সৈকত মুখোপাধ্যায়

কদিন ধরে কলকাতার বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি সংবাদপত্রের ব্যক্তিগত কলামে একটা বিজ্ঞাপন বের হচ্ছিল, যার বক্তব্য এইরকম :
'পার্টি কা শান—জানে মানে মেহমান। আমরা ন্যায্য দক্ষিণার বিনিময়ে বিয়ের আসর থেকে শ্রাদ্ধবাসর, অন্নপ্রাশন থেকে পর্ণোনাচন সবরকম অনুষ্ঠান জমিয়ে দেবার জন্য উপযুক্ত সেলিব্রিটি সাপ্লাই করে থাকি। মান্যগণ্য অতিথি ভাড়া পাবার জন্য যোগাযোগ করুণ—মেসার্স সেলিবসাপ্লাই, ঊনপঞ্চাশ বিজয় মিত্র স্ট্রিট, কলকাতা দুই।'
বিজ্ঞাপনের নীচে যোগাযোগের জন্যে একটা মোবাইল ফোনের নম্বর-ও দেওয়া ছিল।
রবিবার ছয়ই এপ্রিলের বাংলা কাগজেও বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছিল। তানিয়া রান্নাঘরে মাংস রান্না করছিল। ওকে ডেকে দেখালাম।
সামনের রবিবার, মানে তেরোই এপ্রিল আমাদের দ্বিতীয় বিবাহ বার্ষিকী। তা ছাড়া এই বছরই নতুন ফ্ল্যাটটাও কিনলাম। অফিসের সহকর্মীরা অনেকদিন ধরেই ব্যাপারটা সেলিব্রেট করতে চাইছিলেন। তাই ঠিক করেছিলাম তেরো তারিখ আমার নতুন ফ্ল্যাটে তাদের নিয়ে একটা মাঝারি গোছের পার্টি দেব।
এসব জোগাড়যন্ত্র কোনও ব্যাপার নয়, ফোনে ফোনেই সব ব্যবস্থা হয়ে যায়। অতিথিদের আনা-নেওয়ার জন্যে দুটো বড় গাড়ি ভাড়া করে ফেলেছি। ফুল-ওলাকে বলা আছে—রবিবার বিকেলেই ফুল দিয়ে ঘর সাজিয়ে দিয়ে যাবে। খাওয়া দাওয়ার জন্যে ক্যাটারার তো আছেই। শুধু একটা ব্যাপারেই মনটা একটু খুঁতখুঁত করছিল। আমার বা তানিয়ার কারুরই সেরকম ওজনদার আত্মীয় নেই। দুজনেরই বাবা স্বর্গে গেছেন। আমার মা থাকেন এলাহবাদে দাদার কাছে। আসতে পারবে না। তানিয়ার মা-ও বাতে কাবু। তাই ভাবছিলাম, একটা শুভ অনুষ্ঠান করতে চলেছি, যদি বেশ দাপুটে একজন অভিভাবক থাকতেন, আমাদের বন্ধুদের বাবা-বাছা বলে অপ্যায়ন করলেন, আমাদেরও মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন, তাহলে কী ভালোই না হত।
তানিয়া আমার মনের কথা খুব ভালো বুঝতে পারে। বিজ্ঞাপন দেখেই বলল, হ্যাঁগো, চলো না, একবার দেখেই আসি ব্যাপারটা কী। বেশি দূরে তো নয়।
তাই হল, দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলেই গেলাম ঊনপঞ্চাশ বিজয় মিত্র স্ট্রিটে।
প্রথম দর্শনে ভেবেছিলাম যাত্রাদলের অফিস। সেরকমই দরজার সামনে কাঠের পাটার ওপরে নারী পুরুষের রংচঙে ব্লো-আপ। ঘরের ভেতরের দেয়ালেও বোর্ড-পিন দিয়ে অনেক মুখের ছবি গাঁথা আছে দেখলাম। তানিয়া ঘুরে ঘুরে দ্যাখে আর উলসে ওঠে,—ওমা দ্যাখো, 'এক গলা জলের' পিসিমা! ওই তো 'আঁধার ভালোর' বড় বউ! আর ওই মেয়েটাকে চিনতে পারছ? 'গৃহিণীর পকেটমানি' প্রাোগ্রামটার অ্যাঙ্কার গো!
আমি চাপা গলায় বললাম, চুপ করো। বেশি আদেখলেপনা করো না। কে যেন আসছে। বলতে না বলতেই একটি শ্যামবর্ণ ছোকরা, পরনে জিনস আর টি-শার্ট, ভেতরের দিকের দরজার পর্দাটা সরিয়ে ঘরে ঢুকল।
আমরা কিছু বলবার আগেই সে দু-হাত জোড় করে মাথায় ঠেকিয়ে বলল,—নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার। বউদি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন। দাদা কী খাবেন বলুন, ডাব না কোল্ড ড্রিঙ্কস? দাঁড়ান, ফ্যানটা একটু বাড়িয়ে দিই। এয়ার কুলার একটা লাগিয়েই ফেলতাম, বুঝলেন। কিন্তু আমাদের এদিকে আবার ডি.সি. লাইন। আমি বলি কী দাদা, ট্যাক্সিটা বরং ছেড়েই দিন। পায়ের ধুলো দিয়েছেন যখন, ছোট ভাইয়ের কাজকর্মটা একটু ভালো করে দেখেই যান। ভুলটুল কিছু করলে ধরিয়েও দিতে পারবেন।
তানিয়া তো মুগ্ধ। আমি ছেলেটিকে প্রশ্ন করলাম, আপনার নামটা কী ভাই?
—উদয় দাস, দাদা। লোকে ভালোবেসে উদাস বলে ডাকে। আপনিও তাই বলবেন।
মনে মনে বললাম, মোটেই তোমাকে উদাস বলব না। তুমি বেশ ঘুঘু। ডাব বা ড্রিঙ্কস কিছুরই অর্ডার দাওনি, খেয়াল করছি। মুখে বললাম, আচ্ছা উদয়, এই সেলিব্রেটি সাপ্লায়ারের ব্যাপারটা যদি একটু বুঝিয়ে বলো, তাহলে আমি মানে তপন দত্ত আর তোমার তানিয়া বউদি বুঝতে পারি আমরা ঠিক জায়গায় এসেছি কি না।
—জায়গা তো এখনও অবধি এই একটাই, দাদা। সে ঠিক হোক আর ভুল হোক। কনসেপ্টটা তো একদম নতুন। আমারই ব্রেনচাইল্ড। এখনও অবধি আর কেউ ধরতেই পারেনি।
অবশ্য আইডিয়ার বীজটা ছিল আমার বাল্য স্মৃতিতে। আমাদের মেদিনীপুরের গ্রামের বাড়িতে দেখতাম সারা পাড়ার যত বিয়েবাড়ি, যত বাসর, সব গান গেয়ে জমিয়ে দেবার জন্য ডাক পড়ত রসের দিদির। সে বুড়ির আসল নাম সবাই ভুলেই গেছিল। সবার কাছেই সে রসের দিদি। বরের চিবুকটি ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় 'বনে এমন ফুল ফুটেছে / মান করা বঁধু আর কী সাজে' এইসব গেয়ে একেবারে হুলুস্থুল বাধিয়ে দিতেন। বহিরাগতদের সাধ্য কী বোঝে যে তিনি কনে বউয়ের নিজের লোক নন।
আমি সেই ট্রাডিশনটুকুই একটু মেজে ঘষে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, বুঝলেন তপনদা। এর জন্যে যদি সামান্য হাত খরচা না নিই তাহলে আমারই বা কী করে চলে বলুন।
আমি এতদূর শুনে একটু মাথা চুলকে বললাম, কিন্তু এরমধ্যে একটু তঞ্চকতা থেকে যাচ্ছে না?
—আপনি দাদা একেবারে ইয়ে। ক্যাটারারের মালিক যদি ফুলকোঁচা মেরে আপনার মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রিতদের আপ্যায়ন করতে পারে, তাহলে অন্যের মামা কেন আপনার নাতির মামা সেজে অন্নপ্রাশনের সময় তার মুখে ভাত তুলে দিতে পারবে না?
সুবিধেগুলোর কথাও তো একবার ভাববেন। ধরুন অরিজিনাল মামা অত্যন্ত খিটখিটে ডিসপেপটিক-চরিত্র। একঘর লোক, ভিডিও ক্যামেরা এই সবের সামনেই কাপড়ে সু-সু করে দেওয়ার অপরাধে নবজাতককে ছুড়ে ফেলে দিলেন। সেক্ষেত্রে একজন হ্যান্ডস্যাম হাসিখুশি সেলিব্রিটি মামা থাকলে কত ভালো হয় না?
আর যদি মামা অদৌ নাই-ই থাকে? কোন দু:খে 'কানা-মামা' খুঁজতে যাবেন বউদি? আমি আপনাকে 'গানামামা' দিয়ে দেব। নীলাঞ্জন লাহা—গতবছর 'উদারা-মুদারা-তারা' গানের লাইভ-কম্পিটিশনে সেকেন্ড হয়েছিল। দেখবেন, ভাত খাওয়াতে খাওয়াতেই 'হাঁটি হাঁটি পা পা, খোকন হাঁটে দেখে যা' এই সব গেয়ে অনুষ্ঠান কেমন জমিয়ে দ্যায়। লোকজন চিরকাল মনে রাখবে আপনার নাতির অন্নপ্রাশন।
—কিন্তু আমি তো নাতির অন্নপ্রাশনের ব্যাপারে আসিনি ভাই। আমার ছেলেরই এখনও অন্নপ্রাশন হয়নি। মানে ছেলেপুলেই হয়নি এখনও।
—আহা, আমি তো জাস্ট উদাহরণ দিচ্ছিলাম।
—কিন্তু উদয়, যদি ধরা পড়ে যায় সে সেলিব্রিটি আমারআত্মীয়-বন্ধু কিছুই নয়, স্রেফ ভাড়া করে এনেছি?
—অসম্ভব তপনদা, সেলিব্রিটিদের আমরা যেভাবে গ্রুমিং করি তা দেখলে আপনার চোখ কপালে উঠে যাবে।
আপনার বাড়ি যাবার আগে সে বংশ তালিকা, আপনার জীবনের স্মরণীয় সব ঘটনা, বউদির মাইগ্রেনের ব্যাথ্যা শেষ কবে হয়েছিল, আপনার চিংড়ি মাছে অ্যালার্জি, নাকি বাংলা ব্যান্ডে—স-অ-অ-ব মুখস্থ করে যাবে।
তা ছাড়াও, যিনি প্রথমবার আমাদের হয়ে কাজ করছেন তাকে আমরা শিখিয়ে দিই দশ-টা তাসের ম্যাজিক, কুড়িটা অ্যাডাল্ট-জোকস, আর বাংলা বর্ণমালার বর্ণ-প্রতি পাঁচটা করে গান। অন্তাক্ষরী খেলতে গেলে কাজে লাগে তো। ব্যস, পার্টি জমে ক্ষীর। এরপরেও নেহাত বদ্ধ ব্যোমকেশ ছাড়া কে খুঁজতে যাবে দাদা আপনার রিলেশন।
এই অবধি শুনে-টুনে ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্যই মনে হল। বললাম, তবে উদয়, সামনের রবিবার আমাদের বিবাহবার্ষিকী। একজন ছবি বিশ্বাসের মতন মেসোমশাই দিতে পারো? বেশ লম্বা-চওড়া চেহারা, ব্যারিটোন ভয়েস। দাঁতে পাইপ কামড়ে অতিথিদের খাওয়াদাওয়ার তদারকি করবেন। একটা ড্রেসিংগাউন থাকলে আরও ভালো হয়।
—আপনি কি দাদা উত্তমকুমার, যে ছবি বিশ্বাস আপনার মেসোমশাই হবেন? ওরকম কমল মিত্তির, ছবি বিশ্বাস টাইপের বৃদ্ধ আজকাল বাস্তবে দেখতে পান কি, যে ফস করে আপনার বিবাহ বার্ষিকীতে ঢুকিয়ে দেবেন? এখন কলকাতার এইট্টি পার্সেন্ট বৃদ্ধ বেতো হাঁটুর ওপরে বারমুডা, ঝোলা ভুঁড়ির ওপরে টি-শার্ট, টাকের ওপরে কলপ চাপিয়ে ফ-ফ করে চ্যাংড়ামি মারতে মারতে পার্কে লেংচে বেড়ায়। যাবেন না একদিন সকালের দিকে ওই শিশু উদ্যানে। দেখতে পাবেন চিরশিশুদের।
হতাশ হয়ে বললাম, তাই তো, তাহলে কী করা যায় বলো তো ভাই উদয়।
উদয় বলল, চিন্তা করছেন কেন? আমি আপনাকে মেসোর থেকে অনেক ভালো জিনিস দিয়ে দিচ্ছি। ছোটশালি।
তাই শুনে তানিয়া হাঁউমাঁউ করে উঠল। আরে আমার তো সত্যিকারেই ছোটবোন আছে তনুশ্রী। ওইদিন তাকে আসতেও বলেছি। দুজনে ক্ল্যাশ করে যাবে না?
—ওজন কত? গম্ভীর মুখে জিগ্যেস করল উদয়।
—কার?
—ওই যে, তনুশ্রী না কী যেন নাম বললেন।
—আমি যার কথা বলছি, অমৃতা সেন, তার বিয়াল্লিশ। ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস জানেন?
—কার?
—আপনার বোনের।
—পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ-পঞ্চান্ন—
—পিরামিড সেপ। লজ্জার কথা। তনুশ্রী না তনুবিশ্রী? অমৃতার জানেন? আটত্রিশ-ত্রিশ-বেয়াল্লিশ। ডেঁয়ো পিঁপড়ের মতন ফিগার। আপনার বোন গান জানেন?
—পুরোনো সেই দিনের কথা।
—আর এ বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল গায়। আপনি বউদি একটা কাজ করুন। বোনকে ফোন করে বলে দিন জামাইবাবুর চিকুনগুনিয়া হয়েছে। সারা দেহ লক্ষ্ণৌ-চিকনের মতন ফুটো ফুটো হয়ে গেছে, গুনে শেষ করা যাচ্ছে না। প্রাোগ্রাম ক্যানসেল। আর রবিবার বিকেল বিকেলই অমৃতাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। শুধু মেয়েটার দিকে একটু খেয়াল রাখবেন। সব গেস্ট তো তপনদার মতন ভদ্রলোক হয় না।
তানিয়া বিরক্ত স্বরে বলল, আপনার তপনদাও এ ব্যাপারে খুব একটা ভদ্রলোক নয়। সেটাই চিন্তা।
যাই হোক অতিথিদের মনোরঞ্জনের কথা ভেবে অমৃতাতেই রাজি হলাম। জিগ্যেস করলাম, পড়বে কত?
উদয় বলল, অমৃতা তো খুব একটা বড় মাপের সেলিব্রিটি নয়। তবে সেটা একদিক দিয়ে ভালোই, বুঝলেন। ছোট অকেশনে বড় সেলিব্রিটি নিয়ে গেলে অনুষ্ঠানের স্পিরিটটাই নষ্ট হয়ে যায়। আপনি আমাকে তিন হাজার দেবেন।
—তি-ই-ই-ন হাজার! আমরা দুজনেই খাবি খেলাম।
সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউটারে মাউস ঘুরিয়ে স্ক্রিনে কীসব দেখে-টেখে নিয়ে উদয় বলল, এখানে অবশ্য একটা এক্সচেঞ্জ অফার আছে। ইচ্ছে করলে নিতে পারেন। টাকা অনেকটাই কম পড়বে।
—কীরকম, কীরকম?
—মানে আপনাদের মধ্যে যদি কেউ সেলিব্রিটি হন, আর আমার হয়ে একটা কাজ করে দেন, তাহলে সেই কাজের ফি-টুকু এর সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে দেব।
সসঙ্কোচে বললাম, নব্বই সালে উচ্চমাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিলাম। কাগজে ছবি টবিও ছাপা হয়েছিল। আমাকে কি সেলিব্রিটি বলে ধরা যাবে?
আলবাত ধরা যাবে—টেবিল চাপড়ে বলল উদয়। দেখছেন বিজ্ঞাপনে যে জিঙ্গল গায় সে-ও সেলিব্রিটি, আর আপনি তো যাকে বলে 'বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে'।
এক কাজ করুন। শুক্রবার একবার পানাগড়ে চলে যান। এক চালকলের মালিকের আধদামড়া ছেলে কী করে যেন ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছে। ওটা আমার লাইন নয়, ওর জন্যে আলাদা এজেন্সি আছে। যাই হোক, তাই নিয়ে পাঁচজনে পাঁচকথা বলছে।
তো সেই অপমানিত পিতা পাগলের মতন একজন পণ্ডিত আত্মীয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন, যাকে দেখিয়ে তিনি পাড়া প্রতিবেশীদের বলতে পারবেন যে ছেলে বংশগত মাথার জোরেই যা করবার করছে। অন্য কিছু নয়।
তো আপনাকে যখন পেয়েই গেলাম তপনদা, আমি সেই চালকলে ফোন করে বলে দিচ্ছি, পণ্ডিত মামা পাঠালাম। যথাযোগ্য সমারোহের সঙ্গে লোকজনকে দেখান। হ্যাঁ, মনে করে আপনার উচ্চ মাধ্যমিকের মার্কশিটটা আর পেপার কাটিংগুলো নিয়ে যাবেন।
বউদি, তা হলে আরও দেড় লেস হয়ে গেল। আপনি দেবেন দেড়।
কথাবার্তা সেরে উঠতে যাচ্ছি, উদয় বলল, দাদা আমরা শুধু পারিবারিক নয়, সামাজিক অনুষ্ঠানেও সেলিব্রিটি সাপ্লাই দিচ্ছি। এই তো এখন এপ্রিল মাস। আর ক'দিন পর থেকেই শুরু হবে স্বাধীনতা দিবসে বিভিন্ন ক্লাবে পতাকা উত্তোলনের জন্য স্বাধীনতা-সংগ্রামী বুকিং। রেয়ার কমোডিটি স্যার। নতুন করে তৈরি তো করা যায় না। সেই উনিশশো সাতচল্লিশের আগের যে কয়েকপিস পড়ে আছে।
আবার পনেরোই অগাস্টের পর থেকেই শুরু হয়ে যাবে দুর্গাপুজোর ফিতে কাটার বায়না। ওখানে কোনও অসুবিধে নেই। ফিল্মস্টার থেকে পলিটিশিয়ান সবই কাজে লেগে যায়।
বললে পরে দুর্লভ অতিথিও আনিয়ে দিই, এই ধরুন কুয়োর থেকে তুলে আনা বাচ্চা, কিংবা বালক দৌড়বীর। চেনাশোনার মধ্যে কারুর প্রয়োজন হলে একটু বলবেন আমার কথা। উঠছেন নাকি? ডাব আনতে দিচ্ছিলাম যে।
দুটো দিন মন্দ কাটল না।
প্রথমত শুক্রবার পানাগড়ের রাইস-মিলের বাগানে এলাহি পার্টি। সে কী আপ্যায়নের ঘটা, কী খাওয়াদাওয়ার আয়োজন—চিন্তা করা যায় না। গ্রামের দিকে লোকেরা একটু বেশি চালাক চতুর হয়। অনেকভাবে আমাকে খোঁচাল, জেনুইন মামা কিনা দেখার জন্য। কিন্তু ধন্য সেলিব-সাপ্লাইয়ের ট্রেনিং-এর মহিমা। কিছুতেই আমাকে টলাতে পারল না। উলটে সেই হবু ডাক্তারের বাবা আমার মার্কশিট,পেপার-কাটিং এইসব দেখিয়ে পাড়া প্রতিবেশীকে ভজিয়ে ফেলল যে নরানাং মাতুলক্রম:। এক বৃদ্ধ শেষমেশ প্রশ্ন করে বসল—হ্যাঁ বাবা নবকেষ্ট, এমন গুণের গুণমণি শালাটিকে এতদিন কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলে? আগে কখনও দেখিনি তো। নবকেষ্ট, মানে আমার নব-উপার্জিত ভগ্নীপতি, গম্ভীর মুখে জবাব দিল—তপন আজ পনেরো বছর বাদে দেশে ফিরল। দুবাইয়ে ওর নিজের ব্যবসা। আগামীকাল ভোরের ফ্লাইটে-ই ফিরে যেতে হবে।
সন্ধেবেলা নবকেষ্টর সঙ্গে যখন স্টেশনের দিকে হেঁটে যাচ্ছি তখন আস্তে আস্তে করে তাকে জিগ্যেস করলাম, এক্সচেঞ্জ অফার কিছু পেয়েছিলেন না কি?
—হ্যাঁ। দু-হাজার লেস করেছে। আমার জন্য নয়। ছেলের মায়ের জন্যে।
—বলেন কী! বউদি সেলিব্রিটি? কী বাবদে?
—বছর দুয়েক আগে একবার চোখে লঙ্কা গুঁড়ো ছিটিয়ে ডাকাত ধরেছিল। কাগজে নাম-টামও বেরিয়েছিল। তাই শুনে উদয় দাস বলল, ভালোই হল। বর্ধমানে এক নারীবাদি সংগঠনের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে সভাপতি খুঁজছে।
কাল গেছিল। ভাষণটাষণও দিয়েছে। গর্বের হাসি হাসল নবকেষ্ট।
তার পরে রোববার আমাদের নিজেদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারির পার্টি, সে-ও সেলিব-সাপ্লাইয়ের কল্যাণে চমৎকার জমে গেল।
অমৃতা যে কী প্রাণবন্ত মেয়ে, কী বলব। এত হোমলি, এত ভদ্র, এত হাসিখুশি। এই কোমরে আঁচল জড়িয়ে তানিয়ার সঙ্গে রান্নাঘরে মাছের চপ ভাজছে, তো এই ট্রে-তে করে চা নিয়ে আমাদের বন্ধুদের সার্ভ করছে। আর এসবের মধ্যে মধ্যে মিষ্টি গলায় গান তো আছেই। তারপর বন্ধুরা যখন শুনল যে সামনের পুজোতেই এক বিখ্যাত রেকর্ড কোম্পানি থেকে আমার ছোট শালিটির সিডি বেরোচ্ছে তখন তো তারা এই সেলিব্রিটির সঙ্গে ছবি না তুলে ছাড়লই না।
সব মিটে যাবার পর রাতে যখন আমি আর তানিয়া অমৃতা-কে ট্যাক্সিতে তুলে দিতে গেলাম তখন তানিয়া ওকে জিগ্যেস করল সামনের বারেও 'সেলিব সাপ্লাইয়ের' সঙ্গে যোগাযোগ করলে ওকে পাওয়া যাবে কি না। অমৃতা ভারি অবাক হয়ে বলল, আমি তো 'সেলিব সাপ্লাইয়ের' সঙ্গে যুক্ত নই।
—তাহলে কি এক্সচেঞ্জ-অফার...
—ঠিক ধরেছেন। উদয়দার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম একজন সেলিব্রিটির জন্য—যিনি আমার সিডিটার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে থাকবেন। তখন উদয়দাই বললেন, আজকের এই কাজটার মতন কয়েকটা কাজ করে দিলে খরচ অনেকটা বাঁচাতে পারব। তবে তুমি যদি ডাকো দিদিভাই—তানিয়ার গলা জড়িয়ে ধরে বলল
অমৃতা—তাহলে আমি সামনের বারেও আসব। তোমার বোন হিসেবেই আসব।
তবে সেলিব সাপ্লাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক চুকল না। কলেজে পড়াই বলে উদয়-ও যেমন আমাকে ভক্তিশ্রদ্ধা করত, আমারও তেমনি ওর এই ব্যবসার চরিত্র-টা খুব মজার লাগত। সন্ধের দিকে তাই প্রায়ই সেলিব-সাপ্লাইয়ের ছোট ঘরটায় গিয়ে বসে থাকতাম, আড্ডা দিতাম উদয়ের সঙ্গে, আর দেখতাম চেনাঅচেনা মানুষের আনাগোনা। নানারকম অভিজ্ঞতা হত। তবে একটা ব্যাপার একদম পরিষ্কার হয়ে গেছিল, উদয়কে সেলিব্রিটিদের পেছনে এক পয়সাও খরচা করতে হয় না।
এক সেলিব্রিটি আরেক সেলিব্রিটির সাহচার্য পাবার জন্য তৃতীয় এক সেলিব্রিটিকে সাহচার্য দিচ্ছেন। এক্সচেঞ্জ অফার রেটের তারতম্যটুকুই উদয়ের পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা।
সুবিধাটা হল, এখন এমন কোনও মানুষ নেই যিনি কোনও না কোনওভাবে সেলিব্রিটি নন—তা সে পনেরো দিনের জন্যই হন আর পনেরো মিনিটের জন্যে। মিডিয়ার চড়া আলোর নীচে প্রতি সন্ধ্যায় শ্যামাপোকার মতন অজস্র সেলিব্রিটির ওড়াউড়ি। তবে ইয়ে, তাদের আয়ুও শ্যামাপোকারই মতন। সকাল হলে কালের সম্মার্জনীর মুখে জমে ওঠে ঝরা ডানার স্তূপ।
প্রথমে ভেবেছিলাম যত বেশি সেলিব্রিটি ততই উদয়ের লাভ। কিন্তু আমার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে একদিন উদয় ক্ষোভে ফেটে পড়ল।
—এভাবে চলবে না দাদা। এভাবে চললে ব্যবসার বদনাম হয়ে যাবে।
—কেন? কী হল আবার?
—বেনোজল ঢুকে যাচ্ছে দাদা। কাস্টমার এসে কমপ্লেন করছে, কী সেলিব্রিটি পাঠালেন, লোকে চিনতে পারছে না। প্রথম প্রথম প্রতিবাদ করতাম—কী বলছেন! রীতিমতন কাগজের কাটিং দেখে, ভিডিয়ো ক্লিপিং দেখে চান্স দিয়েছি। আর আপনি বলছেন লোকে চিনতে পারছে না? তাই হয়?
তারপরে কাস্টমাররাই আমার ভুল ধরিয়ে দিল। গণ্ডগোলটা কোথায় হচ্ছে জানেন তপনদা? মনোরঞ্জনের মনিকর্নিকার ঘাটে হরিশচন্দ্র মিডিয়া তো ক্রমাগত সেলিব্রিটি উচ্ছুণ্ড্য করে চলেছে। কিন্তু দর্শক শ্রোতাদের স্মৃতি তো আর হাতির মতন নয় যে, ওই মুখের মিছিল মনে রাখবে। শীতের কপি বর্ষাকালে রান্না করলে বোটকা গন্ধ ছাড়বেই ছাড়বে।
—তাহলে কী করবে এখন?
—সময় বেঁধে দেব। সেলিব্রিটি হবার এত সময়ের মধ্যে যদি আসেন তাহলে এক্সচেঞ্জ অফারের সুযোগ পাবেন, না হলে নয়। একটা নোটিশ বানিয়েছি। আপনি একটু দেখে দিন,ভুল টুল কিছু আছে কি না। তারপর দরজায় লটকে দেব। নোটিশটা ছিল এই রকম :
নোটিশ
সর্ব সাধারণের জন্যে জানানো হচ্ছে যে পরের মাস থেকেএক্সচেঞ্জ-অফারের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তাবলি প্রযোজ্য হবে।
কৃতিত্বের ধরন |
কতদিন অবধি গ্রাহ্য |
এক্সচেঞ্জ রেট |
১) বাংলা ছবির নায়ক, নায়িকা। |
প্রথম বই রিলিজের পর গ্রামের দিকে ছ'মাস,শহরে একমাস। |
পাঁচ হাজার টাকা। |
২) সিনেমা পরিচালক। (আর্ট ফিল্ম গ্রাহ্য নয়) |
ঐ |
ঐ |
৩) টিভি চ্যানেলের নৃত্য-গীতাদি ধামাকার বিজয়ী-বিজয়নীগণ। |
পরবর্তী ধামাকা শুরু হওয়ার আগে অবধি,অথবা পনেরো দিন,—যেটা কম। |
আলোচনা সাপেক্ষ |
৪) বোর্ডের পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান পেলে |
ফল প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যে। রিভিউয়ের ফলে নীচের লোকে ওপরে উঠে এলে পয়সা ফেরত দিতে হবে। |
পাঁচশো টাকা। |
৫) ইভ টিজারকে ঠ্যাঙানো অথবা উলটে তাদের হাতে ঠ্যাঙানি খাওয়া। |
পাঁচদিন। |
পাঁচশো টাকা। |
৬) (কেবল মাত্র ট্যাক্সি ড্রাইডার ভাইয়েদের জন্য) পেছনের সিটে গয়না অথবা টাকার ব্যাগ পেয়ে থানায় জমা দিলে। |
ঐ |
ঐ |
বি: দ্র:—প্রাসঙ্গিক খবরের কাগজের কাটিং, দুকপি স্ট্যাম্প-সাইজ ফটো, এবং শেষ দুটি আইটেমের ক্ষেত্রে পুলিশের শংসাপত্র সহ আবেদন করতে হবে।
বললাম চমৎকার হয়েছে উদয়। তুমি সেলিব্রিটির সংখ্যা-বৃদ্ধি দেখে মুষড়ে পড়েছ? আর উলটোদিকে সেলিব্রিটিদের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করবার জন্যে লালায়িত লোকের সংখ্যা কী রকম বেড়ে যাচ্ছে সেটা তো দেখছ না। বুঝছ না কেন—সমুদ্রের জল যেমন উত্তাপে বাষ্প হয়, তারপর মেঘ, সেই মেঘ আবার বৃষ্টি হয়ে সমুদ্রেই ফিরে আসে, তেমনি তোমার কোম্পানিতে ফ্যানেরাই সেলিব্রিটি হবে, সেলিব্রিটিরাই ফ্যান। অন্তহীন গাড়োলচক্র। তোমার কমিশন মারে কে? লটকে দাও নোটিশ। মা ভৈ:।
অভয় তো দিলাম, কিন্তু উদয়ের ভয় কাটে কই? একদিন অফিসের পর সেলিব-সাপ্লাইয়ে গিয়ে দেখি বেচারা উদয় দাস অফিস ঘরে আলো অবধি জ্বালেনি। উদাস মুখে বাইরের ফুটপাথে মোড়া পেতে বসে আছে। আমাকে দেখে অফিসে ঢুকে আলো-টালো জ্বেলে বসল। আমিও বসলাম। বললাম, ব্যাপার কী?
—খদ্দের নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দাদা!
—কেন?
—ডাইরেক্ট মার্কেটিং-এর ঠ্যালায়।
আমার মুখ দেখে বোধহয় উদয়ের মায়া হল। তাই বিশদ করে বুঝিয়ে বলল,—
আপনি দাদা গেঁইয়া-ই রয়ে গেলেন। ডাইরেক্ট-মার্কেটিংও বোঝেন না? ওই আগেকার দিনে যাকে ফেরিওয়ালা বলতেন। জানেন দাদা, আমি এত খরচ করে দোকান সাজিয়ে বসে আছি, আর ওদিকে কাঁধে কালো ব্যাগ নিয়ে প্যাংলা ছেলেরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে জিগ্যেস করে বেড়াচ্ছে—'সেলিব্রিটি লাগবে বউদি, সেলিব্রিটি?'

কোয়ালিটির কথা কে ভাবে আজকাল বলুন, সবাই শস্তা খোঁজে। দু:খের কথা শুনবেন? আমার নিজের পিসেমশাই মারা গেছেন। সোদপুরে পিসির বাড়ি গিয়ে দেখি শ্রাদ্ধবাসরে একা পুরুতমশাই দানের বালিশে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছেন আর যত আত্মীয়-অভ্যাগত উঠোনে প্যান্ডেলের তলায় কাকে যেন ঘিরে বসে হাঁ করে কী শুনছে। আমিও একপাশে গিয়ে বসলাম। দেখি বিগত যুগের যাত্রাসম্রাট কিন্নরকুমার নব্বই বছর বয়সে কল্কাদার কমলা রঙের পাঞ্জাবি পরে ফোকলা মুখে পিসেমশাইয়ের স্মৃতিচারণ করছেন। তিনি নাকি আমার স্বর্গত পিসের বাল্যবন্ধু ছিলেন। আমি তো যা বোঝার বুঝে নিয়েছি। কোনওরকম গ্রুমিং হয়নি, তার ওপরে নব্বই বছর বয়সে কিন্নরকুমারের মাথার ভেতরেও কলপের অন্ধকার ঢেকে গেছে। ফলে স্মৃতিচারণটা কেমন দাঁড়িয়েছিল শুনুন—
'আহা, রামেন্দরনাথের গানের গলাখান কী আসিল! কই, শোনেন।
নাইনটিন থার্টি নাইন। পূজার যাত্রাদল লইয়া গেসি নাটোর। উঠসি গিয়ে নাটোর রাজার নায়েব বনবিহারী স্যানের বাটি-তে। বনবিহারীর কইন্যা বনলতা। ভা-আ-আ-রি সুন্দর মাইয়া।
নবমীর সন্ধ্যায় রাজবাড়ির মাঠে পালা নামাইলাম, সুভাষ ঘরে ফেরে নাই।
শ্রোতাদের মধ্যে থেকে পিসির ননদের মেয়ে বুবুন মৃদু প্রতিবাদ জানাল, তা কী করে হবে মামাবাবু? থার্টি-নাইনে নেতাজি তো ত্রিপুরী কংগ্রেসের সভাপতি। ঘরে ফেরে নাই মানে?
—রও মা, রও। সুভাষ কি দুনিয়ায় একখান-ই পয়দা হইসিল? এ তোমাগো নেতাজি নন, অইন্য সুভাষ। হ্যাঁ, কী য্যান কইতাসিলাম। নাটোরের পালা নয়?
হ্যাঁ, তা সেই পালায় আমি সাজসিলাম ভাবনা কাজি, আর রমেন্দর হইল গিয়া, ইসে—গ্যালিলিও। কী গানখান-ই সে গাইল। শুনবা? শোনো।
কুথায় পাব কইলসি গো কইন্যা,
কুথায় পাব দড়ি;
তুমি হইও গহীন গাঙ,
আমি ডুইব্যা মরি।
তাইর পর রাত্তিরে ঘরের মধ্যে ফিসফাস আওয়াজ শুইন্যা, চোখ পিটপিটাইয়া দেখি—বনলতা রমেন্দরের হাতখান হাতের মধ্যে লইয়া খাড়াইয়া আছে। কইতাছে, আপনে তো একখানা জিনিয়াস। এতদিন কোথায় আসিলেন?
এখন বুঝি, নাটোর ইস্কুলের মাস্টার হেই জীহ্বানন্দয় বনলতার কথাখান ওভারহিয়ার করসিল। ইভস ড্রপিং-ও কওন যায়।
আমরা তো বটেই, পিসিমা অবধি শোকতাপ ভুলে হা করে পিসেমশাইয়ের সেই গুণকীর্তণ শুনছিলেন। কারণ, আমার পিসেমশাই স্বর্গত রমেন্দ্রসুন্দর আঢ্য একুশ বছর বয়েসে সেই যে দেশ ছেড়ে অক্সফোর্ডে গিয়ে স্থিতু হয়েছিলেন, তারপর থেকে আর একসঙ্গে পনেরো দিনের বেশি কখনও এখানে কাটাননি। তারমধ্যেই যে তিনি সরাসরি যাত্রা জগতে, এবং পরোক্ষে কাব্যজগতে এমন অবদান রেখে গেছেন সেটা পিসিমার পক্ষেও নতুন খবর।
বুঝলেন তপনদা—একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল উদয়—ফেরিওলা থেকে সেলিব্রিটি নিলে এরকমই হয়। কিন্তু লোকের চেতনা আসতে তো সময় লাগবে। আর তার মধ্যেই তো আমার ব্যবসা চৌপাট হয়ে যাবে।
এমন সময় একটা নোংরা-পোশাক পরা লোক মুখভর্তি ঝুপো দাড়ি, কানে গোঁজা পোড়া সিগারেট, একহাতে একটা বোম্বাই সাইজ ডাবের খোলা আরেক হাতে একটা খবরের কাগজ—উদয়ের সামনে এসে দাঁড়াল।
উদয় মহাবিরক্ত হয়ে মুখ খিঁচিয়ে বলল, এই শালা ন্যাপলা, তোর মাথায় এবার এমন এক আধলা ঝাড়ব যে পাগলামি চিরদিনের জন্য ঠিক হয়ে যাবে। ভাগ শালা এখান থেকে।
কী ব্যাপার?—জিগ্যেস করলাম।
—আর বলবেন না স্যার। আমি মরছি নিজের জ্বালায়, তার মধ্যে এই শালা ন্যাপলা ক্ষ্যাপা এসে খালি মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছে।
—কী চায় ও?
—ও বলছে ও নাকি সেলিব্রিটি। আমার কোম্পানি-তে ওকে কাজ দিতে হবে। অবশ্য ওরই বা দোষ কী? ওকে গাছে তুলল তো মিডিয়া।
—মানে?
—আরে, ন্যাপলা মাঝে মাঝে হাওড়া ব্রিজের চূড়ায় উঠে বসে থাকে, ওখান থেকে গঙ্গার শোভা-টোভা দ্যাখে। আবার সন্ধে লাগলে নিজে থেকেই সুড় সুড় করে নেমে নিজের ডেরায় ফিরে যায়। তা, সেদিনও ওরকম ব্রিজের মাথায় উঠেছে। দেশে বোধহয় সেদিন খবরের আকাল ছিল। কাজেই ব্রেকিং নিউজ হয়ে গেল—'ব্রিজের মাথায় আত্মহত্যাকামী যুবক।'
কুড়ি-টা টেলিলেন্স ব্রিজের নীচে থেকে ন্যপলার সমস্ত মুভমেন্ট ধরতে লাগল। বেচারা ছেঁড়া প্যান্টুলে লজ্জা ঢাকতে গিয়ে হাত খসে পড়েই যাচ্ছিল আরেকটু হলে।
তারপর সে মাটিতে নামামাত্র মহিলা-পুরুষ মিলিয়ে বিশজন রিপোর্টার তাকে ঘিরে ধরে প্রশ্নের ঝড় বইয়ে দিল। 'কীসে আপনাকে ক্ষেপিয়ে তুলল ভাই, বিশ্বায়ন না শ্রেণি-সমন্বয়?' 'আপনি আট বছর আগে একদিন কবিতাটা পড়েছেন?' 'কাইন্ডলি একটু সুইসাইডনোট-টি দেখাবেন? আমাদের দর্শকদের জন্য ফটোকপি করে নিয়ে আপনাকে আবার ফেরত দিয়ে দেব।'
ন্যাপলা কোনওরকমে রিপোর্টারদের চক্রব্যূহের ফাঁক দিয়ে খিঁচে দৌড় দিয়েছে। থেমেছে একেবারে আহিরিটোলায় নিজের ফুটপাথে এসে।
কিন্তু গতকাল পাড়ার চ্যাংড়া-রা ন্যাপলাকে খবরের কাগজ খুলে দেখিয়ে দিয়েছে ব্রিজের ডগায় ভিজে বেড়ালের মতন ওর ছবি। আর যায় কোথায়। সেই থেকে ন্যাপলা চ্যুইংগাম হয়ে আমার পেছনে সেটে গেছে। কী করি বলুন তো।
খুব একটা কিছু করতে হল না অবশ্য। ন্যাপলা আপন মনে বিড়বিড় করে এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল। দুয়েকবার সেলিব সাপ্লাইয়ের দরজায় লাগানো সিনেমার নায়কদের পোস্টার দেখতে দেখতে ঘাড়-টাড় বেঁকিয়ে হিরোদের মতন পোজ দিল। তারপর উদয়ের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল—এইবেলা যদি কাজ দেন সস্তায় করে দেব। সামনের মাসে সেকেন্ড হুগলি ব্রিজে উঠব। তারপর কিন্তু রেট বেড়ে যাবে। এই বলে গটগট করে আহিরিটোলার দিকে হাঁটা দিল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উদয় বলল—দাদা একটা রিকোয়েস্ট আছে। দেশে ধানকাটা চলেছে। তাই আমাকে হপ্তা খানেকের জন্যে ঘাটাল যেতে হবে। কিন্তু দোকান তো বন্ধ রাখতে পারব না। এখন শীতকাল। ফুল জলসার সিজন। প্রচুর প্রধান অতিথির অর্ডার আসছে। তাই আমার খুড়তুতো ভাই ভোলা-কে দোকানে বসিয়ে যাচ্ছি। ও এমনিতে চালাক ছেলে, ঠিক চালিয়ে দেবে। কিন্তু ওর না একটু ড্রিঙ্ক করার অভ্যেস আছে।
ডিউটি আওয়ারের বাইরে খেলে অসুবিধে নেই। কিন্তু মদ খেয়ে দোকানে বসলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমি তাই ওকে সামলে রাখার জন্য বলে যাচ্ছি—তপনদা মাঝে মাঝে সারপ্রাইজ ভিজিট দেবেন। আপনি কিন্তু সত্যি সত্যি মাঝে মাঝে এসে ভোলার হালচাল দেখে যাবেন দাদা। তাহলে ও বাড়াবাড়ি করবার সাহস পাবে না।
উদয়কে কথা দিলাম সেইরকমই করব। তবে সারপ্রাইজ ভিজিটের সময় পেলাম না। ঠিক দু-দিনের মাথায় উদয়ই আমাকে আর তানিয়াকে সারপ্রাইজড করে দিয়ে রাত দশটার সময়ে হাজির হল আমাদের ফ্ল্যাটে। দমকলের ঘন্টির মতন কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলতেই উদয় আমার বগলের তলা দিয়ে ড্রাইভ মেরে একেবারে সোফার পেছনে ঢুকে চেঁচাতে লাগল 'ওই এল, ওই ধরল, ওই মারল'। অনেক বুঝিয়ে, ঘাড়ে মাথায় জলের থাবড়া দিয়ে তাকে ঠান্ডা করলাম। তারপর সে সোফার ওপরে উঠে ছড়িয়ে বসল। বলল, বউদি, আমাকে দয়া করে চারটে দিন এখানে থাকতে দিন। তার মধ্যেই আমার ট্র্যাভেল এজেন্ট আমাকে প্লেনের টিকিট কেটে দেবে, আমি বাংলাদেশে চলে যাব।
বললাম—চার কেন, তুমি চল্লিশ দিনই থাকো না। কিন্তু কাকে ভয় তোমার? কেন এমন চালু ব্যবসা ফেলে পালাতে চাইছ? কে তোমাকে তাড়া করেছে? পুলিশ? ডাকাত?
—না, না, না। আরও ভয়ংকর! কবি। দাদা লক্ষ লক্ষ কবি।কবি-রা আমার বাড়িতে চড়াও হয়েছিল। আমাকে ঘাটাল বাসস্ট্যান্ড অবধি তাড়া করে এসেছিল। প্রতিটি জেলার তরুণ কবি-রা আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। পালানো ছাড়া আমার পথ নেই।
ভারি অবাক হয়ে বললাম,—কবিগুরু স্বয়ং বলে গেছেন কাব্য পড়ে যেমন ভাব, কবি তেমন নয় গো। তবুও তাদের ঠিক ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী বলে তো কখনও মনে হয়নি। ব্যাপারটা কী হয়েছিল বলো তো।
—সেটা জানবার জন্যে আমি নিজেও মাথা খুঁড়ে মরছি। এই টুকু বলতে পারি মেদিনীপুরে কিছুই হয়নি। যা হবার তা হয়েছে এই কলকাতায়। ভোলা-কে ফোন করলেই সব জানা যাবে। একটু নম্বরটা লাগান না দাদা। আমি বাড়ি থেকে পালাবার সময় মোবাইল-টাও আনতে পারিনি। স্পিকারটা অন করে দিন তাহলে সবাই শুনতে পাব।
তাই করলাম। ওদিক থেকে ভোলার গলা ভেসে এল, হ্যালো ও-ও?
—আরে শুয়োর, তুই কোথায়?
—কে, মেজদা? আমি আর. জি. করের এমার্জেন্সিতে।
—কাকে দেখতে গেছিস?
—ও:, দেখতে আসব কেন? নিজেই ভরতি আছে। বাঁ-হাতে কম্পাউন্ড ফ্যাকচার। মাথার পেছনে এগারো-টা স্টিচ। আধলা ঝেড়েছিল বলে এগারোটা। থান-ইট ঝাড়লে বাইশটা হত।
—বলিস কী রে! ওরা এমন হিংস্র হয়ে উঠল কেন? চুপ করে থাকিস না ভোলা। কিছু বল।
—কী বলব মেজদা? আমিও তো কিছুতেই বুঝতে পারছি না, গণ্ডগোলটা কোনখানে হল।
পরশুদিন, মানে সরস্বতী পুজোর দিন, তুমি যেমন বলে গেছিলে, সুকান্তনগর কবিতীর্থের সদস্যেরা গাড়ি-টাড়ি নিয়ে বিকেল থাকতেই চলে এল। মনে পড়ছে তো তোমার, সুকান্তনগরে এই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কবি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল সেইদিন।
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন। ওরা আজকের মহত্তমকবি-কে প্রধান অতিথি হিসেবে বুক করে গিয়েছিল। মওকা বুঝে বিশ হাজার টাকা অ্যাডভান্স নিয়েছিলাম। স-অ-ব মনে আছে। তুই থামিস না ভোলা, বলে যা।
—হ্যাঁ বলছি। তারপর বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হল। ছ'টা বাজল, সাড়ে ছ'টা, উদ্যোক্তারা তো কেবলি আমাকে তাড়া মারছে। ওদিকে মহত্তম কবির দেখা নেই। তিনি তো আবার মোবাইল ফোন-ও রাখেন না যে ফোন করে বুঝব কোথায় আছেন।
এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নাকি শুরু হবার কথা সাতটায়। সভাপতি হিসেবে স্থানীয় বিধায়ক এসে বসে থাকবেন। বাঁশ দিয়ে ঘিরে, দশক হিসেবে কবিদের বসবার নাকি আলাদা আলাদা জায়গা করা হয়েছিল। সেসব নাকি বিকেল থেকেই কবি-তে কবি-তে ছয়লাপ। তাদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙতে চলেছে। এদিকে আমারও সন্ধ্যাহ্নিকের বেলা পেরিয়ে যাচ্ছে। গা ম্যাজম্যাজ, মাথা ভার...
—শুয়োর! গর্জে উঠল উদয়।
—আমায় বলছ?
—না, ওপাড়ার বেচারাম তেলি-কে। তারপর বলে যা।
—হঠাৎ বাইরে বিরাট উল্লাসধ্বনি, 'এসে গেছে এসে গেছে।' দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি ভক্তদের কাঁধে পিঠে চেপে মহত্তম কবি ততক্ষণে অপেক্ষমান গাড়ির মধ্যে ঢুকে গেছেন। এক ঝলক তাকে দেখতে পেলাম। নোংরা পাজামা পাঞ্জাবি, হলদে বড় বড় দাঁত, কচুরিপানার শেকড়ের মতন দাড়ি, আবার কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনি ঝোলা। দিব্যি হাসি হাসি মুখে গাড়ির পেছনের সিটে এলিয়ে বসে আছেন। এতক্ষণ যে দেরি করলেন তার জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। যাইহোক ঠিক সাতটার সময়ে ভক্তরা জয়ধ্বনি দিতে দিতে কবিকে নিয়ে চলে গেল। আমিও গেলাস আর ছোলাভেজা...ও: স্যরি।
—হুঁ, তা গণ্ডগোলটা কোথায় হল?
—এর পরের ঘটনা আমি টেলিভিশনে দেখেছি। কবিসম্মেলনের লাইভ সম্প্রচার হচ্ছিল তো। যেমনটি দেখেছিলাম বলে যাচ্ছি। এর মধ্যে আমাদের দোষটা কোথায় সেটা তুমিই ভালো বলতে পারবে।
সে তো বিরাট জাঁকজমকের অনুষ্ঠান দাদা। ফরসা ফরসা সুন্দর সুন্দর মেয়েরা কাঞ্জিভরম শাড়ি আর স্প্যাগেটিব্লাউজ পরে প্রদীপ জ্বালিয়ে...
—ওইসব শুনতে চেয়েছি রে উল্লুক!
—ও: চ্যাঁচাচ্ছ কেন। দেখছ এটা একটা হাসপাতাল। বেশ, তাহলে প্রধান অতিথি, মানে আমাদের মহত্তম, মাইকের সামনে আসার পর থেকে কী কী করলেন তাই বলি।
প্রথমেই তো তিনি কানের গোড়া থেকে একটা পোড়া সিগ্রেট বের করে ফস করে ধরিয়ে ফেললেন। রেলা দেখে তো উদীয়মান কবিরা মুগ্ধ। কিন্তু তারপরে কী যে হল, মহত্তম কিছুই আর বলেন না। খালি এদিক-ওদিক তাকান আর মুচকি মুচকি হাসেন। তখন অডিয়েন্স থেকে আওয়াজ এল, 'গুরু, তরুণ কবিদের রচনা থেকে একটা আবৃত্তি হোক।'
তাই শুনে মহত্তম বললেন, 'ভাইরে। বিদ্যাসাগর মশায় কী একখানা বই লিখেছিলেন। বর্ণপরিচয়। সেই কোন যুগে পড়েছিলাম। তারপরে আর যা যা পড়েছি সবই ভুলে গেছি। কিন্তু বর্ণপরিচয়-খানা এখনও ভুলতে পারলাম না। তার থেকেই দু-লাইন শোনাই আপনাদের।' এই বলে মাইক টেনে নিয়ে তারস্বরে অজ, আম, কর, খল শোনাতে লাগলেন।
এতটা বোধহয় উদীয়মানদেরও সহ্য হল না। তাদের প্রতিনিধি এক বেঁটে টেকো ছোকরা দাঁড়িয়ে উঠে বলল, 'আপনি কি এতদ্বারা বোঝাতে চাইছেন যে আমরা বালখিল্যেরও অধম? অর্বাচীন?'
মহত্তম সমান তেজের সঙ্গে জবাব দিলেন, 'সে তো ঐহিক শিরদাঁড়ায় ঘুনপোকার নাক্ষত্রিক হৃদপিণ্ডের অনুরণনে দু-পলক মৃত গর্দভের বিলীয়মান কশেরুকা এবং ঋদ্ধ চন্দ্রাবলির ওষ্ঠ-দংশনের পরে অ্যাজটেক ঘেরাটোপ খুলে দিলে পিতৃহত্যাময় যে মোহজাল উদ্ধারনপুর ঘাটের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তার স্রোতে কান পাতলেই প্রতীয়মান হয়।'
এই কথায় উদীয়মানরা ভয়ংকর অফেন্ডেড হয়ে হইচই শুরু করল। তার মধ্যে একজন যেই না কবির দিকে গাঁজার কলকে ছুঁড়ে মেরেছে, অমনি কবিও কাঁধের ঝোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে পর পর তিনটি ডাবের খোলা বার করে নিখুঁত টিপে যথাক্রমে সেই উচ্ছৃঙ্খল তরুণ, প্রদীপ-জ্বালানো মহিলা এবং স্থানীয় বিধায়কের মাথায় ঝেড়ে দিলেন। তারপর অবলীলাক্রমে প্যান্ডেলের বাঁশ বেয়ে একদম মঞ্চের চূড়ায় উঠে বসে নিশ্চিন্তমনে চাঁদ দেখতে লাগলেন। যেন কিছুই হয়নি। কবি সম্মেলনে চিটে গুড়।
আর আমিও মেজদা বিন্দুমাত্র আন্দাজ করতে পারিনি এরপর কী হতে চলেছে। তাহলে কি আর সেলিব সাপ্লাইয়ের অফিসে বসে থাকি। আধঘণ্টার মধ্যে, বুঝলে, উদ্যোক্তারা হকি-স্টিক নিয়ে হাজির। চিৎকার করে বলে, শালা, কোত্থেকে একটা কবির ডুপ্লিকেট পাঠিয়ে দিয়ে বিশহাজার টাকা ঝেড়ে দিলে। আমরা চোখের জলে ভাসব, আর তুমি লাল জলে? মার শালাকে। তারপর মেজদা, ওরা আমারই বোতল দিয়ে আমার মাথায় ভেউ-ভেউ-ভেউ-ফোঁস-ফোঁস...
উদয় বলল, কাঁদিস না ভোলা, কাঁদিস না। সবই আমার কপাল। উদ্যোক্তারাই যদি কবির বদলে ন্যাপলাকে নিয়ে গিয়ে প্রধান অতিথির চেয়ারে বসিয়ে দ্যায়, তাতে তোর আমার কী দোষ বল। আচ্ছা রাখছি।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।