বটকৃষ্ণ ও পুঁটলির রহস্য

অমল চট্টোপাধ্যায়

বটা ওরফে বটবৃষ্ণ ওর মেজদির বাড়ি হাবড়ায় যাচ্ছে। সাথে ভাগ্নে পলটে। ওর বড়দির ছেলে, নাইনে পড়ে, বটকৃষ্ণ অবশ্য দুবার দেবার পর স্কুল ফাইনাল পাস করার পর সরস্বতীর পাট চুকিয়ে ওর বাবার মিষ্টির দোকান এখন সেখানেই বসে। অবশ্য ঘরে জাঁকজমক করে সেই তার দিদিদের আমল থেকে এখনো সরস্বতী পুজো হয়ে আসছে। খুব নামি মিষ্টির দোকান। তাঁর দাদুর নামে মিষ্টির দোকান। কৈলাশ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। বেশ চালু দোকান। খদ্দেরদের সাথে হিসেব—নিকেশ করতেই হিমসিম খায় বটকৃষ্ণ। তবু এসব কাজে বলা যেতে পারে ও এক নম্বরের, হিরো। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, কারণ এই কাজ ছাড়াও ওর আর একটি বিশেষ গুণ ছিলো, যা ওর মগজে সব সময় চলে বেড়ায় সে হলো সুযোগ পেলেই গোয়েন্দাগিরি করা। ওর গোয়েন্দাগিরির অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনা নিয়ে না হয় আর একদিন বলা যাবে। আপাতত এখন কি ঘটতে চলেছে সেই নিয়েই এগোনো যাক। স্টেশনে টিকিট কেটে প্লাটফর্মে এসে ওরা দেখে হাবড়ার লোকাল আসতে দেরি আছে। সুতরাং প্লাটফর্মে যে বসার সিট আছে তারই একটিতে ওরা অর্থাৎ বটকৃষ্ণ ও পলটে এসে বসে। বটকৃষ্ণ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক—ওদিক ভালো করে একবার দেখে নিয়ে ভাগ্নে পলটেকে বলে, বুঝলি, একজন ভালো বড় মাপের গোয়েন্দা হতে গেলে এই যেমন শার্লকহোমস, ব্যোমকেশ, কিরীটি, ফেলুদা বলছি এদের মতন যদি হওয়া যায় তবেই গোয়েন্দা হবার সব বাসনা হয় পরিপূর্ণ। যা আমার গোয়েন্দা জীবনে আমি একশ পার্সেন্ট পেরেছি। তার কারণ এই যে দেখছিস আমার হাতেধরা এক সস্তা দরের লাল ডট পেন। এই পেনটি একটু আগে এখান থেকেই পেয়েছি। এবং তোর চোখের আড়াল হতে। এখন কথা হচ্ছে পেনটি দেখে এর রহস্য ভেদ করা, কিরে, কিছু বুঝলি না তো। তাহলে বলি পেনটি দেখে কি মনে হয়, একটি ডট পেন। তাও সাধারণ। এখন যা বলছি ভালো করে পেনটির দিকে তাকা।

দেখে কিছু চোখে পড়েছে...

পলটে বললে, না তেমন কিছু বুঝতে পারছি না।

বটকৃষ্ণ পলটের দিকে তাকিয়ে বললে, বুঝলি না। আমি বলছি, শোন, আমার যতদূর মনে হচ্ছে এই পেনটি ছিল কোনো বাচ্চার কাছে।

পলটে বললে, তুমি বুঝলে কি করে?

বটকৃষ্ণ তাঁর যুগোল ভ্রূ কুঁচকে তারপর হেসে বললে দ্যাখ, ভালো করে দ্যাখ, পেনটির আশপাশে কোনো দাগ দেখতে পাচ্ছিস কি না।

পলটে পেনটি হাতে নিয়ে পেনটি এদিক—ওদিক ঘুরিয়ে ভালো করে দেখে নেয়, তারপর বললে, তাইতো কয়েকটি দাগ পেনের গায়ে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু এ থেকে তুমি কি বোঝাতে চাইছ?

বটকৃষ্ণ বললে এর মধ্যেই আছে মূল রহস্য। এবার বলি আসলে এটা দাগ নয়, দাঁত দিয়ে কামড়ানোর দাগ। এবং এটা বাচ্চার কাজ। বাচ্চাটির হাতে পেনটি ছিলো এবং খেলাচ্ছলে পেনটি মুখে পুরে কামড়াচ্ছিল হয়তো কোনো অসাবধানে পেনটি পড়ে যায়। তারপর পেনটির কথা আর মনে নেই। সাথে হয়তো পরিবারের কেউ ছিল তাড়া ছিলো, চলে গেছে।

—কিরে এবার আমায় কার পর্যায় ধরবি।

পলটে তাঁর মামার দিকে তাকায় ঠিক সেই সময় প্রায় অর্ধ উলঙ্গার জটপাকানো চুল, দাড়ি খালি পা ওদের সামনে এসে দাঁড়ায় একটি লোক। তারপর নিমেষে বটকৃষ্ণের হাতে ধরা পেনটি ছিনিয়ে নেয়, তারপর বিকট এক ভঙ্গি করে পেনটি মুখে দিয়ে কামড়াতে কামড়াতে চলে যেতে থাকে, হঠাৎ থেমে বটকৃষ্ণের দিকে চোখ রেখে বলে দুর শালা, জঞ্জাল, বলে হন হন করে প্লাটফর্মে আরো অনেক মানুষের ভীড়ে মিশে যায়।

পলটে অবাক হয়ে বললে মামা এটা কি হলো? এরকম কোনো গোয়েন্দা চরিত্রের সাথে মিল আছে কি?

বট কৃষ্ণ এক গাল হেসে বললে ভুল আমি করিনি বাপ। পাগল কখনো ছাগল হয়, কখনো বাচ্চা হয়। আবার কখনো দুনিয়াটাকেই নেয় হাতের মুঠোয়।

হাবড়া লোকাল ছাড়বার সময় হয়ে আসে। কথা বলতে বলতে ওরা খেয়াল করেনি। তাড়াতাড়ি দৌড়ে ট্রেনে উঠে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনের হুইসেল বেজে ওঠে। ট্রেন ছেড়ে দেয়, কিছু যাত্রী লাফিয়ে ওঠে। কিছু যাত্রী ট্রেনের সাথে সাথে দৌড়ায়, যদি ট্রেনে উঠতে পারে। এরকম ঝুঁকি নেওয়া বিপজ্জনক এসব জেনেও এই ভুলটা সব সময় বেশিরভাগ আমরা করে থাকি।...

যাইহোক ট্রেনে উঠেই বটকৃষ্ণের চোখজোড়া একবার এদিক—ওদিক ভালো করে দেখে নেয়। এই স্বভাবটি আগে ছিলো কি না জানা নেই। গোয়েন্দা হবার পর থেকে হয়তো হয়েছে, একজন ভালো গোয়েন্দাদের পক্ষে এই কাজটি নাকি ভীষণ জরুরি। বটকৃষ্ণের তাই ধারণা।

ট্রেনে ঠাসাঠাসি ভীড় না থাকলেও বসার সীট খালি নেই। সুতরাং অন্য যাত্রীদের সাথে ওরাও দাঁড়িয়ে থাকে। বটকৃষ্ণ ওর স্বভাব অনুযায়ী এদিক— ওদিক তাকাতে থাকে, হঠাৎ ট্রেনের চাকার শব্দকে অতিক্রম করে জোরে হ্যাঁচ্চেচা শব্দ শুনে অনেকেই চমকে ওঠেন। তারপর সবার নজরে পড়েন এমন অদ্ভুত হাঁচির শব্দ কোত্থেকে এলো। দেখেন এক বয়স্ক লোক। ষাট—এর ঊর্ধ্বে বয়স হয়তো আরো বেশি হতে পারে। লোকটি ছেঁড়া কাপড়ের ন্যাকড়া দিয়ে নাক মুছছেন। যাত্রীরা আর কিছু না ভেবে যে যার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বটকৃষ্ণ কিন্তু বয়স্ক লোকটিকে ভালো করে দেখতে থাকে।

দেখতে দেখতে ভ্রূ দুটো কুঁচকে ওঠে ওর, কেমন একটা সন্দেহ জাগে মনে। লোকটি ট্রেনের দরজার এক ধারে বসে থাকলেও লোকটি যে লম্বা বটকৃষ্ণ তা অনুমান করে নেয়। শুকনো চেহারা, রোগা নয়। তবে গায়ের চামড়া কিছুটা কুঁচকানো। যদিও বয়সের ভারে এমন হয়েছে। মাথার চুল কদম ছাঁট করে কাটা। অনেকটা রামকৃষ্ণের মতো দাঁড়ি, তাকানোটাও কেমন যেন অদ্ভুত, মনীষীরা যেমন ভাবাবিষ্ট হয়ে যান কখনো কখনো, ঠিক সেই মতন, বটকৃষ্ণ মনে মনে ভাবে লোকটি বেড়াল তপস্বী নয়তো?

এছাড়া আরো অনেক কিছু ভেবে বটকৃষ্ণের মনে হয় লোকটি ঠিক সুবিধার নয়, এর যথেষ্ট কারণ আছে।

প্রথমত লোকটির পোশাক।

গায়ে হাফ হাতা শার্ট, শার্টটি ধপধপে ফর্সা। যেন দোকান হতে আজই কিনে এনে গায়ে দিয়েছেন। আবার ধুতিটি ওনার দেখেই মনে হয় ধুতিটি সাবান কাচা হয়নি কিছু দিন। এছাড়া কাপড়ের এক পুঁটলি, পুঁটলিটি লোকটি তাঁর বুকে এমন ভাবে হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছেন যে, যেন মনে হয় এই পুঁটলির ভেতর কতই না মূল্যবান সব জিনিস রয়েছে। বটকৃষ্ণের কাছে অন্তত তাই মনে হয়।

এছাড়া চকচকে পাম শু! বটকৃষ্ণকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তোলে। চকচকে পাম শু সে অনেকেই পরে থাকেন। কিন্তু পাম শু পরে অমন পাম শু—কে নিয়ে ঠোকাঠুকি কেন? বটকৃষ্ণ লক্ষ করে লোকটি প্রায় সময় তাঁর পাম শু জোড়া একবার বাঁ—পায়ের পাম শু একবার ডান পায়ের পাম শু ট্রেনের মেঝেতে অল্প বিস্তর ঠুকছেন। এর কি কোনো কারণ আছে? হয়তো আছে। একটা কিছু করার মধ্যে প্রত্যেকের কিছু না কিছু কারণ থাকে। কিন্তু এখানে লোকটির কি উদ্দেশ্যে অমন সুন্দর চকচকে পাম শু জোড়া ট্রেনের মেঝেতে ঠোকা হচ্ছে এবং স্বইচ্ছায় সুতরাং কারণ তো একটা আছে। এবং তার উত্তরটাই পাওয়ার আশায় বটকৃষ্ণ উদবিগ্ন। ওর ধারণা এই চকচকে পাম শুকেই কেন্দ্র করে নিশ্চয়ই কিছু না কিছুর সন্ধান ও খুঁজে পাবে।

যেমন এমন ঘটনা প্রায় সময় ঘটে এবং কাগজ মাধ্যমে জানা যায় জুতোর মধ্যে মূল্যবান রত্ন বা চোরাই মাদক দ্রব্য পাচার করতে গিয়ে সুদক্ষ গোয়েন্দাদের তৎপরতায় অবশেষে ধরা পড়ে। সুতরাং বটকৃষ্ণেরও সেই একই ধারণা। নতুন জুতো। তাও ট্রেনের মেঝেও প্রায় সময় ঠোকা। কি উদ্দেশ্য? নিশ্চয়ই জুতোর ভেতর থাকলেও কিছু থাকতে পারে। এবং আছে বলেই একটু অসুবিধা হচ্ছে। তাই জুতো জোড়া ঠুকে পায়ের ভেতর যাতে কষ্ট না হয় তার জন্য এটা করা। আর এটা করার জন্য কে আর লক্ষ করছে? কিন্তু বটকৃষ্ণ নিজের মনেই বলতে থাকে। তুমি বাছাধন কার পাল্লায় পড়েছ জানো না। বুঝবে আমার হিসেবে আরো কিছু বাকি আছে তারপর কি হয় দেখবে। আপাতত জুতো নিয়ে হলো। এবার ওই কাপড়ের পুঁটলি। যাকে ভীষণ আপনজনের মতো বুকে আঁকড়ে ধরা।

আবার একটা ব্যাপারে বটকৃষ্ণকে আরো ভাবিয়ে তোলে লোকটি পুঁটলির এক নির্দিষ্ট জায়গায় প্রায় সময় আঙ্গুল দিয়ে পুঁটলির ওই জায়গাটি এমন ভাবে টিপে টিপে দেখছেন যেন পুঁটলির ভেতর ওই স্থানে তাঁর আসল জিনিসটি ঠিক আছে কিনা। এবং নিশ্চিত হয়ে ওই সময় দুকলি রামপ্রসাদী গানও গেয়ে ওঠেন, মাঝে মাঝে। তারপর এক হাত কপালে ঠেকিয়ে বলতে থাকেন, মা সবই তোমার ইচ্ছা।

বটকৃষ্ণ মনে মনে গজরাতে থাকে। তারপর আর স্থির হয়ে থাকতে না পেরে ওর কাছে ওই অদ্ভুত মানুষটি যাকে দেখে সাধারণ এক গোবেচারি বলে মনে হয় কিন্তু বটকৃষ্ণের শ্যেন দৃষ্টিতে নিশ্চিত করে দেয় এই বয়স্ক ব্যক্তিটি এক নম্বরের সেয়ানা। সুতরাং, তুমিও প্রস্তুত হয়ে এগিয়ে যাও। বটকৃষ্ণের মন সে কথাই বলে। আর দেরি না করে লোকটির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। লোকটি তখন আনমনা হয়ে পুঁটলিটি আঙ্গুল দিয়ে টোকা মেরে যাচ্ছেন। আবার কখনো ট্রেনের মেঝেও তাঁর পায়ে পড়া পাম শু জোড়া অনেকটা তাল দেবার মতো করে ঠুকছেন। হঠাৎ চেয়ে দেখেন একজন নাদুস নুদুস চেহারা প্যান্ট শার্ট পরা লোক তাঁর দিকে তাকিয়ে, লোকটি তৎক্ষণাৎ তাঁর আনমনা ভাবটি কাটিয়ে হাসলেন। বটকৃষ্ণ বিনিময়ে হাসে। তারপর বললে কোথায় যাবেন। লোকটি সামান্য হেসে বললেন ওই হাবড়া। আপনি? বটকৃষ্ণ বললে আমিও শেষ মাথায়। লোকটি আবার ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে পুঁটলির একই জায়গায় টিপে টিপে দেখছিলেন।

বটকৃষ্ণ বেশ ভালো করেই লক্ষ করে লোকটি পুঁটলির ওই অংশটুকু ছাড়া আর কোনো স্থানেই আঙ্গুল দিয়ে টিপে দেখছেন না। আর যখনই টিপে দেখছেন তখনই কেমন একটা ভাব নিয়ে ওই টেপার জায়গাটা ভ্রূ জোড়া কুঁচকিয়ে দেখতে থাকেন। আর তখন স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক অবস্থায় মনের সাধ মিটিয়ে নেবার জন্যে শ্যামা সঙ্গীত বা অন্য কিছু যেমন ভাটিয়ালী গদগদ গলায় বেসুরে দুচার লাইন গেয়ে নেন। তারপর আপন মনে একটু তৃপ্তি করে হেসেও নেন। জানা নেই কার সাথে বিনিময় করে নেন। অন্য কারো কাছে এ সব হয়তো বয়স বাড়ার একটা বাড়তি লক্ষণ এটাই ভাবাতে পারে। কিন্তু বটকৃষ্ণের চিন্তাধারা আলাদা। সে একজন শখের গোয়েন্দা হলেও অনেক কঠিন কাজকে নিমেষে সমাধান করেছে। অবশ্য বটকৃষ্ণের তাই ধারণা। তাই সে তাঁর চিন্তাধারাকে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

প্রথমত, লোকটি বয়স্ক হলেও তাঁর চাউনি হাবভাব একেবারেই ভোলানাথ বলা যাবে না। বরঞ্চ বটকৃষ্ণের মতে সেয়ানা বলা যেতে পারে। তা না হলে অদ্ভুত ভাবে পোশাক পরা। ধপধপে শার্ট, অথচ ময়লা ধুতি। আবার পায়ে চকচকে পাম শু। এ কেমন ধারা রুচি। আবার চকচকে পামশু ট্রেনের মেঝেও প্রায় সময় কখনো জুতোর গোড়ালি, কখনো জুতোর অগ্রভাগ নিয়ে ঠোকা? এর কি কারণ থাকতে পারে? তবে কি বটকৃষ্ণের চিন্তাধারাই ঠিক পথে চালনা করছে। না, একটা রহস্যের গন্ধ থেকেই যাচ্ছে বটকৃষ্ণের কাছে। এছাড়া ময়লা পুঁটলি? কেনই বা ওই একটা সাধারণ পুঁটলির ওপর এতো নজরদারি, কি আছে ওই পুঁটলির মধ্যে? বটকৃষ্ণের মন থেকে ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে। সুতরাং ও আর চুপ করে না থেকে লোকটিকে বিনীতভাবে বললে মাফ করবেন আপনাকে ভালো লেগেছে তাই বলছি, আপনার পাম শু দেখছি নতুন। আজই কিনলেন বুঝি?

বয়স্ক লোকটি বিনীত হেসে জবাব দিলেন। আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। ছোট মেয়ের বাড়ি গিয়েছিলাম ভবানীপুর। বাপ যাই হোক, মেয়ে তাঁর অবস্থাপূর্ণ বাড়িতে পড়েছে। সবই তার কৃপা। তাহলে এতো গরিব ঘর থেকে গিয়ে সুখ পায়। পুরো পরিবারই সুখী। এই নতুন পাম শু আমার ছোট মেয়েই দিয়েছে। এই যে গায়ে আমার শার্ট, এটাও আজ কেনা। ধুতিও কিনে দিয়েছে। এতো দামি ধুতি, তাই এটা এখন পরতে চাইনি। মেয়ে নাছোড়বান্দা তবু পরিনি। বলেছি সামনের মাসে ওর ননদের বিয়ে তখন পরবো। এখন ধুতিটি আমার পুঁটলির ভেতর বন্দি অবস্থায় আছে। সত্যি বলতে কি আমার দুই মেয়েই সুখে আছে। তাদের বাবা মা এটাই তো আশা করে থাকে।

আমার মেয়েরাও হয়েছে তেমনি। বাবার শত যন্ত্রণা। তালিমারা জীবন ওদের ভালো লাগে? তাই ছোট মেয়ে আমার চটি জোড়ার অবস্থা দেখে আমাকে সঙ্গে করে একপ্রকার ধমক দিয়ে নিয়ে যায় জুতোর দোকানে। তারপর সে তার বাবাকে দেবে তাই দেয় কিনে দামি জুতো। তাও পাম শু। জানেন বসন্ত ঋতু জেনেও যা উপলব্ধি কোনোদিন করতে পারিনি। এখন মেয়েরাই আমার বসন্ত হয়ে আমায় জানান দিয়ে যায়। ছেলে আমার বড়, বি. এ. পাস চাকরি করে তবে রোজকার তেমন নয়। তবু চেষ্টার খামতি নেই। বাপ মা আর তাঁর পরিবারকে কি করে সুখে রাখা যায়। কিছু বললেই ছেলের শুধু একটাই উত্তর। আমি আর তার মা তার কাছে গোড়া আর সে মালি। মালির কাজ গাছের গোড়ায় জল দেওয়া। আর তার পরিচর্যা করা।

আমি যদি বলি বুড়ো গাছ কি আর ফল দিতে পারে?

উত্তরও দেয় সোজা করে, তা জানি না। তবে তার গায়ের হাওয়া বড়ই স্নিগ্ধ শুদ্ধ ও পবিত্র যা পুরো জায়গাটাই স্নেহ দিয়ে বেঁধে রেখেছে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন। বলে কিনা পুরো গাছটায় আশীর্বাদ ফলে ভরা।

বটকৃষ্ণ হুঁ করে বললে সত্যি শুনেও আনন্দ। কিন্তু দামি পাম শু। আবার নতুন পাম শু জোড়া আমি লক্ষ রাখছি প্রায় সময় আপনি ট্রেনের মেঝেও ওই পাম শু জোড়া ঠুকছেন, কেন? এটা কি কোনো উদ্দেশ্য? তা হলে বুঝেও বুঝতে চাইছেন না কেন আপনার নতুন জুতো খারাপ হয়ে যেতে পারে। মানে নষ্টও হতে পারে। তাই বয়স্ক লোকটি বটকৃষ্ণের কথা শুনে প্রথমে ওনার ভ্রূজোড়া কুঁচকে বটকৃষ্ণের দিকে তাকান।

তারপর হো হো করে হেসে নেন। হাসি থামলে বলেন, আমার নাতি সবে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু কথাবার্তায় একেবারে পাকা পোক্ত। তার ওপর গোয়েন্দা বই পড়া। ওই নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করা। নানান প্রশ্ন, নানান কথা, ওর বিশেষ সময়টা আমাকে নিয়েই কাটিয়ে দেয়। আমি কাছাকাছি পাই তাজা সবুজের গন্ধ। তাই মনের ইচ্ছেটাকে আরো দূরে নিয়ে যাই। জানেন তো পৃথিবীর মানুষ, ভিন্ন ভিন্ন তাদের রূপ ভিন্ন চরিত্র। তাই পৃথিবীটা আমার কাছে লাগে বড় সুন্দর। তাই মন বলে আরো চাই কাছে পেতে। যাইহোক আমার নাতি বলে গোয়েন্দা প্রথম ক্ষেপে সবাইকেই সন্দেহ করে। তারপর তালিকা থেকে এক এক করে বাদ দিয়ে তারপর আসল আসামিকে চিহ্নিত করে। তা আপনি মশাই তেমন কেউ ননতো? কি জানি!

যাক আলাপ পরিচয়ে আস্তে আস্তে তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এবার যা বলছি আপনি আমার পাম শু—র কষ্ট যন্ত্রণায় ভীষণ কাতর হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আমি, নিজের হয়েও নিষ্ঠুর হয়ে এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছি কারণ এখন আমি আপনার সাথে বাক্যালাপ করে চলেছি। কিন্তু কিছুক্ষণ আগেও পায়ের আঙ্গুলের ব্যথায় ছটফট করছিলাম। মেয়ে আমার সত্যি লক্ষ্মী মা। তার বাবার জুতোর হাল দেখে মেয়ের চোখে জল। তাই কিনে দিলে নতুন জুতো। কিন্তু তার বাবার এরই মধ্যে পায়ের আঙ্গুলে কটা ফোস্কা পড়েছে তা যদি তার মেয়ে জানত! তাহলে মেয়ে আমার নাওয়া খাওয়া ভুলে বাপের সেবায় ব্যস্ত হয়ে থাকত, ভেবেছিলাম জুতো খুলে একবার দেখি আঙ্গুলের কি অবস্থা। পরক্ষণে ভাবি এই ব্যথায় আর যদি পরতে না পারি। খালি পায়ে হাঁটা। আমার পক্ষে আরো কষ্টকর। তাছাড়া জুতোয় এতক্ষণ ধুলো ময়লা লাগা পুঁটলির মধ্যে রাখা ঠিক হবে না। অগত্যা এই কষ্টটুকু সহ্য করেই থাকি কিছুক্ষণ। তারপর বাড়ি গিয়ে যা হবার হবে। তবে একটা উপায়ে কিছুটা আরাম বোধ পাচ্ছি তাহলো ট্রেনের মেঝেও এই পাম শু জোড়া ঠোকা। এই দেখুন একবার জুতোর অগ্রভাগে একবার পেছন অর্থাৎ গোড়ালির দিকে আর একবার ঠুকছি এতে আমার কি হচ্ছে বিষে বিষক্ষয়। মানে পুরোটা না হলেও কিছুতো যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাচ্ছি। নতুন জুতোর কষ্ট কি আর তখন মনে থাকে।

প্রথম ধাপেই একটা জোর হোঁচট খায় যেন বটকৃষ্ণ। সেটি সামলে উঠতে একটু সময় নেয় বটকৃষ্ণের। তবে বেশিক্ষণ নয়, কারণ সহজে হাল ছাড়তে নেই গোয়েন্দাদের। এ ব্যাপারে কেউ না বুঝলেও বটকৃষ্ণ জানে, কারণ সে জানে লড়াই চালিয়ে গেলে ঠিক সময়ে একটা ক্লু পেলেও পেতে পারে সে। তাই একটু ঝুঁকে বটকৃষ্ণ লোকটিকে শান্ত মেজাজে বললে বোঝাই যাচ্ছে পুঁটলিটি আপনার ভীষণ প্রিয়। না মানে যে ভাবে বুকে আঁকড়ে রেখেছেন তাই বলছি। অবশ্য হারাবার ভয়ও তো আছে।

বয়স্ক লোকটি উত্তরে বললেন, আমার ঘরে একটি পুরোনো তালিমারা ছাতা আছে, যা ব্যবহারের অযোগ্য। কিন্তু কি জানেন, যা সঙ্গী হয় সে যাইহোক না কেন আমার কাছে আপন হয়ে পড়ে। ছেলে নতুন ছাতা কিনে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু এখনো ওটাকে সঙ্গী করে নিতে পারিনি। আর পুরোনো ছাতাটিও নিয়ে আসতে পারিনি বউয়ের ধাতানি খেয়ে। মেয়ের মায়ের দেওয়া কিছু নিয়ে গেলাম পুঁটলি বেঁধে আবার মেয়ের দেওয়া কিছু জিনিস এই কাপড়ের পুঁটলির মধ্যে নিয়ে চলেছি তার মাকে দেবার জন্যে। আর হারাবার কথা বলছেন, সে তো আছেই। আপনার পকেটে যে পেনটি দেখছি। কি মশাই ওটা হারালে কি আপনার কষ্ট হবে না।

বটকৃষ্ণ সামান্য হেসে বললে, তা অবশ্য ঠিক।

বয়স্ক লোকটি একগাল হেসে বললেন, তাহলে বুঝুন, আপনি মনে করলেই সে যাই হোক সে হয় আপন, যদি না অপর জিনিসটির ওপর লোভ আসে। জানেন মেয়ে আমার তাদের একটি ব্যাগও দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু ব্যাগটি ছিলো অনেক বড় যা আমার জিনিসপত্র রাখার পর আরো তিন গুণের বেশি ধরতে পারে। অতবড় ব্যাগ কি হবে। একটি আবার নিতান্তই ছোট ব্যাগ। আমার দুর্ভাগ্য। মেয়ে অবশ্য মিষ্টি ধমক দিয়ে বলেছে আমার জামাই বাবাজিকে দিয়ে সুন্দর একটি ব্যাগ কিনে পাঠিয়ে দেবে। কাপড়ের পুঁটলি তাঁর পছন্দ নয়। পুঁটলি বেঁধে যাওয়া—আসা আর হয়তো হবে না। কারণ মেয়ে আমার এদিক দিয়ে ভীষণ জেদি। আজকালকার মেয়ে আমার পুঁটলির দুঃখ কি বুঝবে?

বটকৃষ্ণ হেসে বললে—এই পুঁটলিই তাহলে আপনার কাছে মহামূল্য। যা হারাতে ভয় পাচ্ছেন।

বয়স্ক লোকটি ঘাড় কাৎ করে বললেন, আলবত, আপনাকে আগেই বলেছি যেটুকু থাক, সে আমার বড়ই আপন। এই পুঁটলির মধ্যে কি আছে জানেন?

বটকৃষ্ণ লোকটির দিকে তাকায় মনে মনে বলে আমি তো এটাই জানতে চাই কি উদ্দেশ্যে পুঁটলির একই অংশে বারে বারে আঙ্গুল দিয়ে টেপা। কি বিশেষ জিনিস আছে ওর মধ্যে যা এখনো সন্দেহ হলেও বোঝা যায়নি।

বটকৃষ্ণ মৃদু হেসে বললে, কি আর জানবো। আপনার কাছ থেকে যেটুকু জানা। আপনার মেয়ের দেওয়া কিছু জিনিস।

বয়স্ক লোকটি বললেন সেতো বলেছি, কিন্তু তার চেয়েও এক মূল্যবান জিনিস আছে এর মধ্যে। আর একটু কাছে আসুন আপনাকে ভালো লেগেছে। সব বলবো এক এক করে। এ সব কথা পাঁচ কান না হওয়াই ভালো।

বটকৃষ্ণ বয়স্ক লোকটির পাশে ট্রেনের মেঝেতেই বসে পড়ে কারণ বটকৃষ্ণের তখন একটাই জিজ্ঞাসা কি এমন মূল্যবান জিনিস যা আছে ওই পুঁটলির মধ্যে।

বটকৃষ্ণ গ্যাট হয়ে বসে বয়স্ক লোকটিকে বললে, আমি ছাড়া আর কারো শোনা সম্ভব নয়। আপনি নির্ভয়ে বলুন আপনার মনের যত কথা।

বয়স্ক লোকটি খানিকক্ষণ কেশে নিলেন তারপর বটকৃষ্ণের আরো একটু কাছে সরে এসে বললেন। মনের মতো মানুষ না পেলে মনের কথা বলা যায় না।

বটকৃষ্ণ মাথা দুলিয়ে মোলায়েম হেসে বললে, ঠিক বলেছেন—

বয়স্ক লোকটি আস্তে আস্তে বললেন, মেয়ের দেওয়া ধুতিতো এই পুঁটলির ভেতর আছেই। এছাড়া কোলকাতার রসগোল্লা, আচার, মেয়ের বাড়ির বাগানে হওয়া কিছু শাক—সব্জি আর কাঁচালঙ্কা। একটা কামড় দিয়ে বুঝেছি ব্যাটা আমার বাল্যকালে শিবেন মাস্টারের চেয়েও ঝাঁজালো এবং কড়া। মেয়ে অবশ্য বলেছে একটু কড়াতো হবেই কারণ আমি এখন শহরেই আছি কিনা। আর আমার হাতেই লঙ্কা লাগানো হয়েছে। আমি অবশ্য অত বুঝি না, তবে মেয়ে একটু হয়েছে বুঝেছি কারণ শহরে আছে কিনা।

বটকৃষ্ণ বললে বাঃ শুনেও আনন্দ, কিন্তু আমার একটা ব্যাপারে জানতে ইচ্ছে করছে। যদিও এসব মামুলি ব্যাপার তবু আপনার সাথে কিছু সময়ের আলাপ অথচ মনে হচ্ছে বহুদিন আগে থেকেই চেনা জানা। তাই জিজ্ঞেস করা।

বয়স্ক লোকটি আবেগ উথলিয়ে বললেন আরে মশাই সংকোচ না করে বলেই ফেলুন। জীবন যখন একটু উৎফুল্ল হয়ে চলতে চায় তখন কেনই বা তাকে নিরাশ করি। বলুন, আমিও একটু আরাম করে বসি।

বটকৃষ্ণ বললে তেমন গুরুত্ব কথা নয়, শুধু বলছি পুঁটলিটি মাঝে মাঝে আঙ্গুল দিয়ে টিপছেন কেন? এর কি কোনো রহস্য আছে। মানে অসাবধানতায় কিছু হারিয়ে না যায় তার জন্যে টিপে বুঝে নেওয়া জিনিসটি ঠিক আছে কি না।

বটকৃষ্ণের কথায় বয়স্ক লোকটি হোঃ হোঃ করে হাসতে থাকেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন আপনি কি আমার ওপর দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছেন নাকি? তা করুন। স্যাঁতসেতে জীবন আর জ্বালা যন্ত্রণা মুখ যদি একবার লোকসমাজে দেখা না যায়। মন্দ কি? কিছু মানুষ তো বুঝবে। যাইহোক শার্লক হোমস, ব্যোমকেশ, ফেলুদা, কিরিটি রায় এদের জানা আছে কি?

বটকৃষ্ণ মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বললে, তা আছে।

বয়স্ক লোকটি হেসে বললেন, বাঃ—তবে তো হয়েই গেলো, আপনি সমাধান করুন। কি কারণে আমি ব্যাকুল হয়ে পুঁটিলিটি টিপছি। হ্যাঁ নিশ্চয়ই এর কারণ আছে।

বটকৃষ্ণকে চুপ থাকতে দেখে, বয়স্ক লোকটি ঠোঁট টিপে হেসে বললেন আমার কাছ হতে এতো ক্লু পেলেন অথচ বলতে পারলেন না। আমিই বলছি, এর মধ্যে যে আচার ভরা শিশিটি আছে। সেটি উল্টে গিয়ে আচারের তেল গড়াচ্ছে কিনা দেখছি। কিংবা ট্রেনের ঝাঁকুনিতে শিশিটি ভেঙে গেলো কিনা তাও ভাবিয়ে তুলছে। যার জন্যে আমার এই পাগলামি করাটা হয়তো আপনার কাছে বিরক্তকর কিংবা গোয়েন্দাদের যা হয় সন্দেহের কারণ।

—কি, ঠিক বলিনি?

বটকৃষ্ণ ঢোক গিলে বললে কি যে বলেন, ইচ্ছেটাই কি সব কিছু পাইয়ে দেয়, তা পুঁটলির খবর এখানেই তবে শেষ।

আরতো কিছু নেই?

বয়স্ক লোকটি এক অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি করে বটকৃষ্ণের দিকে তাকাল, তারপর পুঁটলিটি কোলের ওপর রেখে দুহাত দিয়ে তার রামকৃষ্ণের মতো দাঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, আরে মশাই পুঁটলির ভেতরে আসল রহস্যের কাহিনি এখনো বলিনি, বলবো সবুরে আপনিও তৃপ্তি পাবেন। ভীষণ দামি।

বটকৃষ্ণ চোখ গোল করে বললে, বলেন কি?

বয়স্ক লোকটি ধীর গলায় বললেন, আছে, বহু মূল্যবান এক জিনিস। আজই পৌঁছে না দিতে পারলে রক্ষে থাকবে না। দারুণ জিনিস মশাই। লোভ সামলাবার ক্ষমতা আছে তো? আমিই পারছি না। লোভ খাঁটি হলেও ভয়ঙ্কর। ক্ষতিকর। কিন্তু এটা—

বটকৃষ্ণ বললে না না আমি সেই ধাঁচের মানুষ নই। লোভে পাপ বাড়ে, সেবায় নয় বলুন—

বয়স্ক লোকটি বললেন সমাদর পাওয়ার মতোই জিনিস। ভীষণ—নামী ও দামিও বটে। একটি আংটি না না শুধু আংটি কেন আরে! আপনি কাঁপছেন কেন? এই তো ভালো ছিলেন। এই রোগ আগেও ছিলো নাকি। কি গেরোরে বাবা। ম্যালেরিয়া কিনা কে জানে। তাহলে মেঝেয় শুয়ে পড়ুন। আরাম পাবেন। আমি কারো কাছে জলের খোঁজ করি।

বটকৃষ্ণ আরো কাঁপতে থাকে। কথা বলতে গিয়ে তোতলিয়ে যায়। বললে আঃ কথা বাড়াবেন না। বলুন কত দামি আংটি, পাথর বসানো আংটি কি? কি রঙের পাথর? পাথরের সাইজ কত বড়? কোন কালের পাথর? তখন কোন যুগ? পাথরটি হীরে, পান্না, চুনী না রক্ত মুখী নীলা? আরে মশাই বলুন, অন্য কথায় প্যাঁচ মারবেন না। চটপট উত্তর দিন। কথা বলতে বলতে আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ে বটকৃষ্ণ। কপালে ঘাম ঝরতে থাকে। বয়স্ক লোকটি বটকৃষ্ণের এমন সব আজব কথায় প্রথমে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন বটকৃষ্ণের দিকে। তারপর ক্ষেপে গিয়ে বলেন। দুর ছাই এ যে পোষা ছাগল ভেবে বুনো ষাঁড়ের পাল্লায় পড়েছি। যত বলতে চাইছি। দামি তো বটেই। সেই কোন যুগের আংটি। হ্যাঁ আনতে গিয়েছিলাম কড়া হুকুমের খপ্পরে পড়ে। একটি বাদশাহী আংটি। পেয়েও গেলাম অনেক কষ্টে। আর সেটি—হুররে,—বয়স্ক লোকটির কথা আর শোনা গেলো না।

বটকৃষ্ণের ওরকম বিকট চিৎকারে। ওরকম চিৎকার, কামরার প্রায় সব যাত্রীরা প্রথমে ভ্যাবাচাকা হয়ে পড়ে। তাকে সামলাতে কিছু সময় চলে যায়। তার পর সব সামলে কয়েকজন যাত্রী বলে ওঠেন কি হলো? পকেটমার। কয়েকজন অন্যভাবে নিয়ে বলেন। আঃ কিছু তো ঘটেছে। তা না হলে এমন চিৎকার কেন?

পলটে অনেক কষ্টে সীটে বসার মতো নিজের একটু জায়গা করে নিয়ে ছিলো, মামার মোটা শরীর ওইটুকু জায়গায় বসতে পারবে না। তাই আর ডাকেনি। তাছাড়া কার সাথে মামা অর্নগল কথা বলছিলো পলটে দেখেও মামাকে আর না ডেকে নিজের আপন খেয়ালে ট্রেনের জানলা দিয়ে বঙ্গভূমির রূপ দর্শনেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু মামার ওরকম চিৎকার শুনে পলটেও প্রথমে চমকে ওঠে। তারপর কামরায় দাঁড়ানো যাত্রীদের ফাঁকফোকরের মধ্যে দিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পলটের মামা এতো জোরে হুররে বলে চিৎকার করে আসলে কি যেন বোঝাতে চলেছে। কি জানি আবার কোনো গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে নিজেই না সেই জালে আটকে যায়। কেন না মামাকে নিয়ে এসব ঘটনা পলটের আগে থেকেই জানা। যাইহোক পলটে বসে না থেকে মামার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

ট্রেনের কামরায় অধিকাংশ যাত্রীরাই চুপ থেকে নেই। নানাদিক থেকে নানা প্রশ্ন। বুড়ো তাহলে এক নম্বরের সেয়ানা। নিয়ে চলেছেন সাত রাজার এক ধন বাদশাহী আংটি? বুড়ো তো দেখছি মাদক দ্রব্য পাচারকারীদের থেকেও আরো কয়েক ধাপ ওপরে। পাচারকারীদের মাথা কিনা কে জানে?

একজন বললেন বোঝা দায় কে বলবে ময়লা পুঁটলির মধ্যে এক অত্যাশ্চর্য জিনিস? যা এখন দুর্লভ। দেখাই যায় না।

—আরে মশাই আর একজন বলতে থাকেন। দেখুন কেমন মানুষ। যে জাল ফেলছে। বিক্রি করছে, অথচ মাছ দেখেইনি। বোঝা দায় সরল অথচ যায় বাঁকা পথে। সবাই এখন বয়স্ক লোকটিকে দেখতে থাকেন। নানা জন নানা ভাবে। কেউ ঝুঁকে, কেউ বা এক হাতে ট্রেনের রড ধরে অন্য হাত কোমরে রেখে। বিশেষ করে সবার আরো নজর ওনার পুঁটলির দিকে।

সবাই যখন বয়স্ক লোকটিকে বলতে থাকেন এবং প্রায় নজর বন্দি করে রেখেছেন। তখন বয়স্ক লোকটি তাঁর পুঁটলিটি আরো ভালোভাবে হাত দিয়ে বুকের মধ্যে চেপে ধরে বটকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত স্বরে বললেন, আপনি মানুষ কিন্তু আমার সন্দেহের তালিকায় আপনি মানুষ তো? কি জানি আদিম যুগ হতে ফিরে আসা অসভ্য নিরেট মাথা একজন কিনা। যে কি এখনো সভ্য হয়ে উঠতে পারেনি। বটকৃষ্ণ দুহাত কোমরে দিতে গিয়েছিলো কিন্তু ট্রেন চলাকালীন টাল সামলাতে না পেরে ট্রেনের হাতল ধরে নেয়। তারপর একটু ব্যঙ্গ হেসে বললে, আপনি কথায় মঞ্চে বক্তৃতা দেবার মতো। আর কাজে প্যাঁচ কষা। কিন্তু এখানে তা হবার নয়। একটু বাদেই টের পাবেন।

বয়স্ক লোকটি গলা ওনার খাদে নামিয়ে বললেন, হ্যাঁ, মালুম পাচ্ছি। প্রথমে ভেবেছিলুম গরু—না হোক ছাগল। তবে শান্তশিষ্ট।

এখন দেখছি বোধশূন্য ক্ষ্যাপা পাগল। যে হাত পা ছোড়ে অকারণে। আবার চেঁচায় জোরে বেশি পাগল হলে। অবশ্য আধ পাগলার সংখ্যাও এখন দেখছি কম নয়। আর বেশি সময় নেবে না আপনার পাশে থাকলে। তাই বলি আমাকে ছেড়ে বরঞ্চ অন্য স্থানে আপনার গুণকের্তন করুন।

সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত ভঙ্গি করে বটকৃষ্ণ বললে আসামি যখন ফাঁদে পা দেয় তখন দিক শূন্য হয়ে ধাপ খোঁজে। যদি ধাপে ধাপে পা রেখে উঠতে পারে। কিন্তু আপনার সেই পথ যে এখন বন্ধ। কারণ আমি বটা ওরফে বটকৃষ্ণ চৌধুরী। এবং সবাই জানে আমি একজন গোয়েন্দা। প্রথম দেখার পর থেকেই আমি বুঝেছি। আপনার সৎ হয়ে থাকাটা একটা ভান, আসল পরিচয় আশা করি আর বলতে হবে না। নিন বাদশাহী আংটিটি বার করুন।

বয়স্ক লোকটি প্রচন্ড রেগে এবার উঠে দাঁড়ান। বলেন তোমায় দেখে মায়া হচ্ছিল ঠিকই এখন মনে হচ্ছে এক থ্যাবড়া মারি তোমার মুখে তোমাদের মতো এই সব সার শূন্য মানুষগুলোর জন্যই সোনার বাংলার এই হাল, তা হলে কেন বা যাবে মানুষ দ্বারে দ্বারে হাত পাততে। ইস গোয়েন্দা দেখাচ্ছে। মানুষ চেনাই ওর কাজ। আরে গোয়াড়, দেশের যা হাল। থানার পুলিশরাও ভেবে পাচ্ছেন না কাকে থানায় ঢোকাবে। কাকে ছাড়বে। আর ইনি নিমেষে মানুষ চিনে গেলেন। নেমে এলেন আর এক শার্লক হোমস রাম ছাগল হয়ে।

চুপ করুন। বটকৃষ্ণ ধমকে ওঠে। বললে ওসব কথায় চাল ভিজবে না। ভালোয় ভালোয় বলছি বাদশাহী আংটিটি বার করুন। ওটা থানায় জমা দেবো। তারপর মিউজিয়ামে।

বয়স্ক লোকটি রেগেই বললেন। মিউজিয়ামে দেবেন? কেন? তার চেয়ে আপনার মুণ্ডুটাই জমা দিন। মানুষের যা হাল, মুন্ডুটি দেখলে তবু একটু বুদ্ধি খুলবে। আপনার মুন্ডুটিই হবে মিউজিয়ামে সব চাইতে সেরা।

বটকৃষ্ণ বললে বটে, আপনি কি ভেবেছিলেন। আমি এমনি এমনি আপনার ওই সব আবোল তাবোল কথা শুনে সময় নষ্ট করছিলাম। সেটি ভেবে আপনি ভুল করেছেন আসলে কথায় কথায় আসল জিনিসটি জানার জন্যই আমার এ প্ল্যান।

একজন যুবক গাট্টাগোট্টা আয়রন ম্যানের মতো চেহারা। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে বয়স্ক লোকটির কথা শুনছিলো। সে এবার এগিয়ে আসে, বললে কেন এতো ধানাই পানাই বলছেন। আমাকে চেনেন? নিন বার করুন বাদশাহী আংটি, না হলে যুবকটি তার হাতের মাসলগুলো দেখিয়ে বয়স্ক লোকটিকে আবার বললেন সময় নষ্ট না করে বাদশাহী আংটিটি দেখান। একজন বয়স্ক যাত্রী প্রায় ঢুলছিলেন সীটেয় বসে। মাথায় সাদা কালো চুল সাদাটাই বেশি। দাড়িও সেই একই অবস্থা। তিনি ঢুলছিলেন ঠিকই, আধবোজা থাকা সত্ত্বেও কিন্তু নজর ছিলো বয়স্ক লোকটির দিকে। তিনি আধবোজা অবস্থাতেই বললেন কতই রঙ্গ দেখি প্রভু। এক ছিলেন রামকৃষ্ণ, তিনি বলেছিলেন ''যত মত, তত পথ''। আর ইনি আর এক রামকৃষ্ণ কি মিলন। বলেন কিনা যত পাই, তত চাই। তা বাপু এক দল এক হাতে মাউথপিস ধরে অন্য হাতে হাত পাতে। তা তুমি বাপু—কোন মাপের? ছিঃ দেশটা ডোবায় ভরে গেল। তা বলছি, এটি কার আমলের বাদশাহী আংটি? আকবর শাহজাহান না দারাশিকোর হত্যাকারী ঔরঙ্গজেব? বলুন, পুরানো আমলের এই সব আমি আবার একটু আধটু গবেষণা করছি।

—মহাশয় আমারও তাই জানার ইচ্ছে দেশটা কি সত্যি সত্যি গোবরে ঠাসা বস্তা আর বাদ বাকি অধিকাংশই পাগলে ছেয়ে গেলো? বয়স্ক লোকটি বিরক্তভাবেই বললেন।

একজন মধ্য বয়স্ক, তিনি একটু দূরে ট্রেনের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর কপালে তিলক কাটা পরনে ধুতি, গায়ের গেরুয়া রঙের ঢোলা ফুতুয়া। গলায় রুদ্রারেক্ষ মালা, কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগ। সেটির রঙও গেরুয়া। থলথলে শরীর। গোরা গায়ের রং। পায়ে চটি। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। তিনি একবার চোখ বুজে তারপর আবার চোখ খুলে ওপর পানে তাকান। হাত দুটো বুকের কাছে ঠেকিয়ে জোড় হস্তের মতো করে মনে মনে কি সব বললেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন আজই ভোর রাত্রির সময় গণনা করে বুঝি আজ এমন কিছু ঘটবে যা অভাবনীয় অত্যাশ্চর্য।

এক বয়স্কা মহিলা ট্রেনের সীটে বসে অনেকক্ষণ ধরেই এইসব দেখছিলেন। পাশে বসে এক বাচ্চা মেয়ে। সাত—আট বছর বয়স। সম্ভবত নাতনি হবে। বয়স্কা মহিলা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন। গণনা ঠাকুর তো তাহলে ঠিকই বলেছেন। —আরে আপনারা এখনো চুপ থাকবেন? কিছু একটা করুন।

অনেকেই বলে উঠলেন না না অন্যায়কে কিসের আপোস? বুড়োকে পুলিশের হাতে দেওয়া হবে।

—বয়স্কা মহিলার পাশে বসা সেই বাচ্চা মেয়েটি হঠাৎ বয়স্ক মহিলাকে জড়িয়ে কান্না জড়ানো গলায় বললে, না না ঠামি বুড়ো দাদুকে পুলিশে দিও না। বারণ করো, না হলে ও মরে যাবে। বয়স্কা মহিলা মৃদু ভর্ৎসনা দিয়ে তাঁর নাতনিকে বললেন, আদি খ্যেতা হচ্ছে। চুপ করে বসে থাক। বুঝলি শয়তানদের বয়স দেখতে নেই। ওদের জন্ম থেকেই শিরায় শিরায় পাপ লুকিয়ে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে একদিন শয়তানে পরিণত হয়। এই যে দেখছিস সাধুর মতো দাড়ি। এই দাড়িতেও শয়তান লুকিয়ে আছে। সেই মহিলা আঙ্গুল তুলে বয়স্ক লোকটির দিকে তাক করে অন্য যাত্রীদের বললেন, সাবধান, ভুলেও ছেড়ে দেবেন না একে।

এবার বয়স্ক লোকটি মুষড়ে পড়লেন। ওনার চোখ মুখের ভাব দেখে বোঝা যায় যেভাবে ওনাকে কোণঠাসা করা হয়েছে সেখান হতে বেরোনো কঠিন। কারণ কামরার অধিকাংশ যাত্রী এখন ওনার প্রতি বেপরোয়া ভাব। ইচ্ছে হলেই অনেক কিছু করতে পারে। আর থানা—বয়স্ক লোকটি বিষণ্ণ হেসে মনে মনে ভেবে নিলেন।

সেখানকার পরিবেশের অবস্থা এবং ব্যবস্থা। কারণ জানার থেকে অকারণে কিছু করার সিদ্ধান্তটাই ওদের বেশি জরুরি হয়ে পড়ে। সুতরাং তিনি কোনো উপায় না দেখে বটকৃষ্ণ এবং যাত্রীদের হাত জোড় করে বললেন। আমি বুড়ো মানুষ। কোনো ভাবে পৃথিবীকে আঁকড়ে বেঁচে আছি। তাই আমার অনুরোধ এই বুড়ো মানুষটিকে আর কষ্ট দেবেন না। মুক্তি দিন।

ট্রেনের বেশিরভাগ যাত্রীরাই চিৎকার করে বলে ওঠে অনেকটা মিছিলের ঢঙে মুক্তি নয়, মুক্তি নয়, বিচার চাই, বিচার চাই। দেশের শক্তি বাড়াতে এক হও, এক হও।

বয়স্ক লোকটি আরো মুষড়ে পড়ে বললেন, আমার কষ্টের জীবনে এই পৃথিবী থেকে যেটুকু পেয়েছি সেটুকুই ভগবানের কৃপা হিসেবে সানন্দে গ্রহণ করেছি। কিন্তু আজকের এই প্রাপ্য কাকে বাছবো? ভগবান না সমাজ ব্যবস্থা? আমি জানি জল গড়ায়, তবে জানি না তা শুদ্ধ কিনা। কিন্তু গড়ায়, শুদ্ধ জল স্পর্শ করলে যেমন নিজেকে পবিত্র লাগে, এখানে বুড়ো মানুষ বুঝি না খাদ পেলে সেখানেই কোন জল গেড়ে বসে। তাই বটকৃষ্ণের দিকে হাতটি বাড়িয়ে বলেন, দোহাই এই বুড়ো মানুষটিকে মুক্তি দিন।

বয়স্ক লোকটির কথা শুনে বটকৃষ্ণ কথার মোড় ঘুরিয়ে বললে, আচ্ছা আচ্ছা থানায় আপনার যেতে হবে না। কিন্তু বাদশাহী আংটিটি দিতে হবে। কারণ এমন দুষ্প্রাপ্য জিনিস আমাদের কারো অধিকার নেই। ওটি সরকারের কাছেই থাকবে।

বয়স্ক লোকটি তাঁর হাত জোড়া কপালে ঠেকিয়ে বিষণ্ণ গলায় বললেন এই হত ভাগার কপালটিও যদিও সরকারের, কিন্তু এর বিষয়বস্তু কি তা জানতে একেবারেই অনিচ্ছুক। কয়েকজন ব্যস্ত হয়ে বললেন। আরে লেকচার থামা। তারপর বটকৃষ্ণকে বললেন এই মালটিকে আপনি ছেড়ে দেবেন?

বটকৃষ্ণ সবাইকে আশ্বস্ত দিয়ে বললে কোনোদিন কি ভেবেছেন এমন জিনিস দেখবেন। সুতরাং দেখে যান। তাছাড়া প্রত্যেকটি থানায় আমার যাতায়াত আছে। লালবাজারটাই বা বাদ দিই কি করে।

আয়রন যুবকটি বললেন, দাদা আমিও কম যাই না। সারা ভারতে প্রায় স্থানে আমার নামে গুনগান। সুতরাং আমি আপনার পাশেই আছি।

বয়স্ক লোকটি কিছু বলতে গিয়েও যাত্রীদের ও রকম ব্যবহার দেখে চুপ থাকাটাই ঠিক মনে করে বটকৃষ্ণের দিকে তাকালেন। বটকৃষ্ণ ইশারায় পুঁটলিটি দেখিয়ে খুলতে বলে।

পলটে এতক্ষণ তাঁর মামার এসব ব্যাপার স্যাপার দেখে কি বলবে মামাকে তাই ভাবছিলো। বলতে আর পারেনি। যেহেতু মামা এতক্ষণ Excited হয়ে পড়েছিলো তাই। এবার মামার একেবারে কাছে গিয়ে বললে মামা কামরায় তো আরো কয়েকটি পুঁটলি দেখছি। কিন্তু এখন বুঝেছি সত্যি তুমি জিনিয়াস। এক কথায় ফেলুদা না হলেও তার কাছাকাছি গেছো।

ভাগ্নের কথা শুনে মোলায়েম হাসি দিয়ে বটকৃষ্ণ বললে বেশিরভাগ সবাই তা ভাবে, যেমন তুই। কিন্তু তোর দাদু মানে আমার বাবা কিন্তু এসব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আমার কানটি ধরে তিন পাক ঘুরিয়ে শেষে দোকানে নিয়ে বসায়। আর বলেন মিষ্টি দোকানটাই তোর উপযুক্ত জায়গা। পড়াশোনা তো গোল্লায় গেছে। এখন দোকানে বসে যদি কিছু শিখতে পারিস।

বয়স্ক লোকটি ওনার পুঁটলি খুলতেই পুঁটলির ভেতরে দেখা যায় আচারের শিশি, মিষ্টির বাক্স, কাঁচালঙ্কা, ধুতির প্যাকেটটি পুঁটলির ভেতর থেকে নিয়ে ধুতিটি দেখান। এছাড়া টুকিটাকি কিছু জিনিস সেগুলোও দেখান।

বয়স্ক লোকটি এরপর বটকৃষ্ণের দিকে তাকাতেই বটকৃষ্ণ উত্তেজিত হয়ে বললে, এসব দেখে কি আমি মাথায় রাখবো, বাদশাহী আংটি কোথায়?

যাত্রীরা প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন পুঁটলির ওপর কেউ কেউ বললেন, দেখাবে না। বুড়ো ভীষণ ধড়ীবাজ।

বটকৃষ্ণ বললে, আঃ উত্তেজিত হবেন না, দেখাবে না তো উনি যাবেন কোথায়।

বয়স্ক লোকটি শান্ত গলায় বললেন, ছিঃ ছিঃ দেখাবো নিশ্চয়ই দেখাবো, এমন সুন্দর গড়া দেশ। এমন দেশে এমন মহান তুল্য মানুষ থাকতে না দেখিয়ে পারি। তবে বড় আপশোশ রয়ে গেলো এই কামরায় যদি একজন ভালো চিত্রকর থাকতেন। কারণ আজকের এই দৃশ্যখানি উনি নিশ্চয়ই তাঁর কাজে লাগাতেন। এবং ছবিগুলো ভারত এবং বিভিন্ন দেশে সমাদরে বিক্রিও হতো। আমি তো চিত্রকর নয় দুর্ভাগ্য। একজন কবি থাকলে বুঝতেন। হায়রে কবি কি বিচিত্র এই দেশ। আমি কি লিখি। ভাষা আর আসে না। একবার সবার দিকে তাকিয়ে বয়স্ক লোকটি পুঁটলির ভেতর থেকে তার শেষ সম্বল ব্রাউন কাগজে মোড়া সেটি বার করলেন সবাই কৌতূহল হয়ে সেটির দিকে নজর দেন। যাত্রীদের একজন বলেও উঠলেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ নিশ্চয়ই এর মধ্যেই আছে সাত রাজার একধন ওই বাদশাহী আংটি। তাড়াতাড়ি প্যাকেট খুলুন।

বটকৃষ্ণের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে। বয়স্ক লোকটিকে ঝাঁজালো স্বরে বললে, আপনি কি ভেবেছেন, সময়ের দাম নেই। বলুন কি আছে? বাদশাহী আংটি?

বয়স্ক লোকটি এমনিতেই রেগে ছিলেন বটকৃষ্ণের ওপর বললেন, আছে তোমার যম। বলেই সেই ব্রাউন কাগজে মোড়া প্যাকেটটি খুলে তার ভেতরে যেটি ছিলো সেটি হাতে নিয়ে হাতটি ওপরে তুলে সেটি ঘুরিয়ে সবাইকে দেখিয়ে বললেন—বাংলার অক্ষরের সাথে পরিচয় আছে কি? না আমি পড়ে বুঝিয়ে দেবো। এবং এটাও বলতে হবে কি, এটি কার আমলের?

সঙ্গে সঙ্গে পলটের চোখ ট্যারা। অন্যান্য যাত্রীরাও হতভম্ব। বটকৃষ্ণের মুখ চোখ দেখে যা বোঝা যায় তার ওমন শরীরকে নিয়ে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে রাখা যাবে না। সুতরাং সে নিজেই ধপাস করে ট্রেনের মেঝেয় বসে পড়ে।

আর সেই গণৎকার যার গণনা সঠিক। ওনার চোখ মুখের যা অবস্থা তাতে মনে হয় এই মুহূর্তে ট্রেন থেকে নেমে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। ট্রেনের দরজার কাছে গিয়েও নেমে যেতে পারলেন না। তার একটাই কারণ নির্দিষ্ট স্থানে ঠিক সময় ট্রেন পৌঁছোতে পারেনি রেড সিগন্যাল থাকার জন্যে। এখন ট্রেনের গতি জোর। আয়রন ম্যানের যা হয় সেই মেজাজটি আর নেই। সুতরাং একবার এদিক—ওদিক তাকিয়ে তিনি তাঁর ফুল শার্টের গোটানো হাতা টেনে নীচে নামিয়ে দেন হাত বরাবর। জামার বোতামগুলো আটকাতে ভোলেন নি। দাঁড়ানো ভঙ্গিও পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো।

বয়স্ক লোকটি উচ্চস্বরে বললেন, আপনারা মানুষ না এক শিয়ালের রা শুনে প্রত্যেকটি শিয়ালের চিৎকার। আমি সত্যি হতদরিদ্র একজন ব্যক্তি। কিন্তু ভদ্রতায় আপনারাই আমায় বুঝিয়ে দিলেন। আরে মশাই পুঁথিগত জ্ঞান সত্যি কদর পায়। কিন্তু চরিত্র, মানুষ—মানুষকে মর্যাদায় আরো বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আপনারা, মুষ্টিমেয় কিছু আছে যারা সুযোগের অপেক্ষা থাকেন,সুন্দর এক পরিবেশকে কি করে পঙ্কিল করা যায় সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাওয়া। যেমন আপনারা। আমি যতই বলতে চাইছি ''বাদশাহী আংটি'' আসলে একটি বই। লেখক স্বনামখ্যাত সত্যজিৎ রায়। বইটি আমার নাতি চায় এবং দাদুর কাছে তার হুকুম। তাই মেয়ের বাড়ি যাবার পর একবার কলেজ স্ট্রিটে যেতে হয়। আমি যতই বলতে চাইছি এই বইটির কথা, কিন্তু কি শুনবে এই গোয়ার গোবিন্দ ষাঁড়টি। তার আগেই বুনো ষাঁড়ের সাথে হাত মিলিয়ে সবাই বুনো ষাঁড় হয়ে যেমন হয়ে থাকে নিরীহ মানুষগুলোর ওপর অত্যাচার চালানো! আপনারাও তাই করতে যাচ্ছিলেন। সত্যি কি বিচিত্র এই দেশ। কবি, এ তুমি কি লিখলে? সার্থক জনম আমার, জন্মেছি এ দেশে। তিনি কি সত্যি এমনটি ভেবেছিলেন? আমিই বা কি বলবো?

বটকৃষ্ণ এখন বাংলার পাঁচের মতো মুখটি করে। বয়স্ক লোকটির দিকে তাকাতেও ভয় পাচ্ছে। তবু তাকাতে হয় বললে, বুঝতে পারিনি, মাফ করবেন। আপনার তুলনায় আমি তো অনেক ছোট।

বয়স্ক লোকটি সামান্য হেসে বললেন ছাগল যদি ওর শিং জোড়া দিয়ে আমায় গুতো মারে, তারপর একটু সরে গিয়ে যদি মাথা নাড়ে, তাহলে আমি ছাগলটির সমন্ধে কি বুঝবো, ও এখন ছাগল হলেও কৃষ্ণ প্রেমে হাবুডুবু খাবে আর ঘাস খাওয়াটা বর্জন করে শুধু ফল খাবে?

সেই মহিলা যিনি তাঁর নাতনির সাথে ছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, আমার নাতনি ঠিকই বলেছিলো, আমার কি বাজেটাই না লাগছে। তারপর বটকৃষ্ণর দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, একটা অপদার্থ নিরেট মাথা, কেন যে সায় দিলাম। পলটে তার মামার ওরকম ফ্যাকাসে মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকানোর পর বললে মামা ও মামা, বটকৃষ্ণ পলটের দিকে তাকাতে পলটে বললে—মামা, বাদশাহী আংটি আমিও পড়েছি। ফ্যানটাসটিক। শোনো, তুমিও পড়ো কিছু শিখবে। বটকৃষ্ণ তাঁর ভাগ্নেকে কি বলতে যায়, পরক্ষণে পকেটে হাত দিয়ে বলে আমার মানিব্যাগটি কি আমার কাছে ছিলো? পলটে অবাক হয়ে বললে তা হলে কি হবে মামা। যাবো তো ঠিক। স্টেশনে নেমে হাঁটা। আবার ফিরতে হবে তো?

মেজ মাসির কাছ হতে না হয় চেয়ে নিও।

বটকৃষ্ণ চেঁচিয়ে বললে চপ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%