পরের দিন যখন ঘুম ভাঙল, তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। এসিটা বন্ধ করে মাথার কাছে জানালা খুলে দিতেই এক মুঠো রোদ্দুর ঘরের মধ্যে এসে পড়ল। সবুজ ধানখেতের উপর বয়ে চলা শরতের ঢেউ, আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা, দূর থেকে ভেসে আসছে বিসর্জনের সুর।
আমি হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি নীচে বেশ কিছু মানুষের জটলা। তড়িঘড়ি করে নীচে নেমে দেখি দুর্গা সকলের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছে, আর সকলের মিষ্টিমুখ করছে।
আমাকে দেখে দুর্গা বলল—তুমি কখন উঠলে? তুমি ঘুমিয়েছিলে বলে ডাকিনি। যাই হোক ভালো হয়েছে। সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। একজন হলেন এমিলি লিম, সেদেশের বিখ্যাত লেখক। একজন মি. হিয়ান, জীববিদ্যার গবেষক, সিঙ্গাপুর ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। একজন বাঙালি চিকিৎসক, মি. রোহন বাগচি, একজন সেখানকার উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তা, আরও অনেকে। এরা সবাই বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতে এসেছেন।
দুর্গা বলল—মাই স্পেশাল ফ্রেড ইজ রিটার্নিং টু কলকাতা টুডে ইভিনিং। ওই উইল মিট নেক্স সানডে। আই হ্যাভ অলরেডি ক্যানসেলড সাম ইমপর্টেন্ট প্রোগ্রাম।
ওনারা বললেন—ওকে মিস সান্ট। উই উইল কল ইউ লেটার। থ্যাঙ্ক ইউ।
আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন—মি: ইয়ং বিশ্বাস, হ্যাভ অ্যা হ্যাপি জার্নি টু ইণ্ডিয়া।
আমি সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বললাম—থ্যাঙ্ক ইউ। উই মে মিট এগেন হোয়েন ইউ উইল ভিজিট কলকাতা।
—ও সিওর। থ্যাঙ্ক ইউ এগেন।
ওনারা চলে যাবার পর দুর্গা বলল—চলো, ব্রেকফাস্ট করতে হবে।
আমি বললাম—তুমি সরকারি প্রোগ্রাম বাতিল করেছ, বলনি তো।
ওইরকম প্রতিদিন অনেক প্রোগ্রাম থাকে। ওগুলো নিয়ে ভাবার কিছু নেই।
আমার জন্য এসব করতে হল তো।
বলছি না, ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না।
আমি ব্রেকফাস্ট করেই সৌরাংশুর বাসায় যাব।
কেন? এখানে ভালো লাগছে না?
কী যে বল না তুমি? আসলে আজকে চলে যাব তো, কাজেই ও হয়তো আমাকে নিয়ে কোথাও বের হবে ভেবে রেখেছিল, কিন্তু পারেনি।
তোমাকে কিছু বলেছে?
না বলেনি কিছু, তবে…।
ওসব ছাড়ো তো। তুমি এখন যাও। ড্রাইভার তোমাকে সৌরাংশুর বাসায় ড্রপ করে দেবে। ওখানে তোমার যা আছে গুছিয়ে নিয়ে তুমি আর সৌরাংশু সাড়ে দশটা-এগারোটার মধ্যে চলে এসো। আমি সৌরাংশুকে বলে দিচ্ছি, ও কিচ্ছু মনে করবে না। ওকে তুমি চেনোই না।
এখান থেকেই তবে এয়ারপোর্টে যাব?
নিশ্চয়ই। আমি তোমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেব।
আজ তোমার কোনো কাজ নেই।
আছে তো। তোমার যত্ন নেওয়া।
আমি আর কিছু বললাম না। অবশ্য বললেও কিছু লাভ হত না। দুর্গা যখন একবার কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, তার কোনো নড়চড় করানো সম্ভব নয়।
আমি ওকে যত দেখছি তত অবাক হয়ে যাচ্ছি। একদিকে গভীর, উদার ভালোবাসা, কর্মনিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা; অন্যদিকে অসম্ভব জেদী, দৃঢ়সংকল্পপরায়ণা, ব্যক্তিত্বময়ী নারী। একদিকে নিজের গবেষণা, অধ্যাপনা, সরকারি বিভিন্ন কমিটির পরামর্শদাতা; আবার অন্যদিকে নিজের ফার্ম, সাবজেক্ট-এর উপর লেখালেখি, আর একান্ত নিজস্ব জগৎ।
আমাকে অন্যমনস্ক দেখে দুর্গা বলল—ইশিতার কথা মনে পড়ছে?
আমি কিছু বললাম না।
ও বলল—আমার ফোন থেকে কথা বলো।
তোমার ফোন থেকে?
দেখবে, কেমন চমকে যাবে।
আবার ভুলও বুঝতে পারে।
তা অবশ্য ঠিক। তোমার ফোন থেকেই কথা বলো।
আমি ফোন করতেই ইশিতা বলল—বউকে মনে পড়ল, তাহলে?
মনে পড়বে না কেন?
তুমি ওদেশে গিয়ে কোনো মেম-টেমের পাল্লায় পড়লে না তো?
বাজে কথা ছাড়ো। সায়ন কেমন আছে?
ভালো আছে। ও তো বাবা-মার কাছে বেশ আছে। সকালে উঠে বলেছিল—মা, বাবা আজকে আসবে তো?
তুমি কী বললে?
কী আবার বলব? বললাম—আসবে।
যদি এখানে থেকে যাই, দেশে না ফিরি?
অ্যাই, তোমার কথাবার্তা কেমন ভালো ঠেকছে না। কী হয়েছে?
কিচ্ছু হয়নি, মাই সুইট ডার্লিং। আমি আজই দেশে ফিরছি।
তোমার জন্য আমার ভীষণ মন খারাপ করে।
আর কয়েক ঘণ্টা তো।
সাবধানে আসবে।
ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে।
ফোন রেখে দুর্গার দিকে তাকাতে দুর্গা একগাল হেসে বলল—তুমি বউকে টেনশনে ফেলছ কেন? কত সাহস! এদেশে থেকে যাবে! এই সাহস সেই সময় হল না কেন? তাহলে তো আজ এই অবস্থা হত না।
আই অ্যাম সো স্যরি।
সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে আমি সৌরাংশুর বাসায় রওনা দিলাম। রাস্তায় যেতে যেতে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম—আপকা নাম ক্যায়া হ্যায়?
ও হিন্দিতেই বলল—রাহুল।
পুরো নাম?
রাহুল রেড্ডি।
অন্ধ্রপ্রদেশ?
ও হিন্দিতে বলল—ওর বাবা রমেন রেড্ডি প্রায় বছর তিরিশ আগে ব্যাবসার কাজে এদেশে আসে। এখানে এক প্রতারকের পাল্লায় পড়ে সব কিছু হারিয়ে এখানেই থেকে যায়, দেশে আর ফেরেনি। এখানেই এমিলি কিম বলে এক মহিলাকে বিয়ে করে।
আমি জানতে চাইলাম—এদেশ কেমন লাগে?
বহুত আচ্ছা হ্যায়।
তারপর বলল—বাবার কাছ থেকে ও হিন্দি শিখেছে। আবার দুর্গার কাছ থেকে কিছু বাংলাও শিখেছে। বলতে না পারলেও মোটামুটি বুঝতে পারে।
আমি জানতে চাইলাম—তুমি কতদিন এই ম্যাডামের গাড়ি চালাচ্ছ?
চার সাল হবে।
আমি দুর্গার কথা ভাবছি। রাগে, অভিমানে যে-মেয়েটি চুপিসাড়ে একা একা এই বিদেশের মাটিতে চলে এসেছিল, নিজের ভালোবাসাকে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে নীরবে সরে গেছে, সে আজ একান্ত নিজের প্রচেষ্টায় বিদেশের মাটিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যার পাশে বসে মুড়ি-বাদাম খেতে খেতে কত বিকেল কেটে গেছে, যার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ স্ট্রিট থেকে বউবাজার, বালিগঞ্জ থেকে টালিগঞ্জ ঘুরে বেড়িয়েছি, ডিপার্টমেন্টের করিডোরে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছি, সেই দুর্গা আজ সব কিছু ছাপিয়ে অনেক উঁচু সিঁড়িতে পৌঁছে গেছে। এখানকার মানুষজন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপামর জনগণ দুর্গাকে নিজেদের একান্ত আপনজন বলে মেনে নিয়েছে। এই দেশ তাকে নিজের কন্যাসম স্বীকৃতি দিয়েছে। আর সারাবিশ্ব তাকে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার দিয়েছে।
ভাবলাম, আমার সঙ্গে অভিমান করে এদেশে চলে আসায়, দুর্গার শাপে বর হয়েছে। আমার সঙ্গে ওর গাঁটছড়া বাঁধলে হয়তো সারাজীবন আমার ছত্রছায়ায় কেটে যেত। গতানুগতিক অধ্যাপনার বাইরে আর কোনোকিছু করে ওঠা সম্ভব হত না। ওর বিশ্বজোড়া খ্যাতিও অর্জিত হত বলে মনে হয় না। এই অধম ভালোবাসার টানে তাকে কাছ ছাড়া হতে দিত না। আর এই মূল্যবান প্রতিভাটি অনাদরে, পরিচর্যার অভাবে আর পাঁচজনের মতো সাধারণভাবে কেটে যেত। আমার মতো স্বার্থপর, মানুষটির কাছে হয়তো শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ওর প্রতিভাটা নষ্ট হয়ে যেত।
সৌরাংশু আমাকে দেখে বলল—তোমার আর এখানে আসার কী দরকার ছিল? আমাকে বললে বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে নিয়ে ওখানে পৌঁছে দিতাম।
আমি বললাম—আমার ওপর রাগ করেছিস?
রাগ করব কেন? তুমি এখন বিখ্যাত মানুষের পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছ। আমাকে প্রায় ভুলেই গেছ।
বাচ্চা ছেলের মতো কথা বলিস না। আমি তো আজকের দিনটা তোর দিদির সঙ্গে থাকব। ইন ফ্যাক্ট, আর হাতে গোনা কয়েক ঘণ্টা। তারপর তোর দিদি তোর কাছেই থাকবে।
তোমাকে নিয়ে আমার যে কত পরিকল্পনা ছিল?
আবার যখন আসব তখন দেখা যাবে। ওর কথা তো ফেলতে পারি না।
যেন ছোটোবেলা থেকে দিদিকে চেনো!
এক-এক জন মানুষকে কয়েক ঘণ্টায় অনেকটা চেনা যায়, আবার অনেক মানুষ আছে যাদের সারাজীবনেও চেনা যায় না।
কথাগুলো কি আমাকে বললে?
দূর বোকা, তোকে বলতে যাব কেন?
তাহলে কার সম্পর্কে বললে?
এসব তুই বুঝবি না।
আমার বুঝে কাজও নেই।
তুই এখনও রাগ করে বসে থাকবি?
না, চলো আমার পূজনীয় দাদার ব্যাগপত্র গুছিয়ে দিই।
আমি ব্যাগ থেকে একটা ক্যামেরা আরেকটা মোবাইল ওর হাতে দিয়ে বললাম, তোকে আর কিছু দিতে পারলাম না। কলকাতা গেলে তোর ব্যাগ ভরতি করে তুলে দেব।
সৌরাংশু বলল—তুমি এসব কখন কিনলে?
দুর্গাকে সঙ্গে নিয়ে কিনেছি।
দুর্গা…মানে!
তোর দিদি।
ও আচ্ছা। তুমি এখানে কাজে এসেছ। এসব উপহার দেওয়ার সময় কি ফুরিয়ে যাচ্ছে?
এ আর কী? তোর জন্যই তো আমি আমার হারিয়ে যাওয়া পুরোনো রত্ন খুঁজে পেয়েছি।
হারিয়ে যাওয়া রত্ন? কোথায়?
এই সিঙ্গাপুর সিটিতে।
কী সেই রত্ন?
এসব তোর জেনে কাজ নেই। তবে তোর জন্যই তা সম্ভব হয়েছে। সৌরাংশু ভাবতে লাগল। প্রিয়ব্রত তার হারিয়ে যাওয়া পুরোনো রত্ন খুঁজে পেয়েছে। অথচ বলছে না কী সেই হারিয়ে যাওয়া রত্ন। কী বোঝাতে চেয়েছে প্রিয়ব্রতদা? দুর্গাদির সঙ্গেও বা ওর এত বন্ধুত্ব কীসের?
সৌরাংশুকে অন্যমনস্ক দেখে বললাম—কী রে তুই কী ভাবতে বসেছিস?
না, কিছু না।
জিনিসপত্র গোছাতে হবে তো?
হ্যাঁ চল, গুছিয়ে দিচ্ছি।
আমাদের জিনিসপত্র গোছাতে বেশি সময় লাগল না। যা কেনাকাটা হয়েছে, দুর্গা যা যা গিফট দিয়েছে, সবই তো ওর ওখানে আছে। ওর কাছে পুরোপুরি দুটো লাগেজ হবে।
বাইরে বিজয়া দশমীর বিসর্জনের সুর। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মন্ত্রোচ্চারিত সিডির অংশ-বিশেষ। কোনো কোনো বাঙালি কলকাতা থেকে এসব আনিয়েছে।
আমি সব জিনিসপত্র তাড়াতাড়ি গুছিয়ে প্রস্তুত হয়ে বসে আছি। আর সময় নষ্ট করতে চাইছি না। যতটা সময় পাচ্ছি, তার সবটাই যদি দুর্গার সঙ্গে থাকতে পারি, তবুও কিছুটা আশ মেটে। শুধু মনে হচ্ছে সৌরাংশুর এখানে থাকা মানে সময় নষ্ট, জীবনের মূল্যবান সময়ের একটু একটু করে অপচয়। আমি বুঝতে পারছি সৌরাংশুকে এভাবে অবজ্ঞা করা ঠিক নয়, তবু মনের ইচ্ছেটাকে গলা টিপে হত্যা করি কী করে?
মিনিট দশেক এটা-ওটা বলে কাটালাম। সৌরাংশু রেডি হচ্ছে না দেখে বললাম—কীরে, তুই বেরোবি না?
আমার এক বন্ধুর আসার কথা, সেজন্য অপেক্ষা করছি।
বন্ধু? কখন আসবে?
বারোটা নাগাদ।
সে তো এখনও দু-ঘণ্টার ওপর। ততক্ষণ এখানে থেকে কী করব?
কী বলছ তুমি?
আমি বলতে চাইছি ওখানেও তো অনেক জিনিস গোছানোর আছে। তাড়াতাড়ি গেলে ওগুলো গোছাতে পারব।
তোমার ফ্লাইট তো সেই সন্ধ্যে বেলা।
দুর্গা আমাকে নিয়ে কিছু কেনাকাটা করবে বলেছিল।
বুঝতে পেরেছি, এখানে তোমার তর সইছে না।
ঠিক তা নয়।
সৌরাংশু আমার দিকে তাকিয়ে কী বুঝল কী জানি, বলল—তোমাকে দিদির ওখানে এখন ড্রপ করে দিয়ে আসছি। অমি সাড়ে-বারোটা-একটা নাগাদ যাব।
আমি একটু উদাস হয়ে বললাম—কথাটা খুব একটা মন্দ বলিসনি।
সৌরাংশু বলল—আমি এখুনি বেরোচ্ছি।
গাড়িতে যাওয়ার সময় সৌরাংশু জিজ্ঞেস করল—এদেশ কেমন লাগছে দাদা?
খুব ভালো। কাজের প্রতি প্রত্যেকের গভীর নিষ্ঠা আছে।
আর মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিকতা।
এদেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষের কথা জানি না। তবে যেসব ভারতীয় এদেশে এসেছেন, তাদের আন্তরিকতা, ভালোবাসা, আতিথেয়তা প্রশ্নাতীত।
সুযোগ পেলে আবার আসবে?
আমার তো ইচ্ছে হচ্ছে এখানে পাকাপাকিভাবে থেকে যাই।
আর বউদি, সায়ন, দায়িত্ব এড়াতে পারবে?
সেইজন্যই তো কলকাতায় ফিরে যাচ্ছি।
সৌরাশু দুর্গার বাড়ির গেটের কাছে আমাকে ড্রপ করে চলে গেল। দুর্গার বাড়ির লোকজন এসে আমার লাগেজগুলো ভিতরে নিয়ে গেল।
আমাকে দেখে দুর্গা বলল—তুমি চলে এসেছ। খুব ভালো হয়েছে।
তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল—সৌরাংশু আসেনি?
ও পরে আসবে।
কেন?
বলল তো ওর কোনো এক বন্ধু আসার কথা। তার সঙ্গে কথাবার্তা সেরে দুপুরে আসবে।
তুমি এলে কী করে?
ও আমাকে ‘ড্রপ’ করে দিয়ে গেল।
এই পর্যন্ত এল, আর আমার সঙ্গে দেখা না করে চলে গেল?
ভেতরে ঢোকেইনি, পাছে দেরি হয়ে যায়।
ইদানীং দেখছি ও একটু এড়িয়ে যাচ্ছে।
না, না, তুমি ওকে ভুল বুঝো না।
ভুল তো আমি বুঝছি না।
ওসব ছাড়ো। তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে, একটু ভেতরে চলো।
কী কথা আছে?
তুমি ভেতরে চলো, তারপর বলব।
এই বলে ওর হাত ধরে একপ্রকার জোর করে ওকে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলাম। তারপর বললাম—তুমি চোখ বন্ধ করো।
দুর্গা বলল—কেন?
বন্ধ করো না একবার।
কিন্তু কারণটা বলবে তো?
সারপ্রাইজ আছে।
আচ্ছা ঠিক আছে, এই আমি চোখ বন্ধ করলাম।
আমি একটা ডায়মণ্ড নেকলেস পকেট থেকে বের করে দুর্গার গলায় পরিয়ে দিলাম। চোখ খুলে দেখেই দুর্গা প্রথমে বিস্মিত, পরে আনন্দিত হয়ে বলল—তুমি এসব কখন কিনলে?
পছন্দ হয়েছে?
খুব পছন্দ হয়েছে। আসলে আমাকে মানুষ প্রচুর উপহার দেয়। কিন্তু এই ধরনের উপহার একেবারে কাছের মানুষ ছাড়া কেউ দেয় না।
তাহলে আমাকে কাছের মানুষ বলে স্বীকার করলে?
দুর্গা কাছে সরে এসে আমার বুকে মাথা রেখে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল।
ওর প্রতিটি নিশ্বাস-প্রশ্বাসের কণা, ওর হৃৎপিন্ডের লবডুব শব্দই বলে দিচ্ছিল আমার প্রতি ওর ভালোবাসার গভীরতা আগের মতোই রয়েছে। হাজার হাজার মাইল দূর থেকেও আমার প্রতি ওর আন্তরিকতায় এতটুকুও ভাটা পড়েনি।
আমি বললাম—তুমি সারাজীবন এভাবে আমারই থেকো।
দুর্গা বলল—আর তুমি?
সারাজীবন আমার হৃদয়মন্দিরে আছ, থাকবে।
তুমি সংসার করে সারাজীবন সুখে বউ ছেলে নিয়ে কাটাবে, আর আমি…
তবু তুমি ভালো আছ। সারাজীবন একজনকে আঁকড়ে কাটিয়ে দিলে। আর আমি? প্রচন্ড হৃদয় যন্ত্রণায় কাটাই। একদিকে তোমার প্রতি আমার একনিষ্ঠ ভালোবাসা, অন্যদিকে ইশিতা আর সায়ন। মাঝে মাঝে যখন একা থাকি, তখন মনে হয় অন্য কোথাও চলে যাই, যেখানে পরিচিত কেউ নেই, নিজের বলে কেউ জোর খাটাতে আসবে না।
সেখানে গেলেও কি তোমার যন্ত্রণা কমবে?
আমি জানি না, বুঝতে পারি না।
যতদিন বেঁচে থাকবে তুমি পারবে না এই হৃদয়-হাহাকার থেকে মুক্তি পেতে।
তুমিও দেশে ফিরে চলো, আমরা একসঙ্গে এক পরিবারের হয়ে থাকব।
তা হয় না। তবে দেশে যদি কোনোদিন ফিরে যাই, তাহলে তোমাদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধুত্ব থাকবে।
খুব ভালো হবে। বুড়ো বয়সে তুমি-আমি ইশিতা একসঙ্গে গল্প করে কাটাব।
এদেশকে কী করে ভুলি বল, যতটুকু খ্যাতি, সম্মান, মর্যাদা পেয়েছি তা তো এদেশের জন্য। এদেশের মানুষ মর্যাদা-আন্তরিকতা-ভালোবাসায় আমায় কানায় কানায় ভারিয়ে দিয়েছে।
তবু নিজের জন্মভূমির জন্য কিছু করতে ইচ্ছে করে না?
করে তো। মাঝে মাঝে ভাবি বছরের অর্ধেকদিন এখানে, বাকি অর্ধেকটা কলকাতায় থাকি।
আমার ওপর অভিমানে তা করনি।
অভিমানে নয়, এক প্রকার জেদে করিনি।
তার কারণ তো আমি।
দুর্গা কিছু না বলে চুপ করে থাকে।
আমি ওর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিই। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর দুর্গা বলল—তোমার ওপর আমার আর কোনো রাগ-অভিমান নেই। এবার এলে বউ-ছেলেকে নিয়ে এসো।
আমি বললাম—ওদের বলব। জানি না তোমার এখানে আসবে কিনা।
দুর্গার ফোনটা বেজে উঠল। ফোন ধরে দুর্গা বলল—আজ আমি কোথাও যেতে পারব না।
ওপার থেকে বোধহয় জিজ্ঞেস করল—আর ইউ ইল?
দুর্গা বলল—নো, আই এম অলরাইট। বাট আই এম বিজি ইন মাই পার্সোন্যাল ম্যাটারস।
ফোনটা রেখে দেওয়ার পর আমি বললাম—আমার জন্য তোমার কাজ পন্ড হয়ে গেল।
দুর্গা কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর বলল—তুমি আমার জায়গায় থাকলে কী করতে?
আমি তোমার মতো এত উদার, এত উদাসীন হতেই পারব না।
বাজে কথা কম বলো।
সত্যিই বলছি, তোমার মতো সবাই হতে পারবে না। আমি তো নয়ই।
ঘরের বাইরে বেশ কিছু মানুষের চিৎকার চেঁচামেচিতে আমরা বাইরে এলাম। দেখি ফার্মের কর্মীরা বেশ কিছু ডাব এনেছে।
দুর্গা বলল—এসব তোমার জন্য।
এত কী করে খাব?
তিন চারটে খেতে পার।
আমি দুটো খেলাম। তাতেই ওরা খুশি।
আমি বললাম—তোমার এই সাম্রাজ্যে এই জন্যই থেকে যেতে ইচ্ছে করছে।
থেকে যাও।
একথা বলার পর কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর দুর্গা হেসে উঠল। অনেকদিন পর দুর্গাকে এভাবে হাসতে দেখলাম।
ওরা চলে যাওয়ার পর হাঁটতে হাঁটতে আমরা ফার্মের এদিক-ওদিক ঘুরলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম—তুমি কখনো একাকীত্ব অনুভব কর না?
দুর্গা বলল—করি। তখন এটা-ওটা কাজের মধ্যে কাটিয়ে দিই।
এত কিছু পাওয়ার পরও জীবনে কোনো দুঃখ আছে?
নিজেকে প্রশ্ন করো।
আমি দুর্গার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মেঘমুক্ত নীল আকাশ। সিঙ্গাপুর নদীর স্নিগ্ধ আমোদিত মৃদমন্দ হাওয়া। বিজয়া দশমীর বিসর্জনের সুর। দুর্গার চোখে-মুখে বিরহ যন্ত্রণার স্পষ্ট ছাপ। আর আমি? আমার প্রিয় মানুষটাকে কাছে পেয়ে তাতেই মজেছিলাম। আবার দূরে চলে যাওয়া, চোখের আড়ালে চলে যাওয়া।
আমি বললাম—সমাজের সমস্ত বিধিরেখা ভেঙে, পারিবারিক বন্ধনকে তোয়াক্কা না করে আমরা আবার একসঙ্গে থাকতে পারি না?
দুর্গা বলল—কী পাগলামি করছ?
এটা পাগলামি নয়, এটা হৃদয়ের কথা, জীবনের কথা।
সামাজিক বিধি-নিষেধের প্রয়োজন আছে।
অনেকেই তা মানে না। এসব মানতে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছেটাকে হত্যা করতে হবে?
ত্যাগের মধ্য দিয়েও তো প্রেম বেঁচে থাকে।
তা অনেক কষ্টের।
তা গৌরবেরও বটে।
আমি যে মাঝে মাঝে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে যাই।
নিজেকে বোঝাও। আমি যদি পারি, তুমি পারবে না কেন? আমি তো তোমাকে ভালো করেই চিনি।
তুমি আমাকে শক্তি দাও। তুমি তো শক্তিদায়িনী, মুক্তিদায়িনী।
আমি তো তোমার সঙ্গে সবসময় আছি।
সৌরাংশু হন্তদন্ত করে এসে ঢুকল। আমাদের দেখে সে বলল—
স্যরি, আমার বেশ দেরি হয়ে গেল।
দুর্গা বলল—দেরি হয়ে গেল না দেরি করে এলে?
কী যে বল না দিদি?
ঠিকই বলছি। তুমি আজকাল দিদিকে এড়িয়ে যাচ্ছ।
আমাকে ভুল বুঝো না দিদি। আসলে…।
আসলে তোমার খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। আমি আজ কতগুলো সরকারি প্রোগ্রাম বাতিল করেছি, তা জান? আমি কাউকে ঠকাতে পারি না, যা করি, অন্তর থেকে করি, নিষ্ঠার সঙ্গে করি, ভণিতা করি না।
আমি বললাম—সৌরাংশু আমাকে অনেক আগে থেকে বলে রেখেছিল যে আজ একটু ওর দেরি হবে।
দুর্গা বলল—আর তোমাকে ওর হয়ে সাফাই গাইতে হবে না। ওকে আমি ছোটো ভাইয়ের মতো স্নেহ করি। ঠিক আছে, চলো লাঞ্চটা করে নিই।
সৌরাংশু খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম করছিল। আমি আর দুর্গা খাওয়ার পর বসে গল্প করছিলাম। ক্রমে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। এবার ঘরে ফেরার পালা।
সমস্ত লাগেজ চাপিয়ে আমরা যখন চাঙ্গি এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দিলাম, তখন বিকেলের সূর্য অনেকটাই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। ফার্মের লোকেরা আমায় হাত নেড়ে বিদায় জানাল। যেন একান্ত আপনজন কেউ বিদায় নিয়ে বহুদূরে চলে যাচ্ছে।
সৌরাংশু চালকের সিটে গিয়ে বসল। আমি আর দুর্গা পেছনে। গাড়ি চলতে শুরু করল। আমি সৌরাংশুর দৃষ্টি এড়িয়ে দুর্গার হাতে হাত রাখলাম। দু-জনে এত কাছাকাছি, পাশাপাশি, অথচ মাঝে আকাশসম ব্যবধান। একটা শক্ত, কঠিন প্রাচীর দু-জনের মাঝে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দুর্গা বলল—কলকাতায় গিয়ে বউ-ছেলেকে পেয়ে আমাদের ভুলে যেয়ো না।
সৌরাংশু বলল—দাদা যা বউ-পাগলা মানুষ।
আমি বললাম—তোমাদের কি ভোলা যায়?
এয়ারপোর্টে পৌঁছে রেজাউলদার কফি শপে গেলাম। রেজাউলদা একটা ছোট্ট প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে বলল—আমার কলকাতার ভাইয়ের জন্য ছোট্ট উপহার।
আমি বললাম—তুমি কলকাতায় গেলে আমাদের বাড়িতে অবশ্যই যাবে।
সবাইকে বিদায় জানিয়ে আমি সিকিউরিটি লাউঞ্জে ঢুকলাম। দেখলাম দুর্গার চোখে জল। ও রুমাল দিয়ে চোখের কোণের জল মুছল।
তারপর দুর্গা আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে বলল—তুমি পরের পুজোয় আসবে তো? আমি আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখব। এবার তো আগে থেকে তোমার আসার খবর জানতাম না।
আমি ওর দুটো হাত ধরে বললাম—আসব। প্রতিবছর পুজোয় আমি আসব। আমার দুর্গাকে দেখতে, তাকে দেবীর আসনে বসিয়ে আরাধনা করতে প্রতি পুজোয় আমাকে আসতেই হবে।
দুর্গা স্থির দৃষ্টিতে গভীর বিশ্বাসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন