পরের বারে আমি নেট পেলাম। আইনে নেট পাওয়া আমার কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার সমান। ইউনিভার্সিটি থেকে গত কয়েক বছরে কেউ এই বিষয়ে নেট পায়নি। ডিপার্টমেন্টে উৎসবের বন্যা বয়ে গেল। শিক্ষক থেকে সহপাঠী, শুভাকাঙ্ক্ষীরা সবাই আমাকে শুভেচ্ছা জানাল।
অল্পের জন্য এবারের নেটটা দুর্গার হাতছাড়া হল। একটা পেপারে ওর প্রাপ্ত নম্বর একটু কম। বাকি পেপারে অনেক নম্বর পেয়েছে।
দুর্গা এখন কলকাতায় নেই। ও দেশের বাড়িতে গেছে। বাবা খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভরতি করাতে হয়েছে।
আমি দুর্গাকে ফোন করে খোঁজ নিতে পারছি না। ওদের গ্রামের বাড়িতে তখন ফোন আসেনি। আমার আনন্দের খবরটা ওকে জানাতে চাই। আর কাকাবাবু কেমন আছেন, অসুখ কতটা গুরুতর তা জানতে চাই। মনটা বড়ো উতলা হয়ে ওঠে।
আমাকে নিয়ে সবাই হইহুল্লোড় করছে, মেসের ছেলেরা, ডিপার্টমেন্টের সকলে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। অথচ আমার মধ্যে সেই উচ্ছ্বাস নেই।
দুর্গার মনের অবস্থা এখন কীরকম? তার উদবেগ, মনের যন্ত্রণা কি আমাকে কম কষ্ট দেয়? ওর মনের অস্থিরতায় কি আমি স্থির থাকতে পারি? কাকাবাবুর অসুস্থতায় আমারও কম দুশ্চিন্তা হচ্ছে না!
বাসায় গিয়ে মনমরা হয়ে বসে থাকছি। ডিপার্টমেন্টে এসেও কাজে মনোনিবেশ করতে পারছি না। কোথায় যেন একটা অভাব, হাহাকার। পাশাপাশি এত মানুষ, এত শুভাকাঙ্ক্ষী, তবু মনে হচ্ছে কেউ কোথাও নেই। এরা কেউ কাছের নয়, নিজের নয়।
আমার চেনা-জানা চোদ্দোজন নেট পেয়েছে। ওরা সবাই মিলে একটা প্রোগ্রাম করল। আমার কোনো ইচ্ছাই ছিল না তাতে অংশ নেওয়ার। দুর্গা কাছে নেই, পরন্তু কাকাবাবু কেমন আছে জানি না। মনের মধ্যে একটা সংশয়, একটা অজানা আশঙ্কা। কাকাবাবুর খারাপ কিছু ঘটল না তো?
ডিপার্টমেন্টের ছেলেরা একপ্রকার জোর করে আমায় প্রোগ্রামে নিয়ে গেল। সবার সঙ্গে পরিচয়পর্ব মেটার পর আমি দর্শকাসনে সারাক্ষণ চুপচাপ বসেছিলাম। এক-একজন তাদের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কথা বলতে লাগল। আগামী দিনে যারা নেট দেবে তাদের কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ইত্যাদি পরামর্শ দিল।
একটি মেয়ে উঠে বলল—প্রত্যেকটা বিষয় খুঁটিয়ে পড়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে ধীরে ধীরে প্রতিটি বিষয়ে ঢুকতে হবে। একসময় ওটা নিজের করায়ত্ত হয়ে যাবে। তা ছাড়া পরিশ্রম, অধ্যবসায়, দৃঢ়সংকল্প ও আত্মবিশ্বাসই সাফল্যের চাবিকাঠি। একবার হল না বলে হাল ছেড়ে বসে থাকলে চলবে না।
মেয়েটা কম বয়সিই হবে। বটানিতে এম. এসসি. করে প্রথম চান্সেই নেট পেয়েছে। ফর্সা, স্লিম, সুশ্রী। চঞ্চলা হরিণীর মতো চটপটে। ও কথাগুলো বলার সময় মাঝে মাঝে চুলগুলো মুখের উপর থেকে সরাচ্ছিল আর আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার চোখ দুটো ওর মুখের দিকে, ওর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে চলে যাচ্ছিল। মেয়েটার নাম ইশিতা, ইশিতা দাস, ‘ল’ ডিপার্টমেন্টের একটা সেমিনারে ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ওখানে ওর একটা প্রেজেন্টেশন ছিল।
সকলের পীড়াপীড়িতে আমাকে উঠে কিছু বলতে হল। বললাম—আমি ইশিতার সঙ্গে একমত। প্রতিটা বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে যে ধারণা তৈরি হয়, তাতে এই ধরনের পরীক্ষায় খুবই সাহায্য করে। তা ছাড়া শিক্ষকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা কিংবা একসঙ্গে বসে আলোচনা দরকার, তাতে অনেক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা যায়।
যারা প্রোগ্রামে উপস্থিত ছিল তারা প্রত্যেকেই একবার আমার দিকে, একবার ইশিতার দিকে তাকাচ্ছে। কেউ কেউ ফিসফিস করে কী যেন বলছে আর মুখ টিপে হাসছে।
প্রোগ্রামে গান, আবৃত্তি, শ্রুতিনাটক, হাস্যকৌতুক, ম্যাজিক শো প্রভৃতি হল। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ছাত্র-ছাত্রীরাই পরিবেশন করল। ইশিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ ‘কৃষ্ণা’ কবিতাটা আবৃত্তি করল। অসাধারণ অনুভূতির বহি:প্রকাশ। সকলের সঙ্গে আমিও হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানালাম।
প্রোগ্রাম শেষে ডিপার্টমেন্টের ছাত্র-ছাত্রীরা চলে গেল। আমরা যারা নেট পেয়েছি তারা বসে গল্প করছিলাম। সবাই মিলে বলল—কাছাকাছি কোথাও পিকনিকে যাবে। আমি জানালাম, আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। আমার এক অতিকাছের মানুষ এখানে নেই। আমার এক একান্ত আপনজন অসুস্থ। আমি সবসময় একটা চিন্তা আর আশঙ্কার মধ্যে আছি। আমার পক্ষে কোথাও গিয়ে আনন্দ হইচই করা সম্ভব নয়।
ফিজিক্সের সঞ্জীব বলল—প্রিয়ব্রত তুই না করিস না। একটা মাত্র দিন। ভোর বেলা যাব, সন্ধ্যায় ফিরে আসব।
আমি বললাম—তুই বুঝতে পারছিস না, আমার সত্যিই অসুবিধে আছে।
হঠাৎ করে ইশিতা বলল—আমারও একটু ব্যক্তিগত সমস্যা আছে, যেতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।
সঞ্জীব বলল—তোমার আবার কী সমস্যা? প্রত্যেকে এভাবে বললে কী করে হবে?
আমি বললাম—আমায় একটু মেদিনীপুর যেতে হবে। আমার প্রিয়জনের অসুস্থতার সময় তার পাশে দাঁড়াতে হবে। তোরা কী বলিস?
সঞ্জীব বলল—তাহলে পিকনিকটা আমরা পেছোতে পারি। এই সপ্তাহের পরিবর্তে পরের সপ্তাহে যাব।
আমি বললাম—আমার যাওয়া হবে না রে। আমায় বাদ দিয়ে তোরা চিন্তাভাবনা কর।
ইশিতা রেগে-মেগে গর্জন করতে করতে বলল—ও বোধহয় আমাদের সঙ্গে যেতে চায় না।
আমি বললাম—তোমরা ভুল বুঝছ। আমার অন্যরকম অসুবিধে আছে।
ইশিতা বলল—ও না গেলে আমিও যাব না।
ইশিতার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। ও কী বলছে? কেন বলছে?
সঞ্জীবরাও একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল। ইশিতা এরকম প্রতিক্রিয়া জানাবে ওরাও ভাবতে পারেনি। কারুর ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতেই পারে, পিকনিকে না যাওয়ার অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে, কিন্তু একজন যাবে না বলে আর এক জন যাবে না, এর কোনো কারণ তাদের জানা নেই। প্রিয়ব্রতের সঙ্গে ইশিতার প্রেমের সম্পর্ক নয়। তাহলে এর পেছনে আর কী সমীকরণ থাকতে পারে?
আমি বড়ো অস্বস্তিতে পড়লাম। বিশ্বাস না করলেও সকলের মধ্যে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে একটা ‘কিন্তু’ থেকে গেল।
সঞ্জীব বলল—তুই আর না করিস না, তাহলে পিকনিকটাই ভেস্তে যাবে। আমি বাধ্য হয়ে সম্মতি জানালাম।
পরের রবিবারই সবাই মিলে ডায়মণ্ড হারবারে গেলাম। সকাল সাতটা নাগাদ শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে উঠলাম। ডাউন ডায়মণ্ড হারবার লোকাল। জানালার পাশে একটা সিটে বসলাম। মুখোমুখি বসল ইশিতা। আমার পাশে সঞ্জীব, জয়দীপ। ট্রেন একটার-পর-একটা স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে আর ইশিতা বেশ উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করছে—আর ক-টা স্টেশন বাকি আছে?
সঞ্জীব বলল—আর দশ-পনেরোটা হবে।
ইশিতা বলে—তুমি এর আগে ডায়মণ্ড হারবার গেছ?
সঞ্জীব বলে—দু-বার গেছি। তবে কোথাও বেড়ানো সম্ভব হয়নি। কোনো বিশেষ কাজে গেছি। কাজ শেষ করে ফিরে এসেছি।
পিয়ালি বলল—কলেজে পড়াকালীন বন্ধুদের সঙ্গে একবার বেড়াতে গেছিলাম। তবে আজকের মজাটাই আলাদা।
আমি জানালা দিয়ে রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ঘর-বাড়ি, গাছপালা, মাঠ, খেত দেখতে দেখতে দুর্গার কথা ভাবছিলাম। দুর্গার নরম, কোমল, নিষ্পাপ মুখমন্ডল আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে কাকাবাবুর স্নেহ জড়ানো অভিভাবক সুলভ মুখখানা।
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্গার সঙ্গে পরিচয়, তারপর নিজেদের চেনা-বোঝা, কলকাতায় এসে আরও কাছাকাছি হওয়া, নিজেদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা ইত্যাদি ইত্যাদি। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় দুর্গা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আমার পাশে বসে আছে, হাতে হাত রেখে বলছে—দেখো গ্রামের এই ছেলেগুলো একটু পড়াশোনার সুযোগ পেলে, ঠিকমতো পরামর্শ পেলে অনেকদূর যেতে পারবে। নিজেরা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ওদের নিয়ে কিছু করতে হবে।
আমাকে অন্যমনস্ক দেখে, ইশিতা বলল—একজন তো কিছু বলছে না।
সঞ্জীব আমার হাতে হাত রেখে বলল—তুই কোনোদিন ডায়মণ্ড হারবার গেছিস?
আমি বললাম—গেছি।
সঞ্জীব বলল—একা একা গেছিস, না কারুর সঙ্গে?
আমি বললাম—এত জেনে কী দরকার? গেছি ব্যাস।
ইশিতা আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল—ছেড়ে দাও না সঞ্জীবদা, বলতে না চাইলে জোর করার কিছু নেই।
আমি বললাম—বিশেষ কারণে আমি আসতে চাইছিলাম না। তোরা জোরাজুরি করলি। তাই এলাম। আবার এত কথার কী আছে?
ইশিতা বলল—আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি, কোনো সেমিনারে বা ইন্টারভিউ দিতে আসিনি।
জয়দীপ বলল—তোরা কি সমুদ্রে স্নান করবি?
পিয়ালি বলল—হ্যাঁ, আমরা স্নান করব, আর তোরা ড্যাবড্যাব করে আমাদেরকে দেখবি।
জয়দীপ তখন বলল—তোরা আলাদা জায়গায় স্নান করবি।
সঞ্জীব বলল—এটা দীঘা কিংবা পুরী নয়। সি বিচ নেই। এখানে স্নান করা প্রচন্ড ঝুঁকির হয়ে যাবে।
আমি বললাম—আমি স্নান করব না, বাড়িতে স্নান করে বেরিয়েছি।
ইশিতা বলল—আমিও স্নান করে এসেছি।
ইশিতার কথায় ওরা আবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। জয়দীপ বলেই ফেলল— প্রিয়ব্রত যা করে ইশিতাও তাই করে দেখছি। আমি আমার সিট ছেড়ে অন্য জায়গায় উঠে গিয়ে বসলাম।
আমি বুঝতে পারছিলাম না ইশিতা কেন এমন করছে। ওর এধরনের কথাবার্তায় একটা অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি হচ্ছে। ইশিতা নিজে কি এটা বুঝতে পারছে না? নাকি এটা ইচ্ছাকৃতভাবে জেনে-বুঝেই করছে? তা যদি করে থাকে তবে তার উদ্দেশ্য কী?
একবার ভাবলাম ওকে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। আজকের পর ওর সঙ্গে আর যোগাযোগ না রাখলেই হল। পরে ভাবলাম—ওর সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে কথা বলে মিটিয়ে নেওয়াই ভালো।
আমি আমার মতো বসে এটা-ওটা ভাবছিলাম আর মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। ও ভাবলেশহীনভাবে বসে আছে। যেন কোনো ব্যাপারই নয়। যেন কোনো কিছুই ঘটেনি। ওর কথাবার্তায় বিশেষ কোনো পরিবর্তন লক্ষ করলাম না।
আমি জানালা দিয়ে দেখছিলাম উঁচু-নীচু মাঠে ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা খালি পায়ে খেলাধুলা করছে। একটা সিগন্যালের কাছে আমাদের ট্রেনটা দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি বারবার ঘড়ি দেখছি আর ভাবছি কখন ট্রেনটা ছাড়বে আর কখন পৌঁছোব ডায়মণ্ড হারবারে।
এই সময় একটা চোদ্দো-পনেরো বছরের মেয়ে সাহায্যের প্রার্থনায় আমার সামনে এসে দাঁড়াল। রোগা, রুক্ষ্ণ, বিবর্ণ মুখমন্ডল উশকোখুশকো চুল। পরিচর্যার অভাবে শরীরের মলিনতা উধাও। পরনে পুরোনো ময়লা চুড়িদার। ওড়নাটা টেনে বারবার উন্নত বক্ষযুগল ঢাকবার চেষ্টা করছে। ট্রেনের যাত্রীরা ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
আমি জানতে চাইলাম—কী হয়েছে তোমার?
বাবা অসুস্থ। ডাক্তার দেখানোর অনেক খরচ। সাহায্য না পেলে বাবাকে বাঁচানো যাবে না।
তোমার মা কী করে?
মা চলে গেছে।
চলে গেছে মানে?
আমাদের ছেড়ে অন্য একজনকে বিয়ে করে চলে গেছে।
তোমাদের কোনো ভাই-বোন নেই?
একটা ভাই আছে। ছোটো। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। পড়াশোনায় খুব ভালো।
তুমি পড়াশোনা করছ না?
এই বছর মাধ্যমিক দেব।
বা! এত অসুবিধের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছ।
আমি একটা দশ টাকার নোট ওর হাতে দিতেই ও দু-হাত কপালে টেকিয়ে পাশের যাত্রীর দিকে চলে গেল। আমার দেখাদেখি সহযাত্রীরা অনেকেই দু-টাকা, পাঁচ টাকা দিয়ে সাহায্য করল।
আমি মনে মনে এই অসহায় মেয়েটিকে কুর্নিশ জানালাম। এত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ওর লড়াই করার মানসিকতা দেখে অমি সত্যিই মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। তার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি মনের দৃঢ়তাকে পঙ্গু করে দিতে পারেনি। আমাদের দেশের এইসব সংগ্রামী মানুষের অনেক টুকরো টুকরো অংশই আমার সামনে প্রতিভাত হতে লাগল।
আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলাম, পিয়ালি আমাকে বলল—ইশিতার একটু আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন। তুমি একটু সাহায্য করবে?
ওর কীজন্য অর্থের প্রয়োজন?
সেটা জানাতে হবে?
ওকে আমার সামনে এসে তার প্রয়োজনের কথা জানাতে হবে।
তাহলে তুমি সাহায্য করবে তো?
প্রয়োজনটা জানার পর যদি মনে করি সাহায্য করা দরকার, আমার সাধ্যমতো করব।
ইশিতা বলল—ওর সাহায্যের দৌড় তো দশ টাকা।
আমি বললাম—তার চেয়ে কমও হতে পারে।
পিয়ালি বলল—তুমি দশ টাকার চেয়ে কমিয়ো না।
আমি বললাম—সে দেখা যাবে।
পিয়ালি বলল—আমি ইশিতার হয়ে চাইলে হবে না।
না, নিজেকে দু-হাত জোড় করে চাইতে হবে।
সঞ্জীব বলল—ও যদি তোকে চেয়ে বসে।
আমি বললাম—আজে-বাজে বলিস না।
কামরার অন্যান্য যাত্রীরা আমাদের কথাবার্তা বেশ উপভোগ করছিল। কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে বলল—আজকালকার ছেলে-মেয়েরা ভদ্রতা সভ্যতা জানে না। বড়ো-ছোটো জ্ঞান নেই। যা মুখে আসছে তাই বলছে।
ইশিতা উঠে আমার দিকে আসছে। সত্যি সত্যিই আসছে। আমি ভাবছিলাম—ও বোধহয় ইয়ার্কি করছে। কিন্তু ও তো দেখছি সত্যি সত্যি আসছে। সবাই হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কী করি, কী বলি তা দেখার ও শোনার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
ইশিতা এসে আমার কাছে হাতজোড় করে বলল—তোমার পাশে বসতে পারি? আমি অবাক বিস্ময়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ইশিতা আবার বলল—আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না? আমি কি তোমার পাশে বসতে পারি? আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম—হ্যাঁ নিশ্চয়, নিশ্চয়ই।
এই বলে আমি একটু সরে গেলাম। পাশের ভদ্রলোকও উলটোদিকে চেপে বসল। ইশিতা আমার পাশে আমার গা ঘেঁষে বসল।
আমি কিছু না বলে চুপচাপ বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর ইশিতা বলল—তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলবে না?
আমি বললাম—কথা বলব না কেন?
তুমি আমার ওপর খুব রাগ করেছ না?
স্বাভাবিক নয় কি?
আমি মনে করি না।
তোমার মনে করার ওপর সব কিছু নির্ভর করে না।
আমি এমন কিছু বলিনি যাতে তুমি রাগ করতে পার।
তুমি বললে কেন যে আমি না এলে তুমিও আসবে না।
সকলে মিলে না এলে আসার মজাটাই থাকে না।
তুমি তো সকলের কথা বলনি, শুধু আমার কথা বলেছ।
তুমি কি সকলের মধ্যে একজন নও?
অন্য কেউ না এলে তুমি কি একই কথা বলতে?
যেটা হয়নি তা নিয়ে আলোচনা করে কোনো লাভ নেই।
যদি সেরকম কিছু হত তাহলে কি একই কথা বলতে?
তখন ভেবে দেখা যেত।
তার মানে তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে বলেছ?
বুঝতে যখন পারছ তখন বলছ কেন?
তুমি এটা ঠিক করনি।
কেন?
সবাই কী ভাবল বল তো।
কে কী ভাবল তাতে কী এসে যায়।
তাতে আমারও কিছু এসে যায় না। কিন্তু যেখানে কোনো সম্পর্ক নেই, তাই নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হওয়াটা কাজের নয়।
আজ সম্পর্ক নেই, কাল হবে।
হবে না।
কেন হবে না?
বললাম তো হবে না, বেশ।
ইশিতা কী একটা বলতে যাচ্ছিল, পিয়ালি বলল—তোরা টিফিন করবি তো? এই বলে দুটো টিফিনের প্যাকেট আমাদের কাছে পাঠাল।
এক কোয়ার্টার রুটি, দুটো কলা, ডিম সেদ্ধ আর সন্দেশ। বেশ খেলাম আমরা। পেটে খিদে থাকলে কার মনমেজাজ ঠিক থাকে?
ইশিতা বলল—আজ খুব ভালো লাগছে।
আমি বললাম—স্বাভাবিক।
এই প্রথম নিজেকে মুক্ত, স্বাধীন মনে হচ্ছে।
এতদিন তুমি পরাধীন ছিলে?
বাবা-মা-র উপর তো নির্ভরশীল ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার হাতখরচাও মায়ের কাছ থেকে নিতে হত।
এখনও তুমি চাকরি-বাকরি পাওনি।
খুব শিগগির পেয়ে যাব। শুধু নেটের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
তোমার কি ব্যবস্থা করা আছে?
একটা কলেজে পার্ট টাইম বা গেস্ট লেকচারার হিসেবে ঢুকে যাই। বাকিটা পরে দেখা যাবে।
তোমার তো ব্যবস্থা করাই আছে। একটা কলেজে পার্টটাইম পড়াচ্ছ। এবার তো স্থায়ী ব্যবস্থা শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ব্যাপারটা এত সহজ নয়।
তেমন কঠিনও নয়।
তুমি আমার সম্বন্ধে বেশ জান দেখছি।
জানতে হয় মশাই।
আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারও জান?
সব জানি।
ডায়মণ্ড হারবার স্টেশনে ট্রেন ঢুকল। আমরা ট্রেন থেকে নেমে রিকশা করে সমুদ্রের পাড়ে যাচ্ছি। ইশিতা আর আমি রিকশা করে যাচ্ছি, আর আমার দুর্গার কথা মনে পড়ছে। দুর্গার সঙ্গে প্রথম আলাপের দিনও আমরা রিকশা করে বর্ধমান শহরে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছি। হাতে হাত রেখে গায়ে গা ছুঁয়ে পাশাপাশি বসে যে অনুভূতি হয়েছিল, আজও তা স্পষ্ট বুঝতে পারি। দুর্গার সততা, মৌলিক চিন্তাভাবনা, তার ব্যক্তিত্ব, প্রতিবাদী চরিত্র আমাকে বারবার ভাবায়, আলোড়িত করে। শয়নে-স্বপনে আমার সারাহৃদয় জুড়ে দুর্গার অবাধ বিচরণ। ও কাকাবাবুর অসুস্থতায় উদবিগ্ন হয়ে ছোটাছুটি করছে, আর আমি এই গায়ে-পড়া মেয়েটার সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি, মজা করছি! এই মেয়েটা আমার সমস্ত সম্পর্ক ছিঁড়ে তছনছ করে দিচ্ছে। দুর্গা ছাড়া আর কারুর পাশে বসে ঘুরে বেড়াতে আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
এমন সময় ইশিতা বলল—তুমি রিকশাওয়ালাকে বলো, আমরা অন্য দিকে চলে যাই।
আমি বললাম—ওরা তো আমাদের খুঁজে পাবে না।
খুঁজে না পাক। আমরা আমাদের মতো ঘুরে বেড়াব, মজা করব, আনন্দ করব।
তা হয় নাকি? ওরা দুশ্চিন্তা করবে।
আমরা কি বাচ্চা ছেলে-মেয়ে? আমরা আমাদের মতো ঘুরতে পারি না?
কিন্তু একসঙ্গে এসেছি তো?
আবার একসঙ্গে ফিরে যাব। ছ-টার ট্রেনটা ধরলেই হল।
আমি মহাবিপদে পড়লাম। ইশিতা যে মাঝপথে এসে এসব করবে আমি বুঝতে পারিনি। ও কি পূর্বপরিকল্পনা করে এসব করছে! তাহলে ওকে ছেড়ে দিয়ে আমিও কেটে পড়তে পারি। সেটা কি ঠিক হবে? সঞ্জীবরা কোনদিকে গেল, কোথায় গেল তা তো জানি না। ফোন থাকলে জিজ্ঞেস করে নিতে পারতাম। ওদের কারুর কাছে ফোন নেই। ওদের কোথায় খুঁজব? রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে ইশিতার সঙ্গে ঝগড়া করা বড়ো অশোভনীয় দেখাবে।
অগত্যা ইশিতার কথামতো স্টেশন থেকে অনেক দূরে, কলেজ মাঠ ছাড়িয়ে সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে উঠলাম। নির্জন জায়গা। ধারে-কাছে কেউ কোথাও নেই। কয়েকটি স্মৃতিফলক দাঁড়িয়ে আছে। বেশ অনেকটা দূরে ইটভাটার চিমনি থেকে সাদা-কালো ধোঁয়া কুন্ডলী পাকাতে পাকাতে ওপরের দিকে উঠছে। মাইল খানেক দূরে জেলে মাঝিদের ছোটো ছোটো মাছ ধরার নৌকো ভেসে বেড়াচ্ছে।
আমি ইশিতাকে বললাম—এদিকটা নির্জন, এদিকে যাওয়া ঠিক হবে না। কোনো বিপদ ঘটলে চিৎকার করে মরে গেলেও কেউ বাঁচাতে আসবে না।
আমি তো নির্জন জায়গাই বেশি পছন্দ করি।
তোমার মতলবটা কি বলো তো?
মতলব কিছুই নয়। দু-জন একান্তে গল্প করার সময় তৃতীয় কেউ না থাকলেই ভালো।
থাকলে ক্ষতি কী?
ও আমার গালটা টিপে বলল—কিছুই বোঝ না যেন।
আমি বুঝতে পারছি আমি একটা ট্র্যাপে পড়ে গেছি। ধীরে ধীরে আরও গভীর জলে তলিয়ে যাচ্ছি। এখান থেকে বের হবার কোনো রাস্তা দেখছি না। ইশিতা একটা অভিসন্ধি নিয়ে এখানে এসেছে। ঠাণ্ডা মাথায় ব্যাপারটা সামলাতে হবে।
যা ভয় পেয়েছিলাম তা হল না। ইশিতা আমাকে নিয়ে কোনো বেহায়াপনা করল না। ওর ছোটোবেলার গল্প, বাবা-মায়ের গল্প, কলেজজীবন থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত ঘটা টুকরো টুকরো অনেক কথাই বলল। অমি নির্বাক শ্রোতা হয়ে সব শুনলাম। বুঝলাম, ও আমাকে অনেক আগে থেকেই চেনে। ভালো শিক্ষক হিসেবে, সেমিনারে ভালো বক্তা হিসেবে, মেধাবী ছাত্র হিসেবে অন্য অনেকের মতো আমাকে চেনে।
আমি প্রায় ভুলেই গেছিলাম যে আমাদের ‘ল’ ডিপার্টমেন্টের একটা সেমিনারে ওর সঙ্গে পরিচয়, আলাপ হয়েছিল। তারপর আর কোনো যোগাযোগই ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেমন হয় আলাপ-পরিচয়ের পর যোগাযোগ না থাকলে ধীরে ধীরে লোকে ভুলে যায়।
যতটা বুঝলাম ইশিতা আমার আর দুর্গার ব্যাপারে কিছুই জানে না। একবার ভাবলাম দুর্গার কথাটা ওকে বলি। তাহলে আমাকে নিয়ে ওর যে স্বপ্নালু পরিমন্ডল তৈরি হয়েছে, তা ধীরে ধীরে ভেঙে যাবে। নিজে থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যাবে। পরক্ষণে ভাবলাম, আজকের ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব না দেওয়াই ভালো। ইশিতার সঙ্গে আর যোগাযোগ না রাখলেই হল।
সারাদিন ওখানে কাটানোর পর আমরা কিছুটা হেঁটে এসে রিকশা ধরে স্টেশনে এলাম। দেখলাম জয়দীপ, সঞ্জীব, পিয়ালিরা টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
জয়দীপ বলল—তুই আমাদের না জানিয়ে ইশিতাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেলি?
সঞ্জীব বলল—এখানে আমরা সবাই মিলে বেড়াতে এসেছি। তোরা যদি একান্তে গল্প করবি, আলাদাভাবে আসতে পারতিস।
পিয়ালি বলল—তোমরা না ফিরলে তোমাদের বাড়ির লোকজনকে গিয়ে কী বলতাম? কত ছেলে-মেয়ে বাড়িতে না জানিয়ে নিজেরা বেড়াতে গিয়ে লজে রাত কাটিয়ে বাড়ি ফিরছে।
ইশিতা বলল—আমরা তো ফিরে এসেছি। এখন এত কথার কী আছে?
সঞ্জীব আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল—তুই একবার আমাদের বলতে পারতিস।
ইশিতা বলল—ওকে দোষ দিচ্ছিস কেন? আমিই ওকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেছিলাম।
সবাই চুপ করে গেল।
লজ্জায়, অপমানে, অশ্লীল ইঙ্গিতে আমার এতদিনের উঁচু মাথাটা নীচু হয়ে গেল। সারারাস্তা একটি কথাও বললাম না। যাদবপুর আসতেই ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সবাইকে হাত নেড়ে নেমে গেলাম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন