বেশ কয়েকদিন ধরে দুর্গার দেখা নেই। ক্লাসে আসছে না, রানিসায়রের পাড়ে যেখানে আমরা প্রায়শ দেখা করি, সেখানে আসছে না; বনদপ্তরের পার্ক, যেখানে মাঝে মাঝে আমরা নিভৃতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করি, সেখানেও আসছে না। ও যে মেসে থাকে সেই ‘শান্তি’ মেসে মেয়েরা থাকে বলে ভেতরে ঢুকতে পারিনি। তবে বাইরে থেকে তালা বন্ধ।
ওর সহপাঠীদের সঙ্গে তেমন কোনো পরিচয় নেই। তবু ওর ডিপার্টমেন্টে খোঁজ নিয়েছি। কেউ তেমন সদুত্তর দিতে পারেনি। তবে হঠাৎ কোনো প্রয়োজনে কোথাও চলে গেল! ও মেস পরিবর্তন করেনি তো? তাহলে নিশ্চয়ই আগে থেকে আমাকে জানাত। তবে কি বাড়ি গেছে? হঠাৎ কোনো প্রয়োজনে বাড়ি যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। সেক্ষেত্রে আমাকে জানিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। তাহলে মেসে তালা বন্ধ কেন? মেসে কোনো গন্ডগোল হয়েছে? নিজেদের মধ্যে ঝামেলা হওয়ায় তালা বন্ধ করে যে যার বাড়ি চলে গেছে? ও! আর পারি না। আমি কোথায় খুঁজব? কীভাবে খুঁজব? ওর যদি কোনো ফোন নম্বর জানা থাকত, তাহলে না হয় কোনো টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করে খোঁজ নিতে পারতাম। আমার নিজের কোনো ফোন নেই। তবে যে বাড়িতে থাকি, সেই বাড়ির মালিকের ফোন নম্বর রয়েছে। ওই নম্বরটা দিয়ে রাখলে ঠিক হত। কিন্তু আমার আর দুর্গার সম্পর্ককে পাঁচ-কান করতে চাইনি। আমাদের সম্পর্ক অন্য কারুর আলোচনার বিষয়বস্তু হোক, তা আমি চাইনি।
আমি প্রতিটি মুহূর্তে এক অসহনীয় যন্ত্রণায় ছটফট করছি। প্রতিটি সেকেণ্ড, প্রতিটি ঘণ্টা, এক একটি বছর, এক একটি যুগ বলে মনে হয়। এক-একবার মনে হয় আমার ছোট্ট হৃৎপিন্ডটা এবার শরীর থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। কখনো মনে হয় আমি আর পারব না, পারব না সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকতে। হাঁটতে হাঁটতে একই রাস্তা দিয়ে বারবার গেছি, বারবার এসেছি। তবু ওর কোনো খোঁজ পাইনি।
এদিকে আমি ঠিকমতো ক্লাস করতে পারছি না। প্রতি মুহূর্তে আমি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছি। কোনো কিছুই ভালো লাগে না। মনে হয় চারদিক কেমন ফাঁকা, হাহাকারময়। মনে হয় কেউ কোথাও নেই। সবই মিথ্যে, সবই অভিনয়।
মেসে আমার আচরণ বোধ হয় স্বাভাবিক ছিল না। রুমমেট সন্দীপ জিজ্ঞেস করল প্রিয়দা, কোনো প্রবলেম?
কেন এমন মনে হচ্ছে?
তোমাকে কেমন অস্থির, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে।
না, তেমন কিছু নয়।
কিছু একটা তো হয়েছে। তুমি বলতে না চাইলে বোলো না।
বলার মতো কিছু নয় রে। তেমন হলে বলতাম। আমার প্রায় সব কথা তো তোকে বলি।
সব কথা তুমি বল না।
তাই?
তাই।
কোন কথা তোকে বলিনি বল?
সেদিন তোমাকে স্টেশনে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের এক দিদির সঙ্গে ঘুরতে দেখা গেছে। তা ছাড়া…।
তা ছাড়া?
ফার্মেও তোমাদের একসঙ্গে দেখা গেছে।
সব বাজে কথা।
আমি নিজে দেখেছি।
আমি আমতা আমতা করে বললাম—কখন কোথায় কার সঙ্গে কোনো কাজে গেছি, ঠিক আছে। তাকে অন্যভাবে ভাবলে হয়? তেমন কিছু হলে বলব।
প্রমিশ?
প্রমিশ।
এই যাত্রায় সন্দীপকে কোনোক্রমে সামলানো গেল। কিন্তু আমার অস্থিরতা, উদ্বেগ আমি নিজেই চেপে রাখতে পারছি না। কোনো-না-কোনোভাবে তা বেরিয়ে আসছে।
মাঝে মাঝে রেলস্টেশনে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে বসে থাকি। যেখানে দুর্গা আর আমি প্রথম আলাপের দিনে বসে গল্প করেছিলাম। ভাবি এই বোধহয় দুর্গা কোনো একটা ট্রেন থেকে নামল। কিন্তু কোথায় দুর্গা? এত হাজার হাজার যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে যাচ্ছে, আসছে। অথচ বিশেষ একজনের দেখা নেই। আবার ভাবি দুর্গা নিশ্চয়ই পরের ট্রেন থেকে নামবে। নামে না। আবার পরের ট্রেন।
কখনো ভাবি—দুর্গা অসুস্থ হয়ে পড়ল না তো? ওর কোনো বিপদ হল না তো? কী করে জানব? প্রিয়জনের বিপদে আমি কীভাবে সাহায্য করব? মাঝে মাঝে চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করে—দুর্গা, তুমি কোথায়? তুমি কোথায়? আমি এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
কোনো কোনো সময় এমনও হয়েছে দুর্গা ভেবে কোনো একটি মেয়ের পেছনে পেছনে দ্রুত পায়ে হেঁটে গেছি। কাছে গিয়ে দেখি—মেয়েটি দুর্গা নয়।
একবার হাওড়া লোকাল প্ল্যাটফর্মে ঢোকার সঙ্গেসঙ্গে একটি মেয়ে ট্রেন থেকে নেমে হন হন করে ফ্লাইওভারের দিকে হেঁটে চলেছে। পেছন থেকে মনে হচ্ছিল দুর্গাই হবে। প্রায় একইরকম লম্বা, গায়ের রং, মাথার চুলও একইরকম। কাঁধে একই রকমের ব্যাগ। দুর্গা যেমন হাঁটে, ঠিক তেমনই লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে চলেছিল মেয়েটি। আমি পেছন পেছন গিয়ে মেয়েটির হাত ধরে বললাম—তুমি কোথায় গেছিলে?
মেয়েটি আমার দিকে ঘুরতেই বুঝলাম বড় একটা ভুল হয়ে গেছে। সঙ্গেসঙ্গে বললাম—ভুল হয়ে গেছে দিদি। আমি ভাবছিলাম আমারই এক পরিচিত বান্ধবীই হবে। মেয়েটি চিৎকার করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল; এমন সময় ভিড়ের মধ্যে থেকে এক লম্বা, কোর্ট-টাই পরা সুদর্শন ভদ্রলোক বললেন—ইন্দ্রাণী, আমি এখানে। এদিকে এসো।
লোকটির ডাকে মেয়েটি আমার দিকে কটমট করে তাকাতে তাকাতে ওঁর দিকে চলে গেল।
আমি লজ্জায় কোনোক্রমে অন্যদিকে দৌড়ে ভিড়ের মাঝে মিশে গিয়ে বাঁচলাম। ভাবলাম এবার বোধ হয় আমাকে কেউ বুঝতে পারবে না।
সেখান থেকে বেরিয়ে ফ্লাইওভার দিয়ে নামছি, এমন সময় দুর্গার সেই বান্ধবীর সঙ্গে দেখা। আমি এতটা খেয়াল করিনি। ওই আমাকে পেছন থেকে ডাকল—আপনি প্রিয়ব্রতদা না?
হ্যাঁ, আপনি?
আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি দুর্গার বন্ধু, ইলা।
ও আচ্ছা আচ্ছা। সেদিন প্ল্যাটফর্মেই আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। আসলে অল্প সময়ের জন্য তো?
এটা হয়।
সেদিন তো আপনার বন্ধুর চেষ্টায় বউটা বেঁচে গেছিল। কিন্তু বাচ্চাগুলোকে বাঁচানো যায়নি।
সব শুনেছি।
কার কাছ থেকে?
কেন, দুর্গার মুখে।
কখন?
এই কয়েকদিন ধরে। ওর মুখে আপনার সব কথা শুনেছি।
এই কয়েকদিন ধরে—মানে? ও কোথায় ছিল?
আমরা কয়েকজন মিলে বাঁকুড়ার এক পাহাড়ে বেড়াতে গেছিলাম। ওর মেসের সবাই, আর আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে। সবাই মেয়ে বন্ধু কিন্তু।
আমি তো জানতাম না। মানে আমাকে ও জানায়নি।
হঠাৎ-ই ঠিক হয়েছে। কেউ কাউকে জানাতে পারেনি।
একটা চিঠি লিখে দিয়ে গেলেও পারত। আমার যে কী টেনশন হচ্ছিল।
কার কাছে চিঠি লিখে যাবে? সবাই তো চলে গেছিলাম।
তবু কোনোভাবে জানালে ভালো করত।
ও চেষ্টা করেছিল, পারেনি। ও আমাদের সঙ্গে যেতে চাইছিল না, আমরাই একপ্রকার জোর করে নিয়ে গেছি।
কবে ফিরলেন?
এই তো ঘণ্টাখানেক আগে। ওরা যে যার বাসায় চলে গেল। আমি লাগেজটা রেখে বেরিয়ে এসেছি। শক্তিগড় যাব, আবার ফিরে আসব।
আমার গা থেকে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। দুর্গা ভালো আছে। যা আশঙ্কা করেছিলাম তা না হওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লাম।
আমার মনের আকাশে যে আঁধারি কালো মেঘ জড়ো হয়ে বিধ্বংসী কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাষ দিয়েছিল, সেই দুশ্চিন্তা দূর হয়ে মেঘমুক্ত পরিচ্ছন্ন নির্মল নীল আকাশ উঁকি দিচ্ছে। জীবনের যাত্রাপথে যে কুয়াশাঘন আবছা ধূসর বন্ধুর পথ এসে হাজির হয়েছিল, মুহূর্তের লহমায় সেই পথ শেষে মসৃণ যাত্রাপথ খুঁজে পেলাম। শুকনো, বিবর্ণ, আগাছাময় বাগান আবার বাসন্তী হাওয়ায় নতুন ভাবে চনমন করে উঠল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম—দুর্গা এখন কোথায়?
মেসেই ছিল।
তাহলে চলি এখন। এই বলে বেশ কয়েক পা চলেও এসেছিলাম, হঠাৎ ইলা পেছন থেকে এসে আমাকে ডেকে বলল—প্রিয়ব্রতদা, একটা জিনিস আপনাকে দিতে ভুলে গেছি।
একটা জিনিস?
হ্যাঁ।
কী বলুন তো?
ইলা ব্যাগ থেকে একটা চিঠি বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল—দুর্গা, এই চিঠিটা আপনাকে দিতে বলেছে।
দুর্গা চিঠি দিয়েছে?
এটা নিন। পরে পড়বেন এক সময়। আমার ট্রেন এসে গেছে। এখন চলি। এই বলে চিঠিখানা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল।
আমি চিঠিখানা পেয়ে আনন্দে-বিস্ময়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। আজকাল চিঠি সেরকমভাবে কেউ আর লেখে না। এখন টেলিফোনেই সব কথাবার্তা মিটে যায়। কাগজ কলম হাতে নিয়ে ছন্দে-কবিতায় সাজিয়ে গুছিয়ে চিঠি লেখার মতো এত সময় নেই। অনেকক্ষেত্রে সময় থাকলেও ইচ্ছেটা হারিয়ে যাচ্ছে।
অথচ আগেকার দিনে কত চিঠি লেখা হত! একজনের মনের বার্তাকে আর একজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য চিঠির বিকল্প আর কীই-বা হতে পারে? কত মানবী তার আপনজনের কাছ থেকে একটা চিঠির প্রত্যাশায় ডাকপিয়োনের যাত্রাপথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত! কত প্রেয়সী তার প্রিয়জনের কুশল সংবাদের জন্য একটা চিঠির আশায় কত দিন, কত রাত উৎকন্ঠা আর আবেগে কাঁদতে কাঁদতে বালিশ ভিজিয়েছে। আবার কখনো-বা একটামাত্র ব্যাথাতুর সংবাদে বানভাসী মানুষের মতো হাহাকারে সকলে ফেটে পড়েছে।
এইভাবে চিঠি আসে, খবর আসে। অন্যকে জানা হয়, চেনা হয়। তখন কাগজে মোড়া একটা খামের দাম কয়েক হাজার গুণ বেড়ে যায়। মনে হয় যারা ডাকপিয়োনের কাজ করে, একজনের গোপন বার্তা আর একজনের কাছে পৌঁছে দেয়, জীবনের হারজিতের খবরটা ঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব নেয়, তাদের চেয়ে মহৎ কাজ বোধ হয় হয় না।
এই চিঠিতে কী আছে? আমার হৃৎপিন্ডের শব্দটা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আমার এই প্রবহমান গতানুগতিক জীবনে এই চিঠি কী বার্তা নিয়ে এল? মনটা বড়ো উদাস হয়ে যায়। আমি আকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। আমি কী দেখছি—আকাশ? মেঘ? মুক্ত বিহঙ্গে উড়ে বেড়ানো বাঁধনহীন পাখির উচ্ছাস? নাকি অসীম নীলাকাশের পরিসর মাপার চেষ্টা করছি? সত্যিই কি কোনোকিছু দেখছি আমি? নাকি আমি দাঁড়িয়ে আছি, আর আমার কল্পনাবিলাসী মন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে উড়ে গেছে দুর্গার মনের আঙিনায়, ওর হৃদয় বাগানে?
আমি অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়েছিলাম। একজন যাত্রী দ্রুতপায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ধাক্কা লাগায় চিঠিখানা হাত থেকে পড়ে যায়। আমি তৎক্ষণাৎ ওটা তুলে নিয়ে প্ল্যাটফর্মের এক মাথায় ফাঁকা জায়গায় গিয়ে তা খুলে পড়তে লাগলাম। দুর্গা লিখেছে—
বর্ধমান ২ এপ্রিল ১৯৯২
প্রিয়ব্রত,
গত রবিবার আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে পিকনিকে গেছিলাম বাঁকুড়ার এক পাহাড়ের কোলে। সমতলভূমি থেকে উঁচু হতে হতে আকাশের কাছাকাছি এসে তার মাথাটা ঠেকেছে। আর কিছুটা হলে বোধ হয় আকাশকে ছোঁয়া যেত। সেখান থেকে সমতলের গাছপালা, ঘরবাড়িগুলোকে বেশ ছোটোই দেখায়। বিকেলের সূর্যালোকের স্বর্ণচ্ছটা যখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পড়ে, আর উলটো পিঠে তার পাতলা ছায়া যখন বিস্তৃত হয়, তখন যে কী অদ্ভুত রোমাঞ্চকর দৃশ্যের অবতারণা ঘটে তা বলে বোঝানো যাবে না।
প্রকৃতির মতো সুন্দরী নায়িকা বোধহয় হয় না। সে তার দুষ্টুমির চোখের ইশারায় মানুষকে কাছে টানে, আর সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে দেহমন উজাড় করে দেয়। তার মধ্যে কোনো ভণিতা নেই, কোনো চাতুরী নেই। যখনই মানুষ অবিবেচকের মতো নির্বিচারে তার ওপর অত্যাচার করেছে, সে প্রতিশোধ নিয়েছে তার বহুরূপী মূর্তিতে—কখনো বন্যায়, কখনো খরায়, কিংবা কখনো ভূমিকম্পে।
বিকেলে যখন পাহাড়ের একটি ঢালে বান্ধবীদের সঙ্গে বসে গল্প করছিলাম, তখন দেখছিলাম একপাল ভেড়া নিয়ে কয়েকটা ছেলে-মেয়ে পাদদেশের দিকে চলে গেল। তাদের নির্দেশ ভেড়াগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করছিল। এদের এত শৃঙ্খলাবোধ দেখে আমাদের দেশের আপামর জনগণের কথা মনে পড়ে। ওদের থেকে আমরা অনেককিছু শিখতে পারি।
হাঁটতে হাঁটতে একটা উঁচু টিলার কাছে এসে মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল। হালকা বাদামি আর হলুদ রঙের শাড়ি পরে পাহাড়টা দাঁড়িয়ে আছে। দূরে দূরে দাঁড়িয়ে তাল, খেজুর। ছোটো ছোটো মেরুদন্ডহীন ঘাসগুলি প্রায় সারা পাহাড় জুড়ে বসে আছে। আঁকাবাঁকা ভাবে মানুষের পায়ে চলা একটা পথ নীচের দিকে নেমে গেছে।
তোমার কথা আমার খুব মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল তোমাকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর চলে যাই যেখানে আকাশ মাটির সঙ্গে মিশেছে কিংবা সূর্য নিজেকে আড়াল করবার জন্য মুখ ঢাকে। মনে হচ্ছিল এরকম দু-একটা পাহাড় যদি আমাদের ওদিকে থাকত, তার কোলে একটা ঘর বানাতাম। মনের ক্ষতচিহ্নগুলোকে সারাবার এর চেয়ে ভালো জায়গা বোধহয় আর হয় না।
তুমি নদী খুব ভালোবাস তাই না? আমিও বাসি। কিন্তু তার পাড়ে যদি কোনো পাহাড় থাকে, একটা ঝর্নাধারা যদি তার গা বেয়ে ঠিকরে ঠিকরে পড়ে, তখন কী আনন্দ লাগে বল তো! তখন মনে হয় পাহাড়ের এই দিগন্তবিস্তৃত আকাশের নীচে বাকি জীবনটা কাটিয়ে যেতে পারলে বেশ ভালো হত।
শস্যশ্যামলা ভারতবর্ষের এই বৈচিত্রের কথা একবার ভাব তো! কোথাও পাহাড়, কোথাও সমতলভূমি, কোথাও পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল জায়গা, কোথাও-বা বৃষ্টিহীন মরুভূমি। কোথাও অনুর্বরা পাহাড়ি জঙ্গল, কোথাও নদীঘেরা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ। কোথাও সুন্দরী গোয়ার হাতছানি, কোথাও চা বাগিচায় মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার সূর্যোদয়ের অপূর্ব দৃশ্য। আমাদের দেশের প্রকৃতির এত প্রাচুর্যের মধ্যেও আমরা সংঘাত করি, একে অন্যকে সহ্য করতে পারি না।
তুমি যদি থাকতে দেখতে পেতে বাদামি রঙের এক-জাতীয় পাখি কেমন ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে পাথর কাটে, নুড়ি ভাঙে। এরা পাথরের মধ্যে কী খোঁজে? কী জানি? তুমি সঙ্গে থাকলে হয়তো বলে দিতে। বলে দিতে পাহাড়ি মেয়েরা দল বেঁধে কী ভাষায় গান গাইতে গাইতে চলে যায়।
একজন লোক সাপুড়েদের মতো কাঁধে ঝুলি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশের দিকে চলে গেল, বোধ হয় সাপুড়েই হবে। আমার খুব ইচ্ছে করছিল লোকটার থেকে সাপ খেলা দেখতে। কিন্তু বন্ধুরা বলল—ওরা নাকি কীসব মন্ত্রতন্ত্র, তুকতাক জানে, মানুষকে মোহিনীমন্ত্রে নাকি বশ করতে পারে। তাদের বশীকরণ মন্ত্রে নাকি লোকে ঘরবাড়ি ছেড়ে, প্রিয়জন ছেড়ে আর একজনের কাছে চলে যায়। তুমি এসব বিশ্বাস কর? আমাকে কেউ বশীকরণ মন্ত্রে তোমার থেকে কেড়ে নিলে তুমি কী করবে? তুমি থাকলে ওই সাপুড়ের সঙ্গে কথা বলতাম। সাপকে বশীভূত করার কৌশল জেনে নিতাম।
পাহাড়ের একেবারে গা ঘেঁসে বেশ কিছুদূরে কতগুলো কুঠরি দেখা যাচ্ছিল। আমাদের স্থানীয় গাইড বলেছিল এখানে কয়েকটা পাহাড়ি মুন্ডা পরিবার থাকে। কয়েক পুরুষ ধরে ওদের বাস। ওরা প্রচন্ড পরিশ্রম করতে পারে। এদের সহ্যশক্তিও প্রবল।
আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ওখানে যাবার। দেখতাম পাহাড়ের কোলে ওরা কেমন সংসার পেতেছে। কেমন ওদের জীবনযাত্রা? ওরা কী খায়? কী করে? কিন্তু কে নিয়ে যাবে? তুমি সঙ্গে থাকলে আমি কাউকে পরোয়া করতাম না। ওদের ওখানে বসে একটু পাহাড়ি জল খেতাম। ওদের মনটাকে বোঝার চেষ্টা করতাম। হয়তো ওদের খুব ভালো লাগত। হয়তো ওরা সমতলের মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে চায়, সখ্যতা করতে চায়, আত্মীয়তা করতে চায়।
জান প্রিয়ব্রত, তুমি সঙ্গে থাকলে আমি পৃথিবীর সব দুঃখ-যন্ত্রণা কেমন ভুলে যাই। তুমি কথা বলবে না, অন্যদিকে মন দেবে না, শুধু কোনো একটি কেসের আইনের ধারাগুলি নিয়ে ভাবতে থাকবে। তবু আমি তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন ভালোলাগা অনুভব করি।
একটা সত্যি কথা তোমাকে বলব? প্রত্যেক নারীর জীবনে একটা পুরুষ মানুষের বড়োই প্রয়োজন। তার মধ্যে আস্থা থাকবে, বিশ্বাস থাকবে, গভীরতা থাকবে। মান- অভিমানের মাঝে থাকবে বোঝাপড়া। সে স্বর্ণলতার মতো কাউকে আঁকড়ে ওপরে উঠতে চায়। সেই মনটির বড়ো অভাব। তার জীবনে হয়তো হাজার হাজার পুরুষ আসে। কিন্তু মনের মতো করে কাউকে পাওয়া হয়তো সবার ক্ষেত্রে হয় না।
তোমার জীবনে আমি এসে জানি না তোমাকে কতটা অনুপ্রাণিত করতে পেরেছি। আমি চাই তুমি আমার হাত ধরে পৃথিবীর সমস্ত পাহাড়সম বাধা পেরিয়ে এমন একটি আসনে উপনীত হবে যেখানে সবাই তোমাকে চিনবে, শ্রদ্ধা করবে। ভিড়ের মধ্যে এক নিশানায় তোমাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। তবে কোনো সস্তা চতুরতায় নয়, তোমাকে কঠোর পরিশ্রম করে তোমার প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে। আমি জানি তুমি পারবে। তুমি অবশ্যই পারবে।
প্রিয়ব্রত, আমার মনে হয় একটা চার চাকা গাড়ির সামনের দুটো চাকা হচ্ছে পুরুষ, পেছনের দুটো চাকা হল নারী। সামনের দুটো চাকা ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, তেমনি পেছনের দুটো চাকা ছাড়া গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। একটা পরিপূর্ণ জীবনের জন্য দুটোরই প্রয়োজন আছে।
পাড়ার একটা মেয়ের কথা আমার মনে পড়ে গেল। সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতে স্বামীর সঙ্গে রীতিমতো ঝগড়া করে একরকম চ্যালেঞ্জ নিয়ে চলে এসেছিল। ভেবেছিল নিজে যখন রোজগার করে তখন অন্যের কথামতো চলবে কেন? কিন্তু আজ! মেয়েটা একেবারে শুকিয়ে গেছে। অর্থের প্রতি তার আর কোনো মোহ নেই। কী হবে এই অর্থ? এখন সে বলে সে খুব ভুল করেছে। মেয়েরা যতই অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভরশীল হোক না কেন, তার দরকার একটা সংসার, বিছানা, চাদর। এ পৃথিবীতে স্বামী ছাড়া কেউ সবচেয়ে আপন হতে পারে না। সবাই কেমন মাংসলোভী নেকড়ের দৃষ্টিতে তাকায়। ছেলেটা আজও তাকে ভালোবাসে। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই তার সামনে যেতে পারছে না। আমি বললাম—‘সীমাদি, তুমি যাও। ও কিচ্ছু বলবে না। আর যদি কিছু বলেও থাকে, সে তো তোমার আপনজন, বলতেই পারে।’ কি আমি ঠিক বলিনি?
আমার এক মামাতো দাদা আছে। কলকাতায় থাকে। দাদা একটা রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কের রিজিওনাল ম্যানেজার। ববিতা বউদি একটা স্কুলে পড়ায়। বউদি বলে—‘দুর্গা, স্বামীর ভালোবাসা ছাড়া এ সংসার অন্তঃসারশূন্য। শুধু অর্থ দিয়ে ঘরবাড়ি হয়, ব্যবসা হয়; সংসার হয় না, সম্পর্ক তৈরি হয় না। পারস্পরিক ভালোবাসা ছাড়া, মনের মিলন ছাড়া সবই বৃথা, সবই মিথ্যা। সুর আছে, ভাষা আছে, বীণা আছে; তবু সেই বীণা রিনঝিন করে বেজে ওঠে না। ওভাবে সারাজীবন সাজানোই থাকে।’ হয়তো বউদি ঠিকই বলে, হয়তো ভালোবাসার অভাবে অনেক সংসারে শুধু ইঁট-বালি-সিমেন্ট দিয়ে বানানো ঘর আছে, মানুষ আছে, তবু কোনো সম্পর্ক নেই, কোনো ভালোবাসা নেই।
সেদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে দুটো শালিখ পাখি দেখলাম। লোকে বলে—জোড়া শালিখ দেখলে নাকি খুব ভালো। আমি এসব বিশ্বাস করি না। আমি যেটা বলতে চাই—এই দিগন্ত বিস্তৃত প্রকৃতির বুকে কত পাখি, প্রজাপতি, উইপোকা, নদী, আকাশ! তুমি কাছে থাকলে আমার হুড়হুড় করে মনে পড়ে যায় কত নাম না-জানা পাখির নাম, কত অজানা ফুলের রং। তুমি আমাকে শিখিয়েছ চাঁদ কীভাবে হাসে, মাটি কীভাবে গন্ধ ছড়ায়।
আমাদের বাড়ির পাশে বিমলকাকুদের একজোড়া হাঁস আছে। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। ওরা সারাদিন পুকুরে খেলা করে। ওদের কী ভাব! পুকুরের যেদিকে যায় একসঙ্গেই যায়। ওরা মাঝে মাঝে ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে একে অন্যকে আদর করে। মাঝে মাঝে অভিমানে একে অন্যের থেকে দূরে চলে যায়। আবার কাছাকাছি আসে, ভাব বিনিময় করে। মানুষও বোধ হয় এইভাবে রাগ-অভিমান, প্রেম-ভালোবাসায় ঘর বাঁধে, একে অন্যকে আঁকড়ে বেঁচে থাকে।
প্রিয়ব্রত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আমি আর ইলা কিছুটা নেমেছিলাম। ওই দিকটায় সচরাচর কেউ যায় না, বেশ নির্জন। থোকা-থোকা সাদা-হলুদ পাহাড়ি ফুলে ভরা। আমি কয়েকটা ফুল তুললাম। ইলা দুটো ফুল আমার খোঁপায় গুঁজে দিল। বেশ লাগছিল আমার। তুমি সঙ্গে থাকলে তোমাকে নিয়ে এই বিস্তৃত সৌন্দর্যঘেরা পাহাড়ের কোলে হারিয়ে যেতাম।
আরও কিছুটা নীচে একটা ছোট্ট গুহা মতো আছে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। কেউ এখানে লুকিয়ে থাকলে বোঝাই যাবে না। দেখলাম তিন চারটে ছেলে সেখানে বসে মদ খাচ্ছে। বয়স কুড়ি-বাইশের বেশি হবে না। ওরাও আমাদের মতো এখানে বেড়াতে এসেছে। আমাদের দেখে ওদের চোখের ভাষা বদলে গেল। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। পোশাক-আশাক দেখে মনে হল ওরা বড়োলোক বাবার বখাটে ছেলে। ইলা বলল—‘দুর্গা, চল এখান থেকে চলে যাই। ওরা সুবিধের নয়।’ আমি বললাম—‘ওদের এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওরা কিচ্ছু করতে পারবে না।’ আমরা এদিক-ওদিক ঘুরছিলাম। ইলা ইচ্ছেমতো ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছিল। হঠাৎ ছেলেগুলো এসে আমাদের রাস্তা আটকে দাঁড়াল, আর আজেবাজে কথা বলতে লাগল। মদ খেয়ে ওরা টলছিল, স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না। আমি ইলাকে বললাম—তুই এদের ছবিগুলো তুলে রাখ। বাসায় ফিরে এদের বাবা-মার কাছে ছবিগুলো পাঠিয়ে দেব।’ এই কথা শুনে ছেলেগুলো ঘাবড়ে গেল। হঠাৎ-ই আমাদের পায়ের কাছে বসে বলল—‘ভুল হয়ে গেছে দিদি। প্লিজ, বাড়িতে খবর দেবেন না। আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি।’ ওরা চলে যাওয়ার পর ইলা হাসতে হাসতে বলল—‘তুই ওদের বাবা-মাদের চিনিস?’ আমি বললাম—‘ধুর, চিনিই না। এমনি বাজিয়ে দেখছিলাম’।
আরও অনেক মজার মজার ঘটনা ঘটেছে, দেখা হলে বলব। তুমি থাকলে আমার খুব ভালো লাগত।
যাক, এতক্ষণ শুধু আমার কথা বললাম। তুমি কেমন আছ? আমাকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তা করছ। আমি সত্যিই দুঃখিত। যাওয়ার আগে তোমাকে বলে যেতে পারিনি। হঠাৎই প্রোগ্রামটা ঠিক হয়। আমি যেতেও চাইছিলাম না। সকলে এমন পীড়াপীড়ি করল যে আমি না করতে পারলাম না।
কী করছ তুমি? আমার জন্য মন খারাপ করছে? এই-তো আমি ফিরে এসেছি। জীবনানন্দ দাশের কবিতাগুলো নিশ্চয়ই এতদিনে পড়ে ফেলেছ। তোমাদের মেসের সামনে পলাশগাছটা নিশ্চয়ই নতুন সাজে ফিরেছে। উঠোনের ফুলের গাছগুলোতে নিয়মিত জল দেবে, সার দেবে। ওরাও খেতে চায়, ওদেরও পিপাসা পায়।
ও হ্যাঁ, তোমার টেবিলের ওপর আমি একটা ডায়েরি ফেলে এসেছিলাম। তাতে কতগুলো দরকারি ফোন নম্বর লেখা আছে। তুমি ওটা যত্ন করে গুছিয়ে রাখবে।
তুমি বেশি রাত অবধি জাগবে না। শরীর থাকলে, ইচ্ছে থাকলে, সফলতা আসবেই। অযথা চিন্তা কোরো না।
আমি বেড়ানোর ফাঁকে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী নাটকটা বেশ কিছুটা পড়েছি। এখনও শেষ হয়নি। যতটা পড়েছি, বেশ ভালো লেগেছে।
আজ এখানেই রাখি। কাল ইউনিভার্সিটিতে দেখা হবে। ভালো থেকো।
ইতি
তোমার দুর্গা
চিঠিটা পড়ে আমি এক বিস্ময়াভূত ভালোলাগায় তন্ময় হয়ে যাই। এক আশ্চর্য অনুভূতিতে আমার দেহ মন ভরে যায়।
বাসায় ফিরে ঘরে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। চিঠিটা বেশ কিছুক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরলাম। দুর্গার হাতের ছোঁয়া স্পষ্ট অনুভব করতে লাগলাম।
বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে শুয়ে থাকার পর উঠে বসলাম। চিঠিটা খুলে আগাগোড়া আবার পড়লাম। আবার রাখলাম, আবার পড়লাম। ওর প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা অক্ষর, প্রতিটা অনুভূতি অনুধাবন করার চেষ্টা করলাম।
এ এক অজানা স্বস্তি, অভিনব আনন্দ। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে ভালোবাসার এই পৃথিবীতে মৃত্যু আছে, শোক আছে। কোনো মানুষের সারাটা জীবন আলো-ভরা সুন্দর হয়তো নয়। মাঝে মাঝে আঁধার এসে হাজির হয়। কিন্তু তা বলে অন্ধকারটাই কি একমাত্র সত্যি? না, তা নয়। অনেক সুর, অনেক গন্ধ, অনেক রং, স্বপ্ন আর স্বপ্নভাঙার স্বাদ নিয়েই এ জীবন।
সন্দীপ এসে দরজায় কড়া নাড়তেই উঠে দরজা খুলে দিলাম।
ও জিজ্ঞেস করল—কী হল প্রিয়ব্রতদা, তুমি দরজা বন্ধ করেছিলে কেন?
শুয়েছিলাম।
এই অবেলায় শুয়েছিলে?
শোয়ার জন্য আবার বেলা-অবেলা?
তুমি তো এসময় শুয়ে থাক না, তাই।
না রে, শরীরটা ভালো লাগছে না, তাই শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।
কেন কী হয়েছে? জ্বর না পেট খারাপ?
মাথাটা ধরেছিল।
গ্যাস হয়েছিল নাকি?
হবে হয়তো।
তুমি শরীরের প্রতি একদম যত্ন নাও না। শুধু পড়াশোনা, এর ওর সুবিধে অসুবিধেয় ছুটে যাওয়া। এইভাবে চলতে থাকলে কোনদিন একটা বড়ো অসুখ বাধিয়ে বসবে।
তোরা তো আছিস।
আমরা কিছুই করতে পারব না। তুমি আমাদের কোনো কথাই শোনো না।
রাগ করিস না, আমি একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
তবু আমাদের কথা শুনবে না।
শুনব, শুনব। তোরা ছাড়া আমার আর কে আছে বল।
ঠিক আছে। তুমি এখন দরজা বন্ধ করে বিশ্রাম নাও। আমি বেরোচ্ছি।—এই বলে সন্দীপ দরজা টেনে বেরিয়ে গেল।
সন্দীপ বেরিয়ে যেতেই আমি উঠে দরজায় ছিটকিনি দিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। দুর্গার মুখটা আমার সামনে ভেসে ওঠে। জীবনের অন্ধকারময় অংশগুলো ভুলে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে, নতুন উৎসাহে জীবনগড়ার স্বপ্ন দেখতে লাগলাম।
এই চিঠিটা আমার কাছে পৃথিবীর অনেক কিছুর চেয়েও দামি। জীবনের এই ধূসর মরুপ্রান্তরে দুর্গা ছায়াশীতল মরুদ্যানের মতো তার নরম দু-খানি হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তার করস্পর্শে আমি আবার নতুন করে হাঁটতে শুরু করেছি। সমস্ত হতাশা, প্রতিকূলতা কাটিয়ে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার দৃঢ় সংকল্পে ব্রতী হয়েছি। আমি জানি—দুর্গা পাশে থাকলে কোনো বাধাই আমার সামনে স্থায়ী হয়ে দাঁড়াতে পারবে না, কোনো প্রতিবন্ধকতাই আমার চলার পথ চিরদিন অবরুদ্ধ করতে পারবে না।
মনে মনে বলে উঠলাম—
তুমি আছ বলে আঁধার ভুলে গিয়ে,
দুর্গম পথ, দুঃসহ সময় পেরিয়ে,
শীত আর গ্রীষ্মকে সহ্য করে,
দিনের পর দিন কাটিয়েছি।
আর বুঝেছি—তুমি একটি নাম শুধু নও,
এক প্রেরণা, বাঁচবার বার্তা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন