দেওয়াল ঘড়িটা টিক টিক করে বেজে চলেছে। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। আমার নরম, কোমল, স্পর্শকাতর চোখের পাতা দু-টি কঠিন পাথরের মতো স্থির হয়ে আছে, প্রতিজ্ঞা করেছে তারা কিছুতেই বুজবে না। চোখের সামনে আমার লালিত্যময় ছোটোবেলা, বাবা-মা-বোনের অপরিমেয় স্নেহ-ভালোবাসা, যৌবনের সুখস্মৃতির টুকরো টুকরো অংশ ভাসতে থাকে।
বাবা অজিত বিশ্বাস, মা তন্ময়ীদেবী আর বোন রিয়াকে নিয়ে আমাদের ছিল সুখের সংসার। জনমানবপূর্ণ কাঁথি শহরে আমাদের বেশ ভালোই দিন কাটছিল। ছড়ানো-ছিটোনোভাবে ছোটো ছোটো একতলা দোতলা ঘর, বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি, অনতিদূরে অপূর্ব সুন্দরী দীঘার সমুদ্র সৈকতের মৃদু হাতছানি আর নক্ষত্রভরা উদার আকাশের মোহ আমাদের ছোট্ট সংসারকে স্বচ্ছলতা আর সুখের মোড়কে আচ্ছাদন করে রেখেছিল।
বাবা যখন একটি জাতীয় ব্যাঙ্কের ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার হয়ে কলকাতা থেকে কাঁথি শহরে গেল তখন পরিচিতদের অনেকেই নিষেধ করেছিল। বাবা কারুর কথা শোনেনি। বাবার প্রসপেকটিভ কেরিয়ার, আমার আর বোনের ভবিষ্যত চিন্তা, সর্বোপরি কাঁথি শহরের উষ্ণ অভ্যর্থনায় আমরা ওই শহরেই থেকে যাই।
কিছুদিনের মধ্যেই আমরা সেই শহরের প্রেমে পড়ি। আমি আইন পড়তে কলকাতায় চলে আসি আর বোন স্থানীয় একটি গার্লস স্কুলে ভরতি হয়।
সেই শহরে এসে কলকাতা-হাওড়ার বহু মানুষ যারা কর্মসূত্রে সেখানে থাকে, তাদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অমৃতকাকু আর তার মেয়ে শ্রাবণী তাদের বাসায় মাঝে মাঝে আসত। দীঘা থেকে গণেশদা আর স্বপ্না বউদিও মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় পা রাখত। পরেশকাকুও কোনো কোনো ছুটির দিন এসে হাজির।
গফুর মিঞা রোজ সকালে খবরের কাগজ দিয়ে যেত। বাবা প্রত্যেকদিন তাকে একটা করে সিগারেট দিত।
আমি বাবাকে অনেকবার বারণ করেছি। একদিন বললাম—আচ্ছা গফুর চাচা, এই ছাইপাঁশ খোলসের মধ্যে কী এমন থাকে যে ‘সকালে মুখে না দিলেই চলে না?
গফুর চাচা হাসতেন আর বলতেন—অজিত সাব, ছেলে আপনার এক রত্ন হয়েছে। আমার বারংবার আপত্তিতে বাবা আর গফুর চাচা দু-জনেই একসময় সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল।
শিউলি বউদি প্রত্যেকদিন সকালে এসে ঘর মুছত, বাসনপত্র ধোয়াধুয়ি করে যেত। ব্যর্থ যৌবনা শিউলি বউদির বয়স ছিল চল্লিশের কাছাকাছি।
সতেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল শম্ভুদার সঙ্গে। দু-টি ছেলে-মেয়েও আছে। শম্ভুদা রিকশা চালাত আর বউদি স্থানীয় একটি বাজারে সবজি বিক্রি করত। সেই শম্ভুদা একদিন মিত্রা নামে আর একটি মেয়েকে নিয়ে কোথায় যে পালিয়ে গেল আজও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কিন্তু শিউলি বউদি শম্ভুদাকে তারপরেও ভালোবাসত।
আমি তখন ভালোবাসা কাকে বলে, বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে-ভালোবাসা তা ঠিক বুঝতাম না।
শিউলি বউদি মা-এর কাছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত আর বলত—বউদি, ওর মনে যদি এমন ছিল, আমাকে বলতে পারত, এভাবে পালিয়ে যাবার কোনো দরকার ছিল না।
কী বলিস, এখানে থাকলে তুই মানিয়ে নিতে পারতিস?
মানিয়ে নিতাম, কী আর করা যাবে? জোর করে তো কাউকে আটকে রাখা যায় না।
তবে? তবে………..
মানুষটাকে দু-বেলা তো চোখের দেখা দেখতে পেতাম।
অনেক তো খোঁজখবর নিলি, কিছুই হল না। বরং ছেলে-মেয়েগুলো মানুষ কর। দেখবি তোর দুঃখ একদিন ঘুচবেই ঘুচবে।
সত্যি বলছ বউদি?
ওপরে ভগবান আছে না?
সেই থেকে শিউলি বউদি দু-টি ছেলে-মেয়ে নিয়ে ক্যানেল পাড়ে বস্তিগোছের একটা ছোট্ট ঘরে কোনোক্রমে থাকত। এবাড়ি-ওবাড়ি বাসন ধোয়া, রান্না করা, বাজার করা—এভাবেই কোনোক্রমে চলে যেত তার। এই শরীর নামক নদীটি যদি কোনোদিন কোনো কারণে শক্ত পাথরে আঘাত পেয়ে আছড়ে পড়ত, তখন দু-টি অবোধ শিশুসন্তানের কান্না আর বিমিশ্রিত আর্তনাদ নীরবে নিভৃতে ঝরত।
সত্যি, বেঁচে থাকার জন্য মানুষ এভাবে পরিশ্রম করতে পারে! নিজের শিশুসন্তানের মুখে দু-মুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য, নিজের ইজ্জত বাঁচিয়ে সদুপায়ে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ এভাবে লড়াই করতে পারে! এদের এই করুণ ইতিহাস না জানলে সমাজের অনেক তথ্যই অজানা থেকে যায়।
জ্যোৎস্নার এক-টুকরো হাসি জানালা দিয়ে আমার বিছানায় এসে পড়েছে। সকালের সেই মেঘ নেই, গুমোটও নেই। ঘড়িতে ঢং ঢং করে দুটো ঘণ্টা বাজল। এক মুঠো মৃদু হাওয়া ঘরের মধ্যে ঢুকে ঘুরপাক খেতে খেতে দরজায় টোকা দিয়ে চলে গেল।
আমি উঠে বসলাম। ঢক ঢক করে ঠাণ্ডা জল খেলাম। আবার শুয়ে পড়লাম। কিন্তু চোখের পাতা দুটো এক হয় না। ঘুম যেন আমার দু-চোখ থেকে এক অজানা অচেনা স্বপ্নের দেশে পাড়ি দিয়েছে।
শিউলি বউদির কথা মনে পড়তেই আমার মনে পড়ে—আমাদের বাসার পাশেই ছিল একটা শিউলি ফুলের গাছ। জানালার পাশে বসে সেই গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, বোনের সঙ্গে গল্প করতে করতে কত হলুদ বিকেল যে কেটে গেছে তার ইয়ত্তা নেই।
কোনো কোনোদিন সকালে রিয়া কতগুলো ঝরা শিউলিফুল এনে আমার টেবিলের ওপর সাজিয়ে রেখে বলত—দাদা, ফুলগুলো যখন গাছে ছিল, তখন ওদের প্রাণ ছিল, হৃৎপিন্ড নড়ত, কিন্তু ঝরে যাওয়ার পরেও এরা কত সুন্দর! কোনো দুঃখ নেই, কোনো আক্ষেপ নেই।
এটা ফুল বলেই সম্ভব।
কেন? অন্যদের বেলা হবে না কেন?
এরা নিজেদের জন্য ফোটে না। অপরের জন্যই এরা নিজেদের প্রস্ফুটিত করে।
ছুটির দিনে কখনো কখনো বোনের সঙ্গে দাবা খেলায় বসতাম। তখন বোনের কী উত্তেজনা! মাঝে মাঝে বোনের কাছে ইচ্ছাকৃতভাবে হেরে যেতাম। তাতে বোনের কী আনন্দ! সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখত। তার সেই নিষ্কলঙ্ক জ্যোৎস্নাসম মধুর হাসি আর চোখের চাহনি আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করতাম।
একবার স্কুলের হয়ে ক্যুইজ কনটেস্টে রিয়া ফার্স্ট হয়েছিল। আয়োজকরা ওকে জিজ্ঞেস করেছিল—
তোমার এই সাফল্যের জন্য কার অবদান সবচেয়ে বেশি?
আমার দাদা।
একবার দোলের দিন পাড়ার ছেলেরা রিয়াকে রং মাখিয়ে দিয়ে গেছিল, আর তাতে ওর কী কান্না! আমি তখন বাড়ি ছিলাম না। আমি বাড়ি ফিরে ওকে শান্ত করতে তবে ও শান্ত হয়েছিল।
ঘড়িতে ঢং ঢং করে তিনটে ঘণ্টা বাজল। কোন সুদূর প্রান্ত থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ ভেসে এল। একটি সুবাসিত গন্ধ ঘরের মধ্যে ঢুকে সুগন্ধে ভরিয়ে তুলল।
মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। তার সেই চন্দ্রালোকিত মায়া মাখানো মুখ, তার ছায়াশীতল কোমল হাতের পরশ, হৃদয় জুড়োনো মায়া মমতা, আদর মাখানো বিধি-নিষেধ— মূর্তিময়ী দেবীর মতো আমার হৃদয়-দুয়ারে উদ্ভাসিত হচ্ছে।
প্রতি বছর বিজয়া দশমীর দিন দুই ভাই-বোন মিলে যখন বাবা-মাকে প্রণাম করতাম, তখন মায়ের যে কী আনন্দ হত তার কোনো উপমাই হয় না। মনে হত সিঁদুরে রাঙানো দেবী দুর্গা প্রাতঃভ্রমণ সেরে দু-টি অবোধ শিশু-সন্তানকে তার স্নিগ্ধ ছায়ায় আশীর্বাদ করবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
একবার আমার জ্বর হয়েছিল। চার-পাঁচদিন ওষুধ খাওয়ার পরও যখন জ্বর কমল না, তখন মায়ের কী দুশ্চিন্তা! সারারাত মাথার কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। মাতৃস্নেহের এই গভীর বহি:প্রকাশ আমার কাছে আজও কেমন ধোঁয়াশা লাগে।
পাখি যেমন রোদ-বৃষ্টি-ঝড় কিংবা শত্রুর কামড় থেকে তার বাচ্চাকে নিজের ডানার মোড়কে আগলে রাখে, বাঘিনি যেমন তার বাচ্চাকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো কড়া নজরে রাখে, তেমনি এই মানবকুলেও একজন মা তার শিশুকে সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও অপত্যস্নেহে বড়ো করে তোলে।
আমার মনে হয়, এই পৃথিবীর ছায়াঘেরা যত মরুদ্যান আছে, শান্ত-সুন্দর মনোমুগ্ধকর সবুজ দ্বীপ আছে কিংবা অরণ্য প্রকৃতির লাবণ্য আছে, মাতৃ-হৃদয়ের আঁচলের ছায়ায় এসব ম্লান হয়ে যায়।
বাবা-মা-এর মধ্যে ঝগড়া হতে আমি কোনোদিন দেখিনি। বাবা যখন চাকরিসূত্রে এই শহরে আসে, মা মনে মনে অসন্তুষ্ট হয়েছিল কিনা কোনোদিন বোঝা যায়নি। হয়তো পৃথিবীর সব স্ত্রী-রাই মুখবুজে সব মেনে নেয়। আর যারা মানিয়ে নিতে পারে না, সেখানে সংসারের শান্তি টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
বাবাকে আমি সর্বদা বন্ধুর মতোই পেয়েছি। জীবনের প্রতিটি ধাপে অবর্ণনীয় সংগ্রাম করতে করতে তিনি সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে অনেক ওপরে উঠেছেন। কথা-কাজ-ব্যবহারে একটা তেজস্বীভাব আর ব্যক্তিত্ব ধরা পড়ত।
একবার ভয়াবহ বন্যায় পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিপর্যয় নেমে আসে। হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে এই শহরের আনাচে-কানাচে খোলা আকাশের নীচে আশ্রয় নেয়। বাবা স্থানীয় লোকজন নিয়ে একটা ভোলান্টারি ক্যাম্পের ব্যবস্থা করেছিল।
সেদিন বাবা মাকে বলেছিল—জান তনু, মানুষ যখন ঘরছাড়া হয়, দু-মুঠো ভাতের জন্য যখন দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তখন যে কী দুঃসহ যন্ত্রণা হয়, তা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা মুশকিল।
মনে পড়ে বন্ধু রবার্টের কথা। ‘ল’ কলেজে প্রথম দিন থেকেই তার সঙ্গে আলাপ। সেই আলাপ নিবিড় বন্ধুত্বে পরিণত হতে বেশি সময় লাগেনি। কোথাও বেড়াতে গেলে দু-জন, খেলার মাঠে দু-জন, কখনো-বা সিনেমা থিয়েটারের টিকিট কাউন্টারের সামনে দু-জনে নিশ্চিন্তে গল্প করছি।
সেই দিনগুলি, সেই মুহূর্তগুলি কি আর কোনোদিন ফিরবে না!
মনে পড়ে পাড়ার মোড়ে হরিহর সিং-এর সেই চায়ের দোকান। ওই দিকে গেলেই তার হাতের তৈরি চা খাওয়া চাই। সত্যি লোকটার হাতে জাদু আছে।
আমি তখন যাদবপুরে একটা মেসে থাকতাম। আমাদের বাসার উলটোদিকে তিন চারটে বাড়ির পর একটা দোতলা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু-টি চোখ আমাকে একদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করত। কলেজে যাওয়ার সময় আর ফেরার সময় প্রায়শই সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। আমার কল্পনাবিলাসী মন অনেকটা চুম্বকের মতো তার প্রতি আকর্ষণ করত।
রবার্ট বলেছিল—প্রিয়, বেটার ইউ আসক হার এবাউট হার ইন্টারেস্ট।
নো রবার্ট, ইট মে বি আ রং অ্যাজামশন রিগার্ডিং হার ফিলিংস।
ওকে, বাট হোয়াই ডাজ শি লুক অ্যাট ইউ?
ইটস নট আ ক্রাইম।
ইটস নট আ গুড বিহেভিয়র।
হোয়াই আর ইউ ব্লেমিং হার। মে বি, শি ডাজ ফানি।
মে বি, মে বি, মে বি। ইউ আর আ হার্টলেস পারসন।
আই অ্যাডমিট।
সেই মুখখানা অনেকটা আবছা হয়ে আমার চোখের সামনে ভাসছে। সে কি এখনও ওইভাবে বারান্দায় বসে আমার আসার প্রতীক্ষায় রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে? দূর, কবেকার কথা! হয়তো সে কোথাও সুখে সংসার করছে। অনেক বছর ওদিকে যাওয়াই হয়নি।
আর দুর্গা? যে ছিল আমার ধ্যান, আমার জ্ঞান, আমার এগিয়ে চলার প্রেরণাশক্তি, যার কথা ভেবে সকালে আমার ঘুম ভাঙত, ব্যস্ত দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে নামত, রাতে শোবার আগে যার পুলকিত মুখটা কল্পনা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তাম, সে কোথায় হারিয়ে গেল। আমার জীবনে সমস্ত দরজা বন্ধ করে সে যে সেই চলে গেল, আর ধরা দিল না।
আমি যখন হতাশায়, হৃদয় যন্ত্রণায়, মরু প্রান্তরে ভগ্ন মনোরথে পায়চারি করছিলাম, তখন উষ্ণতার ডালি নিয়ে আমার হৃদয়ে এসে কড়া নাড়ে ইশিতা।
আমি মাস্টার ডিগ্রি কমপ্লিট করে রিসার্চ করছি। ‘ভারতীয় আইন এবং জীব বিজ্ঞান’-এর ওপর একটা সেমিনারের আয়োজন হয়েছিল আমাদের ক্যাম্পাসে। আইনের পাশাপাশি জীব বিজ্ঞানেরও অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিরা এই সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখানেই আলাপ ইশিতার সঙ্গে। ও তখন উদ্ভিদবিদ্যার কোনো একটি বিষয়ের ওপর রিসার্চ করছিল।
ও-ই প্রথম আলাপ করেছিল। বলেছিল—আমি ইশিতা দাস, রিসার্চ ফেলো, বটানি ডিপার্টমেন্ট।
আমি প্রিয়ব্রত বিশ্বাস, রিসার্চ ফেলো, ‘ল’ ডিপার্টমেন্ট।
আপনি পার্টিসিপেট করবেন তো?
আমার একটা ছোট্ট প্রেজেন্টেশন আছে।
আপনি?
আমি শুধু আপনাদের প্রেজেন্টেশনগুলো মন দিয়ে শুনব। সবে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। এখনও তেমনভাবে শুরুই করতে পারিনি।
এই সামান্য আলাপেই সেদিন আমাদের যে যোগাযোগ শুরু হল তা বিয়ের সম্পর্কেই স্থায়ী পরিণতি পেল।
একদিন ইউনিভার্সিটির সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নামছিলাম, ডিপার্টমেন্টের হেড ডেকেছিলেন, কাজেই একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। সিঁড়িতে একজনের সঙ্গে হঠাৎ ধাক্কা লেগে গেল, হাত থেকে ডায়েরিটা পড়ে গেল। সেটি তুলতে গিয়ে দেখি ইশিতা, মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ থেকে বের হল—স্যরি।
আরে তুমি? বুঝতে পারোনি?
বুঝলে কি ধাক্কা মারতাম?
ভালোই হল।
মানে?
অনেকদিন তো বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয় না।
এদিকে তেমন আসা হয়নি।
সেজন্য সুদে-আসলে উশুল হল।
মানে?
দেখাও হল আবার পরশ পাওয়াও গেল।
এটা ইউনিভার্সিটি, বাড়ি নয়।
ও আমার দিকে এক দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, তারপর বলল—
চলো না একদিন কাছাকাছি কোথাও বেড়িয়ে আসি।
পরের রবিবার আমরা গেলাম দক্ষিণেশ্বরে। গঙ্গার পাড়ে, কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়, দূর্বার নরম পাদানির ওপর আমরা পাশাপাশি বসলাম। গঙ্গার উদার বুকের ওপর ছোটো ছোটো নৌকো, অবুঝ ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, মাতৃদেবীর অকুন্ঠ আশীর্বাদ আর গঙ্গাকে আঁকড়ে বালি ব্রিজের সতর্কভাবে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য অবলোকন করছিলাম।
শিশিরের চাদর মেখে নরম দূর্বাগুলি বারে বারে সূর্যকে হাতছানি দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে ছোটো-বড়ো স্টিমার, বোট গঙ্গার জীবনরস পান করতে করতে ছুটছিল। অদূরে একটি প্রবীন বটগাছ। কত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে! প্রতিদিনের যাত্রীদের কথাবার্তা সে শোনে, বর্ষায় দুরন্ত পাগলিনী গঙ্গাকে পায়ের কাছে এলেই আটকে দেয়।
শিশির জড়ানো সতেজ সকাল। আমরা মায়ের মন্দিরে পুজো দিলাম। মাতৃদেবীকে অনেক বেশি মায়াময়ী দেখাচ্ছিল। ধূপ-ধুনোর সুগন্ধি ধোঁয়ায় মায়ের মুখ থেকে অব্যক্ত আশীর্বাদ ঝরে পড়ছিল। আমি তন্ময় হয়ে বেশ কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।
পুজো সেরে আবার গঙ্গার পাড়ে গিয়ে বসলাম। ফর্সা, লম্বা, তন্বী ইশিতার নিষ্পাপ মুখমন্ডল আর আলুলায়িত কেশরাশি শীতের স্নিগ্ধ বাতায়নে প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো সুন্দর দেখাচ্ছিল।
একটি ছোট্ট নৌকো কয়েকজন যাত্রী নিয়ে হেলতে দুলতে ঘাট ছেড়ে ওপারে বেলুড় মঠের দিকে চলতে লাগল। একটি ট্রেন গর্জন করতে করতে ব্রিজের ওপর দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। উত্তরের শীতল হাওয়া আবার জোরে বইতে শুরু করল। আমি নিজের অজান্তে একটি দূর্বা ঘাস ছিঁড়ে গঙ্গার বুকে ছুঁড়ে দিলাম।
ইশিতা বলল—এই যে নদী দেখছ, জলের ঢেউয়ের আনন্দ-উচ্ছ্বাস উপভোগ করছ, এদের কাজ কী বলো তো?
তুমি বটানির লোক, তুমি বলো।
এদের কাজ হল কিছু মানুষকে বোকা বানিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা। এই বলে সে খিলখিল করে হেসে উঠল।
কথাটা শোনামাত্র আমিও হেসে উঠলাম। বললাম এই নদীর চরিত্র তুমি পুরোপুরি বুঝতে পারো?
নদীর চরিত্র! আমার মতো সামান্য মানুষের পক্ষে বোঝা দুঃসাধ্য ব্যাপার। গ্রীষ্মের ফুটিফাটা রোদে তার জলধারায় সঞ্চিত জলভান্ডার থেকে জল বিতরণ করে গরিব চাষিদের মুখে হাসি ফোটায়। বর্ষায় ধরে এক ধ্বংসাত্মক মূর্তি। শহর-গ্রাম-অট্টালিকা ভাসিয়ে মানব সভ্যতার ওপর সে কঠিন আঘাত হানে, কীসে যে তার আনন্দ, কীসে যে দুঃখ, সত্যিই বোঝা মুশকিল। কখন যে তার কী খেয়াল হয় সে নিজেও কী তা বুঝতে পারে!
নারী চরিত্রও অনেকটা সেরকম।
পুরুষগুলোর কাজ হচ্ছে কথায় কথায় নারীদের দোষ দেওয়া। তোমরা মেয়েদের কোনোদিন বোঝার চেষ্টা করেছ? কখনো তাদের মনটা বোঝার চেষ্টা করেছ?
সেভাবে অবশ্য কোনোদিন ভাবিনি।
পুরুষরা নিজের ইচ্ছা ও অনিচ্ছা মেয়েদের ওপর চাপিয়ে দেয়। দূর আকাশে ভেসে বেড়ানো পাখিদের দেখে কোমল পালকে ঢাকা তাজা মাংসের কথাই তাদের মনে পড়ে; সুন্দরী হরিণীর মুখের দিকে তাকিয়ে তার শরীরের মাংসটা কিলোদরে মাপার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের যে একটা হৃদয় আছে, ঋতুর পরিবর্তনে তারা যে বিশেষ অনুভূতি লাভ করে, আনন্দ-দুঃখে তাদের হৃৎপিন্ডের শব্দটা যে কয়েকগুণ বেড়ে যায় সেটা কেউ বোঝার চেষ্টা করে না।
আমি সেভাবে বলতে চাইনি। আসলে মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনটা সমুদ্রের ফেনার মতো ফাঁপা। বাইরের অবয়বটা খুলে ফেললে ভেতরটা সত্যি সত্যিই ফাঁকা। এই বিস্তৃত নদীর বুকে ছোটো ছোটো ডিঙি নিয়ে মৎস্যকন্যাদের খুঁজে বেড়ানো জেলেদের মতো। কখনো তার ঝুলিতে কিছু জোটে, কখনো-বা শূন্য হাতে ফিরতে হয়।
তবু জীবনের মানে খুঁজতে হয়। যতই দুর্বল হোক, দুরন্ত হোক, মাতাল হোক—এ জীবনের জন্যই আমাদের পথ চলা। তার যাত্রাপথে কখনো বসন্ত আসে কখনো বরফ হাওয়া আছড়ে পড়ে, কখনো ঘৃণা-ক্রোধ জমাট বাঁধে, কখনো-বা ভালোবাসার ঝর্নায় মন বড়ো উতলা হয়ে ওঠে।
একটা ভিখিরি সাহায্যের প্রার্থনায় আমাদের কাছে এসে দাঁড়াল। আমি পকেট থেকে দু-টাকা বের করে লোকটার হাতে দিতেই সে আকাশের দিকে হাত উঁচু করে ভগবানের উদ্দেশ্যে আমাদের মঙ্গল প্রার্থনা করে মনের আনন্দে চলে গেল।
আমি ইশিতাকে বললাম—এ তো ধর্মীয় স্থান। এখানে ভিখিরি থাকবে কেন? মাতৃদেবীর আশীর্বাদ সত্যিই কি কৃপণ? এদের তো কোনো জাত নেই, ভেদ নেই, ধর্মান্ধতা নেই।
ভগবান যা বিচার করার ঠিক করেন। হয়তো এরা কোনো অন্যায় করেছে, সেজন্য শাস্তি পাচ্ছে।
তাই?
ঠিক তাই। নাহলে তুমি কোথায় ছিলে, আমিই বা কোথায় ছিলাম, অথচ আমাদের নিজেদের পছন্দ হল, বাড়ির লোকেরা দেখাশোনা করল, বিয়েও হল।
আমি ওর মুখের ওপর উড়ে আসা চুলগুলি সরিয়ে দিয়ে বললাম—তোমাকে আজকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।
ও তার ডান হাতের আঙুলগুলি আমার বামহাতের আঙুলে রেখে বলল—তোমাকেও আজকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। বেশ পুরুষ পুরুষ মনে হচ্ছে।
কী বললে, পুরুষ পুরুষ মনে হচ্ছে। অন্যসময় কী মনে হয়? এই বলে ওর একটি কান আমি হাত দিয়ে মুলে দিলাম।
আহা, ছাড়ো, লাগছে।
লাগুক।
লোকে কী ভাববে? নতুন বউকে কী কেউ এসব করে?
লোকে তো জানে না তুমি কী দুষ্টু।
তুমিও কম কীসে?
এইভাবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত আমরা গঙ্গার পাড়ে বসেছিলাম। আকাশ-বাতাস-নদী-সূর্য আমাদের কথোপকথন শুনছিল। কৃষ্ণচূড়া গাছটি টিপ্পনি কেটে কেটে দু-একটা পাতা খুলে আমাদের দিকে ছুঁড়ে মারছিল। পাখিরা ফিসফিস করে আমাদের নিয়ে হাজার কথা বলাবলি করছিল।
তারপর ইশিতাকে নিয়ে আমি বহু জায়গায় বেড়াতে গেছি। দিল্লি-আগ্রা-পুরী-কেরালা-উটি-মুম্বই-ভাইজাক-দার্জিলিং গেছি। ধীরে ধীরে আমরা সম্পৃক্ত হয়েছি। নিজেদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে ভাগ করে নিয়েছি।
দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে ইশিতা অসুস্থ হয়ে পড়ে। পাহাড়ি উপত্যকায় বেড়াতে বেড়াতে ওর প্রচন্ড ঠাণ্ডা লেগে যায়। মুহূর্তে মুহূর্তে হাঁচি। সঙ্গে যা ওষুধপত্র ছিল তাতে কাজ হচ্ছিল না। শিলিগুড়িতে ডাক্তার দেখানোর পরও কোনো লাভ না হওয়ায় বাগডোগরা বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট ধরে সোজা কলকাতায়।
ইশিতা বলেছিল—তুমি শুধুশুধুই চিন্তা করছ। দেখো এমনিতেই সেরে যাবে।
তুমি বুঝতে পারছ না, নিউমোনিয়া হয়ে গেলে সমস্যা হবে।
তুমি সঙ্গে থাকলে আমার কিচ্ছু হবে না।
তুমি সুস্থ হলে আবার আমরা আসব।
প্রমিশ।
প্রমিশ।
সেবার কলকাতায় ফিরে প্রায় মাসখানেক ইশিতাকে চিকিৎসায় থাকতে হয়েছিল।
আমি পাশ ফিরে ঘুমোনোর চেষ্টা করলাম। কলকাতা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে শুয়ে ইশিতার প্রশ্বাস-নিশ্বাসের শব্দ, চুলের ঘ্রাণ অনুভব করছি। অনেক মতানৈক্য, বহু দ্বিমত সত্ত্বেও আমরা কেউ কাউকে প্রতারণা করিনি। জীবনের অনেক না-বলা কথা, না-জানা কাহিনি, এমনকী কলেজ জীবনে ঘটা নিজেদের অনুভূতিগুলিও নিজেদের মধ্যে গোপন করিনি।
দেওয়াল ঘড়িতে আবার একটা ঘণ্টা পড়ল। রাতের মোহ কাটিয়ে সময় ভোরের দিকে এগোচ্ছে। মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে চোখে-মুখে আলতো করে ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে। আমি উঠে আবার ঢক ঢক করে জল খেলাম। কিন্তু চোখের পলক পড়ছে না। মনে পড়ছে ছোট্ট সায়নের কথা।
আমার আর ইশিতার ভালোবাসার ফসল হিসেবে একসময় ইশিতার কোলে আসে ছোট্ট ফুটফুটে সায়ন। তাকে নিয়ে ইশিতার কী আনন্দ! ছোট্ট দুটো হাত, দুটো পা আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে হাঁটতে লাগল। ‘মা’, ‘বাবা’ ডাকতে ডাকতে দৌড়োতে লাগল।
ওকে নিয়ে ইশিতা বেশ ভালোই আছে। সারাক্ষণ ওর যত্ন নেওয়া, পড়াশোনা নিয়ে চিন্তাভাবনা, ভবিষ্যত চিন্তাভাবনা ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের ডিপার্টমেন্টের বাইরে কোনো কাজে সে থাকে না। একটা ছুতো পেলেই ছুটি নিয়ে সায়নের খেয়াল রাখাই তার মুখ্য কাজ। অনেক সময় আমার খেয়ালই রাখে না। দীর্ঘদিনের পর এই প্রথম দিল্লিতে সে কনফারেন্সে যাচ্ছে। আমি তাই কিছু বলিনি। একটু নিজের মতো করে চলুক না।
ইশিতাকে নিয়ে আমি যে অসুখী তা বলব না। বরং অন্যান্য তথাকথিত সুখী দম্পতির মতো আমরাও সুখেই আছি। তবু মনের কোথাও যেন একটা ক্ষত থেকেই গেছে। দুর্গা বোধহয় সারাজীবন আমার হৃদয়ের এক কোণে ছোট্ট একটা জায়গা নিয়ে থেকেই যাবে। শুধু আমি চাপা দিয়ে ভুলে থাকার চেষ্টা করি।
বুকের মধ্যে কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। সংসারের প্রিয়জনদের থেকে দূরে থেকে আজ আমি বুঝতে পারছি, সব কিছু থেকেও প্রত্যেক মানুষের একটা নিজস্ব আলাদা সত্ত্বা থাকে।
জীবনানন্দের সেই কবিতার কয়েকটি ছত্র তার মনে পড়ে—
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রং মুছে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
রাত্রি এখন শেষ প্রহরে। কোথায় যেন একটা পাখি ডেকে উঠল। জ্যোৎস্না বিকিরণ করতে করতে ক্লান্ত চাঁদ পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। একমুঠো ঠাণ্ডা হাওয়া আর জ্যোৎস্নালোকিত ভোরের নির্জনতায় আমি এক সময় গভীর ঘুমে ডুবে যাই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন