অতীত ঘুরে

অমল চট্টোপাধ্যায়

পথ ধরে যারা হাঁটছিলেন যারা বাসে ওলা বা ট্যাক্সিতে সবাই চমকে ওঠেন প্রথমে। তারপরই গেল গেল করে সমস্বরে আর্তচিৎকার। এর খানিক বাদেই বয়স্ক একজন লোককে কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে রাস্তার ফুটপাতের এক ধারে নিয়ে এসে বসাল এবং সঙ্গে সঙ্গে নানান প্রশ্ন, কোথায় চোট পেলেন, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বুঝি, সত্যি ভগবান আছেন, তা না হলে কি যে হতো। বাড়ির লোকতো জানেই না। ফোন থাকলে করুন না। এছাড়া আরো নানান প্রশ্ন। অবশ্য এখানে লোকটিকে যারা নিয়ে আসেন তাদের মধ্যে কয়েকজন বুঝতেই পারছেন যেটুকু উনি আঘাত পেয়েছেন তা অতি সামান্য।

যেখান হতে আহত লোকটিকে ধরাধরি করে আনা হয় সেখানে দাঁড়িয়ে বি. এম. ডব্লু. এক গাড়ি। গাড়ির ভেতর স্টিয়ারিং ধরা যিনি, অনুমানে প্রায় ষাট। ব্রাস করা চুলে সামান্য পাকা। দীপ্ত মাখা চোখ, এখন সামান্য ভেজায় আরো উজ্জ্বল লাগছে। চশমা পরা। দাঁড়ি গোঁফ কামানো। ভরাট মুখ। মেদ নেই শরীরে। চাকচিক্য পরিপূর্ণ চেহারা। বসা অবস্থায় থাকলেও বোঝা যায় বেশ লম্বা। প্যান্ট সার্ট পরা এক সৌম্য চেহারার মানুষ। এক কথায় এতো বয়সেও ধরে রাখা বসন্ত মাখা এক সতেজ পুরুষ।

ওনার প্রায় ঘেঁসেই বসে ফুটফুটে এক মেয়ে। এগারো—বারো হবে বয়স। পোশাক—পরিচ্ছদ না বলাই বাহুল্য। এক কথায় দামি।

গাড়ির চার পাশেই জনতার ভিড়। এবং তাদের উচ্চ স্বরে চিৎকার। সাথে কিছু গালিগালাজও মেশানো। সবই গাড়িতে, স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বসা ভদ্রলোকটিকে কেন্দ্র করে। ভদ্রলোক যেন একটা বিরাট অন্যায় করেছেন এমন একটি ভাব নিয়ে চুপ হয়ে মাথা নীচু করে আছেন। পাশে বসা মেয়েটি ভয়ে ভদ্রলোকটিকে জড়িয়ে থাকে। এমন সময় যিনি গাড়িতে আহত হন, তিনি আস্তে আস্তে ফুটপাত ছেড়ে এগিয়ে আসেন তখনই জনতার আঃ উঃ শব্দে ওনাকে ঘিরে বলতে থাকেন আপনি আহত। বসুন চুপ করে। আমরা দেখছি। কি করণীয় বলে আরো বেশি রকম ভাবে অশ্লীল মন্তব্য করতে থাকেন। তাদের অসভ্য আচরণ ক্রমশই হিংস্রতায় পরিণত হতে থাকে। যদিও সমাজ সভ্যতার একটা দিক আছে। আছে পুলিশ আছে আইন। আছে সভ্যতার অনেক দিক। অথচ সে সব সভ্যচিন্তা না করেই সমাজটাকে কালি লেপা করে নিজেরাই হয়ে ওঠে কিছু সময়ের জন্য শের। জানা নেই সুষ্ঠু সমাজকে এমন কিছু মানুষ পঙ্কিল মাখিয়ে সমাজকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জানা নেই। জেনেও কিছু করার নেই। ওর জন্যে আছেন দিকপাল নেতারা। তারাই বুঝে নেবেন। আমি কে? বলতে চাই, পারিনা, আমরাই যে পারি না ঠিক বলতে, কোনটা ঠিক। কোনটা বেঠিক।

আহত লোকটি ভিড় কাটিয়ে জনতার সহানুভূতির কথা না শুনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসেন সুস্থ অবস্থায়। মনেই হয় না একটু আগে উনি আহত হয়েছিলেন। তবু জনতা? এটাই আমাদের সভ্য সমাজে বড় ভূমিকা। কিছু না বুঝেই ঝামেলা পাকানো। আগেতো কিছু করে দেখাই, পরে দেখা যাবে। তাই জনতা একটু হলেও আহত লোকটির সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। কিছুতো একটা ওনার হয়ে বলতে হয়। তাদের মতে, না হলে মত পাল্টে ওনার রাস্তা অর্থাৎ যিনি বেশি না হলেও অন্যায় করেছে, যদি রাস্তা পরিষ্কার করে দেওয়া হয় অন্যায় করা লোকটির জন্যে, তাহলে সমাজটাই যে মেরুদণ্ডহীন হয়ে যাবে। সুতরাং গাড়ির চারপাশে ঘিরে থাকা জনতার তরফ থেকে যা ইচ্ছে তাই বলতে থাকেন, গাড়ির ভেতর যিনি স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে মাথা নীচু করে বসেছিলেন তাঁকে উদ্দেশ্য করে।—শালা লাটসাহেব। কি মনে করেছেন আমাদের লাইফ বুঝি কুকুর বেড়ালের মতো কে চেঁচিয়ে বললেন, আরে কথা কম কাজে বেশি। লোকটাকে আগে গাড়ি থেকে নামাই। তারপর ওনার সুর কোন পর্যায় গিয়ে পৌঁছয় বোঝা যাবে। সাথে সাথে ভাষার পরিবর্তন অর্থাৎ গালিগালাজ। যা আমাদেরই গেঁয়ো মাটির তুলনায় শহরের আদপকায়দা ভিন্ন রকম। সব ভালো তবু যেন আলাদা। এইসব শুনতে শুনতে গাড়িতে বসা ভদ্রলোকটির মুখ লজ্জায় ঘৃণায় কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন শোনেন খুকি ভয় পাচ্ছ? দুধ খাবে। ওমন সৌম চেহারা ভদ্রলোকটি এরকম একটা বাজে মন্তব্যে উত্তর দেবেন সেই ক্ষমতাও দেবার মতন শক্তিও নেই । কাপুরুষের মতো চুপ থাকতে বাধ্য হন। কারণ প্রত্যক্ষভাবে বিশেষ করে এরকম পরিস্থিতিতে এমন মারমুখি চেহারা, কুৎসিত চোখ, আগে কখনো দেখেন নি। আজকের ঘটনায় জনতার এরকম বিশ্রীভাবে হাত পা নেড়ে এমনকি কয়েকজনের লাথিও মারা হয়ে গেছে গাড়িতে। এসবের মাঝে নিজেকে কি ভাবে মিষ্টি মুখে বোঝাবেন। অন্যায় করলে তারতো একটা ব্যবস্থা আছে। আপনাদের এই অত্যাচার আরো বেশি নয় কি? কিন্তু কাদের বোঝাবেন। সুতরাং চুপ হয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ তখনকার মতো পাচ্ছিলেন না। শুধু ভেবেছিলেন পুলিশ থাকলে হয়তো কিছু সুরাহা হতো। কিন্তু পুলিশ কোথায়?

বাচ্চা মেয়েটি ভদ্রলোকটিকে জড়িয়ে কেঁদে ওঠে। বলে দাদু, গুন্ডাগুলো আমাদের মেরে ফেলবে। চল পালিয়ে যাই। ভদ্রলোকটি স্থির দৃষ্টিতে অসহায় ভয়বিহ্বল নাতনির দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়েও চুপ হয়ে থাকেন। হয়তো নাতনির কথা ভেবেছিলেন, তাই ভালো, পরক্ষণে মত পাল্টে ভাবেন সে যদি অভিমুন্য না হয়ে অর্জুনের মতো বেরিয়ে যাবার কায়দা জানতেন তাহলে অন্তত তাঁর নাতনির জন্যে কাপুরুষের পর্যায়ে নিজেকে পরিচয় দিয়েও নাতনির কথা ভেবে পালিয়ে যেতেন। এছাড়া কাদাঘাটা মানুষদের বুঝিয়ে কিছু লাভ নেই। মেয়েটি ফের কেঁদে বলে। দাদু পালাবে না?

ভদ্রলোক নিরুত্তর।

ভালো—মন্দ মিশিয়ে কে ভালো কে মন্দ বোঝা দায় তবু কিছুতো মানুষের এই অচরণ থেকেই যায়।

সুযোগ পেলেই ফণা তোলার ক্ষমতা না থাকলেও আমি সাপ এটা তো ভাববেই বিশেষ করে আরো পাঁচজনের মাঝে দলবদ্ধ হয়ে ওদের মতামতটাই ঠিক করে নেয়। সমাজকে ঘসে মেজে আরো সুন্দর করে তুললাম আমাদের মতো শ্রেণির মানুষ। আর এই মহান কাজটির কাহিনিটি আরো সুন্দর করে ফাটাতে হবে বন্ধুমহলে আর চা খাবার আড্ডায়। তবেই না আসর জমবে। সমাজ হবে আরো শক্তপোক্ত এবং সুন্দর।

একবারের জন্য ভাববার সময় দিলো না নিজেদের। আহত ব্যক্তিটি সুস্থ হয়তো কিছু একটা ঘটতে পারতো কিন্তু তা হয়নি, এরপর কি করা প্রয়োজন। আহত লোকটিরই বা কিছু বলার আছে, কি নেই? যেহেতু উনি সামান্যতমও আঘাত পাননি। শুধু গাড়ির সামনেই পড়ে গিয়েছিলেন, হয়তো ফুটপাতের বাইরেই উনি ছিলেন। তবু যা হয়ে থাকে। চালিয়ে যাও। এই না হলে মানায়। আছে থানা, পুলিশ আইন আদালত। থাক যেমন চলছে চলতে দাও। আমরাই এখন আইন দণ্ড। গাড়ির ভেতরে যিনি অপরাধী হয়ে বসে আছেন, যার নাতনি ভয়ে তাঁর দাদুর পেছনে মুখ লুকোবার চেষ্টা করছে সেই করুণ দৃশ্যও কারো মনে দাগ কাটতে পারে নি। এটা কি ঠিক? এর উত্তর যারা সত্যি সত্যি সাহায্যে হাত বাড়ায় প্রয়োজনে মিটমাট না হলে পুলিশ। এখানে তা হবার নয় এমন কিছু থাকে যাদের পরকে হেনস্থা করাটাই স্বভাব। গাড়িতে বসে থাকা লোকটিকে তখনো একই ভাবে অপদস্থ করতে থাকেন, বসে থাকা ভদ্রলোকটি এবার ওনার পকেট থেকে মোবাইলটি বার করলেন ঠিক সেই সময় একজনের উচ্চস্বরে গলা শোনা যায়। প্লীজ, আপনাদের এইসব অমানুষিক আচরণ শোভা পায় না। আমি মেনেও নিতে পারছি না কোন অপরাধে একজন নিরীহ ব্যক্তিকে অসভ্য কথা বলে তাকে বন্দি করে রাখা। এই অধিকার কে দিয়েছেন?

ভিড়ের মধ্যে থেকে কে একজন হেঁড়ে গলায় বললেন, কে বলছেন, কে দাদা আপনি! একবার দেখিতো বদনখানি। যে জনতার এই নির্মম আচরণকে মেনে নিতে পারছিলেন না, সে এগিয়ে আসেন এবং বলেন আমার বদন দেখতে চাইছেন দেখুন। কিন্তু আপনি একজন মানুষ সেই চিন্তা করে নিজের অসভ্য আচরণগুলো সংশোধন করে ভাবুন অপরাধ কার বেশি? তাহলেই যে লোকটি আহত হয়েছিলো এবং সুস্থ অবস্থায় সেই আবার আপনাদের সবার সম্মুখে বলতে চায় আপনারা যা করে চলেছেন তা সমাজে একটা বিরাট কলঙ্ক। অপরাধ, এখানে আইন বলে তো একটা কিছু আছে। থানা, পুলিশ নিশ্চই আছে। যাদের ওপর নির্ভর করে পরিবেশকে আরো সুন্দর করে দেখার চেষ্টা করি। হয়তো আরো দেখার আশা রাখি। তাহলে কেন একত্রে জট পাকিয়ে এইসব নোংরা আচরণ করছেন। আমার তো মনে হচ্ছে আপনারাই সাংঘাতিক। আমার সাহায্যেই আপনারা দলগত ভাবে এগিয়ে এসেছেন, এর জন্য নিশ্চয়ই আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আপনাদের এ অবিচার আমার পক্ষে মেনে নেওয়া মানেই আমাকে মানুষ বলাটা ভুল হবে। কারণ আমি সম্পূর্ণ অক্ষত। আর আপনারা এইসব অমানুষিক করে নিজেরাতো ভুল করছেন, উপরন্তু সমাজটাকেই বিকৃত করে তুলছেন। আপনাদের বিনীতভাবে বলছি তবু বলতে বাধ্য করাচ্ছে আমি কাপুরুষ নই। আবার সাধুও নয়। আর অন্যায়ের সঙ্গে আপোসও করি না। আজ যা ঘটেছে এবং আমাকে কেন্দ্র করে, তা অতি এক সামান্য ঘটনা। এবং সেটা আমারই ভুলে। পুরো দোষটাই আমার, ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে নিজেই লজ্জিত হয়ে পড়ছি। তবুও ধন্যবাদ দিতে হয় ওনার গাড়ি চালনার দক্ষতা দেখে। ওনার জন্যই অক্ষত অবস্থায় আপনাদের বলতে পারছি ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় পা দেওয়াটাই আমার ভীষণ অপরাধ। সুতরাং আমারই ক্ষমা চাওয়া উচিত ওনার কাছে। ওনার নয়, এবং আপনারাও জবরদস্তি অধিকারের আওতায় না থেকে ওনার যাবার পথ পরিষ্কার করে দিন। এই আমার আবেদন। গাড়িতে বসা ভদ্রলোকটি সবই শুনছিলেন লোকটির কথা। গাড়ির জানলার কাচ একটু ফাঁক ছিলো বলেই। দেখছিলেন তাঁকে, যে কিছু আগে তাঁরই অসতর্কে একটা বিরাট কিছু হয়ে যেতে পারতো, অবশ্য হয়নি। ভদ্রলোক নিজেকেই সম্পূর্ণভাবে দোষী করে আশ্চর্যভাবে আহত লোকটিকে দেখতে থাকেন। প্রায় সাড়ে পাঁচ—এর লম্বা মেদ ঝরা চেহারা। পোশাক—পরিচ্ছদ সব মিলিয়ে সাধারণ না বলাই বাহুল্য। এক কথায় বয়স্ক হলেও এখনো হারিয়ে ফেলেননি ওনার সুন্দর চেহারাটি।

জনতার হম্বিতম্বি ভাব আর নেই। ভিড় পাতলা হতে হতে একেবারেই ফাঁকা হয়ে যায়। যদিও যাবার মুখে শিয়ালের আঙ্গুর ফল টকের মতন কয়েকজনকে বলতে দেখা যায় কি জানি পেয়ারের দোস্ত কি না।

গাড়ি যাবার রাস্তা এখন পরিষ্কার। আহত লোকটিই শুধু দাঁড়িয়েছিলেন, ফুটপাত প্রায় রাস্তা ঘেঁসে থেমে থাকা গাড়ির সামনে ফুটপাতে। দৃষ্টি ছিল গাড়ির ভেতরে বসে থাকা এগারো—বারো বছরের মেয়েটির দিকে।

শেষ হব হব বিকেল। আকাশে পাখির মেলা। দলবদ্ধ হয়ে উড়ে চলেছে তাদের জানা পথে।

রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ। গাছে বসা পাখির গুঞ্জন, সুর বড়ই মধুর, নেই কোনো কোলাহল। একত্রে থাকা কত সুখ। কতই না আছে মনের কথা গাড়িটি অক্ষতভাবেই আছে। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ভদ্রলোকের হাত। পাশে মেয়েটি, যার মধ্যে একসময় ভয়ের সঞ্চার হয়েছিল এখন সম্পূর্ণ আলাদা। চোখে মুখে তারই আভাস সুস্পষ্ট। গাড়ির জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে রাস্তার চারপাশ দেখতে দেখতে বসে থাকা ভদ্রলোকটিকে বললে, দাদু, জানি কোলকাতা রূপসী তার প্রতি অঙ্গে রূপ ছড়ায়, অথচ তারই মাটি তারই ছায়ায় থেকে এতো কোন্দল! ভাষায় কাদা মাখা! জানি আছেনও এমন যার প্রমাণ তোমার বয়সই এক ভদ্রলোকের মধ্যে। যে এখনো দাঁড়িয়ে। একবার ধন্যবাদ দেবে না ওনাকে? যদি চলে যান? ভদ্রলোক মিষ্টি করে হেসে বললেন দিদিভাই বিষের বাঁধন যিনি ছিঁড়তে একাই এলেন এগিয়ে এবং যাকে কিনা আমার সামান্য ভুলের জন্যে ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়ে যেতো তাঁর বেঁচে থাকার এখনো কত স্বপ্ন। তাঁর কাছে আমি ক্ষমা চাইবো এতে জানি না কতটা আমার রুচি পাল্টাবে কিন্তু এক এক সময় নত মাথাও গর্বের জায়গায় স্থান পায়। গাড়ির দরজার হ্যান্ডেল খুলে নেমে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক, সাথে নাতনি। দাঁড়ালেন এসে আহত লোকটির সামনে। বললেন নমস্কার। আমার অসাবধানতায় একটা বিরাট ভুল করতে চলেছিলাম। তাই এর বেশি বলাটাই অন্তত আমার শোভা পায় না। তাই জোড় হাত করে ভদ্রলোক বললেন আমার এই অন্যায় হয়তো আপনি মন থেকে মেনে নেবেন না তবু ক্ষমা চাইছি। আপনি দাঁড়িয়ে তাই ভাবলাম—আহত লোকটি মৃদু ভাবে হাসলেন এবং আশ্চর্য হয়ে বললেন আমাকে আপনার ক্ষমা চাওয়াটাকে গ্রহণ করতে বলছেন এবং বিনয়ী হয়ে। না না আপনি এভাবে বলে আমায় আরো লজ্জায় ফেললেন। আর আমি এখনো কেন দাঁড়িয়ে! সত্যিই তো কি আশায় দাঁড়িয়ে!

ভদ্রলোক পকেট থেকে সিগারেট প্যাকেট বার করে তার থেকে দুটি সিগারেট বার করে নিজে একটি মুখে রেখে অপর সিগারেটটি এগিয়ে বলেন চলেতো! আহত লোকটি সিগারেট নিয়ে বললেন থ্যাঙ্ক। তারপর বিমর্ষ স্বরে বললেন এমন এক সময় গেছে সিগারেট এক মুহূর্ত কাছ ছাড়া হলে বাকি কাজগুলোই কেমন ওলোটপালট হয়ে যেতো। আমার মেয়ের কড়া শাসনে পড়ে সব মানতেই হয়। সারাদিনে কয়েকটা ছাড়া আর হয়ে উঠতো না। তাও অলক্ষে, সামনে হলে মিষ্টি ধমক। তারপর—আহত লোকটি ভদ্রলোকটির কাছ হতে দেশলাই নিয়ে সিগারেট ধরান।

দুজনই সিগারেটে টান দিতে দিতে ভদ্রলোক বললেন, এই যে দেখছেন আমার নাতনি ওর কড়া শাসনেও আমি ভয়ে জড়োসড়ো । সিগারেট খাওয়া চলবে না।

হঠাৎ মেয়েটি দুজনকেই উদ্দেশ্য করে বলে—তোমরা এতো কিছু জানো অথচ জানো সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।

ভদ্রলোক অন্যায় হয়ে গেছে এমন একটা ভাব দেখিয়ে বললেন সরি দিদিভাই। তোমার আর এক দাদু আছেন তাই—

মেয়েটি কিছু না বলে আহত লোকটির দিকে তাকাতে আহত লোকটি সেই একই ভাবে বললেন আমিও সরি বলছি।

ভদ্রলোক সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, আমি এক বড় কোম্পানির বড় পোস্টে ছিলাম। এক বছর হলো অবসর নিয়েছি। সুতরাং আমার সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে আজকের ঘটনায় যা যা ঘটেছে অনেক কিছুই অন্যায় আছে, কিন্তু যেখানে আইন আছে তারাই বুঝে নিতেন। অথচ যে আচরণ দেখলাম হয়তো এই ভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়ে কারো ওপর এই সব মানুষ শুধু সুযোগের অপেক্ষাতেই এইসব কাণ্ড করে শান্তি পান। কিন্তু আমার কথা ওদেরকে নিয়ে নয়। শুধু ভাবা এখনো কি অনেক যারা শিক্ষার মূল পর্ব কি সেটি বোঝে না? যাই হোক এবার আপনার কথা বলি মারাত্মক অন্যায় না করলেও কিছু অন্যায় থেকেই যায়। সুতরাং আমার জিজ্ঞাসা আপনি এতোটাই স্বার্থ ত্যাগী মানুষ? আপনিই বলুন আশ্চর্য নয় কি? এই যে এখন সিগারেট খাচ্ছি। আপনার সাথে মন খুলে কথা বলছি, অথচ কিছু সময় আগেও ভাবছিলাম যে বদ্ধ অবস্থায় আটকে পড়েছি কে আসবেন এই অবস্থার মুখোমুখি হয়ে প্রতিবাদ করার জন্যে? অবশেষে আশ্চর্য যিনি আহত হলেন তিনিই দাঁড়ালেন রুখে। এমন হয়? আপনি এতো উদার হলেন কি করে? যদিও আপনার চেহারায় ভালো মানুষী ভাবটাই সুস্পষ্ট। তবু, আহত লোকটি হাসলেন, বললেন ভারি মিষ্টি আপনার নাতনিটি। মিলও পাই আমার মেয়ের—লোকটি আর কথা না বলে চুপ করে গেলেন।

ভদ্রলোক বললেন কিছু মনে করবেন না।

এ মুখ আপনার চেনা। যাকে আগে দেখেছেন, হয়তো একই চেহারায় এমন দেখেছেন। যদিও আমার নাতনি ওর মায়ের মুখটি বসানো। বয়সের একটু যা তফাত। বৌমার স্বভাব একেবারেই ছেলেমানুষি। বুঝতেই দেয়নি আমি শ্বশুর। বাপের আসনে বসিয়ে মৃদু ভর্ৎসনায় কড়া শাসন। সিগারেট বেশি খাওয়া চলবে না। সময়মতো খাওয়া, শোয়া, সবই তার বাপের স্থানে বসিয়ে তার অন্তর থেকে বেরিয়ে আসা দাপট। ওর এই কড়া শাসনের বাঁধনে পড়ে বাইরের যেটুকু কাজ সেই টুকুই। তারপর মায়ের কাছে, অর্থাৎ বৌমার কড়া শাসনের মধ্যে। ছেলের এগারো বছর বয়সেই স্ত্রীকে হারাই। মুষড়ে পড়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু ছেলের কথা ভেবে হয়ে উঠতে দিইনি। ছেলে বড় হলো। অফিসে ভালো চাকরি পেলো। বিয়েও ওর মতে, রেজিস্ট্রী বিয়ে। প্রথমটা শুনে খারাপ লাগলেও যখন প্রথম মুখ দেখি, তখন কেন জানি না মনে হলো মা এলো আমার ঘরে। আমার ফাঁকা জায়গাটি পূরণ করতে। বেশ ছিলাম, কিন্তু সুখ কি আবার সবার সয়। নাইটশোতে সিনেমা দেখে ফেরার পথে, গাড়ি এ্যাকসিডেন্ট। ছেলে ছেলের বউ দুজনই মারা যায়। সে দুঃখের বোঝা যে কতদিন বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছি, তার দিন ক্ষণ মনে রাখা যায়নি। এই নিদারুণ ব্যথা কি শেষ হয় না গোনা যায়। ভাবি স্ত্রী মারা যাবার পর যে শূন্য আমার জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছিলো সে স্থান কি পূরণ হবে? সুখ একটা আলাদা সুখ। আর সুখ দুঃখ মিলিয়ে যে সুখ আসে সেটাও ঈশ্বরের অসীম কৃপায় পেয়েওছিলাম। জানি না সে সুখটুকও হারিয়ে ফেলি। হয়তো আমিও হারিয়ে যেতাম। কিন্তু যাইনি, হয়তো এখানেও ঈশ্বরের লীলা। নাতনিই এখন আমার সুখ। প্রতিক্ষণে মনে হয় আমি সেই শূন্যতেই আছি। ও যে শুধু আমার দিদিভাই তা নয়। ও আমার মা, হ্যাঁ। নীলাঞ্জনা। নীলাঞ্জনা আমার বৌমা।

আহত লোকটি সচকিত হয়ে তাকান। কি বললেন। নীলাঞ্জনা। তার পরেই বললেন এ্যাকসিডেন্টের খবরটা কাগজে পড়েছি। ব্যথাটা আমিও কম পাইনি। আহত লোকটি আপনা হতেই চোখ দুটি হাত দিয়ে মুছে নেন। তারপর বললেন, দুঃখ থাকলেও সে জীবন যন্ত্রণার মধ্যেও লড়াই চালিয়ে যায়, কিন্তু জীবনে যদি আঁধার ঘন হয়ে আসে তা হলে সেতো নিজেকেই দেখতে পায় না। আমার ক্ষেত্রেও হয়তো তাই। আজ হয়তো রাত কিছুটা ফিকে হলো। জানি না আলো ফুটবে কিনা। আচ্ছা নমস্কার, বাচ্চা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে স্নেহের বশে বললেন দিদিভাই তুমি খুব মিষ্টি, আমি এখন আসি।

আহত লোকটি পা বাড়াতেই ভদ্রলোক ডেকে উঠলেন, প্লীজ দাঁড়ান, আমি নীলয় ব্যানার্জী। আপনার নামটি জানা হয়নি।

আহত লোকটি সামান্য হাসলেন, বললেন ডক্টরেট নীলাভ রায়। বালীগঞ্জ প্লেস। অবশ্য সে বাড়ি বহুদিন হল ব্যবহার করা হয় না। ভেবেছিলাম বিক্রী করে দেবো। পারিনি বিক্রী করতে। জানিনা কেন, একজনের ওপর দেখা শোনার ভার আছে। সেই দেখে, জানেও না আমি কোথায় থাকি। জানতেও দিইনি।

গাড়ি থাকা সত্ত্বেও অনাদরে পড়ে থাকে গ্যারেজে। হয়তো ওটারও কষ্ট।

ভদ্রলোক বললেন আপনি তাহলে থাকেন কোথায়? আহত লোকটি বললেন যখন যেখানে, ইচ্ছে হলে তীর্থে। ভগবান টাকা দিয়েছেন, সুখতো থাকবেই। কিন্তু এ সুখ আমার কাছে বিরাট এক শূন্য ছাড়া কিছুই না। আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় পাই। নিজের ক্ষত বিক্ষত মুখ দেখে যদি চমকে উঠি সেই ভয়ে। অনুভব করি ভীষণ যন্ত্রণা। আজ কাটা ঘায়ে মনে হলো কার স্পর্শে একটু যেন আরাম বোধ পাচ্ছি।

ভদ্রলোক বিনয়ী হয়ে বললেন, আরামকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিন। দেখবেন মনে হবে আবার কিছু ফিরে পেলাম।

আহত লোকটি শ্বাস নিয়ে বললেন, মেয়ে সেই ছোট্টবেলা থেকেই বাবার আদরে আদরে বড় হয়। অবশ্য তার মাকেও ভীষণ ভালো বাসে। প্রচন্ড মেধাবী। গানও গায় সুন্দর। রীতিমতো রেওয়াজ, গানের মাস্টার আসেন, দিনগুলি বলতে পারেন সুখী পরিবার।

কিন্তু ভাবা যায় চিরশান্ত নদী। যে নদীর ছোট ছোট ঢেউ বাতাসের দোলায় আরো ভালো লাগে, হঠাৎ সে নদী উত্তাল হয়ে যদি সাজানো সুন্দর বাগানটি তচনচ করে দেয়। তাহলে নদীরও কি সেই সৌন্দর্য থাকে। বাগানটি তো গেলো, সাথে সাথে রূপটিও গেল বদলে নদীর। তারপর একটু থেকে লোকটি বললেন, জেদ, জেদ যে কোথায় নিয়ে গিয়ে আছড়ে মারবে বোঝা দায়। যা আমার ক্ষেত্রে হয়েছিলো। আমার বন্ধু বড় বিজনেস ম্যান, তার একমাত্র ছেলে, বন্ধুর বার বার ইচ্ছায় আমিও কথা দিই। এখানেই মত— অমত নিয়ে শুরু। আমার জেদ, মেয়ের অমত, ওর অন্য স্থানে ঠিক করা আছে এবং এও বলেছিলো, ছেলে ভালো সুপুরুষ, শিক্ষিত এবং বড় পোস্টে চাকরি করে। ওর বাবার একমাত্র ছেলে। ওর বাবাও এক বড় কোম্পানির বড় পোস্টেই আছেন। সুতরাং সেই ছেলেকেই সে নেবে, এবং রেজেস্ট্রি হবে।

মেয়ের কথায় তৎক্ষণাৎ ওকে আমার মুখ দর্শন করতে বারণ করি। মেয়ে আমার নীলাঞ্জনা তার বাপকে অনেক বুঝিয়েও তার উত্তর না পেয়ে চলে যায়। বাবা কি তার চলে যাবার ব্যথাটা বুঝেছিলেন? না না আহত লোকটি প্রায় কাঁদতে কাঁদতেই বললেন আমি বাপ হয়ে বলতে পারেন আমি এক নরক শ্রেণির মানুষ। কথা কটি বলে লোকটি পা বাড়াতেই ভদ্রলোক ওনার হাতটি ধরলেন। বললেন আমার মা অর্থাৎ বৌমার কাছে আমার ঘরে আসার কয়েক দিন বাদে সব শোনার পর আপনার সাথে বৌমার কথা বলিয়ে দেবার চেষ্টা করি। কিন্তু আপনার কথা শোনার পর আর আপনাকে ফোন করেনি। ওর মায়ের সাথে যা দু—একটা কথা হয়েছে। মেয়েকে দেখতে ইচ্ছে থাকলেও ওর বাবার জন্যে বারণ করে দেওয়া হয় আসতে। তা সত্ত্বেও একবার গিয়েছিলাম তখন নাতনি দেড় বছরের, ওকে এবং বৌমাকে নিয়ে, তালা বন্ধ দেখে আশপাশের লোকজনদের বলেও কোনো লাভ হয়নি। শুধু ওর মায়ের মৃত্যু শুনে ওকে আরো কান্নার বোঝা বাড়িয়ে দেয়। সব সময় আপনার কথা, তারপর মায়ের মৃত্যু। ওর মনের যন্ত্রণা ওই বুঝতো।

বেশি না হলেও খানিকটা আমরাও।

আহত লোকটি নিরুত্তর। কি বলবেন, বললেন আমি হৃদয়হীন। আমি নিষ্ঠুর, পৃথিবীতে যা কিছু স্বাধীনতা, তা শুধু আমার ঔদ্ধত্যে চলবে? না, না এ অন্যায়, অবিচার। তাই চূর্ণ হলো আমার সব অহংকার। আমি আজ একা, সব আছে, তবু আছি অন্ধ গহ্বরে পড়ে।

আহত লোকটি বেশ কিছুক্ষণ নিজের সাথে নিজে এসব ভাবতে ভাবতে এক সময় মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোকটিকে বললেন, সুখ মানেই জীবন মধুময়। কিন্তু সেই জীবনকেই যদি নিজে খুঁচিয়ে দিই। তাহলে শুধু বেঁচে থাকার জন্য জীবনটাই থাকে মধু নয়। আপনি সুখী থাকুন, আমি চেষ্টা করবো।

ভদ্রলোকটি মৃদু হেসে বললেন পাল্লা মেপে দেখাই যাক না পাল্লার মাপটি সমান হলো কিনা। তারপর নাতনিকে ডেকে বললেন দিদিভাই আজ তুমি আবদার করেছিলে ভালো এক উপহার পাওয়ার জন্য। দিদিভাই আহত লোকটিকে দেখিয়ে বললেন ইনিই তোমার বড় উপহার। তোমার আর এক দাদু।

তোমার মায়ের বাবা হন ইনি।

মেয়েটি খুশি খুশি মুখ নিয়ে চেয়ে থাকে আহত লোকটির দিকে। আহত লোকটি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে তার নাতনিকে। চোখে কত দুঃখ যন্ত্রণার জল আবেগে বেরিয়ে আসে আপনা হতে। ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন এ দৃশ্য দেখার পরও কি স্বার্থপরের মতো বলবো আমার পাল্লাটাই ভারী? সুতরাং এবার থেকে সমান ভাবে দেখবো আমরা আমাদের নাতনি ওরফে মাকে। তাঁর শাসনেই চলতে হবে আমাদের। ভদ্রলোক আহত লোকটিকে বললেন কি বলেন নীলাভবাবু ঠিক বলিনি?

নীলাভবাবু এর উত্তরে মাথা নাড়তে নাড়তে দুজনেই হোঃ হোঃ করে হাসতে থাকেন। হাসিতে হাসিতে সুখ নিয়ে এলেন মনের অন্তঃস্থলে পেছনের দরজা বন্ধ করে।

এদিকে শরতের চাঁদটি পূর্ণরূপে আকাশে। তার স্নিগ্ধ আলো সারা জায়গা ভরে। কতই না সুন্দর এ পৃথিবী। কে চায় তাকে ছেড়ে যেতে?

গাড়ি চলে এগিয়ে, নাতনির গলায় মিষ্টি গান।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%