অবশেষে আমাদের প্লেন যখন চাঙ্গি এয়ারপোর্টে নামল তখন ভোরের জড়তা কাটিয়ে রক্তিম সূর্য উঠি উঠি করছে। সারাদিনের ক্লান্তি আর পরিশ্রমের শেষে সকালের শীতল হাওয়ায় অনেকেই নিশ্চিতভাবে ঘুমিয়ে পড়েছেন। চাঙ্গি এয়ারপোর্ট তার নিত্যদিনের যাত্রীদের মান-অভিমান আর অত্যাচার-অবিচার সহ্য করে নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের কৌতূহল, ব্যস্ততা আর প্রতারণার মাঝে সে শুধু মুখ বুজে হাসে আর ইশারায় কী যেন বলে।
চাঙ্গির ইমিগ্রেশনের বিধি-নিষেধ পেরিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে পা রাখতেই একমুঠো মুক্ত হাওয়া আমার চোখে মুখে এসে লাগল। সিঙ্গাপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে প্রশ্বাস নিলাম। এ আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা।
একটু দূরেই একটা কফি শপ। এক কাপ কফি খেলাম। দেখলাম পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই এই ভদ্রলোক বেশ রসিকতা করে কথা বলেন। সারাদিন দিব্যি চা-কফি বিক্রি করে সন্ধ্যায় মনের আনন্দে বাড়ি ফেরেন। বহু দেশের বহু মানুষের সঙ্গে তার নিত্য কথা হয়, আলাপ হয়। আবার কখনো কখনো আমার মতো বিদেশি ব্যক্তিকে নানা কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সাহায্য করে।
কথায় কথায় জানলাম, ওঁর নাম রেজাউল আলম। হাওড়ার আন্দুলের কাছে ওঁর বাড়ি। প্রায় আঠারো বছর ধরে ও সিঙ্গাপুরেই আছে। বাংলা ছাড়া ইংরেজি, চিনা, ও তামিল ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন।
আমি জানতে চাইলাম ‘আলমদা, ভারতে যান না?
‘বছরে একবার যাই। ছোটোভাই, তাদের ছেলে-মেয়েরা আছে। জন্মভিটের একটা টানও আছে।’
এই দেশ আপনার কেমন লাগে?
বেশ ভালো দাদা। সুন্দর সাজানো ছোট্ট দেশ। হিংসা, দাঙ্গা নেই বললেই চলে।
এখানে কোনো প্রয়োজন হলে বলব।
আলবত বলবেন। একশোবার বলবেন, হাজারবার বলবেন। এখানে উঠছেন কোথায়?
সিঙ্গাপুর সিটিতে, এক বন্ধুর কাছে।
কতদিন থাকছেন?
সপ্তাহ খানেকের মতো।
এই গরিবের বাড়িতে একদিন দুই বন্ধু মিলে চলে আসুন। এই বলে নিজের ঠিকানার একটি কার্ড আমার হাতে দিলেন।
চেষ্টা করব। যদি না পারি, ফেরার সময় এখানে তো দেখা হবেই।
রেজাউল আলমের মুখ হাসিতে ভরে গেল। দেশের লোকের সঙ্গে কথা বলে তাকে তৃপ্তই দেখাল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম—অনুসন্ধান অফিসটা কোনদিকে দাদা?
আবার অনুসন্ধান অফিস কেন?
আমার বন্ধুটির আমাকে রিসিভ করতে আসার কথা। ওখানেই সে অপেক্ষা করবে।
‘ও’। এই বলে আলমদা অনুসন্ধান অফিসের দিকটা দেখিয়ে দিলেন।
‘ও’—এই কথাটার দ্বারা আলমদা কী বোঝাতে চাইলেন বুঝলাম না। একটি মাত্র অক্ষর, অথচ কত অর্থ, কত তাৎপর্য! কত রাগ-অভিমান, সম্মতি-অসম্মতি, হিংসা-প্রতিশোধ, ঘৃণা-ভালোবাসার ইঙ্গিত বহন করে নানা মানুষের কাছে নানা ভাবে স্পর্শ করে।
অনুসন্ধান অফিসের কাছে এসে দেখলাম সৌরাংশু উদ্বিগ্নভাবে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। যেন দূরদূরান্তের অজানা কোনো দেশ থেকে প্রিয়জন আসার প্রতীক্ষায় প্রতিটি মুহূর্ত গুনছে আর ভাবছে—‘‘ও সত্যিই আসবে তো’’?
আমাকে দেখে সৌরাংশু আনন্দে চিৎকার করে ওঠে—প্রিয়ব্রতদা, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? প্লেন-তো অনেকক্ষণ ল্যাণ্ড করেছে।
রেজাউলদার কফি শপে কফি খাচ্ছিলাম, আর গল্প করছিলাম।
রেজাউলদা! সে আবার কে?
আমি কফি শপের দিকে হাত দেখিয়ে বললাম—ওই যে কফি বিক্রি করছেন। ভদ্রলোক বাঙালি মুসলিম। হাওড়ায় বাড়ি।
তাই? বিদেশে এসেই বাঙালি বন্ধু জুটিয়ে নিলে।
কাকতালীয়ভাবে হয়ে গেল। আমি ভাবতেই পারিনি।
তুমি কিন্তু অন্যায় করেছ।
কেন?
বিদেশে এসে উলটো-পালটা কারুর পাল্লায় পড়লে ইশিতা বৌদি আর সায়নকে কী জবাব দেব?
খুব পেকেছিস। বন্ধু হলেও আমি তোর চেয়ে তিন বছরের বড়ো বুঝলি। এই বলে হেসে উঠলাম।
সৌরাংশু-ও আমার সঙ্গে হেসে উঠল। তারপর বলল—চলো, বাসায় যাওয়া যাক।
‘বাসা’ কথাটি আমার কাছে বেশ ব্যঞ্জনাময় বলে মনে হয়। স্নেহ-ভালোবাসা-মায়া-মমতা জড়ানো একটি শান্তির আশ্রয়স্থলই তো বাসা হওয়া উচিত। যেখানে থাকবে বাবা মার স্নেহ, ভাই-বোনের ভালোবাসা, স্ত্রীর কোমল হাতের পরশ কিংবা প্রেমিকার নরম হৃদয়ের উষ্ণতা। কিন্তু সমস্ত ব্যঞ্জনা বাদ দিয়ে কোনো একটি আশ্রয়স্থলই আমার কাছে এখন শব্দটির একমাত্র অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিঙ্গাপুর নদীর পাড় বরাবর আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে। নয়নাভিরাম সুদৃশ্য অট্টালিকানগরী। একটি সাজানো পার্ক। সেখান থেকে ভেসে আসছে কয়েকজন তরুণ-তরুণীর কলহাস্য। দূর আকাশে কয়েকটি পাখি দল বেঁধে উড়ে বেড়াচ্ছে। গল্প করতে করতে হেঁটে চলেছেন কয়েকজন পথচারী। ফুটপাতের ওপর একজন পাগল-গোছের মানুষ আকাশের দিকে চেয়ে কী যেন বকে চলেছে তারস্বরে।
সৌরাংশু বলে—এই নদীটি সেন্ট্রাল এরিয়া থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণাংশের ওপর দিয়ে বয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। একসময় এই নদীকে কেন্দ্র করেই প্রথম ব্যবসায়িক বন্দর গড়ে ওঠে। স্যার স্ট্যাম্পফোর্ড র্যাফেলসের হাত ধরেই এর গোড়াপত্তন।
এই র্যাফেলস লোকটি কে?
উনি ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে এদেশে আসেন।
তারপর?
তার প্রচেষ্টাতেই এই আধুনিক নগরী গড়ে ওঠে।
হঠাৎ একটা সিগন্যালের কাছে এসে আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। ট্রাফিক সিগন্যালের হুঁশিয়ারিতে জবুথবু হয়ে সব গাড়িগুলো বাধ্য সন্তানের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
এদিকটা বেশ ফাঁকা। ছড়ানো-ছিটানোভাবে কতগুলি গাছ দাঁড়িয়ে। প্রাতঃভ্রমণ সেরে অনেকেই বাড়ি ফিরছেন। তাদের অনেকের সঙ্গে রয়েছে বিদেশি কুকুরের সঙ্গতা। দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের মিষ্টি সুর।
আমি জানতে চাইলাম—সৌরাংশু এখানেও পাখ-পাখালির সুর!
এখানে বিভিন্ন প্রজাতির কোকিল দেখা যায়। ওদের মিষ্টি সুরে সারা সিঙ্গাপুর মাতিয়ে রাখে।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করে।
আমি সৌরাংশুকে জিজ্ঞেস করলাম—ছোটোবেলার স্কুলের বার্ষিক গেমসের কথা মনে পড়ে? তুই দৌড়োচ্ছিস। দৌড়োতে দৌড়োতে একবার পিছিয়ে পড়ছিস, একবার এগিয়ে যাচ্ছিস। তুই একবার মাঝপথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলি। তারপর কী করলি বল তো?
আমি উঠে পা-টাকে সোজা করে আবার দৌড়োতে শুরু করলাম। বেশ কিছুটা দৌড়োনোর পর দেখলাম সবাই পিছিয়ে গেছে। আমি সেই দৌড়ে জিতেছিলাম।
আমি ওর পিঠে হাত চাপড়ে বললাম—সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ বিদেশের বুকে মাথা উঁচু করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
সেজন্য তোমার অবদান কম নয় প্রিয়দা। তুমি পাশে না থাকলে আমি কোথায় হারিয়ে যেতাম।
তুই যা-ই বল, এর পুরো কৃতিত্ব কিন্তু তোর। আমি তোকে সাহস আর উৎসাহ জুগিয়েছি মাত্র।
আমি দূরের বড়ো বড়ো টাওয়ারগুলির দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—নগরসভ্যতার এই বিশ্বায়নের যুগে আমাদের জীবনযাত্রার প্রকৃতি কেমন দ্রুত বদলে যাচ্ছে!
সৌরাংশু হাত দিয়ে বোঝাতে চাইল—এই রাস্তা ধরে দক্ষিণ দিকে কিছুটা গেলে অর্চার্ড টাওয়ার পৌঁছোনো যায়। ভ্রমনার্থীদের কাছে এ এক আকর্ষণীয় জায়গা।
আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখলাম এক জায়গায় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে বাংলা গানও বাজছে।
সৌরাংশু বলল—প্রিয়দা, এখানে বহু বাঙালি বাস করে। বলা যেতে পারে বাঙালি পাড়া। এরা সবাই মিলে প্রতি বছর দুর্গাপূজার আয়োজন করে। কলকাতা থেকে প্রতিমা আসে। পুরোহিতও আসেন। সব বাঙালিরা এক জায়গায় মিলিত হয়ে পুজো করে। দেখে মনে হয় যেন পশ্চিমবঙ্গের কোনো পুজোমন্ডপে রয়েছি। আগামীকাল সপ্তমী। নিয়ম মেনেই দশমী পর্যন্ত পুজো হয়। তোমাকে একদিন নিয়ে আসব।
তুই কলকাতাকে মিস করিস না?
করি তো। কলকাতার সেই কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউস, ভিক্টোরিয়া, দৌড়ে দৌড়ে ট্রামে ওঠা, ফুচকা, কচুরি আর বাংলা ভাষা।
আর সেই মেস লাইফ। যাদবপুরের পুরোনো ভাড়াবাড়ি?
কেমন চলছে কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ?
রাজনীতি ভালো লাগে না। দলবাজি, গোষ্ঠীবাজি রাস্তাঘাটে, অফিসে, কলেজে, স্কুলে-বাজার-হাটে সর্বত্র। তবে একটা আন্দোলন হচ্ছে।
সামাজিক সম্পর্ক?
সহজ, সরল, সুন্দর সম্পর্কগুলি ক্রমশ জটিল হয়ে যাচ্ছে।
আর তিলোত্তমা কলকাতা?
কলকাতা শহরটায় দিন দিন জনসংখ্যা আর যানজট বেড়ে যাচ্ছে। দক্ষিণদিকে শহরটা তার শাখা-প্রশাখা হু-হু করে মেলে ধরছে। দিনকে দিন শহরটাকে চেনা যাচ্ছে না।
শুনছি আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।
বিশ্বের উষ্ণায়নের থাবা থেকে কলকাতাকে বাঁচানো খুবই জরুরি। এ নিয়ে বিশেষ ভাবনা চিন্তা এখনই প্রয়োজন।
কিছু মানুষ এ নিয়ে দিনরাত কাজ করছে বলেই হয়তো এখনও এসব টিকে আছে।
গাড়ি একটা মোড় নিয়ে ঘুরতেই রাস্তার একদিকে বেশ কিছু মানুষের জটলা। অদূরে সিঙ্গাপুর পুলিশের গাড়ি। ড্রাইভার এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করে জানল—কোনো এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে।
সৌরাংশু বলে—কত মানুষ দিনের পর দিন এভাবে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা সবসময় আত্মহত্যাই। সে কোনো বিখ্যাত লোকই হোক আর অতি সাধারণ লোকই হোক। কারণ ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু পরিণতি এক—সব শেষ হয়ে যাওয়া।
আমি বললাম—আসলে কী জানিস, আমরা সকলে মুখোশ পরে থাকি। আর আড়ালে কত জনের কত যন্ত্রণা, দুঃখ, বেদনা, হাহাকার আর হতাশা স্তূপীকৃত হয়ে থাকে!
আমি সৌরাংশুর গলায় কেমন বেদনার সুর পেলাম। একজন আহত, হতাশাগ্রস্ত, প্রত্যাখ্যাত মানুষের আত্মপ্রকাশ দেখা গেল। বুঝলাম, এ প্রসঙ্গটা উত্থাপন না করলেই ভালো হত। সৌরাংশু এখনও রেশমিকে ভুলতে পারেনি। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও সৌরাংশুর সারা হৃদয় জুড়ে রেশমির বিচরণ এখনও বিরাজমান। অথচ এমনটা হওয়ার ছিল না। ওরা দু-জন দু-জনকে খুব ভালোবাসত। পোস্ট গ্র্যাজুয়েটে ওরা দু-জনে ক্লাসমেট ছিল। মাঝে মাঝে আমাদের মেস বাড়িতে আসত। বেশ হাসিখুশি ছিল রেশমি। সকলের সঙ্গে সহজেই মিশতে পারত। পড়াশোনায় দু-জনেই ছিল অসাধারণ মেধাবী। মাঝে মাঝে ওদের মধ্যে টুকিটাকি কথা কাটাকাটি হত। দু-দিন রাগ-অভিমান হত। আবার মিটেও যেত। ওদের এই প্রেম নিয়ে অনেকে অবশ্য টিপ্পনি কাটত।
আমি চুটিয়ে ব্যাপারটাকে উপভোগ করতাম। একদিন আমি কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি মেসে ফিরে দেখি ওরা আমার ঘরে অন্তরঙ্গভাবে বসে গল্প করছে। আমাকে অসময়ে মেসে ফিরে আসতে দেখে ওরা অস্বস্তিতে পড়ে। রেশমি তো লজ্জায় কয়েকদিন আমার মুখোমুখি হয়নি। তখন আমি একটি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজে পার্ট টাইম করতাম। ওরা তখন রিসার্চ করছে। চাকরির চেষ্টাও করছে। আমাকে শ্রদ্ধা করত। আমি বন্ধুর মতো ওদের সঙ্গে মিশতাম। টুকরো টুকরো অনেক অভিযোগ আমাকে শুনতে হত, আবার তার মীমাংসাও করতে হত।
একদিন রেশমি এসে বলল—দাদা, সৌরাংশু আমাকে কয়েকদিন এড়িয়ে চলছে।
কেন?
বুঝতে পারছি না।
কিছু একটা কারণ আছে নিশ্চয়ই।
আমি মুম্বাইয়ের একটা ইনস্টিটিউটে আবেদন করেছি ওকে না জানিয়েই।
তুমি ওকে এড়িয়ে কিছু করলে ও তো তোমাকে এড়িয়ে চলবে, এ তো জলের মতো পরিষ্কার।
আমি কিন্তু অতশত ভেবে আবেদন করিনি। বিজ্ঞাপন দেখে সাধারণভাবে একটা আবেদন করেছি।
ওকে বলতে পারতে। যাই হোক ওটা নিয়ে ভেব না। ওকে আমি বুঝিয়ে বলব। তবে…।
তবে?
তোমরা নিজেরা একবার কথা বলে নাও, কর্মজীবনে তোমরা কোথায় কী করবে?
ভগবান কার যে কোথায় ভাত-ডালের ব্যবস্থা করে রেখেছেন, তা কী করে বলা যায় দাদা?
তা ঠিক। তবে কর্মস্থল, কর্মজীবন ভীষণভাবে ব্যক্তিগত জীবনকে প্রভাবিত করে।
অনেকক্ষণ সৌরাংশুর জন্য অপেক্ষা করার পর রেশমি সে-দিনের মতো চলে গেছিল। আমি সে-দিন রেশমির চোখেমুখে চিন্তার ভাঁজ লক্ষ করেছি। তারপর আবার সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু বিধাতা বোধ হয় অন্যকিছু ভেবে রেখেছিলেন। মুম্বাইয়ের ওই ইনস্টিটিউটে রেশমি সুযোগ পায়। সৌরাংশু সেদিন কিছু বলেনি। রেশমি বলেছিল আপাতত সে মুম্বাই যাচ্ছে। কলকাতায় সুযোগ পেলে সে আবার ফিরে আসবে। রেশমি আর ফেরেনি।
এদিকে সৌরাংশু-ও বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করতে থাকে। সিঙ্গাপুরের একটি ইনস্টিটিউটও তার মধ্যে ছিল। ও একদিন এসে বলল—দাদা, সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউটটি আমায় নির্বাচিত করেছে। কলকাতারটা এখনও প্রসেসিং-এর মধ্যে। কী হবে জানি না। এখন কী করা উচিত?
তোর নিজের কী মনে হয়?
বড়ো কনফিউজড।
রেশমিকে জানিয়েছিলি?
জানিয়েছিলাম।
কী বলল?
ও কোনোকিছু বলতে কেমন অনীহা প্রকাশ করল।
আর একবার ওর সঙ্গে কথা বলিস।
সৌরাংশু তারপর রেশমির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল। রেশমি সাড়া দেয়নি। তাতে রেশমির ওপর একপ্রকার রাগে-অভিমানেই সৌরাংশু এদেশে চলে এসেছে।
আমি কিছু বলছি না দেখে সৌরাংশু বলল—প্রিয়দা, তুমি কেমন চুপ করে গেলে। বউদি আর সায়নের কথা ভাবছ?
আমি কিছু না বলে স্মিতহাস্যে ওর দিকে তাকালাম। ও বোধ হয় ভাবল আমি সত্যি সত্যি ইশিতা আর সায়নের কথা ভাবছি। ও বলল তুমি ওদেরকে নিয়ে আসতে পারতে।
আসার কথা ছিল। কিন্তু দিল্লিতে ইশিতার একটা কনফারেন্স পড়ে গেল। ও-ই প্রধান বক্তা। বলল—তুমি যাও। আমি পরে যাব। সৌরাংশু যখন আছে তখন যেকোনো সময় যেতে পারি। তা ছাড়া বিদেশে তোমার প্রথম সেমিনার। এ সুযোগ ছেড়ো না। সায়ন সবে সাত। ও আর একটু বড়ো হোক। তারপর যাওয়া যাবে।
তোমাদের জন্য আমার দরজা সবসময় খোলা আছে। তবে পুজোর ছুটিতেই বাঙালিদের মধ্যে বেড়ানোর ঝোঁক বেশি দেখা যায়।
বাঙালিরা এখন সারা বছরই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সায়ন কেমন আছে দাদা। ওকে দেখতে বড়ো ইচ্ছে করে।
খুব দুষ্টু হয়েছে। ইদানীং জেদও বেড়েছে। আসলে…।
আসলে?
এই বাচ্চা বয়সে স্কুলে এত চাপ! এখনকার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর মধ্যে এত প্রতিযোগিতা!
ঠিকই বলেছ দাদা, আমার মামাতো দাদাও সেদিন একথাই বলছিল। বলল ওর ছেলের চেয়ে ওর ব্যাগের ওজনই বেশি।
শুধু তাই নয়। অভিভাবকদের মধ্যে প্রত্যাশাও বেশি। ছেলে স্কুলে প্রথম হবে, সাঁতারে প্রথম হবে, আঁকায় প্রথম হবে, গানে প্রথম হবে, ক্যুইজে প্রথম হবে ইত্যাদি।
অথচ আমাদের সময় এত চাপ ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই আমরা পড়াশোনা করেছি। তাতে খুব খারাপ করেছি বলে তো মনে হয় না।
আমি সায়নের ওপর খুব একটা চাপ দিই না। ওকে স্বাভাবিক ভাবে বড়ো হতে দিই। এই নিয়ে ইশিতার সঙ্গে মাঝে মাঝে ঝগড়াও হয়। তুই ওকে একটু বুঝিয়ে বলিস তো।
বলব।
গাড়ি আবার একটি মোড়ের কাছে এসে দাঁড়াল। সৌরাংশু ডান দিকে হাত দেখিয়ে বলল ওই দিকটায় তোমার ইউনিভার্সিটি—যেখানে তোমার সেমিনার আছে।
আমি অনেকটা উত্তেজিত হয়ে বললাম—তাই! তা কতদূর হবে?
বেশি দূর নয়। কাছেই।
একটু টেনশন হচ্ছে।
কেন?
কত দেশের কত মানুষ, কত পরিবেশবিজ্ঞানী আসবেন!
তাতে কী আছে? আমার প্রিয়ব্রতদা মানে ড. প্রিয়ব্রত বিশ্বাসও কম কীসে?
তোর কাছে তোর প্রিয়ব্রতদা সবচেয়ে গুণী হতে পারে, কিন্তু…।
এত কিন্তু কিন্তু কোরো না তো। আমি তো জানি তোমার পড়াশোনার গভীরতা। তা ছাড়া…।
তা ছাড়া?
দেখবে অধিকাংশ বক্তাই স্পনসরশিপে বিদেশ ভ্রমণ করতে আসে।
আমি আর কিছু বললাম না। চুপ করে বসে রইলাম।
গাড়ি আরও কিছুটা গিয়ে বাঁক ঘুরেই দাঁড়িয়ে পড়ল। সৌরাংশু বলল—দাদা নামো, আমরা বাসায় এসে গেছি।
লিফট ধরে চতুর্থ ফ্লোর, দরজার গায়ে জ্বলজ্বল করে লেখা ড. সৌরাংশু মজুমদার। পাশাপাশি দুটো ঘর। পেছনের দিকে ছোট্ট বারান্দা। এক কোণে পরম আদরে রাখা দু-টি ফুলের টব পুষ্পমন্ডিত হয়ে লাজুক রমণীর মতো স্মিতহাস্যে অতিথি অভ্যর্থনার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
পেছনের দরজাটা খুলে দিতে এক মুঠো মুক্ত হাওয়া ঘরে ঢুকে আলতোভাবে ছুঁয়ে গেল। দেওয়ালের গায়ে সুন্দর নক্সা। যেন কোন শিল্পী তার নরম তুলি দিয়ে তার প্রেয়সীর হৃদয়ে রূপকথার অনেক কথাই লিখে গেছেন। ঘরের এক কোণে প্রাচীনযুগের কারুকার্য করা একটি পাথরের দেবীমূর্তি রাখা আছে। এটি সময়ের প্রবহমাণতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অতীতের স্মৃতিকে আগলে রেখেছে।
দরজার ভেতরের গায়ে বড়ো বড়ো করে লেখা আছে—‘A journey of hundred miles starts with only a single step.’
বা! কথাটা কত অনুপ্রেরণার! সত্যিই মানুষের জীবন শুরু হয় শূন্য থেকে। তারপর চাওয়া-পাওয়ার ঘুর্ণাবর্তে ঘুরতে ঘুরতে শেষ বেলায় কারুর ঝুলিতে কিছু জোটে, আবার কারুর ঝুলি সারাজীবন খালিই থেকে যায়।
সময় মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সময়ের সঙ্গে মানুষের লুকোচুরি খেলায় সময়ই সব সময় জিতে আসছে। জীবনের সীমিত সময়ের মধ্যে মানুষ বড়ো হয়, ঘর বাঁধে। তারপর এই মূক-বধির ধরিত্রীর কোল শূন্য করে চলে যায়।
পেছনের জানালার পর্দাটা সরাতেই এই সুন্দর শহরের একটুকরো নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়ে। সিঙ্গাপুর নদীর নীল জলরাশির দু-দিকে শহীদ মিনারের মতো সুউচ্চ সুদৃশ্য অট্টালিকা। দক্ষিণ দিকটায় একরাশ কালো মেঘ আকাশকে ঢেকে ফেলেছে। আর একটু পরেই নামবে বৃষ্টি। যেন দূর সীমানার ওপারে রূপসী রাজকন্যা চুল বাঁধছে আর কাজল কালো টিপ পরে সেজেগুজে তার প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করছে। তার রূপকথার রাজপুত্তুর যদি না আসে তবে দু-চোখের অশ্রুকণায় ভাসিয়ে দেবে শহর-গ্রাম-নদী-গিরিখাত।
শান্ত, মুক্ত প্রান্তরে যখন মেঘে মেঘে দিগন্ত ঢাকে, থমকানো বিদ্যুতের ঝলকানিতে আকাশে সহস্র বলিরেখা দেখা যায়, তখন অ্যালমণ্ড-সি হোলি-বাঁশ গাছগুলো তাদের ধমনি-শিরার প্রত্যেক রসকণায় যে উষ্ণতা অনুভব করে তার প্রকাশ ঘটে যখন সে আঁচল উড়িয়ে নাচতে থাকে, বৃষ্টির যৌবরাজ্যে সিক্তবসন পরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির বুকে চুমু এঁকে দেয়।
আমি লাগেজ খুলে সাবান-শ্যাম্পু-তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথরুমটা পরিপাটি করে সাজানো। বিদেশি সাবান, পারফিউমের গন্ধ। আমি দু-চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে ঘ্রাণ নিলাম। সাওয়ারটা ছেড়ে নিজেকে বেশ কয়েকবার ভেজালাম। এ দেশের জলের স্বাদ কি আলাদা? মুখে দিয়ে স্বাদটা নিলাম। বিশেষ তফাত কিছু পেলাম না। তবু আমার প্রতিটি অণু-পরমাণু এই বিদেশি জলধারার বণ-গন্ধ-স্বাদ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল।
সৌরাংশু এসে দরজায় টোকা মারে—প্রিয়দা, কফি রেডি, তাড়াতাড়ি করো।
হ্যাঁ বেরোচ্ছি। আমার হয়ে গেছে।
স্নান সেরে বেরিয়ে দেখি সৌরাংশু দু-কাপ কফি, বাদাম, কিসমিস আর কেক নিয়ে বসে আছে।
আমি বললাম—বিদেশের মাটিতে এই প্রথম স্নান। ইচ্ছে করছিল কয়েক ঘণ্টা ধরে স্নান করি।
বেশি স্নান কোরো না, ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
কফি খাওয়ার পর সৌরাংশু বলল—তুমি একটু বিশ্রাম নাও। আমি একটু রান্নার ব্যবস্থা করি।
তুই রান্না করবি?
হ্যাঁ।
তুই তো মাছও ভাজতে জানতিস না। এই নিয়ে তোকে কম বকেছি।
তখন শুনিনি। এখন ঠকে ঠকে সব শিখতে হয়েছে।
আমি তোকে সাহায্য করতে পারি।
তুমি এখন শুধু বিশ্রাম নাও। রান্না-বান্না হয়ে গেলে তোমাকে ডেকে নেব।
তুই ইনস্টিটিউটে যাবি না?
ছুটি নিয়েছি।
খামোখা ছুটি নিতে গেলি কেন?
তুমি একটু চুপ করবে।
বাইরের মেঘটা আরও গাঢ় হয়ে এসেছে। কতগুলি পাখি মনের আনন্দে নাচছে। সামনের গাছটা থেকে কয়েকটা অর্ধমৃত পাতা ঝরে পড়ল, বিদ্যুতের ঝলকানি আর বজ্রপাতে আকাশটা বারবার কাঁপতে লাগল।
সৌরাশু বলল—প্রিয়দা, আমার মাঝে মাঝে ভীষণ বোরিং লাগে। সারাদিন ইনস্টিটিউটে কাজ করার পর যখন বাসায় ফিরি, দু-দন্ড কথা বলার মতো কেউ নেই। তোমার সান্নিধ্যে কয়েকটি দিন বেশ ভালোভাবে কাটবে।
স্বীকার করলি তাহলে।
অস্বীকার কবে করলাম?
অতঃপর সৌরাংশু রান্নাঘরে ঢুকল। আদা, রসুন আর লঙ্কার এক বিমিশ্র গন্ধ আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে এসে লাগে। সৌরাংশু বেশ রান্না শিখেছে। অথচ আমি তেমনভাবে পারি না। কোনো কোনো দিন বাড়িতে ইশিতা না-থাকলে এবং রান্নার মাসি না-এলে রান্নাঘরে ঢুকতে হয়েছে, কিন্তু আলু-ভাতে, ডিম-ভাতে ছাড়া বিশেষ কিছুই করা হয়ে ওঠেনি। এই অসম্পূর্ণতাও মানুষের জীবনে কখনো কখনো ধরা দেয়।
সারাদিন আড্ডার পর রাত্রি নামে। খাওয়া-দাওয়ার পর আমি আলাদা একটা ঘরে শুয়ে পড়লাম। নির্জন নিশুতি রাত। জানালা দিয়ে আকাশের তারকাপুঞ্জের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। এই বিস্তৃত মেঘচ্ছায়া ঘেরা পৃথিবীর ঘরে ঘরে তখন নিদ্রার ঢেউ আছড়ে পড়ছে। অথচ এই আকাশ, এই রাত্রি, এই নীরবতা কোনো রহস্যঘন স্নপ্নলোকের মতো আমার সামনে বার বার ভেসে উঠছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন