পরের দিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন বেশ বেলা হয়েছে। জানালা দিয়ে এক টুকরো রোদ্দুর ফিনকি কেটে বিছানায় এসে পড়েছে। রাস্তার ওপারে গাছ থেকে কয়েকটা শুকনো পাতা ঝরে হাওয়ায় উড়ছে, গড়াচ্ছে। এক ঝাঁক পাখি দল বেঁধে আপন খেয়ালে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। একটা প্লেন রৌদ্রতপ্ত ভাঙা আকাশকে ভেদ করে চলে গেল।
সৌরাংশু এসে বলল—গুড মর্নিং দাদা। ঘুম হয়েছে?
মর্নিং। খুব হয়েছে। কোনো অসুবিধে হয়নি তো।
কোনো অসুবিধে হয়নি বেশ শান্তিতে ঘুমিয়েছি।
যাকগে, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
মানে?
একটা দুশ্চিন্তা ছিল, তোমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা।
তুই একটু বেশি ভাবিস।
তোমার কোনো অসুবিধে হলে আমি খুব কষ্ট পাই দাদা। আজ এই জায়গায় পৌঁছোনোর পেছনে তোমার অবদানই সবচেয়ে বেশি।
হঠাৎ সৌরাংশুর ফোনটা রিনরিন করে বেজে উঠল। পরিচিত নম্বর। সৌরাংশু বলল—প্রিয়দা, বউদির ফোন। তোমাদের কলকাতার ল্যাণ্ডফোন থেকে।
তুই ফোনটা ধর।
আরে বউদি তো তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে।
তুই ধর না। আমি মুখটা ধুয়ে আসছি।
সৌরাংশু ফোনটা ধরে বলল—হ্যালো বউদি, কেমন আছ?
ওই পাশ থেকে উত্তর আসে—সৌরাংশু, তোমরা কেমন আছ? তোমার দাদা কোথায়?
দাদা এখুনি আসছে। তুমি আর সায়ন এলে ভালো লাগত।
তুমি কিছু মনে কোরো না। আমার যাওয়ার ইচ্ছেও ছিল। একটা গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্সের জন্য আজ বিকেলেই দিল্লি যাচ্ছি। সায়নকে বাবা-মার কাছে রেখে যাব। কালই ফিরে আসব। তোমার দাদা পরে যখন তোমার ওখানে যাবে, তখন সবাই মিলে যাব।
আমাকে আসতে দেখে সৌরাংশু বলল—তুমি একটু ধরো বউদি, দাদা এসে গেছে।
আমি ফোনটা ধরে বললাম—গুড মর্নিং ম্যাডাম।
ইয়ার্কি হচ্ছে! এত বেলায় ঘুম থেকে উঠে গুড মর্নিং বলা হচ্ছে!
হ্যাঁ, একটু বেলা হয়ে গেল। তোমাদের ব্রেকফাস্ট হয়েছে?
হয়েছে।
সায়ন কী করছে?
পড়তে বসেছে।
তুমি ক-টায় বের হবে?
ভাবছি একটু তাড়াতাড়িই বের হব।
তাই করো। হ্যাভ আ হ্যাপি জার্নি।
তোমার সেমিনার ক-টায় শুরু হবে?
বারোটায়।
একটু আগে বেরিও। সাবধানে থাকবে।
কোনো চিন্তা কোরো না, সৌরাংশু সবসময় আমার খেয়াল রাখে।
তবু সাবধানে থাকবে, বিদেশ বলে কথা।
সায়নকে একবার দাও।
সায়ন ফোনটা ধরে বলে—বাব্বা, তুমি কেমন আছ?
ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?
তুমি কবে ফিরবে? তোমাকে খুব মিস করছি!
আর কয়েকটা দিন মাত্র। এখানে যে কাজে এসেছি, তা মিটে গেলেই সোজা বাড়ি চলে আসব।
মার সঙ্গে কথা বলো।
ইশিতা ফোনটা ধরে বলল—তুমি না থাকায় ওর দুষ্টুমি বেড়ে গেছে।
তুমি ওকে বকাবকি করবে না।
তোমার আবদার পেয়ে পেয়ে ও দিন দিন জেদি হয়ে যাচ্ছে।
আর তুমি যখন আদর কর, তখন?
এখন রাখি। রাতে ফোন করব।
রাখো।
ফোনটা রেখে সৌরাংশুকে বললাম—বেশ দেরি হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি ব্রাশ করে আসছি।
বউদির সঙ্গে কথা বললে তোমার সময়জ্ঞান থাকে না।
তুই পাকামি বন্ধ করবি!
তাড়াতাড়ি ব্রাশ করে এসে দেখি চা প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সৌরাংশু বলল— আর একবার চাপাব!
একদম না, এতেই চলবে।
চা খেতে খেতে সৌরাংশুকে বললাম—সেমিনারে তুই থাকবি তো?
হ্যাঁ থাকব। কার্ড পেয়েছি।
ভালোই হবে।
সেমিনারের পাশাপাশি পরিবেশ সংক্রান্ত কাজের জন্য এদেশের সরকার এবং একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যৌথভাবে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়ে একটি পুরস্কার দিচ্ছে। শুনলে অবাক হবে সেই পুরস্কার পাচ্ছে এদেশে বসবাসকারী একজন বাঙালি।
বাঙালি?
ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে।
আগে থেকে ছিল?
না, এখানে এসে পরিচয় হয়েছে। উনি আমার দিদির মতো।
দিদি? মানে মহিলা?
হ্যাঁ, তাই। তোমার সঙ্গে আজ আলাপ করিয়ে দেব। খুব ভদ্র আর রুচিশীলা। কথা বললেই বুঝতে পারবে।
তুই যখন বলছিস তখন নিশ্চয়ই উনি ভালো মানুষ, গুণী মানুষ।
চা খাওয়ার পর সৌরাংশু বলল—তুমি এখন ব্রেকফাস্ট করবে না দাড়ি কামাবে?
এখন ব্রেকফাস্ট করে নিই। তারপর দাড়ি সেভ করে স্নান করে নেব। তুইও তো ব্রেকফাস্ট করবি?
হ্যাঁ, নিয়ে আসছি।
আমি একদৃষ্টিতে সৌরাংশুর দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। কত দায়িত্ব আর কর্তব্যের মাঝেও তার উপকারী মন এক সতেজ চেতনার ডানায় ভর দিয়ে ভেসে বেড়ায়। আজকের দিনে যেখানে বহুক্ষেত্রে ভাই ভাইয়ের প্রতিষ্ঠার জন্য সামান্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় না, অনেকক্ষেত্রে অবজ্ঞা আর অবহেলায় বৃদ্ধ বাবা-মা বৃদ্ধাশ্রমের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়, সেখানে বন্ধুর জন্য এই স্বার্থত্যাগ সত্যিই ব্যতিক্রমী ঘটনা।
মাঝে মাঝে মনে হয়,—প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষেরা অনেক ভালো ছিল। বনের ফলমূল আর পশুপাখির কাঁচা মাংস আগুনে ঝলসে সকলে ভাগ করে পরমানন্দে দিন কাটাত। কী সহজ সরল জীবনযাত্রা ছিল তাদের! আজকে মানুষ যত বেশি সভ্য হয়েছে, শিক্ষায় আর অর্থে যত বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে, চন্দ্রাবতরণ থেকে নক্ষত্রযুদ্ধের পরিকল্পনা করছে, ততই সে নিজের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বাইরের বিশ্বকে সে আপন করেছে, কাছে টেনেছে, কিন্তু আপন হৃদয়ের হৃৎপিন্ডের মৃদু শব্দকে অনুভব করতে শেখেনি; বুঝতে পারেনি তার মনন জগতের প্রকৃত তৃষ্ণা। সে জীবনের চাওয়া-পাওয়ার কঠিন পাটিগণিতের সূত্রের মধ্যে আবর্তিত হতে হতে ধীরে ধীরে আপন হৃদয়ের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যোগসূত্রহীন ছোটো ছোটো দ্বীপের মতো হয়ে উঠেছে।
কখনো কখনো ভাবি—মানুষের মন যদি অনুভূতিহীন জড় পদার্থে পরিণত হয়, তাহলে সে বাঁচে কীসের জন্য? এই বাড়ি, গাড়ি, অর্থের পেছনে ইঁদুর-দৌড় কার জন্য? আমাদের সমাজে ঘটা বহু ঘটনার অন্তরালে যে কত রহস্য লুকিয়ে থাকে, মুখোশের আড়ালে সমাজের কেষ্টবিষ্টুদের যে নোংরা কীর্তিকলাপ স্তূপীকৃত হয়ে থাকে, তার কতটুকুই বা প্রকাশ্যে আসে?
মনে হয় আমরা সত্যি-মিথ্যা, বাস্তব-অভিনয়, খাঁটি-ভেজালের সীমান্তরেখায় দাঁড়িয়ে আছি। কখনো কখনো এর তারতম্য ঘটে। আর তখনই ঝুলি থেকে বেড়ালটা বেরিয়ে পড়ে। সবার সামনে মুখোশটা খুলে যায়।
সৌরাংশু ব্রেড-কাটলেট আর এক গ্লাস করে গরম দুধ নিয়ে হাজির।
খেতে খেতে বললাম—খাওয়া-দাওয়ায় কলকাতার সঙ্গে এখানকার বিশেষ কোনো ফারাক নেই, তাই না রে?
এগুলি ইন্টারন্যাশন্যাল সিটি। সবরকমের খাবার পাওয়া যায়। বাঙালিদের প্রিয় মাছ-ভাত এখানে ভালোই মেলে।
আর সিঙ্গাপুরি কলা? এখন লোকাল সিঙ্গাপুরি কলায় কলকাতা ছেয়ে গেছে।
তাই না?
একেবারে তাই।
সৌরাংশুর ড্রইং রুমটা বেশ সাজানো-গোছানো। দেওয়ালের গায়ে একটি অসাধারণ ছবি। একটি গ্রাম, একটি কুঁড়েঘর আর উঠোনের এক কোণে একটি গোরু বাঁধা আছে। তার শিশুসন্তানটি মায়ের দুধ খাচ্ছে। কী তাৎপর্যময় এই ছবি! চিরন্তন সত্যের এই ছবি! মাতৃস্তন্য পান করে সমস্ত মানুষই তো বড়ো হয়ে ওঠে। মাতৃস্নেহের বিকল্প আজও হয়নি। এই নিখাদ পবিত্র সম্পর্কের কোনো তুলনাই হয় না।
চায়ের টেবিলের মাঝে রয়েছে ছোট্ট একটা ফুলদানি। বিভিন্ন আকৃতির কৃত্রিম ফুলে বেশ দেখাচ্ছে এটি।
সৌরাংশু বলল—দাদা, জয়দীপদার কথা মনে আছে?
জয়দীপ মুখার্জি?
হ্যাঁ, প্রেসিডেন্সি কলেজ, ইকনমিকস।
মনে থাকবে না আবার, শনি-রবি হলেই তো মেসে আমার ঘরে এসে আড্ডা মারত।
‘ও’ এখন কোথায় আছে?
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে।
বা! দারুণ খবর। সেদিন কাগজে ওর একটা ইন্টারভিউ বেরিয়েছিল।
হ্যাঁ। আমাকে দিন তিনেক আগে ফোন করেছিল।
কী বলল?
ভালো ইনস্টিটিউট থেকে তেমন অফার পেলে এদেশে চলে আসবে।
জয়দার ফোন নম্বরটা আছে?
আছে। পরে নিয়ে নিস।
ও কি মেমসাহেব বিয়ে করেছে নাকি?
তাই শুনেছি। কোনোদিন দেখা হয়নি, কথাও হয়নি। উনি নাকি হিউম্যান রাইটসের ওপর কাজ করেন।
আমি বললাম—তোর অমিতকে মনে পড়ে?
অমিত চট্টোপাধ্যায়?
হ্যাঁ।
কোঁকড়ানো চুল, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, হাই পাওয়ারের চশমা।
একদম ঠিক ধরেছিস।
ওর যা হাবভাব ছিল, যেন কত বড়ো কেউকেটা। ওর রেজাল্ট তো জানি।
ও এখন কোনো একটি দপ্তরের ডিরেক্টর হয়েছে।
ডিরেক্টর! কী বলছ তুমি?
ইশিতা কোথায় যেন শুনেছে। সেদিন বলছিল।
আর আমার কিছু বলার নেই।
আমি বললাম এসব কথা পরে হবে। এবার আমাদের স্নান করে খেয়েদেয়ে তৈরি হতে হবে।
সৌরাংশু বলল—যাচ্ছি। তারপর বলল—সন্দীপ কী করছে, জান?
অনেকদিন ওর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। কেন, কী করছে?
ও সেদিন ফোন করেছিল। বলল এস.এস.সি. দিয়ে মেদিনীপুরের কোনো একটি গ্রামের স্কুলে চাকরি পেয়ে ওইখানে চলে গেছে।
অথচ তোদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছিল সন্দীপ দলুই।
ও অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে পড়াশোনা করেছে।
এখনও সময় আছে।
বিয়ে করে ছেলেপুলে মানুষ করছে।
গড়পড়তা বাঙালির মতো জীবনযাপন।
তারপর সৌরাংশুকে বললাম আর দেরি নয়। তুই এইসব ভাব। আমি স্নান সেরে আসছি। এই বলে বাথরুমে ঢুকলাম।
বেশ স্নান করলাম। বিদেশি জলের স্বাদ আর মাত্র কয়েকদিন নিতে পারব। তারপর আবার সেই পরিচিত কলকাতা। সেই রাস্তা, তিন কামরা ফ্ল্যাট, কোলাহল। দাড়িটা কামানোর পর বেশ ভালো দেখাচ্ছে। শরীরের আনাচে কানাচে একটু-আধটু মেদ জমলেও মোটের ওপর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বলা যায়। ছেলে-বউ-সংসার আর চাকরি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত প্রিয়ব্রত বিশ্বাস অনেকদিন নিজের শরীরটাকে তেমনভাবে দেখেনি। আজ প্রাণভরে দেখছে। সুঠাম শরীরের চেকনাই এখনও অনেকটা আগের মতোই আছে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে সৌরাংশুকে বললাম—তাড়াতাড়ি করিস। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
তোমার টেনশন হচ্ছে, তাই না?
সব ব্যাপারে ইয়ার্কি করিস না।
আচ্ছা ঠিক আছে বাবা, আমি যাচ্ছি। দু-মিনিটেই আমার হয়ে যাবে।
খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা যখন বাড়ি থেকে বের হলাম তখন পাক্কা এগারোটা বাজে। হলুদ-সাদা স্ট্রাইপের শার্টের ওপর মেরুন রং-এর ব্লেজার। সৌরাংশু পরেছিল মেরুন শার্টের ওপর অ্যাশ রং-এর ব্লেজার, সৌরাংশুকে বেশ স্মার্ট, বুদ্ধিদীপ্ত লাগছিল।
সৌরাংশু বলল—দাদা, তোমাকে দারুণ হ্যাণ্ডসাম দেখাচ্ছে। তার ওপর তোমার গোল্ডেন ফ্রেমের চশমায় তোমাকে আরও স্মার্ট দেখাচ্ছে। বউদি দেখলে না হাঁ করে তাকিয়ে থাকত।
তোর বউদির না গা-সওয়া হয়ে গেছে। বরং এবার কলকাতা গেলে তোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
তাই?
তাই।
গাড়ি বেশ জোরেই চালাচ্ছে সৌরাংশু। একটি মোড়ের কাছে আসতেই রবীন্দ্র-সংগীতের সুর ভেসে এল। ও বলল—দাদা, আজ সপ্তমী। এখানে বাঙালিরা একসঙ্গে দুর্গাপুজো করছে। সন্ধ্যেবেলায় আসব।
আমার মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল। দুর্গাপুজো। সপ্তমীর সকাল। অথচ আমি কলকাতায় নেই। কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় পুজো, প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে ঠাকুর দেখার লাইন, বন্ধুদের সঙ্গে সকাল থেকেই আড্ডা, বিকেলে দুর্গার সঙ্গে বের হওয়া, ঠাকুর দেখতে গিয়ে রূপসী সুন্দরীদের সঙ্গে চোখাচোখি, বাঁকা চোখের ইশারা, লাল ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি।
দু-দিকে উঁচু উঁচু অট্টালিকা। যেন কোনো স্বপ্নপুরীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কালাং নদীর পার বরাবর আমরা যাচ্ছি। নদীটির দুই পাড় বরাবর সুন্দর শহর গড়ে উঠেছে।
সৌরাংশু বলল—এই নদীই এদেশের দীর্ঘতম নদী।
এতে মাছ ধরে না।
ধরে তো, কলোনি গড়ে ওঠার আগে এদেশের আদি অধিবাসীরা এই নদীর তীরে বসবাস করত এবং নদীতে মাছ ধরে জীবনযাপন করত।
ওরা ওরাং কালাং নামেই পরিচিত।
তুমি জানলে কী করে?
কোনো একটা জার্নালে পড়েছি।
তখন জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ছিল এই অধিবাসীরা।
তারপর?
১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে স্ট্যাম্পফোর্ড র্যাফেলস এদেশের মাটিতে পদার্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে এদেশের চেহারা বদলাতে থাকে। এখন বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন এদেশে এসে বসবাস করছে।
বোধহয় পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশেই এই প্রাচীর ভেঙে সারা বিশ্বের সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
কিছুটা গিয়ে একটি বাঁক ঘুরেই আমাদের গাড়িটি দাঁড়িয়ে পড়ল, সৌরাংশু বলল—দাদা, এসে গেছি। এবার নামতে হবে।
আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। দেখলাম বিশাল আয়োজন, সেমিনার হলের বাইরে বিভিন্ন দেশের পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আমি দেখলাম ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রয়েছে। তাতে আমাদের সুন্দরবনের কুমির প্রকল্প, জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের ছোট্ট বর্ণনা রয়েছে।
সৌরাংশু তার ইনস্টিটিউটের অধিকর্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। বেশ অমায়িক ভদ্রলোক। কোনো ভনিতা নেই, অহংকার নেই। ইণ্ডিয়া সম্পর্কে ওঁর সম্যক ধারণা আছে।
আমি বললাম—প্রফেসর লি., হ্যাভ ইউ এভার গন টু ইণ্ডিয়া?
ইয়েস, ইন 2008
হোয়ার হ্যাভ ইউ গন?
যাদবপুর ইউনিভার্সিটি, জহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি। দ্যাট টাইম আই ওয়েন্ট টু দার্জিলিং।
দার্জিলিং?
ইয়েস, ওয়াণ্ডারফুল প্লেস, ইটস দ্যা গিফট অব গড।
নেক্সট টাইম, প্লিজ হ্যাভ অ্যা নাইস মিট ইন কলকাতা।
ও সিওর।
ভারতবর্ষ থেকে আরও তিনজন গেছিলেন। একজন পুনের, একজন কেরালার এবং তৃতীয় জন উড়িষ্যা থেকে। সকলের সঙ্গে আলাপ হল। ভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদের অনেকের সঙ্গে কথা হল।
সেমিনার ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক বারোটায় শুরু হল। পঞ্চম বক্তা হিসেবে আমি পরিবেশের স্বাস্থ্য এবং আইনি ব্যবস্থার সম্পর্কের ওপর বললাম। সারা বিশ্বজুড়ে একটি ‘কমন ল’ আবার আঞ্চলিক ভিত্তিতে ‘মিউনিসিপ্যাল ল’-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বললাম। বক্তব্যের শেষে বেশ জোরালো হাততালিও জুটল।
তিনটে পর্যন্ত সেমিনার চলার পর সেদিনের মতো শেষ। বাকি প্রতিনিধিরা আগামীকাল বলবেন, তবে এক ঘণ্টার বিশ্রামের পর ঠিক চারটায় অ্যাওয়ার্ড প্রদানের অনুষ্ঠান।
সেমিনার হল থেকে বেরিয়ে লনে দাঁড়িয়ে আমি আর সৌরাংশু কথা বলছিলাম। উলটো দিকে বেশ বড়ো এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব সিঙ্গাপুর। সেই মিউজিয়ামের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে সৌরাংশু বেশ গুছিয়ে বলছিল। আমি সেইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর কথা শুনছিলাম। বারবার ঘোষণা হচ্ছিল ডুর্গা সান্ট-এর নাম। পরিবেশ রক্ষার ওপর কাজের জন্য সেদেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার।
সৌরাংশু বলল—অনুষ্ঠানের পর দিদির সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেব।
—অনেকবার তো ওনার গুণকীর্তন শুনলাম। আলাপ না করলে চলে?
বিকাল চারটে। সেমিনার হল কানায় কানায় পূর্ণ। আমরা পেছনের সারিতে গিয়ে বসলাম। প্রেস, ইলেক্ট=নিক্স মিডিয়া ছেয়ে গেছে। এমন রাজকীয় অনুষ্ঠান আমি এর আগে দেখিনি।
মঞ্চে দেখা গেল ডুর্গা সান্টকে। চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছর বয়সী, মাঝারি গড়ন। জিনসের প্যান্ট, ব্লেজার, দামি চশমা, মুখমন্ডল থেকে একটা জ্যোতি ছড়াচ্ছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে আমার বহুদিনের চেনা কাছের কোনো মানুষ।
ডুর্গা সান্ট যখন ধন্যবাদসূচক বক্তব্য রাখছেন তখন কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে এই কন্ঠস্বর আমার চেনা। মনে হচ্ছে আমি হাজার হাজার বার এই কন্ঠস্বর শুনেছি। কিন্তু কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না। তবে কি এই আমার দুর্গা? কিন্তু ও এখানে? বীজগণিতের সূত্র মেলাতে পারছিলাম না।
ওই দেশের সাংবিধানিক প্রধান ওনার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার সময় সারা ঘর হাততালিতে ফেটে পড়ছিল। ক্যামেরার মুহুর্মুহু ফ্ল্যাশলাইটে ভরে যাচ্ছিল হলঘরটি।
প্রায় মিনিট পাঁচেকের পর হাততালি বন্ধ হতেই আমি সৌরাংশুকে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলাম—এই তোর দিদি?
হ্যাঁ।
পরিচয় করাবি বলছিলি?
অনুষ্ঠান শেষ হোক, তারপর।
কিন্তু উনি যদি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যান, তাহলে?
উনি তাড়াতাড়ি যাবেন না।
তুই জানলি কী করে?
আমি আজ সকালে ফোন করে বলে রেখেছি।
সেকি, বলিসনি তো?
সব বললে চলে?
উনি কি আমাকে চেনেন?
তা জানি না।
তুই কি আমার নাম বলেছিস?
না, শুধু বলেছি আমার এক দাদা তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চায়।
আমি নিজে থেকে কখন চাইলাম?
এখন চাইছ।
উনি কী বললেন?
অনুষ্ঠানের পর তোমাকে ভিজিটিং রুমে নিয়ে যেতে।
এতসব অনুষ্ঠানের পর তোর কথা কি খেয়াল থাকবে?
তুমি তো আমার দিদিটিকে চেন না। একবার আলাপ হোক, তখন বুঝতে পারবে উনি কী ধরনের মানুষ।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আমরা অপেক্ষা করছি। প্রায় এক ঘণ্টা হতে চলল। একবার বসছি, একবার উঠে দু-পা, চার-পা পায়চারি করে আবার বসছি। আর সৌরাংশু নিশ্চিন্তমনে সোফায় এলিয়ে একটা জার্নাল পড়ছে। ভদ্রমহিলা সম্পর্কে ওর আত্ম-বিশ্বাস দেখে আমি একটু বিস্মিত হচ্ছিলাম।
আমি সৌরাংশুকে ঠেলা দিয়ে বললাম—কী রে ওনার মনে আছে তো? উনি চলে যাননি তো?
তুমি এত চিন্তা করছ কেন?
প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেল কিনা, তাই বলছিলাম।
তেমন হলে ওর বাড়িতে চলে যাব।
বাড়িতে যাব মানে? ওঁর তো সংসার আছে। তা ছাড়া উনি বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নেবেন। অন্য কাজও থাকতে পারে।
সংসার-টংসার কিচ্ছু নেই। আমার মতো ঝাড়া হাত-পা।
মানে?
মানে, বিয়েই করেনি।
কেন?
তা বলতে পারব না। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনোদিন কথা হয়নি। তবে—।
তবে?
শুনেছি কলকাতায় কোনো একটি ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ায় দিদিটি ওপথে আর যায়নি। অবশ্য একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। নিজের কাজের ওপর আরও আত্মনিয়োগ করতে পেরেছে। তাতেই আজ এই সাফল্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ডাক পড়ল। ঘরের মধ্যে ঢুকতেই উনি উঠে দাঁড়ালেন। সৌরাংশুকে উদ্দেশ্য করে বলল—স্যরি, সৌরাংশু, কতগুলো চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিলাম। ওরা আলাদা আলাদাভাবে চেয়েছিল। কিন্তু আমি ওদেরকে বললাম—সবাইকে একসঙ্গে একটা ইন্টারভিউ দেব। ওরা রাজি হয়ে গেল। কিছু মনে করিস না।
সৌরাংশু আমাকে দেখিয়ে বলল—দিদি, উনি আমার সেই দাদা, যার কথা তোমাকে বলেছিলাম।
উনি হাতজোড় করে নমস্কার করতে গিয়ে আমাকে দেখে বিস্ময়াভূত হয়ে গেলেন। আমিও ওনাকে দেখে বিস্ময়ে-আনন্দে বাক্যহারা হয়ে গেছি।
সৌরাংশু বলল—দিদি, উনি প্রিয়ব্রত বিশ্বাস।
আমি এক দৃষ্টিতে দুর্গার দিকে তাকিয়ে আছি। আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটি আজ মাত্র কয়েকহাত দূরে টেবিলের ওপারে বসে আছে। যার জন্য আমার জীবন, আমার মন-প্রাণ আকুল হয়ে উঠত, যাকে সারাদিনে অন্তত একবার চোখের দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, সে আজ আমার মুখোমুখি।
আমার পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলি হুড়মুড়িয়ে সামনে এসে পড়ছে। আমার হারিয়ে যাওয়া কলেজজীবন, যৌবনের সোনালি দিনগুলি আমার স্মৃতিপটে হাজির হচ্ছে। ভগ্ন অট্টালিকায় চাপা পড়া পুথিগুলির বিবর্ণপাতা ভোরের বাসন্তী হাওয়ায় নতুন করে উঁকি দিচ্ছে। বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মধুর নিবিড় সম্পর্কগুলি আবার নতুন জোয়ারের ঢেউ তুলে হৃদয়-দুয়ারে আছড়ে পড়ছে। আমি পুরোনো সুরেলা সংগীতের সুর আবার নতুন করে শুনতে পাচ্ছি। যে জীবনযন্ত্রণাকে আমি জল দিয়ে নিভিয়ে সুখে সংসার করছিলাম, দুর্গাকে দেখে আজ তা কেমন ওলট-পালট হয়ে গেল।
দুর্গাও বাকরুদ্ধ হয়ে চুপচাপ বসে থাকল। ওর স্মৃতিপটে ফেলে আসা দিনগুলো বোধ হয় একটার পর একটা হাজির হতে থাকে। ও বিস্ময়াভূত হয়ে আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
আমরা কেউই চোখ সরিয়ে নিতে পারছিলাম না। অবশেষে দুর্গাই নীরবতা ভঙ্গ করে বলল—তুমি! তুমি এখানে?
আমি বললাম—দুর্গা তুমি! এখনও আমার বিশ্বাস হচ্ছে না!
সৌরাংশু বলল—দিদি, তুমি প্রিয়দাকে চেন? প্রিয়দা, তুমিও দিদিকে চেন?
আমরা কেউ কিছু বলছি না দেখে সৌরাংশু বোধহয় কিছুটা আন্দাজ করতে পারল।
আমি দুর্গার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বারবার হারিয়ে গেলাম ওকে নিয়ে আমার ফেলে আসা পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থনে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন