আমার দুর্গা – ২.৮

কয়েকদিন ধরে কলকাতার রাস্তাঘাটে, অলিতে-গলিতে, রেলস্টেশনে, চায়ের দোকানে একটাই আলোচনা। কেউ কেউ মাইক বেঁধে, হাতে পোস্টার নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে মিছিলে হাঁটছে। কেউ কেউ রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদ করছে। কেউ কেউ আবার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-অফিস বয়কট করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

খবরের কাগজগুলো পুরো প্রথম পাতা জুড়েই এই খবর ছাপাচ্ছে। জাতীয় এমনকী আন্তর্জাতিক কাগজগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে এই খবরটা তুলে ধরেছে। বিভিন্ন শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিকরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

দক্ষিণ কলকাতায় ট্রেনলাইন লাগোয়া বস্তি উচ্ছেদ করতে গিয়ে পুলিশের লাঠিতে কয়েকজন বস্তিবাসী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভরতি হয়েছে। অনেকে ঘরছাড়া হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জনগণের মতামত ব্যক্ত করতে শুরু করেছে। কেউ বলছে— উপযুক্ত পুনর্বাসন ছাড়া এরা যাবে কোথায়? কোথায় কাটাবে এরা দিনরাত? যারা পড়াশোনা করছে তারা এই অবস্থায় কী করবে? এরা এ দেশেরই মানুষ, মানব সম্পদ। এদের থাকবার একটুখানি আশ্রয়ের ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। সরকার সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য এড়িয়ে যেতে পারে না।

আবার কেউ কেউ বলছে—এরা জোর করে জায়গা দখল করে বসে আছে। অনেকের অনেক স্বাচ্ছন্দ্য আছে, তবু ক্ষতিপূরণের জন্য এখানে বাস করে। যে যেখানে এসে ঝুপড়ি বানিয়ে বসে পড়বে, আর সরকার সবার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে? বেআইনিভাবে দখল করে যে যেখানে আছে, সবাইকে উচ্ছেদ করে দেওয়া উচিত। এটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল, যাই হোক দেরিতে হলেও সরকার সঠিক উদ্যোগ নিয়েছে।

বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাঁবু খাটিয়ে ত্রান নিয়ে বসে রয়েছে। খাবারদাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ, জল, ওষুধপত্র ইত্যাদি নিয়ে তারা বস্তিবাসীদের সাহায্য করছে।

সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরা সেই সব ছবি কাগজের প্রথম পাতায় তুলে ধরছে। একটা সংবাদপত্র একজন আশি ছুঁই ছুঁই ভদ্রমহিলার ইন্টারভিউ ছেপেছে। উনি ওই বস্তিতে একটা ছোট্ট কুটুরিতে থাকেন। বস্তিবাসীরা সবাই মিলে ওঁর দেখাশোনা করে। নিজের বলতে কেউ নেই। একসময় সব ছিল। ওপার বাংলা থেকে স্বামীর হাত ধরে চলে আসার পর এখানে-ওখানে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে এখানে এসেই বাসা বেঁধেছেন। একটি ছেলেও ছিল। চিকিৎসার অভাবে দশ বছর বয়সেই মারা যায়। স্বামীটাও ইহলোক ছেড়ে চলে যায় বছর ছয়েক আগে। তবু বস্তিবাসীর যত্নে আর দেখাশোনায় চলে যাচ্ছিল সরস্বতী দেবীর এই জীবনটা। বস্তির এই ছোট্ট কুটুরি ছেড়ে লোটা-কম্বল ছেড়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন?

এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে আধো ভাঙা গলায় উনি বলেছেন—বস্তির এই ছোট্ট ঘরে অভাব আছে, দারিদ্র্যতা আছে, শিক্ষার অভাব আছে, তবু আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই, যত্নআত্তিও যথেষ্ট পায়।

সাংবাদিক প্রশ্ন করে—আচ্ছা সরস্বতীদেবী, এইভাবে সরকারি জায়গা দখল করে থাকা বেআইনি নয়?

মানছি বাবা অন্যায়, কিন্তু সব কিছু আইন দিয়ে বিচার করলে হবে না। এইসব গরিব ভিটেমাটিহীন অসহায় মানুষগুলোর কথাও তো ভাবতে হবে।

সরকারের উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে না?

এইসব মানুষকে ঘরছাড়া করে, মাথার ওপর এক চিলতে ছাউনি কেড়ে নিয়ে কি দেশের উন্নয়ন করা যায়? এরা কি দেশের কেউ না?

এদের অনেকের তো বেশ টাকা-পয়সা আছে, তারা অন্যত্র চলে যেতে পারে।

যা সামান্য টাকা কেউ কেউ জমিয়েছে, তা দিয়ে এই কলকাতা শহরে ঘরবাড়ি বানানো যায়? এটা যারা বলছে, ঠিক বলছে না।

অনেকে বহু অসামাজিক কাজকর্মে যুক্ত।

অসাধুলোক কোথায় নেই? এই যে সামনের উঁচু বাড়িটা দেখছেন, দু-তিনটে গাড়ি আছে, দারোয়ান আছে, পুলিশ এসে লোকটাকে ধরে নিয়ে গেল। লোকটার নাকি জাল ওষুধের ব্যবসা আছে।

অন্য জায়গায় অপরাধমূলক কাজ করে এখানে এসে অনেকে আশ্রয় নেয়।

পুলিশ এসে তাদের ধরুক। আমরা এসব সমর্থন করি না। সেদিন মিটিং হয়েছে। বলা হয়েছে যে বিভিন্ন অসামাজিক কাজ করবে কিংবা দুষ্কৃতিদের আশ্রয় দেবে তাকে এই বস্তি ছেড়ে দিতে হবে।

সরকার যদি অন্য কোনো জায়গায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে?

করেছে নাকি?

যদি করে?

তবে সবাই মিলে আলোচনা করে যা সিদ্ধান্ত নেবে, তাই হবে।

আপনার এতে সায় নেই?

আমি বুড়ো মানুষ, একটু থাকবার জায়গা পেলেই হল। কিন্তু যারা আমার দেখাশোনা করে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেব।

ইন্টারভিউ-এর বাকি অংশ আর ছাপেনি। তবে ওনার ছবিটা ছেপেছে। বিবর্ণ ভাবলেশহীন মুখমন্ডল। গায়ের চামড়া কুঁচকে গেছে। পরনে একটা আধ-ময়লা সাদা কাপড়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে দেওয়া একটা কালো চশমা। তা দিয়েই এই পৃথিবীকে দেখেন, দেখেন এই পৃথিবীর মানুষজনকে। আর নির্লিপ্তভাবে উঁচু আকাশটার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবেন সারাক্ষণ। তার হারিয়ে যাওয়া কৈশোর, যৌবনের ডুব সাঁতার, বার্ধক্যের নি:সঙ্গতার কথা ভাবতে ভাবতে চোখে জলও আসে। আঁচল দিয়ে সেই জল মুছতে মুছতে চেঁচিয়ে বলেন—এই রতন, পোড়ারমুখো রতন, আমার লাঠিটা কোথায় নিয়ে গেলি?

খবরের কাগজে ঘটনাটা পড়ে বেশ মর্মাহত হলাম। কষ্টেসৃষ্টে হলেও মেসে থাকার জন্য একটা ছোট্ট খাট, বিছানা আছে আমার নিজের শোয়ার জন্য। কিন্তু এইসব গৃহহীন মানুষেরা কোথায় থাকবে? কতদিন এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াবে? কতদিনই বা মানুষ এদের সাহায্য করবে?

স্নান-খাওয়া সেরে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। আগে ওখানে যাব, তারপর ওখান থেকে ইউনিভার্সিটি চলে যেতে পারব।

মেসের সন্দীপ বলল—দাদা, তুমি তো দিব্বি আছ, আর কিছুদিনের মধ্যে ভালো চাকরিও পেয়ে যাবে। ওইসব ঝামেলার মধ্যে খামোখা জড়াচ্ছ কেন?

আমি বললাম—জড়াচ্ছি না, পরিস্থিতি কেমন তাই দেখতে যাচ্ছি। আমি আর কী করতে পারি বল? প্রয়োজনে বিশ-পঞ্চাশ টাকা আর্থিক সহায়তাই করতে পারি।

এই বিশ-পঞ্চাশ টাকায় কিচ্ছু হবে না।

তবু মনে হবে, ওদের বিপদের দিনে আমারও ছোট্ট অবদান থাকল।

ওই পর্যন্তই করো, বেশি নেতাগিরি করতে যেও না, বিপদে পড়বে।

পাগল, আমি ওসবের মধ্যে নেই।

তাহলে এত সুড়সুড়ি কেন? ওদের ভাবনা ওদের নিজেদের ভাবতে দাও।

কিছু মানুষ আছে, যারা সারাজীবন শুধু এর-ওর সমালোচনা করে গেল, অথচ নিজে কিচ্ছু করল না।

আমরা কিছু না করি, একজন তো আছে সকলের কথা ভাববার জন্য।

একজন নয়, প্রচুর মানুষ আছে, যারা একে অন্যের বিপদে ছুটে যায়। আর এরা আছে বলেই এখনও অন্যায়ের প্রতিবাদ হয়, নিজেদের অধিকারের জন্য মানুষ গর্জে ওঠে।

সন্ধ্যেয় ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসো, ওখানে থেকে যেও না।

খুব পেকেছিস না?

এই বলে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মেস থেকে বের হলাম।

প্রতিদিন কত ঘটনাই না ঘটে! কোথাও ট্রেন দুর্ঘটনা, কোথাও-বা প্লেন। কোথাও আগুন লেগে অগ্নিদগ্ধ হয়ে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। কোথাও ভূমিকম্প, কোথাও বন্যা-খরায় বহু মানুষ অকালে এই পৃথিবী থেকে অকালে ঝরে যাচ্ছে। কেউ কঠিন মারণরোগে, কেউ-বা সুচিকিৎসার অভাবেও মারা যাচ্ছে। এসব তো আকছার ঘটে। কই কখনো তো মনটা এত ব্যকুল হয়ে ওঠে না। তবে বস্তিবাসীদের এই উচ্ছেদে মন এতই ব্যথাতুর কেন? তবে কি আদি-অনন্তকাল ধরে অর্জিত মানুষের বসবাস করার অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমার অন্তরাত্মা সায় দিয়ে উঠছে? নাকি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের মধ্যে বসবাস করার অধিকারও সুরক্ষিত হতে পারে—এই মৌলিক জিজ্ঞাসা থেকেই আমার এত হৃদয়স্পর্শী ভাবনা?

হঠাৎ আমার এক কলেজ-সহপাঠীর সঙ্গে দেখা। রাস্তায় একটু অন্যমনস্কভাবেই হাঁটছিলাম। ওর সঙ্গে ধাক্কা লেগে যেতেই ও আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর বিস্ময়াভূত হয়ে বলল—আরে প্রিয়ব্রত না!

আমি বললাম—তন্ময়, তুই এখানে?

এই তো স্যারের চেম্বার থেকে বের হলাম। এবার হাই কোর্টে যাব।

কেমন চলছে তোর প্র্যাকটিশ?

চলছে। তুই কী করছিস?

পিএইচ.ডি করছি। একটা কলেজের সঙ্গেও আছি।

ভালো। তা এদিকে কোথায়?

একটু দরকার আছে। কাল এদিকে একটা বস্তি উচ্ছেদ নিয়ে ঝামেলা হয়েছে শুনলাম।

আর বলিস না। এরা যেখানে ইচ্ছে গজিয়ে উঠবে, তুলতে গেলেই হাজার ঝামেলা।

আমি দেখলাম ওর সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করে শুধু শুধু মতান্তরকে সামনে এনে লাভ নেই। সেইজন্য নিতান্ত সৌজন্য বিনিময় করে বললাম—এখন আসি, ভালো থাকিস।

তন্ময় বলল—হাই কোর্টের দিকে গেলে চেম্বারে যাস। ছুটির দিন একবার বাড়িতে আয়।

নিশ্চয়ই যাব।

এই বলে আমি উলটোদিকের রাস্তা বরাবর সোজা হাঁটা দিলাম। কিছুটা যাওয়ার পর রাস্তার মোড়ে দেখি একটা বিরাট মিছিল। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম—বহু বিশিষ্ট মানুষজন, শিল্পী, সাহিত্যিক, ক্রীড়াবিদ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রীরা মৌনমিছিল করছে। তাদের অনেকেই সমাজে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত ও খ্যাতিমান।

মিছিল-টিছিলে যাওয়ার কোনো অভিপ্রায়ই আমার নেই। আমি এসেছি ঘটনাস্থল দেখতে অনেকটা কৌতুকের বশে, আর দু-দশ টাকা সাহায্য করতে। এর বেশি কিছু করার সামর্থ্য বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই। জীবনে প্রতিষ্ঠিত না হলে আমার চিন্তাভাবনা, আমার আদর্শবোধ কোনোকিছুই কাউকে প্রভাবিত করতে পারবে না। আমার মতো কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মধ্যে সে ভাবনাগুলো জন্মায়, আবার মরেও যায়।

আমি রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করছিলাম। মিছিলটা চলে গেলে আমি ঘটনাস্থল ঘুরে ইউনিভার্সিটিতে চলে যাব। ওখানে গিয়ে দুর্গাকে ঘটনাটা বলব। ও নিশ্চয়ই বলবে—তুমি এখন ওসবের মধ্যে থেকো না। আগে নিজের পায়ে দাঁড়াও। প্রতিষ্ঠিত হও। দশজন লোক তোমায় চিনুক। তারপর তুমি এইসব প্রতিবাদ মঞ্চে যেও। তখন মানুষ তোমার কথা শুনবে, বোঝবার চেষ্টা করবে।

মিছিলের লাইন কিছুতেই আর শেষ হয় না। আমি ঘনঘন ঘড়ি দেখছিলাম ও মিছিলের শেষ কোথায়—তা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ দেখি মিছিলে প্ল্যাকার্ড হাতে দুর্গা হেঁটে চলেছে। প্রথমে আমি কিছুটা বিস্ময়াভূত হয়ে গেছিলাম। আমি ঠিক দেখছি তো! সত্যিই ও দুর্গা তো?

তারপর যখন নিশ্চিত হলাম যে ও আমারই দুর্গা, আমি তখনই দৌড়ে গিয়ে মিছিলের মধ্যে হাঁটতে থাকা দুর্গার হাত ধরে টানতে টানতে বললাম—এসব তুমি কী করছ? এখুনি আমার সঙ্গে চলে এসো।

দুর্গা বলল—কেন, কিছু বলবে? তুমি বরং এই মিছিলে চলে এসো। হাঁটতে হাঁটতে যা বলার আমাকে বলো।

তোমার এই মিছিল-টিছিলে যাওয়ার কী দরকার? ইউনিভার্সিটি ছেড়ে এভাবে মিছিলে হাঁটার কোনো প্রয়োজন আছে?

প্রয়োজন আছে। একটা প্রতীকী প্রতিবাদের প্রয়োজন আছে। একদিন ইউনিভার্সিটি না গেলে এমন কিছু ক্ষতি হয়ে যাবে না।

তা বুঝলাম। কিন্তু তাই বলে এইভাবে মিছিলে…। আমি ভাবতেই পারছি না।

কেন ভাবতে পারছ না?

কারণ তুমি-আমি এর কিছুই করতে পারব না।

কে বলল? প্রতিবাদ না করে বাঁচা যায়?

সে সময় আমাদের আসেনি। যেদিন সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, তোমার চিন্তাভাবনা আরও পরিণত হবে, তখন…।

তবে দশ বছর পর সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে আজকের ঘটনার প্রতিবাদ করবে? কী চিন্তাভাবনা তোমার!

আমি সেকথা বলছি না। তখন যেসব সামাজিক সমস্যা আসবে, সেগুলির সময়োপযোগী প্রতিবাদ হবে। আমরাও তাতে সামিল হব।

এখন কী হবে?

তুমি আমার সঙ্গে চলো। আমরা ডিপার্টমেন্টে যাই।

তুমি যাও, আমি ঘণ্টা খানেকের পরে আসছি।

আমি কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম। দুর্গা মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে প্রতিবাদের ঝড় তুলে এগিয়ে গেল। ওর প্রতিবাদী কন্ঠস্বর বারবার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে আমার কানে এসে পৌঁছোতে লাগল। এ মিছিলের শেষ কোথায়? যতদূর চোখ যায় কাতারে কাতারে মানুষের ভিড়। অফিস-কাছারি, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি ছেড়ে এভাবে দলে দলে মানুষ পথে নামবে তা বোধহয় আমি ভাবতেই পারিনি। কলকাতা শহর প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, প্রতিটি অবিচারের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। আজ কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা আলাদা, এর ধরন আলাদা।

ভিড়ের মধ্যে বহু চেনা মানুষকে দেখলাম। যারা কোনো ঝামেলায় থাকে না, রাজনীতির কূটকচালিতে থাকে না, তাদেরও আজ মিছিলে দেখতে পাচ্ছি। যারা বিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় সারাদিনই নিজেদের নিয়োজিত করেন, সাংসারিক বহু বিষয় থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকেন, তাদের অনেকেই আজ পথে নেমেছেন।

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি—মানুষের এই প্রতিবাদে কিছু কি লাভ হয়? সমস্যার কি কোনো সমাধান হয়? হয়তো হয়। হয়তো এক্ষেত্রেও হবে।

পেছন থেকে তানিয়া আমার হাত ধরে বলল—ঠিক ধরেছি, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাবাগোবার মতো কী ভাবছ?

আমি বললাম—তানিয়া তুই? তুই এখানে কী করছিস?

একটা মেডিক্যাল সেন্টারে এসেছিলাম।

ডাক্তার দেখাতে?

না, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে। কালকে ডাক্তার দেখবে।

কার কী হয়েছে?

কার আবার কী হবে? একটা জলজ্যান্ত মানুষ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আর তুমি কার কথা বলছ?

তোর আবার কী হল এই বয়সে?

তুমি তো কোনোদিন ভালোভাবে আমাকে দেখলে না, দুর্গাদির পেছনে পড়ে থাকলে।

মানে?

দুর্গাদির পেছনে পড়ে থেকে তোমার কী লাভ? তোমার কথা তো শুনল না, মিছিলে চলে গেল।

তুই জানলি কী করে?

আমি দূর থেকে সব দেখেছি। তা ছাড়া শুধু কী আমি দেখেছি, তোমার পরিচিতরা অনেকেই দেখেছে।

সেটা আমাদের ব্যাপার। তুই এই বিষয়ে মাথা না গলালেই ভালো।

সারা ডিপার্টমেন্ট তোমাদের নিয়ে আলোচনা করে, আর আমার বেলায় দোষ।

পেছনে কে, কী বলল, তাতে আমার কিছু এসে যায় না।

আমার এসে যায়।

কেন?

তুমি কি কিছুই বুঝতে পার না।

কী ব্যাপারে?

তোমাকে আর ন্যাকামি করতে হবে না।

এই বলে তানিয়া হাত ধরে একপ্রকার জোর করে টানতে টানতে সামনের একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল। বড়োলোকের মেয়ে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে নকল করে নিজেদের এলিট ক্লাস বলে বোঝাতে চায়। জিনসের প্যান্ট আর টি শার্ট। তার ওপরের বোতামদুটো খোলা রয়েছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমার চোখদুটো ওর আংশিক উন্মুক্ত বক্ষযুগলের দিকে চলে যাচ্ছে। ও টেবিলের উলটোদিকে বসে আমার দিকে ঝুঁকে নিজেকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।

আমার কাছে টাকাপয়সা তেমন নেই। দামি রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার কথা কোনোদিন ভাবতে পারি না। কিন্তু এখন কী হবে? ম্যানেজার তো ছেড়ে দেবে না। অন্যান্য লোকজনও আছে। ওরা বলবে—‘সুন্দরী বান্ধবী নিয়ে খেতে এসেছেন, পকেটে টাকা নেই? ফুটপাথের মুড়ি ঘুঘনি খেতে পারতেন।’

আমি এই বিপদ থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাব ভাবছি, ভাবছি কার মুখ দেখে যে আজ ভোর হয়েছিল। নিজের ওপর নিজের রাগ হচ্ছে। কী দরকার ছিল তানিয়ার সঙ্গে এখানে খেতে আসার? কোনো একটা অজুহাতে এড়িয়ে গেলেই হত।

তানিয়ার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ও একটার পর একটা অর্ডার দিচ্ছে, আর পরম তৃপ্তি ভরে খাচ্ছে। আমি এটা-ওটা বলে বেশি অর্ডার না দিয়ে বসে আছি। বুঝতে পারছি—আজকে কপালে অনেক দুঃখ আছে।

ও আইনে মাস্টার ডিগ্রি করছে। বিখ্যাত ব্যারিস্টার সুজয় বসুর মেয়ে। ডিপার্টমেন্টের ‘হেড’-এর সাথে লতায়-পাতায় সম্পর্ক। তাই তানিয়ার এই গায়ে পড়া বেহায়াপনা চরিত্রের কথা জানা সত্ত্বেও কেউ কিছু বলে না। বরং অনেকেই ওপরে ওপরে তার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করে।

আমি কোনোদিন তা করিনি। ও-ই বরং বিভিন্ন সময় ডিপার্টমেন্টে এসে ‘প্রিয়ব্রতদা, এটা ঠিক বুঝতে পারছি না, একটু বুঝিয়ে দেবে’, ‘তোমার সাজেশন হুবহু মিলে গেছে,’ গোছের কথা বলে ভাব জমাতে আসে।

খাওয়া-দাওয়া সেরে রুমালে মুখ মুছতে মুছতে তানিয়া বলল প্রিয়ব্রতদা, আজকে তোমার ডিপার্টমেন্টে গিয়ে লাভ নেই, চলো দু-জনে মিলে সিনেমা দেখে আসি।

আমি বললাম—ডিপার্টমেন্টে আমার কাজ আছে। এখুনি যেতে হবে।

ও আমার হাতটা ধরে বলল—একটা দিন তো। ঠিক আছে সিনেমা নয়, অন্য কোথাও চলো। তুমি আমার কাছে যা চাইবে, তাই পাবে।

ওর চোখের ইশারা বুঝতে আমার অসুবিধে হল না। আমি ওর হাত ছাড়িয়ে হন হন করে বেরিয়ে এলাম।

ম্যানেজার বলল—স্যার, বিলটা পেমেন্ট করে যান।

আমি তানিয়ার দিকে হাত দেখিয়ে বললাম—বিলটা উনিই দেবেন।

রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মনে হল আমি একটা বাঘিনির গুহার ফাঁদে আটকে পড়েছিলাম। সেখান থেকে ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। আর দ্বিতীয়বার ও-মুখো হব না।

তখনও দর দর করে ঘামছি। বার বার রুমাল দিয়ে ঘাম মুছছি, তবু ঘাম কিছুতেই থামে না। আমি কিছুটা এগিয়ে রাস্তার ওপারে গাছের নীচে বাঁধানো সিঁড়িতে বেশ কিছুক্ষণ বসলাম।

এক মুঠো মুক্ত হাওয়া চোখে মুখে এসে লাগল। বেশ আরাম পেলাম। গাছে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসে থাকলাম। সমস্ত কালো মেঘ চোখের সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল। আবার মেঘমুক্ত নীলাকাশে আমি আর দুর্গা কাছাকাছি, পাশাপাশি ভাসতে লাগলাম।

ডিপার্টমেন্টে পৌঁছে দেখি সবাই আজকের মিছিল নিয়ে আলোচনা করছে। কেউ বলছে—আগে থেকে জানলে আমিও যেতাম। কেউ বলছে—এসবের পেছনে রাজনীতি আছে, এতে জড়িয়ে কাজ নেই।

অনীশদা বছর তিনেকের সিনিয়র। আমাকে শুনিয়ে বলছে—তোরা যাই বলিস, দুর্গার মধ্যে একটা প্রতিবাদী চরিত্র আছে, যেটা অন্যায় হচ্ছে, যেটা কাম্য নয়, তার প্রতিবাদ সে করবেই, তা যত বড়ো শক্তিই করুক না কেন। এই প্রতীকী প্রতিবাদেই তো বড়ো বড়ো বিপ্লব হয়েছে।

মঞ্জুরী অনীশদার বান্ধবী। ও অনীশদার সুরে বলল—দুর্গা প্রতিবাদী, স্পষ্টবাদী, অসম্ভব জেদি, আবার ছাত্রী হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী। সেমিনারগুলোতে ওর প্রেজেন্টেশনগুলো দেখেছিস, বড়ো বড়ো গবেষকদের তাক লাগিয়ে দেয়। ও সর্বগুণে পারদর্শী। দশভূজা।

তারপর অনীশদা আমাকে বলল—কি প্রিয়ব্রত, তুই এখন ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিস?

কী বলছ দাদা?

তুই দুর্গাকে ছেড়ে তানিয়াকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস?

মঞ্জুরী একবার অনীশদা, একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলে—কী বলছ তুমি? প্রিয়ব্রত আবার তানিয়ার পাল্লায় কবে পড়ল?

ওকেই জিঞ্জেস করো।

মঞ্জুরী তখন আমার দিকে তাকিয়ে বলল—তুই তো এরকম ছিলি না। তোকে তো ভালো ছেলে বলে সবাই জানতাম।

আমি বললাম—তোমরা ভুল ভাবছ।

অনীশদা বলল—কীসের ভুল? তুই তানিয়ার সঙ্গে ‘ফুড ভেলি’ রেস্টুরেন্টে যাসনি?

গিয়েছিলাম, তাতে কী হল?

মঞ্জুরী বলল—আমরা পুরো ব্যাপারটা জানি না বলেই তো তোকে জিজ্ঞেস করছি।

আমি দুর্গার সঙ্গে দেখা করে ডিপার্টমেন্টে ফিরছিলাম। দুর্গা মিছিলের সঙ্গে গেল। আমি ডিপার্টমেন্টে আসব বলে বাস স্টপেজে দাঁড়িয়েছিলাম, হঠাৎ তানিয়া পেছন থেকে এসে হাতটা ধরল। তারপর পীড়াপীড়ি করে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল। বাস স্টপেজে লোকজন ছিল। অহেতুক কথা কাটাকাটি হোক, লোকজন জড়ো হোক, আমি চাইনি।

তা বেশ ভালো। কিন্তু রেস্টুরেন্টে ওকে একা ফেলে চলে এলি কেন?

ওর সঙ্গে একসঙ্গে বসে গল্প করা যায়?

অনীশদা বলল—বিল না মিটিয়ে চলে এলি?

তোমরা এসব জানলে কী করে?

যেখানে যা ঘটবে আমাদের কাছে ঠিক খবর চলে আসবে।

সে তো বুঝলাম, কিন্তু তোমাদের সেই গোয়েন্দার নামটি জানতে পারি?

ওসব জেনে তোর লাভ নেই। বরং ওদিকটা সামাল দে।

ওদিকটা মানে?

দুর্গা জানলে কী ভাববে বুঝতে পেরেছিস?

তুমিই তো একটু আগে বললে দুর্গা অসম্ভব বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে যদি এ-ব্যাপারটা বুঝতে না পারে তাহলে আর কীসের বুদ্ধিমতী হল?

তাকে ঘটনাটা বুঝিয়ে বলতে হবে।

তা বলব না কে বলল?

অনীশদা আর মঞ্জুরী মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। আমি আমাদের রিসার্চ রুমে চলে গেলাম।

বিকেল তিনটে নাগাদ দুর্গা এল। আমাকে দেখেই বলল—তুমি রাগ করেছ না?

রাগ করব কেন? যে যার নিজস্ব চিন্তাভাবনা।

তুমি দেখছি এখনও রাগ করে বসে আছ।

বললাম তো, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে।

আমি তানিয়ার কথা বললাম। ও বলল মিছিলের শেষে কী হল, কারা গ্রেপ্তার বরণ করল, ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাসায় ফিরে দুর্গার কথা ভাবতে লাগলাম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ও কখনো পিছপা হয় না, তাতে কে কি মনে করল, কে অসন্তুষ্ট হল, কিচ্ছু এসে যায় না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%