আমার দুর্গা – ২.৭

মাস যায়, বছর কেটে যায়। দু-জনেই ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কমপ্লিট করি।

তারপর কলকাতায় চলে আসি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ করার জন্যে। আমি যাদবপুরে একটা মেসে থাকি আর দুর্গা গোলপার্কের কাছে একটা ছাত্রী মেসে।

চেনা শহর। এর রূপ-রস-গন্ধ-বিলাসিতা কিছুটা জানি। আইনের স্নাতক স্তরে পড়ার সময় কখনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে, কখনো একা-একাই কলকাতার অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়িয়েছি। প্রাসাদোপম অট্টালিকায় মানুষের জীবনযাত্রা, জরাজীর্ণ পুরোনো পোড়ো বাড়ির বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব, ফুটপাথের ওপর ঘর-বাড়িহীন হাজার-হাজার মানুষের রাত্রিযাপন আমি দেখেছি। আমি দেখেছি বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার-হাজার কম বয়সি ছেলে হোটেলে, মুদি দোকানে, চায়ের দোকানে নামমাত্র পয়সার বিনিময়ে কাজ করে। আবার অনেকে আছে যারা সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আমি দুর্গাকে নিয়ে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে গেছি। ওর যাতে কোনো অসুবিধে না হয়, কোনো বিপদে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রেখেছি।

একদিন দুর্গা এসে বলে—এইভাবে হবে না বুঝেছ, ভালো কোনো শিক্ষকের কাছে বা কোচিং সেন্টারে ভরতি হওয়া দরকার। এইভাবে এলোমেলোভাবে পড়লে কিচ্ছু হবে না।

তুমি হতাশ হোয়ো না। আমি দেখছি তোমার সাবজেক্টের ওপর কোনো কোচিং-এর ব্যবস্থা করা যায় কিনা।

ব্যবস্থা করা যায় কিনা বললে হবে না, ব্যবস্থা করতেই হবে।

অর্ডার?

হ্যাঁ অর্ডার। এটা না হলে আমার সমস্যা হচ্ছে।

ঠিক আছে আমি এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা করছি।

তোমার লাগবে না?

আমার স্যার তো আছেন। মাঝে মাঝে ওঁর বাড়ি গিয়ে বুঝে আসি। যদি তেমন দরকার হয়, স্যারই ব্যবস্থা করে দেবেন।

একটা-দুটো চান্সে নেট লাগাতে হবে। না-হলে আস্তে আস্তে হতাশা গ্রাস করবে।

ঠিক বলেছ। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের সাফল্য পেতে হবে। তাহলেই আমরা তাড়াতাড়ি সংসার শুরু করতে পারব।

তোমার মাথায় শুধু ওসব ঘুরছে।

তোমার মাথায় কী ঘুরছে শুনি?

জানি না যাও।

মেয়েদের এই হল দোষ। বুক ফাটবে, তবু মুখ ফুটবে না। মনের ভেতরে এক, আর বাইরে আর এক।

মেয়েদের মনের কথা বোঝ? ক-টা মেয়ের সঙ্গে তোমার মেলামেশা?

তুমি কিন্তু আসল ব্যাপার থেকে অন্যদিকে চলে যাচ্ছ।

সব কথা কি মুখে বলতে হয়, বুঝে নিতে পার না?

মুখে বললেই বা ক্ষতি কী? তাতে কি তোমার ব্যক্তিত্ব নষ্ট হবে?

পুলিশের মতো জেরা কোরো না তো। আসল কাজটা করো।

আসল কাজ?

এই রে, ভুলে গেলে? আগে আমার জন্য শিক্ষক ব্যবস্থা করো।

এত তাড়াহুড়ো করলে চলে? ভেবে-চিন্তে করতে হবে না? এমন একজন শিক্ষক ব্যবস্থা করলাম, শেষে ওঁরই প্রেমে পড়লে, তখন আমার কী হবে?

কী আবার হবে, হাঁ করে বসে বসে দেখবে।

ওটা হতে দিচ্ছি না।

তাই?

তাই।

এক-একদিন বিকেল বেলা গোলপার্কের কাছে আমরা দেখা করতাম। তারপর সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে ঢাকুরিয়া লেকে গিয়ে পৌঁছোতাম। দেখতাম কাতারে কাতারে মানুষ জনবহুল কলকাতা থেকে বেরিয়ে স্বস্তির কলকাতায় এসে জিরিয়ে নিচ্ছে। কেউ-বা অফিস ফেরত, কেউ-অবসরপ্রাপ্ত, কেউ-বা বেকার যুবক-যুবতী, কেউ-বা স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী। কেউ বসে গল্প করছে, কেউ বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডায় মগ্ন, কেউ-বা নিভৃতে বসে আপনজনের সঙ্গে প্রাণখুলে মনের কথা বলছে।

দুর্গা বলত—বহু মানুষের প্রচুর টাকাপয়সা আছে, নাম-যশ আছে, তবু সুযোগ পেলেই এখানে চলে আসে, মুক্ত আকাশের নীচে বসে গভীরভাবে নিশ্বাস ছাড়ে, প্রশ্বাস নেয়।

এখানে এসে বেশ ভালো লাগে। যানবাহনের ভিড় নেই, মানুষের কোলাহল নেই, দর কষাকষি নেই, শুধু আছে প্রাণখোলা হাসি, নির্ভেজাল আড্ডা, হৃদয়ের ভাষায় প্রিয়জনের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া।

এক-জোড়া পানকৌড়ি লেকের এপ্রান্তে ডুব দিতে দিতে ওপ্রান্তে গিয়ে ওঠে। আবার ওপ্রান্তে ডুব দিতে দিতে এপ্রান্তে এসে পৌঁছোয়।

এদের দেখে দুর্গা বলে—এরা বেশ আছে তাই না? সারাটা জীবন সাথীকে নিয়ে এখানেই কাটিয়ে দিচ্ছে। এটাই ওদের ঘর, ওদের পৃথিবী।

ওরা আমাদের মতো ভ্রমণার্থীদের দেখে মজা পায়। সারাদিন হেসে-খেলে বেড়ায়। কোনো একদিন যদি এখানে কেউ বেড়াতে না আসে, তবে ওরাও কষ্ট পাবে, ওদের মনটাও কেমন উদাস হয়ে যাবে।

একজন ভদ্রমহিলা দৌড়োতে দৌড়োতে লেকের চারদিক পাক মারছে। বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে। পরনে টাইট প্যান্ট আর সাদা গেঞ্জি। উনি যখন দৌড়োচ্ছেন সকলে হাঁ করে ওনার শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখছে।

আমাদের অনতিদূরে কয়েকজন বয়স্ক লোক একসঙ্গে বসে গল্প করছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন প্রফেসর তালুকদার। ভদ্রমহিলা ওঁর কাছে এসে বললেন—আরে প্রফেসর তালুকদার, কেমন আছেন?

মিসেস সরকার! আপনি কখন এলেন?

হাফ-অ্যান-আওয়ার, দু-পাক হয়ে গেছে।

ও আই সি, আমি খেয়ালই করিনি।

আপনি ওঁদের সঙ্গে গল্প করছিলেন।

প্রফেসর সরকার বাড়িতে আছেন?

বাড়ি থাকলে সঙ্গে নিয়ে আসতাম। ও এখন নিউইয়র্কে একটা সেমিনারে গেছে।

কবে ফিরবেন?

আগামী পরশু। তারপর দু-দিন থেকে সিঙ্গাপুর।

আপনি সঙ্গে যাচ্ছেন?

উনি হেসে বললেন—আপনি তো জানেন দেখছি।

সেদিন ক্লাবে ড. দুবে বলেছিলেন।

কৌশিকদা?

ইয়েস, ড. কৌশিক দুবে।

এ.জি.এমে নতুন প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনাগুলো শুনলেন।

ওয়েট অ্যাণ্ড সি।

উই হোপ ফর দ্যা বেটার।

অবভিয়াসলি, আদারওয়াইজ ইউ হ্যাভ টু গো।

ইট ইজ ইজিয়ার টু সে, বাট ডিফিকাল্ট টু ওয়ার্ক।

ডেফিনিটলি।

আপনারা সপরিবারে একদিন বাড়িতে আসুন।

নিশ্চয়ই যাব।

বউদি কেমন আছেন?

ও এখন দিল্লিতে একটা সলিসিটর ফার্মে অ্যাডভাইসর হিসেবে কাজ করছে। মাসে দশ পনেরো দিন ওখানেই থাকে।

বেশ আছেন তাহলে।

অবসরের পর ব্যস্ততা বেড়ে গেছে।

ওকে, থ্যাঙ্ক ইউ, এখন আসি।

আসুন।

আমি আর দুর্গা ওঁদের কথা শুনছিলাম। এমন ভাব করছিলাম, যেন আমরা ওঁদের কথা শুনছিই না, নিজেদের মধ্যে গল্প করছি।

আমি বললাম—এখানে বহু নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত, যশস্বী মানুষ আসেন, এত সাধারণভাবে জীবনযাপন করেন যে আমরা বুঝতে পারি না।

গুণী মানুষরা সাধারণত সাদাসিধে জীবনযাপন করে।

আমার গুণী মানুষটা কীরকম?

সে তো দেখতেই পারছ।

এখন তো একরকম দেখছি, যখন চাকরি-বাকরি পেয়ে উচ্চ-প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তোমার জীবনযাত্রা পালটে যেতেও তো পারে।

আমার পাশে বসে আছে যে মানুষটি, সেও পালটে যেতে পারে।

তুমি কার কথা বলছো?

আমার পাশে কে বসে আছে শুনি?

এটা ভালো হচ্ছে না কিন্তু।

কোনটা ভালো হচ্ছে না?

তুমি আমাকে নিয়ে মজা করছ।

ঠিক আছে, আর মজা করব না।

দক্ষিণের রেললাইনের ধার থেকে ফাঁকা মুক্ত হাওয়া আমাদের চোখে মুখে এসে লাগল। একটা মালগাড়ি ঝন ঝন আওয়াজ করতে করতে বজবজের দিকে চলে গেল। কয়েকজন ছেলে-মেয়ে দল বেঁধে হাসাহাসি করতে করতে লেকের পাড় বরাবর ওদিকে চলে গেল।

একজন আইসক্রিমওয়ালা ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে আমাদের দিকে এল। সামনে এসে বলল—কটা দেব দিদিমনি?

আমি বললাম—কটা দেব মানে? আগে আমরা নেব কিনা জিজ্ঞেস করবে তো?

দিদিমনি হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকলেন।

তাই?

দুর্গা ফিক করে হেসে বলল—এত কথার কী আছে? কটা দেবে বলে দাও না।

দুটো দাও।

আইসক্রিম খেতে খেতে বললাম—তুমি আমাকে আগে বলবে তো। তাহলে ওকে একথা বলতাম না। কি ভাবল বল তো?

ও কিচ্ছু ভাবেনি। বরং মজা পেয়েছে।

তুমি কিন্তু ঠিক করনি।

তুমি কি সবসময় আমাকে জানিয়ে কর? সারপ্রাইজ আছে না?

ঠিক সময়ে উশুল করে নেব।

একদম না। দুষ্টু ছেলে আমার। এই বলে দুর্গা আবার হেসে ওঠে।

আইসক্রিম খেয়ে মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল। মনে মনে দুর্গাকে ধন্যবাদ জানালাম। এইভাবে ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি সারাজীবন করে যাও। আমি তোমায় কিচ্ছু বলব না।

দুর্গা বলল—এই শুনছ, এবার আমরা উঠে ওদিকে যাব।

আমি শুনতে না পাওয়ার ভান করে চুপচাপ বসে রইলাম।

দুর্গা আমার হাত ধরে বলল—হে আমার কেষ্ট ঠাকুর, আমি কি বলছি শুনতে পাচ্ছ না?

আমি বললাম—ও হ্যাঁ, তুমি কী বলছ?

এবার ওঠো, ওদিকে যাব।

ওদিকে কেন?

এমনিই যাব, ওদিক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে যাব।

আমার একদম ইচ্ছে করছে না।

কেন?

ইচ্ছে করছে, সারারাত এখানে বসে তোমার সঙ্গে গল্প করি।

পাগল কোথাকার।

পাগল কেন?

আমার সন্ধ্যাবেলায় একটা কাজ আছে।

কাজ! কী কাজ?

বলা যাবে না।

কী এমন কাজ যে আমাকেও বলা যাবে না।

সব কি বলতে হবে?

আমি তো তাই করি।

দুর্গা নিজের হাতের তালুদুটো ঘষতে ঘষতে বলল—আমি না একটা টিউশন পড়াচ্ছি।

টিউশন?

দুর্গা মাথা নাড়ল।

কবে থেকে?

এই মাস থেকে।

তুমি বলনি তো?

না, বলা হয়নি। তুমি কিছু মনে করতে পার তাই। এখানে থাকা খাওয়ার তো বেশ খরচ, বাবা-মা-এর বয়স হয়েছে। তা ছাড়া এতে হাতখরচটা হয়ে যাবে।

তা ঠিক। কোন ক্লাস?

একাদশ শ্রেণি।

সায়েন্স?

দুর্গা মাথা নেড়ে বলল—হ্যাঁ।

আমরা উঠে ওদিকে যেতে যেতে দুর্গা আমাকে কাছে টেনে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—ওদিকে দেখ শ্রাবন্তী ম্যাডাম বসে আছেন।

শ্রাবন্তী ম্যাডাম, জুলজির?

হ্যাঁ, সঙ্গে অঞ্জন স্যারও আছেন।

আমি আড়চোখে দেখলাম। বেশ ঘনিষ্ঠভাবে পাশাপাশি বসে আছেন। যারা জানেন না তারা বুঝবেন ওঁরা স্বামী-স্ত্রী। বলল—দু-জনেই তো বিবাহিত।

অঞ্জন স্যারের মেয়ে তো জিওগ্রাফি অনার্স পড়ছে। তবে…।

তবে কী?

শ্রাবন্তী ম্যাডামের ব্যাপারটা জানি না।

শুনেছি ওনার বিয়েটা ভেঙে গেছে।

এরকম করে বেড়ালে বিয়ে টেকে নাকি?

তবে শাঁখা সিঁদুর পরেন।

হয়তো আবার কাউকে জুটিয়েছে, বয়স তো বেশি নয়।

শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সম্পর্কে এরকম বলতে নেই।

আমাদের দেখলে ওনারা লজ্জায় পড়বেন।

লজ্জার কোনো কারণ দেখছি না। আমরা না দেখলেও অন্যরা দেখছেন।

চলো, অন্যদিকে চলে যাই।

আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই মালবিকাদির সঙ্গে দেখা। মালবিকাদি আমাদের চেয়ে বছর তিনেকের বড়ো, কেমেস্ট্রির ছাত্রী। ডিপার্টমেন্টে বেশ নাম আছে। সবে নেট পেয়েছে। একটা কলেজে পার্টটাইমও করছে।

আমাদের ব্যাপারটা মালবিকাদি জানত, আমাদের দেখে বলল—তোরা তো বেশ ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিস।

দুর্গা বলল—অনেকদিন পর আজকে একটু বেরিয়েছি।

প্রিয়ব্রত তোকে কিছু খাইয়েছে?

ও কী খাওয়াবে, আমিই ওকে খাওয়ালাম।

কী খাওয়ালি?

আইসক্রিম।

কখন বেরিয়েছিস?

এই তো সাড়ে তিনটে নাগাদ।

দাঁড়া, আমি তোদের খাওয়াচ্ছি।

তুমি ওর কাজটা করে দিচ্ছ?

প্রিয়ব্রতের নামে কিচ্ছু বলিস না, ও খুব ভালো ছেলে।

শুধু ভালো ছেলে হলে হয় না, একটু দায়িত্বশীলও হতে হয়।

এখনও দায়িত্বশীল হওয়ার মতো কিছু হয়নি। আগে চাকরি-বাকরি পাক, তারপর বলবি।

তুমি একা, উদয়দা আসেনি।

ও খাবার কিনতে গেছে। যা পেটুক।

কী খাবার কিনতে পাঠিয়েছ?

কী পায় কী জানি, এখানে চাইলেই সব পাওয়া যায় না।

সে তো তোমাদের দু-জনের খাবার।

যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় নয় জন।

আমি বললাম—দিদি, উদয়দা তো স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশ যাচ্ছে।

ও একবছরের জন্য। তারপর ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন।

একবছর তো কম সময় নয়।

সেইজন্যই তো রেজিস্ট্রিটা করে নিলাম। জাপান থেকে ফিরলে সামাজিক অনুষ্ঠান হবে। দুর্গা বলল—তুমি কি একদম বেঁধে রাখলে?

ওরে বাবা, ওদেশে গিয়ে কার পাল্লায় পড়ে ঠিক আছে। ছেলেদের মন তো, সুন্দরী মেয়ে দেখলেই গলে যায়। তা ছাড়া ওকে দেখতেও বেশ স্মার্ট, হ্যাণ্ডসাম।

উদয়দাকে এসব কথা বলব?

আমি তো ওর সামনেই একথা বলি।

আমি বললাম—তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে থাকতে উদয়দা অন্য কারুর কথা ভাবতে পারে?

আমি তো ওর সঙ্গে থাকছি না। অবশ্য মাস ছয়েকের পর আমিও ওদেশে যাব।

গুড, একেই বলে পতিব্রতা স্ত্রী।

একে পতিব্রতা স্ত্রী বলে না। পতিকে পাহারা দেওয়া স্ত্রী।

এই বলে মালবিকাদি হো হো করে হেসে উঠল। হাসলে তাকে আরও সুন্দর দেখায়। ওর গজাল দাঁতদু-টি যখন বেরিয়ে পড়ে তখন বাচ্চা মেয়ের মতো মিষ্টি লাগে।

মালিবিকাদি বলল—প্রিয়ব্রত বিদেশ-টিদেশ যাচ্ছ নাকি?

আমাদের সাবজেক্টে সুযোগ কম, অন্তত সরকারি স্কলারশিপে।

দুর্গা বলল—আমি কিন্তু বিদেশ যাবই।

মালবিকাদি বলল—তোর বরকে ফেলে।

ও আমার সঙ্গে যাবে।

চাকরি ছেড়ে?

বউয়ের জন্য প্রয়োজনে সব ছাড়তে হবে।

আমি বললাম—তাই বলে চাকরি?

শাহজাহান তার প্রিয়তমার জন্য যদি তাজমহল বানাতে পারে, তুমি এটুকু করতে পারবে না।

মালবিকাদি বলল—ঠিক বলেছিস। যুগ যুগ ধরে শুধু মেয়েরা সব ছেড়েছুড়ে স্বামীর সঙ্গে যাবে কেন? স্বামীরাও ছেড়েছুড়ে স্ত্রীদের সঙ্গে চলুক।

আমি কিছু না বলে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলাম।

একটু পরে দেখি উদয়দা হাতে দুটো প্যাকেট নিয়ে হনহন করে আসছে। আমাদেরকে দেখে বলল—আরে তোরা?

আমি বললাম—অনেকদিন একসঙ্গে কোথাও বের হইনি, আজ একটু বেরিয়েছি।

খুব ভালো করেছিস। তোরা গল্প কর, আমি আরও দু-প্যাকেট খাবার নিয়ে আসছি।

তুমি ব্যস্ত হোয়ো না উদয়দা, এখান থেকে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

উদয়দা মালবিকাদির দিকে তাকাল। মালবিকাদির চোখের ভাষা বুঝতে উদয়দার কোনো অসুবিধে হল না। সে মালবিকাদির পাশেই বসে পড়ল।

আমি বললাম—উদয়দা, কবে খাওয়াচ্ছ, বলো।

এই সেদিন খেলি।

সে তো রেজিস্ট্রি ম্যারেজ-এর জন্য।

আবার কীসের জন্য?

তোমার বিদেশ যাত্রার জন্য।

ও তো এখনও মাস খানেক দেরি।

দুর্গা বলল—দিদির কাছেও খাওয়াদাওয়া পাওনা আছে।

মালবিকাদি বলল—আমার কাছে আবার কীসের জন্য?

কয়েকমাসের মধ্যে তোমার চাকরি হচ্ছে, তার জন্য।

উদয়দা বিস্ময়াভূত হয়ে জিঞ্জেস করল—চাকরি!

কলেজে স্থায়ী লেকচারার।

গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল।

তুমি উপহাস কোরো না উদয়দা, দেখবে দিদি তোমার মর্যাদা রাখবে।

আমি উপহাস করছি না, তবে যত তাড়াতাড়ি ভাবছ, তত তাড়াতাড়ি হবে বলে মনে হয় না।

সে চারমাসের জায়গায় ছ-মাস লাগবে।

বছর খানেকের আগে হচ্ছে না।

আমি বললাম—তাতে আমাদের কিচ্ছু অসুবিধে নেই। খাওয়া-দাওয়া হলেই হল।

মালিবিকাদি বলল—তোরা কবে খাওয়াবি? ঠিক করে পড়াশোনা করছিস তো? না, শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছিস?

পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে দিদি।

এবছরের মধ্যেই দু-জনের নেট লাগানো চাই।

এ বছর মানে তো দুটো চান্স। আশা করছি হয়ে যাবে।

মালবিকাদি এবার দুর্গার দিকে তাকিয়ে বলল—তোর কেমন হচ্ছে?

ঠিকই আছে। তবে একটা গাইড পেলে ভালো হত। বেশ কতগুলো অধ্যায় এখনও তেমনভাবে করায়ত্ত করতে পারিনি।

আমার দিকে তাকিয়ে দিদি বলল—একজন শিক্ষকের বা কোচিং সেন্টারের ব্যবস্থা করে দে।

ও আমাকে বলেছে। অমি দু-একদিনের মধ্যেই ব্যবস্থা করে দেব।

দিদি দুর্গাকে বলল—তাহলে আর কী? এবার আদাজল খেয়ে লেগে পড়।

তোদের পিএইচ.ডি. রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেছে?

আমার-টা সামনের সপ্তাহে পেয়ে যাওয়ার কথা, ওরটা মাসখানেক লাগবে।

ভালো, খুব ভালো।

উদয়দা বলল—তোদের ব্যাপারটা বাড়িতে জানে?

আমি বললাম—আমরা বাড়িতে জানিয়েছি। ও বাবা-মা কে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে একবার ঘুরে গেছে।

দুর্গা, খুব চালাক। হবু শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেমন তাও দেখে এসেছে।

দুর্গা বলল—এতে চালাকির কিছু নেই দাদা। ওরা আমাদের বাড়ির সকলকে নিমন্ত্রণ করেছিল, সেজন্যই গেছিলাম।

মালবিকাদি বলল—রথ দেখা, কলা বেচা।

দুর্গা এর কোনো উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসে বলল—ওদের বাড়ির সকলে খুব ভালো। খুব ভালো মানুষ ওরা। জানি না আমি ওদের মতো হতে পারব কিনা।

খুব পারবি। তোর মতো মেয়ে আজকাল পাওয়া ভার। আমি তো মাঝে মাঝে বলি, আমার একটা ভাই থাকলে তোর সঙ্গে বিয়ে দিতাম।

উদয়দা বলল—তাহলে প্রিয়ব্রতের কী হত?

আমি বললাম—ভাগ্যিস দিদির কোনো ভাই নেই।

থাকলে কি করতিস?

ঝগড়া বাধিয়ে দিতাম।

গোধূলির মায়াবী আলো-আঁধারি ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় ঢলে পড়তে থাকে। সারা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তারকারাশির মেলা। পাখিরা বাসায় ফিরতে থাকে। আসন্ন নিবিড় সন্ধ্যায় অনিশ্চয়তা আর সংশয় বুকে নিয়ে ফুটপাথবাসীরা সামিয়ানা টাঙায়। আশা- নিরাশার দড়ি টানাটানি আর রাজনীতির কূটকচালির মাঝে পথশিশুরা তাদের বিবর্ণ ধূসর মুখে তাকিয়ে থাকে। ধান্দাবাজ, স্বার্থপর মানুষেরা ইশারায় নিজেদের হিসেব বুঝে নেয়। প্রেমিক-প্রেমিকারা একান্ত হয়ে হাতে হাত রাখে, কপালে চুমু খায়। মাছরাঙা পাখি সুযোগ বুঝে সরোবরের মাছ ছোঁ মেরে ধরে মুখে পুরে দেয়, দখিনা বাতাস চোখে মুখে এসে ছোঁয়া দেয়।

দুর্গা কানের কাছে চুপিচুপি বলল—এবার ওঠো, আমায় পড়াতে যেতে হবে।

আমি বললাম—মালবিকাদি-উদয়দা, তোমরা বসো, আমরা এখন উঠি, ওর একটু কাজ আছে।

উদয়দা বলল—এখন যা, পড়াশোনা কর। বেশি সময় নষ্ট করিস না।

মালবিকাদি বলল—আমরাও একটু পরে উঠব।

দুর্গা বলল—তোমরা আরও কিছুক্ষণ বসলেও বসতে পার, সন্ধ্যে তো এখনও হয়নি।

আমরা উঠে হাঁটতে শুরু করলাম। মাঝে মাঝে দুর্গাকে তাকিয়ে দেখছিলাম। কোনো ক্লান্তি নেই, হতাশা নেই, অস্থিরতা নেই। যেন বাগানের সতেজ লাল গোলাপ, মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু তাকিয়ে থাকতে হয়।

দুর্গা বলল—ইস উদয়দারা কী ভাবল বল তো?

কী আবার ভাববে?

হয়তো ভাববে প্রতিদিন আমরা এভাবে ঘুরে বেড়াই, পড়াশোনা করছি না।

না-না, ওরা এসব ভাবে না।

ওরা চুটিয়ে প্রেম করছে।

আরও কিছুটা হাঁটার পর লেক থেকে বেরিয়ে মেন রাস্তায় উঠলাম। আবার সেই বাস-ট্যাক্সি-মিনিবাস, আবার সেই জনকোলাহল, শহুরে ব্যস্ততা, আবার আর পাঁচটা দিনের মতো গতানুগতিক জীবনযাত্রা।

দুর্গা বলল—আবার কবে আমাদের দেখা হবে?

আগামী পরশু, ইউনিভার্সিটিতে।

এখন আসি।

দুর্গা হেঁটে কিছুটা যাওয়ার পর ওর মেসের গলির রাস্তাটা ধরল। আমি অনেকক্ষণ সেই দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%