সৈকত মুখোপাধ্যায়

মহেশপুর মহিলা মহাবিদ্যালয়ের, মানে সোজা বাংলায় মহেশপুর গার্লস কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের বাৎসরিক পরীক্ষা শুরু হল।
শুরু হল ইতিহাসের প্রথমপত্র দিয়ে।
ভাবগম্ভীর পরিবেশের মধ্যে নব্বইটি ছাত্রী কোশ্চেন-পেপার খুলল, এবং প্রথম প্রশ্নটির ওপর চোখ বুলিয়েই সমবেত কণ্ঠে আর্তনাদ ছাড়ল—ইসসসসস।
দশ নম্বরের সেই প্রশ্নটি এক নম্বরের অসভ্য। 'লিঙ্গের উত্থানের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা করো।'
নব্বইটি ছাত্রীরই সেই প্রশ্ন দেখে মুখ লাল হয়ে গেল। লজ্জায় নয়, রাগে।
তাদের মনে হল প্রশ্নটি একাধিক কারণে অন্যায্য।
প্রথমত, তারা আর্টস-এর ছাত্রী। ও জিনিসটি উত্থানের কারণ তারা কেমন করে জানবে? ও তো বায়োলজির সিলেবাস।
দ্বিতীয়ত, মহেশপুর কলেজ একটি গ্রামীণ কলেজ এবং চারদিকে প্রচুর আড়াল-আবডাল থাকার ফলে প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ, অর্থাৎলিঙ্গের উত্থানের ফলাফল সম্বন্ধে নব্বই জন ছাত্রীর মধ্যে অষ্টআশি জনেরই প্রত্যক্ষ এবং মধুর অভিজ্ঞতা রয়েছে (অবশিষ্ট দুটি ছাত্রী পারস্পরিক লেসবিয়ান)। তবু সেসবই তাদের প্রাইভেট ব্যাপার। পরীক্ষার খাতায় তা নিয়ে লিখতে তাদের বাধ্য করা হবে কেন?
তৃতীয়ত, এখানে কি বেশ কিছুটা জেন্ডার-বায়াসের ঘটনা ঘটে গেল না? মেয়েদের কলেজে পুং প্রত্যঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন কেন? নব্বইটি ছাত্রী সমবেত কণ্ঠে গর্জন ছাড়ল...সুশীলাদির কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও।
সুশীলাদির সঙ্গে সুশীলসমাজের কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি কলেজের প্রিন্সিপাল—সুশীলা ধাড়া। নামমাত্র ডিভোর্সী। ছাত্রীরা যখন তার নাকের সামনে একনম্বর কোশ্চেনটি নাচাল, তখন বহুযুগের ওপার থেকে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সর্বনাশ! ইয়ের উত্থান ও ফলাফল! রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে তিনি মনে মনে ইতিহাসের পেপার-সেটার মহুয়া মুখার্জির মুণ্ডপাত করতে লাগলেন। সে ছুঁড়ির সবে দু-মাস হল বিয়ে হয়েছে। কিন্তু তাই বলে কি এখন বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে কোশ্চেন বানাতে হবে? ছি ছি ছি। কী করবেন তিনি এখন?
মহুয়া আবার এখনও কলেজে আসেনি। আজকাল প্রায়ই বারোটার পরে কলেজে ঢুকছে। নতুন বিয়ে হয়েছে বলে মায়া করে কিছু বলতেন না। কিন্তু এই মুহূর্তে সুশীলা ধাড়ার মনে হল, না বলাটা মস্ত ভুল হয়েছে তার। অগত্যা পরীক্ষা কিছুক্ষণের জন্যে স্থগিত রেখে তিনি অন্য টিচারদের জরুরি মিটিং-এ তলব করলেন।
টিচার্স-রুমে শ্মশানের পরিবেশ। বাংলার হেনা মিত্র শুধু একবার মিনমিন করে বললেন—আচ্ছা সুশীলাদি। ছাপাখানার ভুলে ইতিহাসের কোশ্চেনের মধ্যে জীবনশৈলীর প্রশ্ন ঢুকে যায়নি তো?
—তোমার মুণ্ডু! জীবনশৈলী পড়ানো শুরু হয়েছে, যে কোশ্চেন বানানো হবে? আর, এর নাম জীবনশৈলী?
—ওটার বদলে একটা যা হোক প্রশ্ন লিখতে বলুন না মেয়েদের। এই ধরুন...ধরুন হর্ষবর্ধনের দাক্ষিণাত্য ক্ষত...কিংবা কিংবা...
—কিংবা অওরঙ্গজেবের বৌদ্ধধর্মপ্রচার। সবই তো ভুলে মেরে দিয়েছ দেখছি। যতসব অশিক্ষিত বর্বর। খেঁকিয়ে উঠলেন প্রিন্সিপাল সুশীলা।
তারপর মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললেন—ওরা তো বিকল্প কোশ্চেন চাইছে না। এই অসভ্যতার কারণ জানতে চাইছে।
—আটকাবেন কেমন করে? এ তো রাইট টু ইনফর্মেশন। তথ্য জানার অধি...। সুশীলাদির জ্বলন্ত দৃষ্টির সামনে টপ করে নিজের মন্তব্য গিলে ফেললেন পলসায়েন্সের মাধবী নন্দী।
—কী হয়েছে সুশীলাদি? মেয়েরা পরীক্ষা থামিয়ে বসে আছে কেন? হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল মহুয়া মুখার্জী, ইতিহাসের দিদিমণি।
—তোমার দয়ায়। টিভির লোকজন আসার সময় হয়ে গেল। এলে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তুমিই এটা ব্যাখ্যা কোরো। আমাকে আর লজ্জা দিও না। ইতিহাসের কোশ্চেনপেপারটা মহুয়া মুখার্জির মুখের সামনে বাড়িয়ে ধরলেন সুশীলা ধাড়া।
একবার কোশ্চেনের কপিটায় চোখ বুলিয়েই মহুয়া করিডর ধরে গটমট করে হেঁটে গিয়ে ঢুকল পরীক্ষার হলে। মেয়েরা কিছু বলতে যাচ্ছিল। একধমকে তাদের থামিয়ে দিল মহুয়া। তারপর বলল...প্রথম কোশ্চেনে একটা ছাপার ভুল হয়ে গেছে। তোমরা শুরুতে একটা 'ক' বসিয়ে নাও। প্রশ্নটা হবে, 'কলিঙ্গের উত্থানের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা করো।'
আর একটা কথা শুনে রাখো। তোমাদের মনে যে এত পাপ, তার জন্যে প্রত্যেকের পাঁচ নম্বর করে কাটব। আগেই বলে রাখলাম।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।