পরের রবিবার বাড়ি গেলাম। বাবা-মার জরুরি তলব। সব কাজ ফেলে চলে এসো। আর কয়েকদিনের পর পরীক্ষা। পড়াশোনার চাপ রয়েছে। তবু বাড়ি যেতেই হল।
সারাদিন ধরে আলো বিকিরণ করতে করতে ক্লান্ত সূর্য তখন পশ্চিম আকাশের কোলে ঘুমোতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। সারারাত ধরে সে ঘুমোবে। তার বর্ণচ্ছটা উঁচু নারকেল গাছটার মাথায় এসে পড়েছে।
আমি রিকশা থেকে নামতেই বাবা-মা বেরিয়ে এল। রিয়া দৌড়ে এসে ব্যাগপত্র নিয়ে গেল। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সুজিত মেসোমশাই, সাবিত্রী মাসিমা আর তাদের একমাত্র মেয়ে অর্ণা।
সুজিত মেসোমশাই বাবার বন্ধু। বাবা যখন কলকাতায় ছিল তখন দু-জনই একই ব্র্যাঞ্চে চাকরি করতেন। বাবা চলে এল কাঁথিতে আর সুজিত মেসোমশাই কৃষ্ণনগরে। অনেকবারই উনি আমাদের বাড়িতে এসেছেন। কখনো মাসিমাকে সঙ্গে নিয়ে, কখনো-বা অর্ণাকে সঙ্গে করে। এবার সপরিবারে।
মেসোমশাই-মাসিমাকে প্রণাম করতেই মেসোমশাই বললেন—আমাদের প্রিয় বেশ বড়ো হয়ে গেছে। সেই ছোট্ট থেকে ওকে দেখে আসছি, খাইয়ে না দিলে, জামা প্যান্ট পরিয়ে না দিলে স্কুলেই যেত না, সে আজ আদব-কায়দা, ব্যবহারে বেশ পরিণত হয়ে উঠেছে।
আমি মা-বাবার দিকে ঘুরে বললাম—মেসোমশাই কী বলে দেখ, সেই কবে ‘ল’ পড়তে কলকাতায় গেছি, একা একা থেকেছি। মেসোমশাই কিচ্ছু খবর রাখে না।
অর্ণা পাশ থেকে বলল—তুমি কত পরিণত হয়েছ বোঝা যাবে। কাল আমরা দীঘা বেড়াতে যাব, তোমার সঙ্গে গল্প করব, বোঝা যাবে বিদ্যাবুদ্ধি একটু বেড়েছে কিনা।
আমি অর্ণাকে বললাম—তোর তো ফাইনাল ইয়ার। আগে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট কর, তারপর আমার সঙ্গে গল্প করবি।
কী আমার বিদ্যাসাগর রে। ওনার সঙ্গে গল্প করতে হলে নাকি গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে আসতে হবে। আজকালকার মেয়েদের তুমি জান না। মাধ্যমিক পাশ করেই কত ছেলেকে ঘোল খাইয়ে দিচ্ছে।
আমি অর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বললাম—রিয়া, তোর বন্ধুকে সাবধান করে দে।
মা বলল—তোরা কি উঠোনে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করে যাবি? আগে ঘরে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে বিশ্রাম কর। তারপর কথা হবে।
মায়ের কথায় বোনের কাছ থেকে ব্যাগপত্র নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। তারপর জামাকাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়লাম।
জানালা দিয়ে এক-মুঠো মুক্ত হাওয়া ঘরের মধ্যে ঢুকে ঘুরপাক খেতে খেতে বেরিয়ে গেল। বাড়ির উঠোনে দারোয়ানের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো বেলগাছ থেকে কয়েকটা পাতা ঝরে পড়ল।
আমি দেখলাম—ডালপালা-পাতায় গাছটা এখনও ভরে আছে। এর নীচু ডাল থেকে মা প্রতিদিন পুজোর জন্য বেলপাতা পাড়ে। মনে পড়ে রিয়ার কথা। ছোটোবেলায় দুষ্টুমি করলে আমি ওকে ভয় দেখানোর জন্য বলতাম—এই বেলগাছে ভূত থাকে। যে দুষ্টুমি করবে, তাকেই ধরে নিয়ে যাবে।
রিয়া একটুও ভয় না পেয়ে বলত—হতেই পারে না। বেলপাতা দিয়ে ঠাকুরের পুজো হয়, সেখানে কখনো ভূত থাকতে পারে?
আমি বলতাম—সব গাছে ভূত থাকে।
ও বোধহয় কথাটা বিশ্বাস করত। ধীরে ধীরে গায়ের কাছে এসে বলত—এই তো আমি দুষ্টুমি বন্ধ করে দিয়েছি। এখন আর ভূত আসবে না বল দাদা?
আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বলতাম—তুই দুষ্টুমি না করলে কেউ কিচ্ছু করবে না।
সেই রিয়া আজ কত বড়ো হয়ে গেছে! অনার্সের ফাইনাল ইয়ার কমপ্লিট করলেই মাস্টার ডিগ্রি কোর্সে ভরতি হবে। তারপর…।
এমন সময় দরজা ঠেলে অর্ণা বলল—ভেতরে আসব? হাতে খাবারের প্লেট।
তুই।
মাসিমা তোমার জন্য এই খাবার পাঠালেন।
মা নিজে না এসে তোকে পাঠাল?
উনি অন্য কাজে ব্যস্ত আছেন।
রিয়া কোথায় গেল?
ও যেন কী একটা করছে।
ওদের কোনো কান্ডজ্ঞান নেই।
আমি আসায় আপত্তি আছে?
তুই তো নিয়ে চলেই এসেছিস। রেখে যা, আমি খেয়ে নেব।
আমি খাইয়ে দেব?
কেন, আমি কি নিজে খেতে পারি না?
আমার হাতে খেলে তোমার ভালো লাগবে।
তুই খুব পেকেছিস।
পাকামির কী দেখেছ? এখন-তো কিছুই করিনি।
মাসিমাকে ডাকব?
ডাকতে হবে না, যাচ্ছি। এই বলে আমার দিকে কটমট করে তাকাতে তাকাতে চলে গেল।
আমি টিফিন খাওয়ার পর প্লেটটা নিয়ে রান্নাঘরের বেসিনে রেখে হাত মুখ ধুচ্ছি, অর্ণা গায়ের কাছে এসে বলল—কেমন হয়েছে পায়েস? ওটা আমি বানিয়েছি।
তুই বানিয়েছিস?
ভালো হয়েছে। বেশ ভালো হয়েছে।
অর্ণার মুখে হাসি খেলে গেল। এমন জ্যোৎস্নামাখা পুলকিত হাসি ওর মুখে অনেকদিন দেখিনি। এই হাসিতে কোনো অভিসন্ধি নেই, কোনো ভণিতা নেই, কোনো হিসেব-নিকেশ নেই।
সন্ধ্যাবেলা আমি নিজের ঘরে বসে জানালা দিয়ে আকাশটাকে জরিপ করছিলাম। কীভাবে গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা আসে, মাথার ওপর চাঁদ ধীরে ধীরে আলো ছড়ায়। সেই আলোয় পৃথিবীর প্রাণীকূল নিজের নিজের রহস্যঘন জীবনে আবর্তিত হয়। সন্ধ্যার এই আলো-আঁধারি লুকোচুরি বেশ লাগে আমার। এর নিজস্ব ভাষা আছে, আলাদা মাত্রা আছে। কোনো কোনো দিন জনকোলাহল, হইহুল্লোড় কিংবা নিছক আড্ডার চেয়ে নি:সঙ্গ সন্ধ্যা অনেক ভালো লাগে। দিকচক্রবালে জামরঙা শাড়িতে পরিবৃত আকাশ, শূন্যে ভাসমান মেঘকুন্ডলী, ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে অসীম ব্যবধান—যেন এক মায়াপুরী।
অর্ণাকে নিয়ে রিয়া ঘরে ঢুকল। আমাকে জানালার কাছে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে রিয়া বলল—তুই এখানে একা বসে কী ভাবছিস দাদা?
অর্ণা বলল—কী ভাবছে না বলে কার কথা ভাবছে জিজ্ঞেস কর।
রিয়া এসে আমার হাত ধরে বলল—এই দাদা, কার কথা ভাবছিস?
অর্ণা বলল—কার কথা আবার? আমার কথা।
আমি বললাম—তোরা এখান থেকে যাবি?
অর্ণা আমার কথায় পাত্তাই দিল না। সে ঘরের এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বলল—এটা মাসিমা, মেসোমশাইয়ের বাড়ি। এই বাড়ির যেকোনো ঘরে, যেকোনো জায়গায় যখন খুশি আমি যেতে পারি। কারুর নিষেধ পরোয়া করি না।
আমি রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম—রিয়া, তোর বন্ধু কী বলে রে?
রিয়া ইশারায় আমাকে বলল—ওসব ছাড় তো।
ঠিক বলেছিস। পাগলে কী না বলে!
অর্ণা রাগে উত্তেজিত হয়ে বলল—কী, আমি পাগল?
আমি বললাম—শান্ত হয়ে বস। কী বলতে এসেছিস বল।
অর্ণা বলল—আমরা গল্প করতে এসেছি।
রিয়া বলল—দাদা, আমরা কাল দীঘা বেড়াতে যাব। তাই তোর সঙ্গে বসে পরিকল্পনা করতে এসেছি।
দীঘা? আমি যাচ্ছি না।
যাচ্ছি না মানে?
যাচ্ছি না মানে যাচ্ছি না।
সে কী রে? তুই না গেলে কী করে হবে?
কী হবে?
মজা, হইহুল্লোড়।
হইহুল্লোড় আমার ভালো লাগে না।
বাবা, মা, মাসিমা, মেশোমশাই, অর্ণা সবাই যাবে। কতদিন একসঙ্গে আমরা কোথাও যাইনি, বল। বাবা-মা-এর তো ইচ্ছে করে সবার সঙ্গে বসে গল্প করা, আড্ডা দেওয়া।
তোরা যাচ্ছিস তো।
তাতে কী আছে? তুই না গেলে আমিও যাব না।
অর্ণা বলল—আমিও যাব না।
আমি বললাম—তোরা আমায় ব্ল্যাকমেল করছিস।
রিয়া, অর্ণা কিছু না বলে নিজেদের মধ্যে ইশারায় কী যেন বলল।
আমি বললাম—ঠিক আছে, আমি যাব।
ওরা আনন্দে একসঙ্গে লাফিয়ে উঠল। অর্ণা টাল সামলাতে না পেরে আমার গায়ের উপর এসে পড়ল। আমি সরে বসলাম।
পরের দিন আমরা যখন দীঘা পৌঁছোলাম তখন সকালের আড়ষ্টতা কাটিয়ে সূর্য সবে জেগে উঠছে। তার স্বর্ণাল রশ্মিচ্ছটা সমুদ্রের অপরিমেয় জলরাশির ওপর এক অপূর্ব মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের রচনা করেছিল। চারদিকে বালি আর বালি, তার মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি ঝাউগাছ। পিচ ঢালা রাস্তার গা বেয়ে নেমে গেছে সমুদ্রের আঁচল। তারপর ঢেউ আর ঢেউ। মাঝসমুদ্রে কয়েকটি মাছ ধরার লঞ্চ চোখে পড়ে। এরা প্রতিদিন কোথায় যায়? সমুদ্রের সোনালি, রূপালি মাছগুলি নিয়ে এদের সত্যিই লুকোচুরি খেলা চলে। সমুদ্রের পাড়ে বাঁধানো সিঁড়িতে বসে অসীম জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকলে মনের সমস্ত দুঃখ, বেদনা যেন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। আমি বারবার চেষ্টা করছি ঢেউগুলো গুনে দেখবার, দূর! তা কি পারা যায়! একটা শেষ হতে না হতেই আর একটা এসে আছড়ে পড়ে।
দূর আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিদের এত ধৈর্য নেই। পাড়ে বসে সমুদ্রের নৃত্য দেখে তাদের স্বাদ মেটে না। তাই তারা যতদূর সম্ভব সমুদ্রের ওপর উড়ে গিয়ে সমুদ্রের নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কারের চেষ্টা করে। এরা বেশ মুক্ত, স্বাধীন। কেউ এদের বাধা দেয় না, নিষেধ করে না। ‘আমার বাড়ি’, ‘আমার গাড়ি’ বলে চিৎকার করে না। অল্পতেই এরা তুষ্ট থাকে। সারাদিন শুধু প্রকৃতির সুধা-রস পান করে, আর মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়।
নীল ছাতা মাথায় আকাশ প্রতিনিয়ত সমুদ্রকে পাহারা দিয়ে যায়। তারা পরস্পর পরস্পরকে বড্ড বেশি ভালোবাসে। তারপর অনেকদূরে লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে আকাশ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। সেই জন্য মাঝে মাঝে সমুদ্র বড়ো উতলা হয়।
অর্ণা এসে আমার পাশে বসল। ওর পরনে জিনস আর টি শার্ট। চোখে কালো সানগ্লাস, কাঁধে একটা ছোট্ট ব্যাগ। ওকে বেশ স্মার্টই দেখাচ্ছিল।
বেড়াতে আসা উঠতি বয়সী ছেলেরা ওর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েছিল। ওকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টাও করছিল।
অর্ণা ওদের কথায় কর্ণপাত না করে আমায় বলল—প্রিয়ব্রতদা, এই সীমাহীন নীল আকাশ, গভীর সমুদ্রের নীল জলরাশি, আর শিরশির করে কথা বলা ঝাউবনে তোমার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে না?
খুব ইচ্ছে করে। তবে…।
তবে?
যে-কারুর সঙ্গে তো সময় কাটানো যায় না।
ঠিক বলেছ। আমারও যার তার সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে করে না।
করবে না।
কিন্তু যার সঙ্গে গল্প করতে চাই, যাকে মনের কথা জানাতে চাই, সে যদি আমাকে এড়িয়ে চলে?
তাহলে বুঝবে সে তোমাকে পছন্দ করে না।
আমার পছন্দের কোনো দাম নেই?
সেটা তোমার কাছে আছে। ওর কাছে নেই। তা ছাড়া…?
তা ছাড়া?
তুমি কি সত্যি সত্যি হৃদয়ের গভীরতা থেকে কাউকে পছন্দ কর? নাকি ওপরে ওপরে ভালোলাগে বলেই একথা বলছ?
তুমি একথা বলছ কেন?
এই সংসারে অনেকে আছে যারা নিজস্বতাকে গোপন রেখে শুধু বাইরের চোখ জুড়োনো অলঙ্কারে আবির্ভূত হয়। ভন্ড পুরোহিতরা অর্থ রোজগারের তাগিদে ন্যায়-অন্যায় জলাঞ্জলি দিতেও পিছপা হয় না, প্রতারক কালোবাজারির দল বাড়িতে সতীসাধ্বী স্ত্রীর নিকট পুরুষত্বের বড়াই করে বেড়ায়, বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল যে মুখোশের আড়ালে কি কুৎসিত রূপটাই না লুকিয়ে আছে।
রোদের তাপটা তরতরিয়ে বেড়ে চলছিল। নীল আকাশের বুকে এক ঝাঁক পাখি দল বেঁধে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত উড়ে বেড়াচ্ছিল। সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আনমনা হয়ে অর্ণা বলল—জান প্রিয়ব্রতদা, আমাদের পাশের বাড়িতে এক প্রতিবেশী কাকা আছে। অবিবাহিত। একটি মেয়েকে ভালোবাসত। মেয়েটিও বোধহয় কাকাকে ভালোবাসত। কেউ কাউকে কোনোদিন কিছু বলেনি। তারপর সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেল। জীবনে ভাটা এল। তারা কেউ আর বিয়েই করেনি।
আমি অর্ণার চোখে চোখ রাখলাম। দেখলাম ওর কাজল কালো চোখের ইশারা বদলে যাচ্ছে, ওর মুখের ভাষা বদলে যাচ্ছে, ওর ঠোঁটগুলো কেমন কাঁপছে।
দুর্গার কথা আমার মনে পড়ে। পৃথিবীর সব অজানা প্রশ্নের উত্তর, সব অবোঝা মনের আধার দুর্গার চোখেই খুঁজে পাই। মনে হয় যুগ যুগ ধরে, সীমা-পরিসীমা হারিয়ে যদি দুর্গার চোখে চোখ রাখতাম তাহলে কোনো কষ্ট থাকত না, কোনো অতৃপ্তি থাকত না। কি যাদু আছে দুর্গার দুই চোখে’ যা দেখলে কত অজানা প্রশ্নের উত্তর গড়গড় করে মুখে চলে আসে, পাথরের মতো কঠিন হৃদয়ও বরফের মতো গলে জল হয়ে যায়।
অর্ণা বলল—কি দেখছ?
তোকে।
সত্যি?
সত্যি।
দেখলাম, অর্ণার মুখখানি আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠল। সে উঠে দু-হাত মেলে কয়েক পাক ঘুরল। এক অদ্ভূত ভালোলাগায় তার দেহমনে তাপ সঞ্চারিত হল।
ভাবলাম, এই অর্ণারা আছে বলেই পৃথিবীতে প্রাণ আছে, জীবনরস আছে। এরা আছে বলেই রাতের আঁধার কেটে ভোর হয়, বসন্ত আসে।
একটা লাল হলুদ রঙের প্রজাপতি উড়ছিল ঝাউগাছটার ধার ঘেঁসে। ডালে বসে একটা দাঁড়কাক ডাকছিল কর্কশ স্বরে।
রিয়া এসে বলল—অর্ণা, তোর কী হয়েছে?
দারুণ খবর আছে।
কী খবর?
পরে বলব।
পরে বলিস। কিন্তু এখন চল, তোকে ডাকছে সবাই।
কেন?
কিছু তো খেতে হবে।
আমাদের জন্য পাঠিয়ে দে।
তুই নিয়ে আসবি চল।
রিয়া বলল—দাদা, তুই কী খাবি?
তুই যা খাবি, আমার জন্য তাই নিয়ে আসিস।
অর্ণা বলল—তোর দাদার খাবারটা আমিই পছন্দ করে নিয়ে আসব।
আমি কিছু বললাম না। বেড়াতে এসে কোনো অপ্রিয় কথা না বলাই শ্রেয়। মানুষের জীবন তো মাত্র কয়েকটা দিনের। তবে কেন এত রাগ-অভিমান? কেন চুরি, ছিনতাই, কপট অভিনয়? জীবনের সমস্ত মান-অভিমানকে বাক্সবন্দি করে সহজ আচরণ করলে কী এমন ক্ষতি হয়ে যাবে? কেন মিথ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি? মানুষের জীবনটা যদি সহজ হত, আঁকাবাঁকা পথ ছাড়িয়ে জীবন যদি ঝঞ্ঝাটহীন সরলরেখায় চলত, তাহলে কি জীবনের তাৎপর্য এমনভাবে অনুভব করতে পারতাম না? জীবন কি এতটা রোমাঞ্চময় হত না?
আমি উঠে সি-বিচে জলের কাছাকাছি গেলাম। দেখলাম ঢেউগুলো কেমন পাড়ে এসে একটার পর একটা আছড়ে পড়ছে, আর বুদবুদের মতো সাদা ফেনা তৈরি করে মিলিয়ে যাচ্ছে।
দেখলাম নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কিশোর-কিশোরীরা সেই ঢেউয়ে স্নান করে সমুদ্রের ঘ্রাণ অনুভব করছে। অরণ্যের কোলে যাদের জীবন কাটে, সমুদ্রের সঙ্গে যাদের আজন্ম পরিচয়, হয়তো তাদের কাছে অরণ্যের অপরিমেয় সৌন্দর্য কিংবা সীমাহীন সমুদ্রের কোনো বিশেষত্বই ধরা পড়ে না। অথচ যারা আমাদের মতো ক্ষণিকের ভ্রমণ পিপাসু মানুষ, তাদের কাছে অরণ্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি ঢালের অবর্ণনীয় দৃশ্য কিংবা নীল সমুদ্রের পাগলামি বারে বারে হাতছানি দেয়।
বেশ দূরে অনেকগুলো মাছ ধরার ট্রলার ঢেউগুলোকে ভেঙে ছলাৎ ছলাৎ করে ছুটে চলেছে। এখান থেকে সেগুলোকে ছোটো ছোটো ডিঙির মতোই দেখাচ্ছে। সমুদ্রের অকৃপণ জলরাশির আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা মাছগুলোকে বোকা বানিয়ে সহজেই তারা ঝুড়ি ভরতে পারে। অনেকে আছে যারা জ্ঞান হবার পর থেকে সমুদ্রের এই মৎস্যকন্যাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় কাটিয়ে দেয়।
দেখলাম দুজন তরুণ-তরুণী ঢেউয়ের তালে তাল মিলিয়ে স্নান করছে। হাত দিয়ে একে অপরকে ধরে রেখেছে। দেখে মনে হয় কলেজ পড়ুয়া প্রেমিক-প্রেমিকাই হবে।
এরা কি একে অপরকে ভালোবাসে? এরা কি হৃদয়ের ভাষায় কথা বলে? নাকি শুধু শরীরী আবেদন?
কী জানি? এক-একজনের চিন্তাভাবনা এক-একরকম। কেউ ভাবে ‘মানি ইজ এভরিথিং’। যদি কারুর প্রচুর অর্থ থাকে তাহলে ছেলে বা মেয়েটা ভোঁদা, গাধা না পাগল বিচার করে কী লাভ? কেউ কুমোরটুলির শিল্পী দেখে তার প্রেমে পড়তে চায়। কেউ-বা টেলিভিশনের পর্দায় মডেলদের দেখে প্রেমে পড়তে ইচ্ছে প্রকাশ করে। কেউ খোঁজে একটা মন, শুধু মন; যে তার মনের মনিকোঠায় আর একটা মন বাঁধতে পারে।
দুর্গার কথা মনে পড়ে। ও থাকলে বেশ মজা হত। ওকে নিয়ে গল্প করতে করতে সি-বিচে ঘুরে বেড়াতাম। ঘোড়ার পিঠে চেপে ছবি তুলতাম। আইসক্রিম খেতাম। একসঙ্গে সমুদ্রে নেমে স্নান করতাম। ও ঢেউ দেখে বলে দিত কোনটা পাড়ে এসে লাগবে আর কোনটা তার আগেই ভেঙে যাবে।
কতগুলো স্কুলপড়ুয়া ছেলে-মেয়ে এসে হাঁটু পর্যন্ত জলে নেমে সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করতে লাগল। স্কুল থেকে পিকনিকে এসেছে। সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকাও আছেন।
দুর্গা থাকলে ওদের সঙ্গে ভাব করতাম। ও ছোটোদের সঙ্গে সহজেই মিশতে পারে। ওদের কৈশোর মনের চাওয়া-পাওয়া অনায়াসে বুঝতে পারে। ও সঙ্গে থাকলে আমি বিশেষ জোর পাই, ভরসা পাই।
অর্ণা একটা প্যাকেট আমায় দিয়ে বলল—কেক, ডিম সেদ্ধ, নাড়ু আর কলা। কী পছন্দ হয়েছে?
বা! চমৎকার।
তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও, স্নান করতে যাব।
তুই রিয়ার সঙ্গে স্নান কর।
রিয়া ভিতু। ও বেশিদূর জলে নামবে না। আমি তোমার সঙ্গে স্নান করব।
তোরা মেয়েরা একসঙ্গে স্নান কর। আমি, বাবা, মেসো একসঙ্গে স্নান করব।
ওই ছেলে মেয়ে দু-জন কেমন একসঙ্গে স্নান করছে।
ওরা প্রেমিক-প্রেমিকা।
আমরাও…। অর্ণা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। রিয়া এসে বলল—দাদা, আমরা তিন জন একসঙ্গে স্নান করব। মা, মাসিমা, মেসো আর বাবা একসঙ্গে।
—ঠিক আছে, চল।
অর্ণা কটমট করে রিয়ার দিকে তাকাল। শিকারির হাত থেকে শিকার হাতছাড়া হলে যেমন রেগে গমগম করে, সেইমতো অর্ণা বলল—আমি একা একাই স্নান করব।
রিয়া কোনোমতে ওকে শান্ত করল।
আমি বললাম—তোরা চেঞ্জ করে আয়। আমিও রেডি হয়ে আসছি।
স্নানের জন্য গাড়িতে একটা ট্রাউজার আর স্যাণ্ডো গেঞ্জি রাখা ছিল। আমি এসে দেখি রিয়া একটা চুড়িদার পরে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম—অর্ণা আসেনি।
ও চেঞ্জ করে আসছে।
যা গায়ে পড়া মেয়ে!
ও এইরকমই। দু-দিনের জন্য এসেছে। মাথা না-ঘামালেই হল। তবে ভেতরটা পরিষ্কার।
একটু বেপরোয়া।
একটু আধুনিক।
একে আধুনিকতা বলে না বুঝলি। রুচিবোধের অভাব।
থাক না ওসব। স্নানের আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে।
আমি কালই বর্ধমান চলে যাব।
বুঝেছি।
কি বুঝেছিস?
বর্ধমানের প্রতি টানটা ইদানীং বেশ বেড়েছে।
অর্ণা লাফাতে লাফাতে চলে এল। পরণে একটা বারমুডা সাইজের প্যান্ট, আর পাতলা টাইট গেঞ্জি।
ওর দিকে তাকিয়ে রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললাম—দেখলি, কী বলেছিলাম?
রিয়া কিছু বলল না।
আমরা একসঙ্গে স্নান করতে লাগলাম। একটার পর একটা ঢেউ এসে আমাদের গায়ে আছড়ে পড়তে লাগল। আর তাতে সমুদ্রের জলরাশির স্পর্শানুভূতি উপভোগ করতে লাগলাম। এর একটা বিশেষ স্বাদ আছে, বিশেষ অনুভূতি আছে।
প্রতিটা ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্ণার আনন্দের উচ্ছ্বাস প্রকাশ পাচ্ছিল।
ও ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে সমুদ্রের গভীরে চলে যাচ্ছিল। ওর খেয়ালই ছিল না। আমি বুঝতে পেরে ওর হাত ধরে টানতেই ও আমার বুকে এসে আমাকে আঁকড়ে ধরল। আমার সারা শরীরে উষ্ণ রক্তস্রোত বইতে লাগল। ওর হৃৎপিন্ডের ‘লব-ডুব’ শব্দটা আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। ও আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরছিল।
আমি ওকে একটু পাড়ের কাছে নিয়ে এসে বললাম—তুই গভীরে যাচ্ছিলি কেন?
ও এতক্ষণে আমাকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল—তাই বুঝি?
রিয়া বোধহয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল—চল দাদা, আর স্নান করব না। অর্ণা তুইও চলে আয়।
ঘটনাটা শুনে বাবা-মা, মেসো-মাসিমা সবাই রেগে আগুন। বাবা আমাকে বলল— তোদের আলাদা করে স্নান করার কী দরকার ছিল? আমরা একসঙ্গে স্নান করতে পারতাম।
মা বলল—কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটলে কী হত বল তো?
মেসো বলল—এই জন্যই ওকে একা একা ছাড়ি না।
মাসিমা তো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
বাবা বলল—চলো সবাই। খাওয়া-দাওয়া করতে হবে।
হোটেলে বসে খাচ্ছিলাম। মেসো, মাসিমা আমার দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল। যেন আমি কোনো অপরাধ করেছি। আমার জন্যই এটা ঘটেছে।
আমি ঘটনাটা বলতে যাচ্ছিলাম, রিয়া আমাকে হাত দিয়ে নিষেধ করল। এটা নিয়ে বাবার সঙ্গে মেসোমশাইদের ভুল বোঝাবুঝি হোক—রিয়া তা চাইছিল না। আমি দাগি অপরাধীর মতো সব কিছু শুনছিলাম।
বিকেলে আমরা বেশ কিছুক্ষণ সমুদ্রের পাড়ে একসঙ্গে বসেছিলাম। পড়ন্ত সূর্যের লালাভ বিচ্ছুরণ সমুদ্রের নীল জলরাশির ওপর পড়ে যে অপূর্ব দৃশ্যের রচনা করেছিল, তা আমরা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলাম। অর্ণা বেশ কয়েকটা মুহূর্তের ছবি ক্যামেরাবন্দি করেছিল।
তারপর আমরা সবাই মিলে সি-বিচে হাঁটতে লাগলাম। অনেকদিন পর বাবা-মা-এর মুখে হাসি দেখতে পেলাম। সন্তানেরা এইভাবে কাছাকাছি থাকলে হয়তো প্রত্যেক বাবা-মা-ই এভাবে খুশি হয়।
দেখলাম, সি-বিচের ওপর লাঠি হাতে এক বৃদ্ধা শামুক গতিতে হেঁটে যাচ্ছিল। ওর বৈধব্যের চেহারাটাই বলে দিচ্ছিল তাকে ছেড়ে তার সঙ্গীটি অনেকদূর চলে গেছে, আজ এত বড়ো দুনিয়ায় সে বড়ো একা।
আমাকে অন্যমনস্ক দেখে রিয়া বলল—তোকে কেমন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। কিছু ভাবছিস?
না, কিছু না।
অর্ণা বলল—তোর দাদা দেখছি ঘন ঘন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে।
আমি বললাম—আমাকে এত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার কোনো কারণ আছে কি?
ক্রমশঃ প্রকাশ্য।
সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এবার একটু নিজের মতো করে থাকা যাবে। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, অর্ণা ঘরে ঢুকে বলল—আসব?
কে? তুই?
হ্যাঁ, আমি।
আবার কী বলবি?
ও একটা গোলাপ আর পেন হাতে দিয়ে বলল—এগুলো তোমার জন্য।
কেন?
তুমি কি কিছুই বুঝতে পার না?
কী ব্যাপারে?
তুমি কি অন্য কোথাও…?
বুঝতে পেরেছিস তাহলে?
অর্ণা দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দৌড়ে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পরের দিন ও আর আমার মুখোমুখি হয়নি। বিকেলে বাড়ি চলে যাওয়ার সময় আমার কাছে এসে বলল—‘ভালো থেকো।’
আমি ওর যাত্রাপথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন