তালোত্তম সম্ভব কাব্য

সৈকত মুখোপাধ্যায়

'এশী কাফের শনিবারের আড্ডা সেদিন মোটেই জমছিল না। যাঁরা জানেন না তাঁদের জানিয়ে রাখা ভালো যে, জগাছা রোডের ধারে কাশীরাম মাইতির ঝুপড়ি চায়ের দোকানটাকে ওই দোকানের রেগুলার কাস্টমার সুদীপ, অভ্র, অরুণ আর মানিকলাল ভালোবেসে ওই নামেই ডাকে। এমনকী বছরে দুবার ওরা শব্দবাণ নামে যে লিটল ম্যাগাজিনটা বার করে, সেখানেও যোগাযোগের ঠিকানা হিসেবে কাশী-কাফের নামই দেওয়া থাকে।

আজ আড্ডা না জমার কারণ দুটো। এক, সুদীপ, অভ্র আর অরুণ সন্ধে ছ'টার মধ্যে চলে এলেও ওদের দলের চাঁই মানিকলাল গুপ্ত এখনও আসেনি; যদিও সন্ধে সাড়ে সাতটা বাজতে চলল। মানিকলাল গুপ্ত মালগাড়ির অবসরপ্রাপ্ত গার্ড, ভালোই মাল টানেন এবং সেই সুবাদে প্রায় সময়ই ঊর্ধ্বমার্গে বিচরণ করেন। ওনার প্রিয় নীতিবাক্য হল 'সেই সত্য যা রচিবে তুমি।' কবিগুরুর দেওয়া এই লাইসেন্সের জোরে মানিকলাল গুপ্ত অনর্গল আজগুবি গল্প ফেঁদে যান, যার কোনও-কোনওটি, অশ্রীল অংশ এডিট করে, শব্দবাণে ছাপা হয়। আর মানিকদার আসতে দেরি হলেও ওরা যে তাঁকে মোবাইলে ধরবে, তারও উপায় নেই, কারণ, মানিকদা মোবাইল ফোন ব্যবহারই করেন না। বলেন—রেডিয়ো-কলার জিনিসটা দলছুট হাতি বা বিপন্ন বাঘের গলাতেই মানায়, মানুষের নয়।

তবু মানিকদার দেরিটা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু কাশী-কাফের ঠিক উলটোদিকে রাতারাতি যে টায়ার কোম্পানির বিকট এবং ক্যাটকেটে বিজ্ঞাপনটা লাগিয়ে দিয়ে গেছে সেইটার দিকে তাকালেই সুদীপ, অভ্র আর অরুণের মেজাজ আরো খিঁচড়ে যাচ্ছে। তাল কেটে যাচ্ছে আড্ডার। সেই বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে একটি আদুল গা, টিকটিকির মতন নির্লোম তরুণ ভয়ংকর সাজগোজ করে কী জানি কেন লরির টায়ারের ওপরে বসে মুচকি মুচকি হাসছে। তবে কানে দুল, মাথার চুলে পনিটেল, হাতে বালা, গলায় সাতলহর ললন্তিকা, চোখে সুর্মা, এমনকী ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকও আছে।

সুদীপ দেখবে না দেখবে না করেও আরেকবার হোর্ডিংটার দিকে তাকাল। তারপর সিগারেটের শেষটা পা দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,—হুঁ:, মেট্রোসেক্সুয়াল! মেয়েরা যখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে উঠে এসে বাইরের জগতকে বুঝে নিচ্ছে, এরা তখন পুরুষদের নতুন করে সাজুগুজু শেখাচ্ছে।

অভ্র বলল—সত্যি, এসব দেখলে ভয় করে রে। যে হাত এতদিন হাল ধরেছে, পাথর কেটেছে, তলোয়ারের হাতল, তুলি, কলম, স্ক্যালপেল নিয়ে ব্যাপৃত থেকেছে, সেই হাত কি এখন শুধু বিনুনি বাঁধবে আর কানের দুলের প্যাঁচ লাগাবে?

সেদিন কদমতলায় পিসির বাড়ি গেছি, বুঝলি—বলল অরুণ বাড়ির বাইরের দিকে পিসেমশাইয়ের একটা টিমটিমে লন্ড্রি ছিল। শুনেছিলাম উনি মারা যাওয়ার পরে পিসতুতো দাদা সেটাকে তুলে দিয়ে পুরুষদের বিউটিপার্লার খুলেছে। গিয়ে দেখি সত্যিই তাই। কাচের স্যুইংডোর, এ.সি মেশিন-টেশিন লাগিয়ে দাদা লন্ড্রিঘরটার চেহারা একেবারে বদলে দিয়েছে। আবার কাব্য করে পার্লারের নাম রেখেছে 'কোমল ক্যাকটাস'। মানে বুঝলি তো?

—হ্যাঁ হ্যাঁ। যে ক্যাকটাসের দাড়ি-লোম সব কামিয়ে পুঁইশাক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তোকে আর বোঝাতে হবে না। তারপর বলে যা।

—বলছি, শোন না। স্যুইংডোর ঠেলে পার্লারের ভেতর উঁকি দিয়ে কী দেখলাম বল তো?

—কী?

—দেখি কী, মেসোর লন্ড্রিতে যে উড়িয়া ধোপাটা কাপড় ধোলাই করত, সেই নরহরি, আর তার বউ লক্ষ্মী, দুজনেই নীল কুর্তা-পাজামার ওপরে সাদা অ্যাপ্রন চাপিয়ে দুটো লোকের ফেসিয়াল করছে। আমাকে দেখে একগাল হেসে নরহরি এগিয়ে এল। বললাম,—এ কাজ কবে শিখলে নরহরি? সে বলে কী—নতুন করে আবার শেখার কী আছে দাদাবাবু? পুরুষ মানুষের মুখ ব্লিচ করা আর বেডকভার কাচার মধ্যে তফাত আছে নাকি কিছু? আমি তো সোডা, নীল, ভাতের মাড়—এইসব দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছি।

শুনে ভির্মি খাচ্ছিলাম আরেকটু হলে। তারপর ভেতর-বাড়িতে গিয়ে দেখি দাদা একটা বড় গামলায় দুধ, আটা, কলা দিয়ে বেশ চটকে চটকে মাখছে আর বউদি চাকা চাকা করে শশা কাটছে। বললাম—বা: বেশ, বেশ। সত্যনারায়ণকে সিন্নি দেবে বুঝি?

বউদি একগাল হেসে বলল—তোমারও যেমন বুদ্ধি ঠাকুরপো! সিন্নি আবার কোথায় দেখলে? তোমার দাদা ন্যাচারাল-ফেসিয়ালের মাল-মশলা বানাচ্ছে। আটায় মুখের শুকনো ত্বক ঝরে যায়, দুধে লোমকূপ পরিষ্কার হয় আর পাকা কলায় ঔজ্জ্বল্য বাড়ে। তোমার তো আবার মুখ ভরতি বনমানুষের মতো দাড়ি; নাহলে দিতাম একটু মাখিয়ে।

বললাম—রাম কহো! বরং একটু শশা দাও, খাই।

—ও শশা খাবার জন্যে নয়, চোখের পাতায় প্যাক দেবার জন্যে।—গম্ভীর মুখে বলল দাদা।

দু:খের কথা কী বলব, বউদি আমার জন্যে চা ভিজিয়েছিল। তার লিকারটা অবধি নিয়ে চলে গেল নরহরি। নাকি কাস্টমারের চুলের 'গেলেজ' বাড়াবে ওই দিয়ে।

ইতিমধ্যে কাশীনাথ থার্ড-রাউন্ড চা দিয়ে গেছে। চায়ে চুমুক দিয়ে সুদীপ বলল—আচ্ছা, এসব করে লাভ হয় কিছু? মানে ওই টায়ারে-বসা মালটার মতন চেহারা দেখে মেয়েরা পটে?

অরুণ বলল—তা বলতে পারব না। পুরুষ মানুষের আদর্শ রূপ নিয়ে বিশেষ চর্চা হয়েছে বলে তো মনে হয় না। তা ছাড়া রূপের আদর্শও স্থির কিছু নয়, যুগে যুগে তার বদল হয়।

—তার থেকেও বড় কথা—অভ্র মাথার পেছনে হাতে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে বলল—মেয়েরা আদৌ রূপ দেখে পটে, না গুণ দেখে মজে, না পয়সা দেখে ফাঁসে, তা তো আজও বুঝে উঠতে পারলাম না।

বলে রাখা ভালো, অভ্র তার চব্বিশ বছরের জীবনে পাঁচ নম্বর হাফসোলটা এই ক'দিন আগেই মাত্র খেয়েছে।

অভ্রর কথা শেষ না হতেই ওদের পেছন থেকে গম্ভীর ঘোষণা ভেসে এল—ওহে অবোধ, অপোগণ্ডর দল! মেয়েরা রূপ, গুণ, পয়সা কিছুই বোঝে না। তারা বোঝে উপযোগিতা, ইউটিলিটি।

ঈষৎ টলায়মান অবস্থায় ওদের পাশের বেঞ্চিতে এসে বসলেন মানিকলাল গুপ্ত।

—এই দ্যাখো, তুমি আবার টেনে এসেছ? এরকম করলে পত্রিকা বার করা যাবে? একটু যদি সিরিয়াস না হও...

—ও:, বুঝিস না কেন সুদীপ, এট্টু না খেলে যে আমি সিরিয়াস হতেই পারি না। হ্যাঁ, অরুণ কী যেন বলছিলিস? পুরুষ মানুষের রূপের কোনও আদর্শ নেই, না কী যেন?

—হ্যাঁ, তাই তো বলছিলাম। কেন? তোমার আছে নাকি কিছু জানা?

—যা জানতাম তাই দিয়েই তো তৈরি হয়েছিল তালোত্তম।

—তা-আ-আ, লো-ও-ও-ত, তম-অ-অ???

—আরে বাবা হ্যাঁ। তালোত্তম। তাল তাল উত্তম বস্তু মিশিয়ে যে পুরুষকে বানানো হয়। কেন, 'তিলোত্তমা' বুঝতে তো এক মিনিট সময় লাগে না। 'তালোত্তম' শুনে অমন হাঁ হয়ে গেলে চলবে?

—তুমি বানিয়েছিলে তালোত্তম? কোথায় সে?

—আমি বানাব কেন? বানিয়েছিলেন প্রফেসর কাশ্যপ। আমি কেবল পরামর্শ দিয়েছিলাম। আর, জিগ্যেস করছিস তালোত্তম কোথায়? সে বড় দু:খের কাহিনি রে। সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই তো শিখলাম ওই একটু আগে যা বলছিলাম—মেয়েরা রূপ-গুণের থোড়াই পরোয়া করে। পাক্কা ইউটিলিটেরিয়ান সব। না হলে বকফুলের মতন সুন্দর জিনিসকে ব্যাসনে ডুবিয়ে বড়া ভাজে?

তাই বলছি, পুরুষদের ফ্যাশনের চেঞ্জ নিয়ে তোরা বেশি উতলা হোস না। ওসব ফ্যাশান আসবে-যাবে। মেয়েরা চিরকাল একইরকম থেকে যাবে—নিসিন্দে আর কাসুন্দের মতন।

নিসিন্দে আর কাসুন্দে! ওরা মানিকলালকে ঘিরে ঘন হয়ে বসল।—তালোত্তমের সঙ্গে তাদের কী সম্পর্ক? কেসটা বলো তো শুনি। এই কাশী, মানিকদাকে লাল চা দে। লেবু দিবি না। নেশা কেটে যাবে।

চায়ে চুমুক দিয়ে মানিকলাল স্মৃতিচারণা শুরু করলেন।

প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা। লক্ষ্ণৌ-লালকুঁয়া মিটার গেজ লাইনে মালগাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলাম।

আমাদের মালগাড়ির গার্ডের মতো নি:সঙ্গ চাকরি পৃথিবীতে আর নেই রে। সেই একপ্রান্তে ইঞ্জিনে বসে আছেন ড্রাইভার সাহেব আর আশিটা বগির পেছনে লোহার ঘোমটা দেওয়া কামরায় বসে আছি আমি; মধ্যে এক কিলোমিটার জুড়ে শুধু লাট লাগানো ছোলার বস্তা। সন্তনগরের একটু আগে এসে সিগনালে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। সন্তনগরের নাম শুনেছিস তো?

—কৃষি-গবেষণা কেন্দ্র?

—ইয়েস। তো লণ্ঠন হাতে হাঁটতে-হাঁটতে সেই সন্তনগর স্টেশনে পৌঁছে যা খবর পেলাম তাতে চিত্ত জল হয়ে গেল। সামনে নাকি সরযূ নদীর একটা শাখা হঠাৎ বন্যার তোড়ে একটা ব্রিজ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কবে যে সেই ভাঙা ব্রিজ সারানো হবে তা খোদায় মালুম। যতদিন না হচ্ছে ততদিন গাড়ি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।

ড্রাইভার তো তাই শুনে স্যুটকেস হাতে নিয়ে শিস দিতে দিতে লক্ষ্ণৌয়ে ফিরে গেলেন। কিন্তু গার্ডের জানিস তো, গাড়ি ছেড়ে যাবার নিয়ম নেই। কাজেই আমি সেই গহন শালবনের মধ্যে ছোলার বস্তা আগলে বসে রইলাম। কেরোসিন স্টোভে খিচুড়ি রেঁধে খাই, ক্যাসেট- প্লেয়ারে শচীনকত্তার ভাটিয়ালি শুনি। প্রথম দিনটা এইভাবেই কেটে গেল। দ্বিতীয় রাতে হঠাৎ গার্ডকামরার জানলায় ঠক-ঠক আওয়াজ।

জানলার কাচে চোখ লাগিয়ে দেখি চমৎকার একটি আরবি ঘোড়ার পিঠে চেপে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। সাজ-পোষাকে পাক্কা সাহেব। পরনে রাইডিং ব্রিচেস আর জ্যাকেট। মাথা আমার জানলার উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। আমাকে ভদ্রলোক হাতের ইশারায় দরজা খুলতে বললেন। ভালো করে দেখে নিলাম ওনার হাতে অস্ত্রটস্ত্র আছে কি না। তারপর চট করে দরজা খুলে গার্ডের কামরায় ওনাকে ঢুকিয়ে নিয়ে আবার ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। সাবধানের মার নেই।

ভদ্রলোক ক্যাম্প-খাটে আমার পাশে বসলেন। খেয়াল করে দেখলাম ওনার চোখের দৃষ্টি কেমন যেন উদভ্রান্ত। আমাকে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, হিন্দিতেই বললেন—আপনি তো বাঙালি? বাংলা গানের শব্দ পেলাম জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে।

বললাম—ঠিকই ধরেছেন।

ওনার পরের প্রশ্নটার জন্যে একেবারেই তৈরি ছিলাম না। জিগ্যেস করলেন—মধুসূদন দত্তের তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য পড়েছেন?

অগত্যা আমিও পালটা প্রশ্ন করলাম—কবে পালালেন?

—কোত্থেকে?

—পাগলা গারদ থেকে।

—ধ্যাৎ মশাই, আপনি কি আমাকে পাগল ভাবলেন নাকি? আমি প্রফেসর কাশ্যপ। সন্তনগরের কৃষি-বৈজ্ঞানিক। পঞ্জিকার পেছনে যে অতিবৃহৎ লাল মূলার বিজ্ঞাপন দেখেন, তা আমারই আবিষ্কার।

—বলেন কী? তাহলে হঠাৎ ভদ্রলোকের দরজায় ধাক্কা দিয়ে 'তিলোত্তমা সম্ভব' পড়েছে কি না জিগ্যেস করা কেন?

—আহা বলুনই না।

—পড়েছি ছেলেবেলায়।

—গল্পটা একটু বলতে পারবেন? যেটুকু মনে আছে!

—ওই তো, সুন্দ আর উপসুন্দ নামে দুই রাক্ষস ভাই ছিল। তারা কার কাছ থেকে যেন বর পেয়েছিল যে, তারা যদি নিতান্তই একে অন্যকে বধ না করে তাহলে আর কেউ তাদের মারতে পারবে না। এদিকে দু-ভাইয়ের তো বেদম ভাব। তারা মারামারি করবে কোন দু:খে? বরং দু-জনে মিলে মনের সুখে দেবতাদের মারতে লাগল। দেবতারা দেখল বিপদ। তখন বোধহয় বিষ্ণুর মাথা থেকেই বেরোল একটি সুন্দরী নারী নির্মাণ করে দু-ভাইয়ের মাঝখানে ছেড়ে দিলে কেমন হয়? যেমন ভাবা তেমনি কাজ। বিশ্বকর্মা ত্রিলোকের সৌন্দর্য তিল তিল করে আহরণ করে একটি রমণী-রতন নির্মাণ করলেন।

—আ-হা-হা, দু-একটা মেটিরিয়াল বলতে পারবেন?

—আপনি মাস্টার গোত্রের জীব। আপনার সামনে সবটা তো বলতে পারব না। তবে ধরুন, ভ্রমরের কৃষ্ণপক্ষ দিয়ে তৈরি হল সেই নারীর চক্ষুতারকা। ঠোঁটের জন্যে বিম্বফল, মানে তেলাকুচো তো পুরোনো প্রেসক্রিপশন। তারপর তিলফুল দিয়ে নাক। দাড়িম্ব আর কদম্বের মধ্যে ভয়ানক ঝগড়া লাগল, কে তার স্তনযুগে স্থান পাবে তাই নিয়ে। তখন বিশ্বকর্মা ধুত্তোর বলে দুজনকেই সড়িয়ে পূর্ণচন্দ্রের আদলে তার পয়োধর গঠন করলেন। কদলীর আদলে গড়লেন উরু, গজকুম্ভের আদলে নিতম্ব...আর বলব?

—থাক থাক, চিত্তচাঞ্চল্য ঘটছে।

—হ্যাঁ, এইভাবে তো তিল তিল সৌন্দর্য জড়ো করে তৈরি হল তিলোত্তমা। তিনি গিয়ে সুন্দ-উপসুন্দের মধ্যে দাঁড়ানো মাত্র দুই ভাইয়ের মধ্যে দে ধপাধপ নে ধপাধপ। ব্যস। দু'জনেই খতম।

—বা বা। কিন্তু সুন্দ-উপসুন্দ যদি পুরুষ না হয়ে নারী হত! ধরুন তাদের নাম হত যদি নিসিন্দে রাই আর কাসুন্দে রাই?

—এই দেখুন স্যার, আবার কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে আপনি পাগলা গারদ থেকে...

—ও:, চুপ করে শুনুন না যা বলছি। সত্যিকারেই নিসিন্দে আর কাসুন্দে নামে দুই নারী গত তিন বছর ধরে সন্তনগর শাসন করছে। দুই বোন। যুবতী। অবিবাহিতা। একজন রেজিস্ট্রার, আরেকজন টিচার্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি। দুটোই নির্বাচিত পদ। গত নির্বাচনে নিসিন্দে রাই আর কাসুন্দে রাই আমার প্যানেলকে গোহারান হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। আর ক্ষমতায় এসে থেকে আমরা, যারা ওদের প্রতিপক্ষ ছিলাম, তাদের লাইফ হেল করে দিচ্ছে।

—কীরকম, কীরকম?

—আমরা একটুআধটু গ্র্যান্টের টাকা মারতাম, ভুয়ো যন্ত্রপাতি কেনার বিল করতাম কিংবা শালাকে ভাইপোকে সন্তনগরের নানান নির্মাণ-কার্যের কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দিতাম। তা ছাড়া রিসার্চ অ্যাসিস্টেন্ট ছাত্রীদের থেকেও যাকে বলে ফেমিনিন-ফেবার নিয়ে থাকতাম। নিসিন্দে আর কাসুন্দে এসে গত তিন বছরে এইসব ভালো ভালো প্রথা বন্ধ করে দিয়েছে। সুন্দ-উপসুন্দের হাতেও দেবতারা এভাবে নাকাল হয়নি। এখন এত নিরামিষ জীবন আমাদের যে দেখে ফুলকপিও হাসে।

—ওহোহো, বড়ই বেদনা পেলাম শুনে। তাহলে কী করবেন এখন?

—আর একমাস বাদেই আবার সেক্রেটারি আর রেজিস্ট্রার পদে ইলেকশনের তারিখ পড়েছে। আমরা এবারেও ফাইট দেব ঠিকই, কিন্তু মনে মনে জানি, ওদের দু'বোনের মধ্যে বিরোধ বাধাতে না পারলে এবারেও জিতব না। তাই ভাবছি—তিলোত্তমা ফর্মুলা অ্যাপ্লাই করলে কেমন হয়?

—বলেন কী? তালোত্তম?

—হেঁ হেঁ হেঁ। নামটা তো খাসা দিলেন। একেই বলে বাঙালির ব্রেন। তা-লোত-তম। তাল তাল উত্তম জিনিসের মিশ্রণে তৈরি পুরুষ। বা বা বা।

—কিন্তু প্রফেসর কাশ্যপ বানানোর ঝামেলায় যাবেন কেন? আপনার দলে হ্যান্ডসাম যুবক নেই?

—ছিল তো। ডক্টর লছমন ঝা। ভোজপুরী সিনেমায় নায়কের পার্ট অবধি করেছিল, জানেন। সে একদিন আমাদের গোশালার রাস্তায় নিসিন্দে রাইয়ের হাতটা একটু ধরেছে, অমনি দু-বোনে মিলে তাকে বেদম পিটিয়ে গোবরসারের চৌবাচ্চায় ফেলে দিল। ও তালোত্তম ছাড়া আর কেউ ভাঙন ধরাতে পারবে না, বুঝেছেন! আপনি তো বাঙালি, মধুসূদনের দেশের লোক। বলুন না, কী কী জুড়লে আচ্ছা-সে-আচ্ছা একটি পুরুষ তৈরি হয়?—বললেন ডক্টর কাশ্যপ।

বুঝলি অরুণ, বিদেশে বসে যদি তোকে কেউ জাতের দোহাই দেয় তবে তা তুচ্ছ করা খুব কঠিন। শাস্ত্র-পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারত যেখান থেকে যেটুকু মনে পড়ল, লিস্টি করে দিলাম ডক্টর কাশ্যপকে। মনে মনে ভাবছি, নিয়ে কী করবি ঘোড়াড্ডিম? তোরা কি বিশ্বকর্মা, যে জড়বস্তুর গুণাবলি দিয়ে মানুষ বানাবি? মুখে আমার সন্দেহের কথা বলেও ফেললাম ডক্টর কাশ্যপকে।

তাই শুনে ডক্টর কাশ্যপ বললেন,—কী যে বলেন না! আমাদের কাছে এমন সব হর্মোন-টর্মোন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এইসব আছে যে, মানুষ বানানো আমাদের কাছে জলভাত। আচ্ছা, আপনাকে একটু স্যাম্পেল দেখিয়ে যাই।

এই বলে টেবিলের ওপর থেকে আমার হুইস্কির বোতলটা নিয়ে কীসব করলেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বোতলটা কচি কচি ডাল-পাতায় ছেয়ে গেল; দশ মিনিটের মাথায় লাল লাল লঙ্কায় ভরে গেল সেই বোতলঙ্কার গাছ। গতবছর অব্দি সেই গাছের লঙ্কা খেয়েছি। জল, মাটি কিচ্ছু লাগত না। শুধু সপ্তাহে একচামচ করে অ্যালকোহল। গতবছর আমার নাতির হাত থেকে পড়ে সেই বোতলঙ্কার গাছ ভেঙে গেল।

যাই হোক, এর পরে তো আর ডক্টর কাশ্যপের হাতযশে অবিশ্বাস করা যায় না। অতএব ভয়ংকর কৌতূহল নিয়ে বসে রইলাম তালোত্তম সম্ভব কাব্যের শেষ সর্গের জন্যে। কিন্তু বিধি বাম। দুদিনের মধ্যেই রেল-কোম্পানি ভাঙা ব্রিজ সারিয়ে ফেলল, ড্রাইভার ফিরে এল, আর আমাকেও মালগাড়ি নিয়ে চলে যেতে হল লালকুঁয়া।

এরপর কাজের চাপে ভুলেই গিয়েছিলাম সন্তনগরের ঘটনা। মনে পড়ল, মাস দুয়েক বাদে, ওই সন্তনগরে ফিরে গিয়েই। সেদিনও মালগাড়ি নিয়ে সন্তনগর পেরোচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ ক্ল্যাং-গুড়দুম আওয়াজ তুলে গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল। গার্ড-কামরা থেকে উঁকি মেরে দেখলাম সিগন্যাল দিব্যি সবুজ। তাহলে হলটা কী? অগত্যা লণ্ঠন নিয়ে লাইন ধরে ইঞ্জিনের দিকে দৌড়োলাম।

ইঞ্জিনের সামনে গিয়ে দেখি এক অদ্ভুত দৃশ্য। লাইনের ওপর গলা দিয়ে শুয়ে আছেন ডক্টর কাশ্যপ, এবং তাঁর পাশে শুয়ে আছে একটি বলশালী অশ্বেতর, মানে খচ্চর আর কী।

ডক্টর কাশ্যপের পরনে আজ ইওরোপিয়ান পোশাকের পরিবর্তে লুঙ্গি আর গেঞ্জি। ড্রাইভার তো কাশ্যপকে শুধু মারতে বাকি রেখেছে। বলে—কোথাকার উজবুক। মালগাড়ির সামনে সুইসাইড করতে এসেছে, যার ইস্পিড কিনা ঘণ্টায় দশ মাইল। যাই হোক, আমি তো পুরোনো পরিচয় দিব্যি দিয়ে, গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কাশ্যপকে ভূমিশয্যা থেকে ওঠালাম। কিন্তু খচ্চরটা কিছুতেই উঠবে না। এমন আত্মহত্যাপ্রবণ খচ্চর আমি কখনও দেখিনি। শেষকালে পেটের নীচে বাঁশ দিয়ে চাড় দিতে ব্যাটা উঠে গম্ভীর মুখে রেল লাইনের ধারে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। ডক্টর কাশ্যপকে নিয়ে আমি ফিরে গেলাম গার্ড-কামরায়। গাড়ি আবার চলতে শুরু করল।

একপেগ হুইস্কি খাইয়ে কাশ্যপকে একটু চাঙ্গা করে তুলে প্রশ্ন করলাম,—ব্যাপারটা কী ডক্টর? মাথায় সুইসাইড করার মতন এমন বদখেয়াল চাপল কেন?

ডক্টর কাশ্যপ মাথা নীচু করে জবাব দিলেন—সেক্রেটারি-ইলেকশনে আমার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে, আমার প্যানেলের কুড়িজনই হেরে গোভূত হয়েছে, আমার কোয়ার্টারে ইনকাম-ট্যাক্স হানা দিয়েছে, আমার ছাত্রী কাম সহচরী পিপাসা মেটা হুমকির চোটে কলেজ ছেড়ে দিয়েছে, এমনকী অতিবৃহৎ লাল মূলার ফর্মুলা যে ব্রাজিল থেকে চুরি করেছিলাম তা অবধি কাগজে ফাঁস হয়ে গেছে। সারা সন্তনগরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিসিন্দে আর কাসুন্দে দুই বোন। আমার আর বেঁচে থাকবার উপায় নেই।

অবাক হয়ে বললাম—এমন হল কেন? তালোত্তমকে কি তাহলে শেষ অবধি বানিয়ে উঠতে পারেননি?

এই কথায় ভয়ংকর খেপে গিয়ে ডক্টর কাশ্যপ মালগাড়ির শব্দের ওপর গলা তুলে চ্যাঁচাতে লাগলেন—হ্যাং ইয়োর তালোত্তম। সেই হারামজাদার জন্যেই আজ আমার এই অবস্থা। ও আর পিপাসা মেটা দুজনে মিলে আমাকে ডোবাল। সাধে কী বলে, স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী!

—হল কী ডক্টর কাশ্যপ?

—আরে তুমি যেমনটি বলেছিলে তেমনটি লক্ষণ মিলিয়ে পুরুষশ্রেষ্ঠ তৈরি করলাম। তুমি বললে 'শালপ্রাংশু'। শাল গাছ পাওয়া আর এমন কী শক্ত। নিয়ে এলাম শালগাছের গুঁড়ি।

তারপর বললে 'মহাভুজ'। মানে নাকি যে হাতের আঙুল লম্বমান অবস্থায় হাঁটু ছাড়িয়ে যায়। তা মানুষের তো এমন হাত হয় না। বাগান থেকে একটা হনুমান ধরে তার হাতদুটো শালগাছের দুপাশে জুড়ে দিলাম।

তারপর বলেছিলে 'কপাটবক্ষ'। নিজের কোয়ার্টারের চিলেঘরের দরজার কপাট খুলে লাগালাম তালোত্তমের বুকে।

এমনি করে সেটস্কোয়ার নিয়ে নিখুঁত আয়তক্ষেত্র এঁকে 'আয়তচক্ষু', টিয়াপাখির ঠোঁট দিয়ে 'শুকচঞ্চু নাসা'। একবার মনে হয়েছিল নাকের লাল রংটার জন্যে কীরকম জোকার জোকার লাগছে যেন। স্কিন-কালার করে দিই বরং। তারপর ভাবলাম, না: থাক। শাস্ত্রবাক্য লঙ্ঘন করা উচিত নয়। তুমিই বলেছিলে, ভুরু যেন কান ছুঁয়ে থাকে। তা, অতবড় ভুরু পাব কোথায়? তাই কানদুটোকেই খুলে চোখের কোনায় বসিয়ে দিলাম।

তারপর 'পক্ব গোধূম বর্ণ'। পক্ব গোধূম মানে পাকা গম। এইখানে একটু মুশকিল হল। আমাদের সন্তনগরের কৃষিখামারে তিনশো তেতাল্লিশ রকমের গমের বীজ আছে। তাদের তিনশো তেতাল্লিশ রকমের রং। সরবতী, সোনোরা, কল্যাণসোনা, সোনালিকা—কার রং নেব? তারপর ভেবে দেখলাম, তুমি বাঙালি হয়ে যখন বলেছ, তখন নিশ্চয়ই পশ্চিম বাংলার রেশনে যে গমটা দেওয়া হয়, সেই 'পচা বাংলা' গমের রংটাই ঠিক হবে। একটু কালচে গোবর গোবর রং। তবু 'জয় মা' বলে সেটাই দিলাম তালোত্তমের গায়ে লাগিয়ে।

এইভাবে দিব্যি তালোত্তম তৈরি হল। এবার তো প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে হয়। আর এইখানেই আমি সবচেয়ে বড় ব্লান্ডারটা করে বসলাম। আমার সহচরী সেই পিপাসা মেটাকে জিগ্যেস করলাম—আচ্ছা পুরুষ মানুষের কেমন হৃদয় তুমি পছন্দ করো? সিংহের মতন?

পিপাসা খিল খিল করে হেসে বলল—তাহলে কি আপনার মুখ দেখি স্যার? পুরুষ মানুষের হৃদয় হবে ভেড়ার মতন; তবেই মেয়েরা তাকে পছন্দ করবে।

অতএব একটি ভেড়ার হৃদয় বুকে ফিট করে তালোত্তমকে পাঠিয়ে দিলাম কাসুন্দে-নিসিন্দের কোয়ার্টারের দিকে। তারপর সারা রাত জেগে বসে রইলাম দুই বোনের ঝগড়ার আওয়াজ শুনব বলে। কোথায় কী? উলটে ভোর হতে না হতেই মাইকের আওয়াজে গোটা সন্তনগর ক্যাম্পাস কেঁপে উঠল :

পেয়ারে ভাইয়োঁ ঔর বহেনো, দেখে যান, দেখে যান, দেখে যান। দেখুন, উল্লুকে পাঁঠে, কুত্তে কামিনে ডক্টর কাশ্যপ আমাদের দুই অবলা নারীর জান লেনে কি খাতির, ক্যায়সা ভয়ানক রোবট, য়ানে যন্ত্রমানব বনাকে ভেজা হ্যায়। এ পেয়ারে, বোলো না ইন লোগোকোঁ, কৌন ভেজা হ্যায় তুমকো।

ছাদে দাঁড়িয়ে দেখি কী, পুরুষাধম তালোত্তম কুন্দদন্ত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে লাজুক মুখে উত্তর দিচ্ছে—ডক্টর কাশ্যপনে ভেজা হ্যায়।

তার পরেই তো পাব্লিক 'মার মার' করে তাড়া করল আমাদের। পরের দিনই ছিল ইলেকশান। ফলাফল যা হল সে তো আগেই বলেছি।

—শুনেছি ইলেকশানে জেতার পর নিসিন্দে রাই আর কাসুন্দে রাই কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নিয়ে গার্ডেন পার্টি দিয়েছিল। সেখানে শালকাঠের আগুনে হনুমানের মাংস আর ভেড়ার কলিজার বার-বি-কিউ হয়েছিল। ভাবতে পারো, আমার চিলেঘরের কপাটটা দিয়ে দু-বোনে কদমগাছে ঝুলা বানিয়েছে।—ডক্টর কাশ্যপ লুঙ্গির খুঁটে চোখ মুছলেন।

সুদীপ, অভ্র আর অরুণ এতক্ষণ চুপ করে মানিকলাল গুপ্তর গল্প শুনছিল। এবারে সুদীপ জিগ্যেস করল—তাহলে এ গল্পের মরালটা কী?

—মরাল হল, মেয়েরা কক্ষণো পুরুষ মানুষের রূপের মতন পেটি ব্যাপার নিয়ে মাথায় না। দুই বোনের যদি ঝগড়া করতেই হয় তাহলে মাইনে নেয় কম, খাটে দুরমুশের মতন অথচ একদমই কামাই করে না—এরকম একটি কাজের মাসির অধিকার নিয়ে ঝগড়া করতে পারে; কিন্তু মেট্রো সেক্সুয়াল নিয়ে? ছো:!

এই অবধি বলে মানিকলাল উঠতে যাচ্ছিল, তৎক্ষণাৎ অভ্র তার হাত ধরে থামাল। মাণিকলাল ভুরু তুললেন—কী হল রে?

—না, মানে একটা জিনিস বলে দিচ্ছে যে তোমার এটা বানানো গল্প। মোটেই কোনও আসল ঘটনা নয়।

মানিকলাল ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করল—কী জিনিস?

—মানে কাশ্যপের আদৌ কোনও খচ্চর ছিল না। ওটা তো ঘোড়া!

—ও হো হো। বলে হা হা করে একচোট হেসে নিল মানিকলাল। তারপর বলল—কাশ্যপের ঘোড়াটাই তো মনের দু:খে শুকিয়ে খচ্চরের মতো হয়ে গেছিল।

—কেন, কেন, কী এমন দু:খ হয়েছিল তার যে সে ঘোড়া থেকে 'ঘোড়েতর' খচ্চরের মতো হয়ে গেল?

তার শরীর থেকেও কাশ্যপ একটা জিনিস খুলে নিয়ে তালোত্তমর শরীরে ফিট করেছিল। সেটা গেলে ঘোড়ার ঘোড়াত্বই যে আর থাকে না রে!

কাশ্যপের ঘোড়ার দু:খেই যেন, মানিকলাল একটা দীর্ঘশ্বাস খরচ করল।

আর সেই মনোবেদনাতেই তো খচ্চরটা, থুড়ি ঘোড়াটা, আত্মহত্যা করার জন্যে মরণপণ করে বসেছিল। রেললাইন থেকে উঠতেই চাচ্ছিল না!!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%