প্যাশন ফ্রুট

সৈকত মুখোপাধ্যায়

শাক্যদা সুবোকে দু-হাতের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বলল, অত ভেঙে পড়িস না ভাইটি আমার। আমি এই তেইশ বছর বয়সের মধ্যে গুনে গুনে আটটা সফল প্রেম করেছি, কিন্তু বিশ্বাস কর, তার আগে হাফশোল খেয়েছি তেরোবার। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তোকে বলছি মন্দিরা তোর সঙ্গে যে ব্যবহারটা করছে, সেটা খুব স্বাভাবিক। সব মেয়েই এটা করে থাকে। এটাকে বলে 'টেস্টিং-পিরিয়ড'।

সুবো, মানে জয়পুরিয়া কলেজের ফিজিক্স সেকেন্ড ইয়ারের শুভায়ু সেনগুপ্ত, এতক্ষণ যে দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়েছিল সেটার সঙ্গে তুলনা চলে কেউ লটারির টিকিট পাকিয়ে কান চুলকে ফেলে দেবার পর যদি দেখে সেই টিকিটে এককোটি টাকা প্রাইজ উঠেছে, তার চোখের দৃষ্টির। তবে শাক্যদার এই কথা শোনবার পর সেই চোখেও যেন একটু কৌতূহল দেখা দিল।

উৎসাহিত হয়ে আহিরিটোলা বান্ধব সংঘের সেক্রেটারি শাক্য বিশ্বাস গড়গড় করে বলে চলল :

টেস্টিং পিরিয়ডে মেয়েটা তোকে ভাইফোঁটা দিতে চাইবে, তোকে শুনিয়ে শুনিয়ে তোর রাইভ্যাল-এর রূপগুণের প্রশংসা করবে, কিংবা তুই ফোন করলে ফোন ধরবে না। তোর কষ্ট হবে খুব। কিন্তু আমি তোকে বলছি সুবো, একবার যদি চোখকান বুজে এই পিরিয়ডটা কাটিয়ে দিতে পারিস তাহলে ও মেয়ে তোর।

সুবো ভারি বিরক্ত হয়ে বলল, আ:, শাক্যদা। তোমাকে হাজারবার বলছি না মন্দিরা ওসব টেস্টিং-ফেস্টিং কিছুই করেনি। ও একেবারে অন্যরকম মেয়ে। ভীষণ সিরিয়াস। ছলনা ওর আসে না।

ই:, আসে না আবার! কোনওদিন বলবি পরচর্চাও আসে না, সিরিয়াল দেখাও আসে না।

আসে না-ই তো। আসে না বলেই তো আমার ফাঁকিটা ধরে ফেলল।

ভারি হতাশ হয়ে শাক্য বিশ্বাস সুবোর পাশেই বিছানার ওপরে গা এলিয়ে দিল। বলল, আবার তুই সেই পুরোনো কথায় ফিরে গেলি। ফাঁকি কীসের রে? কীসের ফাঁকি? তুই সত্যি করে ভালোবাসিস না মন্দিরাকে?

জানি না গো শাক্যদা। এত জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুবো যে শিলিং থেকে একটা টিকটিকি সেই নিশ্বাসের ধাক্কায় টপ করে মেঝেয় খসে পড়ল। সেদিকে দৃকপাত না করে সুবো বলল, যদি সত্যি করেই ভালোবাসব, তাহলে মন্দা সেই ভালোবাসাকে ভুল বুঝল কেন?

শাক্য জিগ্যেস করল, তুই ঠিক কী বলেছিলিস বল তো মন্দিরাকে?

বলেছিলাম, মন্দা! তুমি কি আমাকে সন্তানের জনক হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

সর্বনাশ? এই কি একটা প্রেমিকের ভাষা? ও কী বলল?

বলল, চড়িয়ে গাল লাল করে দেব।

সেক্রেটারি শাক্য বিশ্বাস শুভায়ুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আহিরিটোলার ফুটপাথ ধরে উদাস মুখে হাঁটা লাগাল। কোথায় যাবে, কী করবে কিছুই তার মাথায় ঢুকছিল না। তাদের বান্ধবসংঘ ক্লাবে সুবোর মতন এঁড়েবাছুরের সংখ্যা সত্তর। প্রতি মাসেই তার মধ্যে অন্তত কুড়িজনের নানারকম হৃদয়ঘটিত সমস্যা দেখা যায়। বেশিরভাগ কেস মিটেও যায় নিজে থেকেই। নেহাত কেউ মনের দু:খে মুম্বাই পালালে কিংবা মিছিমিছি আত্মহত্যার অভিনয় করলে তাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তা না হলে শাক্যর ওসব ব্যাপারে কোনও ইন্টারেস্ট নেই। তার ইন্টারেস্টের জায়গাটা অন্য। তার মনপ্রাণ বাঁধা পড়ে আছে নাটকে। নাটক পরিচালনাটাই শাক্যর ধ্যান জ্ঞান স্বপ্ন।

আর গত দু-বছরে তার তিনটে সুপারহিট প্রাোডাকশনের নায়কের নাম শুভায়ু সেনগুপ্ত।

সুবোর বয়েস এখন কুড়ি। কিন্তু আঠেরো বছর বয়স থেকেই ওর হাইট পাঁচ ফুট দশ। তামাটে গায়ের রং, এক মাথা কোঁকড়া চুল আর একটু শিশুসুলভ মুখে গজদন্তের হাসি। রোমান্টিক রোলে ফাটিয়ে দিচ্ছিল ছেলেটা।

কিন্তু এবারেই যে কী শনি লেগে গেল ওর কপালে। না পারছে নাটক, না পারছে প্রেম। এদিকে আর পনেরোদিন পরে, পঁচিশে বৈশাখে, রবীন্দ্রভবনে রীতিমতন কল-শো বিসর্জন নাটকের। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষে বান্ধবসংঘের বিনম্র নিবেদন। জয়সিংহের ভূমিকায় শুভায়ু সেনগুপ্ত। কী হবে তাই ভেবে কান্না পাচ্ছিল শাক্যর।

মন্দিরা ওর প্রেম নিবেদনের ধরন দেখে যেকথা বলেছিল, কালকের মহড়ায় সেই একই কথা শাক্যরও বলতে ইচ্ছে করছিল সুবোকে। চড়িয়ে গাল লাল করে দেব। আরে ছ্যা ছ্যা! এই কি অপর্ণা আর রঘুপতির মধ্যে দোটানায় ছিঁড়ে যাওয়া মানুষের উচ্চারণ? শুনে তো মনে হচ্ছিল জয়সিংহ প্ল্যাটফর্মের মাইকে ট্রেন আসবার ঘোষণা করছে। আবেগ কোথায় গেল? এত নিরুত্তাপ গলা কোত্থেকে পেল সুবো?

সেই কথাটাই আজ সুবোকে জিগ্যেস করবার জন্যে ওর বাড়ি গিয়েছিল শাক্য। উত্তরে যা শুনল সেটাও সমান অবিশ্বাস্য।

ব্যাটা ক'দিন আগে মলাটে নগ্ন নারীপুরুষের ছবি দেখে কলেজের লাইব্রেরি থেকে একটা ইংরেজি বই মহা উৎসাহে বাড়িতে নিয়ে আসে। নিজের ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিয়ে বইটা খোলে এবং দ্যাখে যা ভেবেছিল তা না হলেও এই বইটাও কম ইন্টারেস্টিং নয়।

বইটাতে লেখক এক অদ্ভুত তত্ব ঝেড়েছেন। বলেছেন প্রেম প্রীতির ক্ষেত্রে মানুষে আর বাঁদরে নাকি অদ্যাবধি বিশেষ পার্থক্য কিছুই নেই। আমরা যাকে প্রেম বলি তা নাকি বিশুদ্ধ কাম। এবং কামও আর কিছু নয়, শুধু পরবর্তী প্রজন্মকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার কলকাঠি।

একজন নারীর চোখে পুরুষের সেই লক্ষণগুলোই ভালোলাগে যা তাকে জনক হিসেবে সক্ষম প্রমাণ করে। একইভাবে একজন পুরুষের চোখে নারীর সেই লক্ষণগুলো ভালো লাগে যা থেকে বোঝা যায় এ মেয়ে উর্বরা।

ভয়ংকর জোরালো ভাষায় লেখা বইখানি শেষ করে সুবো যখন রাস্তায় বেরিয়েছে তখন থেকেই সে নিজেকে একটা পুরুষ বাঁদর এবং রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা সমস্ত মেয়েকে বাঁদরি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। এতদিন যে কেশদামকে মেঘের রাশির ছাড়া আর কিচ্ছু মনে হয়নি, আজ তাকেই মনে হয়েছে একটা ইন্ডিকেটর মাত্র।

কীসের ইন্ডিকেটর?

কেন? ওই উর্বরতার।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা সমস্ত গজকুম্ভের মতন নিতম্ব, রম্ভা উরু, বিম্ব অধর থেকে শুরু করে জীবনানন্দীয় করুণ শঙ্খের মতন স্তন অবধি সেই একই বার্তা আজ পৌঁছিয়ে দিয়েছে তার কানে—ও হে শুভায়ু! এ মেয়ে মা হবার যোগ্য...কিংবা যোগ্য নয়।

এই হল সুবোর জবানবন্দি। অসহায়ের মতন সে শাক্যদাকেই তারপর জিগ্যেস করেছে—মনের এই অবস্থায় শিল্প সাহিত্য নাটক চারুকলা সবই কি মিথ্যে হয়ে যায় না? তাহলে সে কেমন করে আবেগ মিশিয়ে নাটকের ডায়ালগ বলবে? আর কেমন করেই বা মন্দিরাকে বলবে, আই লাভ ইউ? বরং একটি বাঁদর আরেকটি বাঁদরিকে ইলিচ মিলিচ কিলিচ করে যা জিগ্যেস করে সেও তাই জিগ্যেস করেছিল মন্দিরাকে। ওই—তুমি কি আমাকে সন্তানের জনক...ইত্যাদি।

বেচারা সুবো। শাক্যর মনে পড়ল বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় সুবো আকুল হয়ে ওর হাতদুটো ধরেছিল। বলেছিল, আমার আগের মনটা কী করে ফিরে পাই বলো তো শাক্যদা? এটা তো ঠিক নয়, এই মনুষ্যজাতিকে সারাক্ষণ জানোয়ার হিসেবে দেখাটা। আমার তো পাগল পাগল লাগছে।

শাক্য আবার ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, অত চিন্তা করিস না। শাক্য বিশ্বাস যখন বেঁচে আছে, ব্যবস্থা একটা কিছুই হয়েই যাবে।

আশ্বাস তো সে দিয়ে এল সুবোকে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হাও দা ড্যামেজ ক্যান বি আনডান?

মানুষের আবেগ ফিরিয়ে দেওয়ার মতন কোনও ওষুধ রয়েছে নাকি পৃথিবীতে?

অ্যালোপ্যাথি...স্পিরিট? উঁহু। সাময়িক উন্মাদনা। বাচ্চা ছেলের হাতে মদ তুলে দেওয়া যায় না।

হোমিওপ্যাথি? বিষস্য বিষমৌষধি। ওরে বাবা। ওতে নাকি আগে রোগের লক্ষণ বাড়িয়ে তোলে। দরকার নেই। এখন তো তবু সুবো জামাকাপড়টা গায়ে রেখেছে। হোমিও চিকিৎসার পর যদি সেগুলোকেও খুলে ফেলে লাফ মেরে গাছে চড়ে বসে?

ভেষজ? গাছ-গাছড়া, ফলমূল। তাই তো! ফেরাতে হবে আবেগ। আবেগ মানে প্যাশন...প্যাশন। আচ্ছা প্যাশন ফ্রুট বলে কি একটা আছে না? নেট নেট। এক্ষুনি নেট সার্ফ করা দরকার। লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির দিকে একরকম দৌড় লাগাল শাক্য বিশ্বাস।

দুদিন পরেই সাতসকালে শাক্যদার চিৎকারে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠল সুবো। তখনও ঘুম জড়িয়ে আছে আহিরিটোলার রাস্তাঘাটে।

সুবো! এই সুবো! কী এনেছি দেখে যা।

বাইরে বেরিয়ে এসে সুবো দেখল শাক্যদা একটা ঘ্যামা দেখতে প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্যাকেটটা ছোট, চারকোনা। নীলের ওপর সোনালি ডোরাকাটা গিফট পেপার দিয়ে সুন্দর করে প্যাক করা।

কী ওটা? বিরক্তমুখেই জিগ্যেস করল সুবো। এমনিতেই তার কয়েকদিন ধরে রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে না। বিছানায় মাথা ঠেকালেই নানান রকম প্রশ্ন মাথায় ঠেলাঠেলি শুরু করে দিচ্ছে। এই যে সে মিষ্টি খেতে এত ভালোবাসে, এর কারণ কী? সেটা কি পাকা ফলের ওপর নির্ভরশীল জীবনের স্মৃতি? সে যে বন্ধুদের সঙ্গে ছাড়া একবেলাও কাটাতে পারে না তারই বা কী ব্যাখ্যা? সুদূর অতীতে কি তারা, মানে পুরুষ বাঁদররা, দল বেঁধে শিকার করত? সেই সময় থেকে কি রক্তে ঢুকে গেছে বন্ধুপ্রীতি?

এমনকী এইরকম এক রাতে, সুবোর মা যখন তার মাথার কাছে বসে চুলের মধ্যে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে আমাকে একটু বল তো বাবা। ক'দিন ধরে দেখছি তোর মনে সুখ নেই। মুখ শুকিয়ে এই ঘরটুকুর মধ্যে পড়ে রয়েছিস—তখন সুবো প্রায় লাফ মেরে মায়ের কাছ থেকে সরে বসেছিল। কারণ, সে মনে মনে পরিষ্কার দেখতে পেয়েছিল সেই চিরপরিচিত দৃশ্য। মা-বাঁদর ছানা-বাঁদরের উকুন বেছে দিচ্ছে।

শাক্যদা অবশ্য তার রাতজাগা চোখের দিকে ভালো করে চেয়েই দেখল না, তার বিরক্তিকেও পাত্তা দিল না। মহা উল্লাসে বলল, দেখে যা সুবো, তো আরোগ্য আমার হাতের মুঠোয়। এই হল গিয়ে প্যাশন ফ্রুট।

ভারি অবাক হয়ে সুবো শাক্যদার পাশের চেয়ারে বসে বাক্সের মোড়কটা খুলতে শুরু করল। খুলতে খুলতেই জিগ্যেস করল, কী নাম বললে?

প্যাশন ফ্রুট, প্যাশন ফ্রুট। বাংলায় বললে আবেগফল। অরিজিনালি কলম্বিয়ার মাল। এখানে সিকিমে একটা বিলিতি ফার্ম অল্প কিছু চাষ করে, তাও পুরোটাই এক্সপোর্ট করে দেয়। নেহাত আমার ছোটপিসে ওই ফার্মের অ্যাকাউন্টেন্ট, তাই তার কাছে কাকুতিমিনতি করে তোর জন্যে পাঁচশো গ্রাম আনালাম। কাল রাতের ফ্লাইটে এসেছে। আজ সকালেই ক্যুরিয়ার কোম্পানি আমার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেল। 'আর্জেন্ট' বলে দিয়েছিলাম কিনা।

এ নিয়ে আমি কী করব?

কী করবি মানে? খাবি। খাবি। এক এক কামড় খাবি আর দেখবি হারানো প্যাশন কুলকুল করে তোর শিরা উপশিরার রক্তস্রোতে, তোর অলিন্দ নিলয়ের কোষে কোষে, তোর সেরিব্রাম সেরিবেলামের খাঁজে খাঁজে...তোর...তোর...যাগগে। মোদ্দা কথা আবার তুই বাঁদর থেকে মানুষ হয়ে উঠবি। আবার তোর মধ্যে ফিরে আসবে সমস্ত মানবিক আবেগ।

সুবো ইতিমধ্যে বাক্সটার চারদিকে জড়ানো ফিতেটা খুলে ফেলেছে। এবার খুলে ফেলল বাক্সের ঢাকনাটাও। দেখল, ভেতরে ধবধবে সাদা তুলোর ওপরে শোয়ানো রয়েছে উজ্জ্বল সবুজ দশটা ফল। একটা ফল সে হাতে তুলে নিল। ডিমের মতন গড়ন। সাইজটাও একটা ছোট মুরগির ডিমের মতন। বেশ ওজন আছে। ফলটা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকলো সুবো। বা:! গন্ধটা তো অদ্ভুত। ভালো বা খারাপ বলা যাবে না, কিন্তু বেশ চনমনে। যেন নাকের মধ্যে দিয়ে ঢুকে সুবোর মাথার মধ্যে কয়েকদিন ধরে জমে থাকা কুয়াশার চাদরটাকে একবার দুলিয়ে দিল সেই টক টক মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ।

পাশ থেকে শাক্যদা তার দিকে তীব্র কৌতূহলে তাকিয়েছিল। এইবার জিগ্যেস করল, কী রে, এই ফল আগে কখনও দেখেছিস?

কী করে দেখব? আমি কি কলম্বিয়ায় গেছি কোনওদিন?

তাও তো বটে। আচ্ছা, কাট কাট। একটা ফল এবার কেটে ফেল দেখি।

সুবো ঘর থেকে একটা পেনসিল কাটা ছুরি নিয়ে এসে ফলটা মাঝখান থেকে চিরে ফেলল। ভেতরটা ভারি অদ্ভুত। হালকা হলুদ রঙের শাঁসটা যেন শক্ত ছিবড়ের মতন তন্তু দিয়ে অজস্র ভাগে ভাগ করা। সুবো বলল, দ্যাখো শাক্যদা, কী রকম দেখতে! ফল তো নয়, যেন মানুষের কোনও অঙ্গ।

তা তো হবেই, তা তো হবেই। উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল শাক্যদা। প্যাশন ফ্রুট নিয়ে কলম্বিয়ায় একটা লোককথা চালু আছে, জানিস? নেট ঘেঁটে পেলাম। এক কিশোর রাখালকে ভালোবেসেছিল এক রাজার মেয়ে। কিন্তু সেই রাখাল তার বাঁশি আর গরুর পাল নিয়ে এমনই মগ্ন যে সেই কিশোরী রাজকন্যার আকুলতা সে বুঝতেই পারল না। মেয়েটি অপেক্ষা করে থেকে থেকে তারপর একদিন আক্ষরিক অর্থে বুক ফেটে মারা গেল। কিন্তু কেউ তার শবদেহকে শেষযাত্রার জন্যে মাটি থেকে তুলতে পারে না। পাথরের মতন ভারী সেই শবশয্যা। শেষ অবধি গনৎকার গুনে বললেন, যতক্ষণ ওই রাখাল এসে শয্যায় হাত না লাগাচ্ছে ততক্ষণ রাজকুমারী প্রাসাদ ছেড়ে যাবেন না। তাই হল। রাখাল এসে শবশয্যা স্পর্শ করা মাত্র হালকা পালকের মতন তা মাটি ছেড়ে উঠে পড়ল।

এতদিনে রাখাল বুঝতে পারল কী মহা ভুল সে করেছে। কত বড় ভালোবাসাকে সে বোকার মতন উপেক্ষা করেছে। হাতে চিরসঙ্গী বাঁশিটি নিয়ে সে রাজকুমারীর শবানুগমন করল।

নদীর ধারে চিতা সাজিয়ে শোয়ানো হল কিশোরী রাজকুমারীকে। আগুন দেওয়া হল সেই চিতায়। কিন্তু এবারে আরেক সমস্যা। কিছুতেই চিতার আগুন জ্বলে না। অগত্যা আবার গণনায় বসতে হল গনৎকারকে। তিনি গুনে বললেন যতক্ষণ ওই রাখাল তার বাঁশিতে তান ধরে থাকবে ততক্ষণই জ্বলবে রাজকুমারীর চিতা। এই কথা শুনে রাখাল বিনা বাক্যব্যয়ে বাঁশিটা তুলে ঠোঁটে ঠেকাল। এবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল চিতা।

সে রকম দীর্ঘ দহন আজ অবধি কেউ দ্যাখেনি। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হল, রাত ফুরিয়ে সকাল। রাখাল তার বাঁশি বাজিয়েই চলেছে, বাজিয়েই চলেছে ক্লান্তিহীন, শ্রান্তিহীন। অবশেষে রাজকুমারীর শরীর পুড়ে ছাই হয়ে গেল, চিতাও নিভে গেল আর একটা সরু রক্তের ধারা নেমে এল রাখালের ঠোঁটের কষ থেকে। সে তার প্রেমিকার চিতাভস্মের পাশে লুটিয়ে পড়ল, মৃত। তার শেষ নিশ্বাসটুকুও সে পুরে দিয়েছে বাঁশির খোলে।

আরেকটা চিতা জ্বলে উঠল সেই নদীর ধারে।

কয়েকদিন পরে সেই চিতার মিলিত ছাইয়ের বুক থেকে মাথা তুলল সবুজ একটা লতা। প্যাশন ফ্রুটের লতা।

সেইজন্যেই এই ফলের ভেতরটা মানুষের হৃদপিণ্ডের মতন, বুঝলি? অন্তত সেইরকমই বিশ্বাস করে কলম্বিয়ার মানুষজন।

আড়চোখে সুবোর মুখের দিকে তাকিয়ে শাক্য বিশ্বাস দেখল সুবোর চোখে উদভ্রান্ত দৃষ্টি। সে বড় বড় নিশ্বাস ফেলছে। শাক্য বলল, যাগগে। আমি এখন চলি। সন্ধে সাতটার সময় কিন্তু অবশ্যই রিহার্সালে আসবি। আর একদম নষ্ট করার মতন সময় নেই আমাদের হাতে।

নষ্ট করবার মতন সময় সুবোরও ছিল না। সে কচমচ করে তিনটে প্যাশন ফ্রুট খেয়ে ফেলল—কাঁচাই। তারপর হাঁক ছাড়ল, মা, জামা প্যান্ট বার করে দাও। কলেজ যাব।

ও মা, সে কী রে! সুবোর মা ভারি অবাক হয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। এই যে বললি শরীর খারাপ, কোত্থাও যাবি না।

না, না। সব ঠিক হয়ে গেছে। আমাকে এক্ষুনি বেরোতে হবে।

সুবো ইতিমধ্যেই তার শিরায় শিরায় সেই রাখালের বাঁশির শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। আবেগে তার বুক টন টন করছিল। সে বেশ বুঝতে পারছিল শরীর নয়, সে শুধু মন্দিরার চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে একটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে।

ফিজিক্স ল্যাবরেটরির ফাঁকা ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে ঠিক সেই কথাটাই মন্দিরাকে জানিয়ে দিল। এমন অদ্ভুত ব্যাপার, সেই কথা শুনে আজ মন্দিরাই সুবোর বুকের ওপর তার নরম গালটা পেতে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। যখন মুখটা তুলল তখন তার চোখ দুটোয় জল টলমল করছে। ধরা গলায় বলল, এরকম করে আগে বলোনি কেন, শুভায়ু?

সন্ধেবেলায় শাক্য বিশ্বাসের বাড়ির চিলেঘর আবার জয়সিংহের আবৃত্তির আওয়াজে গমগম করে উঠল।

কেমন বুঝছিস? সুবোকে একটু একলা পেয়ে জিগ্যেস করল শাক্যদা।

ফ্যান্টাস্টিক। প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।

বেশ বেশ। কিপ ইট আপ। শাক্যদা কেমন যেন কাষ্ঠ হেসে কেটে পড়ল।

পরদিন সকালে সুবোর চিৎকারে চমকে উঠলেন তার মা। তাড়াতাড়ি ওর ঘুরে ঢুকে জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে রে? অমন ষাঁড়ের মতন চেঁচাচ্ছিস কেন?

আরে আমার প্যাশন ফ্রুন্টগুলো কোথায় গেল? অলরেডি এফেক্টটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আজ আবার মন্দা...যাগগে। তুমি ওই ফলগুলো কোথায় রেখেছ?

সুবোর মা ভারি অবাক গলায় বললেন, প্যাশন ফ্রুট! আমড়ার ইংরিজি বুঝি প্যাশন ফ্রুট? তা তো জানতাম না। আমাকে শাক্য বলে গেল, মাসিমা দেশের বাড়ি গিয়েছিলাম, মানকুন্ডু। সেখান থেকে বিলিতি আমড়া নিয়ে এলাম। খেয়ে দেখবেন। গুড়ের মতন মিষ্টি।

তা, তুই ও জিনিসের খোঁজ করছিস কেন বাবা? ও দিয়ে তো আমি অম্বল বানিয়ে ফেলেছি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%