পরের দিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ, স্নান করে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম। সৌরাংশু আজ আর কোনো প্রশ্ন করেনি। কোনো কথাই জিজ্ঞেস করেনি। কোনো কৌতূহলী দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়নি।
আমরা বসে কফি খাচ্ছি আর মাঝে মাঝে ঘড়ির দিকে চোখ রাখছি। ও কখন আসবে? সত্যি সত্যি আসবে তো? এক উৎকন্ঠা, আশা-উদ্বেগের মধ্যে আমার প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে। প্রতিটি মুহূর্তকে মনে হচ্ছে এক-একটা দিন, এক-একটা বছর, এক-একটা যুগ।
বাইরের পুজোমন্ডপ থেকে নবমী পুজোর বাদ্যি-নিনাদ ভেসে আসছে। ত্রিশূলধারী দশভুজা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পিতৃগৃহে পূজিত হচ্ছেন। আমার দুর্গা? সেও তো কম কিছু নয়। দশভুজার মতো পৃথিবীর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার মহান কাজে ব্রতী হয়েছে। জীবনের সমস্ত প্রেম-ভালোবাসা-আবেগ দিয়ে প্রতিমুহূর্তে গবেষণা করে চলেছে। এর কৃতিত্বও কম কীসে?
এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজ।
আমি লাফিয়ে উঠে দরজা খুলতে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম সৌরাংশু হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে ভাবলাম—একটু বেশি আদিখ্যেতা হয়ে যাচ্ছে না তো? নিজেকে একটু স্বাভাবিক দেখানোর ভান করে সৌরাংশুর দিকে তাকিয়ে বললাম—এই সকাল বেলা আবার কে এল রে?
সৌরাংশু বলল—খুলে দাও, খুলে দাও। দিদি এসেছে। দিদির বেল দেওয়ার আওয়াজ এরকমই হয়।
এতটা পাংচুয়াল?
খুলে দেখো। আমার কথাটা মিলিয়ে নিয়ো।
আমি মনে মনে ভাবলাম—দুর্গার কথাটা তুই তুলে ভালো করেছিস। আমি মনে মনে চাইছিলাম, দুর্গা তার দেওয়া সময়েই এখানে আসুক। তার দুর্গা ঠিক আগের মতোই তার প্রতি বিশেষ আগ্রহী হোক। আগের মতোই তার চোখে চোখ রেখে বলুক—তুমি সঙ্গে থাকলে আর কোনো কিছুর পরোয়া করি না আমি।
দরজা খুলতেই এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক আমার দেশে ফেরার টিকিট দিয়ে গেল। সৌরাংশু বলে রেখেছিল।
টিকিট নিয়ে দরজা বন্ধ করে বললাম—কী রে তোর দিদির যে এত গুনগান করলি, ওনার তো দেখা নেই। সেজেগুজে সেই কখন থেকে বসে আছি।
আমি কথা শেষ করতে-না-করতেই আবার কলিং বেলের আওয়াজ।
সৌরাংশু বলল—এবার নিশ্চয়ই দিদি। দুর্গাদিকে এতটা হেলাফেলা কোরো না তো। দরজাটা খুলে দাও।
আমি বললাম—আমি পারব না। তুই উঠে খোল। আবার কে না কে এসেছে ঠিক আছে।
সৌরাংশু আমার দিকে তাকাতে তাকাতে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই এক গাল হাসি নিয়ে দুর্গা ঘরের মধ্যে আস্তে আস্তে ঢুকল। পরনে লাল সিল্কের শাড়ি। ম্যাচিং করা ব্লাউজ। কপালে লাল টিপ। গলায় সোনার নেকলেস। হাতে লাল নেল পালিশ। ঠোঁটে লাল রঙের হালকা লিপস্টিক।
ওর আগমনে বাড়ির পরিবেশটাই পালটে গেল। মনে হল মা দুর্গা মেয়ের সাজে বাপের বাড়িতে এসে পৌঁছোল।
আমি হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুতেই চোখ সরাতে পারছি না। ওর শান্ত শুভ্র মুখের মলিনতা, কাজল কালো চোখের গভীরতা, যৌবনের রূপমঞ্জরীতে আমি মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে :
নারী মানে গান—
নারী মানে কবিতা—
নারী মানে ভালোবাসা
নারী মানে একটি মন…
নারী মানে প্রেরণা…
আর নারী মানে শক্তি
নারী মানে দুর্গা।
দুর্গা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল—তৈরি তো?
আমি বললাম—তৈরি।
সৌরাংশু বলল—দিদি, প্রিয়দা তো ভোর থেকে উঠে সেজেগুজে বসে আছে।
দুর্গা বলল—তুই কি আমাদের সঙ্গে যাবি? গেলে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।
সৌরাংশু বলল—না দিদি, আজ আমার একটু কাজ আছে। পরে কোনোদিন তোমার সঙ্গে বেরোবো। তুমি কফি খাবে?
দুর্গা বলল—কিচ্ছু খাব না। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল—এবার বেরোনো যাক।
আমি ‘ওর’ পিছু পিছু ওর সঙ্গে গেলাম। গাড়িতে উঠে দুর্গা ড্রাইভারের সিটে বসতেই বললাম—ড্রাইভার আনোনি?
না, নিজেই ড্রাইভ করে এসেছি।
কেন?
ওকে আনলে আজকের আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে।
এটা তোমার বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না?
কোনো বাড়াবাড়ি নয়। আজ ড্রাইভ করতে করতে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে যাব।
যেদিকে মন চাইবে সেদিকে যাব।
আমি পাশে গিয়ে বসতেই ও গাড়ি স্টার্ট দিল।
আমি একটা স্বপ্নসাগরের মাঝে ভাসতে লাগলাম। পাশে আমার প্রথম প্রেমের পূজারিনী। স্বপ্ননগরীর ঝকঝকে রাস্তায় ওকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আবার আমার পুরোনো জীবনের সব কিছু ফিরে পেয়েছি। মনে হচ্ছে আমি কিছু হারাইনি। সব কিছু আগের মতোই আছে।
দুর্গা প্রথমেই এসে দাঁড়াল সাউথ ব্রিজ স্ট্রিটে একটি হিন্দু মন্দিরের সামনে। আমাকে বলল—চলো আমরা মন্দিরে পুজো দিয়ে আসি।
পুজো?
হ্যাঁ পুজো।
এই বলে আমাকে হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের ভিতরে নিয়ে গেল। যেতে যেতে বলল—এর নাম শ্রী মেরিয়ামান মন্দির। দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দু মন্দিরের আদলে এটি তৈরি।
বা! দারুণ তো। সত্যিই মনে হচ্ছে ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে কোনো মন্দিরে পুজো দিচ্ছি। কী ঝকঝকে তকতকে!
১৯৮০-এর দশকে এদেশের সরকার এটিকে জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে।
এ তো দারুণ উদ্যোগ।
আমি মাঝে মাঝে এখানে আসি। একা একা বেশ কিছুক্ষণ কাটাই। বেশ লাগে।
দেখলাম এদেশে বসবাসকারী প্রচুর ভারতীয় এখানে এসেছেন। অনেকে সপরিবারে এসেছেন পুজো দিতে। তাদের কেউ কেউ দুর্গাকে চেনে। কেউ কেউ জাতীয় পুরস্কার জয়ী দুর্গা সান্টের সঙ্গে আলাপ করতে এগিয়ে আসে।
তাদেরকে ‘হ্যালো’, ‘বাই’ এসব বলতে বলতে দুর্গা আমাকে বলে—তাড়াতাড়ি চলো, এখন সবাই এসে জড়ো হবে। প্রেসের, মিডিয়ার লোকজন চলে আসবে।
আমরা একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে বসলাম। ও মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এল।
আমি জানতে চাইলাম—একটা মসজিদ দেখলাম মনে হয়।
ওটা জামা-ই মসজিদ।
ও।
ভারতের করমন্ডল উপত্যকা থেকে আগত চুলিয়া মুসলিমদের ধর্মস্থান এটি।
তাই?
হ্যাঁ। আমার কয়েকজন বন্ধুও আছে।
খুব ভালো।
কী ভালো?
নিজের দেশের মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠা।
আমার সব ধরনের, সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে।
গাড়ি ঘুরতে ঘুরতে একটা নদীর ধারে এসে দাঁড়াল। দুর্গা বলল—এখানে বসে আমরা ব্রেকফাস্ট করব।
ব্রেকফাস্ট তো করেই বেরিয়েছি। তুমি কিছু খেতে চাইলে খাও।
তোমার ব্রেকফাস্ট খাওয়া জানা আছে। আজকে আমরা এই নদীর তীরে বসে একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করব।
তুমি কি ব্রেকফাস্ট বানিয়ে এনেছনাকি?
নিজে হাতে বানিয়েছি।
বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ড. ডুর্গা সান্ট নিজে হাতে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে এনেছেন?
তোমার কাছে তো এই পরিচয়ে আসিনি। আমার প্রিয় মানুষ, একান্ত কাছের মানুষের জন্য এইটুকু করব না?
তুমি সেই আগের মতোই রয়ে গেলে।
তুমিও তো আমাকে পেয়ে নিজের বউ-ছেলেকে ভুলে বসে আছ।
সত্যিই এ জীবনে যে তোমার সঙ্গে দেখা হবে ভাবতেই পারিনি।
আমার কিন্তু স্থির বিশ্বাস ছিল। একদিন-না-একদিন তোমার সঙ্গে দেখা হবে। সেদিন হয়তো…।
সেদিন হয়তো…কী?
আমাকে চিনতেই পারবে না বা না চেনার ভান করে এড়িয়ে যাবে।
এখন কী মনে হচ্ছে?
আমরা এ জীবনে একে অন্যের না হলেও বন্ধুত্ব তো থাকতেই পারে।
শুধুই বন্ধুত্ব?
শুধুই বন্ধুত্ব, এই বলে ও আমার গালে একটা চুমু খেল।
এই প্রথম দুর্গা আমায় চুমু খেল। কলকাতা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এই বিদেশের মাটিতে আমি দুর্গার প্রথম সোহাগ উপভোগ করলাম। ক্লার্কির বিস্তৃত যৌবনা নদীর কলকলতানে, উন্মুক্ত আকাশের নীচে আমি চোখ বন্ধ করে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। এই মধুর, মোহময়ী সোহাগ আমি পরমতৃপ্তিতে উপভোগ করতে পারলাম।
আমরা নদীর পাশে এসে বসলাম। দু-দিকে অট্টালিকা নগরীর মাঝে বয়ে চলা এই স্রোতধারার দিকে তাকিয়ে দুর্গা বলে—নদী-সাগরের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। এদের কোনো জাতপাত নেই। এরা কত উদার! কত শৃঙ্খলাবদ্ধ!
মাঝে মাঝে ওরা বেপরোয়া হয়ে গ্রাম-শহর সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
আমরাও মাঝে মাঝে বেপরোয়া হয়ে কাজ করি।
দুর্গা বাটারমাখানো ব্রেড, ডিম সেদ্ধ আর কলা নিয়ে এসেছে। খেতে খেতে ‘ও’ বলল—সেই ডায়মণ্ড হারবারের কথা মনে আছে?
মনে থাকবে না আবার। খাওয়া শুরু করার আগেই হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে সব খাবারই উড়িয়ে নিয়ে সমুদ্রে ফেলল।
সেদিন সারাবেলা বাদাম, চকোলেট আর জল খেয়েই কেটেছিল।
বেশ হয়েছিল।
কী বেশ হয়েছিল?
বেশ মজাই হয়েছিল।
চারদিকে প্রচুর তরুণ-তরুণী, প্রেমিক-প্রেমিকাদের ভিড়। কেউ কেউ মাছভাজা দিয়ে বিয়ার খেতে খেতে বান্ধবীর গায়ে ঢলে পড়ছে। কেউ কেউ আবার একা একা নিভৃতে বসে ডায়েরি নিয়ে কী যেন লিখে চলেছে।
দুর্গা বলল—এই জায়গায় এলে মুক্ত বিহঙ্গের নীচে বসে দু-কলম মনের কথা লিখতে ইচ্ছে করে।
তুমি তো অনেকগুলো বই লিখেছ।
সে তো সাবজেক্টের ওপর।
তাহলে?
এখানকার বিখ্যাত লেখক Koh Buck Song-এর Heartlands বইটি অসাধারণ। ওনার The Ocean of Ambition বইটিও অমূল্য সাহিত্যসৃষ্টি।
তুমি এত কাজের মাঝেও সাহিত্যচর্চা কর?
সাহিত্য ছাড়া বাঁচা যায়? এটা ক্লান্ত পথিকের আশ্রয়স্থল, ব্যর্থ প্রেমিকের শেষ সম্বল, মৃত্যুপথযাত্রীর মৃতসঞ্জীবনী সুধা।
তুমি কখন পড় এসব?
ঘুমোতে যাবার আগে। দেখবে আমার শোবার ঘরে ‘কো বাক সং’-এর বই যেমন আছে, তেমনি ভি. এস. নইপল, নিরোদ সি. চৌধুরি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়েরও বই আছে। যখন যেটা ভালো লাগে, সেটা পড়ি।
বাংলা না ইংরেজি?
দুটোই আছে।
তাই তো তুমি এতটা রোমান্টিক।
দুর্গা আমার হাতটা নিয়ে নিজের হাতের তালুতে রেখে বলল—বউকে খুব ভালোবাস না?
জীবনটা কাটানোর জন্য যা করতে হয়।
মানে?
মনে মনে তুমি আজও আমাকে…।
তুমি ইশিতাকে ঠকাচ্ছ?
না, ঠকাইনি। আবার এক-শো শতাংশ ভালোবাসতেও পারিনি।
এটাই তো ঠকানো।
এটা যদি ঠকানো হয়, আমার বলার কিছু নেই। যেটা বাস্তব, তাই বললাম।
এটা ঠিক নয়। যা পেয়েছ তাকে কেন সম্পূর্ণ দেবে না?
তুমি বলছ?
হ্যাঁ, আমি বলছি। তোমার ছেলে কেমন হয়েছে?
সায়ন বেশ হয়েছে। তুমি যেমন চাইতে, সেরকম।
আমি চাইতাম মানে?
তুমি বলতে না, আমাদের ছেলে হলে তাকে সাইনটিস্ট বানাবে।
তোমার মনে আছে?
আছে। সায়নকে তোমরা সাইনটিস্ট বানাও।
আমরা বানানোর কে বল? বাবা-মা হিসেবে চাইব সায়ন বড়ো হোক, সুখ্যাতি হোক। কিন্তু কী হবে, না হবে তা তো অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।
ইশিতা আর সায়নের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে না?
কোথায়?
যখন কলকাতায় যাব?
তুমি কলকাতায় যাবে? কবে যাবে? কখন যাবে?
এত উতলা হচ্ছ কেন? কোনোদিন হঠাৎ গিয়ে হাজির হব।
সেটা যেন খুব তাড়াতাড়ি হয়।
কয়েকটা পাখি দল বেঁধে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। একটা বড়ো ঢেউ এসে পাড়ের কাছে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেল। একমুঠো মুক্ত হাওয়া এসে আমাদের চোখ-মুখ ছুঁয়ে গেল।
আমরা এবার ওখান থেকে উঠলাম। সেখান থেকে মেরিনা বে। অসাধারণ সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি অঙ্গে রূপের পসরা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রমোদনগরীর এই হৃৎপিন্ড। দেশ-বিদেশের বহুপর্যটক এখানে এসে সৌন্দর্য উপভোগ করছে।
কয়েকজন পর্যটক আবার বাংলায় কথা বলছে। ওদের শরীরে বিকিনির পোশাক। বোধহয় বিদেশে এসে একটু খোলামেলা পোশাকে তথাকথিত স্বরচিত মর্যাদা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
আমরা জুরং বার্ড পার্ক, চায়না টাউন, র্যাফেলস প্লেসে ঘুরে ভিভো সিটিতে এসে বার্ড উঠলাম। দুর্গা বলল—এটা সিঙ্গাপুরের একটি বড়ো শপিং মল।
এখানে এলে কেন?
তোমাদের জন্য কিছু উপহার কিনব বলে।
আমাদের জন্য মানে?
তোমার, ইশিতা আর সায়নের জন্য।
এটা ঠিক করছ না। ইশিতা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে কে জানে?
এগুলো নিলে আমার ভালো লাগবে।
আমি আর কিছু বললাম না। দুর্গা যদি ভালোবেসে কিছু দেয়, দিক না। ওকে আঘাত করতে পারব না। একসময় আমার ওপর সমস্ত অধিকার ছিল ওর। অথচ আজ শুধু অনুরোধ! সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
আমার জন্য প্যান্ট-শার্ট, ইশিতার জন্য শাড়ি আর সায়নের জন্য প্যান্ট-শার্ট। ইশিতার জন্য একটা হীরের নেকলেসও কিনল। আমার কোনো আপত্তি শুনল না। আমি একটা শাড়ি কিনে ওকে দিলাম। সৌরাংশুর জন্য প্যান্ট-শার্ট কিনলাম।
আমি দুর্গার দিকে তাকাচ্ছি আর ভাবছি—কী আন্তরিকতা ওর! যার সঙ্গে বছরের পর বছর কোনো যোগাযোগ নেই, যে-সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে বহুদিন আগে ছিটকে গেছে, স্থায়ী হওয়ার আগে সম্পর্কের সমস্ত সুতো ছিঁড়ে গেছে, তা যেন আজ পুনর্জীবিত হয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
মনে মনে বললাম—দুর্গা, আজ আমি তোমাকে কোনো বাধা দেব না। তুমি যা চাইবে তাই হবে। তুমি আমার হাত ধরে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলো। আমি সাঁতার ভুলে গেছি, হাঁটতে ভুলে গেছি, লিখতে ভুলে গেছি।
দুর্গা বলল—তুমি চুপ করে গেলে কেন? এইসব কি তোমার পছন্দ হয়নি?
তুমি কিনেছ, পছন্দ হবে না আবার।
সে তো আমাকে বিড়ম্বনায় না ফেলার জন্য বলছ।
একদম নয়। সত্যিই উপহারগুলো খুব ভালো হয়েছে।
তোমার দেওয়া শাড়িটাও আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কলকাতা গেলে এই শাড়িটা পরেই তোমার বাড়িতে যাব।
সত্যি?
সত্যি। এই বলে দুর্গা হেসে উঠল।
আমিও ওর সঙ্গে হেসে উঠলাম।
ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা সেমিনারের সার্টিফিকেট আনতে গেলাম। দুর্গা সঙ্গে থাকায় কয়েক মিনিটের মধ্যে আমি সার্টিফিকেট পেয়ে গেলাম। সবাইকে কলকাতা যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে ওখান থেকে যখন বিদায় নিলাম তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। ক্ষিদেয় পেট চুঁই চুঁই করছে।
দুর্গা বলল—চলো, বাড়ি ফিরে যাই। বাড়িতে এসব রেখে খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম নিয়ে আবার বের হব।
কখন বের হবে?
সন্ধ্যের সময়। লিটল ইণ্ডিয়া ঘুরে, কতগুলো পুজোমন্ডপ ঘুরে বাড়ি ফিরব। আমি ওর কথায় সায় দিয়ে বললাম—তাই হবে।
দুপুরে খেয়ে-দেয়ে একটা ঘুম দিলাম। এদেশে এসে আজ একটু শান্তিতে বিশ্রাম নিলাম। মনে হল আমি আমার প্রিয়জনের কাছে আছি। এখানে কোনো ভয় নেই, দ্বিধা নেই, সংকোচ নেই। মনে হচ্ছে এখানে জীবনের বাকি অংশটা কাটিয়ে দিলে বেশ হত। লোকে নিন্দে করবে?—করুক; কলকাতায় আমার নামে ছি! ছি! পড়ে যাবে—পড়ুক; আত্মীয়স্বজনরা ভুল বুঝবে—বুঝুক; ও দেশে আমার চাকরিটা চলে যাবে—যাক। তবু আমার দুর্গার কাছে বাকি জীবনটা থাকতে পারব।
আমি আবার সব কিছু কেমন গুলিয়ে ফেলছি। ভালো-মন্দ বিচার করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল, কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়—তা বুঝতে পারছি না। আমি—প্রিয়ব্রত বিশ্বাস না আইনের অধ্যাপক—প্রিয়ব্রত বিশ্বাস—কোনটা আমার পরিচয়? কোনটা নিয়ে আমার জগত, আমার আমিত্ব—তা বুঝে উঠতে পারছি না।
দুর্গা এসে বলল—এবার ওঠো, সন্ধ্যে হয়ে এল।
উঠতে ইচ্ছে করছে না।
নাকি উঠতে চাইছ না।
মনে হচ্ছে সারাদিন, সারারাত এখানে শুয়ে থাকি।
আজ নবমী, ঠাকুর দেখতে যেতে হবে না?
আমার চোখের সামনেই তো দেবী দুর্গা দাঁড়িয়ে আছে।
—পাকামি হচ্ছে না?
একদম না।
আমি উঠে চা-টিফিন খেলাম। তারপর দুর্গা আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ঠাকুর দেখতে। একটা ঠাকুর প্রাঙ্গণ থেকে আরেকটা। দু-তিনটে দেখার পর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প করছি, এমন সময় ইশিতার ফোন।
হ্যালো, আমি বলছি। তুমি কোথায়?
ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছি।
সে তো বুঝলাম। সৌরাংশুকে ফোন করেছিলাম, ও এই নম্বরটা দিয়ে যোগাযোগ করতে বলল।
হ্যাঁ, এটা ওর আর একটা ফোন।
তুমি কার সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছ?
এখানে অনেক বাল্যবন্ধু আছে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না, এখানে এসে যোগাযোগটা হয়ে গেল। তুমি কখন ফিরলে?
দুপুরে। কাল তোমার ফ্লাইট ক-টায়?
সন্ধ্যের সময়। সায়নকে নিয়ে কাছাকাছি প্যাণ্ডেলগুলো ঘুরতে পার।
আজকে আর বের হব না। কালকে ওকে নিয়ে বের হব।
ঠিক আছে। রাখলাম। ভালো থাকবে।
ফোন বন্ধ করে দুর্গার সঙ্গে একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করলাম।
দুর্গা বলল—বউয়ের ফোন?
আমি কিছু বললাম না। দুর্গা বলল—এতে বিরক্ত হওয়ার কী হচ্ছে? স্বামীকে স্ত্রী ফোন করবে না?
আমরা বেশ কয়েকটা পুজো প্যাণ্ডেল ঘুরে ইশিতার খামারবাড়িতে যখন পৌঁছোলাম, তখন প্রায় সওয়া দশটা।
আমি বললাম—রাত হয়ে গেল, সৌরাংশুর বাসায় ফিরতে হবে।
তুমি আজ রাতে এখানে থাকবে।
আমি রাজি হচ্ছিলাম না। দুর্গা এসে আমার হাতটা ধরে বলল—একটা রাত মাত্র। কালকেই তো কলকাতা ফিরে যাবে। আবার কবে তোমার সঙ্গে একান্তে গল্প করার সুযোগ পাব জানি না, এ থেকে আমায় বঞ্চিত কোরো না।
আমি বললাম—সৌরাংশুকে জানানো দরকার, নাহলে ও আমার জন্য অপেক্ষা করবে।
ওকে বলে দিয়েছি।
কখন?
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে তুমি যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলে।
আমাকে বলনি?
এই তো বললাম।
খাওয়া-দাওয়া সেরে দুর্গা বলল—ছাদে যাবে?
এখন?
হ্যাঁ, এখনই।
কুয়াশাঝরা নির্লিপ্ত উদার আকাশ। চাঁদনি রাত। পুকুরপাড়ের ঝোপ থেকে পোকার ডাক, বাঁশ গাছের শিরশির স্বর, কালাং নদীর ওপার থেকে বয়ে আসা শীতল মুক্ত হাওয়া, দুর্গার লম্বা মুক্ত বেনী সেই হাওয়ায় বারবার মুখের সামনে সরে আসছে।
দুর্গার চোখে-মুখে আজ এক বিশেষ অভিব্যক্তি। ওর কাজল কালো চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বললাম—কী মনোরম এই রাত্রি! মানুষের সম্পর্কের নিবিড়তা, একটু আয়েস, একটু অবসর, একটু নিজেদের মতো করে সময় কাটানো, একটু বিশ্রামের জন্যই বোধহয় এমন মধুর রাত।
এমন রাত বারবার আসুক, বারবার স্মরণীয় হয়ে থাকুক।
তুমি একটু কাছে আসবে?
কেন?
এসো না।
ও কাছে আসতেই আমি ওর কপালে চুমু খেলাম।
ও শিহরিত হয়ে ওঠে। আমি বুঝতে পারছিলাম ওর সারা শরীর উত্তেজনায় কাঁপছিল। ওর চোখ-মুখের ভাষা পালটে যাচ্ছিল।
ও নিশীথ রাতের পুলকিত জ্যোৎস্নায় ছাদের ওপর পাক খেতে খেতে শেলির সেই বিখ্যাত উক্তিটি বলেছিল :
The sunlight calsps the earth,
And the moonbeams kiss the sea—
What are all these kissings worth,
If thou kiss not me?
আমি দুর্গাকে এতটা আনন্দিত হতে কোনোদিন দেখিনি। স্বতঃস্ফূর্ত, যৌবনা নদীর মতো উচ্ছ্বল জলতরঙ্গ, চাঁদনি রাতের মোহময়ী মূর্ছনায় এক অন্য দুর্গাকে দেখতে পাচ্ছি।
আমি স্থান-কাল-সম্পর্ক ভুলে দুর্গাকে কাছে টেনে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরতে চাইলাম। ‘ও’ সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে দূরে সরে গেল। বলল—আমাদের সম্পর্ক এই পর্যন্তই থাক। বন্ধুত্বের মাধ্যমে আমরা সারাজীবন কাটিয়ে দেব। প্রয়োজনে একে অন্যের পাশে দাঁড়াব। তুমি ইশিতা আর সায়নকে ঠকাতে পার না। পার না আমাদের পবিত্র ভালোবাসাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিতে।
আমি বললাম—সাবাস দুর্গা, সাবাস। এতক্ষণে আমার দুর্গাকে আমি ফিরে পেলাম। আমার দুর্গা যেমন ভালোবাসায় উদার হবে, তেমনি তা কালিমালিপ্তও হতে দেবে না।
এভাবেই আমরা বেঁচে থাকব। এই বলে সে কাছে এসে আমার হাত ধরে বলল—রাত অনেক হল। চলো, এবার ঘুমোতে যাই।
আমার শোবার ঘরে মাথার কাছে জানালাটা বন্ধ করে এসিটা হালকা করে চালিয়ে দিয়ে বলল—আমি পাশের ঘরে আছি। দরকার হলে ডাকবে।
নিশ্চয়ই ডাকব।
নবমীর রাত শেষ হতে চলল। পুব আকাশ ফিকে হতে শুরু করল। পৃথিবী আবার জাগবে। আবার একটা নতুন দিন শুরু হবে। আর আমি? দুর্গার বন্ধুত্বকে আঁকড়ে ধরে নতুন সম্পর্কের হাত বাড়িয়ে দেব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন