কুন্তীমন্ত্র

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এক

হাওড়ার জগাছা রোডের ধারে কাশীরাম মাইতির ঝুপড়ি চায়ের দোকানটাকে সেখানকার নিত্য চা-সেবীরা আদর করে 'কাশীকাফে' বলে ডাকে। একটু বেশি রাতের দিকে, এই ধরুন সাড়ে আটটা-ন'টা নাগাদ, সেই দোকানে উঁকি মারলে দেখতে পাবেন, প্রায় ফাঁকা ঘরটার লণ্ঠন জ্বালানো আবছায়া কোণে আড্ডায় মশগুল তিন তরুণ। তাদের নাম অভ্র, অরুণ আর সুদীপ। অবিবাহিত, আধা-বেকার ওই তিন সাহিত্যপ্রেমী কাশীকাফের ঠিকানা থেকেই 'শব্দবাণ' নামে একটা লিটল ম্যাগাজিন বার করে।

কোনও-কোনও সন্ধ্যায় এক তীক্ষ্ণনাসা শীর্ণকায় বৃদ্ধকেও তাদের সঙ্গে দেখা যায়। তিনি যেদিন থাকেন সেদিন অভ্র, অরুণ আর সুদীপের ভূমিকা নিছক শ্রোতার। বৃদ্ধের নাম মানিকলাল গুপ্ত। মালগাড়ির গার্ডের চাকরিতে এককালে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। এখন অবসর নেওয়ার পর সারাদিন বই পড়েন, বাগান করেন, সন্ধের পর অল্পস্বল্প দারু পান করেন এবং পান করার পর কোনওদিন যদি মুড চাপে তাহলে সোজা কাশীকাফের ওই অসমবয়সি বন্ধুদের ঠেকে এসে উপস্থিত হন।

অভ্র অরুণদের আড্ডায় তাদের মানিকদা সব সময়েই স্বাগত, কারণ, মত্ত অবস্থায় তিনি চমৎকার উদ্ভট গল্প বলে যেতে পারেন। সেই সব গল্পের মধ্যে অনেকগুলোই সুদীপরা সামান্য এডিট-টেডিট করে শব্দবাণে ছাপিয়ে দিয়েছে। মানিকলাল গুপ্ত তাতে খুব একটা আপত্তি করেননি। তিনি শুধু বলেছেন, এগুলোকে তোরা সত্য ঘটনার মর্যাদা দিস না, এটাই যা দু:খের।

যেমন এই সেদিনই কথা হচ্ছিল বিলাসপুরের ভৌমিক পরিবারকে নিয়ে। সকালের কাগজে বেরিয়েছে ভৌমিক পরিবারের কথা। একই পরিবারের তিন প্রজন্মে তিনজন প্রতিভাবান হয়তো অনেক দেখা যায়, কিন্তু ভৌমিক পরিবারের সদস্যদের মতন এমন বিচিত্রমুখী প্রতিভা কমই পাওয়া যায়।

পরিবারের প্রথম প্রবাসী কর্তা, যিনি কলকাতা ছেড়ে বিলাসপুরে গিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন, তাঁর নাম অশোক ভৌমিক। অশোকবাবু যৌবনে জিমখানা ক্লাবে চুটিয়ে ক্রিকেট খেলেছেন। মাত্র বাইশবছর বয়সে রেলের চাকরি নিয়ে বিলাসপুর চলে যেতে না হলে ভারতীয় দল আরও একজন সুঁটে ব্যানার্জিকে পেয়ে যেত।

অশোক ভৌমিকের সাত ছেলের মধ্যে কনিষ্ঠ অরিন্দম ভৌমিক সুরকার হিসেবে সঙ্গীত জগতে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এই মুহূর্তে তাঁর সুর দেওয়া সিনেমার সংখ্যা মুম্বাই চেন্নাই মিলিয়ে চল্লিশটার কম হবে না।

আবার অরিন্দম ভৌমিকের ছেলে অনিকেত ভৌমিক অক্সফোর্ডে মাস্টারি করতে করতে মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে একখানা ফাটাফাটি ইংরেজি উপন্যাস লিখে সারা দুনিয়ায় হইচই ফেলে দিয়েছেন। মূলত সেই উপলক্ষেই আজকের কাগজে এত বড় ফিচারটা বেরিয়েছে। ফিচারটা পড়েছে ওরা সবাই। এখন সেই বিষয়েই তর্ক হচ্ছিল।

তরুণ বলছিল, সাধারণত গায়কের ছেলে গায়ক, নায়কের ছেলে নায়ক, পরিচালকের ছেলে পরিচালকই হয়। ভৌমিকদের মতন এমন বিচিত্রমুখী প্রতিভা বংশগতির হিসেবে ঠিক স্বাভাবিক নয়। কোথায় ক্রিকেটার, কোথায় সুরকার আর কোথায় সাহিত্যিক! ব্যাপারটা সত্যিই অবাক করার মতন।

সুদীপ টেবিলে তবলা বাজিয়ে বলল, অবাক হবার কিছু নেই। বংশের ধারা থেকে ওনারা প্রত্যেকেই যেটা পেয়েছেন সেটা হল জেদ। ভালো কিছু করার ইচ্ছে। তারপর সেই জেদ নিয়ে যে যাতে হাত দিয়েছেন তাতেই সফল হয়েছেন।

অভ্র বলল, আপনার কী মনে হয় মানিকদা? বংশগতি কি কোনও একটা বিষয়ে দক্ষতা সাপ্ল্যাই করে, না কি ওই সুদীপ যা বলছে—টেম্পারামেন্ট?

মনিকলাল গুপ্ত বললেন, ঘোড়ার ডিম।

পাঞ্জাবির পকেট থেকে বিড়ি আর দেশলাই বার করে মানিকলাল যত্ন করে ধরালেন। তারপর এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, অশোক ভৌমিককে আমি ভালো করেই চিনতাম। ইন ফ্যাক্ট, বিলাসপুরে যখন পোস্টেড ছিলাম তখন আমরা পাশাপাশি কোয়ার্টারে থাকতাম। কাজেই পারিবারিক বন্ধুত্ব বলতে পারিস। আর সেই অধিকারেই একটা কথা বলছি, মন দিয়ে শোন। অরিন্দম ভৌমিকের গায়েও অশোক ভৌমিকের রক্ত নেই, আবার অনিকেত ভৌমিকের গায়েও অরিন্দম ভৌমিকের রক্ত নেই। এবার বল, বংশগতি নিয়ে কী বলবি।

সর্বনাশ! এ যে কেলেংকারিয়াস কথা বলছেন মানিকদা! কঁকিয়ে উঠল আড্ডাধারীরা।

সে কেলেংকারিয়াস বলিস, আর যাই বলিস, সত্যি কথাটা আমাকে বলতেই হবে। সত্যি কথাটা হচ্ছে ভৌমিক ফ্যামিলির বউরা বংশানুক্রমে কুন্তীমন্ত্র জানত।

কুন্তীমন্ত্র! বলুন, বলুন। বলুন তো দাদা ব্যাপারটা কী। গল্পের গন্ধ পেয়ে অরুণ, সুদীপ আর অভ্র মানিকদার গা ঘেঁষে বসল। এমনকী কাশীনাথ অবধি উনুনের আঁচ ফেলে দিয়ে গুটি গুটি পায়ে মানিকদার পেছনে একটা বেঞ্চিতে জায়গা নিল। অবশ্য তার আগে সে মানিকলাল গুপ্তর সামনে সযত্নে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা র-চা নামিয়ে দিয়েছে। লেবু দেয়নি, পাছে টকের চোটে বড় নেশাটা কেটে যায়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মানিকদা শুরু করলেন।

দুই

হয়েছিল কী, অশোকদা চেয়েছিলেন তার ইন্ডিয়া খেলার অপূর্ণ স্বপ্নটা অন্তত একটা ছেলের মধ্যে পূর্ণতা পাক। সেইজন্যেই নিশ্চয় পরের পর পুত্র উৎপাদন করে গিয়েছিলেন। কিন্তু বলব কী, এমনই তার কপাল, প্রথম ছ'টা ছেলেই ডিউস বল ছুটে আসতে দেখলেই ব্যাট-ট্যাট ফেলে পয়েন্ট কিংবা থার্ড-ম্যানের দিকে দৌড় লাগাত। এত তাদের ভয়।

রাগের মাথায় একদিন অশোকদা বউদিকে যাচ্ছেতাই গালাগাল করলেন। বললেন, তুমি ভীতু, তোমার গুষ্টিসুদ্ধু ভীতু। তোমার বাবা রাতে একা বাথরুমে যেতে পারে না। তোমার দাদা বসের ভয়ে গত দশবছর অফিসে ছুটি নেয়নি। তোমার জন্যেই আমার ছেলেগুলো এরকম ডরপোক হল।

জানিস তো, বাপের বাড়ির নিন্দে শুনলে কোনও মহিলারই হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। বউদি 'রইল তোমার ঘরদুয়োর, রইল তোমার ছেলের পাল, এই আমি চললাম।'—বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। সঙ্গে নিলেন স্রেফ পাঁচটি টাকা, প্রতিদিন যে গীতাটি পড়তেন সেইটা, ঠাকুরের বাতাসার কৌটো আর বোরোলিনের টিউব। তারপর বিলাসপুর স্টেশনে গিয়ে সামনে যে লজঝরে লোকাল ট্রেনটি পেলেন, সেইটিতেই উঠে বনবাসে চললেন।

ট্রেনটা ছেড়েছিল সকালে। দুপুরের মধ্যে কামরা থেকে শহুরে লোকেরা সকলেই নেমে গেল। রইল কেবল মাথায় পাখির পালক গোঁজা, লেংটি-পরা, তির ধনুক হাতে কয়েকটা মেয়ে মরদ। বিকেলের দিকে কোন একটা স্টেশনে গাড়ি দাঁড়াতে তারাও হই হই করে নেমে পড়ল। তার পরের স্টেশনে বাঁ-দিকের দরজা দিয়ে খালি কামরায় একটা চিতাবাঘ উঠে এল আর তাই দেখে বউদিও বুঝলেন বনবাসী হবার উপযুক্ত জায়গায় পৌঁছে গেছেন। তিনিও ডানদিকের দরজা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়লেন। ফাঁকা ট্রেনটা খড়মড় করতে করতে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কোন স্টেশনের দিকে চলে গেল কে জানে।

বউদি জনমানবহীন স্টেশন চত্বরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। ততক্ষণে সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। একটু দূরে জঙ্গলের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল একটা ছোটখাটো টিলা। তার মাথার কাছে কয়েকটা গুহা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বউদি জোরে পা চালিয়ে ওই টিলাটার কাছে পৌঁছোলেন এবং তার পর হাঁচড়ে-পাঁচড়ে টিলায় উঠে একটা গুহার মধ্যে ঢুকে পড়লেন।

গুহাটায় ঢুকে বউদি অবাক হয়ে দেখলেন পাথরের দেয়ালে কত রকমের রংচঙে ছবি! আরও অবাক কাণ্ড এই যে, গুহার ভিতরটা পরিষ্কার তকতক করছে। একধারে পাথরের উনুন, মাটির বাসন কোসন সাজানো রয়েছে। এমনকী চকমকি পাথর আর প্রদীপটি অবধি রেডি।

বউদি প্রদীপটা জ্বেলে গলায় আঁচল দিয়ে সন্ধে দিলেন। তারপর মনে মনে ইষ্টদেবতাকে বাতাসা নিবেদন করে, সেই বাতাসা আর জল খেয়ে প্রদীপের আলোয় গীতা পড়তে বসলেন, যাতে মনটা বাড়িতে ফেলে আসা ছ'টা ছেলের দিক থেকে একটু দূরে থাকে।

চারদিক থেকে বাঘের ডাক, হাতির ডাক ভেসে আসছিল। কিন্তু তাতে কী? রাগের চোটে বউদির মাথা থেকে বাঘের ভয় বেরিয়ে গিয়েছিল। তবে কী না, একটু বাদে গীতা পাঠ করতে করতে যখন আড়চোখে তিনি দেখলেন যে, সাদা শাড়ি পরা, পাকা চুলের এক বৃদ্ধা তার পাশে বসেই হাতজোড় করে পাঠ শুনছেন, তখন বউদির বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। তিনি পড়া থামিয়ে ঘুরে বসলেন। জিগ্যেস করলেন, আপনি কে মা?

উত্তর এল, আমি পাণ্ডুরাজার বিধবা পত্নী, কুন্তী।

অবিশ্বাস করার কোনও উপায়ই ছিল না। বৃদ্ধার যেরকম রূপ আর আভিজাত্য, সেরকমটা একালে সম্ভব নয়। সাষ্টাঙ্গে কুন্তীদেবীকে প্রণাম করে বউদি জিগ্যেস করলেন, তা আপনি এখানে কী করছেন মা?

কুন্তী বললেন, আমি, আমার পুত্রবধূ দ্রৌপদী আর পাঁচ ছেলে অজ্ঞাতবাসে এসেছি। বউমা আর ছেলেরা আশেপাশে গুহাগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এই গুহাটাতে আমি থাকি। তুমি যে বইটা পড়ছিলে শুনতে মন্দ লাগছিল না। কার লেখা গা?

বউদি বুদ্ধিমতী মেয়ে। চট করে ধরে ফেললেন যে সময়ের গর্তে পড়ে তিনি মহাভারতের কালে পৌঁছে গেছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এখনও সংঘটিত হয়নি, ফলে গীতারও জন্ম হয়নি। তিনি যে নিজের অজান্তেই ভীমবেঠকার গুহায় পৌঁছে গেছেন, সেটা বুঝতেও বউদির সময় লাগল না। কে না জানে, অজ্ঞাতবাসের সময় পঞ্চপাণ্ডবেরা কিছুদিন মধ্যপ্রদেশের ওই গুহাগুলোতে বাস করেছিলেন।

তারপর তো বউদিতে আর কুন্তীদেবীতে অনেক সুখদু:খের গল্প হল। বউদি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দিলেন না যে, কুন্তীর জীবনে যা হয়েছে আর যা হবে—সেই কর্ণের জন্মের সময় থেকে স্বর্গারোহণ অবধি—কালী সিঙ্গির কল্যাণে সবটাই তার মুখস্থ।

কুন্তীদেবীর হাত-পা কাঁটায় ছড়ে গিয়েছিল। তিনি যত্ন করে সেগুলোর ওপর বোরোলিন লাগিয়ে দিলেন। মনের সব দু:খের কথা গলগল করে বলে ফেলতে পেরে ততক্ষণে বউদির মনটাও বেশ হালকা লাগছিল। তিনি কুন্তীদেবীর পাশেই পাথরের ওপর আঁচল পেতে ঘুমিয়ে পড়লেন।

ঘুম থেকে উঠে বউদি দেখলেন সকাল হয়ে গেছে। কুন্তীদেবী অন্তর্ধান করেছেন। আকাশ দিয়ে একটা হেলিকপ্টার যেতে দেখে বউদি বুঝতে পারলেন, তিনি আবার বিংশ শতাব্দীতে ফিরে এসেছেন।

নিজের জিনিসগুলো গুছিয়ে তুলতে গিয়ে বউদি দেখলেন, তার মাথার কাছে পাথর চাপা দিয়ে একটা ভুর্জপত্রের চিঠি রাখা আছে। তিনি চিঠিটা পড়লেন। দেবভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করলে সেই চিঠির অর্থ দাঁড়ায়—

'কল্যাণীয়া মণি,

আমি একটি আশ্চর্য মন্ত্র জানি। সেটা নীচে লিখে দিলাম। সন্তানলাভের জন্য যে পুরুষকে কামনা করবে, এই মন্ত্রের কল্যাণে তাকেই নিজের শয়নকক্ষে আনতে পারবে। তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে। আশা করি এই মন্ত্রের সুপ্রয়োগ ঘটাবে এবং তোমার আগামী সন্তান কন্দুক ক্রীড়ায় দক্ষ হবে। তাহলেই তোমার সংসারে শান্তি ফিরবে।

আর একটা কথা শুনে রাখো। ব্যাটাছেলেগুলো চিরকালই আড়বুঝো। সে রাজা পাণ্ডুও যা, অশোক ভৌমিকও তাই। এসব মন্ত্রের কথা তাদের বলতে নেই। আশীর্বাদ নিও। ইতি কুন্তী।

পুনশ্চ: তোমার আশ্চর্য মলমটি নিয়ে গেলাম। বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই, কাজে লাগবে। আশা করি কিছু মনে করবে না।'

বউদি তক্ষুনি সেই আশ্চর্য মন্ত্রটি পড়তে শুরু করলেন। কিন্তু শেষ দুটো লাইন পড়বার আগেই একটা হরিণশিশু এসে তার হাত থেকে ভুর্জপত্রটি খেয়ে নিল। ফলে যে গুণবান পুরুষকে আহ্বান করা হচ্ছে তার নামটুকুই বউদি বলতে শিখলেন। রূপ, গুণ, পদবী এসব যে কেমন করে নির্দেশ করতে হয় তা বউদির অজানাই থেকে গেল।

তারপর যেমনভাবে লজঝরে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চেপে ভীমবেঠকায় এসেছিলেন সেইভাবেই আবার বউদি বিলাসপুরে নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। সেখান অনুতপ্ত অশোকদা শ্বশুরমশাইয়ের জন্যে বাফতার পাঞ্জাবি আর শালার জন্যে স্যুটের পিস কিনে বসেছিলেন। বউদি ঘরে পা দেওয়ামাত্র দুজনের ভাব হয়ে গেল।

বুঝলি সুদীপ, আমার বউয়ে আর বউদিতে ছিল হলায় গলায় ভাব। নাহলে এসব গুহ্য কথা আমি জানব কেমন করে?

যাই হোক, ভীমবেঠকার সেই ঘটনার ঠিক ন'মাস পরে বউদির গর্ভে সপ্তম সন্তান জন্ম নিল। সেই-ই হল তোদের আজকের বিখ্যাত সুরকার—অরিন্দম ভৌমিক।

অভ্র মাথা চুলকোতে-চুলকোতে বলল, যাব্বাবা, তা কেমন করে হয়? কুন্তীমন্ত্র হাতে পেয়েও সুরকার! বউদি কি কোনও ক্রিকেটারের ইয়ে...সাহচর্য প্রার্থনা করেননি?

সাধু বাংলা কপচাস না অভ্র। বউদি বিখ্যাত এক ক্রিকেটারকেই ডেকেছিলেন। ক্রিকেটারের সেরা ক্রিকেটার—পঙ্কজ রায়কে।

তাহলে! পঙ্কজ রায়ের ঔরসে সুরকার জন্মায় কেমন করে?

আগে শোন সবটা। তখন তো এমন সারাদিন টেলিভিশনে ক্রিকেটারদের দেখা যেত না। কাজেই পঙ্কজ রায় বেঁটে না লম্বা, কালো না ফরসা, বউদি কিছুই জানতেন না। তাই আধখ্যাঁচড়া কুন্তীমন্ত্র জপ করা মাত্র বউদির ঘরে পান চিবোতে চিবোতে, ধুতি পাঞ্জাবি পরে যে ভদ্রলোকটি ঢুকলেন, যার ব্র্যাকব্রাশ চুল আর চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, তাকে দেখে বউদি ভাবলেন তিনি বোধহয় স্বনামধন্য ক্রিকেটার পঙ্কজ রায়।

আসলে?

আসলে তো পঙ্কজ মল্লিক।

ও হো হো হো! তাই বুঝি অরিন্দম ভৌমিকের শরীরে ক্রিকেটারের বদলে সুরকারের জিন চলে এল। ভেরি স্যাড।

ভেরি স্যাড তো বটেই। তার চেয়েও দু:খের কথা হল, যখন অশোকদা দেখলেন তার এই ছেলেটারও ব্যাট হাতে নিলে হাঁটু কাঁপে, তখন তিনি রাগে দু:খে বউদির পাশে শোয়াই ছেড়ে দিলেন। চিলেঘরের মেঝেতে বাঘছাল পেতে ঘুমোতেন আর বাড়ির চাকর-বাকর থেকে পাড়া প্রতিবেশী সকলেই সেটা জানত। কাজেই বুঝতেই পারছিস, বউদিরও আর কুন্তীমন্ত্র ব্যবহার করা হল না। স্বামী সহবাস ছাড়া সন্তান হলে লোকে বলবে কী?

তারপর?

তারপর শুরু হল পরের প্রজন্মের মুখ চেয়ে বসে থাকা। অশোকদার প্রথম ছয় ছেলের ঘরের আঠারোটা নাতি-নাতনির মধ্যে কেউ খেলল গুলি, কেউ খেলল ফুটবল। এমনকী আইস-হকি কিংবা বিচ-ভলি অবধি খেলে ফেলল দুয়েকজন। কিন্তু কী আশ্চর্য ভাগ্যের পরিহাস, ক্রিকেটে কারুরই আগ্রহ দেখা গেল না। অশোকদার তখন অনেক বয়স। বুড়োর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন তখনও বংশে একটা নামজাদা ক্রিকেটারের আগমন। তাই বউদি একদিন ছোটছেলে অরিন্দমের বউকে কুন্তীমন্ত্র প্রদান করলেন।

অরিন্দমের বউ কাবেরী অন্ধকার ঘরে কুন্তীমন্ত্র জপ করে সুনীল গাভাসকারকে আহ্বান করল। ঘরে আলো থাকলে সে দেখতে পেত, যিনি ঢুকলেন তার দিব্যি হৃষ্টপুষ্ট গালফোলা চেহারা। মাথার চুল কাঁচা, কিন্তু ঝুলপিদুটো পাকা...।

অভ্র খাবি খেল—সুনীল গাঙ্গুলি!!!

ইয়েস। কবির কবি, সাহিত্যিকের সাহিত্যিক সুনীল গাঙ্গুলি। গাঙ্গুলি মশাই তো অভাবনীয় সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বিদায় নিলেন। যথাসময়ে কাবেরীর গর্ভে জন্ম হল বিখ্যাত সাহিত্যিক অনিকেতের।

অরুণ বলল, আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। অভ্র আর সুদীপ বলল, আমাদেরও। কাশীনাথ উত্তেজনার চোটে চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মানিকলাল বললেন, সে কী রে। এরমধ্যেই মাথা ঝিম ঝিম করছে? এরপর যা শুনলাম সেটা বললে তো বলবি, মানিকদা গুল মারছে।

ওরা সমস্বরে বলল, ছি, ছি, মানিকদা। আপনি গুল মারছেন এ কথা কি স্বপ্নেও ভাবা যায়?

মানিকদা আরেকটা বিড়ি ধরিয়ে বললেন, তবে শোন। মাসদুয়েক আগে অনিকেত নাকি তার মেম-বউ আর দুটো যমজ ছেলেকে নিয়ে বিলাসপুরে এসেছিল। সেই ফুটফুটে বাচ্চা দুটো যতদিন বিলাসপুরে ছিল, ক্রিকেট কেন, কোনও খেলাই খেলেনি। গান গায়নি, গল্প লেখেনি। শুধু গম্ভীরমুখে সারাদিন ধরে নিজেদের ল্যাপটপে শেয়ার কেনাবেচা করেছে। অরিন্দমের, মানে বাচ্চাদুটোর দাদুর একটা বাতিল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ছাপ্পান্ন টাকা পড়েছিল। দু-মাসের মধ্যে শেয়ারে খাটিয়ে ছাপ্পান্না টাকাকে বাইশ লক্ষ টাকা করে দিয়ে ওরা অক্সফোর্ডে ফিরে গেছে।

ওরে বাবা! ওই যমজ শিশু কার সন্তান মানিকদা?

তাই তো বলছি। মেম-বউ নাকি ভৌমিক বংশের স্বপ্নপূরণের জন্যে কুন্তীমন্ত্র জপ করে বাঙালির ক্রিকেটের গর্ব লক্ষ্মীরতন শুক্লাকে ডেকেছিল।

তারপর?

এবারেও মিসটেক। বিধাতাপুরুষ লক্ষ্মীরতনের সন্ধিবিচ্ছেদ করে লক্ষ্মী মিত্তাল আর রতন টাটাকে মেম-বউয়ের শোওয়ার ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে কুন্তীমন্ত্রের শেষ ফসল—ভৌমিক বংশের জোড়া শিল্পপতি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%