গ্যাস্ট্রোলীলা

সৈকত মুখোপাধ্যায়

ডাক্তার অনুপম জালানের প্রতি ডাক্তার নয়ন মিত্র ভয়ংকর মাৎসর্য্য বোধ করছিল।

'মাৎসর্য্য' কথাটার মানে নয়ন ডাক্তার নিশ্চিতভাবে জানে না। তবে শুনলেই বুঝতে পারে ষড়রিপুর মধ্যে ওইটাই সবথেকে ভয়ংকর। তা ছাড়া সে সমকামী নয় যে জালানের প্রতি 'কাম' বা 'মোহ' বোধ করবে। 'ক্রোধ' হচ্ছে বটে, তবে সেটা নিজের বউয়ের ওপরেই বেশি। 'লোভ'-ই বা করবে কেন? তার নিজের পয়সাকড়ি তো জালানের থেকে কিছু কম নয়। আর 'মদ', মানে অহংকারের তো প্রশ্নই ওঠে না। তার সমস্ত অহংকার ওই শালা জালান আর তার নিজের বউ দীপা মিলে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

তাহলে নয় নয় করে পড়ে রইল ওই মাৎসর্য্য।

হ্যাঁ, ডাক্তার নয়ন মিত্তির সেই রবিবার বিকেলে ডক্টরস-কলোনির বাগানে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার বুঝতে পারল, মাৎসর্য্য-রিপুর প্রভাবেই তার মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে, গা গুলোচ্ছে।

এবং ডাক্তার নয়ন মিত্র নিজের মনকে যতই সংস্কৃত করে বোঝাক, আমরা জানি, সোজা বাংলায় ডক্টর জালানের ওপর হিংসেয় তার বুক ফেটে যাচ্ছে।

হিংসের কারণটাও তাহলে বলেই ফেলি।

অনুপম জালান একজন কসমেটিক সার্জন। আর নয়ন মিত্তির চোখের ডাক্তার। একই রাস্তায় একদিকে অনুপম জালানের পেল্লায় নার্সিং হোম—'দা ফিগার গার্ডেন'। অন্যদিকে ডাক্তার মিত্তিরের 'বাবা তারকনাথ আই হসপিটাল'। নিজের চেম্বারের জানলা দিয়ে নয়ন মিত্তির রোজই দ্যাখে, সন্ধে হতে না হতেই রোলস, মার্সিডিজ, অডি, জাগুয়ারে 'দা ফিগার গার্ডেনের' সামনের রাস্তাটা জ্যাম হয়ে যাচ্ছে। সেইসব মহার্ঘ্য গাড়ির গহন অন্দরে বসে ডাক্তার অনুপম জালানের ডাকের জন্যে হা-পিত্যেশ অপেক্ষা করেন যত বৃদ্ধ বিলিওনেয়ার, পলিটিশিয়ান, রেভিনিউ-কমিশনার, পুলিশকর্তা আর শিল্পপতিদের পত্নী উপপত্নী আধাপত্নীদের ঝাঁক।

চেম্বারের জানলা দিয়ে নয়ন সেইদিকে ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে থাকে। দ্যাখে—সামান্য ঢলে যাওয়া যৌবনের সেইসব অসামান্য রূপবতীদের। আহা! সামার-স্যুট, ঘাগড়া-চোলি কিংবা কাঞ্জিভরমে জালানের নার্সিং-হোমের সামনেটা প্রতি সন্ধ্যাতেই যেন বিয়েবাড়ি। আর তার নিজের আই-হসপিটালের সামনেটা একবার দ্যাখো। সারি সারি বুড়োবুড়ি চোখে অ্যাট্রোপিন দিয়ে উবু হয়ে ফুটপাথে বসে আছে—যেন হরিসভার প্রতিষ্ঠাতা পটল তুলেছে আর বাকি সদস্যরা অপেক্ষা করছে কখন লুচি আর কুমড়োর ঘ্যাঁট খাওয়ার ডাক আসে। ছ্যা:। ডিসগাস্টিং!

অথচ সে আর অনুপম তো একই বছরে একই মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম বি বি এস পাশ করেছিল। কিন্তু তারপর লাইনটা বাছা-ই ভুল হয়ে গেল। না, পয়সা সে-ও নিজে কিছু কম রোজগার করে না। ফেকো অপারেশন মানেই তো তাই—'পয়সা ফেকো, তামাশা দেখো'। কিন্তু এখন সে বোঝে পয়সাটাই সব নয়। গ্ল্যামার চাই, গ্ল্যামার।

এই তো, অনুপম যেখানেই যায়, সেখানেই ওকে ঘিরে থাকে বীণা পট্টবর্ধন, রূপালি ঝাঁ, মঞ্জুলিকা বড়ুয়া কিংবা সিলভা তির্কের মতন সোসাইটি লেডিরা। থাকবে নাইই বা কেন? অনুপমই তো ওদের পুনর্যৌবনের জাদুকর।

ব্যাটার হাতযশ আছে কিন্তু!—মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হয় নয়ন ডাক্তার। সিলিকন কাপের যোগফলে কত অধোবদন পয়োধরকে সে আবার উদ্ধত করে তুলেছে, লাইপোসাকসনের বিয়োগফলে কত নীলতিমিকে বানিয়ে দিয়েছে নীলপরি, কত তেলা মাথায় হেয়ার-ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট-এর দৌলতে পনিটেল গজিয়েছে আর কত গিলে করা মুখের চামড়াকে টান টান ইস্তিরি করে ছেড়েছে তার তো ইয়ত্তা নেই।

তার ওপর কানাঘুসো শোনা যাচ্ছে, ফিগার গার্ডেনের ছাদে নাকি হেলিপ্যাড বানানো হচ্ছে। মুম্বইয়ের ফর্টি প্লাস নায়িকারা কপ্টারে চড়ে সোজা এখানে এসে নামবে, অপারেশন টেবিলে টোয়েন্টি মাইনাস করবে, তারপর হেলিকপ্টার থেকেই মা দক্ষিণাকালীর মন্দিরে মানতের গাজর কা হালবা ছুড়ে দিয়ে, বুক ফুলিয়ে ফিরে যাবে বলিউড।

এই খবর প্রথম শোনার পর অন্যমনস্ক নয়ন ডাক্তার লোকাল এম. এল. এ-র চোখের বদলে নাকের ফুটোয় ইম্পোর্টেড লেন্স বসিয়ে দিয়েছিল। সাংসদ সাহেবের হাতে পায়ে ধরে, পার্টি-ফান্ডে বিশ হাজার টাকা ডোনেশন দিয়ে তবে সেই যাত্রায় উদ্ধার পেয়েছিল সে।

মাৎসর্য্য কি সহজ রিপু?

তবে, যে রবিবারের কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম, সেই রবিবারেই হয়ে গেল চূড়ান্ত কাণ্ড। যাকে বলে রিপু-পরিবর্তন।

রোববারটা বাবা তারকনাথ আই হসপিটালে মোটামুটি অফ ডে। ওই দিন অপারেশন টপারেশন হয় না। ডাক্তার নয়ন মিত্র ইন-হাউস রুগিদের একটা রাউন্ড মেরে বিকেল-বিকেল বাসায় ফিরছিল।

একটা কথা আগে বলা হয়নি। সেটা হল, ডাক্তার নয়ন মিত্র আর ডাক্তার অনুপম জালান প্রতিবেশী। শহরের সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার হিসেবে নাম লেখানো আছে বলে দুজনেই গঙ্গার তীরে ডক্টরস কলোনিতে দুটি এলাহি সরকারি কোয়ার্টার ভোগদখল করে থাকে।

যা বলছিলাম। নয়ন সেই রবিবার নার্সিংহোমের রাউন্ড শেষ করে কলোনির গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে দ্যাখে কী, তার বউ দীপাকে পাশে বসিয়ে অনুপম জালান নিজের লাল টুকটুকে টয়োটা-খানা হাঁকিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেল। চোখের ডাক্তার নয়ন প্রথমেই ভাবল তার নিজেরই চোখ খারাপ হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি তালা খুলে কোয়ার্টারে ঢুকে চোখ পরীক্ষার উলটোপালটা এ বি সি ডি লেখা বোর্ডটার দিকে তাকাল। না, সে তো দিব্যি এক্স টি এল জেড, কিউ ডি এল পি, সবটাই পড়তে পারছে। চোখ তো খারাপ হয়নি। তাহলে কি মাথাটাই খারাপ হয়ে গেল? তাও তো নয়। কোমরের প্যান্টালুন তো কোমরেই আছে। তাহলে?

তখন দীপাকে তার মোবাইলে ধরল নয়ন। জিগ্যেস করল, তুমি জালানের পাশে বসে কোন জাহান্নমে যাচ্ছ?

দীপা চাপা গলায় উত্তর দিল, অমন বিচ্ছিরিভাবে কথা বোলো না। জালানদা দয়া করে আমাদের মহিলা-সমিতির বাৎসরিক অনুষ্ঠানে সভাপতি হতে রাজি হয়েছেন। আমার ওপর ভার পড়েছে ওনাকে নিয়ে যাওয়ার। জালানদা ইজ আ গ্রেট সোওওল। তোমার মতন হিংসুটে নন।

নয়ন মিত্তির ফুঁসে উঠল—অ, জালানদা! তাই না? জালানদাকে একদিন হাসপাতালের বারান্দা থেকে ঠেলে ফেলে দেব, তখন তোমরা সব ক'টা বড়লোকের বখে যাওয়া বউ মহিলা সমিতির বদলে কেত্তনের দল খুলতে বাধ্য হবে। একগলা ঘোমটা টেনে, 'সখীঈঈঈ গো, আমার বয়স বুঝি আর ঢাকা থাকল না, ঢাকা থাকল না' বলে কেত্তন গাইবে।

এ তো গেল সেই চূড়ান্ত ঘটনা ঘটার ঠিক আগে ডাক্তার নয়ন মিত্রের মানসিক পটভূমি।

ওদিকে রিপুদোষ কিন্তু সেই মুহূর্তে আরেকজনকেও অ্যাটাক করেছিল। সে হল ডাক্তার অনুপম জালানের ধর্মপত্নী রুক্মিণী জালান। সাদির পর স্বামীর স্পেশালাইজেশনের বিষয়টা জানার পর থেকেই দেহাতের গাঁয়ের মেয়ে রুক্মিণী মরমে মরে থাকে। হায় রাম! সারা দিন জেনানা লোগের শরমের জায়গা নিয়ে কাম করে। ও আদমির কি আর চরিত্রের 'চ'-ও বাকি আছে?

রুক্মিণী মনে মনে নয়ন ডাক্তারকে ভারি পছন্দ করে। হ্যাঁ, কত ভদ্র মানুষ। সত্তর বছরের নীচে কোনও মানুষকে ছুরির ডগা দিয়ে ছুঁয়েও দ্যাখেন না। আর ছুঁলেনও যদি, তো কী ছুঁলেন? আঁখ। কিতনা সুন্দর অংগ! একদম নিউটার জেন্ডার। আদমি জেনানা সবকো এক য্যাসে আঁখ হোতা হ্যায়। হ্যায় কি নেহি?

এই কলোনিতে রুক্মিণীর চোখে নয়নের চেয়ে উঁচুদরের চরিত্রবান ডাক্তার আর একজনই আছেন। ডাক্তার সতপথী। মালাইচাকি ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করেন। আহা, ঘুটন। আঁখসে ভি জ্যাদা নিউটার জেন্ডার।

সেই বিকেলে রুক্মিণীও কোয়ার্টারের জানলা দিয়ে পরিষ্কার দেখেছিল তার নিজের স্বামী ওই চুরৈল দীপা মিত্রের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে একই গাড়িতে চড়ে বেরিয়ে গেল। সেই দৃশ্য দেখার পর থেকেই রুক্মিণীর যা হচ্ছিল তা স্ট্রেটকাট দ্বিতীয় রিপু—ক্রোধ। রাগে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলছিল রুক্মিণীর। বুকটা জ্বলছিল সব থেকে বেশি। ঘন ঘন চোয়া ঢেকুরও উঠছিল। রাগ চেপে রাখলেই তার এরকম হয়। মাথা ঠান্ডা করার জন্যে রুক্মিণী কোয়ার্টারের বাইরে ডাক্তার কলোনির বিস্তৃত বাগানে এসে দাঁড়াল।

মাসটা ছিল চৈত্র। কলোনির পাঁচিল ঘেঁষে রাধাচূড়া আর কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো ফুলে ফুলে যৌবনের জয়পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিল। কোন পাতার আড়ালে বসে কে জানে, একটা চোখ গেল পাখি অক্লান্তভাবে ডেকে যাচ্ছিল। এইসব দেখতে দেখতে শুনতে শুনতেই রুক্মিণীর মাথাটা একবার বোঁ করে ঘুরে গেল। সে তাড়াতাড়ি একটা বকুলগাছের নীচে বাঁধানো বেদিতে বসে সর্বক্ষণের সঙ্গী বটুয়ার মুখটা ফাঁক করল।

আরেকজনও সেই মুহূর্তে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। ডাক্তার নয়ন মিত্র। রিপুর তাড়নায় তারও মুখ বিস্বাদ। হেউ হেউ করে ঢেকুর উঠছে। সে বাগানের গোল রাস্তাটা ধরে জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করল—যদি বুকের ব্যথাটা একটু কমে, এই আশায়।

হঠাৎই বাগানের দূরতম প্রান্তে বকুলগাছের নীচে বেদিটার দিকে নজর পড়ল ডাক্তার নয়ন মিত্রের। ওই নির্জন ছায়াময় কোণে কে বসে আছে? অনুপমের বউ রুক্মিণী না? হাঁটতে হাঁটতেই রুক্মিণীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নয়ন ভাবছিল, কী সুন্দর রোগাভোগা, তপোক্লিষ্ট গৌরীর মতন সুন্দর চেহারা রুক্মিণীর। তার বউ দীপার মতন অমন ভলাপচুয়াস ফিগার নয়।

এক চক্কর কমপ্টি করতে যেটুকু সময় লাগে তার মধ্যেই নয়নের মাথায় একটা ইচ্ছে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করল। দ্বিতীয় চক্করের শেষে সেই নিখাদ শারীরিক তাড়না তাকে টেনে নিয়ে চলল ওই বকুলবেদিটার দিকে। কিন্তু যাবে কি? ছোটবেলা থেকেই নয়নের আত্মবিশ্বাসের অভাব। এক পা এগিয়েই সে আবার উলটোদিকে ঘুরে গেল। চোখ গেল পাখিটা বোধহয় দম নেবার জন্যেই একটু থেমেছিল। নয়নকে পালাতে দেখে সে আবার বিপুল উৎসাহে ডেকে উঠল—ছি, ছি, ছি, ভীতু ভীতু ভীতু।

তাই তো। চাবুক খাওয়ার মতন ঘুরে দাঁড়াল নয়ন মিত্তির। তার বউকে পাশে বসিয়ে যদি শালা অনুপম জালান গাড়ি হাঁকিয়ে চলে যেতে পারে, তাহলে অনুপমের বউয়ের কাছে সে কি কিছুই আশা করতে পারে না? মরিয়া নয়ন দোপাটি জিনিয়ার বেড মারিয়ে গটমট করে রুক্মিণীর দিকে এগিয়ে চলল।

একটু এগোতেই রুক্মিণীর মুখটা কনে দেখা আলোয় ভালো করে দেখতে পেল নয়ন। বুঝতে পারল, ওই মেয়েটাও তারই মতন উপোসী। চোখের ডাক্তার হতে গেলেও আগে পুরো শরীরকে জানতে হয়। নয়ন শরীর চেনে। রুক্মিণীর চোখের তলায় ওই কালির দাগ এমনি নয়। বুকের ওই ঘন ঘন ওঠানামা, মুখে হাত চাপা দিয়ে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আলুথালু বসে থাকা এমনি নয়। ও মেয়ে দেবার জন্যে তৈরি। চাইলেই দেবে। যা চাইবে তার থেকে বেশিই দেবে ওই মেয়ে।

ঘোর-লাগা চোখে রুক্মিণীর দিকে এগোতে নয়ন মনে মনে বলল, দেখে যারে অনুপম, এই বাসন্তী গোধূলিবেলায় আমি আর তোর বউ...

আর দেরি করল না নয়ন। দ্রুতপায়ে রুক্মিণীর সামনে পৌঁছিয়ে স্মার্টলি প্রশ্ন করল—আপকি পাস অ্যান্টাসিড হ্যায় কেয়া?

এলিয়ে পড়া অবস্থা থেকে রুক্মিণী মহা উৎসাহে খাড়া হয়ে বসল। বলল, কিউ নেহি ভাইসাব? ইয়ে লিজিয়ে। আদরক কি পাচক ভি হ্যায়। একদম অর্জিনাল। পাঁচো মিনিট মে গ্যাস উতার দেগা। এ ভি ট্রাই কিজিয়ে থোড়া।—বটুয়াটা ডক্টর নয়ন মিত্রের দিকে এগিয়ে ধরল রুক্মিণী।

নয়নের মুখে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল। কারণ সে তো আগেই জানত, যা চাইবে তার থেকে বেশিই দেবে ওই মেয়ে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%