না হতে আবার দিলো। এবার ইঁদুরটি ঘুমের ঘোরে বলে ওঠে এখন বিরক্ত নয়, পরে হয়ে যাবে, বলে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।

বেড়াল এবার জোরেই ধাক্কা দিলো ইঁদুরকে।

ইঁদুর ভীষণ চমকে বলে ওঠে কে? চেয়ে দেখে বেড়াল।

একটু কেটে কেটে বললো আরে বেড়াল, সুপ্রভাত বন্ধু।

ভালো তো, শরীর মন সব ভালো?

বেড়াল মাথা নেড়ে বললো মোটেই বুঝছি না।

ইঁদুর আশ্চর্য হয়ে বললো কেন কেন! রাত্রিতে বুঝে ভালো ঘুম হয়নি। জেগে জেগে কোনো স্বপ্নটপ্ন দেখোনি তো?

বেড়াল বললো অতশত বুঝিনি।

ইঁদুর চিন্তিত হয়ে বললো, তাহলে ব্যাপারটা সত্যি গুরুতর।

বেড়াল হেসে ইঁদুরকে সামান্য ঠেলা দিয়ে ওর পাশে বসে বললো একটু ঠেলা দিয়ে রাতজাগা স্বপ্নকে মিলিয়ে দেখছি স্বপ্ন দেখাটা আমার কি ছিলো।

ইঁদুর বললো, না না এটা ঠিক নয়, স্বপ্ন তো আরো অনেক হতে পারে, ঠেলাঠেলি কোনো?

বেড়াল মাথা দুলিয়ে বললো, তোমার যুক্তি যেমন ঠিক, আবার আমার যুক্তির মধ্যেও আছে শেষ করে দেওয়া। অর্থাৎ রাস্তাটা ফাঁকা করে দেওয়া।

ইঁদুর অবাক হয়ে জিনিসটি দেখিয়ে বললো কি বলছ ভায়া রাস্তাটা এখানে?

বেড়াল বিরক্ত হয়ে বললো হ্যাঁ হ্যাঁ এখানে।

ইঁদুর চিন্তিত হয়ে বললো বন্ধু রসিকতার নিয়মটা আজ পাল্টে গেল না? মনে হচ্ছে তেতো মেশানো।

বেড়াল ব্যঙ্গ হেসে বললো ভায়া রোজই যদি মিঠে বাতাস পাওয়া যায়, তা হলে ঋতু না থাকলেই পারতো। তাই সময়ে ঝড় যেমন আসে, তেমনি মিঠে সবসময় ভালো লাগে? তাই কথার ছলে একটু তেতো জোগান দিচ্ছি। ইঁদুর হেসে বললো খুব ভালো। তবে তেতোর উপকরণ কি আমাকে ঠেলা দিয়ে?

বেড়াল গম্ভীর হয়ে বললো দেখো, আমার মনে হচ্ছে এই স্থানে বসার মধ্যে আলাদা একটা মজা আছে, সুখও বলতে পারো, যা তুমি পেতে চেয়েছিলে। কিন্তু আমি থাকতে কি করে হয়, তাই দরকার একটা শুধু মাত্র ঠেলা।

ইঁদুর বললো, ঠেলা? আমায়?

বেড়াল বললে মন কি আমায় তা বলায়, ইচ্ছেটাকেই আর ধরে রাখতে পারছি না। তাই চাই রাস্তা হোক ফাঁকা।

ইঁদুর হতচকিত হয়ে বললো আবার রাস্তা? তাও ফাঁকা।

বেড়াল ভীষণ বিরক্ত হয়ে ইঁদুরকে জোরে ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দিয়ে বললো দুর হ। নিকৃষ্ট জীব, তার আবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা। যা যা গর্তে গিয়ে বাস কর।

ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে ইঁদুরের বেশ ভালোই লেগেছিলো। কোনো রকম উঠে দাঁড়ালো তারপর চিন্তিত মনে বলতে বলতে গেলো মায়ের সবুজ বিছানো ঘাসে না শুয়ে তবে আমার স্থান কি গর্তে?

ইঁদুর চলে যেতে বেড়াল সেই জিনিসটির ওপর নড়েচড়ে আরাম করে বসে এক চোট হেসে নিলো। তারপর ওর মাথায় আবার নতুন চিন্তা আসতে থাকে। ভাবতে থাকলো ইঁদুর আর সে এই দুজনের শ্রেণি ভাগ করলে সমাধান কি এক হলো? নিশ্চয়ই না, কারণ তার শক্তিবল ওর তুলনায় অনেক বেশি শক্তি রাখে সে। বেড়াল হাসতে হাসতেই খুশি মনে ওখানকার সব কিছু দেখতে থাকে। হঠাৎ বিরক্ত মাখা চোখে তাকিয়ে বলে ওঠে কি আস্পর্ধা এই পাখিগুলো এখনো আবার কাছাকাছি ঘুরছে?

ওরা কি জানে না এই বেড়ালের শক্তি কতটা? নাঃ আর সহ্য হচ্ছে না ওদের এই বাহাদুরী। এক্ষুণি এর একটা বিহিত করা দরকার।

বেড়াল চিৎকার করে পাখিদের উদ্দেশ্যে বললো এ্যাঁয় তোদের কি বলে দিতে হবে আমি কে? আমার শক্তির ক্ষমতা কতটা মনে করে পালা নয়তো—

পাখিগুলো ভয়ে তাকাতেই বেড়াল জিনিসটার ওপর দাঁড়িয়ে ঝাঁপ দেবার ভঙ্গি করে, ঠিক এই সময় ওই রাস্তা ধরে কুকুর আসছিলো। হঠাৎ বেড়ালের চিৎকার এবং কি একটা জিনিসের ওপর দাঁড়িয়ে কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে, এসব দেখে কুকুরকে ভাবিয়ে তোলে। ভাবার পর একটা সিদ্ধান্তে আসে তা হলো যার ওপর বেড়াল দাঁড়িয়ে আছে সেটা জানা খুব দরকার।

কুকুর আর দেরি না করে একেবারে বেড়ালের কাছে এসে দাঁড়ালো। এবং অদ্ভুত জিনিসটি মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলো। বেড়াল কুকুরের এইসব ব্যাপার দেখে বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না এরপর কি হতে চলেছে।

কুকুর বেড়ালের দিকে তাকাতেই বেড়াল মিষ্টি করে হাসবার চেষ্টা করে বললো, কোথায় চললে বন্ধু? স্বাগতম।

কুকুর বললো স্বাগতম, কিন্তু যেটার ওপর তুমি দাঁড়িয়ে আছো এটা কি? এর কি কিছু মাহাত্ম্য আছে?

বেড়াল আস্তে বললো জানি না তো।

কুকুর মাথা নেড়ে বললো ঠিক, তুমি জানো না, আর জানবেই বা কি করে, আগে তো এ জিনিসটা দেখেনি।

কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।

বেড়াল বললো অন্য কথা? কি কথা? নিশ্চই হাল্কা, জটিল নয়, খুব জটিল হলে সমাধান করা মুশকিল।

কুকুর বললো তা নয় আমার রাস্তা অন্য দিকে, কিন্তু কি আশায় এ পথ ধরে এলাম? ভাবছি এ জিনিসটির মধ্যে কি একটা আলাদা শক্তি আছে। যে শক্তি পেলে ইচ্ছে হলেই সব পাওয়া যায়।

বেড়াল দাঁড়িয়েই বললো ও কিছু নয়, তুমি যেমন আছো তেমনি থাকো। যে পথ ধরে যাচ্ছ সে পথ ধরে এগিয়ে যাও। দেখবে জটিলো সমাধান হয়ে গেছে।

কুকুর বললো যাবো তার আগে বলতো এটির ওপর দাঁড়িয়ে তুমি কি দেখছো? ভাবছ তুমি কত লম্বা?

বেড়াল বললো, তাইতো আমি দাঁড়িয়ে! হ্যাঁ হ্যাঁ এবার মনে পড়েছে, আমি বন্ধু আকাশ দেখছি।

কুকুর অবাক হয়ে বললো, নীচে থেকে আকাশটা বুঝি ছোট দেখায়? তাই এটার ওপর থাকলে আকাশটা কি তোমার চাইতেও খুবই ছোট দেখায়?

বেড়াল থতমতো হয়ে বললো না না তা হবে কেন? হবে বলছো? আচ্ছা এবার ভাববো।

কুকুর হুঁ বলে জিনিসটা আঁকড়ে ধরলো।

বেড়াল আমতা আমতা করে বললো তুমি আবার এটাকে নিয়ে এতো চটকা চটকি কেন করছ? বড্ড জটিল কেস। হালকা হলে ভালো হয় না?

কুকুর হেসে বললো ভালো লেগেছে।

বেড়াল তেমনি ভাবে বললো, ভালো লেগেছে? কেন।

কুকুর দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বললো বোঝো না এই উত্তম জিনিসটায় বসলে বোঝা যায় আমি কত লম্বা। আর আমার চাইতে আকাশটা সত্যি ছোট কিনা তা পরখ করে দেখা।

বেড়াল বললো বেশ তো আমরা দুজনেই না হয় দেখি।

কুকুর বললো আমি শান্তিছায়াকে একাই দেখবো।

বেড়াল কিছু বলতে গিয়েও কুকুরের কটমট করে তাকানো দেখে বুঝতে পারে শান্তিছায়ার পথটাই উল্টো হয়ে গেছে। তাই ভয়ে ভয়ে বললো তুমি না হয় শান্তিছায়ার পুরো রূপটাই দেখে আনন্দ উপভোগ করো। আমি না হয় সাথে থেকে শান্তিছায়ার রূপরস এসব বোঝবার চেষ্টা করি। আর নীল আকাশের ওপর দিয়ে ওই যে একটুকরো মেঘ যাচ্ছে, দেখি ঘুরে ফিরে আবার এদিকেই আসে কিনা। তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে গেলো। দেখাও হয়ে গেলো। জটিলও গেলো মিলিয়ে।

কুকুর বললো বুদ্ধি তোর মন্দ নয়, তাই আগে থাকতেই তার সমাধান করতে হয় কথাগুলো বলে বেড়ালকে এক ঝটকায় নীচে ফেলে দিয়ে বললো, মূর্খ আকাশে মেঘের আনাগোনা নীচে থেকে দেখাটাই তোদের পক্ষে ঠিক রাস্তা।

বেড়াল অনেক কষ্টে উঠে বললো তোমার এই আকৃতির স্বরূপটা কি তোমার জীবনের সাথে মিলে মিশে আজকেই প্রকাশ পেল?

কুকুর বললো মনের সাথে মান মিশলে তবেই তো পাওয়া যায় মর্যাদা। আর মর্যাদা বাড়লে বোঝা যায় আমি কত লম্বা। আর তুই নীচে থেকেই উপলব্ধি কর তোর সীমানা কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

বেড়াল আর কথা না বাড়িয়ে বিশেষ করে কুকুরের মেজাজ বুঝে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলে যায়।

বেড়াল চলে যেতেই ওই জিনিসটার ওপর কুকুর ভালোভাবে বসে মহা উল্লাসে হাসতেই থাকে। হঠাৎ ও হাসি থেমে যায় দেখে নীচে নিরীহ কিছু পশুপাখি জড়সড় হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের দেখে মনে হয় ওরা পালালেই বরঞ্চ ভালো হতো।

কুকুর এই দৃশ্য দেখে ভাবলো এই জিনিসটির মধ্যে সত্যিই কোনো কিছু ভর করে যা আমার মধ্যে আসছে। তারপর নিজের মনেই বললো, পেয়েছি যখন এই অমূল্য জিনিস যার শক্তি প্রকাশ পাচ্ছে আমার মধ্য দিয়ে, তাকে কি সহজে ছাড়া যায়? তাছাড়া শান্তিছায়ায় যতো মধু সবইতো এটায় মাখা। একটা ভাবি তো আর একটা সামনে যেন ভাসে। সবই লোভনীয়, যেমন মধুমাখা, তেমনি মিষ্টি গন্ধ। এ মিঠে গন্ধ সবই কি এটার মধ্যে?

সত্যি মনটি আমার কেমন কেমন করে, একটা চাইতো আর একটি সেলাম ঠুকে বলে, কি চাই আমি। আঃ কি আরাম, আর এইভাবে বসে থাকা যায় না।

দেহটা একটু এলিয়ে দিলেই ভালো। হ্যাঁ, এইবার দেখি আকাশে ওই যে একটুকরো লাল মেঘ, ওই দেখতে দেখতেই সারা দিনটাকে শেষ করে দিই।

কুকুর মেজাজে হাই তুলতে তুলতেই এলিয়ে পড়ে।

হঠাৎ ও দেখতে পায় সজ্জিত এক জায়গায় ওই জিনিসটির ওপর সুসজ্জিত রাজপোশাকে বসে। আশপাশে আরো অনেক পশু। সবার মধ্যেই সভ্যতা সুস্পষ্ট। জিনিসটির প্রায় কাছাকাছি মন্ত্রী শিয়াল। পাশাপাশি বাঘ ভালুক অন্যান্য পশুরা। সবাই কুকুরের কথার ওপর কাজ করার জন্য প্রস্তুত।

মহারাজা কুকুর সোজা হয়ে বসেন।

শিয়াল ওরফে মন্ত্রী বললেন মহারাজ খবর আছে।

মহারাজ বললেন কি সংবাদ, যা আমাকে চিন্তিত করে তুলছে।

মন্ত্রী বললেন, মহারাজ দক্ষিণে আবার মেঘ দেখা দিয়েছে।

মহারাজ স্থির হয়ে বসে বললেন, বুঝলাম। তবে লক্ষ রাখবেন মেঘ যেন ঘনীভূত না হয়।

পাত্রমিত্ররা বলে উঠলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ বেশি ঘনীভূত হওয়া বিশেষ চিন্তার কারণ।

মন্ত্রী বললেন মহারাজ নতুন করে আবার বন্যা আসতে পারে।

মহারাজ মাথা নেড়ে বললেন, আঃ আসতে দিন, যা যাবার যাবে। নতুন করে আবার উর্বর জমি পাব। এটা কি কম পাওয়া।

পাত্রমিত্ররা প্রায় সব একসাথে বলে উঠেন, সব যাক চুলোয় যাক। রাজা যেটায় বসেন সেটা যেনো ডোবে না। রাজা যেন মরে না।

রাজা মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন আর কিছু সমস্যা?

মন্ত্রী মাথা দুলিয়ে বলেন মহারাজ সমস্যা কি আর থেমে থাকে। মাপতে গেলে বোঝা যায় না এর শেষ কোথায়। তাই আপনার ইচ্ছায় শান্তিছায়ায় দিয়েছি খোঁচা মেরে।

মহারাজ মেজাজের সঙ্গে বললেন, বেশ করেছেন, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মাংসগুলো বের করে দিন।

বেড়াল অর্থাৎ গবেষক বললেন, অপূর্ব। হাড়গুলো যদি গবেষণা কক্ষে যায় তাহলে বোঝা যায় ওদের মতলব কি ছিলো।

বাঘ আর ভালুক রাজার বড়ই কাছের। দুজনই একই ভাবে বললেন, নানা এমন কিছু করার দরকার যার দ্বারা রাজার মানও থাকবে, ওরাও থামবে।

মহারাজ চোখ রাঙিয়ে বললেন আগুন জ্বেলে দাও।

পাত্রমিত্র সব আশ্চর্য হয়ে বললেন, চমৎকার। পুড়িয়ে দাও যতসব ওঁচাদের হাড্ডি না জানি রাজার ঘটে কত বুদ্ধি।

মন্ত্রী মাথা নত করে বললেন তাই হবে মহারাজ।

রাজার যারা কাছের তারা সমস্বরে বললেন, হতেই হবে। রাজা মশাইয়ের এক কথা, আছে যত পুঁথি সব, রাজার গোয়ালে সব বাঁধা, হতেই হবে, নির্দেশ বড় কড়া। রাজা ভালো তাই নতুন নিয়মে চলা, আমাদের রাজা। মহারাজা। স্বর্গে ওড়ে তার ধ্বজা।

মন্ত্রী সামান্য কেশে বললেন, মহারাজ রাজভাণ্ডার পরিপূর্ণ।

রাজামশাই উল্লাসে বললেন, খুব ভালো, খরায় যেন ভাণ্ডারের তালা না খোলে।

পাত্রমিত্র সবাই বললেন, কি অপূর্ব শুনছি। এই না হলে মহারাজ, সবই রাজার বুদ্ধি।

আমাদের রাজা, সর্বশক্তিমান। দীন দয়াল রাজা তিনি, পেট পুরে খান।

মন্ত্রী শিয়াল প্রায় রাজার কানের কাছে গিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, মহারাজ টাটকা খবর দলবদ্ধ কিছু যুবক পশুর চোখগুলো কেমন যেন অদ্ভুত, ভয় লাগছে।

রাজা বললেন সমাধান কি নেই?

মন্ত্রী বললেন আছে, কিন্তু নেবো কোনটা?

মহারাজ হাসতে হাসতে বললেন, ওদের আশ্বাসের বাণী শোনান, আর চোখগুলো—

মন্ত্রী বললেন চোখগুলো খুবলে নিই?

রাজা রাগত স্বরে বললেন, আপনি মন্ত্রী। তবে বোকা। ওদের চোখগুলো রঙিন জলে ডুবিয়ে দিন।

পাত্রমিত্ররা বলে উঠলেন, অপূর্ব। যে জন পূজে রাজা, রাজা দেন কম সাজা।

অন্যান্য সাধারণ প্রজা যারা সবাই রাজার আদেশ মান্য করে তারা মহারাজার গুণগান করতে থাকে—

রাজা মহারাজা

মোরা করি নমস্কার,

মোদের শূন্য ঝোলা তবু ধন্য মোরা

রাজা চমৎকার।

মহারাজা অর্থাৎ কুকুর আনন্দে আত্মহারা হয়ে কখনো মাথা দোলান, কখনো দেহ নাচাতে থাকেন। হঠাৎ যেন কার হেচকা টানে চোখ মেলতেই দেখে ও মাটিতে পড়ে। ঘুমের ঘোরে যখন কিসব আবোলতাবোল দেখছিলো সম্ভবত সেই সময় কেউ ওকে হেঁচকা মেরে ফেলে দেয়। মাটিতে পড়ে যাওয়ার যন্ত্রণায় বুঝতে বা দেখতে পায়নি কে ও কাজ করলো। যখন সম্পূর্ণ নিজের চেতনায় ফিরে আসে তখন ওপর পানে চোখ মিলতেই বোঝে কার হেঁচকায় ও মাটিতে পড়ে গিয়েছিলো। ও দেখে ওই সুন্দর লোভনীয় জিনিসটির একটা অংশ ধরে ভালুক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।

কুকুর কিছু বলার আগেই ভালুক সেই জিনিসটির ওপর বসে মেজাজী চালে বললো ওহে, কি করে আশা করতে পারো শান্তিছায়ায় যে অমূল্য জিনিসটি কারো ইচ্ছায় এসেছে, সে কি নিশ্চিত ছিলো। এটা তোমার প্রাপ্য হতে পারে? সে একজন শক্তিমানকেই চেয়েছিলো, আর সেই শক্তিমান আমি।

কুকুর অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ায়, তারপর কিছু একটা বলতে যেতেই ভালুক বলে ওঠে খবরদার। এই আমি বসে আছি যদি শক্তি পরখ করো তাহলে এগিয়ে এসো। নয়তো ভালোয় ভালোয় চলে যাও। আমার শেষ কথা

কুকুর বললো এতে কি শান্তিছায়ার মর্যাদা বাড়লো?

ভালুক ব্যঙ্গ করে বললো স্বাদটা তো এটার মধ্যে তোমার বসার মধ্যে দিয়ে বুঝেছি। সুতরাং এখন কাটো।

কুকুর নিরুপায় হয়ে শুধু বললো, বুঝেছি। এই জিনিসটির বসার পর থেকেই বুঝেছি, এও বুঝেছি যা জীবনে বুঝিনি। ভাবিনি, তার সব উল্টোটাই একটার পর একটা সাজানো। অবশ্য যার মাধ্যমে এটা আসা, সে এটার মধ্যে সব দিলেও নিশ্চয়ই ভালোও কিছু শিক্ষা দিয়ে গেছে। যা ক্ষতিয়ে বুঝতে চাইনি।

কুকুর আর বেশি কথা না বাড়িয়ে নিজের রাস্তা ধরে।

কুকুর চলে যেতেই ভালুক একবার ওটা থেকে নেমে নিজের শক্তি নিজেই পরীক্ষা করার জন্য, জিনিসটির চারপাশ এমনভাবে ঘুরতে থাকে যেন ও কতো বড় বীর পালোয়ান। আর এটা পাবার যোগ্য একমাত্র ভালুক।

বেশ কিছুক্ষণ ভালুক নিজেকে এ সব ভেবে ওই জিনিসটায় এসে বসে। কিছু সময় হেসেও নিলো। তারপর নিজের মনে বললো, ক্ষমতা, ক্ষমতাই দুনিয়ার সব কিছু তাঁর হাতের মুঠোয় থাকে। তার জন্য এই জিনিসটাই আমার সব। আশা আকাঙ্ক্ষা আমোদ প্রমোদ ইচ্ছা সব কিছু প্রয়োজনে পাওয়া যা ইচ্ছা তাই।

ভালুক নিজের দম্ভে হাসতে হাসতে অন্যান্য পশুদের মাঝে নিজের পরিচয়কেও মানতে পারছে না, আস্ফালন বাড়তেই থাকে।

ঠিক সেই সময় এক প্রচন্ড হুংকার দিয়ে বাঘ এসে ভালুকের সামনে দাঁড়ালো।

বাঘকে সামনে দেখে ভালুক প্রথমে চমকে ওঠে, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে সেও চিৎকার করে বলে ওঠে, কোন আস্পর্ধায় তুমি এখানে আসার সাহস পাও?

বাঘ হুংকার দিয়ে বললো সাহসতো আমি দেখাইনি। আমার সাহসই আমাকে এই স্থানে নিয়ে আসে। কারণ যেটির ওপর বসে তুমি হম্বিতম্বি করছো সেটির পাওয়ার আশা ছেড়ে আমাকেই বসতে দাও। কারণ শান্তিছায়ার পুরো ছায়াটাই যাতে আমাকে ঘিরে থাকে আমি এই জিনিসটায় বসে সেটাই বুঝতে চাই।

ভালুক চেঁচিয়ে বললো না, তোমার সে আশা তোমার ঝোলায় বন্দি করে রাখো। তুমি ভেবো না শক্তি হিসেবে আমিও কম নই। আর ক্ষমতা, ক্ষমতা আমি কাজে দেখাই।

বাঘ হুংকার দিয়ে ওঠে খবরদার।

ভালুক উঠে দাঁড়ায়, বুক চাপড়ে বলে সাবধান।

বাঘ আর ভালুকের লাড়ইয়ের আগের মুহূর্ত।

দুজনের মধ্যেই তর্জন গর্জন। ওদের এই ভয়ংকর খেলায় নিরীহ পশুরা দিক ভ্রান্ত হয়ে যে যেদিকে পারছে ছুটছে। একটু যারা সাহসী তারা আবার এগিয়েও আসছে দূরত্ব বজায় রেখে। শেষমেশ শান্তিছায়ায় কি ঘটতে চলেছে, যা কোনো কালেই হয়নি আজ কি শান্তিছায়ায় নেমে আসবে লোভ লালসা আর হাহাকার। শন্তিছায়ায় লেগে থাকবে চির দ্বন্দ্ব?

এসব অভাবনীয় দৃশ্য দেখে বেড়াল বলে উঠলো, লোভ কি শান্তিছায়ার সব চাইতে বড় শত্রু? লোভ আসেই বা কি করে? জাগেই বা কেন? আমরা কি ভুল পথে চলেছি?

বৃদ্ধ উট এসব দৃশ্য দেখে দুঃখে আক্ষেপের সঙ্গে বললো :

লোভ আসে যখন মনে করে সে ক্ষমতাশালী, লোভ জাগে স্বার্থের তাগিদে তখন ভুলে যায় তার সততা। শান্তিছায়ার প্রকৃত সৌন্দর্য। আর তার মান, ভুলে যায় শান্তিছায়া সবার।

বেড়ালের কাছেই কুকুর ছিলো, বললো এই রূপ কি আবার ফিরিয়ে আনা যায় না?

বৃদ্ধ উট আকাশের দিকে চেয়ে বললো, যেখানে ক্ষমতার লড়াই সত্যের মৃত্যু হয় রূপের কাছেই। কারণ রূপই তার ইজ্জত হারায় ক্ষমতার কাছে। বন্দি হয়ে পড়ে ক্ষমতার কাছে। লোভের চরিত্র চায় শুধু ধ্বংস, লোভই হলো ধ্বংসের মূল নায়ক।

অন্যান্য নিরীহ পশুরা বলে ওঠে ধ্বংস নয় শান্তি চাই।

বৃদ্ধ উট আবার বললো লোভ যখন আসে তখন শান্তিছায়া যে আমাদের সবার, তার প্রকৃত প্রাণ আর থাকে না। সেখানে বাসা বাঁধে বিষাক্ত কীটেরা। তারা কুরে কুরে খায় মায়ের রূপকে। কাঁদে মায়ের কোলে সন্তান। শেষে মায়ের প্রকৃত রূপটাই ঢলে পড়ে তারাই ছায়া তলে।

পশুরা একজোট হয়ে বলতে থাকে আমরা মুক্ত কণ্ঠে বলছি, শান্তিছায়া আমাদের গর্ব। আমাদের শান্তিছায়া আমরা সবাই এক। আমাদের রূপ আমরা একে অপরকে ভালোবাসি।

বৃদ্ধ উট আকাশের দিকে চেয়ে প্রার্থনার সুরে বললো, হে সূর্যদেব সত্য ও সুন্দর আজ বন্দি হতে চলেছে ক্ষমতাশীলের কাছে। তুমি রক্ষা করো। আজ থেকে বাঁধা হয়ে থাকবে আমাদের জন্মভূমি? যে শান্তিছায়া হতে তোমার রূপ দর্শনে মোহিত হয়ে যেতাম, সব কি শেষ হবে এই ক্ষমতা লড়াইয়ে?

বাঘ আর ভালুক তখনো তর্জনগর্জন করে চলেছে।

কোত্থেকে শিয়াল এসে উসকানি দিয়ে দুজনকেই ক্ষেপিয়ে বলতে লাগলো, চালিয়ে যাও, দেখাই যাক, ক্ষমতাশীল কে? তারপরই দেখে দলবদ্ধ হয়ে সব শান্তি ছায়ার পশুরা ধেয়ে আসছে সেদিকে। শিয়াল এই সব দেখে ভয়ে ওদের সাথে মিশে এক হয়ে গেল।

সবাই এক সাথে এসে যাওয়ায় বাঘ ও ভালুক ওদের যুদ্ধের প্রস্তুতি থামিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওরা শান্তিছায়ায় ওই অদ্ভুত জিনিসটির দিকে লক্ষ করে চিৎকার করে বললো, ভাঙো, ভেঙে ফেলো এই লোভের জিনিসটিকে। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে যত কূট ছল আর শয়তানের বাসা। এ আমাদের শান্তিছায়ার শত্রু। আমরা চাই না এটাকে।

হঠাৎ বাঘ ও ভালুকও চিৎকার করে বলে ওঠে, আমাদের শক্তি আমরা একই ভালোবাসায় বন্দি এই শান্তিছায়াই হলো আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

সব পশুরা যখন সেই আগের মতো খুশীতে ভরপুর, তখন দিনান্তের শেষে, সূর্যের যাবার বেলা তার রাঙা আলোর মধ্যেই যেন বুঝিয়ে দেন, সুখ শুধু পালা মেপে নয় তাতে অহংবোধ জাগে, মান বাড়ে না। ঐশ্বর্য বাড়ে, সুখ এলেও সে সুখ মূল্যহীন। সুখ প্রত্যেকেই যখন সুখী।।

সুখের মধ্য দিয়ে সবার যে হাসিটুকু পাওয়া যায় সেটাই শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাহলেই সেই স্থান হয় পবিত্র। মন বলে আমি একা নয়। আছি সবাই।।

আমি যেই হই, সবার মন যদি নিজের মনের সাথে মিলিয়ে নেওয়া যায় তাহলে সেই হয় সেরা। সেই হয় প্রকৃত রাজা।

___

অধ্যায় ১১ / ১১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%