মীনচক্ষুর বিকল্প

সৈকত মুখোপাধ্যায়

সুনীল পালোধী তার ট্রাক্টরে চাপিয়ে মাসতুতো শালী চন্দনাকে নিজের গ্রাম শ্যামাদেউলে নিয়ে এসেছিল। কারণ, চন্দনার বাসস্থান যশপুরে নাকি তার যোগ্য পাত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। অপর পক্ষে শ্যামাদেউলে সুপাত্র বেশ ক'টি থাকলেও সুন্দরী বলতে সেরকম কেউ নেই। চন্দনার মতো রূপসীর পক্ষে এমন ফাঁকা মাঠে গোল করা কী আর এমন কঠিন কাজ?—এমনটাই ভেবেছিল সুনীলের বউ গিরিবালা।

এলিমিনেশন রাউন্ড পর্যন্ত সব কিছু বেশ ঠিকঠাক এগোল। চন্দনা গ্রামে ঢোকার এক মাসের মধ্যে মোটমাট আটটি ছেলে নিজের যোগ্যতা বুঝে চন্দনার সঙ্গে প্রেম করতে এসেছিল। চন্দনা তাদের মধ্যে দুজনের সামনে অন্য ছ'জনের এমন প্রশংসা করল যে, তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না তারা অমনোনীত। আর দুজনের ক্ষেত্রে চন্দনা মোবাইলে কল এলেই কেটে দিত। তারাও ইঙ্গিত বুঝতে পেরে সরে পড়ল।

বাকি রইল চার। তাদের মধ্যে দুজন আবার কিছুতেই প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারছিল না। বাধ্য হয়ে ভাইফোঁটার দিন চন্দনা থালায় ধানদুব্বো সাজিয়ে তাদের কাপালে ফোঁটা দিয়ে এল।

কিন্তু এর পরই চন্দনা সমস্যায় পড়ল। ফাইনালে পৌঁছোল যে দুই যুবক, তরুণ কোঙার আর অর্ঘ্য মণ্ডল, তারা একেবারেই তুল্যমূল্য। দুজনেই স্টিল প্ল্যান্ট-এর ট্রেনি ম্যানেজার, দুজনেরই বয়স পঁচিশ, দুজনকেই দেখতে হ্যান্ডসাম এবং সবচেয়ে বড় কথা, ওদের দুজনকেই চন্দনার খুব পছন্দ হয়। তা হলে?

চন্দনার রাতের ঘুম গেল। এ দিকে তার মোবাইলে ক্রমাগত মেসেজ আসছে—আমি না ও? ও না আমি?

দুই আলাদা আলাদা ফোন নম্বর থেকে দুই ভিন্ন ভিন্ন তরুণ হৃদয়ের একই রকম আকুল প্রশ্ন চন্দনার মনকে উচাটন করে তুলল। কী যে করে সে!

এমনই এক দিনে গিরিবালার কোলের মেয়ে প্রিয়াঙ্কা চন্দনার গলা জড়িয়ে বলল, মাসিমণি তুমি আমাদের গ্রামের তুবড়ি কম্পিটিশন দেখেছ?

না তো। কখন হয় রে?

এই তো, রাসের মেলার শেষ দিনেই তো হবে। জানো মাসিমণি...

কী রে?

ওই তোমার পেছনে ঘুরঘুর করছে যে দুটো ছোকরা...

ছি:। ওই ভাবে বলতে হয়?

বাবা-ই ওদের ওরকম বলে। শোনো না, ওই অর্ঘ্যদাদা আর তরুণদাদা না প্রতি বছর ফার্স্ট কিংবা সেকেন্ড হয়। একবার তরুণদাদার তুবড়ি ফার্স্ট হয়, একবার অর্ঘ্যদাদার। কী দারুণ সব ভুঁই-তুবড়ি! আগুনের ফোয়ারা ফোঁওওওস করে উঠছে তো উঠছেই, উঠছে তো উঠছেই। তুমি এ বার দেখতে যাবে তো মাসিমণি?

যাব। টেবিল থেকে আমার মোবাইলটা দে তো।

কোলের কাছে মোবাইলটাকে লুকিয়ে ধরে চন্দনা দুটো আলাদা আলাদা নম্বরে একই এস এম এস পাঠাল—যার তুবড়ি ফার্স্ট হবে আমি তার।

অর্ঘ্য আর তরুণ নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে তুবড়ি বানানোর প্রস্তুতি নিয়ে পড়ল। অর্ঘ্য যদি কলকাতায় উজিয়ে গিয়ে কালীঘাটের কুমোরপাড়া থেকে ছটাকি তুবড়ির খোল কিনে আনে, তো তরুণ ধানবাদ থেকে কিনে আনে এক নম্বর রাজস্থানী সোরা। তরুণ যদি কাঠকয়লা বানাবার জন্য কাঁটার খোঁচা খেয়ে কুলগাছের ডাল কেটে আনে, তো অর্ঘ্য পালতে মাদারের ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে গোড়ালি মচকায়। তাদের মানসিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছলো আটই অগ্রহায়ণ। ওই দিন সন্ধে সাতটায় শুরু হবে শ্যামাদেউল গ্রামের ঐতিহ্যবাহী তুবড়ি কম্পিটিশন।

স্বাভাবিক ভাবেই, অর্ঘ্য মণ্ডল সেই দুপুরে তাদের খামারবাড়ির উঠোনে তুবড়ি বানানোর কাজে মগ্ন ছিল। সে খেয়ালও করল না, তার মাত্র দু-হাত দূরে একটা খড়ের পালুইয়ের ছায়ায় এসে দাঁড়াল তার প্রাণেশ্বরী, যার জন্য এত সাধনা, সেই চন্দনা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অর্ঘ্যর হাতের কাজ দেখে, ঠোঁটে তিক্ত এক হাসি ঝুলিয়ে চন্দনা রওনা দিল তরুণদের বাড়ির দিকে।

বাড়ির পেছনের বারান্দায় বসে তরুণ হাতে নিক্তি নিয়ে বারুদের মশলা মাপবে ভাবছিল। কিন্তু কী জানি কেন, সেই কাজে তার ঠিক মন লাগছিল না। এই তুবড়ি বানানোর চক্করে কত দিন তার সঙ্গে চন্দনার দেখা হয়নি। এ যেন ভালো না বেসে ভালোবাসার কবিতা লেখা হচ্ছে। ভাল্লাগে না এমন বেগার খাটতে তার। বিরস মুখে সে তাকিয়েছিল সামনে সাজিয়ে রাখা লোহাচুর, গন্ধক, কাঠকয়লা, সোরার ছোট ছোট স্তূপগুলোর দিকে।

এমন সময়ে আট আনা ভরতনাট্টমের সঙ্গে চার আনা ব্যালে আর আর চার আনা মাসাইদের শিকারনৃত্য মেশানো এক ছন্দে শরীর দুলিয়ে সেখানে প্রবেশ করল স্বয়ং চন্দনা। তরুণের হাতের নিক্তি কেঁপে একাকার। সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার স্বপ্নের রমণীর দিকে।

কোনও কথা না বলে, স্বপ্নের মতোই এক সময় চলেও গেল চন্দনা। শুধু যাওয়ার সময় তরুণ-এর সব মাপজোখ গুলিয়ে দিয়ে গেল। কিছুতেই সে আর মনে করতে পারছিল না—সোরা, গন্ধক, লোহাচুর আর কাঠকয়লার অনুপাতটা কী? ষোলো-দশ-তিন-তিন, নাকি তিন-ষোলো-দশ-তিন? না না, বোধ হয় দশ-তিন-ষোলো-তিন। ধুর ছাই, তিন-দশ-ষোলো-তিন হলেই বা আটকাচ্ছে কে?

এ সব ফর্মুলা তো কোথাও লিখে রাখা হয় না। অথচ এই মাপের ওপরেই নির্ভর করে কতটা উঁচুতে উঠবে তুবড়ির আগুন। অবশেষে যা মাথায় এল সেই মাপের মশলা বানিয়ে তরুণ তুবড়ি ঠাসল। তার পর সম্মোহিতের মতো হেঁটে চলল মেলাতলার দিকে।

রাসমেলার মাঠ ততক্ষণে লোকে লোকারণ্য। উদ্যোক্তারা বিশাল লম্বা এক বাঁশ পুঁতে তার গায়ে চল্লিশ ফিট অবধি মার্কিং করে রেখেছে। প্রথমে সেই বাঁশের গোড়ায় তুবড়ি বসিয়ে তুবড়ির মুখে দেশলাই কাঠি ঠুকল অর্ঘ্য। ঝড়ের মতো শব্দ করে লাফিয়ে উঠল আগুনের ফোয়ারা। আটত্রিশ ফিট। সবাই ধন্য ধন্য করে উঠল। অর্ঘ্য একবার স্মিত মুখে তাকাল মেয়েদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা চন্দনার দিকে। সে-মেয়ের মুখে কিন্তু কোনও বিকার নেই। একেবারে নিরপেক্ষতার প্রতিমূর্তি।

এ বার তরুণের পালা। দেশলাই ঠোকা মাত্র তার তুবড়ির মুখ থেকে আওয়াজ বেরোল খুট, খাট, ফটাশ। একটু আগুনের ছিটে, তার পর সব চুপ। তরুণের মুখের অবস্থা তখন দেখার মতো। সে দৌড়ে গিয়ে ঝুঁকে পড়ল তুবড়িটার ওপর। তার পর অধৈর্য হাতে তাতে দিল একটা জোর ধাক্কা। সঙ্গে সঙ্গে চোখধাঁধানো আলো আর কানফাটানো আওয়াজ। বোমার মতো ফেটে গেল সেই তুবড়ি। সংবিৎ ফেরার পর জনতা দেখল, তরুণ কোঙার মাটিতে পড়ে আছে। চুল, দাড়ি, গোঁফ—সব পুড়ে তার মুখটাকে দেখাচ্ছে ঠিক একটা হুঁকোর খোলের মতো।

আরও একটু রাতের দিকে অর্ঘ্য পা টিপে টিপে তরুণদের বাইরের ঘরে ঢুকল। সেখানে তখন ঘুমন্ত তরুণের মাথার কাছে বসে তার পোড়া মুখে চুনজল আর নারকোল তেলের পট্টি লাগাচ্ছে আর কেউ নয়, চন্দনা। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে অর্ঘ্য বলল, শর্ত অনুযায়ী তো আমার ঘরেই তোমার যাওয়ার কথা। তা হলে বাবা-মা'-কে বলি এবার একদিন যশপুরে গিয়ে...

কী জানি কেন, ভয়ংকর চটে গিয়ে চন্দনা তাকে খেঁকিয়ে উঠল, আর যশপুরে যেতে হয় না। তার চেয়ে মন দিয়ে ভালো ভালো তুবড়ি বানাওগে। পারতে তুমি কোনওদিন, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এমন প্রাণঘাতী জিনিস বানাতে? বেচারা আর একটু হলে আমার জন্য এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছিল।

চুনজল আর নারকোল তেলের সঙ্গে অনেকটা চোখের জলও মিশিয়ে ফেলল চন্দনা। অবাক অর্ঘ্য বুঝতেই পারল না বাজিটা কেমন করে সে হারল।

সত্যের খাতিরে জানাতেই হয়—পরের বছর তুবড়ি প্রতিযোগিতায় তরুণ ফার্স্ট হয়েছিল। কারণ, তত দিনে তার চন্দনার সঙ্গে হনিমুন শেষ। মন আবার যথাস্থানে ফিরে এসেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%