আমার দুর্গা – ২.৯

কালকা মেল। হাওড়া স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে দুর্গা কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করল। কামরার অনেকেই ‘দুগ্গা’ ‘দুগ্গা’ বলে কপালে হাত ঠেকাল। যারা প্রিয়জনদের ট্রেনে তুলতে এসেছিলেন তারা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল। হাওড়া স্টেশন জানাল—‘আপনার যাত্রা শুভ হোক।’

দুর্গার সাইড আপার বার্থ, আর আমার সাইড লোয়ার। আমি দুর্গাকে বলেছিলাম দু-জনেই লোয়ার বার্থ নিয়ে নিই। ও বলেছিল—‘আমি আপার বার্থেই যাব। লোয়ার বার্থে শুলে সকলে আড়চোখে তাকিয়ে থাকে। বড়ো অস্বস্তি লাগে।’

জানালার কাছে আমরা মুখোমুখি বসে আছি। ট্রেন ছুটছে দুর্বার গতিতে। তার গভীর চিন্তা আর সতর্কতা। এতজন যাত্রীর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বীরবিক্রমে ছুটে চলা। বহু দূর দূরান্তে কোনো এক স্টেশনে কিংবা সিগন্যালের লাল আলোর হুঁশিয়ারিতে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে একটু জিরিয়ে নেয়।

ছোটোবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে একবার মুম্বাই গেছিলাম। বড়ো হওয়ার পর আর বিশেষ কোথাও যাওয়া হয়নি। বাবা-মা অনেকবার আমাকে এদিক-ওদিক যাওয়ার জন্য বলেছে। কিন্তু পড়াশোনা ছেড়ে কোথাও যাইনি।

দুর্গা অবশ্য অনেকবার দিল্লি গিয়েছে কাকার বাড়িতে। তাই ওর অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে একটু বেশি। ট্রেনের মধ্যে কোন খাবার খেতে হবে, কোনটা কেনা যাবে, কোনটা কেনা ঠিক হবে না, ওর কথাতেই চলতে হবে।

দুর্গা বলে—জান তো, হঠাৎ কোথাও বেড়াতে গেলে বেশ ভালো লাগে। এই গতানুগতিক জীবনযাত্রা, ধরা-বাঁধা নিয়ম মেনে সকালে ওঠা কিংবা রাতে ঘুমোতে যাওয়া, দিনের বেলায় ইউনিভার্সিটি, রাতে রিসার্চ পেপার নিয়ে বসা—এইভাবে একঘেয়ে জীবন কাটাতে কাটাতে ভীষণ ক্লান্ত লাগে।

আমার তো ভীষণ ভালো লাগছে। আরও বেশি ভালো লাগছে তুমি সঙ্গে আছ বলে।

আমি ছাড়া কোথাও যেন যাও না।

কাছাকাছি কোথাও যাওয়া, আর দিল্লি যাওয়া এক হল?

আমারও ভীষণ ভালো লাগছে। এর আগে তো একা একা দিল্লি গেছি, এসেছি। কিন্তু তুমি-আমি একসঙ্গে একই কামরায়! আমার এখনও রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে—স্বপ্ন দেখছি না তো?

স্বপ্ন না দেখলে মানুষ বড়ো হবে কী করে? সম্পর্ক দানা বাঁধবে কী করে?

তুমি বুঝি স্বপ্ন দেখ?

দেখি তো।

কী স্বপ্ন শুনি।

আমরা দু-জন স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশ যাব। সেখানে কয়েকবছর কাটিয়ে দেশে ফিরে জমিয়ে সংসার করব।

দুর্গা হা হা করে হেসে উঠল।

সন্ধ্যা আসন্ন। কামরার লাইটগুলো দিনের আলোর অভাব পূরণের গুরুদায়িত্ব নিয়ে জ্বলে উঠল। জানালা দিয়ে চোখে পড়ে ট্রেনলাইনের দু-ধারে দাঁড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, ছোটো ছোটো টিলা আর পাহাড়গুলোর উঁচু মাথা।

একফালি জ্যোৎস্না জানালা দিয়ে ট্রেনের কামরায় এসে পড়েছে। মহাশূন্যে ভাসমান মেঘরাশি। কোনোটি কাশফুলের মতো সাদা, কোনোটি কালো-সাদা মেশানো ঘোলাটে। জ্যোৎস্নামাখা রাতে উঁচু উঁচু গাছ, পাহাড়, নদী নিশ্চিত নিদ্রায় মগ্ন।

আরও বেশ কিছু মাইল যাওয়ার পর সবুজ খেত দেখতে পেলাম। যতদূর চোখ যায় মাঠের পর মাঠ সুবজ খেত। গম, ভুট্টা, ডাল, সরিষা, বিভিন্ন সবজির ভান্ডার নিয়ে খেতগুলো দাঁড়িয়ে আছে। আর জ্যোৎস্নার মায়াবী আলো সেইসব শস্যখেতের ওপর পড়ায় এক অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য রচনা করেছে। মাঝে মাঝে সেই সবুজ খেতের ওপর দিয়ে যখন মৃদুমন্দ হাওয়া ঢেউ তুলে চলে যাচ্ছে, তখন মনে প্রশ্ন জাগে আমাদের দেশের মাটি এত উর্বরা হওয়া সত্ত্বেও, প্রকৃতির উপাদান এত সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এত বেকারত্ব কেন? কেন এত দরিদ্রতা?

দুর্গা বলে—আমরা শিক্ষিত বেকাররা চাষবাসে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। অথচ এটাই আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

মহাত্মা গান্ধির একটি উক্তি আমার মনে পড়ে। উনি এক জায়গায় বলেছেন :

There is enough employment in India for all who will work with their hands and feet honestly. God has given everyone the capacity to work and earn more than his daily bread and whoever is ready to use this capacity is sure to find work. No labour is too mean for one who wants to earn an honest penny. The only thing is the readiness to use the hands and feet that God has given us.

আজকের আধুনিক শিল্পব্যবস্থার যুগেও একথা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। একটি বড়ো কৃষিবিপ্লব প্রয়োজন। হয়তো সময়ের দাবিতে তা অচিরেই জন্ম নেবে।

তা ছাড়া শিল্প সম্প্রসারণের ফলে পরিবেশের ওপর যে ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ছে, তা তো কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। উষ্ণায়নের নিষ্ঠুর দন্তাঘাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ হারিয়ে যাচ্ছে।

এর জন্য প্রাণীজগতও আতঙ্কিত। বহু প্রজাতির প্রাণী আজ অবলুপ্ত, কোনো কোনোটা আবার অবলুপ্তির পথে।

সেমিনারের সব আলোচনা এখানে সেরে ফেললে ওইখানে বলব কী?

তাই?

দু-জনে হেসে উঠলাম।

প্যান্ট্রিবয়ের কাছ থেকে কফি নিয়ে দু-জনে চুমুক দিলাম। বেশ ভালো লাগল। চলন্ত ট্রেনে বসে জ্যোৎস্নালোকিত প্রকৃতিকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল দিনের পর দিন, রাতের পর রাত এভাবে দুর্গার মুখোমুখি বসে চা-কফি খেতে খেতে আর গল্প করতে করতে কাটিয়ে দিলে বেশ হয়।

দুর্গা বলল—কী অদ্ভুত তাই না? আজ সকালে এক জায়গায় বসে নিজের কাজ করেছি, এখন ট্রেনের মধ্যে এক জায়গায়, কাল এই সময় আর এক জায়গায়। এইভাবে মানুষ পৃথিবীটাকে চষে বেড়াচ্ছে। এই গ্রহ ছাড়িয়ে আর এক গ্রহ, আর এক নক্ষত্রকে নিয়ে গবেষণা করছে।

পাশের বার্থে কয়েকজন কলেজপড়ুয়া ছেলে-মেয়ে বাংলা গান নিয়ে বিশেষ করে আধুনিক বাংলা গান নিয়ে আলোচনা করছে। ওরা সবই কলকাতার বিভিন্ন কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, ম্যানেজমেন্ট পড়ার জন্য দিল্লির কোনো একটি ইনস্টিটিউটে যাচ্ছে।

বেশ মজা করছে ওরা। কলেজের কোন টিচার কীভাবে কথা বলে, কোন টিচার আড়চোখে মেয়েদের দিকে তাকায়, কোন ম্যাডাম পড়ানোর চেয়ে সাজগোজ নিয়ে বেশি ভাবেন, আরও কত কী!

কলেজে পড়াকালীন আমাদেরও দু-একজন সহপাঠী ছিল যারা এইসব নিয়ে বেশ মজা করত। কোনো টিচারের গলা নকল করা, কোন টিচার কীভাবে হাঁটেন, কোন টিচার কলেজ থেকে বেরিয়ে কার সঙ্গে রেষ্টুরেন্টে প্রায়শই যায়, কোন ম্যাডাম বাসে উঠলেই ঘুমিয়ে পড়েন ইত্যাদি। কলেজ জীবনের সেইসব ছেলেমানুষির মধ্যে নিছকই মজা ছিল।

দুর্গা বেশ কয়েকটা ফু%ট জুসের প্যাকেট কিনে ওদের প্রত্যেকের হাতে দিতে ওরা খুব খুশি হল। আনন্দ বলে ছেলেটা বলল—থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম।

দুর্গা বলল—ম্যাডাম নয়, দিদি।

নিবেদিতা বলে মেয়েটা বলল—কোথায় যাচ্ছেন দিদি? কোনো ইন্টারভিউ আছে?

একটা সেমিনার আছে।

কোথায় থাকবেন?

ওদের থাকার ব্যবস্থা আছে। তা ছাড়া আমার কাকার বাড়ি আছে। সেখানেও যেতে পারি। তোমরা কোথায় থাকবে?

কালিবাড়ি।

শুনেছি ওদের ব্যবস্থা খুব ভালো। কম খরচে ওখানে থাকা যায়।

আপনি ওখানে গেছেন নাকি?

আমি যাইনি, আমার বন্ধুরা অনেকে যায়।

আমি বললাম—তোমাদের কোনো পরীক্ষা আছে?

শৌভিক বলে ছেলেটি বলল—এম. বি. এ.-এর অ্যাডমিশন টেস্ট।

কোনো একটা স্টেশনে এসে ট্রেন থামল। কয়েকজন যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মে জলের ট্যাপ থেকে বোতলে জল ভরে আনল। কয়েকজন কর্তব্যরত রেল পুলিশকর্মী প্ল্যাটফর্মের মাথার দিকে ব্যস্তভাবে হেঁটে গেল। মুহূর্তে মুহূর্তে নারী কন্ঠের ঘোষণা—কোন ট্রেন কখন ছাড়বে, কোন ট্রেন কখন পৌঁছোবে।

দুর্গা বলল—তোমাকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। কিছু ভাবছ?

তোমার কথা ভাবছি।

আমি তো তোমার সামনে বসে আছি।

ভাবছি, কত সহজে মানুষকে আপন করে নিতে পার।

কেন, আমি কী করলাম?

এই ছেলে-মেয়েদের কেমন সহজ ব্যবহারে আপন করে নিলে।

এটা অবশ্য আমি পারি।

তবে একজনের ওপর তোমার যত রাগ, অভিমান।

একজনের ওপর তো রাগ-অভিমান করতেই পারি।

তাতে যে ওই একজন কষ্ট পায়।

প্রেম করলে একটু কষ্ট পেতেই হবে।

কিন্তু সে যে কষ্ট সহ্য করতে পারে না।

এরপর ভেবে দেখব। কিন্তু তাতে একজনকে কথা দিতে হবে।

কী কথা?

সে যেন আমার ওপর রাগ-অভিমান না করে।

শাহজাহানের মতো সবাই প্রিয়তমার জন্য প্রেমের জয়স্বরূপ তাজমহল নির্মাণ করতে পারে না, সবাই হয়তো প্রেমের ফসল স্বরূপ ঘর পায় না, সবাই হয়তো দেবদাসের মতো পার্বতীর জন্য নিজেকে শেষ করে দেয় না, তবু যাদের জীবনে প্রেম আসে রাতের জ্যোৎস্নার মতো কিংবা ভোরের কুয়াশার মতো, তারা সারাজীবন তা ভুলতে পারে না, পারবেও না।

তাজমহল না বানাতে পারুক, আমার শাহজাহান একটা কুঁড়েঘর তো বানাতে পারবে?

তা হয়তো পারবে।

হয়তো নয়, নিশ্চিতভাবে চাই।

ঘরটাই তো শেষ কথা নয়, ভালোবাসার টানেই তো সীতা একদিন রামচন্দ্রের হাত ধরে বনে এসে জীবনযাপন করেছিল, বেহুলা একদিন স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল।

সে তো পরিস্থিতির জন্য, স্বাভাবিক ক্ষেত্রে নয়।

আমি সমস্ত পরিস্থিতির কথা বলছি।

তেমন হলে দেখা যাবে।

আমি কিছু না বলে ওর দিকে চেয়ে রইলাম।

রাতের খাবার এসে গেল। দুর্গা আর আমি খেতে বসলাম। ভাজা, ডাল, চিকেন। সুস্বাদু হালকা মশলার রান্না। চেটেপুটে খেলাম। অবশেষে আইসক্রিম। দুর্গা আমার আইসক্রিমটা নিয়ে নিল। ও খুব আইসক্রিম পছন্দ করে। ওকে আমি পরম তৃপ্তিতে আইসক্রিম খেতে দেখলাম।

খাওয়া-দাওয়ার পর আমি আর দুর্গা মুখোমুখি বসলাম। প্রকৃতি ঘুমিয়ে পড়েছে। চারদিকে নি:স্তব্ধতা। আর অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে চলেছে এই যন্ত্রযান। এর কোনো ঘুম নেই, আয়েশ করার ফুরসত নেই। সমস্ত যাত্রীকে তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়ে তবে তার বিশ্রাম।

দুর্গা বলল—রাতের প্রকৃতি দেখতে বেশ লাগে। শূন্যে ভাসমান আকাশের নীচে সমস্ত উদ্ভিদ, প্রাণীজগত কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তারা কয়েক ঘণ্টা জিরিয়ে নেয়। আবার পরের দিন নতুন করে শুরু করে।

কিছু নিশাচর প্রাণী আছে যারা মানুষের আয়েসি ঘুমের সুযোগ নিয়ে মানুষের সুখের ঘরে থাবা বসায় তার স্বপ্নের বাসা ভেঙে চুরমার করে দেয়।

এরা একটু সুস্থভাবে চিন্তাভাবনা করলে সকলের ভালো হয়।

আমরা আশা করতে পারি একদিন মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে নিজেকে বদলাবে। বদলাতে হবেই।

শিক্ষার বিস্তারও প্রয়োজন।

শিক্ষার বিস্তারের চেয়ে নৈতিক শিক্ষার, মূল্যবোধের বিস্তার খুব দরকার। শুধু টাকার জন্য, অর্থ উপার্জনের জন্য শিক্ষার বিশেষ তাৎপর্য থাকে না যদি না তাতে শিক্ষার্থীর মূল্যবোধ, নৈতিকতার সমৃদ্ধি হয়।

আজকে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা না ঘটলে ভালো হয়।

দুর্গা জ্যোৎস্নালোকিত প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে গুন গুন করে গান ধরল—

তবু — মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে।

যদি — পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।

যদি — থাকি কাছাকাছি,

দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি—

তবু মনে রেখো।।

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম সেই গান। মনে হল এই গানের সুর ট্রেনের কামরা থেকে দু-ধারের মাঠঘাট ছাড়িয়ে সবুজ শস্যখেতের ওপর দিয়ে দূর দূর গ্রামে-শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হল সেই সুরের মুর্চ্ছনায় নদী কুলুকুলু শব্দে বইতে শুরু করল, মৃদু-মন্দ দখিনা বাতাস এসে চোখ-মুখে ছোঁয়া দিয়ে গেল। আর আমি? দুর্গার হাতে হাত রেখে বললাম—তুমি আমায় মুগ্ধ করে দিলে।

সারারাত দুলতে দুলতে ছুটে চলে যাত্রীভরতি আমাদের ট্রেনটি। সকালে ট্রেনটি যখন দিল্লি স্টেশনে পৌঁছোলো, তখন শহর জেগে উঠেছে।

আমি আর দুর্গা স্টেশনে নেমে একটা অটো করে ইনস্টিটিউটে পৌঁছে গেলাম। পার্লামেন্ট স্ট্রিট ধরে যাওয়ার সময় দুর্গা বলছিল—দেশের নীতি নির্ধারণের প্রাণকেন্দ্র। তারপর সুপ্রিম কোর্টের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ও বলল—ন্যায়-অন্যায় বিচারের সর্বোচ্চ ক্ষেত্র।

ইনস্টিটিউটে পৌঁছে দেখলাম ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রচুর লোক এসেছেন এই সেমিনারে অংশ নিতে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আরও তিনজন এসেছেন।

দুর্গার থাকার রুমটি ছিল গেস্ট হাউসের দ্বিতীয় তলে, আমার তৃতীয় তলে। আমার রুমে ছিল ওড়িশা থেকে আসা দীনেশ ত্রিপাঠী। ভদ্রলোক বেশ ভালো। সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। উনি বাংলা ভালো বোঝেন, বলেনও বটে।

ওঁর সঙ্গে থাকতে আমার বিশেষ কিছু অসুবিধে হয়নি। খাওয়া-দাওয়া, কথাবার্তা মোটামুটি একই ধরনের। এর আগে তিনি অনেক সেমিনারে যোগ দিয়েছেন। ওঁর কাছ থেকে কিছু পরামর্শ নিলাম।

দুর্গার রুমমেট ছিল আন্দামান থেকে আসা এক মাঝবয়সি মহিলা, বেশ উঁচু গলায় কথা বলেন। বিবাহ-বিচ্ছিন্না। বছর দশেকের একটি মেয়েও নাকি আছে, বাবার কাছে থাকে। অনিতা চৌধুরির নামে দিনে কতবার যে ফোন আসে, ঠিক নেই।

দুপুরে আমি আর দুর্গা একসঙ্গে লাঞ্চ সারলাম। দুর্গা বলল—আমার রুমমেটটি একটি জিনিস। হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরেই সারাক্ষণ ঘরে, বাইরে লনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমার সামনেই ড্রেস চেঞ্জ করছে। আমি আছি বলে মনেই করছে না।

উনি কি কোনো কলেজে-টলেজে পড়ান?

পড়ান না ঘুরে বেড়ান উনিই জানেন। শুনলাম তো ডিভোর্সি। সারাক্ষণ বয়ফ্রেণ্ডদের ফোন। বড্ড অস্বস্তিকর পরিবেশ, এর সঙ্গে থাকা যায়?

তুমিও আমার সঙ্গে বার বার কথা বলবে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে। দেখবে বেচারি বুঝতে পারবে তুমি এখানে একা আসনি। তোমারও লোকজন আছে। তখন একটু সমঝে চলবে।

ঠিক বলেছ। তুমি আমাকে মাঝে মাঝে ফোন করবে।

বেচারি বিরক্ত হয়ে রুম ছেড়ে না চলে যায়।

যাক না, চলে যাক। অসহ্য!

সেদিক থেকে আমার রুমমেটটি ভালো। অধিকাংশ সময় রুমে থাকেনই না। আর যতক্ষণ থাকেন, বিভিন্ন কাগজপত্র, ম্যাগাজিন আর ল্যাপটপ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।

খুব ভালো। উনি যখন থাকবেন না, তখন তোমার রুমে চলে যাব।

ঠিক আছে, উনি বেরিয়ে গেলে তোমায় ডেকে নেব।

তাই কোরো।

বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ইণ্ডিয়াগেটের কাছে গেলাম।

দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ। অনেকটা কলকাতার ময়দানের মতো। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহুমানুষ এসে ভিড় জমিয়েছে।

আমরা একটু এগিয়ে গিয়ে মাঠের ওপর সবুজ ঘাসের গালিচায় বসলাম। সারি সারি গাড়ি এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিকে ছুটে চলেছে। আর এই সবুজ কার্পেটের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকা মানুষজন আপন খেয়ালে গল্প করে চলেছে।

আমি বললাম—এই যে মেঘমুক্ত নীল আকাশ, সতেজ বাতাস, আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখির আনন্দঘন সুর—এর মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই, ভেজাল নেই। এগুলো লোক দেখানো নয়, অভিনয়ও নয়।

হ্যাঁ মশাই, এখানে নীলাম্বরী শাড়িতে মুক্ত আকাশ, সবুজ উদার প্রকৃতি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে উপভোগ করো, কেউ বাধা দেবে না।

পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যারা স্বপ্নে ছায়াকে চুম্বন করে, আয়নায় ছায়া দেখে ধরতে চায় কিংবা স্বপ্নালোকের আঙিনায় ছায়ামূর্তির ছবি আঁকে, বাস্তবের সঙ্গে এর তেমন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

আবার এই মানুষই তো মানুষের বিপদে ছুটে আসে। দুর্ঘটনাগ্রস্ত মুমূর্ষু যাত্রীদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, ডুবে যাওয়া নৌকোর যাত্রীদের উদ্ধারে কোনোকিছু চিন্তা না করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে, অগ্নিদগ্ধ বাড়িতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও উদ্ধারকাজ চালায়।

ঠিকই বলেছ।

একটা ঘাস ছিঁড়ে নাড়তে নাড়তে দুর্গা বলে—পৃথিবীটা একটা সুন্দর নকশার মতো, তাই না? একদিকে বাড়ি-ঘর, নদী-সমুদ্র; অন্যদিকে মালভূমি-গিরিখাত-পর্বত-অরণ্য। মাথার উপরে জামরঙা শাড়িতে নীল আকাশ, মাঠে মাঠে সবুজ-সোনালি খেত। যেন কোনো শিল্পী তার নিজস্ব ক্যানভাসে এ ছবি এঁকেছে।

দুটো চিপসের প্যাকেট নিয়ে আমরা একটা একটা করে খাচ্ছি। দেখলাম চারটে কুড়ি বাইশ বছরের মেয়ে হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গেঞ্জিগুলো এতই ছোটো যে মাঝে মাঝে তাদের পেট-পিঠ বেরিয়ে যাচ্ছে। হাতে দামি ঘড়ি, চোখে বিদেশি ব্র্যাণ্ডের সানগ্লাস।

এদের পশ্চিমি পোশাকের বাহুল্যতা দেখে মনে হয় শিক্ষাদীক্ষা, চিন্তাভাবনা, সততা আর অর্থনৈতিকভাবে আমরা পুরোপুরি ভরপুর হয়ে গেছি। আমাদের কোনো দারিদ্র্যতা নেই, অশিক্ষা নেই। শুধু পোশাক-পরিচ্ছদে পশ্চিমি ধাঁচ আনতে পারলেই আমরা সামগ্রিকভাবে উন্নত দেশগুলোকে হারাতে পারব।

দুর্গা বলল—যাওয়ার আগে কনোট প্লেস থেকে একটা জিনসের প্যান্ট আর টপ কিনব। আপত্তি নেই তো?

কোনো পোশাকই অশালীন নয়। অশালীনভাবে পরলেই দৃষ্টিকটু লাগে। তুমি যদি রাতের শোবার পোশাক পরে দিনের আলোতে ঘুরে বেড়াও, তাতে অস্বস্তি তো লাগবেই।

ধীরে ধীরে বিকেল নি:শেষিত হতে থাকে। পশ্চিমের হেলেপড়া সূর্য ঘর গোছাতে শুরু করে।

আমি আর দুর্গা সেখান থেকে বেরিয়ে প্রগতি ময়দানে গেলাম। কী সুন্দরভাবে সাজানো! ওখানে তখন বইমেলা চলছিল। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও একটা স্টল ছিল। প্রচুর বাংলা বই, বাংলা থেকে ইংরেজি, হিন্দি প্রভৃতি ভাষায় অনুবাদিত বইও কম ছিল না। বেশ কিছু রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি এবং আধুনিক বাংলা গানের সিডিও বিক্রি হচ্ছিল।

দুর্গা ‘এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট’-এর ওপর একটা বই কিনল। আমি পাইলির সিলেক্ট কনস্টিটিউশান অব দি ওয়ার্ল্ড বইটা কিনলাম। দেখলাম বহুদেশের সংবিধান সংকলন করে একটা মূল্যবান বই করা হয়েছে। দুর্গা একটা বিউটি গাইডের ওপর বইও কিনল।

সেখান থেকে বেরিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সামনে এসে এক মিনিট দাঁড়ালাম। দেশের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ বেদিমূলে এসে মাটিতে হাত রেখে প্রণাম করলাম।

দুর্গা বলল—কী করছ, লোকে দেখছে তো।

এই আদালতই আমাদের দেশের পরিকাঠামোকে ধরে রেখেছে। এই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা সারাবিশ্বে নজির সৃষ্টি করেছে।

সেখান থেকে অটো ধরে একটা বাঙালি হোটেলে গেলাম। দুর্গা বলেছিল— আজকে ইনস্টিটিউটে ডিনার করব না, কোনো একটা বাঙালি হোটেলে খেয়ে ফিরব।

আমি বললাম—এখন ভারতবর্ষের সব জায়গায় বাঙালি খাবার পাওয়া যায়।

অগত্যা যেতে হল।

খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা যখন ইনস্টিটিউটে ফিরলাম, তখন রাত ন-টা।

পরের দিন আমরা সেমিনারে অংশগ্রহণ করলাম। প্রায় ষাট জন প্রতিনিধি বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছে। ‘ওয়েটল্যাণ্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাণ্ড রিলেটেড ল’ শীর্ষক আলোচনাচক্রে বহুপরিবেশবিদ ও আইনজ্ঞের মহাসমারোহ।

দুর্গা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জলাভূমি ভরাটের ক্ষতিকারক দিকগুলো তুলে ধরে। আমি বর্তমান আইনের পরিবর্তন-পরিবর্ধনের প্রয়োজনীয়তা এবং নতুন আইন প্রচলনের পক্ষে জোর সওয়াল করলাম। সেমিনার হলের হাততালি আর আয়োজকদের মুখের অভিব্যক্তিই বলে দিয়েছিল আমাদের বক্তব্য ওঁদের মুগ্ধ করেছে, আলোচনা সমৃদ্ধ করেছে।

সেমিনার শেষ হলে ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা লালকেল্লায় গেলাম। এতদিন টেলিভিশনের পর্দায় আর বইয়ের পাতায় ছবিতে দেখেছি, আজ মুগ্ধ হয়ে দু-চোখ মেলে দেখলাম। নিখুঁত কারুকার্য আর অসামান্য স্থাপত্যকীর্তি!

দুর্গা বলল—এর আগে দিল্লি আসার সময় দূর থেকে দেখেছি। এখন প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

চাঁদনিচক মার্কেটে এসে একটু কেনাকাটা করলাম। ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্রের বিরাট পসরা। দুর্গা একটা ক্যামেরা কিনল।

আমি বললাম—খুব ভালো হয়েছে। বেশ কিছু ছবি তোলা যাবে।

সবার আগে তোমার ছবি তুলব।

এই জ্যান্ত লোকটাকে তোমার পছন্দ হল না, ছবি বানিয়ে রাখতে চাও।

দুর্গা আমার কান ধরে বলল—খুব পাকা হয়েছ না। তুমি কি চব্বিশ ঘণ্টা আমার কাছে থাক নাকি? যখন কাছে থাক না, তখন তোমার ছবিগুলো দেখব।

তোমার একটা ছবি আমি তুলব, তোমাকে না জানিয়ে।

মানে? কোন বদবুদ্ধি মাথায় এসেছে?

তুমি যখন প্রচন্ড রেগে যাবে, এটা-ওটা ছুড়ে মারবে, সেই মুহূর্তের ছবি তুলে রাখব, পরে দেখলে তোমার নিজেরই হাসি পাবে।

আচ্ছা, খুব মজা পেয়েছ না। এই বলে আমাকে আলতোভাবে কিল-ঘুসি মারতে লাগল।

আমি বললাম—কী হচ্ছে? লোকে দেখছে কিন্তু।

দেখুক।

সেদিন রাতে ইনস্টিটিউটের ক্যান্টিনেই ডিনার সারলাম।

পরের দিন সেমিনার শেষে আমরা লোটাস টেবিলে গেলাম। বেশ কয়েক ঘণ্টা কাটালাম। মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। আমাদের নিজেদের ঘর-বাড়ি, পরিবার-সংসার, নিজেদের পড়াশোনা ইত্যাদি থেকে যেন কয়েক হাজার মাইল দূরে অন্য পৃথিবীতে চলে এসেছি। বুঝলাম কেন মানুষ ঘরবাড়ি, আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে মন্দির-মসজিদ-চার্চ কিংবা অন্যান্য ধর্মস্থান, তীর্থক্ষেত্রে ঘুরে বেড়ায়।

দুর্গা আমার কাঁধে মাথা রেখে বলল—শোনো না, এখানে দু-জন থেকে যাই।

এভাবে? কী পরিচয়ে?

কে পরিচয় জিজ্ঞেস করতে আসছে?

নিজে নিজেকে প্রশ্ন করো।

এতসব বুঝি না।

আমি হাসলাম।

দুর্গা বলল—একটা মেয়ে ছিল সম্পূর্ণ অন্য পরিবারের, অন্য গোত্রের। শুধুমাত্র অগ্নিসাক্ষী রেখে বিয়ে করলেই তার জাত-কুল-পরিচয় সব বদলে যায়?

মেয়েদের একটা পরিচয় খুব প্রয়োজন। একটা সামাজিক, একটা আইনি পরিচয়ের অভাবেই খুব সহজে একটা মেয়ের গায়ে কলঙ্কের ছাপ লেগে যেতে পারে।

আজ শেষ দিন। সকাল থেকেই ব্যাগপত্র গোছানোর পালা। দুপুর বারোটার মধ্যে ইনস্টিটিউট থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এলাম। তারপর রওনা দিলাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে।

এবার পূর্বা এক্সপ্রেস। জানালার কাছে মুখোমুখি বসে আছি আমি আর দুর্গা। আমার সাইড লোয়ার বার্থ, আর দুর্গার সাইড আপার।

হুইশেল বাজিয়ে ছেড়ে দিল হাওড়াগামী পূর্বা এক্সপ্রেস। আমি আর দুর্গা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম ফাঁকা প্ল্যাটফর্মটির দিকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%